📄 গুহায় তিন রাত
ওদিকে সাওর পর্বতের গুহায় আবূ বকর আগে প্রবেশ করলেন। নবিজি কষ্ট পেতে পারেন, এমন কোনও জিনিস থাকলে আগেই যাতে সরিয়ে ফেলা যায়। কয়েকটি গর্ত দেখতে পেয়ে কাপড়ের টুকরো দিয়ে বন্ধ করে দিলেন সেগুলো। এরপর রাসূল ﷺ ভেতরে প্রবেশ করলেন। ক্লান্তি কাটাতে ঘুমিয়ে পড়লেন আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ঊরুতে মাথা রেখে। হঠাৎ তাঁর পায়ে কিছু একটা দংশন করল। বিষের তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে। কিন্তু প্রিয় নবির ঘুম ভেঙে যাবে বলে একটু নড়লেনও না তিনি। একসময় ব্যথার তীব্রতা এত বেড়ে গেল যে, নিজের অজান্তেই চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এক ফোঁটা নবিজির মুখমণ্ডলে পড়ামাত্রই ঘুম ভেঙে যায় তাঁর। দেখলেন সফরসঙ্গী বিষের ব্যথায় নীল হয়ে আছেন। দংশিত জায়গাটিতে রাসূল ﷺ নিজের লালা লাগিয়ে দিতেই ব্যথা উধাও।
টানা তিন রাত গুহায় লুকিয়ে থাকলেন দু'জনে। এ-সময়টিতে আবূ বকরের ছেলে আবদুল্লাহ কাছেই এক জায়গায় রাত্রিযাপন করতেন। তারপর ভোরবেলা এমন সময় মক্কায় ফিরে যেতেন যে, কুরাইশরা টেরই পেত না, তিনি অন্য কোথাও রাত কাটিয়ে এসেছেন। চটপটে এই তরুণ প্রতিদিন মক্কায় কুরাইশদের অপতৎপরতা সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করতেন। আর রাতের বেলা খবর পৌঁছে দিতেন নবি ও আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে।
আবূ বকরের দাস আমির ইবনু ফুহাইরা (রদিয়াল্লাহু আনহু) রাতের একাংশ অতিবাহিত হলে পরে গুহার কাছেই মনিবের ছাগলগুলো নিয়ে চরাতেন। ফলে প্রতিদিন পুষ্টিকর দুধের জোগান পেতে থাকেন গুহাবাসীদ্বয়। পরদিন একদম সকাল সকাল ছাগলগুলোকে একই পথ ধরে মক্কায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতেন আমির। ফলে বালুতে থাকা আবূ বকরের ছেলের পায়ের চিহ্নও ঢাকা পড়ে যেত।
এদিকে কুরাইশের অনুসন্ধানী দলগুলো মক্কা থেকে দক্ষিণের পুরো এলাকা খোঁজাখুঁজি করে উল্টে ফেলে। একবার তারা ওই গুহার একদম মুখের কাছে চলে এসেছিল। স্রেফ একবার কিনারে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকালেই পেয়ে যেত শিকারদের। কুরাইশদের এত কাছে চলে আসতে দেখে আবূ বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বেশ দুশ্চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন এবং ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। নবি ﷺ আশ্বস্ত করে বলেন, “আবূ বকর, এমন দু'জনের ব্যাপারে তোমার কী ধারণা যাদের তৃতীয়জন হলেন, আল্লাহ। চিন্তা কোরো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে রয়েছেন।”
টিকাঃ
[২৪৪] তিবরিযি, মিশকাতুল মাসাবীহ, ৬০২৫।
[২৪৫] বুখারি, ৩৯০৫।
[২৪৬] বুখারি, ৩৬৫৩।
ওদিকে সাওর পর্বতের গুহায় আবূ বকর আগে প্রবেশ করলেন। নবিজি কষ্ট পেতে পারেন, এমন কোনও জিনিস থাকলে আগেই যাতে সরিয়ে ফেলা যায়। কয়েকটি গর্ত দেখতে পেয়ে কাপড়ের টুকরো দিয়ে বন্ধ করে দিলেন সেগুলো। এরপর রাসূল ﷺ ভেতরে প্রবেশ করলেন। ক্লান্তি কাটাতে ঘুমিয়ে পড়লেন আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ঊরুতে মাথা রেখে। হঠাৎ তাঁর পায়ে কিছু একটা দংশন করল। বিষের তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে। কিন্তু প্রিয় নবির ঘুম ভেঙে যাবে বলে একটু নড়লেনও না তিনি। একসময় ব্যথার তীব্রতা এত বেড়ে গেল যে, নিজের অজান্তেই চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এক ফোঁটা নবিজির মুখমণ্ডলে পড়ামাত্রই ঘুম ভেঙে যায় তাঁর। দেখলেন সফরসঙ্গী বিষের ব্যথায় নীল হয়ে আছেন। দংশিত জায়গাটিতে রাসূল ﷺ নিজের লালা লাগিয়ে দিতেই ব্যথা উধাও।
