📄 পর্বতগিরিতে আশ্রয়
অবরুদ্ধ দশা থেকে বেরিয়ে এসে মুসলিমরা গিরিখাতের নিরাপদতর আশ্রয়ে জড়ো হন। এরপর খানিকক্ষণ মুসলিম ও পৌত্তলিকদের মাঝে কিছু ছোটখাটো দাঙ্গা চলে। মুশরিকরা বড় আকারের হামলার চিন্তা বাদ দিয়ে এ-রকম ছোট ছোট আক্রমণ চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অনেকে যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান করে নিহত মুসলিমদের খুঁজে খুঁজে তাদের লাশ বিকৃত করতে থাকে। তাদের কান, নাক, লজ্জাস্থান কেটে দেয় এবং পেট ফুটো করে ফেলে। হামযা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর তরবারিতে আত্মীয় হারানোর শোকে উন্মাদ হয়ে ছিল আবূ সুফইয়ানের স্ত্রী হিন্দ বিনতু উতবা। হামযার মৃতদেহ দেখতে পেয়ে সে এক জঘন্য কাজ করে। তার পেট চিরে কলিজা বের করে এনে চিবুতে শুরু করে। তবে গিলতে না পেরে পরে ফেলে দেয়। সে হামযা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নাক, কান ইত্যাদি কেটে কানের দুল ও পায়ের নুপুর বানিয়েছিল।
উবাই ইবনু খালাফ শেষ একটি চেষ্টা করে রাসূল ﷺ-কে হত্যা করার। কিন্তু তা করতে গিয়ে উল্টো নিজেই পটল তোলে। নবি ﷺ একটি বল্লম ছুড়ে মেরে তাকে ঘোড়ার পিঠ থেকে ফেলে দেন। বাহনের পিঠ থেকে পড়ে গিয়ে ষাঁড়ের মতো হাঁক বেরিয়ে আসে তার মুখ দিয়ে। মক্কায় ফেরার সময় 'সারিফ' নামক স্থানে সে মারা যায়।
আবূ সুফইয়ান ও খালিদ ইবনুল ওয়ালীদের নেতৃত্বে আরও কয়েকজন কুরাইশি সেনা আক্রমণে আসে। বিভিন্ন দিক থেকে পাহাড়ে চড়ে মুসলিমদের পরাভূত করার চেষ্টা করে তারা। কিন্তু কয়েকজন মুহাজিরকে সাথে নিয়ে উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু) তাদের পাল্টা আক্রমণ করে নেমে যেতে বাধ্য করেন। সা'দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর তিরের আঘাতে সে সময় তিন মুশরিকের মৃত্যু হয়েছে বলেও কিছু সূত্র থেকে জানা যায়।
শেষ চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে অবশেষে আবূ সুইয়ান ও খালিদ সিদ্ধান্ত নেন যে, এবার বাড়ি ফেরার পালা। নিজেদের বাইশ জন হারালেও শত্রুর যতটুকু ক্ষতি করা গেছে, তাতে খুশি হওয়ারই কথা। মুসলিমদের মৃতদেহ পাওয়া গেছে সত্তরটি। একচল্লিশ জন শহীদ খাযরাজ গোত্রের, চব্বিশ জন আওসের, আর চার জন মুহাজির। মুসলিমদের পক্ষে যুদ্ধ করা একজন ইয়াহুদিও নিহত হন এ যুদ্ধে।
