📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 শুরু হলো যুদ্ধ

📄 শুরু হলো যুদ্ধ


যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই তিন জন ঝানু সৈনিককে হারিয়ে তখন কুরাইশরা ক্রুব্ধ। আক্রমণে ধেয়ে আসে তারা। ত্বরিত সাফল্যে উজ্জীবিত মুসলিমরা "আহাদ! আহাদ! (এক! এক!)" রব তুলে অবিচল পদে আক্রমণ প্রতিহত করেন।

এদিকে এক হাজার ফেরেশতা এসে মুসলিমদের সাথে যোগ দেন আল্লাহর সাহায্যরূপে। মুহাম্মাদ ﷺ -কে এই গায়েবি সাহায্য দেখিয়েও দেওয়া হয়। আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর দিকে ফিরে তিনি বলেন, "খুশির খবর, আবূ বকর! আল্লাহর সাহায্য চলে এসেছে। ওই যে, উনি জিবরীল। ঘোড়ার রাশ ধরে সামনে এগিয়ে চলেছেন। ধুলো-মাটিতে ভরে গেছে তাঁর পরনের পোশাক।”

নবি ﷺ জোরে জোরে পা ফেলে লড়াইয়ের দিকে আসতে থাকেন এবং এই আয়াতটি তিলাওয়াত করতে থাকেন,

“শীঘ্রই ওই দলটি পরাজিত হয়ে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে।”

নবি ﷺ এক মুঠো ধুলো নিয়ে কুরাইশদের দিকে ছুড়ে মেরে বলেন, "বিকৃত হয়ে যাক চেহারাগুলো।" আল্লাহ তাআলার কী আশ্চর্য ক্ষমতা! প্রতিটি শত্রুর নাকে-মুখে ঢুকে পড়ে সেই ধুলো। একজনও বাদ যায়নি। আল্লাহ তাআলা এ ব্যাপারে বলেন,

"নিক্ষেপ তুমি করোনি, যখন তুমি তা নিক্ষেপ করেছিলে; বরং স্বয়ং আল্লাহই নিক্ষেপ করেছেন।”

আক্রমণের আদেশ দিয়ে নবি ﷺ বলেন, “গর্জে উঠো!” শত্রুর চেয়ে এক-তৃতীয়াংশ লোকবলবিশিষ্ট মুসলিমরা যুদ্ধক্ষেত্রে স্বয়ং রাসূলুল্লাহকে দেখে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। ফেরেশতাদের অদৃশ্য বাহিনীর সাহায্যে কুরাইশদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মুসলিমরা। একের পর এক সৈনিক হারাতে হারাতে বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে কুরাইশ সেনাসারি। তাদের পিছু ধাওয়া করে মুসলিমরা কাউকে হত্যা করেন, কাউকে বন্দি করেন। আবার অনেকের মাথা কেটে পড়ে যাচ্ছে, হাত পড়ে যাচ্ছে কিন্তু কেউ বলতে পারে না কে কাটছে। আসলে তারা ফেরেশতা ছিল।

সুরাকা ইবনু মালিক ইবনি জু'শুমের রূপ ধরে শয়তান সশরীরে উপস্থিত ছিল। ফেরেশতাবাহিনী চলে এসেছে দেখে সে পলায়ন করে লোহিত সাগরে ডুব দেয়।

টিকাঃ
২৮৪. বুখারি, ৩৯৯৫।
২৮৫. সূরা কমার, ৫৪:৪৫।
২৮৬. সূরা আনফাল, ৮ : ১৭।
২৮৭. ইবনু সা'দ, তবাকাত, ২/২৬।

📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 আবূ জাহলের নরকযাত্রা

📄 আবূ জাহলের নরকযাত্রা


সেনাপতি আবূ জাহলকে কড়া নিরাপত্তাবেষ্টনীতে রাখে তরবারি ও বর্শাধারী সেনারা। এই নিরাপত্তাব্যূহ ভেদ করে মুসলিমরা তার কাছে যেতেই পারছিল না।

আবদুর রহমান ইবনু আওফ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর পাশে অল্পবয়সি দুই জন আনসার যুবক দাঁড়িয়ে ছিল। ফলে তিনি নিজেকে নিরাপদ মনে করছিলেন না। ভাবছিলেন শক্তিশালী কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো। এমন সময় দু'জনের একজন অপরজন থেকে লুকিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করল, “চাচা, আবূ জাহল কোনটা?”

