📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 কাফিরদের বন্ধুত্বে ফাটল ও যুদ্ধের পরিসমাপ্তি

📄 কাফিরদের বন্ধুত্বে ফাটল ও যুদ্ধের পরিসমাপ্তি


দীর্ঘ অবরোধের পর মুখোমুখি যুদ্ধ ছাড়া আর কোনও সমাধান চোখে পড়ছিল না কারওই। এমন সময় নুআইম ইবনু আশজাঈ (রদ্বিয়াল্লাহু আনহু) এলেন নবি -এর কাছে। তিনি গতফান গোত্রের সদস্য। কুরাইশ ও ইয়াহুদি উভয় জাতির সাথে তার সম্পর্ক খুবই ভালো। জানালেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আমি তো গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছি। এখনও কেউ জানে না। কী করব, আদেশ দিন।” নবি ভেবে বললেন, “তুমি একা একজন কত আর করতে পারবে?...আচ্ছা, এক কাজ করো। তুমি ছলে-কले-কৌশলে ওদের জোটে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করো। মনে রেখো, যুদ্ধ মানেই ছলচাতুরি।”

যেই কথা, সেই কাজ। নুআইম গেলেন বানু কুরাইযায়। তাকে সাদরে বরণ করে নেওয়া হলো। তিনি বললেন, "আচ্ছা, আমাকে তো আপনারা ভালো করেই চেনেন। এখন যে কথাটা বলব, সেটা কিন্তু একদম গোপন রাখতে হবে, বুঝেছেন?" আগ্রহ পেয়ে ইয়াহুদিরা সম্মতি জানাল। নুআইম বললেন,

“বানু কাইনুকা' আর বানু নাদীরের সাথে কী ঘটেছে, তা তো স্বচক্ষেই দেখলেন। এখন আবার জোট বাঁধলেন গিয়ে কুরাইশ আর গতফানের সাথে। ওদের অবস্থা কিন্তু আপনাদের মতো না। এটা আপনাদের নিজেদের দেশ। আপনাদের নারী, শিশু, সহায়-সম্পদ সব এখানে। আর আপনাদের মিত্রদের ঘরবাড়ি-সম্পদ এখান থেকে একদম নিরাপদ দূরত্বে। কয়েকদিন থেকে এরা যদি কিছু করার সুযোগ না পায়, তাহলে তো ফিরে যাবে নিজ নিজ বাড়ি। আর আপনারা হয়ে পড়বেন মুহাম্মাদের সামনে অসহায়, একা। উনি চাইলে দয়া করবে, চাইলে যেভাবে ইচ্ছা আপনাদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করবে।”

এই কথা শুনে তারা ভয় পেয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তাহলে এখন আমাদের করণীয় কী? নুআইম (রদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, 'যতক্ষণ পর্যন্ত তারা আপনাদের নিকট সন্ধির নিরাপত্তার জন্য তাদের লোকজনকে না পাঠাবে ততক্ষণ পর্যন্ত আপনারা তাদের সাথে মিলে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবেন না।' এ কথা শুনে তারা বলল, 'আপনি সঠিক সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।'

এরপর নুআইম (রদিয়াল্লাহু আনহু) গেলেন কুরাইশদের নিকট। সব গোত্রপতির সাথে সাক্ষাৎ করে বললেন, “আমি যে আপনাদের একজন শুভাকাঙ্ক্ষী, এটা নিয়ে কি আপনাদের কারও কোনও সন্দেহ আছে?”

সবাই সমস্বরে বলল, “একদমই না।”

“তাহলে আমি আপনাদের একটা গোপন কথা বলতে চাই। তবে শর্ত হলো আমার পক্ষ তা থেকে গোপন রাখতে হবে!"

তারা জবাব দিল, “হ্যাঁ হ্যাঁ, অবশ্যই।”

“ইয়াহুদিরা নিজেদের চুক্তিভঙ্গের কারণে তারা এখন লজ্জিত ও অনুতপ্ত। ওরা ভয় পাচ্ছে যে, আপনারা ফিরে গেলে ওরা তো মুহাম্মাদের করুণার পাত্র হয়ে যাবে। এখন মুহাম্মাদকে খুশি করতে তারা প্রস্তাব দিয়েছে যে, আপনাদের জিম্মি হিসেবে উনার হাতে তুলে দেবে। সাবধান থাকবেন। আপনাদের কাউকে ডাকলে ভুলেও সেদিকে পা বাড়াবেন না।"

