📄 কুরাইশদের সলা-পরামর্শ আর আল্লাহর কুদরতি পরিকল্পনা
এর মাঝেই নবিজি ﷺ-এর কাছে জিবরীল (আলাইহিস সালাম) একটি আনন্দের সংবাদ নিয়ে এলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে হিজরত করার আদেশ দিয়েছেন। ঠিক কোন সময় রওনা দিতে হবে, সেটাও বলে দিলেন জিবরীল। আরও জানালেন তাঁকে হত্যা করার কুরাইশি কুপরিকল্পনার ব্যাপারে। উপদেশ দিলেন, “নিজের বিছানায় শোবেন না।”
সেদিন দুপুরবেলা। সবাই ভাতঘুমে আচ্ছন্ন। নবি সেই সুযোগে চলে গেলেন আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ঘরে। জানালেন সদ্য পাওয়া সুসংবাদটি। দীর্ঘ যাত্রার জন্য প্রস্তুত করতে লাগলেন সেই উট দুটিকে। গাইড হিসেবে ভাড়া করলেন আবদুল্লাহ ইবনু উরাইকিত লাইসিকে। এই ব্যক্তিটি মক্কা থেকে ইয়াসরিবে যাওয়ার পথ খুব করে চেনেন। অমুসলিম হওয়া সত্ত্বেও তিনি রাসূলুল্লাহ এবং আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে গোপনে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে সম্মত হন। তিন রাত পর সাওর পর্বতের কাছে আবদুল্লাহকে দেখা করতে বলেন নবিজি। মাঝখানের সময়টা তিনি স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজে এমনভাবে ব্যস্ত রইলেন যে, তাঁকে দেখে কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পেল না তাঁর হিজরতের পরিকল্পনা।
নবি সাধারণত ইশার সালাতের পরপরই ঘুমিয়ে পড়েন। তারপর প্রায় মাঝরাতের দিকে জেগে তাহাজ্জুদে নিমগ্ন হন। যে রাতে মক্কা থেকে বেরিয়ে পড়ার কথা, সে রাতে তিনি আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে বললেন তাঁর বিছানায় ঘুমাতে। তবে এও নিশ্চিত করলেন যে, আলির কোনও ক্ষতি হবে না।
অবশেষে রাতে নেমে এল মক্কায়। মানুষজন সবাই গভীর ঘুমে। ঠিক তখনই রাসূল ﷺ-এর বাসগৃহকে ঘিরে দাঁড়াল দুঃসাহসী খুনিরা। মুহাম্মাদ ﷺ-এর সবুজ কাঁথাটি মুড়ি দিয়ে তাঁরই বিছানায় কেউ একজন শুয়ে আছে। পরিকল্পনা ছিল যে, তারা বাইরেই অপেক্ষা করবে। নবি বেরিয়ে আসামাত্র একসাথে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়বে। কিন্তু কুরাইশরা বুঝবে কী করে যে, তাদের ষড়যন্ত্রের চেয়ে আল্লাহর পরিকল্পনা সূক্ষ্মতর?
وَإِذْ يَمْكُرُ بِكَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِيُثْبِتُوكَ أَوْ يَقْتُلُوْكَ أَوْ يُخْرِجُوكَ وَيَمْكُرُوْনَ وَيَمْكُرُ اللَّهُ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ
“অবিশ্বাসীরা আপনাকে বন্দি, হত্যা বা নির্বাসিত করার চক্রান্ত করেছিল, মনে আছে? তারা চক্রান্ত করে, কিন্তু আল্লাহও পরিকল্পনা করেন। আর আল্লাহই শ্রেষ্ঠ পরিকল্পনাকারী।”
টিকাঃ
[২৩৭] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/৪৮২।
[২৩৮] বুখারি, ২১৩৮।
[২৩৯] সূরা আনফাল, ৮: ৩০।
এর মাঝেই নবিজি ﷺ -এর কাছে জিবরীল (আলাইহিস সালাম) একটি আনন্দের সংবাদ নিয়ে এলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে হিজরত করার আদেশ দিয়েছেন। ঠিক কোন সময় রওনা দিতে হবে, সেটাও বলে দিলেন জিবরীল। আরও জানালেন তাঁকে হত্যা করার কুরাইশি কুপরিকল্পনার ব্যাপারে। উপদেশ দিলেন, “নিজের বিছানায় শোবেন না।”
