📄 ইয়াসরিবে ইসলামের দাওয়াত
বাইআত গ্রহণকারীরা হাজ্জ শেষে ইয়াসরিবে ফিরে যান। নবিজি তাদের সাথে পাঠান আরেক সাহাবি মুসআব ইবনু উমাইর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে। উদ্দেশ্য, নব-মুসলিমদের কুরআন শেখানো। ইয়াসরিবে আবূ উমামা আসাআদ ইবনু যুরারা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ঘরে থাকেন মুসআব। দু'জনে মিলে পালন করেন অমুসলিমদের কাছে ইসলামের দাওয়াহ পৌঁছানোর মহান দায়িত্ব। একদিন মুসআব ও আবূ উমামা একটি বাগানে বসে ছিলেন। দূর থেকে তাদের খেয়াল করেন সা'দ ইবনু মুআয। তিনি আওস গোত্রের নেতা। জ্ঞাতিভাই উসাইদ ইবনু হুদাইরকে ডেকে বললেন, “গিয়ে ওদের একটা ধমকি দিয়ে আসুন তো! এরা আমাদের দুর্বল লোকদের বিভ্রান্ত করে চলেছে।” অস্ত্র হাতে এগিয়ে আসতে লাগলেন উসাইদ। মুসআবকে সতর্ক করে দিয়ে আসআদ বললেন, “আপনার নিকট নিজ গোত্রপ্রধান আসছে, তাকে আল্লাহর প্রতি দাওয়াত দিন।!"
উসাইদ এসে তাদের বললেন, “তোমরা দু'জন এখানে কী জন্য এসেছ? তোমরা বোকাসোকা লোকদের ফুসলাতে এসেছ? জানের মায়া থাকলে এখনই এখান থেকে চলে যাও!”
মুসআব ভয় না পেয়ে বললেন, “আপনিও নাহয় বসে একটু শুনুন আমাদের কথা। পছন্দ হলে মানবেন, না হলে মানবেন না!"
উসাইদ সতর্ক স্বরে বললেন, “ঠিক আছে, মন্দ বলোনি।” অস্ত্র রেখে বসে পড়লেন তিনি। মুসআব তার কাছে ইসলামের মৌলিক বিষয়াদি ব্যাখ্যা করলেন। তিলাওয়াত করে শোনালেন কুরআনের কিছু আয়াত। উসাইদ দেখলেন যে, কথাগুলোর সাথে দ্বিমত করার কিছু নেই। ফলে তখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করে নেন।
বদলে যাওয়া উসাইদ ফিরে আসেন সা'দ ইবনু মুআযের কাছে। ভাবলেন কীভাবে তাঁকেও তাদের কাছে নেওয়া যায়। ভেবে-চিন্তে বলেন, “কথা বললাম লোকগুলোর সাথে। খারাপ কিছু তো পেলাম না ওদের কথায়। তারপরও বলে দিয়েছি আর কারও সাথে যেন এসব কথা না বলে। আচ্ছা, বাদ দিন। শুনলাম আসআদ আপনার জ্ঞাতিভাই বলে বানু হারিসা নাকি তাকে মেরে ফেলার ধান্দা করছে? আপনার সাথে কৃত চুক্তি ভেঙে ফেলতে চায় তারা?
উসাইদের বুদ্ধি কাজে দিল। সা'দ রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে মুসআব ও আসআদের কাছে আসেন। মুসআব (রদিয়াল্লাহু আনহু) সুযোগ পেয়ে তাকেও একইভাবে ইসলামের দাওয়াত দেন। ওই বৈঠকেই ইসলাম গ্রহণ করেন সা'দ ইবনু মুআয (রদিয়াল্লাহু আনহু)। নবিজি ﷺ-এর প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং দৃঢ় ঈমানের জন্য এই সাহাবি বিশেষভাবে খ্যাত।
ঈমানে টইটম্বুর অন্তর নিয়ে সা'দ ফিরে যান স্বজাতির লোকদের কাছে। বলেন, “বানূ আবদিল আশহাল, শোনো! তোমরা আমাকে কেমন লোক বলে জানো?”
