📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 টুকরো হলো চাঁদ

📄 টুকরো হলো চাঁদ


অতিপ্রাকৃতিক কিছু ঘটতে না দেখে কুরাইশরা ভেবে বসল যে, মুহাম্মাদ ﷺ-এর দুর্বলতার জায়গাটা তারা পেয়ে গেছে। এবার তারা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার মতো স্বরে বলতে লাগল, অন্তত ছোটখাটো কোনও একটা নিদর্শন হলেও দেখাতে। ভেবেছিল এভাবে মুহাম্মাদ ﷺ-কে মিথ্যে নবি প্রমাণ করে চুপ করিয়ে দেওয়া যাবে।
নবি দুআ করলেন, যেন কুরাইশদের একটি মু'জিযা দেখানো হয়। অবশেষে আল্লাহ তাআলা উন্মোচিত করলেন স্পষ্ট এক মু'জিযা: চাঁদকে আধাআধি টুকরো করে এমন দূরত্বে স্থাপন করলেন যে, দুটি টুকরো হেরা পর্বতের দুই পাশে চলে গেল। একটি টুকরা জাবালু আবী কুবাইসের ওপর আর একটি তার নিচে চলে গেল। এমনকি লোকজন হেরা পর্বতকে চাঁদের দুই টুকরার মাঝে দেখছিল। নবি তখন বললেন, “সাক্ষী থেকো সবাই।”[২০১]
প্রথমে নিজেদের চোখকেই পৌত্তলিকরা বিশ্বাস করতে পারল না। আস্ত চাঁদ তাদের চোখের সামনে দুই ভাগ হয়ে গেছে। প্রথম ধাক্কাটা কাটিয়ে ওঠার পর তারা অজুহাত বের করল যে, এটা আবু কাবশার নাতির কোনও তুকতাকের ফল, "মনে হয় সে আমাদের চোখের ওপর জাদু করেছে। মক্কার বাইরে থেকে কোনও পথিক আসুক, ওদের জিজ্ঞেস করলেই জানা যাবে তারাও এ ঘটনা দেখেছে কি না।” বাইরে থেকে আসা প্রথম মুসাফির দলটিকেই তারা এ নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করল। দ্বিখণ্ডিত চাঁদ দেখার বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা স্বীকার করল তারাও।[২০২]
কুরাইশদের মুখ বন্ধ হয়ে গেল, কিন্তু তবু অন্তর থেকে কুফর বের হলো না।

টিকাঃ
[২০১] বুখারি, ৪৮৬৪।
[২০২] তাবারি, তাফসীর, ২৭/১১২; ইবনু কাসীর, তাফসীর, ৪/৩৩৪।

📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 ঊর্ধ্বাকাশে রাত্রিভ্রমণ—ইসরা ও মি’রাজ