সেদিন দুপুরবেলা। সবাই ভাতঘুমে আচ্ছন্ন। নবি ﷺ সেই সুযোগে চলে গেলেন আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ঘরে। জানালেন সদ্য পাওয়া সুসংবাদটি। দীর্ঘ যাত্রার জন্য প্রস্তুত করতে লাগলেন সেই উট দুটিকে। গাইড হিসেবে ভাড়া করলেন আবদুল্লাহ ইবনু উরাইকিত লাইসিকে। এই ব্যক্তিটি মক্কা থেকে ইয়াসরিবে যাওয়ার পথ খুব ভালো করে চেনেন। অমুসলিম হওয়া সত্ত্বেও তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে গোপনে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে সম্মত হন। তিন রাত পর সাওর পর্বতের কাছে আবদুল্লাহকে দেখা করতে বলেন নবিজি। মাঝখানের সময়টা তিনি স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজে এমনভাবে ব্যস্ত রইলেন যে, তাঁকে দেখে কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পেল না তাঁর হিজরতের পরিকল্পনা।
নবি ﷺ সাধারণত ইশার সালাতের পরপরই ঘুমিয়ে পড়েন। তারপর প্রায় মাঝরাতের দিকে জেগে তাহাজ্জুদে নিমগ্ন হন। যে রাতে মক্কা থেকে বেরিয়ে পড়ার কথা, সে রাতে তিনি আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে বললেন তাঁর বিছানায় ঘুমাতে। তবে এও নিশ্চিত করলেন যে, আলির কোনও ক্ষতি হবে না।
অবশেষে রাতে নেমে এল মক্কায়। মানুষজন সবাই গভীর ঘুমে। ঠিক তখনই রাসূল ﷺ -এর বাসগৃহকে ঘিরে দাঁড়াল দুঃসাহসী খুনিরা। মুহাম্মাদ ﷺ -এর সবুজ কাঁথাটি মুড়ি দিয়ে তাঁরই বিছানায় কেউ একজন শুয়ে আছে। পরিকল্পনা ছিল যে, তারা বাইরেই অপেক্ষা করবে। নবি বেরিয়ে আসামাত্র একসাথে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়বে। কিন্তু কুরাইশরা বুঝবে কী করে যে, তাদের ষড়যন্ত্রের চেয়ে আল্লাহর পরিকল্পনা সূক্ষ্মতর?
“অবিশ্বাসীরা আপনাকে বন্দি, হত্যা বা নির্বাসিত করার চক্রান্ত করেছিল, মনে আছে? তারা চক্রান্ত করে, কিন্তু আল্লাহও পরিকল্পনা করেন। আর আল্লাহই শ্রেষ্ঠ পরিকল্পনাকারী।”
টিকাঃ
২৩৭. ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/৪৮২।
২৩৮. বুখারি, ২১৩৮।
২৩৯. সূরা আনফাল, ৮: ৩০।
📄 নবিজি ﷺ গৃহত্যাগ করলেন যখন
বিছানায় আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু) শোয়া থাকলেও নবি তখনো ঘরের ভেতরে। এদিকে ঘরের চারপাশে ঘিরে আছে পৃথিবীর নিকৃষ্ট গুপ্তঘাতকেরা। নবিজি বেরিয়ে এসে এক মুঠো মাটি হাতে নিলেন। সশস্ত্র যুবকদের মাথা অভিমুখে ছুড়ে দিয়ে তিলাওয়াত করলেন,
وَجَعَلْنَا مِنْ بَيْنِ أَيْدِيْهِمْ سَدًّا وَمِنْ خَلْفِهِمْ সَدًّا فَأَغْشَيْنَاهُمْ فَهُمْ لَا يُبْصِرُوْনَ
“আমি তাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে স্থাপন করেছি একটি প্রাচীর। অতঃপর তাদের আবৃত করে দিয়েছি। ফলে তারা দেখতে পায় না।”
যেই ব্যক্তিটিকে হত্যা করতে এসেছিল যুবকেরা, তিনিই বেরিয়ে গেলেন তাদের চোখের ঠিক সামনে দিয়ে। অথচ কেউ দেখতেই পেল না। নবি দ্রুত চলে গেলেন আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ঘরে। একসাথে যাত্রা শুরু করলেন তাঁরা। কিন্তু ইয়াসরিবের দিকে নয়; বরং তার বিপরীত দিকে ইয়েমেন-অভিমুখে! ভোরের আগে পাঁচ মাইল মতো দূরত্ব অতিক্রম করে দু'জনে সাওর পর্বতের এক গুহায় আশ্রয় নিলেন।
এদিকে হন্তারক যুবকেরা অপেক্ষায় বসে আছে তো আছেই। ভোরবেলা আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু) জেগে উঠে বাইরে আসার পরেই কেবল তাদের ভুল ভাঙল। মুহাম্মাদ কোথায় আছেন, সে ব্যাপারে আলিকে জেরা করা হলো। কিন্তু তিনি কোনও তথ্য জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। টেনে-হিঁচড়ে তাঁকে কা'বায় নিয়ে বন্দি করে রাখা হলেও মুখ থেকে একটা শব্দও বের করেননি তিনি। এরপর তারা আবূ বকরের ঘরেও ছুটে গেল, আবারও ব্যর্থমনস্কাম। খুঁজে পেল শুধু তাঁর মেয়ে আসমা (রদিয়াল্লাহু আনহা)-কে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনিও কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানান। আবূ জাহল তাঁর কানে এত জোরে চড় মারে যে, কানের দুল খুলে ছিটকে পড়ে।
