📄 বানূ নাদীরের যুদ্ধ (রবীউল আউয়াল, ৪র্থ হিজরি)
এদিকে নবিজি ﷺ -কে একসাথে অনেক দিকে মনোযোগ দিতে হচ্ছে। শান্তিচুক্তিবদ্ধ বানু কিলাবের দু'জন লোক প্রাণ হারিয়েছেন আমর ইবনু উমাইয়ার হাতে। রক্তমূল্য পরিশোধ না করলে সেটা শান্তিচুক্তির লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। এর জের ধরে হতে পারে আরও অনেক রক্তপাত। কয়েকজন সাহাবিসহ ইয়াহুদি গোত্র বানু নাদীরের কাছে গেলেন রাসূলুল্লাহ। উদ্দেশ্য, রক্তমূল্য পরিশোধে তাদের অংশগ্রহণ করতে বলা।
তারা প্রতিক্রিয়া জানাল বেশ ভদ্রভাবেই, “আবুল কাসিম। আমরা তা-ই করব। আপনি এখানে একটু বসুন।” নবিজিকে অপেক্ষায় রেখে তারা নিজেদের মাঝে আলাপ- আলোচনা করতে লাগল। দুর্ভাগ্যবশত তাদের আত্মমর্যাদাবোধের ওপর শয়তানের জয় হলো। আল্লাহর রাসূলকে হত্যা করার কাপুরুষোচিত ফন্দি আঁটে তারা। ভারী একটা জাঁতা জোগাড় করে ঘোষণা করে, “কে আছে যে এটা ওই লোকটার মাথার ওপর ফেলতে পারবে?” জঘন্য এই কাজটি করতে রাজি হয় আমর ইবনু জাহশ।
কিন্তু তার আগেই জিবরীল (আলাইহিস সালাম) চলে এসে নবিজি ﷺ -কে চক্রান্তের কথা জানিয়ে দেন। নবিজি সাথে সাথে উঠে গিয়ে মদীনার পথ ধরেন।
চুক্তিবদ্ধ মিত্রের পক্ষ থেকে এই ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা মোটেও হালকা ব্যাপার নয়। বানু নাদীরের এই ষড়যন্ত্র প্রমাণ করে দিল যে, মুসলিমদের সাথে তাদের সহাবস্থান অসম্ভব। স্বভাবতই নবি তাদের মিত্রতার সমাপ্তি ঘটান। ওই ইয়াহুদি গোত্রের সাথে মুসলিম সমাজের এখন যুদ্ধের সম্পর্ক। মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা (রদিয়াল্লাহু আনহু)- কে দিয়ে ইয়াহুদিদের কাছে একটি বার্তা পাঠান নবি-'দশ দিনের মাঝে তাদের মদীনা ছেড়ে চলে যেতে হবে। এই সময়সীমার পর তাদের কাউকে মদীনায় পাওয়া গেলে ভোগ করতে হবে মৃত্যুদণ্ড।'
আলটিমেটাম পেয়ে ইয়াহুদিরা সহায়-সম্পত্তি গোছগাছ শুরু করে দেয়। বাধ সাধে মুনাফিক-শিরোমণি আবদুল্লাহ ইবনু উবাই। তার নাকি দুই হাজার সেনার এক বাহিনী প্রস্তুত আছে। যেকোনও বিপদে তারা বানু নাদীরকে প্রতিরক্ষা দিতে প্রস্তুত। নবিজি ﷺ -এর প্রত্যয়কে আরও একবার ভুল বুঝল মুনাফিকরা। মিথ্যের বেসাতির ওপর গড়ে ওঠা এই মিত্রতার ব্যাপারে কুরআনে বলা হয়েছে,
“আপনি কি মুনাফিকদের দেখেননি? তারা তাদের কিতাবধারী কাফির ভাইদের বলে, তোমরা যদি বহিষ্কৃত হও, তবে আমরা অবশ্যই তোমাদের সাথে দেশ থেকে বের হয়ে যাব এবং তোমাদের ব্যাপারে আমরা কখনও কারও কথা মানব না। আর যদি তোমরা আক্রান্ত হও, তবে অবশ্যই আমরা তোমাদের সাহায্য করব। আল্লাহ তাআলা সাক্ষ্য দেন যে, ওরা নিশ্চয়ই মিথ্যাবাদী।”
