📄 দেশে-বিদেশে পরাজিত মুশরিকপক্ষের পেরেশানি
ঘরে-বাইরে একের পর এক পরাজয়ে মুশরিকদের মরিয়া ভাব বাড়তে থাকে। বিদেশের মাটিতে রাজদরবারে তাদের গোত্রের নাম ডুবেছে স্রেফ একটি ছোট্ট শরণার্থীদলের কারণে। এ অপমান মেনে নেওয়া যায় না। রক্তের মাধ্যমে হলেও তারা মুসলিমদের কাছ থেকে এর মূল্য বুঝে পেতে বদ্ধপরিকর হয়।
কিন্তু কী করে? আবূ তালিব এখনও ভাতিজার সমর্থনে বটবৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে। কোনও ছল-চাতুরিতেই তাঁকে টলানো যাচ্ছে না। চাচার নিরাপত্তাবলয়ে মুহাম্মাদ অবাধে নিজের মিশন চালিয়ে যাচ্ছেন। এখন পর্যন্ত নির্যাতন, হত্যাচেষ্টা, ঘুষ, তর্ক, এমনকি সমঝোতার মাধ্যমেও কোনও ফলাফল আসেনি।
ঘরে-বাইরে একের পর এক পরাজয়ে মুশরিকদের মরিয়া ভাব বাড়তে থাকে। বিদেশের মাটিতে রাজদরবারে তাদের গোত্রের নাম ডুবেছে স্রেফ একটি ছোট্ট শরণার্থীদলের কারণে। এ অপমান মেনে নেওয়া যায় না। রক্তের মাধ্যমে হলেও তারা মুসলিমদের কাছ থেকে এর মূল্য বুঝে পেতে বদ্ধপরিকর হয়।
কিন্তু কী করে? আবূ তালিব এখনও ভাতিজার সমর্থনে বটবৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে। কোনও ছল-চাতুরিতেই তাঁকে টলানো যাচ্ছে না। চাচার নিরাপত্তাবলয়ে মুহাম্মাদ অবাধে নিজের মিশন চালিয়ে যাচ্ছেন। এখন পর্যন্ত নির্যাতন, হত্যাচেষ্টা, ঘুষ, তর্ক, এমনকি সমঝোতার মাধ্যমেও কোনও ফলাফল আসেনি।
📄 নবিজি ﷺ-এর প্রতি নির্যাতন বৃদ্ধি ও হত্যার প্রচেষ্টা
আবিসিনিয়ার দরবারে পরাজয়ের রাগ কুরাইশরা স্বভাবতই হাতের কাছে থাকা মুসলমানদের ওপর প্রকাশ করতে লাগল।
নবিজি ﷺ-এর মেয়ে উম্মু কুলসূম (রদিয়াল্লাহু আনহা)-কে তালাক দেওয়া সেই উতাইবা ইবনু আবী লাহাব এবার নবিজি ﷺ-এর কাছে এল। সূরা নাজমের এই আয়াতটি:
ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّى ﴿৮﴾ فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى ﴿৯﴾
“অতঃপর নিকটবর্তী হলো ও ঝুলে গেল। তখন দুই ধনুকের ব্যবধান ছিল অথবা আরও কম।” [১৪৫]
উদ্ধৃত করে বলল, “এই কথা যে বানিয়েছে, আমি তাকে অবিশ্বাস করি।” কুরাইশদের ওই সাজদার ঘটনার জ্বালা প্রশমন করতেই মূলত জোর করে এই কথা বলা।
ধীরে ধীরে এই উতাইবা লোকটা নবিজি ﷺ-এর জন্য বিরতিহীন বিরক্তির উৎসে পরিণত হতে শুরু করে। একবার সে এমনকি নবিজির জামা টেনে ছিঁড়ে ফেলে এবং মুখে থুতু মেরে বসে। আল্লাহর রাসূল জবাবে বদদুআ করেন, “হে আল্লাহ, আপনার একটি কুকুরকে এর ওপর লেলিয়ে দিন।”
এর অল্প কিছুকাল পরের ঘটনা। এক কাফেলার সাথে সিরিয়ায় যায় উতাইবা। ‘যারকা’ নামক স্থানে যাত্রাবিরতির সময়ে একটি সিংহ এসে কাফেলার চারপাশে ঘুরতে থাকে। আতঙ্কিত উতাইবা চিৎকার করে ওঠে, “ইয়া আল্লাহ, এটা নিশ্চিত আমাকে খাওয়ার জন্য এসেছে! মুহাম্মাদের প্রার্থনা দেখি সত্যি হয়ে গেল! মক্কায় বসে সে আমাকে সিরিয়ায় খুন করে ফেলছে!”
