📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 মদীনায় ইসলামের হাওয়া

📄 মদীনায় ইসলামের হাওয়া


নুবুওয়াতের একাদশ বছরেও যথারীতি হাজ্জের আনুষ্ঠানিকতা চলতে থাকে। হাজীদের ভিড়ে ছিলেন খাযরাজ গোত্রের ছয় ব্যক্তি আসআদ ইবনু যুরারা, আওফ ইবনুল হারিস, রাফি' ইবনু মালিক, কুতবা ইবনু আমির, উকবা ইবনু আমির এবং জাবির ইবনু আবদিল্লাহ।
আরবদের পাশাপাশি অল্প কিছু ইয়াহূদি গোত্রের বাসস্থানও এই ইয়াসরিব। প্রায়ই সেখানে তাদের সাথে আরবদের জাতিগত দ্বন্দ্ব-কলহ মাথা চাড়া দিয়ে উঠত। ইয়াহুদি সংখ্যালঘুরা এই বলে হুমকি দিত যে, শীঘ্রই তাদের মাঝে একজন নবি আবির্ভূত হবেন। আরবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তিনি ইয়াহুদিদের নেতৃত্ব দেবেন। তখন পূর্বেকার আদ এবং ইরাম জাতির মতো কচুকাটা হবে আরবরা।[২১৭]
তাই ইয়াসরিববাসী আরবরা নবি আগমনের ব্যাপারটির সাথে কিছুটা হলেও পরিচিত ছিল।
ওই ছয় জন হাজী এক রাতে মিনায় অবস্থান করছিলেন। মক্কার ঠিক বাইরেই অবস্থিত এ জায়গাটি। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের দেখে এগিয়ে এলেন নবি। জিজ্ঞেস করলেন, "আপনারা কোন গোত্রের?”
তারা জবাব দিলেন, “খাযরাজ।”
"অর্থাৎ ইয়াহুদিদের মিত্র?”
"জি।”
“চলুন, কোথাও বসে কথা বলি।”
“ঠিক আছে, চলুন।”
নবিজি তাঁদের ইসলামের ব্যাপারে জানালেন, কুরআনের আয়াত শোনালেন এবং আহ্বান করলেন অদ্বিতীয় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার প্রতি ঈমান আনতে।
লোকগুলো নিজেদের মাঝে বলাবলি করলেন, "আরে! ইয়াহুদিরা আমাদের যার কথা বলে হুমকি দেয়, ওনাকে সেই ব্যক্তি বলেই মনে হচ্ছে! চলো, ওনার কাছে আনুগত্যের শপথ করে ফেলি।" সকলেই ইসলাম কবুল করে নিলেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে অনুযোগ করলেন, "আমাদের ওখানে পরিস্থিতি খুবই বাজে। আল্লাহ যদি আপনার মাধ্যমে আমাদের ঐক্যবদ্ধ করে দেন, তাহলে আপনাকে আমাদের জাতির লোকেরা কত যে সম্মান করবে!” এই নব-মুসলিমেরা কথা দিলেন যে, দেশে ফিরে তারা স্বজাতিকে ইসলামের দাওয়াত দেবেন। পরের হাজ্জ মৌসুমে নবি ﷺ-এর সাথে পুনর্বার দেখা করার প্রতিশ্রুতিও দিলেন।[২১৮]

