📄 শোকাবহ রজী’
হিজরি চতুর্থ সনের সফর মাস। আদাল ও কারা গোত্রের একটি প্রতিনিধিদল নবি ﷺ-এর কাছে আসে। তাদের জনগোষ্ঠীরা ইসলামের প্রতি বেশ আগ্রহী-এ কথা জানায় তারা। অপরিচিত এই ধর্মবিশ্বাসটি সম্পর্কে তারা আরও জানতে ইচ্ছুক। আসিম ইবনু সাবিত (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নেতৃত্বে দশ জন সাহাবির একটি দলকে তাদের ওখানে পাঠান নবিজি ﷺ। ঈমান ও কুরআন শেখাতে গিয়ে মুসলিমদের সে দলটি আর ফিরে আসেননি। মুশরিকদের বিশ্বাসঘাতকতায় আল্লাহর রাহে শহীদ হয়ে যান তারা।
রজী' নামক স্থানে হুযাইল গোত্রের একটি দল ওত পেতে ছিল। আদাল আর কারার লোকেরাই তাদের লেলিয়ে দিয়েছে মুসলিমদের ওপর। একটি পাহাড়ে থাকা অবস্থায় দশ জন সাহাবির ছোট্ট দলটিকে চারদিক থেকে জেঁকে ধরে প্রায় এক শ হুযাইলি তিরন্দাজ। তারা শপথ করে বলে যে, মুসলিমরা নেমে এলে তাদের হত্যা করা হবে না। কিন্তু দলনেতা আসিম নেমে আসতে অস্বীকৃতি জানান। তিরযুদ্ধে সাত জন সাহাবি শহীদ হন। বাকি তিন জনকে আবারও শপথ করে বলা হয় যে, তাদের হত্যা করা হবে না। ফলে নেমে আসেন তারা। আসার সাথে সাথে হুযাইলিরা তাদের হাত-পা বেঁধে ফেলতে শুরু করে। একজন সাহাবি মন্তব্য করেন, "এটা হলো প্রথম বিশ্বাসঘাতকতা।" তাকে বাঁধতে আসা লোকটিকে তিনি বাধা দিতে উদ্যত হন। ফলে তাকেও হত্যা করা হয়। খুবাইব ইবনু আদি আর যাইদ ইবনু দাসিনা (রদিয়াল্লাহু আনহুমা)-কে বন্দি করে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয় সেই পুরোনো নিপীড়ক কুরাইশদের হাতে। নিজের জীবন আর তাদের নিজেদের রইল না।
বদর যুদ্ধে হারিস ইবনু আমির ইবনি নাওফালকে কতল করেছিলেন খুবাইব। এবার খুবাইবের জীবনের মালিকানা নিয়ে নেয় হারিসের ছেলে। কিছুদিন কারাভোগ করানোর পর তানঈম অঞ্চলে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় মৃত্যুদণ্ড দিতে। দণ্ড কার্যকরের আগে তিনি দু-রাকাআত সালাত আদায় করে নেন। বদদুআ করেন যেন তার খুনিদের প্রত্যেকের ওপর আল্লাহর ক্রোধ আপতিত হয়। মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার সময় আবৃত্তি করেন,
“মুসলিম অবস্থায় মৃত্যু হলে, নেই পরোয়া কোনও কিছুতেই;
যে পাশ থেকেই করা হোক হত্যা, তা হবে আল্লাহর পথেই।
আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় আমি হচ্ছি নিহত;
তিনি চাইলে কর্তিত অঙ্গেও দেবেন বরকত অবিরত।”
আবূ সুফইয়ান খুবাইব (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে বলেন, “কী? এখন আফসোস হচ্ছে না? মনে হচ্ছে না আজকে তোর জায়গায় মুহাম্মাদ মারা গেলে ভালো হতো, আর তুই থাকতি পরিবারের সাথে নিরাপদে?”
