📄 আবূ রাফি’র হত্যাকাণ্ড (যুল-হিজ্জাহ, ৫ম হিজরি)
আবূ রাফি' এক ধনাঢ্য ইয়াহুদি ব্যবসায়ী। বাড়ি হিজাযে, থাকে খাইবারে। খন্দকের ওই জোটবাহিনী গঠনে তার বেশ অবদান ছিল। এখন জোটবাহিনীও পরাজিত, বানু কুরাইযাও খতম। কিন্তু আবূ রাফি'কে জীবিত রাখা মানে ভবিষ্যতে এ-রকম আরও হুমকির সম্ভাবনা জিইয়ে রাখা। এর আগে আওস গোত্রের সদস্যরা কা'ব ইবনু আশরাফকে কতল করেছে। সমমানের আরেক হুমকি আবু রাফি'কে হত্যা করার মর্যাদাটি তাই পেতে চাইল খাযরাজ। নবিজি ﷺ -এর অনুমতিক্রমে পঞ্চম হিজরি সনের যুল-হিজ্জাহ মাসে আবূ রাফি'র হত্যা অভিযানে বের হন পাঁচ খাযরাজি পুরুষ।
আবূ রাফি'র দুর্গ খাইবারের সীমানায়। আবদুল্লাহ ইবনু আতীক (রদিয়াল্লাহু আনহু)- এর নেতৃত্বে খাযরাজের ওই মুজাহিদরা সেখানে এসে পৌঁছান সূর্যাস্তের সময়। সাথিদের অপেক্ষা করতে বলে আবদুল্লাহ ইবনু আতীক দুর্গের ফটকের কাছে যান। সেখানে এত স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে থাকেন, যেন তিনি দুর্গবাসীদেরই একজন। এক প্রহরী দেখে ডাক দিল, “এই যে আল্লাহর বান্দা, ভেতরে চলে এসো। একটু পরই ফটক বন্ধ করে দেবো।"
এটাই তো চাইছিলেন আবদুল্লাহ। চট করে ভেতরে এসে লুকিয়ে ফেললেন নিজেকে। সে রাতে চাবির গোছাটা চুরি করে নিয়ে ফটক খুলে রাখলেন তিনি, যাতে পালানোর সময় সুবিধা হয়। এরপর এগিয়ে যেতে থাকেন আবূ রাফি'র কামরার দিকে। একেকটি কক্ষ পার হন আর দরজা ভেতর থেকে লাগিয়ে দেন। যাতে কেউ বাইরে থেকে আসতে না পারে। ভেতরের অন্ধকার আর দুর্গবাসীদের ঘুমের কারণে বোঝাই যাচ্ছিল না যে, আবূ রাফি' কোথায় আছে। আবদুল্লাহ নরম স্বরে ডাক দিলেন, “আবূ রাফি!”
সে জবাব দিল, “কে?” আবূ রাফি'র কণ্ঠ অনুসরণ করে এগিয়ে গেলেন আবদুল্লাহ। তরবারি চালালেন বটে, কিন্তু আবূ রাফি' একটু আহত হলো কেবল। ব্যথায় চিৎকার করে উঠল সে। আঁধারের মাঝে আবদুল্লাহ সটকে পড়লেন। একটু পর ফিরে এসে স্বর বদলে জিজ্ঞেস করলেন, “আবূ রাফি', কিসের শব্দ হলো?” হাবভাব এমন যেন সাহায্য করতে এসেছেন।
“আরে সর্বনাশ! কে যেন ঘরে ঢুকে আমাকে তলোয়ার দিয়ে মারতে চেয়েছিল”, ব্যথা আর রাগে চেঁচিয়ে উঠল আবূ রাফি'। আবদুল্লাহ আবারও এগিয়ে এসে আঘাত করলেন। কিন্তু এবারের আঘাতটিও প্রাণঘাতী হলো না। ফলে তলোয়ারটা কায়দা করে তার পেটে বিঁধিয়ে দিয়ে এত জোরে চাপ দেন যে, পিঠের হাড় পর্যন্ত পৌঁছে যায়। গলগল করে রক্ত বের হচ্ছে আবূ রাফি'র শরীর থেকে। দ্রুত আবদুল্লাহ ইবনু আতীক একের পর এক দরজা খুলে সেখান থেকে পালিয়ে আসতে লাগলেন। চাঁদের আলো ছিল ঠিকই। কিন্তু ক্ষীণ আলোতে ভুল বোঝার কারণে সিঁড়িতে পা হড়কে পড়ে যান তিনি। পায়ে জখম হয়। পাগড়ি খুলে বেঁধে নেন পায়ের ক্ষতস্থান। ফটকের পাশের ছায়ায় লুকিয়ে থাকেন ভোর পর্যন্ত। ভোরে দুর্গের চূড়া থেকে এক ঘোষণাকারী বলে ওঠে, “আমি হিজাযের ব্যবসায়ী আবূ রাফি'র মৃত্যুর ঘোষণা দিচ্ছি!”