টিকাঃ
[২১৭] ইবনুল কাইয়িন, যাদু মাআদ, ২/৫০।
[২১৮] ইবনু হিশাম, ১/৪২৮-৪৩০।

📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 আকাবার প্রথম বাইআত

📄 আকাবার প্রথম বাইআত


পরের বছর ঠিকই তাঁদের মধ্যকার পাঁচ জন এসে আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন। সাথে করে নিয়ে আসেন নতুন আরও সাত জন মুসলিমকে, পাঁচ জন খাযরাজের এবং দু'জন আওসের। খাযরাজ গোত্রের পাঁচ জন হলেন মুআয ইবনুল হারিস, যাকওয়ান ইবনু আবদিল কাইস, উবাদা ইবনুস সামিত, ইয়াযিদ ইবনু সা'লাবা এবং আব্বাস ইবনু উবাদা। আর আওস গোত্রের দু'জনের নাম আবুল হাইসাম ইবনুত তাইহান এবং উওয়াইম ইবনু সায়িদা। রদিয়াল্লাহু আনহুম।[২১৯]
এবারকার সাক্ষাৎও হলো মিনায়। নবিজি এখানে তাদের ইসলামের আরও কিছু বিষয় বুঝিয়ে দেন এবং বাইআত (আনুগত্যের শপথ) নিতে বলেন। ইতিহাসে এটি আকাবার প্রথম বাইআত নামে পরিচিত। এই বাইআত মূলত আল্লাহ ও মানুষের মাঝে একটি চুক্তি। চুক্তির শর্তগুলো হলো: আল্লাহর সাথে কোনও কিছুকে শরীক না করা, চুরি না করা, ব্যভিচার না করা, সন্তানদের হত্যা না করা, অপবাদ না দেওয়া এবং নবি ﷺ-এর আদেশ অমান্য না করা। এসব শর্ত যারা মেনে চলবে, তারা আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার লাভ করবে। আর যারা এর কোনও শর্ত ভঙ্গ করবে, অপরাধ প্রমাণিত হলে পৃথিবীতে এর শাস্তির প্রতিবিধান হবে। তবে আল্লাহ কারও পাপাচার গোপন রাখলে তিনি নিজেই তার বিচার করবেন। ক্ষমা করা ও শাস্তিপ্রদান উভয় অধিকারই রাখেন তিনি।[২২০]