খুবাইব হুংকার দেন, “আল্লাহর কসম! নবিজির গায়ে একটা কাঁটা বিঁধুক, সেটাও আমি চাই না।”
এরপর হারিস ইবনু আমিরের ছেলে তাঁকে তার পিতার বদলে হত্যা করে।
আর এদিকে সফওয়ান ইবনু উমাইয়ার হাতে নিজের মৃত্যুর অপেক্ষায় আছেন যাইদ ইবনু দাসিনা (রদিয়াল্লাহু আনহু)। সাফওয়ানের বাপ উমাইয়া ইবনু মুহাররিস মারা পড়েছিল যাইদের তরবারিতে। কিছু সূত্রমতে আবূ সুফইয়ানের সাথে ওপরের কথোপকথনটি হয়েছিল যাইদ ইবনু দাসিনার, খুবাইবের নয়।
রজী' পাহাড়ে পড়ে থাকা মুসলিমদের লাশগুলোকেও কুরাইশরা অপমান করার ফন্দি করে। আসিম (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর লাশ নিয়ে আসার জন্য একদল লোককে পাঠানো হয়। কিন্তু তার দেহের ওপর ভনভন করতে থাকা ভীমরুলের কারণে কাছেও ঘেঁষতে পারেনি মুশরিকরা। জীবদ্দশায় আসিম (রদিয়াল্লাহু আনহু) কসম করেছিলেন যে, জীবনে তিনি কোনও পৌত্তলিককে ছোঁবেন না, তাদেরও তার শরীর ছুঁতে দেবেন না। মরণের পরও আল্লাহ তাআলা তাঁর সে কসম রক্ষা করেন।
টিকাঃ
৩৩২. বুখারি, ৩০৪৫; ইবনু হিশাম, ২/১৬৯-১৭৯; যাদুল মাআদ, ২/১০৯।
📄 মর্মান্তিক বি’রু মাউনা
প্রায় কাছাকাছি সময়ে এর চেয়েও দুঃখজনক আরেকটি ঘটনার শিকার হন মুসলিমরা। আবূ বারা আমির ইবনু মালিক নামে এক লোক ছিল। বল্লম যেন তার কাছে খেলনার মতো। 'মুলায়িবুল আসিন্নাহ' (বল্লম-খেলুড়ে) নামে তাই সবার কাছে পরিচিত। নবিজি ﷺ -এর সাথে একবার দেখা করতে আসে সে। যথারীতি তাকে ইসলামের দাওয়াত দেন আল্লাহর রাসূল। আবূ বারা সে সময় হ্যাঁ-না কিছুই জানায়নি। প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে নিয়ে যায় নাজদ অঞ্চলে। সেখানকার লোকেরা নাকি ইসলাম গ্রহণে আগ্রহী। নবিজি যদি কয়েকজন সাহাবিকে সেখানে পাঠাতেন, তাহলে নাজদিরা ইসলামের ব্যাপারে কিছু শিখে-পড়ে নিত। ওই সাহাবিদের নিরাপত্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল আবূ বারা। কুরআন-পারদর্শী সত্তর জন সাহাবির একটি দলকে এ কাজে পাঠান নবি। বি'রু মাউনা নামক স্থানে যাত্রাবিরতি করেন তারা। আল্লাহর এক দাগী শত্রু আমির ইবনু তুফাইলের কাছে নবিজির পক্ষ থেকে একটি চিঠি নিয়ে যান হারাম ইবনু মিলহান (রদিয়াল্লাহু আনহু)। দাম্ভিক আমির সেটা নিজে না পড়ে তার এক দাসকে দিয়ে পড়াতে লাগল। হারাম (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মনোযোগ সেদিকেই। সুযোগ পেয়ে বল্লমের আঘাতে তাকে শহীদ করে ফেলে আমির। তাকে অবাক করে দিয়ে হারাম ইবনু মিলহানের শেষ কথা হয়, “আল্লাহু আকবার! কা'বার রবের কসম, আমি সফল!”