টানা তিন রাত গুহায় লুকিয়ে থাকলেন দু'জনে। এ-সময়টিতে আবূ বকরের ছেলে আবদুল্লাহ কাছেই এক জায়গায় রাত্রিযাপন করতেন। তারপর ভোরবেলা এমন সময় মক্কায় ফিরে যেতেন যে, কুরাইশরা টেরই পেত না, তিনি অন্য কোথাও রাত কাটিয়ে এসেছেন। চটপটে এই তরুণ প্রতিদিন মক্কায় কুরাইশদের অপতৎপরতা সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করতেন। আর রাতের বেলা খবর পৌঁছে দিতেন নবি ﷺ ও আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে।
আবু বকরের দাস আমির ইবনু ফুহাইরা (রদিয়াল্লাহু আনহু) রাতের একাংশ অতিবাহিত হলে পরে গুহার কাছেই মনিবের ছাগলগুলো নিয়ে চরাতেন। ফলে প্রতিদিন পুষ্টিকর দুধের জোগান পেতে থাকেন গুহাবাসীদ্বয়। পরদিন একদম সকাল সকাল ছাগলগুলোকে একই পথ ধরে মক্কায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতেন আমির। ফলে বালুতে থাকা আবূ বকরের ছেলের পায়ের চিহ্নও ঢাকা পড়ে যেত।
এদিকে কুরাইশের অনুসন্ধানী দলগুলো মক্কা থেকে দক্ষিণের পুরো এলাকা খোঁজাখুঁজি করে উল্টে ফেলে। একবার তারা ওই গুহার একদম মুখের কাছে চলে এসেছিল। স্রেফ একবার কিনারে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকালেই পেয়ে যেত শিকারদের। কুরাইশদের এত কাছে চলে আসতে দেখে আবূ বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বেশ দুশ্চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন এবং ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। নবি ﷺ আশ্বস্ত করে বলেন, “আবূ বকর, এমন দু'জনের ব্যাপারে তোমার কী ধারণা যাদের তৃতীয়জন হলেন, আল্লাহ। চিন্তা কোরো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে রয়েছেন।”
টিকাঃ
২৪৪. তিবরিযি, মিশকাতুল মাসাবীহ, ৬০২৫।
২৪৫. বুখারি, ৩৯০৫।
২৪৬. বুখারি, ৩৬৫৩।
📄 মদীনার পথে
রবীউল আউয়াল মাস। সোমবার রাত। চারিদিকে জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধ আলো। আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর উট দুটি নিয়ে সাওর গুহার কাছে এসে হাজির হন আবদুল্লাহ ইবনু উরাইকিত লাইসি। সাথে ছিলেন আমির ইবনু ফুহাইরা। পথপ্রদর্শক প্রথমে তাঁদের নিয়ে দক্ষিণে ইয়েমেনের দিকে কিছুদূর যান। তারপর পশ্চিমে লোহিত সাগর অভিমুখে চলেন। সাগরের একটু আগেই আবার ঘুরে যান উত্তর দিকে ইয়াসরিব বরাবর। এই ঘুরপথটিতে খুব বেশি মানুষজন চলাচল করে না।
সারা রাত ও পরের দিনের অর্ধকাল পর্যন্ত একটানা চলার পর যাত্রাবিরতি করেন তাঁরা। নবি ﷺ একটি পাথরের ছায়ায় বিশ্রাম নেন। এদিকে এক রাখালের অনুমতি নিয়ে ছাগলের দুধ সংগ্রহ করে আনেন আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)। রাসূলের ঘুম ভাঙলে তাঁকে তা পান করতে দেন। তৃপ্তিসহকারে পানাহার শেষে পুনরায় যাত্রা আরম্ভ করেন।
সম্ভবত দ্বিতীয় দিনের ঘটনা। মক্কা থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে মুশাল্লালের কাছে 'কাদীদ' শহরতলিতে উম্মু মা'বাদের তাঁবু অতিক্রম করেন আল্লাহর রাসূল ﷺ ও আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)। মহিলাটিকে জিজ্ঞেস করেন, চার জন ক্লান্ত পথিকের জন্য কিছু আছে কি না। কিন্তু না কিছুই নেই। উম্মু মা'বাদের ছাগলের পালও তখন বহু দূরের মাঠে। যেই একটি ছোট ছাগী রয়ে গেছে, সেটি এতই দুর্বল যে বাকিদের সাথে যেতে পারেনি। সেটি এক ফোঁটা দুধ দিতেও সক্ষম নয়।
নবি অনুমতি নিয়ে সেই দুর্বল ছোটো ছাগীটিরই দুধ দোহাতে থাকেন। মু'জিযাস্বরূপ সেই ছাগীর ওলান এমনভাবে দুধে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে যে, বড় একটি পাত্র ভর্তি হয়ে যায়। চার পথিকই পেট পুরে দুধপান করেন। তারপর নবিজি আবারও দোহন করে আরও এক পাত্রভর্তি দুধ রেখে যান উম্মু মা'বাদের জন্য।