মুসলিম শিবিরে এখন বিশ্রাম নেওয়ার পালা। উহুদ অঞ্চলে ‘মিহরাস' নামক একটি জলাধার ছিল। নবিজি ﷺ বিশ্রাম নিতে বসলে আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু) সেখান থেকে পানি নিয়ে আসেন। তবে পানিতে দুর্গন্ধ থাকায় নবিজি তা পান করেননি। শুধু মুখ ধুয়ে বাকি পানিটুকু মাথায় ঢালেন। যাতে যন্ত্রণা কিছুটা লাঘব হয়। কিন্তু এতে তাঁর ক্ষতস্থান থেকে আবারও রক্তপাত শুরু হয়। কোনোভাবেই তা বন্ধ হয় না। অবশেষে ফাতিমা (রদিয়াল্লাহু আনহা) চাটাইয়ের একটি টুকরা পুড়িয়ে ছাই দিয়ে ক্ষতস্থানে ড্রেসিং করে দেন। ফলে রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যায়। মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা (রদিয়াল্লাহু আনহু) পরিষ্কার পানির সন্ধান পেয়ে তা নিয়ে আসেন, যা পান করে নবি তৃপ্তি লাভ করেন। আঘাতের কারণে সে বেলা বসেই যুহরের সালাত আদায় করেন আল্লাহর রাসূল । সাহাবিগণও নবিজির অনুসরণে বসেই জামাআতে শরীক হন।
সে সময় মদীনা থেকে কয়েকজন নারী সাহাবি এসে পৌঁছায়। তাদের মধ্যে ছিল আয়িশা, উম্মু সুলাইম এবং উম্মু সুলাইত (রদিয়াল্লাহু আনহুন্না)। তারা আহত সৈনিকদের শুশ্রূষা করতে থাকেন। চামড়ার পাত্রে করে আহতদের কাছে পরিষ্কার পানি এনে পান করান।
টিকাঃ
৩১৬. ইবনু হিশাম, ২/৯০।
৩১৭. হাকিম, আল-মুসতাদরাক, ২/৩২৭।
৩১৮. ইবনু হিশাম, ২/৮৬।
৩১৯. যাদুল মাআদ, ২/৯৫।
৩২০. এক বর্ণনামতে, ৩৭জন।
৩২১. ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি, ৭/৩৫১; ইবনু হিশাম, ২/১২২-১২৯।
৩২২. বুখারি, ৩০৩৭; ইবনু হিশাম, ২/৮৫-৮৭।
৩২৩. বুখারি, ২৮৮১; নূরুদ দীন হালাবি, আস-সীরাতুল হালাবিয়্যা, ২/২২।
📄 বাগ্বিতণ্ডা ও যুদ্ধের প্রতিশ্রুতি
উভয়পক্ষই রণে ক্ষান্ত দেওয়ার মানসিকতায় আছে। পৌত্তলিকরা মক্কায় ফিরে যাওয়ার বন্দোবস্ত শেষ করলে আবূ সুফইয়ান উহুদ পাহাড়ে উঠে চিৎকার করেন, “তোমাদের মাঝে কি মুহাম্মাদ আছে?” নবি কোনও শব্দ করতে নিষেধ করায় মুসলিমদের পক্ষ থেকে কেউ কোনও জবাব দেয়নি। আবূ সুফইয়ান আবার চিৎকার দেন, “তোমাদের মাঝে কি আবূ কুহাফার পুত্র আবূ বকর আছে?” আবারও নীরবতা। তৃতীয়বার আবূ সুফইয়ানের চিৎকার, “তোমাদের মাঝে কি উমর ইবনুল খাত্তাব আছে?” এবারও কোনও সাড়াশব্দ নেই।
নীরবতায় উৎফুল্ল হয়ে আবূ সুফইয়ান ডেকে উঠেন, “আচ্ছা, চলো! ওই তিনটা থেকে অবশেষে মুক্তি পাওয়া গেছে।” উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু) এবার আর চুপ থাকতে পারলেন না। গর্জে উঠলেন, "ওরে আল্লাহর শত্রু! যাদের নাম ধরে ডেকেছ, সবাই জীবিত আছে। আল্লাহ তাআলা তোমাদের কপালে আরও বেইজ্জতি রেখেছেন, অপেক্ষায় থাকো।”
আবূ সুফইয়ান বললেন, "তোমাদের মুর্দাদের নাক-কান কেটে দেওয়া হয়েছে। তবে আমি এটার নির্দেশ দিইনি আবার মানাও করিনি।”
তারপর উঁচু স্বরে বলে উঠলেন, “হুবালের জয় হোক!”
রাসূল ﷺ -এর নির্দেশে সাহাবিরা ঘোষণা দিলেন, “আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বড় ও মহান।"
“আমাদের সাথে উযযা মা আছেন, তোমাদের কেউ নেই!” আবূ সুফইয়ানের চিৎকার।
সাহাবিদের জবাব, "আল্লাহ আমাদের মাওলা, তোমাদের কোনও মাওলা নেই!"