আমির ইবনু তুফাইল তারপর বানু আমির গোত্রের সবাইকে আহ্বান করে বাকি সাহাবিদের আক্রমণ করতে। কিন্তু আবূ বারার দেওয়া নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি ভাঙতে রাজি হয়নি তারা। তাই সে শরণাপন্ন হয় বানু সুলাইম এবং আরও কিছু উপগোত্রের, যেমন রি'ল, যাকওয়ান, লাহইয়ান এবং উসাইয়া। এরা ঠিকই কালবিলম্ব না করে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই মুসলিমদের ওপর। কা'ব ইবনু যাইদ এবং আমর ইবনু উমাইয়া (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) ছাড়া সবাই শহীদ হন। আহত কা'বকে মৃত ভেবে ফেলে রেখে যাওয়া হয়েছিল। সে যাত্রায় জীবিত উদ্ধার হয়ে তিনি পরে খন্দকের যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন।
মুনযির ইবনু উকবার সাথে মাঠে উট চরাচ্ছিলেন আমর ইবনু উমাইয়া দামরি (রদিয়াল্লাহু আনহু)। দূর থেকে দেখতে পান বি'রু মাঊনার ওপর উড়ন্ত শকুনের ঝাঁক। সাথে সাথে আঁচ করে ফেলেন আমির ইবনু তুফাইলের সাথে মুসলিমদের সাক্ষাতের পরিণতি। তৎক্ষণাৎ মুনযির ছুটে যান মুসলিম ভাইদের বাঁচাতে। নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিরোধ করেন শত্রুদের। আমর ইবনু উমাইয়াকে বন্দি করা হলেও সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। তিনি ছিলেন মুদার গোত্রের সদস্য। আমির ইবনু তুফাইলের মা গোলাম আযাদ করার অঙ্গীকার করেছিলেন। সেটা রক্ষার্থে আমর ইবনু উমাইয়াকে মুক্ত করে দেয় আমির ইবনু তুফাইল। তবে তার আগে তার মাথার এক গোছা চুল কেটে রাখে বিজয়ের স্মৃতি হিসেবে।
একমাত্র জীবিত সদস্য হিসেবে মদীনায় ফিরে আসেন আমর (রদিয়াল্লাহু আনহু)। পথে কারকারাহ অঞ্চলে বানূ কিলাবের দুই ব্যক্তির সাথে দেখা হয় তার। দুঃসহ ঘটনার আকস্মিকতা তখনো কাটিয়ে উঠতে না পারা আমর ওই দু'জনকে শত্রু ভেবে খুন করে ফেলেন। অথচ তাদের সাথে নবি ﷺ -এর শান্তিচুক্তি ছিল। অবশেষে মদীনায় ফিরে এসে তিনি পুরো ঘটনা খুলে বলেন। শুনে আল্লাহর রাসূল শুধু বলেন, “এমন দু'জনকে হত্যা করেছ, যাদের রক্তের ক্ষতিপূরণ আমাকে আদায় করতে হবে।”
রজী' ও বি'রু মাউনার ঘটনা নবিজি ﷺ -কে চরমভাবে শোকাহত করে। শান্তিপূর্ণভাবে ইসলামের তাবলীগ করতে যাওয়া দুটি দল একই মাসে মর্মান্তিকভাবে নিহত হন। বলা হয়ে থাকে যে, দুটি ঘটনার সংবাদ একই রাতে পেয়েছিলেন আল্লাহর রাসূল । টানা ত্রিশ দিন রাসূলুল্লাহ ফজরের সালাতে কুনূতে নাযিলা পড়ে শহীদদের খুনিদের প্রতি বদদুআ করেন। অবশেষে ওহির মাধ্যমে জানানো হয় যে, ওই শহীদ বান্দারা আল্লাহ তাআলার সন্তোষভাজন ও সন্তুষ্ট হয়ে জান্নাতে প্রশান্তিতে রয়েছেন। এরপর নবি কুনূতে নাযিলা পড়া বন্ধ করে দেন।