পথিকেরা চলে যাবার পর ফেরেন ঘরের কর্তা আবূ মা’বাদ। স্বামীর কাছে পুরো ঘটনার বর্ণনা দিলেন স্ত্রী। নবিজি ﷺ-এর এমন পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা শুনে আবূ মা'বাদ বলেন, “আরে! ইনি তো কুরাইশ বংশের সেই লোক, যার কথা কিছুদিন যাবৎ শুনে আসছি। কখনও সুযোগ পেলে অবশ্যই তাঁর অনুসারী হয়ে যাব।”
নবিজি ﷺ-এর মক্কাত্যাগের তৃতীয় দিনে এক অদৃশ্য কণ্ঠ মক্কায় ঘুরে ঘুরে কিছু কথা বলতে থাকে। এ মানুষের কণ্ঠ নয়; বরং একজন জিনের। সে বলছিল,
“মানবজাতির প্রতিপালক আল্লাহ তাআলা ওই দুই পথচারীকে রহম করুন। তারা উম্মু মা'বাদের তাঁবু পার হয়েছে। নিরাপদ যাত্রাবিরতি শেষে নিরাপদেই আবার পথচলা শুরু করেছে। যে-ই মুহাম্মাদের বন্ধু হয়, সে-ই সাফল্য পায়। হে কুরাইশ, মুহাম্মাদকে তাড়িয়ে দিয়ে তোমরা মর্যাদা আর ক্ষমতাকে দূরে ঠেলে দিলে। বানু কা'বের কী সৌভাগ্য! তাদের এক নারীর তাঁবু স্বয়ং মুহাম্মাদের আশ্রয় হয়েছে। নারীটিকে জিজ্ঞেস করো তার দুর্বল ছাগী আর দুধের পাত্রের ব্যাপারে। এমনকি সেই ছাগীও জানিয়ে দেবে কী ঘটেছে তার সাথে।”
নবি ﷺ এবং তাঁর সঙ্গীরা 'কাদীদ' ছেড়ে বেরুনোর সময় সুরাকা ইবনু মালিক ইবনি জু'শুম মুদলিজি নামের এক ব্যক্তি তাঁদের দেখে ফেলেন। পলাতকদের ধরে মক্কায় নিয়ে গিয়ে পুরস্কার পাবার লোভ জেগে ওঠে তার মনে। ঘোড়া ছুটিয়ে একটু এগোনো-মাত্রই প্রাণীটি পা হড়কে মাটিতে পড়ে যায়। সেও নিচে আছড়ে পড়ে। আরবের কুসংস্কার অনুযায়ী একটি তির বের করে ভাগ্য পরীক্ষা করল সুরাকা। ফলাফল এল নেতিবাচক। কিন্তু পুরস্কারের লোভে কুলক্ষণকে পাত্তা না দিয়েই আবার ঘোড়ায় চেপে বসল সে। এবার ঘোড়াটি এত দূর নিরাপদে দৌড়ে গেল যে, নবিজি ﷺ-এর কুরআন তিলাওয়াত সুরাকার কানে আসতে থাকে। এদিকে আবূ বকর বারবার পেছনে তাকাচ্ছেন আর উসখুস করছেন। অথচ নবিজি একেবারে নির্লিপ্ত। একটু পরেই ঘোড়ার সামনের পা দুটো একেবারে বালুতে দেবে গেল। আবারও উল্টে পড়ল আরোহী।
ঘোড়াকে গালি দিতে দিতে কোনোরকমে তার পা মাটি থেকে বের করে আনল সুরাকা। কিন্তু পেছনে তাকাতেই দেখল যে, ঘোড়ার পদচিহ্ন থেকে ধোঁয়ার মতো ওপরের দিকে উঠছে বালু। তাড়াতাড়ি আরেকটি তির বের করে এবারও ভাগ্যকে প্রতিকূলে পেল। অবশেষে তার মন মেনে নিল যে, মুহাম্মাদ ﷺ-কে বন্দি করা অসম্ভব। নিজে থেকেই নবিজিকে ডাক দিয়ে আত্মসমর্পণ করে। খাবারও সাধে পথিকদের। তবে তাঁরা সেটা নেননি। তবে নবি ﷺ এতটুকু অনুরোধ রাখতে বললেন, যাতে কুরাইশদের তাঁদের অবস্থান না জানানো হয়। সুরাকা তাতে রাজি হয়। ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য সে একটি চুক্তিনামা লিখে দেওয়ার অনুরোধ করে। নবিজির নির্দেশে চামড়ার একটি টুকরায় চিঠিটি লিখে দেন আমির। সুরাকা তারপর মক্কায় ফিরে যান। অনুসন্ধানী প্রতিটি দলকে এই বলে ফিরিয়ে দেন যে, এই পুরো এলাকা তিনি ইতিমধ্যে খোঁজ করে ফেলেছেন, তাদের যে উদ্দেশ্য তা তিনিই সম্পূর্ণ করেছেন।
চার পথিকই যাত্রা পুনরারম্ভ করেন। একটু পরেই নবিজি ﷺ-এর দেখা হয় বুরাইদা ইবনু হুসাইব আসলামি ও তার অনুসারী প্রায় সত্তর-আশিটি পরিবারের সাথে। তারা সবাই ইসলাম কবুল করে নবিজির পেছনে ইশার সালাত আদায় করেন। উহুদের যুদ্ধের পর মদীনায় হিজরত করেন বুরাইদা।
‘আরজ' অঞ্চলে নবিজির সাথে আরও দেখা হয় আবূ তামিম আওস ইবনু হাজর আসলামির। একটি উট দুর্বল হয়ে পড়ায় তখন নবি ও আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) একই উটের পিঠে ছিলেন। আবূ তামিম তাঁদের একটি উট দেন এবং মাসঊদ ইবনু হুনাইদা নামক এক দাসকেও সাথে পাঠিয়ে দেন। একেবারে ইয়াসরিব পর্যন্ত দাসটি তাঁদের সঙ্গ দেয়। আবূ তামিম মুসলিম হলেও হিজরত না করে নিজভূমে রয়ে যান। পরে উহুদের যুদ্ধের সময় মাসউদের মাধ্যমে মক্কার খবরাখবর আগাম মদীনায় পাঠিয়ে মুসলিম সেনাবাহিনীর বিরাট উপকার করেন তিনি।