আবদুর রহমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) অবাক হয়ে বললেন, “তুমি জেনে কী করবে?”

“শুনেছি সে নাকি নবিজি ﷺ -কে গালিগালাজ করে। যেই সত্তার হাতে আমার জান, তাঁর কসম! ওকে দেখামাত্র হয় আমি তাকে হত্যা করে ফেলব, আর নয়তো সে আমাকে হত্যা করবে।”

আরেকজনও একইভাবে একই কথা জিজ্ঞেস করল। যুদ্ধের হই-হল্লার মাঝে হঠাৎ আবু জাহলকে চোখে পড়ল আবদুর রহমানের। ছেলে দুটোকে দেখিয়ে বললেন, “ওই যে, ওইটা আবূ জাহল।” তখন তারা বাজপাখির মতো চোখের পলকেই সব ভিড় পেরিয়ে আবূ জাহলের কাছে পৌঁছে গেল এবং সাথে সাথে আবূ জাহলের শরীর তরবারির আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করে দিল। ফলে আবূ জাহলের মাটিতে পড়ে মৃত্যুর অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনও কিছু করার থাকল না। এরপর তারা দু'জনে রাসূল ﷺ -এর সামনে হাজির হয়ে নিজেকে আবূ জাহলের হত্যাকারী বলে দাবি করে এবং খুশি প্রকাশ করে। দু'জনেরই তরবারি পরীক্ষা করে রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘোষণা করেন, “তোমরা দু'জনেই তাকে হত্যা করেছ।”

এই দুই যুবক হলেন আফরার দুই ছেলে মুআয এবং মুআওওয়িয (রদিয়াল্লাহু আনহুমা)। মুআওওয়িয বদরে যুদ্ধেই শহীদ হয়েছিলেন। তবে মুআয জীবিত ছিলেন উসমান (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর খিলাফাতকাল পর্যন্ত। আবূ জাহলের কাছ থেকে লব্ধ জিনিসপত্র নবি তাকেই দিয়েছিলেন।

ওদিকে মৃত্যুপথযাত্রী আবু জাহলকে ধূলায় লুটিয়ে কাতরাতে দেখেন আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রদিয়াল্লাহু আনহু)। পুরোনো শত্রুর ঘাড়ে পা দিয়ে মাথা কাটার উদ্দেশ্যে তার দাড়ি ধরেন এবং বলেন, “ওহে আল্লাহর শত্রু, আজ আল্লাহ তোকে কী বেইজ্জতিটাই না করে ছাড়লেন!”

এই মরণ মুহূর্তেও আবূ জাহলের দম্ভোক্তি, 'কিসের বেইজ্জতি? তোরা যে ব্যক্তিকে হত্যা করছিস তার চেয়ে বড় কেউ আছে নাকি?' আবার বলতে লাগল, 'আফসোস! কৃষকের ছেলেরা ব্যতীত অন্য কেউ যদি আমাকে হত্যা করত? আজকে কার বিজয় হলো?

আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রদিয়াল্লাহু আনহু) জবাব দিলেন “আল্লাহ আর তাঁর রাসূলের।”

“ওহে বকরির রাখাল, কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছিস, খেয়াল আছে?” আবূ জাহলের এই কথার পর আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রদিয়াল্লাহু আনহু) তার শিরশ্ছেদ করেন। কাটা মাথাটি হাজির করেন নবি ﷺ -এর সামনে।

“আল্লাহু আকবার! আলহামদুলিল্লাহ!” হর্ষধ্বনি করে উঠলেন আল্লাহর রাসূল। “আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন, তাঁর বান্দাদের সাহায্য করেছেন, আর একাই পরাজিত করেছেন শত্রুসেনাদের।” আবূ জাহলের কর্তিত মস্তকের দিকে চেয়ে নবি বলেন, “এই লোক ছিল এই উম্মাহর ফিরআউন।”