টিকাঃ
৩৩৩. বুখারি, ১০০১, ১০০২, ১০০৩; ইবনু সা'দ, তবাকাত, ২/৫৩-৫৪।
📄 বানূ নাদীরের যুদ্ধ (রবীউল আউয়াল, ৪র্থ হিজরি)
এদিকে নবিজি ﷺ -কে একসাথে অনেক দিকে মনোযোগ দিতে হচ্ছে। শান্তিচুক্তিবদ্ধ বানু কিলাবের দু'জন লোক প্রাণ হারিয়েছেন আমর ইবনু উমাইয়ার হাতে। রক্তমূল্য পরিশোধ না করলে সেটা শান্তিচুক্তির লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। এর জের ধরে হতে পারে আরও অনেক রক্তপাত। কয়েকজন সাহাবিসহ ইয়াহুদি গোত্র বানু নাদীরের কাছে গেলেন রাসূলুল্লাহ। উদ্দেশ্য, রক্তমূল্য পরিশোধে তাদের অংশগ্রহণ করতে বলা।
তারা প্রতিক্রিয়া জানাল বেশ ভদ্রভাবেই, “আবুল কাসিম। আমরা তা-ই করব। আপনি এখানে একটু বসুন।” নবিজিকে অপেক্ষায় রেখে তারা নিজেদের মাঝে আলাপ- আলোচনা করতে লাগল। দুর্ভাগ্যবশত তাদের আত্মমর্যাদাবোধের ওপর শয়তানের জয় হলো। আল্লাহর রাসূলকে হত্যা করার কাপুরুষোচিত ফন্দি আঁটে তারা। ভারী একটা জাঁতা জোগাড় করে ঘোষণা করে, “কে আছে যে এটা ওই লোকটার মাথার ওপর ফেলতে পারবে?” জঘন্য এই কাজটি করতে রাজি হয় আমর ইবনু জাহশ।
কিন্তু তার আগেই জিবরীল (আলাইহিস সালাম) চলে এসে নবিজি ﷺ -কে চক্রান্তের কথা জানিয়ে দেন। নবিজি সাথে সাথে উঠে গিয়ে মদীনার পথ ধরেন।
চুক্তিবদ্ধ মিত্রের পক্ষ থেকে এই ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা মোটেও হালকা ব্যাপার নয়। বানু নাদীরের এই ষড়যন্ত্র প্রমাণ করে দিল যে, মুসলিমদের সাথে তাদের সহাবস্থান অসম্ভব। স্বভাবতই নবি তাদের মিত্রতার সমাপ্তি ঘটান। ওই ইয়াহুদি গোত্রের সাথে মুসলিম সমাজের এখন যুদ্ধের সম্পর্ক। মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা (রদিয়াল্লাহু আনহু)- কে দিয়ে ইয়াহুদিদের কাছে একটি বার্তা পাঠান নবি-'দশ দিনের মাঝে তাদের মদীনা ছেড়ে চলে যেতে হবে। এই সময়সীমার পর তাদের কাউকে মদীনায় পাওয়া গেলে ভোগ করতে হবে মৃত্যুদণ্ড।'
আলটিমেটাম পেয়ে ইয়াহুদিরা সহায়-সম্পত্তি গোছগাছ শুরু করে দেয়। বাধ সাধে মুনাফিক-শিরোমণি আবদুল্লাহ ইবনু উবাই। তার নাকি দুই হাজার সেনার এক বাহিনী প্রস্তুত আছে। যেকোনও বিপদে তারা বানু নাদীরকে প্রতিরক্ষা দিতে প্রস্তুত। নবিজি ﷺ -এর প্রত্যয়কে আরও একবার ভুল বুঝল মুনাফিকরা। মিথ্যের বেসাতির ওপর গড়ে ওঠা এই মিত্রতার ব্যাপারে কুরআনে বলা হয়েছে,