রীম উপত্যকায় পৌঁছে নবি যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর দেখা পান। তিনি সিরিয়াফেরত একটি ব্যবসায়ী কাফেলাকে সঙ্গ দিচ্ছিলেন। কাফেলাটি মুসলিমদেরই। নবি ﷺ ও আবূ বকরকে তিনি সাদা রঙের কাপড় উপহার দেন।
টিকাঃ
[২৪৭] বুখারি, ৩৬১৫।
[২৪৮] ইবনুল কাইয়িম, যাদুল মাআদ, ২/৫৩-৫৪; হাকিম, আল-মুসতাদরাক, ৩/৯-১০।
[২৪৯] বুখারি, ৩৯০৬।
[২৫০] ইবনুল আসীর, উসদুল গাবাহ, ১/২০৯।
[২৫১] ইবনুল আসীর, উসদুল গাবাহ, ১/১৭৩; ইবনু হিশাম, ১/৪৯১।
[২৫২] বুখারি, ৩৯০৬।
রবীউল আউয়াল মাস। সোমবার রাত। চারিদিকে জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধ আলো। আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর উট দুটি নিয়ে সাওর গুহার কাছে এসে হাজির হন আবদুল্লাহ ইবনু উরাইকিত লাইসি। সাথে ছিলেন আমির ইবনু ফুহাইরা। পথপ্রদর্শক প্রথমে তাঁদের নিয়ে দক্ষিণে ইয়েমেনের দিকে কিছুদূর যান। তারপর পশ্চিমে লোহিত সাগর অভিমুখে চলেন। সাগরের একটু আগেই আবার ঘুরে যান উত্তর দিকে ইয়াসরিব বরাবর। এই ঘুরপথটিতে খুব বেশি মানুষজন চলাচল করে না।
সারা রাত ও পরের দিনের অর্ধকাল পর্যন্ত একটানা চলার পর যাত্রাবিরতি করেন তাঁরা। নবি ﷺ একটি পাথরের ছায়ায় বিশ্রাম নেন। এদিকে এক রাখালের অনুমতি নিয়ে ছাগলের দুধ সংগ্রহ করে আনেন আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)। রাসূলের ঘুম ভাঙলে তাঁকে তা পান করতে দেন। তৃপ্তিসহকারে পানাহার শেষে পুনরায় যাত্রা আরম্ভ করেন।
সম্ভবত দ্বিতীয় দিনের ঘটনা। মক্কা থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে মুশাল্লালের কাছে 'কাদীদ' শহরতলিতে উন্মু মা'বাদের তাঁবু অতিক্রম করেন আল্লাহর রাসূল ﷺ ও আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)। মহিলাটিকে জিজ্ঞেস করেন, চার জন ক্লান্ত পথিকের জন্য কিছু আছে কি না। কিন্তু না কিছুই নেই। উম্মু মা'বাদের ছাগলের পালও তখন বহু দূরের মাঠে। যেই একটি ছোট ছাগী রয়ে গেছে, সেটি এতই দুর্বল যে বাকিদের সাথে যেতে পারেনি। সেটি এক ফোঁটা দুধ দিতেও সক্ষম নয়।
নবি ﷺ অনুমতি নিয়ে সেই দুর্বল ছোটো ছাগীটিরই দুধ দোহাতে থাকেন। মু'জিযাস্বরূপ সেই ছাগীর ওলান এমনভাবে দুধে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে যে, বড় একটি পাত্র ভর্তি হয়ে যায়। চার পথিকই পেট পুরে দুধপান করেন। তারপর নবিজি আবারও দোহন করে আরও এক পাত্রভর্তি দুধ রেখে যান উম্মু মা'বাদের জন্য।
পথিকেরা চলে যাবার পর ফেরেন ঘরের কর্তা আবূ মা’বাদ। স্বামীর কাছে পুরো ঘটনার বর্ণনা দিলেন স্ত্রী। নবিজি ﷺ -এর এমন পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা শুনে আবূ মা'বাদ বলেন, “আরে! ইনি তো কুরাইশ বংশের সেই লোক, যার কথা কিছুদিন যাবৎ শুনে আসছি। কখনও সুযোগ পেলে অবশ্যই তাঁর অনুসারী হয়ে যাব।”
নবিজি ﷺ -এর মক্কাত্যাগের তৃতীয় দিনে এক অদৃশ্য কণ্ঠ মক্কায় ঘুরে ঘুরে কিছু কথা বলতে থাকে। এ মানুষের কণ্ঠ নয়; বরং একজন জিনের। সে বলছিল,
“মানবজাতির প্রতিপালক আল্লাহ তাআলা ওই দুই পথচারীকে রহম করুন। তারা উম্মু মা'বাদের তাঁবু পার হয়েছে। নিরাপদ যাত্রাবিরতি শেষে নিরাপদেই আবার পথচলা শুরু করেছে। যে-ই মুহাম্মাদের বন্ধু হয়, সে-ই সাফল্য পায়। হে কুরাইশ, মুহাম্মাদকে তাড়িয়ে দিয়ে তোমরা মর্যাদা আর ক্ষমতাকে দূরে ঠেলে দিলে। বানু কা'বের কী সৌভাগ্য! তাদের এক নারীর তাঁবু স্বয়ং মুহাম্মাদের আশ্রয় হয়েছে। নারীটিকে জিজ্ঞেস করো তার দুর্বল ছাগী আর দুধের পাত্রের ব্যাপারে। এমনকি সেই ছাগীও জানিয়ে দেবে কী ঘটেছে তার সাথে।”
