📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 উদীয়মান হুমকি

📄 উদীয়মান হুমকি


মদীনার নিরাপত্তা ও শান্তি অটুট রাখতে নবিজি -এর এসব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য কুরাইশরা সুযোগ খুঁজতে থাকে। মদীনার মুশরিকদের কাছে তারা আদেশ পাঠায়, যেন শহর থেকে মুসলিমদের বের করে দেওয়া হয়। সাহায্য না পেলে তাদের শিশুদের হত্যা করা ও নারীদের বন্দি করার হুমকি দেয় কুরাইশরা। নবি এই গোপন বার্তা-চালাচালির খবর উদঘাটন করে সমাধানের ব্যবস্থা নেন। মদীনার মুশরিকদের নসীহত করেন এবং খুব করে বলে দেন, যেন তারা কুরাইশদের হুমকি-ধমকিতে ভয় না পায়। নবি -এর কথা শুনে তারা তাদের সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসে।

ঘটনার মোড় ঘুরে যাওয়ায় কুরাইশদের অস্থিরতা বেড়ে চলে। তা আরও স্পষ্ট হয়ে যায়, যখন সা'দ ইবনু মুআয (রদিয়াল্লাহু আনহু) উমরা করতে মক্কা যান। সাথে ছিলেন আবূ সফওয়ান উমাইয়া ইবনু খালাফ। দু'জনে কা'বা তওয়াফ করার সময় তাদের সাথে দেখা হয় আবূ জাহলের। সা'দকে দেখেই সে চিনতে পারে যে, ইনি ইসলাম কবুল করা একজন মদীনাবাসী। দাঁত কিড়মিড় করে বলে, “বাহ! আপনি তাহলে বিধর্মীদেরও আশ্রয় দিচ্ছেন, আবার মক্কায় এসে নিরাপদে ঘুরেও বেড়াচ্ছেন? আল্লাহর কসম! আবূ সফওয়ান আপনার সাথে না থাকলে আজ আপনি নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারতেন না।"

আবূ জাহলের হুমকি থেকে প্রমাণিত হয় যে, মুসলিমদের কা'বা থেকে দূরে রেখেই ক্ষান্ত হবে না তারা; বরং নিরস্ত্র কোনও মুসলিমকে পেলে হত্যা করতেও বদ্ধপরিকর।

এমনই আরও এক হুমকির নাম মদীনার ইয়াহুদি গোত্রগুলো। মদীনাবাসী গোত্রদ্বয় আওস ও খাযরাজের মাঝে পুরোনো শত্রুতা উসকে দিতে তারা সর্বাত্মক চেষ্টা চালায়। বিকাশমান মুসলিম সমাজ ভেতর-বাহির সব জায়গা থেকে শত্রুতার সম্মুখীন হতে থাকে। রক্তপাতের সম্ভাবনা এতই বেড়ে যায় যে, মুসলিমরা ঘুমোতেও যেতেন মাথার কাছে অস্ত্র রেখে। নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল হওয়ার আগ পর্যন্ত স্বয়ং রাসূলুল্লাহ -এর সাথেও থাকত সশস্ত্র দেহরক্ষী:

“আল্লাহই আপনাকে মানুষের হাত থেকে সুরক্ষিত রাখবেন।”

টিকাঃ
২৭০. আবু দাউদ, ৩০০৪।
২৭১. বুখারি, ৩৬৩২।
২৭২. সূরা মাইদা, ৫: ৬৭।

📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 লড়াইয়ের অনুমতি

📄 লড়াইয়ের অনুমতি


এ পর্যন্ত নবি ﷺ ও মুসলিমদের প্রতি নির্দেশ ছিল সকল অপমান-লাঞ্ছনা নীরবে সহ্য করার। কিন্তু এখন মুসলিমরা যথেষ্ট সুবিধাজনক অবস্থানে। সক্ষমতার এই পরিবর্তনে শত্রুপক্ষের তৎপরতা আরও বেড়ে যায়। অবশেষে অত্যাচারকারীদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের যুদ্ধ করার অনুমতি দেন আল্লাহ তাআলা। এই অনুমতি পরে আদেশে পরিণত হয়। অনুমতিটি অবতীর্ণ হয় ধাপে ধাপে।

১. প্রথমে অনুমতি দেওয়া হয় শুধু কুরাইশদের বিরুদ্ধে লড়তে। কারণ, এরাই মক্কায় মুসলিমদের প্রথম নিপীড়ক। তাদের মালামাল ছিনিয়ে নেওয়ার অধিকারও পান মুসলিমরা। তবে যেসব গোত্রের সাথে শান্তিচুক্তি আছে, তাদের সাথে এ আচরণ করা যাবে না।