এরপর বানু গতফানকেও আঘাত করলেন একই সন্দেহের অস্ত্র দিয়ে। তিন পক্ষের মাঝে এখন অবিশ্বাসের ঘোর অমানিশা। আবূ সুফইয়ান বানু কুরাইযার কাছে বার্তা পাঠালেন যে, পরদিন সম্মিলিতভাবে মুসলিমদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। কিন্তু জবাবে পেলেন শীতল প্রতিক্রিয়া। ইয়াহুদিরা জানাল, “দেখুন, প্রথমত কাল শনিবার। এদিন আমরা কোনও মারপিট করতে পারব না। এই দিন শারীআতের নিয়ম ভেঙে আগেও আমরা মহা মুসীবতে পড়েছি। আর না। দ্বিতীয়ত, আপনাদের কয়েকজন লোককে আমাদের কাছে জিম্মি হিসেবে রাখতে হবে। নাহলে আপনারা যদি আমাদের ফেলে নিজেদের বাসাবাড়িতে ফিরে যান, তখন সব বিপদ হবে আমাদের।”

এ কথা শুনে কুরাইশ আর গতফান ভাবল, “এ কী! নুআইমের কথাই তো ঠিক!” কুরাইশরা জিম্মি পাঠাতে অস্বীকৃতি জানাল, আবার যুদ্ধ করার জন্যও জোরাজুরি করতে লাগল। বানু কুরাইযা তা দেখে ভাবল, "আরে! নুআইমের কথাই তো ঠিক!” এরপরই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায় কুরাইশ- কুরাইযা আর গতফান মহাজোট। আর মুসলিমরা তখন সময় কাটাচ্ছেন আল্লাহর কাছে বিপদমুক্তির দুআ করে,

“হে আল্লাহ, আশ্রয় দিন, রক্ষা করুন সব বিপদ থেকে।”

নবি রবের কাছে দুআ করলেন,

“হে আল্লাহ, কিতাব অবতীর্ণকারী! দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী! শত্রুদের নির্মূল করে দিন। হে আল্লাহ, তাদের পরাজিত করুন এবং তাদের মারাত্মক বিপদে ফেলুন।”

মুসলিমদের দুআর জবাবে আল্লাহ তাআলা শত্রুদের ওপর এক ভয়ংকর তুফান প্রেরণ করলেন। সাথে এলেন ফেরেশতাদের সেনাবাহিনীও। কাফিরদের মালপত্র উপুড় হয়ে গেল, উপড়ে গেল তাঁবুর সব খুঁটি। সারা শিবির জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেল তাদের সব জিনিসপাতি। হাড়কাঁপানো শীতে তাদের মনোবলও নড়বড়ে হয়ে এল। হতাশায় আচ্ছন্ন হয়ে আর সাহস হারিয়ে তারা সিদ্ধান্ত নিল ফিরে যাওয়ার।

নবি সে রাতে হুযাইফা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে পাঠান শত্রুদের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি করতে। রাতের আঁধার এবং ঝড়ো আবহাওয়ার মাঝে শত্রুসারির একদম ভেতরে প্রবেশ করে আবার নিরাপদে ফিরে আসেন হুযাইফা (রদিয়াল্লাহু আনহু)। আল্লাহর বিশেষ ইচ্ছেয় ঝড় ও শৈত্য তাকে স্পর্শও করেনি। তিনি এসে শত্রুদের ফিরে যাওয়ার খবর দেন এবং ভাবনাহীন স্বস্তিতে ঘুমিয়ে পড়েন।

এই খবর পেয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন মুসলিমরা। পরদিন সকালে ঠিকই দেখা যায় যে, যুদ্ধের ময়দান ফাঁকা পড়ে আছে।

শত্রুরা জড়ো হয়েছিল পঞ্চম হিজরি সনের শাওয়াল মাসে। পুরো এক মাস জুড়ে মুসলিমরা সব দিক থেকে বিরাট আক্রমণের হুমকি আর আতঙ্কের মাঝে ছিল। শত্রুজোট অবশেষে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় যুল-কা'দা মাসে। মদীনার বিরুদ্ধে এটা ছিল তাদের বৃহত্তম প্রচেষ্টা। সামর্থ্যের সবটুকু ঢেলে দিয়ে তারা চেয়েছিল এ যাত্রায় মুসলিমদের নিঃশেষ করে দিয়ে যেতে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের পরিকল্পনা ধূলিসাৎ করে দেন। ফলে কুরাইশ আর বানূ গতফানের মতো প্রতাপশালীদের পরাজয় দেখে দুর্বলতর শত্রুগোত্ররা শিক্ষা নেয়। তারা আর কখনও মদীনার দিকে চোখ তুলে তাকানোরও সাহস করেনি। মদীনা এখন থেকে চির-নিরাপদ। নবি ঘোষণা দেন, "এতদিন তারা আক্রমণ করেছে, আমরা ঠেকিয়েছি। এখন থেকে আমরাই আক্রমণে যাব।”

টিকাঃ
৩৫২. আহমাদ, ৩/৩।
৩৫৩. বুখারি, ২৯৩৩।
৩৫৪. মুসলিম, ১৭৮৮।
৩৫৫. বুখারি, ৪১১০; ইবনু হিশাম, ২/২৩৩-২৭৩; যাদুল মাআদ, ২/৭২-৭৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00