নবি ﷺ এবং তাঁর সঙ্গীরা 'কাদীদ' ছেড়ে বেরুনোর সময় সুরাকা ইবনু মালিক ইবনি জু'শুম মুদলিজি নামের এক ব্যক্তি তাঁদের দেখে ফেলেন। পলাতকদের ধরে মক্কায় নিয়ে গিয়ে পুরস্কার পাবার লোভ জেগে ওঠে তার মনে। ঘোড়া ছুটিয়ে একটু এগোনো-মাত্রই প্রাণীটি পা হড়কে মাটিতে পড়ে যায়। সেও নিচে আছড়ে পড়ে। আরবের কুসংস্কার অনুযায়ী একটি তির বের করে ভাগ্য পরীক্ষা করল সুরাকা। ফলাফল এল নেতিবাচক। কিন্তু পুরস্কারের লোভে কুলক্ষণকে পাত্তা না দিয়েই আবার ঘোড়ায় চেপে বসল সে। এবার ঘোড়াটি এত দূর নিরাপদে দৌড়ে গেল যে, নবিজি ﷺ -এর কুরআন তিলাওয়াত সুরাকার কানে আসতে থাকে। এদিকে আবূ বকর বারবার পেছনে তাকাচ্ছেন আর উসখুস করছেন। অথচ নবিজি একেবারে নির্লিপ্ত। একটু পরেই ঘোড়ার সামনের পা দুটো একেবারে বালুতে দেবে গেল। আবারও উল্টে পড়ল আরোহী।
ঘোড়াকে গালি দিতে দিতে কোনোরকমে তার পা মাটি থেকে বের করে আনল সুরাকা। কিন্তু পেছনে তাকাতেই দেখল যে, ঘোড়ার পদচিহ্ন থেকে ধোঁয়ার মতো ওপরের দিকে উঠছে বালু। তাড়াতাড়ি আরেকটি তির বের করে এবারও ভাগ্যকে প্রতিকূলে পেল। অবশেষে তার মন মেনে নিল যে, মুহাম্মাদ ﷺ -কে বন্দি করা অসম্ভব। নিজে থেকেই নবিজিকে ডাক দিয়ে আত্মসমর্পণ করে। খাবারও সাধে পথিকদের। তবে তাঁরা সেটা নেননি। তবে নবি ﷺ এতটুকু অনুরোধ রাখতে বললেন, যাতে কুরাইশদের তাঁদের অবস্থান না জানানো হয়। সুরাকা তাতে রাজি হয়। ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য সে একটি চুক্তিনামা লিখে দেওয়ার অনুরোধ করে। নবিজির নির্দেশে চামড়ার একটি টুকরায় চিঠিটি লিখে দেন আমির।
সুরাকা তারপর মক্কায় ফিরে যান। অনুসন্ধানী প্রতিটি দলকে এই বলে ফিরিয়ে দেন যে, এই পুরো এলাকা তিনি ইতিমধ্যে খোঁজ করে ফেলেছেন, তাদের যে উদ্দেশ্য তা তিনিই সম্পূর্ণ করেছেন।
চার পথিকে যাত্রা পুনরারম্ভ করেন। একটু পরেই নবিজি ﷺ -এর দেখা হয় বুরাইদা ইবনু হুসাইব আসলামি ও তার অনুসারী প্রায় সত্তর-আশিটি পরিবারের সাথে। তারা সবাই ইসলাম কবুল করে নবিজির পেছনে ইশার সালাত আদায় করেন। উহুদের যুদ্ধের পর মদীনায় হিজরত করেন বুরাইদা।
‘আরজ' অঞ্চলে নবিজির সাথে আরও দেখা হয় আবূ তামিম আওস ইবনু হাজর আসলামির। একটি উট দুর্বল হয়ে পড়ায় তখন নবি ﷺ ও আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) একই উটের পিঠে ছিলেন। আবূ তামিম তাঁদের একটি উট দেন এবং মাসঊদ ইবনু হুনাইদা নামক এক দাসকেও সাথে পাঠিয়ে দেন। একেবারে ইয়াসরিব পর্যন্ত দাসটি তাঁদের সঙ্গ দেয়। আবূ তামিম মুসলিম হলেও হিজরত না করে নিজভূমে রয়ে যান। পরে উহুদের যুদ্ধের সময় মাসউদের মাধ্যমে মক্কার খবরাখবর আগাম মদীনায় পাঠিয়ে মুসলিম সেনাবাহিনীর বিরাট উপকার করেন তিনি।
রীম উপত্যকায় পৌঁছে নবি ﷺ যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর দেখা পান। তিনি সিরিয়াফেরত একটি ব্যবসায়ী কাফেলাকে সঙ্গ দিচ্ছিলেন। কাফেলাটি মুসলিমদেরই। নবি ﷺ ও আবূ বকরকে তিনি সাদা রঙের কাপড় উপহার দেন।
টিকাঃ
২৪৭. বুখারি, ৩৬১৫।
২৪৮. ইবনুল কাইয়িম, যাদুল মাআদ, ২/৫৩-৫৪; হাকিম, আল-মুসতাদরাক, ৩/৯-১০।
২৪৯. বুখারি, ৩৯০৬।
২৫০. ইবনুল আসীর, উসদুল গাবাহ, ১/২০৯।
২৫১. ইবনুল আসীর, উসদুল গাবাহ, ১/১৭৩; ইবনু হিশাম, ১/৪৯১।
২৫২. বুখারি, ৩৯০৬।
📄 কুবায় আগমন
নুবুওয়াত লাভের চৌদ্দ বছর পর এক সোমবারে ইয়াসরিবের প্রান্তে কুবা নামক স্থানে এসে পৌঁছান নবি ﷺ। এই ইয়াসরিবের নাম পাল্টেই পরবর্তী সময়ে রাখা হয় আল-মদীনাতুল মুনাওয়ারা (আলোকিত শহর)।
মদীনাবাসীরা প্রতিদিন বেরিয়ে পড়ত হাররার উদ্দেশ্যে। দিবসের উত্তাপ অসহ্য হয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত সেখানেই নবিজির জন্য অপেক্ষায় থাকত তারা। তাদের এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে সেই পরমাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিটি এসে হাজির হন তাদের মাঝে। সাদা পোশাক পরা এই অভিযাত্রী দলটি বেশ দূর থেকে নজর কাড়ে এক ইয়াহুদির। সে ডাক দিয়ে বলে, “এই যে আরবরা! তোমরা যার অপেক্ষায় ছিলে, সে চলে এসেছে!”
