📄 বাগ্বিতণ্ডা ও যুদ্ধের প্রতিশ্রুতি
উভয়পক্ষই রণে ক্ষান্ত দেওয়ার মানসিকতায় আছে। পৌত্তলিকরা মক্কায় ফিরে যাওয়ার বন্দোবস্ত শেষ করলে আবূ সুফইয়ান উহুদ পাহাড়ে উঠে চিৎকার করেন, “তোমাদের মাঝে কি মুহাম্মাদ আছে?” নবি কোনও শব্দ করতে নিষেধ করায় মুসলিমদের পক্ষ থেকে কেউ কোনও জবাব দেয়নি। আবূ সুফইয়ান আবার চিৎকার দেন, “তোমাদের মাঝে কি আবূ কুহাফার পুত্র আবূ বকর আছে?” আবারও নীরবতা। তৃতীয়বার আবূ সুফইয়ানের চিৎকার, “তোমাদের মাঝে কি উমর ইবনুল খাত্তাব আছে?” এবারও কোনও সাড়াশব্দ নেই।
নীরবতায় উৎফুল্ল হয়ে আবূ সুফইয়ান ডেকে উঠেন, “আচ্ছা, চলো! ওই তিনটা থেকে অবশেষে মুক্তি পাওয়া গেছে।” উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু) এবার আর চুপ থাকতে পারলেন না। গর্জে উঠলেন, "ওরে আল্লাহর শত্রু! যাদের নাম ধরে ডেকেছ, সবাই জীবিত আছে। আল্লাহ তাআলা তোমাদের কপালে আরও বেইজ্জতি রেখেছেন, অপেক্ষায় থাকো।”
আবূ সুফইয়ান বললেন, "তোমাদের মুর্দাদের নাক-কান কেটে দেওয়া হয়েছে। তবে আমি এটার নির্দেশ দিইনি আবার মানাও করিনি।”
তারপর উঁচু স্বরে বলে উঠলেন, “হুবালের জয় হোক!”
রাসূল ﷺ -এর নির্দেশে সাহাবিরা ঘোষণা দিলেন, “আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বড় ও মহান।"
“আমাদের সাথে উযযা মা আছেন, তোমাদের কেউ নেই!” আবূ সুফইয়ানের চিৎকার।
সাহাবিদের জবাব, "আল্লাহ আমাদের মাওলা, তোমাদের কোনও মাওলা নেই!"
“আজ দারুণ জেতা জিতেছি! এটা বদরের প্রতিশোধ। যুদ্ধ তো (কূপের) বালতির ন্যায়। একবার এর হাতে, একবার ওর হাতে।"
উমরের প্রত্যুত্তর, “এটা সমান সমান না! আমাদের মৃতরা আছে জান্নাতে, আর তোমাদের মৃতরা জাহান্নামে।”
উমরের জবাবে আবূ সুফইয়ান একটু দমে যান, পরে বলেন, “তোমরা তো এমনটাই বিশ্বাস করো। তবে বাস্তবে এমনটা হলে সত্যিই আমরা ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত।” একটু পর বলেন, “উমর, আমি আল্লাহর নামে কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি। সত্যি করে বলো তো, আমরা কি মুহাম্মাদকে খতম করতে পেরেছি?”
“আল্লাহর কসম! পারোনি। তোমার সব কথা নবিজি আমাদের পাশে বসেই শুনছেন।”
“ঠিক আছে। ইবনু কামিআর চেয়ে আমি তোমাকেই বেশি সত্যবাদী বলে জানি।”
তারপর চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন, “তাহলে আগামী বছর বদরে আবার যুদ্ধের প্রতিশ্রুতি রইল।”
নবিজি ﷺ -এর অনুমোদনক্রমে এক সাহাবি জবাব দেন, "ঠিক আছে। এই সিদ্ধান্তই আমাদের এবং তোমাদের মাঝে পাকাপোক্ত হয়ে থাকল।”
টিকাঃ
৩২৪. বুখারি, ৩০৩৯; যাদুল মাআদ, ২/৯৪; ইবনু হিশাম, ২/৯৩-৯৪।
৩২৫. ইবনু হিশাম, ২/৯৪।
📄 মুশরিকদের মক্কায় ফেরা
এই বাক্যবিনিময়ের পর পৌত্তলিক সেনাদল ফিরতি যাত্রা আরম্ভ করে। উটের পিঠে চড়ে ঘোড়াগুলোকে পাশাপাশি হাঁটিয়ে নিয়ে যায়। এটা রণে ভঙ্গ দেওয়ার ইঙ্গিত। এদের এভাবে ফিরে চলে যাওয়ার পেছনে আল্লাহর রহমত ছাড়া আর কোনও ব্যাখ্যাই পাওয়া সম্ভব না। কারণ, তখন মদীনা একেবারে অরক্ষিত। পৌত্তলিকরা সেদিন আক্রমণে এগিয়ে আসলে সহজেই পুরো শহর দখল ও তছনছ করে ফেলতে পারত। ইতিহাস লেখা হতো একেবারেই ভিন্নভাবে। অন্যরকম করে।