“আজ দারুণ জেতা জিতেছি! এটা বদরের প্রতিশোধ। যুদ্ধ তো (কূপের) বালতির ন্যায়। একবার এর হাতে, একবার ওর হাতে।"
উমরের প্রত্যুত্তর, “এটা সমান সমান না! আমাদের মৃতরা আছে জান্নাতে, আর তোমাদের মৃতরা জাহান্নামে।”
উমরের জবাবে আবূ সুফইয়ান একটু দমে যান, পরে বলেন, “তোমরা তো এমনটাই বিশ্বাস করো। তবে বাস্তবে এমনটা হলে সত্যিই আমরা ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত।” একটু পর বলেন, “উমর, আমি আল্লাহর নামে কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি। সত্যি করে বলো তো, আমরা কি মুহাম্মাদকে খতম করতে পেরেছি?”
“আল্লাহর কসম! পারোনি। তোমার সব কথা নবিজি আমাদের পাশে বসেই শুনছেন।”
“ঠিক আছে। ইবনু কামিআর চেয়ে আমি তোমাকেই বেশি সত্যবাদী বলে জানি।”
তারপর চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন, “তাহলে আগামী বছর বদরে আবার যুদ্ধের প্রতিশ্রুতি রইল।”
নবিজি ﷺ -এর অনুমোদনক্রমে এক সাহাবি জবাব দেন, "ঠিক আছে। এই সিদ্ধান্তই আমাদের এবং তোমাদের মাঝে পাকাপোক্ত হয়ে থাকল।”
টিকাঃ
৩২৪. বুখারি, ৩০৩৯; যাদুল মাআদ, ২/৯৪; ইবনু হিশাম, ২/৯৩-৯৪।
৩২৫. ইবনু হিশাম, ২/৯৪।
📄 মুশরিকদের মক্কায় ফেরা
এই বাক্যবিনিময়ের পর পৌত্তলিক সেনাদল ফিরতি যাত্রা আরম্ভ করে। উটের পিঠে চড়ে ঘোড়াগুলোকে পাশাপাশি হাঁটিয়ে নিয়ে যায়। এটা রণে ভঙ্গ দেওয়ার ইঙ্গিত। এদের এভাবে ফিরে চলে যাওয়ার পেছনে আল্লাহর রহমত ছাড়া আর কোনও ব্যাখ্যাই পাওয়া সম্ভব না। কারণ, তখন মদীনা একেবারে অরক্ষিত। পৌত্তলিকরা সেদিন আক্রমণে এগিয়ে আসলে সহজেই পুরো শহর দখল ও তছনছ করে ফেলতে পারত। ইতিহাস লেখা হতো একেবারেই ভিন্নভাবে। অন্যরকম করে।
শত্রুরা চলে যাওয়ার পর মুসলিমরা ময়দানে বেরিয়ে এসে আহত ও শহীদদের খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেন। কয়েকজন শহীদের দেহ মদীনায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নবিজি ﷺ -এর আদেশক্রমে আবার তাদের ফিরিয়ে আনা হয়। শাহাদাতের স্থানে যুদ্ধের পোশাকেই গোসল ও জানাযা ছাড়া দাফন করতে বলেন তাদের। দু-তিন জন শহীদকে একটি কবরেও রাখতে হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে দু'জন শহীদের কাফন ছিল এক কাপড়ে। তবে তাদের মাঝে ইযখির ঘাস দিয়ে দেওয়া হতো। শহীদদের মাঝে যারা কুরআন বেশি জানতেন, তাদের আগে কবরে নামানো হয়। আল্লাহর রাস্তায় সকল আত্মত্যাগকারী শহীদদের লক্ষ্য করে নবি বলেন, “কিয়ামাতের দিন আমি তাদের হয়ে সাক্ষ্য দেবো।”