তারা সমস্বরে জবাব দেয়, “আপনি শুধু আমাদের নেতাই নন, সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তিও বটে।"
সা'দ বললেন, “বেশ। তাহলে শুনে রাখো। যারা আল্লাহ ও তাঁর নবির প্রতি বিশ্বাস করো না, তাদের পরিবারের সাথে আজ থেকে আমার কথা বলা বন্ধ।” ফলে সেই গোত্রের প্রতিটি নারী-পুরুষ মুসলিম হয়ে যান। বাদ থাকেন শুধু উসাইরিম। তিনি ইসলাম কবুল করেন উহুদ যুদ্ধের সময়। মুসলিম হওয়ার পর কোনও সালাতের ওয়াক্ত আসার আগেই উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন উসাইরিম (রদিয়াল্লাহু আনহু)। ইসলামের অন্য কোনও আ'মাল না করেই তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করেন এবং জান্নাতের অধিকারী হন।[২২১]
পরবর্তী হাজ্জের আগেই মুসআব (রদিয়াল্লাহু আনহু) মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন। আল্লাহ তাআলা কীভাবে ইয়াসরিবের লোকদের ইসলামের দিকে পথ দেখাচ্ছেন, এই খোশখবর নবিজি ﷺ-কে দেওয়ার জন্য তিনি তাঁর নিকট যাওয়ার প্রবল আগ্রহবোধ করেন।[২২২]
টিকাঃ
[২২১] আহমাদ, আল-মুসনাদ, ২৩৬৩৪; আবু নুআইম, মা'রিফাতুস সাহাবা, ১০৬৯।
[২২২] ইবনুল কাইয়িম, যাদুল মাআদ, ২/৫১; ইবনু হিশাম, ১/৪৩৫-৪৩৮।
📄 মুসলমানদের মদীনায় হিজরত
আকাবার দ্বিতীয় শপথের পর নাটকীয়ভাবে সমীকরণ পাল্টে যায়। ইয়াসরিবে এখন মুসলিমদের রয়েছে শক্ত ঘাঁটি। অনতিবিলম্বে স্বয়ং নবি ইয়াসরিবে হিজরতের আদেশ পান ওহির মাধ্যমে। সাহাবিদের বলেন, “আমাকে জানানো হয়েছে যে, মক্কা থেকে একদিন আমরা খেজুরভর্তি একটি ভূমিতে দেশান্তরী হবো। আমার মনে হলো সেটা ইয়ামামা অথবা হাজার। কিন্তু না সে জায়গা হলো ইয়াসরিব (মদীনা)।” [২৩১]
আরেকবার বলেছিলেন, “তোমরা যে ভূমিতে হিজরত করবে, সেটা আমাকে দেখানো হয়েছে। জায়গাটা আগ্নেয়গিরির দুটি পাহাড়ের মাঝে অবস্থিত। হয় হাজার, নয়তো ইয়াসরিব। "[২৩২]
নিরাপদ ভূমির প্রতিশ্রুতি পেয়ে কয়েকজন মুসলিম বাইআতের পরপরই ইয়াসরিবে চলে যান। প্রথম মুহাজির আবূ সালামা মাখযূমি (রদিয়াল্লাহু আনহু) অবশ্য দ্বিতীয় বাইআতের এক বছর আগেই স্ত্রী-সন্তানসহ হিজরতের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু উন্মু সালামাকে তার গোত্র বাধা দেয়, ফলে তিনি একাই ইয়াসরিবে যেতে বাধ্য হন তিনি। এক বছর পর উম্মু সালামা (রদিয়াল্লাহু আনহা)-কে স্বামীর কাছে চলে যাবার অনুমতি দেওয়া হয়।[২৩৩]
আবূ সালামার পর হিজরত করেন আমির ইবনু রবীআ ও তাঁর স্ত্রী লাইলা বিনতু আবী হাসমা এবং আবদুল্লাহ ইবনু উম্মি মাকতুম (রদিয়াল্লাহু আনহুম)। মক্কা থেকে বের হওয়াটা বেশ কঠিন কাজ ছিল। কারণ, কুরাইশরা সারাক্ষণ তক্কেতক্কে আছে। তবে উমর ইবনুল খাত্তাব (রদিয়াল্লাহু আনহু) দিন-দুপুরে সবার সামনে দিয়ে হিজরত করেন। একটা আঙুল তোলারও সাহস পায়নি কুরাইশরা। শুধু একা নন, সাথে করে আরও বিশ জন মুসলিমকে নিয়ে গিয়েছিলেন উমর।[২০৪]
ধীরে ধীরে প্রায় সকল মুসলিমই একসময় ইয়াসরিব চলে যান। এমনকি আবিসিনিয়ায় অবস্থানরত সাহাবিগণও বাইআতের খবর শোনার পর ইয়াসরিবে এসে অন্যদের সাথে মিলিত হন। তবে হিজরতে অক্ষম কিছু মুসলিমের সাথে মক্কায় থেকে যান আবূ বকর, আলি, সুহাইব এবং যাইদ ইবনু হারিসা (রদিয়াল্লাহু আনহুম)। নবিজি ﷺ-ও মক্কায় অবস্থান করে আল্লাহর হুকুমের অপেক্ষায় থাকেন। আবূ বকরকে বলেন তাঁর সাথে অপেক্ষায় থাকতে। আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকট দুটি দ্রুতগামী উট ছিল। তিনি সেগুলোকে নিয়মিত বাবলা পাতা খাইয়ে আরও তরতাজা করতে থাকেন, যাতে আল্লাহ তাআলার আদেশ আসামাত্র দ্রুত বেরিয়ে পড়া যায়।[২০৫]