শত্রুরা চলে যাওয়ার পর মুসলিমরা ময়দানে বেরিয়ে এসে আহত ও শহীদদের খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেন। কয়েকজন শহীদের দেহ মদীনায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নবিজি ﷺ -এর আদেশক্রমে আবার তাদের ফিরিয়ে আনা হয়। শাহাদাতের স্থানে যুদ্ধের পোশাকেই গোসল ও জানাযা ছাড়া দাফন করতে বলেন তাদের। দু-তিন জন শহীদকে একটি কবরেও রাখতে হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে দু'জন শহীদের কাফন ছিল এক কাপড়ে। তবে তাদের মাঝে ইযখির ঘাস দিয়ে দেওয়া হতো। শহীদদের মাঝে যারা কুরআন বেশি জানতেন, তাদের আগে কবরে নামানো হয়। আল্লাহর রাস্তায় সকল আত্মত্যাগকারী শহীদদের লক্ষ্য করে নবি বলেন, “কিয়ামাতের দিন আমি তাদের হয়ে সাক্ষ্য দেবো।”
শহীদদের দেহ সংগ্রহ করার এক পর্যায়ে সাহাবিরা এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পান। হানযালা ইবনু আমির (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর দেহ মাটি থেকে একটু উঁচুতে শূন্যে ভাসছে, সারা শরীর থেকে টপটপ করে ঝরছে পানির ফোঁটা। নবি ব্যাখ্যা করে দেন যে, “ফেরেশতারা তাকে গোসল করাচ্ছে।” সদ্যবিবাহিত এই সাহাবি বাসরের পরপরই জিহাদের ডাক শুনতে পান। ঘরে নববধূ রেখে ছুটে এসেছিলেন আল্লাহর রাস্তায়। গোসলের জন্য দেরিটুকু পর্যন্ত করেননি। বীরবিক্রমে লড়াই করে পান করেন শাহাদাতের সুধা। চিরকাল তিনি স্মরিত হবেন “গসীলুল মালাইকা” (ফেরেশতাদের হাতে স্নাত) নামে।
হামযা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে কবর দেওয়ার সময়ও চলে এল। তার কাফনের কাপড় এতই ছোট ছিল যে, মাথা ঢাকলে পা বেরিয়ে যায়, আর পা ঢাকলে মাথা। পরে মাথা ঢেকে দিয়ে কিছু ইযখির ঘাস তার পায়ে রেখে দাফন করা হয়। নিহত এই বীর অর্জন করে নিয়েছেন আল্লাহর সন্তুষ্টি। মহা আড়ম্বরপূর্ণ দাফনকার্য পেলেই কী, আর না পেলেই-বা কী?
হামযা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মতো একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হন মুসআব ইবনু উমাইর (রদিয়াল্লাহু আনহু)।
টিকাঃ
৩২৬. বুখারি, ১৩৪৩।
৩২৭. যাদুল মাআদ, ২/৯৪।
৩২৮. বুখারি, ১২৭৪।
📄 মুসলিম বাহিনী মদীনা অভিমুখী
শহীদদের দাফন-কাফন শেষ। এবার মদীনা ফেরার পালা। পথে থেমে কয়েকজন নারীকে সান্ত্বনা দেন তিনি। তাদের আত্মীয়রা যুদ্ধে নিহত হয়েছে। নবিজির দুআ তাদের অন্তর প্রশান্ত করে।
প্রিয়জন হারানোর বেদনা ধৈর্য ধরে সহ্য করেন মুসলিমরা। নবিজি ও নিরাপদ আছেন, এ সংবাদেই প্রশান্তি সবার। আপনজনের চেয়ে নবিজিকে তাঁরা কত বেশি ভালোবাসতেন, তার সামান্য নমুনা পাওয়া যায় একটি ঘটনায়। যুদ্ধফেরত মুসলিমদের একটি দলের সাথে দীনার বংশের এক নারীর দেখা হয়। তারা ভারাক্রান্ত মন নিয়ে নারীটিকে জানান যে, তার স্বামী, ভাই এবং বাবা তিন জনই যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। কিন্তু নারীটি উত্তরে বলেন, “আগে বলুন নবিজি কেমন আছেন?” জানানো হলো, “আল্লাহর শোকর, তিনি নিরাপদ আছেন।" নারীটির শুধু শোনা কথায় মন মানে না। তিনি নিজের চোখে গিয়ে রাসূলুল্লাহকে দেখতে চান। অবশেষে নবিজিকে সামনাসামনি দেখতে পেয়ে বলেন, “আপনি যে বেঁচে আছেন, তাতেই সব দুঃখ উধাও হয়ে গেছে।”
সে রাতে মদীনাবাসীরা একদম সতর্ক অবস্থায় থাকেন। হাজার হোক, জরুরি অবস্থা তখনো চলমান। ক্লান্তি আর আঘাত তো আছেই, তার সাথে যুক্ত হয়েছে নিজেদের ভুলের কারণে নবিজি ﷺ -এর জীবন ঝুঁকিতে ফেলার অনুশোচনা। সবাই তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ -কে পাহাড়া দিতে ইচ্ছুক। কিন্তু আল্লাহর রাসূলের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো ফিরে যেতে থাকা শত্রুদলের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা। মদীনায় অতর্কিত আক্রমণ যেন চলে না আসে, তা নিশ্চিত করতে চাইছিলেন তিনি।