মুসলিমরা হুড়মুড় করে দৌড়ে আসেন নবিজি ﷺ-কে বরণ করে নিতে। সবাই একসাথে মরুভূমির দিকে দৌড়ে আসায় কিছুক্ষণের জন্য চরম হট্টগোল বেঁধে যায়। তারপর নবি ডান দিকে অগ্রসর হয়ে কুবায় বানু আমর ইবনি আওফ এলাকায় আসেন।
কুবায় পৌঁছে রাসূল ﷺ উট থেকে নেমে কিছুক্ষণ চুপচাপ বিশ্রাম নেন। মদীনাবাসী মুসলিমদের বলা হয় আনসার (সাহায্যকারী)। আনসারদের অনেকেই এর আগে কখনও নবিজিকে স্বচক্ষে দেখেননি। প্রথম দেখায় তারা আবূ বকরকে আল্লাহর রাসূল ভেবে বসেন। কারণ, আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর চুল-দাড়িতে কিছুটা পাক ধরে যাওয়ায় তাকেই বেশি বয়স্ক মনে হতো। কিন্তু যখন আনসাররা দেখলেন যে, বয়স্কদর্শন ব্যক্তিটি রৌদ্র থেকে বাঁচাতে অপরজনকে কাপড় দিয়ে ছায়া দিচ্ছেন, তখন তাদের ভুল ভাঙে। বুঝতে পারে যে, আল্লাহর রাসূল হলেন ওই ব্যক্তি।
নবিজি কুবায় থাকাকালীন কুলসূম ইবনু হাদামের ঘরে অবস্থান করেছিলেন। অন্য এক সূত্রমতে, তিনি সা'দ ইবনু খাইসামার ঘরে ছিলেন। চারদিনের এই সংক্ষিপ্ত অবস্থানকালেই নবিজির হাতে স্থাপিত হয় মাসজিদুল কুবার ভিত্তি। শুক্রবারে আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-সহ কুবা ত্যাগ করেন আল্লাহর রাসূল ﷺ। তার আগে তিনি নানাবাড়ি বানু নাজ্জারে খবর পাঠান। সেখান থেকে আত্মীয়রা অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে এসে নবিজির সাথে মিলিত হন। এরপর সবাই একসাথে রওনা হন মদীনা অভিমুখে।
যখন বানু সালিম ইবনি আওফের বসতিতে পৌঁছেন তখন জুমুআর সালাতের সময় হয়ে যায়। নবি সেখানকার উপত্যকায় জুমুআর সালাত পড়ান। যাতে এক শ জন মুসলিম অংশগ্রহণ করেছিল।
টিকাঃ
[২৫৩] বুখারি, ৩৯০৬।
[২৫৪] বুখারি, ৩৯০৬।
নুবুওয়াত লাভের চৌদ্দ বছর পর এক সোমবারে ইয়াসরিবের প্রান্তে কুবা নামক স্থানে এসে পৌঁছান নবি ﷺ। এই ইয়াসরিবের নাম পাল্টেই পরবর্তী সময়ে রাখা হয় আল-মদীনাতুল মুনাওয়ারা (আলোকিত শহর)।
মদীনাবাসীরা প্রতিদিন বেরিয়ে পড়ত হাররার উদ্দেশ্যে। দিবসের উত্তাপ অসহ্য হয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত সেখানেই নবিজির জন্য অপেক্ষায় থাকত তারা। তাদের এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে সেই পরমাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিটি এসে হাজির হন তাদের মাঝে। সাদা পোশাক পরা এই অভিযাত্রী দলটি বেশ দূর থেকে নজর কাড়ে এক ইয়াহুদির। সে ডাক দিয়ে বলে, “এই যে আরবরা! তোমরা যার অপেক্ষায় ছিলে, সে চলে এসেছে!”