টিকাঃ
[২১৯] ইবনু হিশাম, ১/৪৩১-৪৩৩।
[২২০] বুখারি, ৩৮৯৩।

📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 ইয়াসরিবে ইসলামের দাওয়াত

📄 ইয়াসরিবে ইসলামের দাওয়াত


বাইআত গ্রহণকারীরা হাজ্জ শেষে ইয়াসরিবে ফিরে যান। নবিজি তাদের সাথে পাঠান আরেক সাহাবি মুসআব ইবনু উমাইর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে। উদ্দেশ্য, নব-মুসলিমদের কুরআন শেখানো। ইয়াসরিবে আবূ উমামা আসাআদ ইবনু যুরারা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ঘরে থাকেন মুসআব। দু'জনে মিলে পালন করেন অমুসলিমদের কাছে ইসলামের দাওয়াহ পৌঁছানোর মহান দায়িত্ব। একদিন মুসআব ও আবূ উমামা একটি বাগানে বসে ছিলেন। দূর থেকে তাদের খেয়াল করেন সা'দ ইবনু মুআয। তিনি আওস গোত্রের নেতা। জ্ঞাতিভাই উসাইদ ইবনু হুদাইরকে ডেকে বললেন, “গিয়ে ওদের একটা ধমকি দিয়ে আসুন তো! এরা আমাদের দুর্বল লোকদের বিভ্রান্ত করে চলেছে।” অস্ত্র হাতে এগিয়ে আসতে লাগলেন উসাইদ। মুসআবকে সতর্ক করে দিয়ে আসআদ বললেন, “আপনার নিকট নিজ গোত্রপ্রধান আসছে, তাকে আল্লাহর প্রতি দাওয়াত দিন।!"
উসাইদ এসে তাদের বললেন, “তোমরা দু'জন এখানে কী জন্য এসেছ? তোমরা বোকাসোকা লোকদের ফুসলাতে এসেছ? জানের মায়া থাকলে এখনই এখান থেকে চলে যাও!”
মুসআব ভয় না পেয়ে বললেন, “আপনিও নাহয় বসে একটু শুনুন আমাদের কথা। পছন্দ হলে মানবেন, না হলে মানবেন না!"
উসাইদ সতর্ক স্বরে বললেন, “ঠিক আছে, মন্দ বলোনি।” অস্ত্র রেখে বসে পড়লেন তিনি। মুসআব তার কাছে ইসলামের মৌলিক বিষয়াদি ব্যাখ্যা করলেন। তিলাওয়াত করে শোনালেন কুরআনের কিছু আয়াত। উসাইদ দেখলেন যে, কথাগুলোর সাথে দ্বিমত করার কিছু নেই। ফলে তখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করে নেন।
বদলে যাওয়া উসাইদ ফিরে আসেন সা'দ ইবনু মুআযের কাছে। ভাবলেন কীভাবে তাঁকেও তাদের কাছে নেওয়া যায়। ভেবে-চিন্তে বলেন, “কথা বললাম লোকগুলোর সাথে। খারাপ কিছু তো পেলাম না ওদের কথায়। তারপরও বলে দিয়েছি আর কারও সাথে যেন এসব কথা না বলে। আচ্ছা, বাদ দিন। শুনলাম আসআদ আপনার জ্ঞাতিভাই বলে বানু হারিসা নাকি তাকে মেরে ফেলার ধান্দা করছে? আপনার সাথে কৃত চুক্তি ভেঙে ফেলতে চায় তারা?
উসাইদের বুদ্ধি কাজে দিল। সা'দ রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে মুসআব ও আসআদের কাছে আসেন। মুসআব (রদিয়াল্লাহু আনহু) সুযোগ পেয়ে তাকেও একইভাবে ইসলামের দাওয়াত দেন। ওই বৈঠকেই ইসলাম গ্রহণ করেন সা'দ ইবনু মুআয (রদিয়াল্লাহু আনহু)। নবিজি ﷺ-এর প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং দৃঢ় ঈমানের জন্য এই সাহাবি বিশেষভাবে খ্যাত।
ঈমানে টইটম্বুর অন্তর নিয়ে সা'দ ফিরে যান স্বজাতির লোকদের কাছে। বলেন, “বানূ আবদিল আশহাল, শোনো! তোমরা আমাকে কেমন লোক বলে জানো?”
তারা সমস্বরে জবাব দেয়, “আপনি শুধু আমাদের নেতাই নন, সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তিও বটে।"
সা'দ বললেন, “বেশ। তাহলে শুনে রাখো। যারা আল্লাহ ও তাঁর নবির প্রতি বিশ্বাস করো না, তাদের পরিবারের সাথে আজ থেকে আমার কথা বলা বন্ধ।” ফলে সেই গোত্রের প্রতিটি নারী-পুরুষ মুসলিম হয়ে যান। বাদ থাকেন শুধু উসাইরিম। তিনি ইসলাম কবুল করেন উহুদ যুদ্ধের সময়। মুসলিম হওয়ার পর কোনও সালাতের ওয়াক্ত আসার আগেই উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন উসাইরিম (রদিয়াল্লাহু আনহু)। ইসলামের অন্য কোনও আ'মাল না করেই তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করেন এবং জান্নাতের অধিকারী হন।[২২১]
পরবর্তী হাজ্জের আগেই মুসআব (রদিয়াল্লাহু আনহু) মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন। আল্লাহ তাআলা কীভাবে ইয়াসরিবের লোকদের ইসলামের দিকে পথ দেখাচ্ছেন, এই খোশখবর নবিজি ﷺ-কে দেওয়ার জন্য তিনি তাঁর নিকট যাওয়ার প্রবল আগ্রহবোধ করেন।[২২২]

টিকাঃ
[২২১] আহমাদ, আল-মুসনাদ, ২৩৬৩৪; আবু নুআইম, মা'রিফাতুস সাহাবা, ১০৬৯।
[২২২] ইবনুল কাইয়িম, যাদুল মাআদ, ২/৫১; ইবনু হিশাম, ১/৪৩৫-৪৩৮।

📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 মুসলমানদের মদীনায় হিজরত

📄 মুসলমানদের মদীনায় হিজরত


আকাবার দ্বিতীয় শপথের পর নাটকীয়ভাবে সমীকরণ পাল্টে যায়। ইয়াসরিবে এখন মুসলিমদের রয়েছে শক্ত ঘাঁটি। অনতিবিলম্বে স্বয়ং নবি ইয়াসরিবে হিজরতের আদেশ পান ওহির মাধ্যমে। সাহাবিদের বলেন, “আমাকে জানানো হয়েছে যে, মক্কা থেকে একদিন আমরা খেজুরভর্তি একটি ভূমিতে দেশান্তরী হবো। আমার মনে হলো সেটা ইয়ামামা অথবা হাজার। কিন্তু না সে জায়গা হলো ইয়াসরিব (মদীনা)।” [২৩১]
আরেকবার বলেছিলেন, “তোমরা যে ভূমিতে হিজরত করবে, সেটা আমাকে দেখানো হয়েছে। জায়গাটা আগ্নেয়গিরির দুটি পাহাড়ের মাঝে অবস্থিত। হয় হাজার, নয়তো ইয়াসরিব। "[২৩২]
নিরাপদ ভূমির প্রতিশ্রুতি পেয়ে কয়েকজন মুসলিম বাইআতের পরপরই ইয়াসরিবে চলে যান। প্রথম মুহাজির আবূ সালামা মাখযূমি (রদিয়াল্লাহু আনহু) অবশ্য দ্বিতীয় বাইআতের এক বছর আগেই স্ত্রী-সন্তানসহ হিজরতের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু উন্মু সালামাকে তার গোত্র বাধা দেয়, ফলে তিনি একাই ইয়াসরিবে যেতে বাধ্য হন তিনি। এক বছর পর উম্মু সালামা (রদিয়াল্লাহু আনহা)-কে স্বামীর কাছে চলে যাবার অনুমতি দেওয়া হয়।[২৩৩]
আবূ সালামার পর হিজরত করেন আমির ইবনু রবীআ ও তাঁর স্ত্রী লাইলা বিনতু আবী হাসমা এবং আবদুল্লাহ ইবনু উম্মি মাকতুম (রদিয়াল্লাহু আনহুম)। মক্কা থেকে বের হওয়াটা বেশ কঠিন কাজ ছিল। কারণ, কুরাইশরা সারাক্ষণ তক্কেতক্কে আছে। তবে উমর ইবনুল খাত্তাব (রদিয়াল্লাহু আনহু) দিন-দুপুরে সবার সামনে দিয়ে হিজরত করেন। একটা আঙুল তোলারও সাহস পায়নি কুরাইশরা। শুধু একা নন, সাথে করে আরও বিশ জন মুসলিমকে নিয়ে গিয়েছিলেন উমর।[২০৪]
ধীরে ধীরে প্রায় সকল মুসলিমই একসময় ইয়াসরিব চলে যান। এমনকি আবিসিনিয়ায় অবস্থানরত সাহাবিগণও বাইআতের খবর শোনার পর ইয়াসরিবে এসে অন্যদের সাথে মিলিত হন। তবে হিজরতে অক্ষম কিছু মুসলিমের সাথে মক্কায় থেকে যান আবূ বকর, আলি, সুহাইব এবং যাইদ ইবনু হারিসা (রদিয়াল্লাহু আনহুম)। নবিজি ﷺ-ও মক্কায় অবস্থান করে আল্লাহর হুকুমের অপেক্ষায় থাকেন। আবূ বকরকে বলেন তাঁর সাথে অপেক্ষায় থাকতে। আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকট দুটি দ্রুতগামী উট ছিল। তিনি সেগুলোকে নিয়মিত বাবলা পাতা খাইয়ে আরও তরতাজা করতে থাকেন, যাতে আল্লাহ তাআলার আদেশ আসামাত্র দ্রুত বেরিয়ে পড়া যায়।[২০৫]

টিকাঃ
[২৩১] বুখারি, ৩৬২২।
[২৩২] বুখারি, ২২৯৭।
[২৩৩] ইবনু হিশাম, ১/৪৬৮-৪৭০।
[২০৪] বুখারি, ৩৯২৫।
[২০৫] বুখারি, ২২৯৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00