📄 ঊর্ধ্বাকাশে রাত্রিভ্রমণ—ইসরা ও মি’রাজ


নবিজীবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ঘটনা ইসরা ও মি'রাজ। এক রাতের কিছু অংশে নবিজি ﷺ-কে আল্লাহ তাআলা মক্কার কা'বা থেকে বাইতুল মাকদিসে ভ্রমণ করান। এটাকে বলা হয় ইসরা বা রাতের ভ্রমণ। আর আকসা থেকে নবিজিকে ঊর্ধ্বাকাশে তুলে নেওয়া হয়। একে বলা হয় মি'রাজ বা ঊর্ধ্বগমন। কুরআনে ইসরা সম্পর্কে বলা হয়েছে,
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ (1) “সুমহান সেই সত্তা, যিনি তাঁর দাসকে রাতের একাংশে মাসজিদুল হারাম (কা'বা) থেকে মাসজিদুল আকসায় ভ্রমণ করিয়েছেন, যার চারপাশের ভূমিকে তিনি করেছেন বরকতময়। যাতে আমি তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাতে পারি। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বদর্শী।”[২০৩]
আর মি'রাজের কথা সূরা নাজমের সপ্তম থেকে অষ্টাদশ আয়াতে বলা হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন, এগুলো দ্বারা মি'রাজ উদ্দেশ্য নয়।
ইসরা-মি'রাজ কোন বছরে হয়েছিল, তা নিয়ে মতানৈক্য আছে। সবগুলো মত নিচে উল্লেখ করা হলো, [২০৪]
১. নুবুওয়াতের প্রথম বছরে
২. পঞ্চম বছরে
৩. দশম বছরের ২৭ রজব
৪. দ্বাদশ বছরের ১৭ রমাদান
৫. ত্রয়োদশ বছরের মুহাররম বা রবীউল আউয়াল মাসের ১৭ তারিখ।
ইসরা ও মি'রাজের ঘটনা যেমন চমকপ্রদ, তেমনি শিক্ষণীয়। বিশুদ্ধ বর্ণনানুসারে ঘটনাটির সারসংক্ষেপ হলো-জিবরীল (আলাইহিস সালাম) কা'বায় এসে উপস্থিত হন। সাথে ছিল বুরাক নামক একটি বাহন, খচ্চরের চেয়ে খানিক বড় আর গাধার চেয়ে খানিক ছোট এক প্রাণী। এর প্রতিটি পদক্ষেপ দৃষ্টির শেষ সীমায় গিয়ে পড়ে। নবি শুভ্র ও জিবরীল বুরাকে চড়ে ফিলিস্তিনের আল-আকসায় বাইতুল মাকদিসে পৌঁছান। মাসজিদের বাইরে যেখানটায় আগেকার নবিগণ তাঁদের বাহনের রশি বাঁধতেন, সেখানেই বুরাককে বেঁধে রাখেন।
মাসজিদে ঢুকে মুহাম্মাদ দেখেন যে, অতীতের সকল নবি সেখানে উপস্থিত। এরপর তিনি দুই রাকাআত সালাতে তাঁদের ইমামতি করেন। জিবরীল তাঁর কাছে তিনটি পাত্র নিয়ে আসেন। একটিতে মদ, একটিতে দুধ আর একটিতে মধু।[২০৫] যেকোনও একটি বেছে নিতে বলা হলে নবিজি দ্বিতীয়টি বেছে নেন। জিবরীল এ ব্যাপারে জানান, “আপনার স্বভাবের পবিত্রতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ জিনিসটিই বেছে নিয়েছেন। তাই আপনি ও আপনার অনুসারীরা লাভ করেছে সঠিক পথের দিশা। যদি মদ বেছে নিতেন, তাহলে আপনার অনুসারীরা পথভ্রষ্ট হয়ে যেত।”
এরপর নবি ﷺ-কে বাইতুল মাকদিস থেকে নেওয়া হয় প্রথম আসমানে। জিবরীল দরজা খোলার অনুরোধ করেন। সেখানে ঢুকে আল্লাহর রাসূল দেখা পান প্রথম মানব ও নবি আদম (আলাইহিস সালাম)-এর। দু'জনে সালাম বিনিময়ের পর আদম (আলাইহিস সালাম) মুহাম্মাদ-কে আল্লাহর নবি বলে সাক্ষ্য দেন। আদম তাঁর ডান দিকে তাকিয়ে হাসেন, তারপর বামে তাকিয়ে কাঁদেন। মুহাম্মাদ তাঁর দৃষ্টির অনুসরণ করে তাকিয়ে দেখলেন ডানে দাঁড়িয়ে রয়েছে মুমিনগণ, আর বামদিকে কাফিররা।
একইভাবে দ্বিতীয় আসমানে গিয়ে দেখা হয় দুই জ্ঞাতিভাই ইয়াহইয়া ইবনু যাকারিয়া ও ঈসা ইবনু মারইয়াম (আলাইহিমুস সালাম)-এর সাথে। তৃতীয় আসমানে ইউসুফ, চতুর্থ আসমানে ইদরীস এবং পঞ্চম আসমানে হারুন (আলাইহিমুস সালাম)-এর সাথে সাক্ষাৎ হয়। একইভাবে সালাম বিনিময় হয় ও সবাই নবি ﷺ-এর নুবুওয়াতের সাক্ষ্য প্রদান করেন।
ষষ্ঠ আসমানে ছিলেন মূসা (আলাইহিস সালাম)। যথারীতি সালাম বিনিময় ও সাক্ষ্য প্রদান শেষে মূসা হঠাৎ কাঁদতে শুরু করেন। কারণ, জিজ্ঞাসা করা হলে বলেন, “কাঁদছি, কারণ আমার চেয়ে তরুণ এক ব্যক্তিকে আমার পরে নবি মনোনীত করা হয়েছে। অথচ জান্নাতে আমার অনুসারীদের চেয়ে তাঁর অনুসারীর সংখ্যাই বেশি হবে।"
সপ্তম আসমানে গিয়ে দেখা মেলে বাইতুল মা'মূরে হেলান দিয়ে থাকা ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর সাথে। আসমানি ওই মাসজিদে প্রতিদিন সত্তর হাজার ফেরেশতা তওয়াফ করেন, কিয়ামাতের আগে তারা আর দ্বিতীয়বার তওয়াফের সুযোগ পাবেন না। বংশধরের সাথে একইভাবে সালাম বিনিময় ও সাক্ষ্য প্রদান করেন ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)।