মুসলিমরা হুড়মুড় করে দৌড়ে আসেন নবিজি ﷺ -কে বরণ করে নিতে। সবাই একসাথে মরুভূমির দিকে দৌড়ে আসায় কিছুক্ষণের জন্য চরম হট্টগোল বেঁধে যায়। তারপর নবি ﷺ ডান দিকে অগ্রসর হয়ে কুবায় বানু আমর ইবনি আওফ এলাকায় আসেন।
কুবায় পৌঁছে রাসূল ﷺ উট থেকে নেমে কিছুক্ষণ চুপচাপ বিশ্রাম নেন। মদীনাবাসী মুসলিমদের বলা হয় আনসার (সাহায্যকারী)। আনসারদের অনেকেই এর আগে কখনও নবিজিকে স্বচক্ষে দেখেননি। প্রথম দেখায় তারা আবূ বকরকে আল্লাহর রাসূল ভেবে বসেন। কারণ, আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর চুল-দাড়িতে কিছুটা পাক ধরে যাওয়ায় তাকেই বেশি বয়স্ক মনে হতো। কিন্তু যখন আনসাররা দেখলেন যে, বয়স্কদর্শন ব্যক্তিটি রৌদ্র থেকে বাঁচাতে অপরজনকে কাপড় দিয়ে ছায়া দিচ্ছেন, তখন তাদের ভুল ভাঙে। বুঝতে পারে যে, আল্লাহর রাসূল হলেন ওই ব্যক্তি।
নবিজি কুবায় থাকাকালীন কুলসূম ইবনু হাদামের ঘরে অবস্থান করেছিলেন। অন্য এক সূত্রমতে, তিনি সা'দ ইবনু খাইসামার ঘরে ছিলেন। চারদিনের এই সংক্ষিপ্ত অবস্থানকালেই নবিজির হাতে স্থাপিত হয় মাসজিদুল কুবার ভিত্তি। শুক্রবারে আবু বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-সহ কুবা ত্যাগ করেন আল্লাহর রাসূল ﷺ। তার আগে তিনি নানাবাড়ি বানু নাজ্জারে খবর পাঠান। সেখান থেকে আত্মীয়রা অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে এসে নবিজির সাথে মিলিত হন। এরপর সবাই একসাথে রওনা হন মদীনা অভিমুখে।
যখন বানু সালিম ইবনি আওফের বসতিতে পৌঁছেন তখন জুমুআর সালাতের সময় হয়ে যায়। নবি ﷺ সেখানকার উপত্যকায় জুমুআর সালাত পড়ান। যাতে এক শ জন মুসলিম অংশগ্রহণ করেছিল।
টিকাঃ
২৫৩. বুখারি, ৩৯০৬।
২৫৪. বুখারি, ৩৯০৬।
২৫৫. বুখারি, ৩৯১১।
📄 নবিজি ﷺ-এর মদীনা প্রবেশ
জুমুআ শেষে নবিজি ও তাঁর সঙ্গীরা আবারও মদীনার পথ ধরেন। নারী, পুরুষ ও শিশুর উৎফুল্ল ভিড় তাঁকে স্বাগত জানাতে আসে। মদীনার অলিতে-গলিতে প্রতিধ্বনিত হয় তাদের হর্ষধ্বনি। নারী ও শিশুরা গজল গেয়ে স্বাগত জানায় নবিজিকে। আজও গজলটি মুসলিমদের মুখে মুখে ধ্বনিত হয় ওই দিনটির স্মরণে, যেদিন পূর্ণিমার চাঁদের মতো মানুষটি প্রথম পা রেখেছিলেন মদীনায়—
طَلَعَ الْبَدْرُ عَلَيْنَا *** مِنْ ثَنِيَّاتِ الوَدَاعِ
وَجَبَ الشُّكْرُ عَلَيْنَا *** مَا دَعَا لِلَّهِ دَاع
أَيُّهَا الْمَبْعُوثُ فِيْنَا *** جِئْتَ بِالْأَمْرِ الْمُطَاعِ
“পূর্ণিমার চাঁদ আমাদের ওপর উদিত হয়েছে সানিয়্যাতুল ওয়াদা' থেকে,
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমাদের ওপর ওয়াজিব যত দিন কেউ আল্লাহকে ডাকে,
ওহে আল্লাহর দূত, আপনি আমাদের মাঝে নিয়ে এসেছেন যা মান্য হবে তা কথা আর কাজে।”
মদীনার পথ ধরে চলছে আল্লাহর রাসূলের উটনী, আর একেকজন এসে একেকবার ধরছে তার লাগাম। মনে আশা, উটনীটি হয়তো তার বাড়ির সামনেই থামবে আর রাসূলুল্লাহ সে ঘরকেই বানাবেন আপন বসত। নবি বললেন “ওকে ওরমতো চলতে দাও, আল্লাহই ওকে পথ দেখাচ্ছেন।” অবশেষে হাঁটু গেড়ে বসল উটনী। কিন্তু নবিজি নামলেন না। একটু পর উটনীটি উঠে দাঁড়িয়ে অগোছালোভাবে কিছুদূর এগিয়ে গেল। তারপর ঘুরে এসে বসল আবার ওই আগের জায়গাতেই। আর ঠিক এই জায়গাতেই নির্মিত হয়েছে মাসজিদুন নববি (নবির মাসজিদ)।