২. কুরাইশদের সাথে মিত্রতাকারী অথবা সরাসরি মুসলিমদের অত্যাচারকারী অন্যান্য পৌত্তলিক গোত্রের বিরুদ্ধেও যুদ্ধের অনুমতি আসে।

৩. তারপর অনুমোদিত হয় চুক্তিভঙ্গকারী যেকোনও ইয়াহুদি গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এ ক্ষেত্রে তাদের সাথে চুক্তি এমনিতেই বাতিল বলে গণ্য হয়।

৪. এরপর আসে মুসলিমদের উত্ত্যক্তকারী ও নিপীড়নকারী আহলে কিতাব (খ্রিষ্টান ও ইয়াহুদি) জাতিগুলোর সাথে যুদ্ধের অনুমোদন। তবে আহলে কিতাবরা ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করে জিযইয়া কর পরিশোধে সম্মত হলে তাদের সাথে লড়াই করা যাবে না।

অবশেষে ইসলাম গ্রহণকারী যেকোনও মুশরিক, ইয়াহুদি বা খ্রিষ্টানের সাথে শান্তি স্থাপন করতে এবং তাদের জান-মালের অধিকার সংরক্ষণ করতে আদেশ করা হয় মুসলিমদের।

📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 যী কারাদ বা গাবার যুদ্ধ (মুহাররম, ৭ম হিজরি)

📄 যী কারাদ বা গাবার যুদ্ধ (মুহাররম, ৭ম হিজরি)