“আপনি কি মুনাফিকদের দেখেননি? তারা তাদের কিতাবধারী কাফির ভাইদের বলে, তোমরা যদি বহিষ্কৃত হও, তবে আমরা অবশ্যই তোমাদের সাথে দেশ থেকে বের হয়ে যাব এবং তোমাদের ব্যাপারে আমরা কখনও কারও কথা মানব না। আর যদি তোমরা আক্রান্ত হও, তবে অবশ্যই আমরা তোমাদের সাহায্য করব। আল্লাহ তাআলা সাক্ষ্য দেন যে, ওরা নিশ্চয়ই মিথ্যাবাদী।”
তারা আরও বলে যে, বানু কুরাইযা এবং গতফানও তোমাদের সাহায্য করার জন্য প্রস্তুত আছে। বন্ধুর বেশধারীদের কাছ থেকে এমন সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পেয়ে ইয়াহুদিদেরও বুকের পাটা বেড়ে যায়। নবি ﷺ -এর কাছে বার্তা পাঠিয়ে বলে, “যাব না আমরা। আপনার যা মনে চায় করুন।”
নবি জবাব দিলেন, “আল্লাহু আকবার!” সাহাবিদের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হলো তা। এটি যুদ্ধের আহ্বান। আবদুল্লাহ ইবনু উম্মি মাকতুম (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাতে মদীনার দায়িত্ব অর্পণ করে আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাতে মুসলিম সেনাদলের পতাকা দিয়ে রাসূল অগ্রসর হলেন বানু নাদীরের পুরো অঞ্চলটি অবরোধ করতে। দুর্গে আশ্রয় নিয়ে তির ও পাথরের বন্যা ছোটাল ইয়াহুদিরা। রসদের উৎস আর নিরাপত্তাবেষ্টনীর কাজ করছিল তাদের বিশাল বিশাল খেজুরবাগানগুলো। নবি আদেশ দেন সব গাছ কেটে বাগানে আগুন ধরিয়ে দিতে। এ ঘটনায় বানু নাদীরের মনোবল ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে।
কোনও বর্ণনামতে ছয় দিন, কোনও বর্ণনামতে পনেরো দিন অবরোধ থাকার পর অবশেষে বানু নাদীর হার মানে। নিরাপদে নির্বাসনে যেতে দেওয়ার শর্তে তারা অস্ত্র নামিয়ে রাখতে সম্মত হয়। মুনাফিকদল এবং আরেক ইয়াহুদি গোত্র বানু কুরাইযা ছিল তাদের মিত্র। কেউ কথা রাখেনি।
“তারা শয়তানের মতো, যে মানুষকে কাফির হতে বলে। অতঃপর যখন সে কাফির হয়, তখন শয়তান বলে, তোমার সাথে আমার কোনও সম্পর্ক নেই। আমি বিশ্বপালনকর্তা আল্লাহকে ভয় করি।”
অস্ত্র ছাড়া বাকি সব সম্পত্তি নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেন রাসূল ﷺ । যা পেরেছে, তা-ই মাথায় করে নিয়ে বের হয়েছে বানু নাদীর। এমনকি ঘরের দরজা, জানালা আর খুঁটিও বাদ যায়নি। কুরআনে এ ঘটনার বর্ণনা এসেছে এভাবে,
“মুমিনদের হাতে তো বটেই, নিজেদের হাত দিয়েও তারা নিজেদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করল। চক্ষুষ্মানেরা, এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নাও।”