নবিজি ﷺ-এর স্বাগতিক হতে অনেকেই প্রতিযোগিতা করে। কিন্তু সেই সৌভাগ্য জোটে শুধু আবূ আইউব আনসারি (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ভাগ্যে। দ্রুত এসে উটনীর জিন ধরে ফেলেন তিনি। টেনে নিয়ে চলেন নিজের বাড়ির দিকে। নবি কৌতুকস্বরে বলেন, “বাহন যেদিকে যাচ্ছে, আরোহীকে তো সেদিকেই যেতে হবে!” এই বলে তিনিও চললেন আবু আইউবের সাথে। ওদিকে উটের লাগামটি ধরেন আসআদ ইবনু যুরারা (রদিয়াল্লাহু আনহু)। তাই উটনীর যত্ন-আত্তির সুযোগটি যায় তাঁর ঝুলিতে।
নবিজি ﷺ-এর খাতির-যত্নে প্রতিযোগিতা শুরু হয় আনসার গোত্রপতিদের মাঝে। প্রতিরাতে নবিজির কাছে কমপক্ষে তিন-চার থালা খাবার উপহার আসত। রাসূলুল্লাহ যে শত্রুবিহীন, বন্ধুঘেরা এক নিরাপদ আলয়ে এসেছেন, তা বুঝিয়ে দিতে কেউ কোনও চেষ্টাই বাদ রাখেনি।
টিকাঃ
[২৫৫] বুখারি, ৩৯১১।
[২৫৬] ইবনু হিশাম, ১/৪৯৪; ইবনুল কাইয়িম, যাদুল মাআদ, ২/৫৫।
[২৫৭] ইবনু হিশাম, ১/৪৯৪-৪৯৬; যাদুল মাআদ, ২/৫৫; বুখারি, ৩৯১১।
জুমুআ শেষে নবিজি ও তাঁর সঙ্গীরা আবারও মদীনার পথ ধরেন। নারী, পুরুষ ও শিশুর উৎফুল্ল ভিড় তাঁকে স্বাগত জানাতে আসে। মদীনার অলিতে-গলিতে প্রতিধ্বনিত হয় তাদের হর্ষধ্বনি। নারী ও শিশুরা গজল গেয়ে স্বাগত জানায় নবিজিকে। আজও গজলটি মুসলিমদের মুখে মুখে ধ্বনিত হয় ওই দিনটির স্মরণে, যেদিন পূর্ণিমার চাঁদের মতো মানুষটি প্রথম পা রেখেছিলেন মদীনায়-
“পূর্ণিমার চাঁদ আমাদের ওপর উদিত হয়েছে সানিয়্যাতুল ওয়াদা' থেকে,
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমাদের ওপর ওয়াজিব যত দিন কেউ আল্লাহকে ডাকে,
ওহে আল্লাহর দূত, আপনি আমাদের মাঝে নিয়ে এসেছেন
যা মান্য হবে তা কথা আর কাজে।"
মদীনার পথ ধরে চলছে আল্লাহর রাসূলের উটনী, আর একেকজন এসে একেকবার ধরছে তার লাগাম। মনে আশা, উটনীটি হয়তো তার বাড়ির সামনেই থামবে আর রাসূলুল্লাহ সে ঘরকেই বানাবেন আপন বসত। নবি ﷺ বললেন “ওকে ওরমতো চলতে দাও, আল্লাহই ওকে পথ দেখাচ্ছেন।” অবশেষে হাঁটু গেড়ে বসল উটনী। কিন্তু নবিজি নামলেন না। একটু পর উটনীটি উঠে দাঁড়িয়ে অগোছালোভাবে কিছুদূর এগিয়ে গেল। তারপর ঘুরে এসে বসল আবার ওই আগের জায়গাতেই। আর ঠিক এই জায়গাতেই নির্মিত হয়েছে মাসজিদুন নববি (নবির মাসজিদ)।
নবিজি ﷺ -এর স্বাগতিক হতে অনেকেই প্রতিযোগিতা করে। কিন্তু সেই সৌভাগ্য জোটে শুধু আবূ আইউব আনসারি (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ভাগ্যে। দ্রুত এসে উটনীর জিন ধরে ফেলেন তিনি। টেনে নিয়ে চলেন নিজের বাড়ির দিকে। নবি ﷺ কৌতুকস্বরে বলেন, “বাহন যেদিকে যাচ্ছে, আরোহীকে তো সেদিকেই যেতে হবে!” এই বলে তিনিও চললেন আবু আইউবের সাথে। ওদিকে উটের লাগামটি ধরেন আসআদ ইবনু যুরারা (রদিয়াল্লাহু আনহু)। তাই উটনীর যত্ন-আত্তির সুযোগটি যায় তাঁর ঝুলিতে।
নবিজি ﷺ -এর খাতির-যত্নে প্রতিযোগিতা শুরু হয় আনসার গোত্রপতিদের মাঝে। প্রতিরাতে নবিজির কাছে কমপক্ষে তিন-চার থালা খাবার উপহার আসত। রাসূলুল্লাহ যে শত্রুবিহীন, বন্ধুঘেরা এক নিরাপদ আলয়ে এসেছেন, তা বুঝিয়ে দিতে কেউ কোনও চেষ্টাই বাদ রাখেনি।
টিকাঃ
২৫৬. ইবনু হিশাম, ১/৪৯৪; ইবনুল কাইয়িম, যাদুল মাআদ, ২/৫৫।
২৫৭. ইবনু হিশাম, ১/৪৯৪-৪৯৬; যাদুল মাআদ, ২/৫৫; বুখারি, ৩৯১১