📄 দারুন নাদওয়ায় বৈঠকে কুরাইশ
আরব উপদ্বীপেই মুসলিম সমাজ বিকশিত হওয়ার জন্য একটি ভূমি পেয়ে গেছে, এটা কুরাইশদের কাছে অসহ্য মনে হলো। এমনকি উত্তর দিকের ব্যবসায়িক পথগুলো মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। সে ক্ষেত্রে মুশরিকদের ব্যবসা-বাণিজ্যে লাল বাতি জ্বলবে। আশঙ্কাটি একেবারে অমূলক নয়। উত্তর আরব ও সিরিয়ার মাঝে চলাচলকারী ব্যবসায়ী কাফেলাগুলোর ওপর মক্কাবাসীদের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। আবার স্বয়ং মুহাম্মাদ কবে ইয়াসরিবে পালিয়ে যান, সে দিকেও নজর রাখতে হচ্ছে। একবার গিয়ে অনুসারীদের সাথে মিলিত হতে পারলেই তিনি সেখানে গড়ে তুলবেন মুসলিমদের শক্ত ঘাঁটি। তাই যেকোনও মূল্যে তা এড়ানো দরকার। ঠেকানো দরকার।
দারুন নাদওয়া নামক সমাবেশকেন্দ্রে এ বিষয়ে আলোচনাসভার আয়োজন করা হলো। কুরাইশের বেশির ভাগ রুই-কাতলারা সেখানে হাজির হয়। কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা হলো, নাজদের সম্মানিত এক প্রবীণের রূপ ধরে সেখানে উপস্থিত হয়েছে স্বয়ং ইবলীস!
উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুল আসওয়াদ বলল, “চলুন মুহাম্মাদকে আমরাই বের করে দিই। তাহলেই আমরা চিরতরে মুক্তি পেয়ে যাব সমস্যাটা থেকে।
নাজদি প্রবীণের পছন্দ হলো না বুদ্ধিটা। বলল, “পাগল হয়েছেন? দেখেন না লোকটার কথায় কত মধু? কীভাবে সে মানুষের মন জয় করে নেয়! আপনারা ওকে নির্বাসনে পাঠালে সে আরেক জায়গায় গিয়ে অন্য কোনও গোত্রের মাথা খাবে। নতুন অনুসারী দল জুটিয়ে নেবে। তারপর আপনাদের শহর কব্জায় নিয়ে আপনাদের সাথে যাচ্ছেতাই আচরণ করবে। না, না! এ হতে পারে না। আপনারা অন্য কিছু ভাবুন।”
“যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিলে কেমন হয়? আগেকার কবিরা যেভাবে মারা যেত, সেভাবেই মারা যাবে সে।” আবুল বুখতারির পরামর্শ।
আবারও বাধা দিল নাজদি প্রবীণ, “বন্দি করার এই খবর তো একসময় তার অনুসারীদের কানে যাবেই। কসম করে বলছি যে, ওই ব্যাটারা নিজের বাপ-দাদা-সন্তানের চেয়েও বেশি ভালোবাসে নিজেদের এই নেতাকে। যদি তারা আক্রমণ করে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়, তখন? ওখানেই কি শেষ? ধীরে ধীরে আরও মানুষ দলে টানবে। তারপর একদিন ফিরে এসে আপনাদেরই উচ্ছেদ করবে। তাই, অন্য কোনও পরিকল্পনা করুন।"
শয়তানিতে ইবলীসের যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী আবূ জাহল অবশেষে নিজের কথাটা পাড়ল, “আমার একটা বুদ্ধি আছে। কেউই দেখি এখনও কথাটা তুললেন না। প্রতিটা গোত্র থেকে একজন করে শক্তিশালী, চালাক-চতুর আর সম্ভ্রান্ত যুবককে বেছে নিন। প্রত্যেকের হাতে থাকবে ধারালো তলোয়ার। এরা সবাই একসাথে মুহাম্মাদকে আক্রমণ করবে, একসাথেই আঘাত হেনে হত্যা করে আপদ বিদায় করবে। যেহেতু হত্যার দায়ভার সব গোত্রের ঘাড়ে সমানভাবে পড়বে, তাই বানু আবদি মানাফ সবার সাথে লড়াই করার সাহস পাবে না। বড়জোর রক্তপণ চাইবে আরকি। ওটা আমরা সহজেই দিয়ে দিতে পারব।"
এবার আনন্দে লাফিয়ে উঠল নাজদি প্রবীণ, “একদম কাজের কথা। এই যুবক যা বলেছে সেটাই হলো আসল কথা!"
অবশেষে এই সিদ্ধান্তই পাকাপোক্ত করে সভা শেষ করা হলো। ভালো একটা সমাধান পেয়ে সবার মনেই কিছুটা স্বস্তি। এখন কাজ হলো সেটার জন্য যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণ। [২৩৬]
টিকাঃ
[২৩৬] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/৪৮০-৪৮২।