তন্নতন্ন করে চারিদিকে খোঁজা শুরু করা হলো মুহাম্মাদ ও আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে। দুই পলাতকের যেকোনো একজনকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় ধরিয়ে দিতে পারলে এক শ উট পুরস্কারের ঘোষণাও দেওয়া হয়।
টিকাঃ
[২৪০] সূরা ইয়াসীন, ৩৬: ৯।
[২৪১] ইবনু হিশাম, ১/৪৮৩।
[২৪২] ইবনু হিশাম, ১/৪৮৭।
[২৪৩] তাবারি, আত-তারীখ, ২/৩৭৪।
বিছানায় আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু) শোয়া থাকলেও নবি ﷺ তখনো ঘরের ভেতরে। এদিকে ঘরের চারপাশে ঘিরে আছে পৃথিবীর নিকৃষ্ট গুপ্তঘাতকেরা। নবিজি বেরিয়ে এসে এক মুঠো মাটি হাতে নিলেন। সশস্ত্র যুবকদের মাথা অভিমুখে ছুড়ে দিয়ে তিলাওয়াত করলেন,
“আমি তাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে স্থাপন করেছি একটি প্রাচীর। অতঃপর তাদের আবৃত করে দিয়েছি। ফলে তারা দেখতে পায় না।”
যেই ব্যক্তিটিকে হত্যা করতে এসেছিল যুবকেরা, তিনিই বেরিয়ে গেলেন তাদের চোখের ঠিক সামনে দিয়ে। অথচ কেউ দেখতেই পেল না। নবি ﷺ দ্রুত চলে গেলেন আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ঘরে। একসাথে যাত্রা শুরু করলেন তাঁরা। কিন্তু ইয়াসরিবের দিকে নয়; বরং তার বিপরীত দিকে ইয়েমেন-অভিমুখে! ভোরের আগে পাঁচ মাইল মতো দূরত্ব অতিক্রম করে দু'জনে সাওর পর্বতের এক গুহায় আশ্রয় নিলেন।
এদিকে হন্তারক যুবকেরা অপেক্ষায় বসে আছে তো আছেই। ভোরবেলা আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু) জেগে উঠে বাইরে আসার পরেই কেবল তাদের ভুল ভাঙল। মুহাম্মাদ ﷺ কোথায় আছেন, সে ব্যাপারে আলিকে জেরা করা হলো। কিন্তু তিনি কোনও তথ্য জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। টেনে-হিঁচড়ে তাঁকে কা'বায় নিয়ে বন্দি করে রাখা হলেও মুখ থেকে একটা শব্দও বের করেননি তিনি। এরপর তারা আবু বকরের ঘরেও ছুটে গেল, আবারও ব্যর্থমনস্কাম। খুঁজে পেল শুধু তাঁর মেয়ে আসমা (রদিয়াল্লাহু আনহা)-কে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনিও কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানান। আবূ জাহল তাঁর কানে এত জোরে চড় মারে যে, কানের দুল খুলে ছিটকে পড়ে।
তন্নতন্ন করে চারিদিকে খোঁজা শুরু করা হলো মুহাম্মাদ ﷺ ও আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে। দুই পলাতকের যেকোনও একজনকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় ধরিয়ে দিতে পারলে এক শ উট পুরস্কারের ঘোষণাও দেওয়া হয়।
টিকাঃ
২৪০. সূরা ইয়াসীন, ৩৬: ৯।
২৪১. ইবনু হিশাম, ১/৪৮৩।
২৪২. ইবনু হিশাম, ১/৪৮৭।
২৪৩. তাবারি, আত-তারীখ, ২/৩৭৪।
📄 গুহায় তিন রাত
ওদিকে সাওর পর্বতের গুহায় আবূ বকর আগে প্রবেশ করলেন। নবিজি কষ্ট পেতে পারেন, এমন কোনও জিনিস থাকলে আগেই যাতে সরিয়ে ফেলা যায়। কয়েকটি গর্ত দেখতে পেয়ে কাপড়ের টুকরো দিয়ে বন্ধ করে দিলেন সেগুলো। এরপর রাসূল ﷺ ভেতরে প্রবেশ করলেন। ক্লান্তি কাটাতে ঘুমিয়ে পড়লেন আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ঊরুতে মাথা রেখে। হঠাৎ তাঁর পায়ে কিছু একটা দংশন করল। বিষের তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে। কিন্তু প্রিয় নবির ঘুম ভেঙে যাবে বলে একটু নড়লেনও না তিনি। একসময় ব্যথার তীব্রতা এত বেড়ে গেল যে, নিজের অজান্তেই চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এক ফোঁটা নবিজির মুখমণ্ডলে পড়ামাত্রই ঘুম ভেঙে যায় তাঁর। দেখলেন সফরসঙ্গী বিষের ব্যথায় নীল হয়ে আছেন। দংশিত জায়গাটিতে রাসূল ﷺ নিজের লালা লাগিয়ে দিতেই ব্যথা উধাও।
