📄 আবূ জাহলের নরকযাত্রা
সেনাপতি আবূ জাহলকে কড়া নিরাপত্তাবেষ্টনীতে রাখে তরবারি ও বর্শাধারী সেনারা। এই নিরাপত্তাব্যূহ ভেদ করে মুসলিমরা তার কাছে যেতেই পারছিল না।
আবদুর রহমান ইবনু আওফ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর পাশে অল্পবয়সি দুই জন আনসার যুবক দাঁড়িয়ে ছিল। ফলে তিনি নিজেকে নিরাপদ মনে করছিলেন না। ভাবছিলেন শক্তিশালী কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো। এমন সময় দু'জনের একজন অপরজন থেকে লুকিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করল, “চাচা, আবূ জাহল কোনটা?”
আবদুর রহমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) অবাক হয়ে বললেন, “তুমি জেনে কী করবে?”
“শুনেছি সে নাকি নবিজি ﷺ -কে গালিগালাজ করে। যেই সত্তার হাতে আমার জান, তাঁর কসম! ওকে দেখামাত্র হয় আমি তাকে হত্যা করে ফেলব, আর নয়তো সে আমাকে হত্যা করবে।”
আরেকজনও একইভাবে একই কথা জিজ্ঞেস করল। যুদ্ধের হই-হল্লার মাঝে হঠাৎ আবু জাহলকে চোখে পড়ল আবদুর রহমানের। ছেলে দুটোকে দেখিয়ে বললেন, “ওই যে, ওইটা আবূ জাহল।” তখন তারা বাজপাখির মতো চোখের পলকেই সব ভিড় পেরিয়ে আবূ জাহলের কাছে পৌঁছে গেল এবং সাথে সাথে আবূ জাহলের শরীর তরবারির আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করে দিল। ফলে আবূ জাহলের মাটিতে পড়ে মৃত্যুর অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনও কিছু করার থাকল না। এরপর তারা দু'জনে রাসূল ﷺ -এর সামনে হাজির হয়ে নিজেকে আবূ জাহলের হত্যাকারী বলে দাবি করে এবং খুশি প্রকাশ করে। দু'জনেরই তরবারি পরীক্ষা করে রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘোষণা করেন, “তোমরা দু'জনেই তাকে হত্যা করেছ।”
এই দুই যুবক হলেন আফরার দুই ছেলে মুআয এবং মুআওওয়িয (রদিয়াল্লাহু আনহুমা)। মুআওওয়িয বদরে যুদ্ধেই শহীদ হয়েছিলেন। তবে মুআয জীবিত ছিলেন উসমান (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর খিলাফাতকাল পর্যন্ত। আবূ জাহলের কাছ থেকে লব্ধ জিনিসপত্র নবি তাকেই দিয়েছিলেন।
ওদিকে মৃত্যুপথযাত্রী আবু জাহলকে ধূলায় লুটিয়ে কাতরাতে দেখেন আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রদিয়াল্লাহু আনহু)। পুরোনো শত্রুর ঘাড়ে পা দিয়ে মাথা কাটার উদ্দেশ্যে তার দাড়ি ধরেন এবং বলেন, “ওহে আল্লাহর শত্রু, আজ আল্লাহ তোকে কী বেইজ্জতিটাই না করে ছাড়লেন!”
এই মরণ মুহূর্তেও আবূ জাহলের দম্ভোক্তি, 'কিসের বেইজ্জতি? তোরা যে ব্যক্তিকে হত্যা করছিস তার চেয়ে বড় কেউ আছে নাকি?' আবার বলতে লাগল, 'আফসোস! কৃষকের ছেলেরা ব্যতীত অন্য কেউ যদি আমাকে হত্যা করত? আজকে কার বিজয় হলো?
আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রদিয়াল্লাহু আনহু) জবাব দিলেন “আল্লাহ আর তাঁর রাসূলের।”
“ওহে বকরির রাখাল, কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছিস, খেয়াল আছে?” আবূ জাহলের এই কথার পর আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রদিয়াল্লাহু আনহু) তার শিরশ্ছেদ করেন। কাটা মাথাটি হাজির করেন নবি ﷺ -এর সামনে।
“আল্লাহু আকবার! আলহামদুলিল্লাহ!” হর্ষধ্বনি করে উঠলেন আল্লাহর রাসূল। “আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন, তাঁর বান্দাদের সাহায্য করেছেন, আর একাই পরাজিত করেছেন শত্রুসেনাদের।” আবূ জাহলের কর্তিত মস্তকের দিকে চেয়ে নবি বলেন, “এই লোক ছিল এই উম্মাহর ফিরআউন।”
টিকাঃ
২৮৮. বুখারি, ৩১৪১; মুসলিম, ১৭৫২।
২৮৯. ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি, ৭/৩৪৫।
২৯০. বুখারি, ৩৯৬২।
📄 পার্থক্য গড়ে দেওয়ার সেই দিন
