📄 বানূ কাইনুকার যুদ্ধ
বদরে ঐতিহাসিক জয়লাভ করেও মুসলিমরা দম ফেলার সময় পাননি; বরং মাক্কি ভাইদের পক্ষ থেকে মুসলিম রাষ্ট্রকে চাপে রাখার দায়িত্ব নিজেদের ঘাড়ে নিয়ে নেয় মদীনার প্রতিটি মুশরিক ও ইয়াহুদি গোত্র। ইয়াহুদি গোত্র কাইনুকা'র শত্রুতা তো একদম খোলাখুলিভাবেই চলতে থাকে। নবি তাদের সাবধান করে দিলে মুখ ঝামটা দিয়ে বলে, “মুহাম্মাদ, শুনুন। এত খুশি হয়েন না। কুরাইশদের কয়েকটা উঠতি যুবক আর যুদ্ধে অপারগদেরই তো মাত্র হত্যা করেছেন। কিন্তু আমাদের সাথে যেদিন লড়বেন, সেদিন দেখবেন সত্যিকারের বীরত্ব কাকে বলে!!”
নবিজি এর জবাব দিলেন স্বভাবসুলভ ধৈর্যের মাধ্যমে। এতে বানু কাইনুকা'র ছটফটানি আরও বেড়ে গেল।
বানু কাইনুকা' মদীনার বাজারে একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটায়। যার জের ধরে নিহত হন একজন মুসলিম ও একজন ইয়াহুদি। তাদের এইসব অপতৎপরতা ও অনিষ্টের শাস্তি স্বরূপ এবার আল্লাহর রাসূল তাদের ঘেরাও করে অবরোধ করেন। ২য় হিজরি সনের মধ্য শাওয়াল, শনিবার থেকে বানু কাইনুকা'র ওপর অবরোধ আরোপ করেন মুসলিম বাহিনী। পনের দিন আটকে থাকার পর যুল-কা'দা মাসের শুরুতেই ইয়াহুদিরা আত্মসমর্পণ করে। নবি তাদের সকলকে মদীনা থেকে নির্বাসিত করে সিরিয়ার 'আযরুআত' এলাকায় পাঠিয়ে দেন। তবে অল্পকাল পরই তাদের অধিকাংশ মারা পড়ে সেখানে।
টিকাঃ
৩০০. আবূ দাউদ, ৩০০১, যাদুল মাআদ, ২/৭১, ৯১।
📄 সাওয়ীকের যুদ্ধ
ওদিকে আরেকটি সামরিক অভিযানের মাধ্যমে বদরের প্রতিশোধ নিতে আবূ সুফইয়ানের ছটফটানি ও অস্থিরতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। মুহাম্মাদ -এর সাথে লড়াই করার আগে গোসল না করারও কসম করেন তিনি। লড়লেই যেন বিজয় নিশ্চিত! দুই শ জনের এক বাহিনী নিয়ে মদীনায় আসেন কসম পূর্ণ করতে। 'আরিদ' নামক এক জনবসতিতে অতর্কিতে হামলা করে দুই জন আনসারকে শহীদ করেন। এরপর বাহিনীটি তাদের কয়েকটি দামি খেজুর গাছ কেটে পুড়িয়ে দেওয়ার পর পালিয়ে যায়।
হানাদারদের খবর পেয়ে নবি ও তাঁর সেনারা তাদের পিছুধাওয়া করেন। 'কারকারাতুল কাদর' নামক স্থান পর্যন্ত ধাওয়া করা হলেও শত্রুরা হাতছাড়া হয়ে যায়। তবে ঊর্ধ্বশ্বাসে পালাতে গিয়ে আবূ সুফইয়ানের বাহিনী তাদের সব মূল্যবান রসদ ফেলে যেতে বাধ্য হয়। বিশেষত ভুট্টা দিয়ে তৈরি একধরনের ছাতু। খাবারটির আরবি নাম 'সাওয়ীক'। এই কারণেই অভিযানটিকে 'সাওয়ীকের যুদ্ধ' বলে অভিহিত করা হয়। এটাকে কারকারাতুল কাদরের যুদ্ধও বলা হয়।
টিকাঃ
৩০১. ইবনু হিশাম, ২/৪৪-৪৫; যাদুল মাআদ, ২/৯০-৯১।
📄 কা’ব ইবনু আশরাফের হত্যা
মুসলিমদের পথে পরবর্তী কাঁটার নাম কা'ব ইবনু আশরাফ। প্রচুর সম্পদশালী ধনী এক ইয়াহুদি কবি। মুসলিম ও তাদের নবি -এর প্রতি তার অপরিসীম বিদ্বেষ। নিজের কাব্যপ্রতিভা ব্যবহার করে সে নবি , সাহাবা এবং মুসলিম নারীদের সম্ভ্রম নিয়ে মারাত্মক কটূক্তি করত। সেই সাথে ইসলামের শত্রুদের উৎসাহিত করতে থাকত মুসলিমদের সাথে লড়াই করার জন্য। বদরের যুদ্ধের পরপরই মক্কায় এক ঝটিকা সফর করে সে এ ব্যাপারে আরও উস্কানি দিয়ে আসে। প্রতিশোধ-নেশায় পাগল কুরাইশ তখন একেই তো নাচুনি বুড়ি, তার ওপর কা'বের বাকপটুতা দিয়ে আসে ঢোলের বাড়ি।