টানা তিন রাত গুহায় লুকিয়ে থাকলেন দু'জনে। এ-সময়টিতে আবূ বকরের ছেলে আবদুল্লাহ কাছেই এক জায়গায় রাত্রিযাপন করতেন। তারপর ভোরবেলা এমন সময় মক্কায় ফিরে যেতেন যে, কুরাইশরা টেরই পেত না, তিনি অন্য কোথাও রাত কাটিয়ে এসেছেন। চটপটে এই তরুণ প্রতিদিন মক্কায় কুরাইশদের অপতৎপরতা সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করতেন। আর রাতের বেলা খবর পৌঁছে দিতেন নবি ও আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে।
আবূ বকরের দাস আমির ইবনু ফুহাইরা (রদিয়াল্লাহু আনহু) রাতের একাংশ অতিবাহিত হলে পরে গুহার কাছেই মনিবের ছাগলগুলো নিয়ে চরাতেন। ফলে প্রতিদিন পুষ্টিকর দুধের জোগান পেতে থাকেন গুহাবাসীদ্বয়। পরদিন একদম সকাল সকাল ছাগলগুলোকে একই পথ ধরে মক্কায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতেন আমির। ফলে বালুতে থাকা আবূ বকরের ছেলের পায়ের চিহ্নও ঢাকা পড়ে যেত।
এদিকে কুরাইশের অনুসন্ধানী দলগুলো মক্কা থেকে দক্ষিণের পুরো এলাকা খোঁজাখুঁজি করে উল্টে ফেলে। একবার তারা ওই গুহার একদম মুখের কাছে চলে এসেছিল। স্রেফ একবার কিনারে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকালেই পেয়ে যেত শিকারদের। কুরাইশদের এত কাছে চলে আসতে দেখে আবূ বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বেশ দুশ্চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন এবং ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। নবি ﷺ আশ্বস্ত করে বলেন, “আবূ বকর, এমন দু'জনের ব্যাপারে তোমার কী ধারণা যাদের তৃতীয়জন হলেন, আল্লাহ। চিন্তা কোরো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে রয়েছেন।”
টিকাঃ
[২৪৪] তিবরিযি, মিশকাতুল মাসাবীহ, ৬০২৫।
[২৪৫] বুখারি, ৩৯০৫।
[২৪৬] বুখারি, ৩৬৫৩।
ওদিকে সাওর পর্বতের গুহায় আবূ বকর আগে প্রবেশ করলেন। নবিজি কষ্ট পেতে পারেন, এমন কোনও জিনিস থাকলে আগেই যাতে সরিয়ে ফেলা যায়। কয়েকটি গর্ত দেখতে পেয়ে কাপড়ের টুকরো দিয়ে বন্ধ করে দিলেন সেগুলো। এরপর রাসূল ﷺ ভেতরে প্রবেশ করলেন। ক্লান্তি কাটাতে ঘুমিয়ে পড়লেন আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ঊরুতে মাথা রেখে। হঠাৎ তাঁর পায়ে কিছু একটা দংশন করল। বিষের তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে। কিন্তু প্রিয় নবির ঘুম ভেঙে যাবে বলে একটু নড়লেনও না তিনি। একসময় ব্যথার তীব্রতা এত বেড়ে গেল যে, নিজের অজান্তেই চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এক ফোঁটা নবিজির মুখমণ্ডলে পড়ামাত্রই ঘুম ভেঙে যায় তাঁর। দেখলেন সফরসঙ্গী বিষের ব্যথায় নীল হয়ে আছেন। দংশিত জায়গাটিতে রাসূল ﷺ নিজের লালা লাগিয়ে দিতেই ব্যথা উধাও।
টানা তিন রাত গুহায় লুকিয়ে থাকলেন দু'জনে। এ-সময়টিতে আবূ বকরের ছেলে আবদুল্লাহ কাছেই এক জায়গায় রাত্রিযাপন করতেন। তারপর ভোরবেলা এমন সময় মক্কায় ফিরে যেতেন যে, কুরাইশরা টেরই পেত না, তিনি অন্য কোথাও রাত কাটিয়ে এসেছেন। চটপটে এই তরুণ প্রতিদিন মক্কায় কুরাইশদের অপতৎপরতা সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করতেন। আর রাতের বেলা খবর পৌঁছে দিতেন নবি ﷺ ও আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে।