তারা আরও বলে যে, বানু কুরাইযা এবং গতফানও তোমাদের সাহায্য করার জন্য প্রস্তুত আছে। বন্ধুর বেশধারীদের কাছ থেকে এমন সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পেয়ে ইয়াহুদিদেরও বুকের পাটা বেড়ে যায়। নবি ﷺ -এর কাছে বার্তা পাঠিয়ে বলে, “যাব না আমরা। আপনার যা মনে চায় করুন।”
নবি জবাব দিলেন, “আল্লাহু আকবার!” সাহাবিদের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হলো তা। এটি যুদ্ধের আহ্বান। আবদুল্লাহ ইবনু উম্মি মাকতুম (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাতে মদীনার দায়িত্ব অর্পণ করে আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাতে মুসলিম সেনাদলের পতাকা দিয়ে রাসূল অগ্রসর হলেন বানু নাদীরের পুরো অঞ্চলটি অবরোধ করতে। দুর্গে আশ্রয় নিয়ে তির ও পাথরের বন্যা ছোটাল ইয়াহুদিরা। রসদের উৎস আর নিরাপত্তাবেষ্টনীর কাজ করছিল তাদের বিশাল বিশাল খেজুরবাগানগুলো। নবি আদেশ দেন সব গাছ কেটে বাগানে আগুন ধরিয়ে দিতে। এ ঘটনায় বানু নাদীরের মনোবল ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে।
কোনও বর্ণনামতে ছয় দিন, কোনও বর্ণনামতে পনেরো দিন অবরোধ থাকার পর অবশেষে বানু নাদীর হার মানে। নিরাপদে নির্বাসনে যেতে দেওয়ার শর্তে তারা অস্ত্র নামিয়ে রাখতে সম্মত হয়। মুনাফিকদল এবং আরেক ইয়াহুদি গোত্র বানু কুরাইযা ছিল তাদের মিত্র। কেউ কথা রাখেনি।
“তারা শয়তানের মতো, যে মানুষকে কাফির হতে বলে। অতঃপর যখন সে কাফির হয়, তখন শয়তান বলে, তোমার সাথে আমার কোনও সম্পর্ক নেই। আমি বিশ্বপালনকর্তা আল্লাহকে ভয় করি।”
অস্ত্র ছাড়া বাকি সব সম্পত্তি নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেন রাসূল ﷺ । যা পেরেছে, তা-ই মাথায় করে নিয়ে বের হয়েছে বানু নাদীর। এমনকি ঘরের দরজা, জানালা আর খুঁটিও বাদ যায়নি। কুরআনে এ ঘটনার বর্ণনা এসেছে এভাবে,
“মুমিনদের হাতে তো বটেই, নিজেদের হাত দিয়েও তারা নিজেদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করল। চক্ষুষ্মানেরা, এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নাও।”