অভিযান শেষে খুশিমনে সঙ্গীদের কাছে ফিরে আসেন আবদুল্লাহ। সবাই মিলে নিরাপদে মদীনায় ফিরে নবিজি ﷺ -কে সব ঘটনা জানান। আবদুল্লাহর পায়ের ক্ষতে রাসূলুল্লাহ ﷺ হাত বোলাতেই তা পুরোপুরি এমনভাবে সেরে যায় যে, মনে হয় কখনও কোনও ব্যথাই ছিল না।
টিকাঃ
৩৬৪. বুখারি, ৪০৩৯।
📄 ইয়ামামার নেতা সুমামা ইবনু উসালের বন্দি (মুহাররম, ৬ষ্ঠ হিজরি)
সুমামা ইবনু উসাল ছিলেন ইয়ামামা অঞ্চলের নেতা। ইসলাম ও নবিজি ﷺ -এর প্রতি বিদ্বেষবশত একবার তিনি নবিজিকে হত্যাচেষ্টা করেন। এ কাজে তাকে ইন্ধন জোগায় মিথ্যুক নবি-দাবিদার মুসাইলিমা কাযযাব। ষষ্ঠ হিজরি সনের মুহাররম মাসে গুপ্তহত্যার উদ্দেশ্যে বের হন সুমামা। কিন্তু বানু বকর ইবনি কিলাবের বিরুদ্ধে অভিযান শেষ করে ফেরত আসা একদল মুসলিম অশ্বারোহীর হাতে ধরা পড়ে যান তিনি।
মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নেতৃত্বে সাহাবিদের সেই দলটি সুমামাকে বন্দি করে মদীনায় নিয়ে আসেন। মাসজিদে নববির একটি খুঁটিতে বেঁধে রাখা হয় তাকে। নবি বন্দিকে দেখে জিজ্ঞেস করেন, “সুমামা, কেমন আচরণ আশা করো?”
সুমামা জবাব দেয়, “ভালো আচরণ। কারণ, যদি আমাকে মেরে ফেলেন, তবে এমন একজনকে হত্যা করবেন, যার রক্তের মূল্য আছে। যদি দয়া করেন, তবে দয়া পাবেন। আর যদি ধনসম্পদ চান বলুন, যা চান আপনাকে তা-ই দেওয়া হবে।”
পরপর তিন দিন নবি তাকে একই প্রশ্ন করে একই জবাব পান। অবশেষে তাকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন আল্লাহর রাসূল ﷺ। কিন্তু সুমামা সম্ভবত এই তিন দিনে নিজের মুক্তির চেয়েও আরও গভীর কোনও বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছেন। ছাড়া পেয়েই তিনি গোসল করে এসে ইসলামে দাখিল হওয়ার আবেদন জানান। পরে তিনি নবিজিকে বলেছিলেন, “আমি আল্লাহর কসম করে বলছি, মুহাম্মাদ! একটা সময়ে আমি দুনিয়ার বুকে আপনাকে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করতাম। কিন্তু সেই আপনিই এখন আমার কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়। আল্লাহর কসম! আপনার ধর্মটাকে একসময় আমি সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করতাম। কিন্তু সেটাই এখন আমার নিকট সব থেকে বেশি প্রিয়।”
মদীনা থেকে বের হয়েই উমরার উদ্দেশ্যে মক্কা যান সুমামা (রদিয়াল্লাহু আনহু)। কুরাইশরা তার এই পরিবর্তন দেখে অপমানের তুবড়ি ছোটায়। সুমামার ত্বরিত জবাব, “আল্লাহর কসম! নবিজি অনুমতি দেওয়ার আগ পর্যন্ত ইয়ামামা থেকে একটা গমের দানাও তোদের এখানে আসবে না।”
ঠিকই সুমামা কথাকে কাজে পরিণত করে বসেন। দিনের পর দিন কেটে যায়, অথচ গম-ব্যবসায়ীদের একটা কাফেলাও মক্কায় আসে না। শেষমেশ নবিজি ﷺ -এর কাছে চিঠি পাঠিয়ে আত্মীয়তার দোহাই দিয়ে তারা এই অবরোধ তুলে নেওয়ার আবেদন জানায়। নবিজি অনুমতি দেওয়ার পরই কেবল সুমামা আবার মক্কাবাসীদের সাথে গম লেনদেন শুরু করেন।
টিকাঃ
৩৬৫. নূরুদ্দীন, আস-সীরাতুল হালাবিয়্যা, ২/২৯৭।