আবু বকরের দাস আমির ইবনু ফুহাইরা (রদিয়াল্লাহু আনহু) রাতের একাংশ অতিবাহিত হলে পরে গুহার কাছেই মনিবের ছাগলগুলো নিয়ে চরাতেন। ফলে প্রতিদিন পুষ্টিকর দুধের জোগান পেতে থাকেন গুহাবাসীদ্বয়। পরদিন একদম সকাল সকাল ছাগলগুলোকে একই পথ ধরে মক্কায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতেন আমির। ফলে বালুতে থাকা আবূ বকরের ছেলের পায়ের চিহ্নও ঢাকা পড়ে যেত।
এদিকে কুরাইশের অনুসন্ধানী দলগুলো মক্কা থেকে দক্ষিণের পুরো এলাকা খোঁজাখুঁজি করে উল্টে ফেলে। একবার তারা ওই গুহার একদম মুখের কাছে চলে এসেছিল। স্রেফ একবার কিনারে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকালেই পেয়ে যেত শিকারদের। কুরাইশদের এত কাছে চলে আসতে দেখে আবূ বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বেশ দুশ্চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন এবং ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। নবি ﷺ আশ্বস্ত করে বলেন, “আবূ বকর, এমন দু'জনের ব্যাপারে তোমার কী ধারণা যাদের তৃতীয়জন হলেন, আল্লাহ। চিন্তা কোরো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে রয়েছেন।”
টিকাঃ
২৪৪. তিবরিযি, মিশকাতুল মাসাবীহ, ৬০২৫।
২৪৫. বুখারি, ৩৯০৫।
২৪৬. বুখারি, ৩৬৫৩।
📄 মদীনার পথে
রবীউল আউয়াল মাস। সোমবার রাত। চারিদিকে জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধ আলো। আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর উট দুটি নিয়ে সাওর গুহার কাছে এসে হাজির হন আবদুল্লাহ ইবনু উরাইকিত লাইসি। সাথে ছিলেন আমির ইবনু ফুহাইরা। পথপ্রদর্শক প্রথমে তাঁদের নিয়ে দক্ষিণে ইয়েমেনের দিকে কিছুদূর যান। তারপর পশ্চিমে লোহিত সাগর অভিমুখে চলেন। সাগরের একটু আগেই আবার ঘুরে যান উত্তর দিকে ইয়াসরিব বরাবর। এই ঘুরপথটিতে খুব বেশি মানুষজন চলাচল করে না।
সারা রাত ও পরের দিনের অর্ধকাল পর্যন্ত একটানা চলার পর যাত্রাবিরতি করেন তাঁরা। নবি ﷺ একটি পাথরের ছায়ায় বিশ্রাম নেন। এদিকে এক রাখালের অনুমতি নিয়ে ছাগলের দুধ সংগ্রহ করে আনেন আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)। রাসূলের ঘুম ভাঙলে তাঁকে তা পান করতে দেন। তৃপ্তিসহকারে পানাহার শেষে পুনরায় যাত্রা আরম্ভ করেন।
সম্ভবত দ্বিতীয় দিনের ঘটনা। মক্কা থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে মুশাল্লালের কাছে 'কাদীদ' শহরতলিতে উম্মু মা'বাদের তাঁবু অতিক্রম করেন আল্লাহর রাসূল ﷺ ও আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)। মহিলাটিকে জিজ্ঞেস করেন, চার জন ক্লান্ত পথিকের জন্য কিছু আছে কি না। কিন্তু না কিছুই নেই। উম্মু মা'বাদের ছাগলের পালও তখন বহু দূরের মাঠে। যেই একটি ছোট ছাগী রয়ে গেছে, সেটি এতই দুর্বল যে বাকিদের সাথে যেতে পারেনি। সেটি এক ফোঁটা দুধ দিতেও সক্ষম নয়।
নবি অনুমতি নিয়ে সেই দুর্বল ছোটো ছাগীটিরই দুধ দোহাতে থাকেন। মু'জিযাস্বরূপ সেই ছাগীর ওলান এমনভাবে দুধে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে যে, বড় একটি পাত্র ভর্তি হয়ে যায়। চার পথিকই পেট পুরে দুধপান করেন। তারপর নবিজি আবারও দোহন করে আরও এক পাত্রভর্তি দুধ রেখে যান উম্মু মা'বাদের জন্য।
পথিকেরা চলে যাবার পর ফেরেন ঘরের কর্তা আবূ মা’বাদ। স্বামীর কাছে পুরো ঘটনার বর্ণনা দিলেন স্ত্রী। নবিজি ﷺ-এর এমন পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা শুনে আবূ মা'বাদ বলেন, “আরে! ইনি তো কুরাইশ বংশের সেই লোক, যার কথা কিছুদিন যাবৎ শুনে আসছি। কখনও সুযোগ পেলে অবশ্যই তাঁর অনুসারী হয়ে যাব।”