টিকাঃ
২৮৮. বুখারি, ৩১৪১; মুসলিম, ১৭৫২।
২৮৯. ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি, ৭/৩৪৫।
২৯০. বুখারি, ৩৯৬২।

📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 পার্থক্য গড়ে দেওয়ার সেই দিন

📄 পার্থক্য গড়ে দেওয়ার সেই দিন


আবূ জাহলের মৃত্যুর পর কুরাইশরা মনোবল হারিয়ে ফেলে। মানুষ ও ফেরেশতার এক সম্মিলিত বাহিনীর হাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে ফিরে যায় তারা। শেষ হয় বদরের যুদ্ধ। এ যুদ্ধ কোনও ভূমি বা সম্পদ দখল অথবা প্রতিপত্তি লাভের লড়াই ছিল না; বরং তা ছিল কুফরের ওপর ঈমানকে বিজয়ী করার লড়াই। এই দিন মুসলিমরা নিজের বাবা, চাচা, সন্তান, ভাই ও বন্ধুদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল। উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু) হত্যা করেন তার মামা আস ইবনু হিশামকে। আর আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) মুখোমুখি হন তার ছেলে আবদুর রহমানের। নবিজি ﷺ -এর চাচা আব্বাস বন্দি হন মুসলিমদের হাতে। মুশরিকদের দলে ছিল বাবা উতবা ইবনু রবীআ, আর মুসলিমদের দলে ছিল তার আপন সন্তান আবু হুযাইফা (রদিয়াল্লাহু আনহু)। আত্মীয়তা আর রক্ত-সম্পর্ককে কুরবানি করে অর্জিত হয়েছে ঈমানের বিজয়। যুদ্ধের দিনটি পরিচিতি লাভ করে 'ইয়াওমুল ফুরকান' (পার্থক্য গড়ে দেওয়ার দিন) নামে। কারণ, এই দিনে কোনও গোত্রপরিচয় নয়; বরং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস-অবিশ্বাস ছিল পার্থক্যকারী রেখা。

📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 দুই পক্ষের নিহত ব্যক্তিগণ

📄 দুই পক্ষের নিহত ব্যক্তিগণ


এই যুদ্ধে ১৪ জন মুসলিম শহীদ হন। ছয় জন মুহাজির ও আট জন আনসার। বদরের মাঠেই তাদের কবর দেওয়া হয়। আজও কবরগুলোর অবস্থান প্রসিদ্ধ ও সুচিহ্নিত।

আর পৌত্তলিক পক্ষের মারা যায় ৭০ জন, বন্দিও হয় ৭০ জন। মৃতদের অধিকাংশই হয় গোত্রপতি, নয়তো প্রভাবশালী কেউ। চব্বিশ জন পৌত্তলিক গোত্রনেতার লাশ ছুঁড়ে ফেলা হয় দুর্গন্ধময় এক পরিত্যক্ত কুয়ায়।

নবি ﷺ ও সাহাবিগণ তিন দিন বদরে অবস্থান করেন। মদীনায় ফিরে যাওয়ার দিন নবি সেই কুয়ার ধারে দাঁড়িয়ে প্রত্যেক গোত্রপতির নাম ধরে ধরে ডেকে বলেন, “ওহে অমুকের ছেলে অমুক! ওহে অমুকের ছেলে অমুক! এখন কি মনে হচ্ছে না যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুসরণ করলেই ভালো হতো? আমাদের রব আমাদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আমরা তা সত্য পেয়েছি। এখন তোমরাও কি তোমাদের রবের প্রতিশ্রুতি সত্য পেয়েছ?”

উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু) অবাক হয়ে বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল, আপনি এমন দেহের সাথে কথা বলছেন যার মধ্যে প্রাণই নেই!”

নবি এর প্রত্যুত্তরে বললেন, “আমি যা কিছু বলছি তা তোমরা তাদের থেকে বেশি শুনতে পারছ না। তবে তারা জবাব দিতে পারে না।”

টিকাঃ
২৯১. বুখারি, ২৪০।
২৯২. বুখারি, ৩৯৭৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00