শহীদদের দেহ সংগ্রহ করার এক পর্যায়ে সাহাবিরা এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পান। হানযালা ইবনু আমির (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর দেহ মাটি থেকে একটু উঁচুতে শূন্যে ভাসছে, সারা শরীর থেকে টপটপ করে ঝরছে পানির ফোঁটা। নবি ব্যাখ্যা করে দেন যে, “ফেরেশতারা তাকে গোসল করাচ্ছে।” সদ্যবিবাহিত এই সাহাবি বাসরের পরপরই জিহাদের ডাক শুনতে পান। ঘরে নববধূ রেখে ছুটে এসেছিলেন আল্লাহর রাস্তায়। গোসলের জন্য দেরিটুকু পর্যন্ত করেননি। বীরবিক্রমে লড়াই করে পান করেন শাহাদাতের সুধা। চিরকাল তিনি স্মরিত হবেন “গসীলুল মালাইকা” (ফেরেশতাদের হাতে স্নাত) নামে।
হামযা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে কবর দেওয়ার সময়ও চলে এল। তার কাফনের কাপড় এতই ছোট ছিল যে, মাথা ঢাকলে পা বেরিয়ে যায়, আর পা ঢাকলে মাথা। পরে মাথা ঢেকে দিয়ে কিছু ইযখির ঘাস তার পায়ে রেখে দাফন করা হয়। নিহত এই বীর অর্জন করে নিয়েছেন আল্লাহর সন্তুষ্টি। মহা আড়ম্বরপূর্ণ দাফনকার্য পেলেই কী, আর না পেলেই-বা কী?
হামযা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মতো একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হন মুসআব ইবনু উমাইর (রদিয়াল্লাহু আনহু)।
টিকাঃ
৩২৬. বুখারি, ১৩৪৩।
৩২৭. যাদুল মাআদ, ২/৯৪।
৩২৮. বুখারি, ১২৭৪।
📄 মুসলিম বাহিনী মদীনা অভিমুখী
শহীদদের দাফন-কাফন শেষ। এবার মদীনা ফেরার পালা। পথে থেমে কয়েকজন নারীকে সান্ত্বনা দেন তিনি। তাদের আত্মীয়রা যুদ্ধে নিহত হয়েছে। নবিজির দুআ তাদের অন্তর প্রশান্ত করে।
প্রিয়জন হারানোর বেদনা ধৈর্য ধরে সহ্য করেন মুসলিমরা। নবিজি ও নিরাপদ আছেন, এ সংবাদেই প্রশান্তি সবার। আপনজনের চেয়ে নবিজিকে তাঁরা কত বেশি ভালোবাসতেন, তার সামান্য নমুনা পাওয়া যায় একটি ঘটনায়। যুদ্ধফেরত মুসলিমদের একটি দলের সাথে দীনার বংশের এক নারীর দেখা হয়। তারা ভারাক্রান্ত মন নিয়ে নারীটিকে জানান যে, তার স্বামী, ভাই এবং বাবা তিন জনই যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। কিন্তু নারীটি উত্তরে বলেন, “আগে বলুন নবিজি কেমন আছেন?” জানানো হলো, “আল্লাহর শোকর, তিনি নিরাপদ আছেন।" নারীটির শুধু শোনা কথায় মন মানে না। তিনি নিজের চোখে গিয়ে রাসূলুল্লাহকে দেখতে চান। অবশেষে নবিজিকে সামনাসামনি দেখতে পেয়ে বলেন, “আপনি যে বেঁচে আছেন, তাতেই সব দুঃখ উধাও হয়ে গেছে।”
সে রাতে মদীনাবাসীরা একদম সতর্ক অবস্থায় থাকেন। হাজার হোক, জরুরি অবস্থা তখনো চলমান। ক্লান্তি আর আঘাত তো আছেই, তার সাথে যুক্ত হয়েছে নিজেদের ভুলের কারণে নবিজি ﷺ -এর জীবন ঝুঁকিতে ফেলার অনুশোচনা। সবাই তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ -কে পাহাড়া দিতে ইচ্ছুক। কিন্তু আল্লাহর রাসূলের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো ফিরে যেতে থাকা শত্রুদলের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা। মদীনায় অতর্কিত আক্রমণ যেন চলে না আসে, তা নিশ্চিত করতে চাইছিলেন তিনি।
টিকাঃ
৩২৯. ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ২/৯৯।