নবিজি ﷺ-এর মক্কাত্যাগের তৃতীয় দিনে এক অদৃশ্য কণ্ঠ মক্কায় ঘুরে ঘুরে কিছু কথা বলতে থাকে। এ মানুষের কণ্ঠ নয়; বরং একজন জিনের। সে বলছিল,
“মানবজাতির প্রতিপালক আল্লাহ তাআলা ওই দুই পথচারীকে রহম করুন। তারা উম্মু মা'বাদের তাঁবু পার হয়েছে। নিরাপদ যাত্রাবিরতি শেষে নিরাপদেই আবার পথচলা শুরু করেছে। যে-ই মুহাম্মাদের বন্ধু হয়, সে-ই সাফল্য পায়। হে কুরাইশ, মুহাম্মাদকে তাড়িয়ে দিয়ে তোমরা মর্যাদা আর ক্ষমতাকে দূরে ঠেলে দিলে। বানু কা'বের কী সৌভাগ্য! তাদের এক নারীর তাঁবু স্বয়ং মুহাম্মাদের আশ্রয় হয়েছে। নারীটিকে জিজ্ঞেস করো তার দুর্বল ছাগী আর দুধের পাত্রের ব্যাপারে। এমনকি সেই ছাগীও জানিয়ে দেবে কী ঘটেছে তার সাথে।”
নবি ﷺ এবং তাঁর সঙ্গীরা 'কাদীদ' ছেড়ে বেরুনোর সময় সুরাকা ইবনু মালিক ইবনি জু'শুম মুদলিজি নামের এক ব্যক্তি তাঁদের দেখে ফেলেন। পলাতকদের ধরে মক্কায় নিয়ে গিয়ে পুরস্কার পাবার লোভ জেগে ওঠে তার মনে। ঘোড়া ছুটিয়ে একটু এগোনো-মাত্রই প্রাণীটি পা হড়কে মাটিতে পড়ে যায়। সেও নিচে আছড়ে পড়ে। আরবের কুসংস্কার অনুযায়ী একটি তির বের করে ভাগ্য পরীক্ষা করল সুরাকা। ফলাফল এল নেতিবাচক। কিন্তু পুরস্কারের লোভে কুলক্ষণকে পাত্তা না দিয়েই আবার ঘোড়ায় চেপে বসল সে। এবার ঘোড়াটি এত দূর নিরাপদে দৌড়ে গেল যে, নবিজি ﷺ-এর কুরআন তিলাওয়াত সুরাকার কানে আসতে থাকে। এদিকে আবূ বকর বারবার পেছনে তাকাচ্ছেন আর উসখুস করছেন। অথচ নবিজি একেবারে নির্লিপ্ত। একটু পরেই ঘোড়ার সামনের পা দুটো একেবারে বালুতে দেবে গেল। আবারও উল্টে পড়ল আরোহী।
ঘোড়াকে গালি দিতে দিতে কোনোরকমে তার পা মাটি থেকে বের করে আনল সুরাকা। কিন্তু পেছনে তাকাতেই দেখল যে, ঘোড়ার পদচিহ্ন থেকে ধোঁয়ার মতো ওপরের দিকে উঠছে বালু। তাড়াতাড়ি আরেকটি তির বের করে এবারও ভাগ্যকে প্রতিকূলে পেল। অবশেষে তার মন মেনে নিল যে, মুহাম্মাদ ﷺ-কে বন্দি করা অসম্ভব। নিজে থেকেই নবিজিকে ডাক দিয়ে আত্মসমর্পণ করে। খাবারও সাধে পথিকদের। তবে তাঁরা সেটা নেননি। তবে নবি ﷺ এতটুকু অনুরোধ রাখতে বললেন, যাতে কুরাইশদের তাঁদের অবস্থান না জানানো হয়। সুরাকা তাতে রাজি হয়। ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য সে একটি চুক্তিনামা লিখে দেওয়ার অনুরোধ করে। নবিজির নির্দেশে চামড়ার একটি টুকরায় চিঠিটি লিখে দেন আমির। সুরাকা তারপর মক্কায় ফিরে যান। অনুসন্ধানী প্রতিটি দলকে এই বলে ফিরিয়ে দেন যে, এই পুরো এলাকা তিনি ইতিমধ্যে খোঁজ করে ফেলেছেন, তাদের যে উদ্দেশ্য তা তিনিই সম্পূর্ণ করেছেন।
চার পথিকই যাত্রা পুনরারম্ভ করেন। একটু পরেই নবিজি ﷺ-এর দেখা হয় বুরাইদা ইবনু হুসাইব আসলামি ও তার অনুসারী প্রায় সত্তর-আশিটি পরিবারের সাথে। তারা সবাই ইসলাম কবুল করে নবিজির পেছনে ইশার সালাত আদায় করেন। উহুদের যুদ্ধের পর মদীনায় হিজরত করেন বুরাইদা।
‘আরজ' অঞ্চলে নবিজির সাথে আরও দেখা হয় আবূ তামিম আওস ইবনু হাজর আসলামির। একটি উট দুর্বল হয়ে পড়ায় তখন নবি ও আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) একই উটের পিঠে ছিলেন। আবূ তামিম তাঁদের একটি উট দেন এবং মাসঊদ ইবনু হুনাইদা নামক এক দাসকেও সাথে পাঠিয়ে দেন। একেবারে ইয়াসরিব পর্যন্ত দাসটি তাঁদের সঙ্গ দেয়। আবূ তামিম মুসলিম হলেও হিজরত না করে নিজভূমে রয়ে যান। পরে উহুদের যুদ্ধের সময় মাসউদের মাধ্যমে মক্কার খবরাখবর আগাম মদীনায় পাঠিয়ে মুসলিম সেনাবাহিনীর বিরাট উপকার করেন তিনি।