টিকাঃ
[২৩১] বুখারি, ৩৬২২।
[২৩২] বুখারি, ২২৯৭।
[২৩৩] ইবনু হিশাম, ১/৪৬৮-৪৭০।
[২০৪] বুখারি, ৩৯২৫।
[২০৫] বুখারি, ২২৯৭।
📄 দারুন নাদওয়ায় বৈঠকে কুরাইশ
আরব উপদ্বীপেই মুসলিম সমাজ বিকশিত হওয়ার জন্য একটি ভূমি পেয়ে গেছে, এটা কুরাইশদের কাছে অসহ্য মনে হলো। এমনকি উত্তর দিকের ব্যবসায়িক পথগুলো মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। সে ক্ষেত্রে মুশরিকদের ব্যবসা-বাণিজ্যে লাল বাতি জ্বলবে। আশঙ্কাটি একেবারে অমূলক নয়। উত্তর আরব ও সিরিয়ার মাঝে চলাচলকারী ব্যবসায়ী কাফেলাগুলোর ওপর মক্কাবাসীদের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। আবার স্বয়ং মুহাম্মাদ কবে ইয়াসরিবে পালিয়ে যান, সে দিকেও নজর রাখতে হচ্ছে। একবার গিয়ে অনুসারীদের সাথে মিলিত হতে পারলেই তিনি সেখানে গড়ে তুলবেন মুসলিমদের শক্ত ঘাঁটি। তাই যেকোনও মূল্যে তা এড়ানো দরকার। ঠেকানো দরকার।
দারুন নাদওয়া নামক সমাবেশকেন্দ্রে এ বিষয়ে আলোচনাসভার আয়োজন করা হলো। কুরাইশের বেশির ভাগ রুই-কাতলারা সেখানে হাজির হয়। কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা হলো, নাজদের সম্মানিত এক প্রবীণের রূপ ধরে সেখানে উপস্থিত হয়েছে স্বয়ং ইবলীস!
উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুল আসওয়াদ বলল, “চলুন মুহাম্মাদকে আমরাই বের করে দিই। তাহলেই আমরা চিরতরে মুক্তি পেয়ে যাব সমস্যাটা থেকে।
নাজদি প্রবীণের পছন্দ হলো না বুদ্ধিটা। বলল, “পাগল হয়েছেন? দেখেন না লোকটার কথায় কত মধু? কীভাবে সে মানুষের মন জয় করে নেয়! আপনারা ওকে নির্বাসনে পাঠালে সে আরেক জায়গায় গিয়ে অন্য কোনও গোত্রের মাথা খাবে। নতুন অনুসারী দল জুটিয়ে নেবে। তারপর আপনাদের শহর কব্জায় নিয়ে আপনাদের সাথে যাচ্ছেতাই আচরণ করবে। না, না! এ হতে পারে না। আপনারা অন্য কিছু ভাবুন।”
“যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিলে কেমন হয়? আগেকার কবিরা যেভাবে মারা যেত, সেভাবেই মারা যাবে সে।” আবুল বুখতারির পরামর্শ।
আবারও বাধা দিল নাজদি প্রবীণ, “বন্দি করার এই খবর তো একসময় তার অনুসারীদের কানে যাবেই। কসম করে বলছি যে, ওই ব্যাটারা নিজের বাপ-দাদা-সন্তানের চেয়েও বেশি ভালোবাসে নিজেদের এই নেতাকে। যদি তারা আক্রমণ করে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়, তখন? ওখানেই কি শেষ? ধীরে ধীরে আরও মানুষ দলে টানবে। তারপর একদিন ফিরে এসে আপনাদেরই উচ্ছেদ করবে। তাই, অন্য কোনও পরিকল্পনা করুন।"
শয়তানিতে ইবলীসের যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী আবূ জাহল অবশেষে নিজের কথাটা পাড়ল, “আমার একটা বুদ্ধি আছে। কেউই দেখি এখনও কথাটা তুললেন না। প্রতিটা গোত্র থেকে একজন করে শক্তিশালী, চালাক-চতুর আর সম্ভ্রান্ত যুবককে বেছে নিন। প্রত্যেকের হাতে থাকবে ধারালো তলোয়ার। এরা সবাই একসাথে মুহাম্মাদকে আক্রমণ করবে, একসাথেই আঘাত হেনে হত্যা করে আপদ বিদায় করবে। যেহেতু হত্যার দায়ভার সব গোত্রের ঘাড়ে সমানভাবে পড়বে, তাই বানু আবদি মানাফ সবার সাথে লড়াই করার সাহস পাবে না। বড়জোর রক্তপণ চাইবে আরকি। ওটা আমরা সহজেই দিয়ে দিতে পারব।"
এবার আনন্দে লাফিয়ে উঠল নাজদি প্রবীণ, “একদম কাজের কথা। এই যুবক যা বলেছে সেটাই হলো আসল কথা!"
অবশেষে এই সিদ্ধান্তই পাকাপোক্ত করে সভা শেষ করা হলো। ভালো একটা সমাধান পেয়ে সবার মনেই কিছুটা স্বস্তি। এখন কাজ হলো সেটার জন্য যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণ। [২৩৬]
টিকাঃ
[২৩৬] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/৪৮০-৪৮২।