হুদাইবিয়ার চুক্তির পর কুরাইশদের শত্রুতার গোদ সেরে যায়। কিন্তু বিষফোঁড়া হয়ে টিকে থাকে ইয়াহুদি গোত্রগুলো। অহরহই তারা চুক্তি ভাঙতে থাকে। অন্যান্য গোত্রকেও মুসলিমদের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ হওয়ার জন্য ফুসলাতে থাকে। গোটা খাইবার এবং এর উত্তর দিকের এলাকাটি তাদের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়। এখান থেকেই পরিচালিত হতে থাকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে তাদের সকল ষড়যন্ত্র। নবি খাইবার আক্রমণ করার ঠিক তিন দিন আগে ছোট আরেকটি সংঘর্ষ বাধে। এটি গাবার যুদ্ধ নামে পরিচিত। সময়টি ছিল সপ্তম হিজরি সনের মুহাররম মাস।
উহুদের কাছে গাবা চারণভূমিতে রাসূল তাঁর উটগুলো পাঠান। নবিই-এর দাস রাবাহ এবং একজন রাখাল সাথে ছিল। আবূ তালহার ঘোড়ার পিঠে করে তাদের সাথে সালামা ইবনুল আকওয়া'ও ছিলেন। রদিয়াল্লাহু আনহুম।
এমন সময় অতর্কিতে আক্রমণ করে বসে আবদুর রহমান ইবনু উয়াইনা ফাযারি ও তার গুন্ডারা। রাখালকে হত্যা করে সবগুলো উট ছিনিয়ে নিয়ে যায় তারা। সালামা ইবনুল আকওয়া' ঘোড়াটি রাবাহকে দিয়ে মদীনায় দ্রুত সংবাদ পাঠান এবং নিজে একটি পাহাড়ে উঠে মদীনার দিকে ফিরে খুব উঁচু স্বরে তিনবার বিপদসংকেত দেন, “ইয়া সাবাহা!” তারপর চোরদের তির মারতে মারতে ধাওয়া করলেন। দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে একা হওয়া সত্ত্বেও গাইতে লাগলেন সামরিক সংগীত:
“ধর এটা! আমি হলাম পুত্র আকওয়া'র! আজ আমার হাত থেকে তোদের নেই নিস্তার।"
সালামা (রদিয়াল্লাহু আনহু) একটার পর একটা তির ছুড়ছিলেন। 'ধর এটা' বলে তিনি অবিরাম ধাবিত সে তিরগুলোকেই বুঝিয়েছেন। যখন কেউ ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে পাল্টা ধাওয়া করতে আসে তখন তিনি গাছের আড়ালে গিয়ে সেখান থেকে তির ছুড়ে মারেন। একসময় তারা পর্বতগিরির সংকীর্ণ রাস্তায় ঢুকে গেলে পাহাড়ের চূড়ার উঠে তিনি কয়েকটি পাথর গড়িয়ে তাদের গায়ে ফেলার ব্যবস্থা করেন।
সালামা ইবনুল আকওয়া' তাদের ধাওয়া করতেই থাকেন ফলে একসময় তারা সবগুলো উট ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু সালামার তির-বর্ষণ তাতে থামে না। বোঝা হালকা করতে নিজেদের ত্রিশটি কাপড় এবং ত্রিশটি বর্শাও ফেলে দেয় তারা। সালামা (রদিয়াল্লাহু আনহু) সবগুলোর ওপর ছোট ছোট পাথর চাপা দিয়ে চিহ্নিত করে রাখেন, যাতে পরে এসে সহজে খুঁজে পাওয়া যায়। তারপর আবারও ধাওয়া দেন দুর্বৃত্তদের।
চোরেরা এরপর একটি পর্বতগিরির সংকীর্ণ একটি বাঁকে বসে পড়ে। আর সালামা অপেক্ষায় থাকেন পাহাড়ের চূড়ায়। তাকে দেখতে পেয়ে চার জন এগিয়ে আসতে থাকে তাঁর দিকে। সালামা হাঁক ছাড়েন, “তোরা জানিস আমি কে? আমি সালামা ইবনুল আকওয়া'। তোদের সবক'টাকে আমি সহজেই ধরে ফেলতে পারি, তা যত জোরেই দৌড়াস না কেন। কিন্তু তোরা কখনও আমাকে ধরতে পারবি না।” হুমকি শুনে আগুয়ান চোরগুলো পিছিয়ে যায়।
একটু পরেই সালামা দেখতে পান দূরে গাছের আড়াল থেকে নবিজি -এর পাঠানো অশ্বারোহীরা দৌড়ে বেরিয়ে আসছেন। আখরাম, আবু কাতাদা, মিকদাদ (রদিয়াল্লাহু আনহুম) সবাইকে একে একে দেখা গেল। এবার আখরামের সাথে মুশরিক আবদুর রহমানের দ্বন্দ্বযুদ্ধ বাধে। আবদুর রহমানের ঘোড়াটিকে জখম করে দিতে পারলেও তার হাতে শহীদ হন আখরাম (রদিয়াল্লাহু আনহু)। সে পরে আখরামের ঘোড়াটি নিয়ে নেয়। আবু কাতাদা উঠে এসে বর্শার আঘাতে খতম করে জাহান্নামে পাঠান নরাধম আবদুর রহমানকে। পালের গোদাকে পটল তুলতে দেখে বাকি গুন্ডাবাহিনী লেজ তুলে পালাতে শুরু করে। মুসলিম অশ্বারোহীরা পিছু ধাওয়া করেন তাদের। এখনও দৌড়ে দৌড়ে তাদের সাথে আসছেন সালামা ইবনুল আকওয়া' (রদিয়াল্লাহু আনহু)!
সূর্যাস্তের একটু আগে যু-কারাদ পর্বতগিরিতে গিয়ে পৌঁছায় দুর্বৃত্তরা। সারাদিনের পরিশ্রমে তারা ক্লান্ত-বিধ্বস্ত, সেই সাথে প্রচণ্ড তৃষ্ণার্ত। কিন্তু জলাধারের কাছেও ঘেঁষতে পারছে না শুধু একটি সমস্যার কারণে-সালামার ছোড়া তির। সূর্যাস্তের পর ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে এসে সাহাবিদেরসহ সালামার সাথে সাক্ষাৎ করলেন নবি। সালামা (রদিয়াল্লাহু আনহু) আরজ করলেন, "নবিজি, ওদের দম ফুরিয়ে এসেছে। আমাকে স্রেফ এক শ জন লোক দিন। আমি তাদের তাদের পশুগুলোসহ আপনার কাছে হাযির করি।”
নবি বললেন, "আকওয়া'র পুত্র! জিতেছ তো তুমিই। এবার শত্রুদের একটু দয়া করো। এরপর বললেন, "এখন তাদের বানু গতফানে মেহমানদারী করানো হচ্ছে।”
সেদিনের দুর্দান্ত বীরত্বের কারণে রাসূল সালামা ইবনুল আকওয়া' (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে পদাতিক ও অশ্বারোহী দুই দলেরই মর্যাদা দেওয়া হয় এবং দুটি অংশই তাঁকে দেওয়া হয়। স্বয়ং নবিজির পেছনে ফিরতি যাত্রায় 'আদবা' উটের পিঠে বসার সৌভাগ্যও লাভ করেন তিনি। একদম কাছ থেকে শোনেন নবিজির ঘোষণা, “আজকের সেরা ঘোড়সওয়ার আবু কাতাদা, আর সেরা পদাতিক সালামা ইবনুল আকওয়া'।”
নবি এই যুদ্ধে বের হওয়ার সময় মদীনার দায়িত্ব ইবনু উম্মি মাকতুম (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে দিয়েছিলেন। আর পতাকা বাহক ছিল মিকদাদ (রদিয়াল্লাহু আনহু)।