মদীনা ছেড়ে তাদের অনেকেই বসত গাড়্ড়ে খাইবারে। অল্প কিছু সদস্য চলে যায় সিরিয়ায়। মদীনায় তাদের কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত ভূমিগুলো বণ্টন করে দেওয়া হয় প্রথম দিককার মুহাজিরদের মাঝে। আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় আবূ দুজানা এবং সাহল ইবনু হানীফ-আনসারদ্বয়ও কিছু অংশ পান। জমি থেকে আসা খাজনার কিছু অংশ রাসূল ﷺ ব্যয় করেন স্ত্রীদের ভরণ-পোষণে। বাকি অংশ যায় প্রতিরক্ষা খাতে। মুসলিম যোদ্ধাদের জন্য ঘোড়া ও অস্ত্রের ব্যবস্থা করা হয়। পঞ্চাশটি বর্ম, পঞ্চাশটি শিরস্ত্রাণ, আর তিনশটি তরবারিও ইয়াহুদিদের থেকে পাওয়া গিয়েছিল।
টিকাঃ
৩৩৪. সূরা হাশর, ৫৯: ১১।
৩৩৫. সূরা হাশর, ৫৯: ১৬।
৩৩৬. সূরা হাশর, ৫৯ : ২।
৩৩৭. বুখারি, ৪০৩১; ইবনু হিশাম, ২/১৯০-১৯২; যাদুল মাআদ, ২/৭১, ১১০।
📄 বদরের দ্বিতীয় যুদ্ধ (শা’বান, ৪র্থ হিজরি)
উহুদ থেকে ফেরার সময় আবূ সুফইয়ান বলে গিয়েছিল পরের বছর বদরে আবার মুখোমুখি হওয়ার কথা। চৌঠা হিজরি সনের শা'বান মাস আসতেই নবি ﷺ আগেভাগে ময়দানে রওনা হন। বদরে শিবির স্থাপন করে আট দিন অপেক্ষা করেন আবূ সুফইয়ানের জন্য। সাথে ছিল দেড় হাজার সেনা ও দশটি ঘোড়া। সেনাদলের পতাকাবাহী ছিলেন আলি, আর মদীনার ভারপ্রাপ্ত প্রশাসক হিসেবে ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা (রদিয়াল্লাহু আনহুমা)।
আবূ সুফইয়ানও দু-হাজার সৈনিক নিয়ে বেরোন, যার মাঝে পঞ্চাশ জন ঘোড়সওয়ার। কিন্তু শুরু থেকেই তার মাঝে প্রত্যয়ের অভাব ছিল সুস্পষ্ট। 'মাররুয যাহরান' নামক স্থানে 'মাজিন্না নামক প্রসিদ্ধ ঝরনার নিকট পৌঁছে বাহিনীকে তিনি বলেন, "চারপাশে সবুজ থাকলেই না যুদ্ধ করা যায়। প্রাণীগুলোও খেতে পায়, আমাদেরও দুধ দেয়। কিন্তু এখন তো দেখছি চারদিকে খরা আর খরা। চলো, ফিরে যাই।” পুরো দলকেই সহমত জানাতে দেখা গেল। শত্রুর মুখোমুখি না হয়েই গুটি-গুটি পায়ে ফিরে গেল তারা।
এদিকে মুসলিমরা বদরে অবস্থান করে বেশ কয়েকটি ব্যবসায়িক লেনদেন সেরে ফেলেন। কয়েকটি বাণিজ্য কাফেলার কাছে নিজেদের বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করে ভালোই লাভ হয় তাদের। কুরাইশরা যুদ্ধ না করে ফিরে যাওয়ায় মুসলিমদের সামরিক মর্যাদাও সমুন্নত থাকে। একই বছরের রবীউল আউয়াল মাসে 'দূমাতুল জান্দাল' নামক স্থানে একটি ডাকাতদলের ওপর শাস্তিমূলক অভিযান চালান রাসূল ﷺ। সব জাতের শত্রুকে পরাস্ত করে পুরো এক বছর ধরে শান্তিময় অবস্থা বিরাজ করে মদীনায়। অনুসারীদের ঈমান দৃঢ়করণ ও দ্বীনি শিক্ষাদানের মাধ্যমে এ পরিস্থিতির সদ্ব্যবহার করেন নবি ﷺ।
টিকাঃ
৩৩৮. ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ২/২০৯-২১০; ইবনুল কাইয়িম, যাদুল মাআদ, ২/১১২।