রীম উপত্যকায় পৌঁছে নবি যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর দেখা পান। তিনি সিরিয়াফেরত একটি ব্যবসায়ী কাফেলাকে সঙ্গ দিচ্ছিলেন। কাফেলাটি মুসলিমদেরই। নবি ﷺ ও আবূ বকরকে তিনি সাদা রঙের কাপড় উপহার দেন।
টিকাঃ
[২৪৭] বুখারি, ৩৬১৫।
[২৪৮] ইবনুল কাইয়িম, যাদুল মাআদ, ২/৫৩-৫৪; হাকিম, আল-মুসতাদরাক, ৩/৯-১০।
[২৪৯] বুখারি, ৩৯০৬।
[২৫০] ইবনুল আসীর, উসদুল গাবাহ, ১/২০৯।
[২৫১] ইবনুল আসীর, উসদুল গাবাহ, ১/১৭৩; ইবনু হিশাম, ১/৪৯১।
[২৫২] বুখারি, ৩৯০৬।
রবীউল আউয়াল মাস। সোমবার রাত। চারিদিকে জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধ আলো। আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর উট দুটি নিয়ে সাওর গুহার কাছে এসে হাজির হন আবদুল্লাহ ইবনু উরাইকিত লাইসি। সাথে ছিলেন আমির ইবনু ফুহাইরা। পথপ্রদর্শক প্রথমে তাঁদের নিয়ে দক্ষিণে ইয়েমেনের দিকে কিছুদূর যান। তারপর পশ্চিমে লোহিত সাগর অভিমুখে চলেন। সাগরের একটু আগেই আবার ঘুরে যান উত্তর দিকে ইয়াসরিব বরাবর। এই ঘুরপথটিতে খুব বেশি মানুষজন চলাচল করে না।
সারা রাত ও পরের দিনের অর্ধকাল পর্যন্ত একটানা চলার পর যাত্রাবিরতি করেন তাঁরা। নবি ﷺ একটি পাথরের ছায়ায় বিশ্রাম নেন। এদিকে এক রাখালের অনুমতি নিয়ে ছাগলের দুধ সংগ্রহ করে আনেন আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)। রাসূলের ঘুম ভাঙলে তাঁকে তা পান করতে দেন। তৃপ্তিসহকারে পানাহার শেষে পুনরায় যাত্রা আরম্ভ করেন।
সম্ভবত দ্বিতীয় দিনের ঘটনা। মক্কা থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে মুশাল্লালের কাছে 'কাদীদ' শহরতলিতে উন্মু মা'বাদের তাঁবু অতিক্রম করেন আল্লাহর রাসূল ﷺ ও আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)। মহিলাটিকে জিজ্ঞেস করেন, চার জন ক্লান্ত পথিকের জন্য কিছু আছে কি না। কিন্তু না কিছুই নেই। উম্মু মা'বাদের ছাগলের পালও তখন বহু দূরের মাঠে। যেই একটি ছোট ছাগী রয়ে গেছে, সেটি এতই দুর্বল যে বাকিদের সাথে যেতে পারেনি। সেটি এক ফোঁটা দুধ দিতেও সক্ষম নয়।
নবি ﷺ অনুমতি নিয়ে সেই দুর্বল ছোটো ছাগীটিরই দুধ দোহাতে থাকেন। মু'জিযাস্বরূপ সেই ছাগীর ওলান এমনভাবে দুধে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে যে, বড় একটি পাত্র ভর্তি হয়ে যায়। চার পথিকই পেট পুরে দুধপান করেন। তারপর নবিজি আবারও দোহন করে আরও এক পাত্রভর্তি দুধ রেখে যান উম্মু মা'বাদের জন্য।
পথিকেরা চলে যাবার পর ফেরেন ঘরের কর্তা আবূ মা’বাদ। স্বামীর কাছে পুরো ঘটনার বর্ণনা দিলেন স্ত্রী। নবিজি ﷺ -এর এমন পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা শুনে আবূ মা'বাদ বলেন, “আরে! ইনি তো কুরাইশ বংশের সেই লোক, যার কথা কিছুদিন যাবৎ শুনে আসছি। কখনও সুযোগ পেলে অবশ্যই তাঁর অনুসারী হয়ে যাব।”
নবিজি ﷺ -এর মক্কাত্যাগের তৃতীয় দিনে এক অদৃশ্য কণ্ঠ মক্কায় ঘুরে ঘুরে কিছু কথা বলতে থাকে। এ মানুষের কণ্ঠ নয়; বরং একজন জিনের। সে বলছিল,
“মানবজাতির প্রতিপালক আল্লাহ তাআলা ওই দুই পথচারীকে রহম করুন। তারা উম্মু মা'বাদের তাঁবু পার হয়েছে। নিরাপদ যাত্রাবিরতি শেষে নিরাপদেই আবার পথচলা শুরু করেছে। যে-ই মুহাম্মাদের বন্ধু হয়, সে-ই সাফল্য পায়। হে কুরাইশ, মুহাম্মাদকে তাড়িয়ে দিয়ে তোমরা মর্যাদা আর ক্ষমতাকে দূরে ঠেলে দিলে। বানু কা'বের কী সৌভাগ্য! তাদের এক নারীর তাঁবু স্বয়ং মুহাম্মাদের আশ্রয় হয়েছে। নারীটিকে জিজ্ঞেস করো তার দুর্বল ছাগী আর দুধের পাত্রের ব্যাপারে। এমনকি সেই ছাগীও জানিয়ে দেবে কী ঘটেছে তার সাথে।”