টিকাঃ
[৪১৬] বুখারি, ৩০৪১; মুসলিম, ১৮০৬, ১৮০৭; যাদুল মাআদ, ২/১৩৩।

📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 কাযা উমরা পালন (যুল-কা'দা, ৭ম হিজরি)

📄 কাযা উমরা পালন (যুল-কা'দা, ৭ম হিজরি)


হুদাইবিয়া চুক্তির পর এক বছর কেটে গেছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী মুসলিমরা এবার নির্বিঘ্নে উমরা করতে পারবেন। আবূ রুহম কুলসুম ইবনুল হুসাইন গিফারি (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাতে মদীনার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে নবি মক্কাভিমুখে যাত্রা করেন। নাজিয়া ইবনু জুনদুব আসলামি (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর তত্ত্বাবধানে আছে নবিজির কুরবানির ষাটটি উট। কুরাইশদের বিশ্বাসঘাতকতার কোনও ঠিক-ঠিকানা নেই। তাই সতর্কতাবশত মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর তত্ত্বাবধানে রেখেছেন অস্ত্রশস্ত্রসহ একশটি ঘোড়া।
যুল হুলাইফায় এসে সাহাবিরা ইহরাম বেঁধে নেন। নবি -এর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়, “লাব্বাইক! আল্লাহুম্মা লাব্বাইক!” সহস্র কণ্ঠে তা প্রতিধ্বনিত করেন সাহাবিগণ। শুরু হলো আল্লাহর ঘরে যাত্রার আনুষ্ঠানিকতা। 'ইয়াজাজ' উপত্যকায় পৌঁছে উমরাযাত্রীরা নিরস্ত্র হন। আওস ইবনু খাওলা আনসারি (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নেতৃত্বে দুই শ জনের একটি দলের কাছে অস্ত্রশস্ত্র জমা থাকে। পেছনে অবস্থান করে উমরাকারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভাল করবেন তারা। মক্কার কাছাকাছি এসে পৌঁছানোর সময় উমরা পালনকারীদের প্রত্যেকের কাছে থাকে একটিমাত্র কোষবদ্ধ তরবারি।
হুদাইবিয়া চুক্তির শর্তে এমনটিই বলা ছিল। 'হাজন' হয়ে 'কাদা' দিয়ে শহরে প্রবেশ করেন তারা। মুখে লাব্বাইক ধ্বনি আর চতুষ্পার্শ্বে তরবারিধারী সাহাবিদের নিয়ে কাসওয়া উটের পিঠে করে মক্কায় ঢোকেন নবি। সবার গন্তব্য কা'বা। উটনীর পিঠে বসেই নবি ﷺ একটি লাঠি দিয়ে হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করেন এবং ওভাবেই কা'বার তওয়াফ করেন। তাঁর সাথে সাথে সব মুসলিমরাও তওয়াফ করেন।
ডান কাঁধ উন্মুক্ত রেখে সবার ইহরাম বাঁধা। উদ্দেশ্য বীরত্ব প্রদর্শন। আল্লাহর পবিত্র ঘরে এক আল্লাহরই উপাসনার অধিকার আদায় করে নিয়েছেন তারা, তাও মুশরিকদের একদম চোখের সামনে দিয়ে।
নবিজি -এর সামনে সামনে চলছেন আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা (রদিয়াল্লাহু আনহু)। কাঁধে ঝোলানো তরবারি আর মুখে আবৃত্তি:
'কাফিরজাদারা, সরে দাঁড়া! জায়গা ছেড়ে দে! মর্যাদা আজ নবিজির, চোখ মেলে দেখে নে! আগেও তোদের মেরেছি যাঁহার ঐশী আদেশে, আজও তোদের মারব তাঁরই মহান নির্দেশে। চরম আঘাতে ফাটিয়ে দেবো তোদের মাথার খুলি, আঘাতের চোটে বন্ধুকে আজ বন্ধুও যাবে ভুলি।'