রাতে ঘুমানোর সময় কাফেলার লোকেরা উতাইবাকে একদম মাঝখানে শুতে দিল। তা সত্ত্বেও সিংহটি সব উট আর মানুষকে পাশ কাটিয়ে উতাইবার গায়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে। থাবা দিয়ে মাথা ছিঁড়ে ফেলে ওই দুরাত্মাটির ভবলীলা সাঙ্গ করে দেয়।[১৪৬]
মক্কার ঘরে ঘরে নবি ﷺ-এর শত্রু। আগে একবার সাজদারত নবিজির ঘাড়ে উটের নাড়িভুঁড়ি তুলে দেওয়া উকবা ইবনু আবী মু'আইত আবারও হাজির হলো সালাতের সময়ে। এবার রাসূলুল্লাহ সাজদায় গেলে তাঁর ঘাড়ে পা রেখে সে এত জোরে চাপ দেয় যে, নবিজির চোখ ফেটে যাবার উপক্রম হয়।[১৪৭]
অবশেষে যখন কিছুতেই নবি ﷺ-কে ঠেকানো গেল না, তখন মুশরিকরা তাঁকে হত্যা করার পরিকল্পনার দিকে বিশেষ মনোযোগ দিল। গোত্রকেন্দ্রিক সমাজে এ ধরনের হত্যা অল্পতে শেষ হয়ে যায় না। একটি হত্যাকাণ্ডের জের ধরে বিশাল রক্তপাত হয়। বহুদিন ধরে চলতে থাকে এর গরম হাওয়া। তবু তাদের আর তর সইছিল না। আবূ জাহল কুরাইশদের মাঝে ঘোষণা করল,
“দেখতেই তো পাচ্ছেন, মুহাম্মাদ কতটা বেপরোয়া হয়ে তার মতো সে কাজ করেই যাচ্ছে। পূর্বপুরুষদের অস্বীকার করছে, তাদের পথভ্রষ্ট বলে অপমানিত করছে, আমাদের মূর্খ বলে ডাকছে, আর দেব-দেবীদের বিরুদ্ধকথা প্রচার করেই চলেছে সে। আমি আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি। একদিন আমি ভারী একটি পাথর নিয়ে অপেক্ষায় থাকব। সে সাজদায় যাওয়ামাত্রই ওটা দিয়ে ওর মাথা গুঁড়িয়ে দেবো। এরপর তোমরা বানু আবদি মানাফের আক্রোশ থেকে চাইলে আমাকে বাঁচাতেও পারো, অথবা চাইলে ওদের হাতে তুলেও দিতে পারো।”
লোকজন আশ্বস্ত করল, “চিন্তা করবেন না। আল্লাহর কসম! আমরা কখনও আপনাকে ছেড়ে যাব না। যা চান, তা-ই করুন।”
সমর্থকদের উৎসাহ পেয়ে আবু জাহলও দেরি করল না। পরদিন ঠিকই ভারী একটি পাথর নিয়ে অপেক্ষায় রইল। নবি যথারীতি কা'বায় এসে সালাতে দাঁড়ালেন। কা'বার চারপাশে জায়গায় জায়গায় জটলা পাকিয়ে বসে ছিল কুরাইশরা। আবূ জাহল কী করে, তা দেখতে সবাই অপেক্ষমাণ। আবূ জাহল কার্যসমাধা করতে এগিয়ে গেল ঠিকই। কিন্তু পরক্ষণেই পেছনে ঘুরে দিল দৌড়। চেহারা ফ্যাকাসে, দৃষ্টি উদ্ভ্রান্ত, হাতে তখনো শক্ত করে ধরা সেই পাথর। কুরাইশরা ব্যস্তসমস্ত হয়ে তাকে ধরে শান্ত করল। জিজ্ঞেস করল, “আবুল হাকাম, হঠাৎ কী হলো?”