মদীনা ছেড়ে তাদের অনেকেই বসত গাড়্ড়ে খাইবারে। অল্প কিছু সদস্য চলে যায় সিরিয়ায়। মদীনায় তাদের কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত ভূমিগুলো বণ্টন করে দেওয়া হয় প্রথম দিককার মুহাজিরদের মাঝে। আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় আবূ দুজানা এবং সাহল ইবনু হানীফ-আনসারদ্বয়ও কিছু অংশ পান। জমি থেকে আসা খাজনার কিছু অংশ রাসূল ﷺ ব্যয় করেন স্ত্রীদের ভরণ-পোষণে। বাকি অংশ যায় প্রতিরক্ষা খাতে। মুসলিম যোদ্ধাদের জন্য ঘোড়া ও অস্ত্রের ব্যবস্থা করা হয়। পঞ্চাশটি বর্ম, পঞ্চাশটি শিরস্ত্রাণ, আর তিনশটি তরবারিও ইয়াহুদিদের থেকে পাওয়া গিয়েছিল।
টিকাঃ
৩৩৪. সূরা হাশর, ৫৯: ১১।
৩৩৫. সূরা হাশর, ৫৯: ১৬।
৩৩৬. সূরা হাশর, ৫৯ : ২।
৩৩৭. বুখারি, ৪০৩১; ইবনু হিশাম, ২/১৯০-১৯২; যাদুল মাআদ, ২/৭১, ১১০।
📄 বদরের দ্বিতীয় যুদ্ধ (শা’বান, ৪র্থ হিজরি)
উহুদ থেকে ফেরার সময় আবূ সুফইয়ান বলে গিয়েছিল পরের বছর বদরে আবার মুখোমুখি হওয়ার কথা। চৌঠা হিজরি সনের শা'বান মাস আসতেই নবি ﷺ আগেভাগে ময়দানে রওনা হন। বদরে শিবির স্থাপন করে আট দিন অপেক্ষা করেন আবূ সুফইয়ানের জন্য। সাথে ছিল দেড় হাজার সেনা ও দশটি ঘোড়া। সেনাদলের পতাকাবাহী ছিলেন আলি, আর মদীনার ভারপ্রাপ্ত প্রশাসক হিসেবে ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা (রদিয়াল্লাহু আনহুমা)।
আবূ সুফইয়ানও দু-হাজার সৈনিক নিয়ে বেরোন, যার মাঝে পঞ্চাশ জন ঘোড়সওয়ার। কিন্তু শুরু থেকেই তার মাঝে প্রত্যয়ের অভাব ছিল সুস্পষ্ট। 'মাররুয যাহরান' নামক স্থানে 'মাজিন্না নামক প্রসিদ্ধ ঝরনার নিকট পৌঁছে বাহিনীকে তিনি বলেন, "চারপাশে সবুজ থাকলেই না যুদ্ধ করা যায়। প্রাণীগুলোও খেতে পায়, আমাদেরও দুধ দেয়। কিন্তু এখন তো দেখছি চারদিকে খরা আর খরা। চলো, ফিরে যাই।” পুরো দলকেই সহমত জানাতে দেখা গেল। শত্রুর মুখোমুখি না হয়েই গুটি-গুটি পায়ে ফিরে গেল তারা।
এদিকে মুসলিমরা বদরে অবস্থান করে বেশ কয়েকটি ব্যবসায়িক লেনদেন সেরে ফেলেন। কয়েকটি বাণিজ্য কাফেলার কাছে নিজেদের বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করে ভালোই লাভ হয় তাদের। কুরাইশরা যুদ্ধ না করে ফিরে যাওয়ায় মুসলিমদের সামরিক মর্যাদাও সমুন্নত থাকে। একই বছরের রবীউল আউয়াল মাসে 'দূমাতুল জান্দাল' নামক স্থানে একটি ডাকাতদলের ওপর শাস্তিমূলক অভিযান চালান রাসূল ﷺ। সব জাতের শত্রুকে পরাস্ত করে পুরো এক বছর ধরে শান্তিময় অবস্থা বিরাজ করে মদীনায়। অনুসারীদের ঈমান দৃঢ়করণ ও দ্বীনি শিক্ষাদানের মাধ্যমে এ পরিস্থিতির সদ্ব্যবহার করেন নবি ﷺ।
টিকাঃ
৩৩৮. ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ২/২০৯-২১০; ইবনুল কাইয়িম, যাদুল মাআদ, ২/১১২।