📄 পার্থক্য গড়ে দেওয়ার সেই দিন
আবূ জাহলের মৃত্যুর পর কুরাইশরা মনোবল হারিয়ে ফেলে। মানুষ ও ফেরেশতার এক সম্মিলিত বাহিনীর হাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে ফিরে যায় তারা। শেষ হয় বদরের যুদ্ধ। এ যুদ্ধ কোনও ভূমি বা সম্পদ দখল অথবা প্রতিপত্তি লাভের লড়াই ছিল না; বরং তা ছিল কুফরের ওপর ঈমানকে বিজয়ী করার লড়াই। এই দিন মুসলিমরা নিজের বাবা, চাচা, সন্তান, ভাই ও বন্ধুদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল। উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু) হত্যা করেন তার মামা আস ইবনু হিশামকে। আর আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) মুখোমুখি হন তার ছেলে আবদুর রহমানের। নবিজি ﷺ -এর চাচা আব্বাস বন্দি হন মুসলিমদের হাতে। মুশরিকদের দলে ছিল বাবা উতবা ইবনু রবীআ, আর মুসলিমদের দলে ছিল তার আপন সন্তান আবু হুযাইফা (রদিয়াল্লাহু আনহু)। আত্মীয়তা আর রক্ত-সম্পর্ককে কুরবানি করে অর্জিত হয়েছে ঈমানের বিজয়। যুদ্ধের দিনটি পরিচিতি লাভ করে 'ইয়াওমুল ফুরকান' (পার্থক্য গড়ে দেওয়ার দিন) নামে। কারণ, এই দিনে কোনও গোত্রপরিচয় নয়; বরং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস-অবিশ্বাস ছিল পার্থক্যকারী রেখা。
📄 দুই পক্ষের নিহত ব্যক্তিগণ
এই যুদ্ধে ১৪ জন মুসলিম শহীদ হন। ছয় জন মুহাজির ও আট জন আনসার। বদরের মাঠেই তাদের কবর দেওয়া হয়। আজও কবরগুলোর অবস্থান প্রসিদ্ধ ও সুচিহ্নিত।
আর পৌত্তলিক পক্ষের মারা যায় ৭০ জন, বন্দিও হয় ৭০ জন। মৃতদের অধিকাংশই হয় গোত্রপতি, নয়তো প্রভাবশালী কেউ। চব্বিশ জন পৌত্তলিক গোত্রনেতার লাশ ছুঁড়ে ফেলা হয় দুর্গন্ধময় এক পরিত্যক্ত কুয়ায়।
নবি ﷺ ও সাহাবিগণ তিন দিন বদরে অবস্থান করেন। মদীনায় ফিরে যাওয়ার দিন নবি সেই কুয়ার ধারে দাঁড়িয়ে প্রত্যেক গোত্রপতির নাম ধরে ধরে ডেকে বলেন, “ওহে অমুকের ছেলে অমুক! ওহে অমুকের ছেলে অমুক! এখন কি মনে হচ্ছে না যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুসরণ করলেই ভালো হতো? আমাদের রব আমাদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আমরা তা সত্য পেয়েছি। এখন তোমরাও কি তোমাদের রবের প্রতিশ্রুতি সত্য পেয়েছ?”
উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু) অবাক হয়ে বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল, আপনি এমন দেহের সাথে কথা বলছেন যার মধ্যে প্রাণই নেই!”