নবি ﷺ এবং তাঁর সঙ্গীরা 'কাদীদ' ছেড়ে বেরুনোর সময় সুরাকা ইবনু মালিক ইবনি জু'শুম মুদলিজি নামের এক ব্যক্তি তাঁদের দেখে ফেলেন। পলাতকদের ধরে মক্কায় নিয়ে গিয়ে পুরস্কার পাবার লোভ জেগে ওঠে তার মনে। ঘোড়া ছুটিয়ে একটু এগোনো-মাত্রই প্রাণীটি পা হড়কে মাটিতে পড়ে যায়। সেও নিচে আছড়ে পড়ে। আরবের কুসংস্কার অনুযায়ী একটি তির বের করে ভাগ্য পরীক্ষা করল সুরাকা। ফলাফল এল নেতিবাচক। কিন্তু পুরস্কারের লোভে কুলক্ষণকে পাত্তা না দিয়েই আবার ঘোড়ায় চেপে বসল সে। এবার ঘোড়াটি এত দূর নিরাপদে দৌড়ে গেল যে, নবিজি ﷺ -এর কুরআন তিলাওয়াত সুরাকার কানে আসতে থাকে। এদিকে আবূ বকর বারবার পেছনে তাকাচ্ছেন আর উসখুস করছেন। অথচ নবিজি একেবারে নির্লিপ্ত। একটু পরেই ঘোড়ার সামনের পা দুটো একেবারে বালুতে দেবে গেল। আবারও উল্টে পড়ল আরোহী।
ঘোড়াকে গালি দিতে দিতে কোনোরকমে তার পা মাটি থেকে বের করে আনল সুরাকা। কিন্তু পেছনে তাকাতেই দেখল যে, ঘোড়ার পদচিহ্ন থেকে ধোঁয়ার মতো ওপরের দিকে উঠছে বালু। তাড়াতাড়ি আরেকটি তির বের করে এবারও ভাগ্যকে প্রতিকূলে পেল। অবশেষে তার মন মেনে নিল যে, মুহাম্মাদ ﷺ -কে বন্দি করা অসম্ভব। নিজে থেকেই নবিজিকে ডাক দিয়ে আত্মসমর্পণ করে। খাবারও সাধে পথিকদের। তবে তাঁরা সেটা নেননি। তবে নবি ﷺ এতটুকু অনুরোধ রাখতে বললেন, যাতে কুরাইশদের তাঁদের অবস্থান না জানানো হয়। সুরাকা তাতে রাজি হয়। ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য সে একটি চুক্তিনামা লিখে দেওয়ার অনুরোধ করে। নবিজির নির্দেশে চামড়ার একটি টুকরায় চিঠিটি লিখে দেন আমির।
সুরাকা তারপর মক্কায় ফিরে যান। অনুসন্ধানী প্রতিটি দলকে এই বলে ফিরিয়ে দেন যে, এই পুরো এলাকা তিনি ইতিমধ্যে খোঁজ করে ফেলেছেন, তাদের যে উদ্দেশ্য তা তিনিই সম্পূর্ণ করেছেন।
চার পথিকে যাত্রা পুনরারম্ভ করেন। একটু পরেই নবিজি ﷺ -এর দেখা হয় বুরাইদা ইবনু হুসাইব আসলামি ও তার অনুসারী প্রায় সত্তর-আশিটি পরিবারের সাথে। তারা সবাই ইসলাম কবুল করে নবিজির পেছনে ইশার সালাত আদায় করেন। উহুদের যুদ্ধের পর মদীনায় হিজরত করেন বুরাইদা।
‘আরজ' অঞ্চলে নবিজির সাথে আরও দেখা হয় আবূ তামিম আওস ইবনু হাজর আসলামির। একটি উট দুর্বল হয়ে পড়ায় তখন নবি ﷺ ও আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) একই উটের পিঠে ছিলেন। আবূ তামিম তাঁদের একটি উট দেন এবং মাসঊদ ইবনু হুনাইদা নামক এক দাসকেও সাথে পাঠিয়ে দেন। একেবারে ইয়াসরিব পর্যন্ত দাসটি তাঁদের সঙ্গ দেয়। আবূ তামিম মুসলিম হলেও হিজরত না করে নিজভূমে রয়ে যান। পরে উহুদের যুদ্ধের সময় মাসউদের মাধ্যমে মক্কার খবরাখবর আগাম মদীনায় পাঠিয়ে মুসলিম সেনাবাহিনীর বিরাট উপকার করেন তিনি।
রীম উপত্যকায় পৌঁছে নবি ﷺ যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর দেখা পান। তিনি সিরিয়াফেরত একটি ব্যবসায়ী কাফেলাকে সঙ্গ দিচ্ছিলেন। কাফেলাটি মুসলিমদেরই। নবি ﷺ ও আবূ বকরকে তিনি সাদা রঙের কাপড় উপহার দেন।
টিকাঃ
২৪৭. বুখারি, ৩৬১৫।
২৪৮. ইবনুল কাইয়িম, যাদুল মাআদ, ২/৫৩-৫৪; হাকিম, আল-মুসতাদরাক, ৩/৯-১০।
২৪৯. বুখারি, ৩৯০৬।
২৫০. ইবনুল আসীর, উসদুল গাবাহ, ১/২০৯।
২৫১. ইবনুল আসীর, উসদুল গাবাহ, ১/১৭৩; ইবনু হিশাম, ১/৪৯১।
২৫২. বুখারি, ৩৯০৬।