আরবে কবি এবং কবিতার কদর এমনিতেই বেশ উঁচু। কা'বের বাগ্মিতা যেন জাদুর মতো কাজ করে কুরাইশদের ওপর। প্রতিশোধের আহ্বানের পাশাপাশি সে কুরাইশদের এ বলেও সান্ত্বনা দেয় যে, ধর্মীয় দিক দিয়ে তারাই সঠিকতর। বানু কাইনুকা'র ঘটনা থেকে শিক্ষাও নিতে বলে তাদের। কা'বের পরামর্শ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলার শপথ নেয় কুরাইশ মুশরিকরা।
কাজ শেষে মদীনায় ফিরে এসে মুসলিম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কণ্ঠযুদ্ধ জারি রাখে কা'ব ইবনু আশরাফ। তার ফিরে আসার খবর পেয়ে নবি সাহাবিদের বলেন, “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অপমান করছে কা'ব। কে আছ, যে আমাকে তার থেকে মুক্তি দেবে?”
এই আহ্বানে সাড়া দেন মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা, আব্বাদ ইবনু বিশর, আবু নাইলাহ, হারিস ইবনু আওস এবং আবূ আবস ইবনু জাবর (রদিয়াল্লাহু আনহুম)। মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাকে দলপতি করে অভিযানের পরিকল্পনা ঠিক করা হয়। তবে এ অভিযানে যেহেতু ছলনার আশ্রয় নিতে হবে, তাই আগেই তিনি নবিজি -এর নিকট অনুমতি নিয়ে নেন।
আল্লাহর রাসূল -এর অনুমোদন পেয়ে কা'বের কাছে যান মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা। তাকে ডাকিয়ে এনে এ কথা সে কথার ফাঁকে বলেন, "এই লোকটা [নবি আমাদের কাছে যাকাত-সদাকা চায়। সত্যি কথা বলতে কী, সে আমাদের বিরাট বিপদে ফেলে দিচ্ছে!”
ফাঁদে পা দেয় কা'ব। খুশিতে আত্মহারা হয়ে বলে, "আল্লাহর কসম! ভবিষ্যতে ওকে নিয়ে তোমরা আরও অতিষ্ঠ হয়ে উঠবে।” এভাবে কা'বের বিশ্বাস জয় করে নেওয়ার পর মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা (রদিয়াল্লাহু আনহু) কিছু গম আর খেজুর কর্জ চান। বন্ধক হিসেবে নিজের অস্ত্রগুলো জমা রাখার কথা বলেন। কা'ব অনুরোধটি গ্রহণ করেন।
এরপর আবূ নাইলাহ (রদিয়াল্লাহু আনহু) এসে একইভাবে উষ্মা প্রকাশ করে বলেন যে, আরও বেশ কিছু লোক নবিজি -এর ব্যাপারে একই মনোভাব পোষণ করে। তাদেরও কা'বের কাছে নিয়ে আসার কথা বলেন তিনি। কারণ, সবারই এখন সাহায্যের প্রয়োজন। কা'বের খুশি আর দেখে কে! এতগুলো মুসলিমকে হুঁশ ফিরে পেতে দেখে সে নিজেই বেহুঁশ হওয়ার দশা।
সেদিন ৩য় হিজরি সনের রবীউল আউয়াল মাসের ১৪ তারিখ। পূর্ণিমার রাতে দুর্গে নিজের কামরায় নববধূর আলিঙ্গন উপভোগ করছে কা'ব। পাঁচ জন সশস্ত্র মুসলিম এসে ডাক দেয় কা'বকে। তার স্ত্রী বলে, 'এই সময় কোথায় যাচ্ছেন?' আমি যে আওয়াজ শুনলাম তা থেকে রক্ত প্রবাহের ইঙ্গিত পাচ্ছি!' স্ত্রীর সাবধানবাণীকে পাত্তা না দিয়ে সরল বিশ্বাসে কা'ব বেরিয়ে আসে দুর্গ থেকে। মুসলিমদের হাতে অস্ত্র দেখেও সে কিচ্ছুটি সন্দেহ করেনি। এগুলো তো বন্ধক রাখার জন্য আনা হয়েছে, তাকে হত্যা করতে নয়!