নবি এর প্রত্যুত্তরে বললেন, “আমি যা কিছু বলছি তা তোমরা তাদের থেকে বেশি শুনতে পারছ না। তবে তারা জবাব দিতে পারে না।”
টিকাঃ
২৯১. বুখারি, ২৪০।
২৯২. বুখারি, ৩৯৭৬।
📄 দিকে দিকে যুদ্ধজয়ের খবর
জান নিয়ে পালাতে সক্ষম মুশরিকরা বয়ে নিয়ে যায় তাদের অপ্রত্যাশিত পরাজয়ের শোচনীয় খবর। দুঃখে-হতাশায় মুষড়ে পড়ে মক্কাবাসী। কিন্তু মুসলিমদের সামনে মান-ইজ্জত বজায় রাখতে যেকোনও ধরনের শোক পালন নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়।
কিন্তু চাইলেই কি আর শোক আটকে রাখা যায়? আসওয়াদ ইবনু আবদিল মুত্তালিবের কথাই ধরুন। বদরে সে তিন তিনটি সন্তানকে হারিয়েছে। এক রাতে কোনও এক নারীর লাগামছাড়া মাতমের আওয়াজ পেয়ে ভাবল শোক প্রকাশের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। সাথে সাথে এক দাসকে পাঠিয়ে দিল খবর নিতে। কিন্তু জানা গেল যে, নিষেধাজ্ঞা এখনও বহাল আছে। তবে মহিলাটি কাঁদছে কারণ তার একটি উট হারিয়ে গেছে। রেগেমেগে আসওয়াদ বলল,
“মাতম করে রাত জাগতে বুঝি ওই এক উটকেই পেলি? আর বদরে পড়ে থাকা লাশদের বুঝি ভুলেই গেলি?”
এদিকে নবি ﷺ দু'জন দূতকে মদীনায় পাঠান বিজয়ের সুসংবাদ জানাতে। উত্তর মদীনায় যান আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা আর দক্ষিণে যাইদ ইবনু হারিসা (রদিয়াল্লাহু আনহুমা)। মদীনাবাসী এমনিতেই চিন্তিত ছিল। তার ওপর ইয়াহুদিরা গুজব ছড়িয়ে দিয়েছে যে, প্রতাপশালী কুরাইশরা মুসলিমদের পরাস্ত করে ফেলেছে। নবিজি -এর বার্তা এসে পৌঁছানোমাত্র সবাই উঁচু স্বরে তাকবীর-ধ্বনি দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে। বিজয় তো এসেছেই, আর নিহত মুসলিমরাও শহীদ হিসেবে পাবেন আল্লাহর কাছে যথার্থ পুরস্কার।
📄 মদীনায় প্রত্যাবর্তন
সবাই মিলে মদীনায় ফিরে চলার সময় আল্লাহর রাসূল যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টনের নিয়ম-সংক্রান্ত একটি ওহি লাভ করেন। নবিজি ﷺ -এর জন্য রাখা হবে এক-পঞ্চমাংশ। আর বাকিটা ভাগ করে দেওয়া হবে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মাঝে। মুহাম্মাদ ﷺ -ই একমাত্র নবি, যার জন্য গনীমাতের সম্পদ বৈধ করা হয়েছে। এরপর নাদর ইবনুল হারিস ও উকবা ইবনু আবী মু'আইতকে হত্যার নির্দেশ আসে। যথাক্রমে আলি ও আসিম ইবনু সাবিত আনসারি (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) তাদের শিরশ্ছেদ করেন।
বিজয়ের সুসংবাদ শুনে মদীনা থেকে অনেকেই বদর অভিমুখে ছুটে আসেন। সবারই ইচ্ছে নবিজি ﷺ -কে অভিবাদন জানানো প্রথম ব্যক্তি হওয়ার। রাওহা অঞ্চলে এসে সেনাদলের দেখা পান তারা। সেখান থেকে স্বাগত জানিয়ে নিয়ে যান মদীনায়। বিপুল পরিমাণ বন্দি নিয়ে বিজয়ী বাহিনীকে শহরে প্রবেশ করতে দেখে অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করেন। এই সময়ই আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ও তার সাথি-সঙ্গীরা মানুষ দেখানোর জন্য ইসলাম গ্রহণ করে।
টিকাঃ
২৯৩. ভিন্ন বর্ণনামতে, দুটি মৃত্যুদণ্ডই আলি (রদিয়াল্লহু আনহু)-এর হাতে কার্যকর হয়।