কা'বার উত্তরে 'কুআইকিআন' পাহাড়ে বসে মুশরিকরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল নবাগতদের। অনিচ্ছা সত্ত্বেও চোখে প্রশংসা। এতদিন শুনে এসেছিল যে, ইসলাম নামক ধর্মটার অনুসারীরা কতগুলো জীর্ণ-শীর্ণ-দুর্বল লোক। ইয়াসরিবের বৈরী আবহাওয়ায় সারাক্ষণ রোগ-শোকে ভোগে। কিন্তু আজ নিজেদের চোখে দেখছে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্য!
এরা যে শক্তপোক্ত, উন্নত শিরের যোদ্ধা! মক্কার সবচেয়ে সুঠাম লোকগুলোর সমানে সমান।
নবিজি -এর বুদ্ধিটি কাজে দিয়েছে। কুরাইশদের মন-মেজাজ সম্পর্কে ভালো করেই জানতেন তিনি। তাই আগেই সাহাবিদের নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন, যেন তওয়াফের সময় জোরে জোরে দৌড়ায় সবাই। এতে মুশরিকরা স্বচক্ষে দেখবে মুসলিমদের শক্তি-সামর্থ্য। তবে ইয়েমেনি খুঁটি এবং হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী অংশটিতে দৌড়াতে হবে না। এটি দক্ষিণ দিকে, মুশরিকদের দৃষ্টিসীমার বাইরে অবস্থিত।
তওয়াফ শেষে সাফা-মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মাঝে সাঈ করেন নবি ﷺ। সাতবার সাঈ শেষে মারওয়ায় এসে পশু কুরবানি করেন। তারপর মাথার চুল কামিয়ে নেন। সাহাবিরাও তাঁর অনুকরণে একই কাজ সম্পাদন করেন। রাসূল ﷺ তারপর কয়েকজনকে ইয়াজাজে পাঠিয়ে দেন। যারা অস্ত্রশস্ত্র দেখভালের দায়িত্বে ছিল, তারা এসে এখন উমরা সম্পাদন করবে; আর নতুন এই দলটি গিয়ে অস্ত্রাগারের দায়িত্ব নেবে।
মুসলিমরা তিন দিন অবস্থান করেন মক্কায়। এর মধ্যে মাইমূনা বিনতুল হারিস হিলালিয়্যা (রদিয়াল্লাহু আনহা)-কে বিয়ে করেন নবি ﷺ। তিনি হামযা ইবনু আবদিল মুত্তালিব (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর স্ত্রী ছিলেন। আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর ফুপু। নবি ﷺ তাকে প্রস্তাব পাঠালে তিনি তা আব্বাসকে জানান। আব্বাস তখন এই শুভকাজটি সম্পাদন করার যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। নবি ﷺ সে সময় 'হালাল' অবস্থায় ছিলেন। কারণ, তিনি মক্কায় প্রবেশ করে সর্বপ্রথম উমরা করেন তারপর হালাল হয়ে যান এবং হালাল অবস্থাতেই থাকেন।
চতুর্থ দিনের সকালে নবি ﷺ ফিরতি যাত্রা শুরু করেন মদীনা অভিমুখে। মক্কা থেকে নয় মাইল দূরে 'সারিফ' নামক স্থানে প্রথম যাত্রাবিরতি হয়। আর ওখানেই তাঁর কাছে বধূবেশে প্রেরিত হন মাইমূনা (রদিয়াল্লাহু আনহা)। আল্লাহর এমনই ইচ্ছে, পরিণয়ের স্থানই তার প্রয়াণের স্থান হিসেবে নির্ধারিত ছিল।
মদীনায় ফিরে পুনরায় প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত হন রাসূল ﷺ। প্রেরণ করেন কয়েকটি সশস্ত্র অভিযান। তার মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি হলো মৃতা এবং যাতুস সালাসিল অভিযান।

টিকাঃ
[৪৪০] ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি, ৭/৫০০; যাদুল মাআদ, ২/১৫১।
[৪৪১] বুখারি, ১৫৭৫।
[৪৪২] বুখারি, ১৬০০।
[৪৪৩] তিরমিযি, ২৮৪৭।
[৪৪৪] বুখারি, ১৬০২।
[৪৪৫] বুখারি, ৪২৫৭।
[৪৪৬] বুখারি, ১৮৩৭।
[৪৪৭] বুখারি, ৪২৫১।
[৪৪৮] বুখারি, ৫০৬৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00