টিকাঃ
৩২৯. ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ২/৯৯।
📄 হামরাউল আসাদের যুদ্ধ
ঠিক পরদিন সকালেই নবি ও একজন ঘোষককে দিয়ে ঘোষণা করান যে, উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সবাইকে এক্ষুনি শত্রু ধাওয়া করতে যেতে হবে। চরম ক্লান্তি আর মারাত্মক ক্ষত নিয়ে প্রতিটি মুসলিম সে নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন। মদীনা থেকে আট মাইল দূরে হামরাউল আসাদে স্থাপন করা হয় সেনাশিবির।
ওদিকে মদীনা থেকে ছত্রিশ মাইল দূরে রাওহা নামক স্থানে যাত্রাবিরতি করে সলা-পরামর্শ চলছে মুশরিক শিবিরে। সেনাপতিদের কটূক্তি করার জের ধরে চলছে বাগবিতণ্ডা। অরক্ষিত মদীনায় আক্রমণ করার সুবর্ণ সুযোগকে পায়ে ঠেলে আসার শিশুসুলভ সিদ্ধান্ত নিয়ে সবাই এখন খেপা।
মুসলিম শিবিরেও তখন পরিকল্পনা চলছে। মা'বাদ ইবনু আবী মা'বাদ খুযাঈ নবিজি ﷺ -এর এক শুভাকাঙ্ক্ষী। তিনি হামরাউল আসাদে এসে উহুদের ঘটনা সম্পর্কে সমবেদনা জানান। নবিজি তাকে বললেন আবূ সুফইয়ানের কাছে যেতে। ভীতিকৌশল ব্যবহার করে তাড়িয়ে দিতে বললেন মুশরিক বাহিনীকে। কথামতো মা'বাদ গেলেন রাওহায়। সিদ্ধান্তের পাল্লা তখন মদীনা পুনরাক্রমণের দিকেই হেলে আছে।
মা'বাদ গিয়ে শুরু করলেন মারাত্মক বর্ণনা। মুসলিমরা কেমন ভয়ানক প্রস্তুতি নিয়ে পাল্টা আক্রমণ করতে আসছে, তা বলতে লাগলেন রং চড়িয়ে, “আরে আপনারা তো জানেন না। মুহাম্মাদ এত বিশাল এক দল নিয়ে বেরিয়েছেন, জীবনে এত বড় বাহিনী দেখিনি। প্রতিশোধ আর রক্তের নেশায় পাগল হয়ে আছে সবাই। তোমরা কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ওই পাহাড়টার পেছন দিকে ওদের প্রস্তুতিটা একবার দেখে নাও।"
বুদ্ধি কাজে দিল। সাহস হারিয়ে ফেলল মাক্কি বাহিনী। আবূ সুফইয়ানও তার রণপরিকল্পনাকে একই রকম ভীতিকৌশলে সীমিত করে ফেলেন। মাক্কি বাহিনী আরেক রাউন্ডের জন্য প্রস্তুত—এই বলে একটি কাফেলাকে দায়িত্ব দেন যেন তারা মুসলিম বাহিনীর নিকট তা খুব করে প্রচার করে। এই ফাঁকে বাহিনী নিয়ে তড়িঘড়ি করে নিজেরা ধরেন মক্কার পথ।
হারতে হারতে বেঁচে আসা মুসলিম বাহিনী এই সতর্কবার্তা শুনে লড়াইয়ের পূর্ণপ্রস্তুতি নেন। নতুন আক্রমণের ঘোষণায় তাদের মনোবল আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে।
“যাদের লোকেরা বলেছে যে, তোমাদের সাথে মুকাবিলা করার জন্য কাফিররা বহু সাজ-সরঞ্জাম সমাবেশ করেছে, তাদের ভয় করো। তখন তাদের বিশ্বাস আরও দৃঢ়তর হয়ে যায় এবং তারা বলে, আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট আর তিনি কতই-না চমৎকার তত্ত্বাবধায়ক।”
যেহেতু ফাঁকা হুমকি আর বাস্তবায়িত হয়নি, তাই পরের প্রশান্ত অবস্থাটির কথা আয়াতে তুলে ধরা হয় এভাবে,
“ফলে তারা ফিরে এল আল্লাহর নিয়ামাত ও অনুগ্রহ নিয়ে। কোনও ক্ষতিই তাদের স্পর্শ করেনি। আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া আর কিছু তারা চায়ওনি। আর আল্লাহ তো সীমাহীন অনুগ্রহকারী।”
টিকাঃ
৩৩০. সূরা আ-ল ইমরান, ৩ : ১৭৩।
৩৩১. সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১৭৪।