৩৬৬. বুখারি, ৪৩৭২; যাদুল মাআদ, ২/১১৯; ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি, ৭/৬৮৮।
📄 বানূ লিহইয়ানের যুদ্ধ (রবীউল আউয়াল, ৬ষ্ঠ হিজরি)
হিজায অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র উসফান। সেখানে বাস করে লিহইয়ান গোত্র। রজী'তে এরাই সত্তর জন সাহাবিকে আক্রমণ করে শহীদ করেছিল। নবি অনেক আগে থেকেই এদের ওপর প্রতিশোধ নিতে ইচ্ছুক ছিলেন। কিন্তু এতদিন খন্দক যুদ্ধের মতো বড় বড় ঘটনাগুলো ব্যস্ত রেখেছিল তাঁকে। এখন আর সে ঝামেলা নেই। আর দেরি না করে ষষ্ঠ হিজরির রবীউল আউয়াল মাসে দুই শ সেনা ও বিশ জন অশ্বারোহী নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। এ সময়ও তিনি মদীনার দায়িত্ব অর্পণ করে যান আবদুল্লাহ ইবনু উম্মি মাকতুম (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে।
আজ ও উসফানের মাঝামাঝি 'বাতনু গারান'-এ গিয়ে পৌঁছায় বাহিনীটি। এখানেই হয়েছিল সেই মর্মান্তিক গণহত্যা। সেখানে দুদিনের যাত্রাবিরতি করে নবি শহীদদের জন্য দুআ করেন। অভিযানের খবর পেয়ে বানূ লিহইয়ান পাহাড়ে আশ্রয় নিয়ে আত্মরক্ষা করে। দশ জন অশ্বারোহীর একটি অগ্রগামী বাহিনী নিয়ে উসফানে যান নবিজি ﷺ। 'কুরাউল গমীম' পর্যন্ত গিয়েছিলেন তারা। চৌদ্দ দিন পর মুসলিম বাহিনী মদীনায় ফিরে আসেন। কিন্তু কাউকেই হাতের নাগালে পাননি। মুসলিম বাহিনীর ভয়ে তারা সবাই দূর-দূরান্তে পালিয়ে গিয়েছিল।
📄 যাইনাব ؓ-এর স্বামী আবুল আসের ইসলাম গ্রহণ
একই বছরের জুমাদাল উলা মাসে রাসূল ﷺ একটি সিরিয়াফেরত কুরাইশ কাফেলার খবর পান। যাইদ ইবনু হারিসা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নেতৃত্বে ১৭০ জন অশ্বারোহীর একটি বাহিনীকে 'ঈস'-এ পাঠান তিনি। কুরাইশ কাফেলার নেতৃত্বে ছিলেন আবুল আস ইবনু রবী'। ইনি নবি-তনয়া যাইনাব (রদিয়াল্লাহু আনহা)-এর স্বামী। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে তিন বছর যাবৎ দেখা নেই। একদিকে যাইনাব মদীনায় হিজরত করে এসেছেন, আরেকদিকে আবুল আস ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়ে রয়ে গেছেন মক্কায়।
মুসলিম বাহিনী পুরো কাফেলাটিকে কব্জা করে ফেলেন। আবুল আস শুধু পালিয়ে চলে আসেন মদীনায়। আশ্রয় নেন যাইনাবের ঘরে। স্ত্রীকে অনুরোধ করেন, যেন রাসূল ﷺ -কে বলে কাফেলার মালপত্র ছাড়িয়ে নেওয়া হয়। কন্যার অনুরোধ রক্ষা করেন নবিজি।
ঝানু ব্যবসায়ী আবুল আস মক্কায় গিয়ে যার যার পণ্য তার তার কাছে বুঝিয়ে দিয়ে আসেন। তারপর মদীনায় ফিরে এসে ইসলাম কবুল করেন। পুনর্মিলন হয় স্বামী-স্ত্রীর। কাফিরদের সাথে মুসলিম নারীদের বিয়ে নিষিদ্ধ করে তখনো আয়াত নাযিল হয়নি। তাই পুনঃনবায়ন ছাড়াই বৈবাহিক সম্পর্ক অটুট থাকে।
এ সময়টায় আল্লাহর রাসূল আরও কয়েকটি অশ্বারোহী অভিযাত্রী দল প্রেরণ করেন। দূরবর্তী এলাকাগুলোতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকা শত্রুদের খতম করে শান্তি নিশ্চিত করা হয় এই অভিযানগুলোর মাধ্যমে।
টিকাঃ
৩৬৭. আবু দাউদ, ২২৪০।
৩৬৮. যাদুল মাআদ, ২/১২০-১২২।