এরপর মুহাম্মাদ ﷺ-কে নিয়ে যাওয়া হয় সিদরাতুল মুনতাহায়। জান্নাতি এই গাছটির একেকটি পাতা হাতির কানের সমান, আর ফলগুলো কলসের সমান বড়। স্বর্ণালি আলোকপতঙ্গে ঘেরা গাছটির সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।
এরপর নবিজি ﷺ-কে নেওয়া হয় স্বয়ং মহান প্রতিপালক আল্লাহর সান্নিধ্যে। মানুষের পার্থিব চোখ আল্লাহর সুমহান সত্তাকে ধারণ করতে অক্ষম। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা, নবি ﷺ সেখানে আল্লাহ তাআলার বিশেষ সান্নিধ্যে অবস্থান করেছেন, যে সৌভাগ্য আর কারও হয়নি। আল্লাহ তাআলা উম্মাতে মুহাম্মাদের ওপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাতের বিধান সেখানেই প্রদান করেন। ফিরে যাবার পথে মূসা (আলাইহিস সালাম) মুহাম্মাদ ﷺ-কে থামিয়ে জিজ্ঞেস করেন আল্লাহ তাআলা কী আদেশ করেছেন? পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাতের কথা শুনে পরামর্শ দেন, “আপনার অনুসারীরা অনেক দুর্বল। ওরা এত পারবে না। আপনি প্রতিপালকের কাছে গিয়ে আরেকটু হালকা করিয়ে আনুন।”
এভাবে বারকয়েক আসা-যাওয়া করে ফরজ সালাতের সংখ্যা পাঁচে নামিয়ে আনা হয়। তারপরও মূসা (আলাইহিস সালাম) বলেন, “না, তাও বেশি হয়ে যাচ্ছে। বানী ইসরাঈলের ওপর এর চেয়ে কম দায়িত্ব ছিল। সেটাও তারা করতে পারেনি।” কিন্তু এবার রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, "আমার এখন আল্লাহ তাআলার কাছে যেতে লজ্জা হচ্ছে; বরং এতেই আমি সন্তুষ্ট এবং অনুগত।” একটি কণ্ঠ থেকে ঘোষিত হয়, “আমি বান্দাদের প্রতি আমার আদেশ হালকা করে দিয়েছি। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করলেই তারা পঞ্চাশ ওয়াক্তের সমান প্রতিদান পাবে। আমার আদেশ পরিবর্তিত হয় না।”[২০৬]
ওই রাতেই মক্কায় ফিরে আসেন নবি ﷺ। পরদিন সকালে এই অলৌকিক যাত্রার কথা বলেন সবাইকে। মুশরিকরা যথারীতি উড়িয়েই দিল কথাটা। কেউ ছুটে গেল আবূ বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে। ভাবল, মুহাম্মাদের প্রতি আবূ বকরের দৃঢ় বিশ্বাসকে এবার নাড়িয়ে দিতে পারবে। কিন্তু সব শুনে আবূ বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, “যদি তিনি তা-ই বলে থাকেন, তবে তা নিশ্চয়ই সত্য।” আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর এই উক্তি প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম জুড়ে মুসলিমদের অনুপ্রেরণার খোরাক। বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর নবি বলে যাকে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে, কেন তিনি স্থান-কালের সীমানা পেরিয়ে ভ্রমণ করতে পারবেন না? সেদিন থেকে আবু বকরের উপাধি হয় 'সিদ্দীক' বিশ্বাসী। [২০৭]
আল-আকসা ও সেখানকার মাসজিদ সম্পর্কে জানাশোনা থাকা মুশরিকরা এ বিষয়ে নবিজি ﷺ-কে মুহুর্মুহু প্রশ্ন করতে লাগল তাঁকে মিথ্যেবাদী প্রমাণ করার মাতাল নেশায়। নবি সবকিছুর এত পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করলেন যে, তাতে কয়টি দরজা, কয়টি জানালা, সেগুলো পর্যন্ত বলে দিলেন। কিন্তু কেউ তাতে কোনও ভুল ধরতে পারল না। [২০৮]
শুধু তা-ই না। জেরুসালেম (আল-আকসা) থেকে মক্কা অভিমুখী একটি কাফেলার উটসংখ্যা, অবস্থা, মক্কায় পৌঁছানোর সময়ও বলে দেন নবিজি । পরে ঠিকই সেই কাফেলা নবিজির বলে দেওয়া সময়ে মক্কায় এসে হাজির হয়। সবকিছুই নবিজির বর্ণনার সাথে হুবহু মিলে যায়। [২০৯]
পৌত্তলিকরা তবু আপন ভ্রান্তিতে অনড় থাকে। গোমরাহির অতলে পড়ে থাকে।
সেদিন সকালেই জিবরীল (আলাইহিস সালাম) অবতরণ করে নবিজি ﷺ-কে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায়ের নিয়মকানুন শেখান। সেদিন থেকে সকাল-সন্ধ্যা দু-বেলার পরিবর্তে দিনে পাঁচবার সালাত আদায় শুরু হয়।

টিকাঃ
[২০৩] সূরা ইসরা, ১৭: ১।
[২০৪] এগুলোর সাথে আরও মত রয়েছে। দেখুন, ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি, ৭/২৪২; ইবনুল কাইয়িম, যাদুল মাআদ, ২/৪৯।
[২০৫] আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৪/২০৮।
[২০৬] বুখারি, ৩৪৯।
[২০৭] ইবনু হিশাম, ১/৩৪৯।
[২০৮] বুখারি, ৩৮৮৬।
[২০৯] ইবনু হিশাম, ১/৪০২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00