আবূ জাহলের মৃত্যুর পর কুরাইশরা মনোবল হারিয়ে ফেলে। মানুষ ও ফেরেশতার এক সম্মিলিত বাহিনীর হাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে ফিরে যায় তারা। শেষ হয় বদরের যুদ্ধ। এ যুদ্ধ কোনও ভূমি বা সম্পদ দখল অথবা প্রতিপত্তি লাভের লড়াই ছিল না; বরং তা ছিল কুফরের ওপর ঈমানকে বিজয়ী করার লড়াই। এই দিন মুসলিমরা নিজের বাবা, চাচা, সন্তান, ভাই ও বন্ধুদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল। উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু) হত্যা করেন তার মামা আস ইবনু হিশামকে। আর আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) মুখোমুখি হন তার ছেলে আবদুর রহমানের। নবিজি ﷺ -এর চাচা আব্বাস বন্দি হন মুসলিমদের হাতে। মুশরিকদের দলে ছিল বাবা উতবা ইবনু রবীআ, আর মুসলিমদের দলে ছিল তার আপন সন্তান আবু হুযাইফা (রদিয়াল্লাহু আনহু)। আত্মীয়তা আর রক্ত-সম্পর্ককে কুরবানি করে অর্জিত হয়েছে ঈমানের বিজয়। যুদ্ধের দিনটি পরিচিতি লাভ করে 'ইয়াওমুল ফুরকান' (পার্থক্য গড়ে দেওয়ার দিন) নামে। কারণ, এই দিনে কোনও গোত্রপরিচয় নয়; বরং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস-অবিশ্বাস ছিল পার্থক্যকারী রেখা。
📄 দুই পক্ষের নিহত ব্যক্তিগণ
এই যুদ্ধে ১৪ জন মুসলিম শহীদ হন। ছয় জন মুহাজির ও আট জন আনসার। বদরের মাঠেই তাদের কবর দেওয়া হয়। আজও কবরগুলোর অবস্থান প্রসিদ্ধ ও সুচিহ্নিত।
আর পৌত্তলিক পক্ষের মারা যায় ৭০ জন, বন্দিও হয় ৭০ জন। মৃতদের অধিকাংশই হয় গোত্রপতি, নয়তো প্রভাবশালী কেউ। চব্বিশ জন পৌত্তলিক গোত্রনেতার লাশ ছুঁড়ে ফেলা হয় দুর্গন্ধময় এক পরিত্যক্ত কুয়ায়।
নবি ﷺ ও সাহাবিগণ তিন দিন বদরে অবস্থান করেন। মদীনায় ফিরে যাওয়ার দিন নবি সেই কুয়ার ধারে দাঁড়িয়ে প্রত্যেক গোত্রপতির নাম ধরে ধরে ডেকে বলেন, “ওহে অমুকের ছেলে অমুক! ওহে অমুকের ছেলে অমুক! এখন কি মনে হচ্ছে না যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুসরণ করলেই ভালো হতো? আমাদের রব আমাদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আমরা তা সত্য পেয়েছি। এখন তোমরাও কি তোমাদের রবের প্রতিশ্রুতি সত্য পেয়েছ?”
উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু) অবাক হয়ে বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল, আপনি এমন দেহের সাথে কথা বলছেন যার মধ্যে প্রাণই নেই!”
নবি এর প্রত্যুত্তরে বললেন, “আমি যা কিছু বলছি তা তোমরা তাদের থেকে বেশি শুনতে পারছ না। তবে তারা জবাব দিতে পারে না।”
টিকাঃ
২৯১. বুখারি, ২৪০।
২৯২. বুখারি, ৩৯৭৬।
📄 দিকে দিকে যুদ্ধজয়ের খবর
জান নিয়ে পালাতে সক্ষম মুশরিকরা বয়ে নিয়ে যায় তাদের অপ্রত্যাশিত পরাজয়ের শোচনীয় খবর। দুঃখে-হতাশায় মুষড়ে পড়ে মক্কাবাসী। কিন্তু মুসলিমদের সামনে মান-ইজ্জত বজায় রাখতে যেকোনও ধরনের শোক পালন নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়।
কিন্তু চাইলেই কি আর শোক আটকে রাখা যায়? আসওয়াদ ইবনু আবদিল মুত্তালিবের কথাই ধরুন। বদরে সে তিন তিনটি সন্তানকে হারিয়েছে। এক রাতে কোনও এক নারীর লাগামছাড়া মাতমের আওয়াজ পেয়ে ভাবল শোক প্রকাশের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। সাথে সাথে এক দাসকে পাঠিয়ে দিল খবর নিতে। কিন্তু জানা গেল যে, নিষেধাজ্ঞা এখনও বহাল আছে। তবে মহিলাটি কাঁদছে কারণ তার একটি উট হারিয়ে গেছে। রেগেমেগে আসওয়াদ বলল,
“মাতম করে রাত জাগতে বুঝি ওই এক উটকেই পেলি? আর বদরে পড়ে থাকা লাশদের বুঝি ভুলেই গেলি?”
এদিকে নবি ﷺ দু'জন দূতকে মদীনায় পাঠান বিজয়ের সুসংবাদ জানাতে। উত্তর মদীনায় যান আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা আর দক্ষিণে যাইদ ইবনু হারিসা (রদিয়াল্লাহু আনহুমা)। মদীনাবাসী এমনিতেই চিন্তিত ছিল। তার ওপর ইয়াহুদিরা গুজব ছড়িয়ে দিয়েছে যে, প্রতাপশালী কুরাইশরা মুসলিমদের পরাস্ত করে ফেলেছে। নবিজি -এর বার্তা এসে পৌঁছানোমাত্র সবাই উঁচু স্বরে তাকবীর-ধ্বনি দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে। বিজয় তো এসেছেই, আর নিহত মুসলিমরাও শহীদ হিসেবে পাবেন আল্লাহর কাছে যথার্থ পুরস্কার।