হাঁটতে হাঁটতে আর কথা বলতে বলতে একটু দূরে চলে আসে সবাই। আবূ নাইলাহ (রদিয়াল্লাহু আনহু) কা’বের মাথায় দেওয়া সুগন্ধির প্রশংসা করেন। একটু কাছ থেকে শুঁকে দেখার অনুমতি চান তিনি। গদগদ হয়ে কা'ব রাজিও হয়ে যায়। এভাবে আবূ নাইলাহ (রদিয়াল্লাহু আনহু) বারকয়েক নিজেও শোঁকেন, সঙ্গীদেরও শুঁকে দেখতে বলেন। একসময় কা'বকে একদম বাগে নিয়ে আসার পর আবূ নাইলাহ সঙ্গীদের আহ্বান করেন, "এবার ধরো আল্লাহর শত্রুটাকে!”
সাথে সাথে সবাই তরবারি দিয়ে কয়েকবার আঘাত হানেন। তবে তা খুব বেশি ফলপ্রসূ হয়নি। অবশেষে মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা (রদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর কোদাল দিয়ে কা'বের তলপেট চিরে ফেলেন। ভয়ানক চিৎকার করতে করতে মারা পড়ে কা'ব। সে আওয়াজে জেগে ওঠে সারা দুর্গ। মশাল জ্বলে ওঠে চারপাশে। কিন্তু জঘন্যতম শত্রুর বকবকানি চিরতরে বন্ধ করে দিয়ে নিরাপদে পালিয়ে আসেন পাঁচ মহান সাহাবি। (রদিয়াল্লাহু আনহুম)।
এ ঘটনায় মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে ইয়াহুদিদের মনোবল। প্রকাশ্য শত্রুতা ত্যাগ করে কিছুকালের জন্য গা-ঢাকা দেয় তারা। মুসলিমরাও সাময়িক রেহাই পান উত্ত্যক্তকারীদের হাত থেকে।
টিকাঃ
৩০২. বুখারি, ৪০৩৭।
📄 কারদাহ অভিযান
হিজরি তৃতীয় সনের জুমাদাল উলা মাস। ইরাক হয়ে সিরিয়া রওনা দেয় কুরাইশদের একটি ব্যবসায়ী কাফেলা। কাফেলার তত্ত্বাবধানে নিযুক্ত সফওয়ান ইবনু উমাইয়া। নিরাপত্তা নিয়ে কুরাইশরা এবার বেশি চিন্তিত না। কারণ, এবার তারা যাচ্ছে নাজদ অঞ্চল দিয়ে। মদীনা ও মুসলিমদের হুমকি থেকে এটা বেশ দূরে।
কিন্তু নবিজি -ও খুব হুঁশিয়ার। মূল্যবান মালবোঝাই কাফেলাটির খবর পেয়ে দুই শ জনের একটি অশ্বারোহী বাহিনী প্রেরণ করেন তিনি। নেতৃত্বে আছেন যাইদ ইবনু হারিসা (রদিয়াল্লাহু আনহু)। নাজদ অঞ্চলের 'কারদাহ' নামক একটি ঝরনার কাছে কুরাইশ কাফেলাটি যাত্রাবিরতি করে। অতর্কিত আক্রমণের মুখে কাফেলার যাত্রীরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও ফেলে যায় তাদের সব মালামাল। মালামাল হস্তগত করার পাশাপাশি কাফেলার গাইড ফুরাত ইবনু হাইয়ানকেও আটক করেন মুসলিমরা। কিন্তু আটককারীদের কাছে তিনি এত অসাধারণ মানবিক আচরণ পান যে, মুগ্ধ হয়ে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেন।
লব্ধ গনীমাত হিসেব করে দেখা যায় এতে প্রায় এক লাখ দিরহাম মূল্যের সম্পদ আছে। বদরের যুদ্ধে কুরাইশদের যে-রকম সামরিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, এই আক্রমণে তাদের ঠিক সে-রকমই বিশাল আর্থিক ক্ষতি হয়।
টিকাঃ
৩০৩. ইবনু হিশাম, ২/৫০-৫১।