সে বলল “আমি তো কথামতো কাজ করতেই যাচ্ছিলাম, কিন্তু হঠাৎ কোত্থেকে একটা উট এসে হাজির। আল্লাহর কসম! এত বড় মাথা, গলা আর দাঁতওয়ালা উট আমি জীবনেও দেখিনি। আমাকে খেয়ে ফেলতে আসছিল ওটা।”
নবি পরে বলেছিলেন, "সেটা আসলে জিবরীল ছিল। যদি সে আমার নিকটবর্তী হতো তাহলে সে তাকে ধরে ফেলত।” [১৪৮]
তবে এতকিছুর পরও অন্যান্য কুরাইশ নেতারা আবূ জাহলের অভিজ্ঞতা থেকে কোনও শিক্ষা নেয়নি। একদিন নবিজি কা'বা তওয়াফ করছিলেন। আশপাশে থাকা কুরাইশরা তাঁকে উদ্দেশ্য করে টিটকারি মারতে থাকে। রাসূলুল্লাহ যত বিরক্ত হন, তাদের টিটকারি-মশকরা তত বাড়ে। অবশেষে আল্লাহর রাসূল থেমে তাদের মুখের ওপর বললেন, “হে কুরাইশের লোকসকল, তোমরা কি শুনছ? যেই সত্তার হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম! আমি তোমাদের হত্যা ও যবাই করার আদেশ নিয়ে এসেছি!” [১৪৯]
নবিজির মুখে এমন কথা শুনে মশকরাকারীদের বুক ধক করে ওঠে। কিছুক্ষণ নীরব থেকে তারা নরম-সরম কথা বলে মুহাম্মাদ ﷺ-কে নিরস্ত করতে চেষ্টা করে।
পরদিন আবার ওই একই লোকেরা নতুন করে সাহস সঞ্চয় করে কা'বায় আসে। বলাবলি করতে থাকে মুহাম্মাদ সম্পর্কে। একটু পর নবিজি হাজির হতেই তেড়েফুঁড়ে এল তারা। নবিজির জামা টানতে টানতে বলল, “তুই-ই তো সেই লোক না, যে আমাদের বাপ-দাদাদের দেবতাদের ভুলে যেতে বলে?”
নবি একটুও ভয় না পেয়ে বলেন, “হ্যাঁ। আমিই সেই লোক।”
উন্মাদ হয়ে থাকা জটলাটার কেউ তাঁকে ধাক্কাধাক্কি করতে থাকে, কেউ ছোটায় গালির তুবড়ি। নবিজির গলার কাপড় টেনে ধরে উকবা ইবনু আবী মু'আইত তাঁর শ্বাসরোধ করে ফেলার জোগাড় করে। কোলাহল শুনে দৌড়ে আসেন আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)। উকবার কাঁধে সজোরে টান দিয়ে তার কাছ থেকে মুহাম্মাদ-কে ছাড়িয়ে নেন। তারপর প্রতিটা ব্যক্তিকে টেনেটুনে নবিজির কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে থাকেন। বলেন, “ওরে হতাভাগার দল! তোমাদের জন্য আফসোস! একজন মানুষ আল্লাহকে নিজের রব বলছে দেখেই বুঝি তোমরা তাকে মেরে ফেলতে চাও?”
উত্তেজিত মুশরিকরা এবার নবিজি ﷺ-কে ছেড়ে দিয়ে আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)- কে ধরল। নবিজিকে নিরাপদ রাখতে তিনি জীবন দিতেও প্রস্তুত। সেদিন আবূ বকরকে এত মারা হয় যে, তাঁর চেহারা থেকে নাক আলাদা করে বোঝা যাচ্ছিল না। তাঁর গোত্র বানু তাইমের লোকেরা তাঁকে পরে জড়াজড়ি করে ঘরে পৌঁছে দেয়। সবাই ধরেই নিয়েছিল যে, তিনি পরেরদিন পর্যন্ত আর বাঁচবেন না।
কিন্তু আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) সেদিন সন্ধ্যায়ই কথা বলতে আরম্ভ করেন। সন্ধ্যায় জ্ঞান ফেরার পর প্রথমেই জানতে চান মুহাম্মাদ কেমন আছেন। এত প্রাণপণ ভক্তি দেখে প্রচণ্ড তিরস্কার করে গোত্রের লোকেরা। নিজের স্বাস্থ্য ঠিক রাখা তো দূরের কথা, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুস্থতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার আগে তিনি সেদিন খাবার- পানিও ছুঁয়ে দেখেননি। ওই আঁধারের মাঝেই তাঁকে দারুল আরকামে নিয়ে যাওয়া হয়। নবিজিকে জীবিত ও সুস্থ দেখে তারপরেই তিনি খাবার-পানীয় গ্রহণ করেন।[১৫০]
হিজরতের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগ পর্যন্ত আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) মুহুর্মুহু নির্যাতনের শিকার হন। অবশেষে একদিন আবিসিনিয়ার উদ্দেশে মক্কা ছেড়ে রওনা দেন তিনি। পথে 'বার্ক গিমাদ' নামক একটি জায়গা পড়ে। সেখানে দেখা হয় মালিক ইবনুদ দাগিনার সাথে। তিনি বিখ্যাত 'কারা' ও 'আহাবীশ' গোত্রের নেতা। আবু বকরের মক্কাত্যাগের কারণ জানতে চান মালিক। সব শুনে নাখোশ হয়ে বলেন, “আপনি অভাবীদের কত সাহায্য করেন, পরিবারের সাথে ভালো আচরণ করেন, অভাগাদের বোঝা বয়ে নেন, মেহমানের কদর করেন, সত্যের জন্য কষ্ট সহ্য করা মানুষদেরও আশ্রয় দেন। আপনার মতো মানুষকে আবার বহিষ্কার করে কীভাবে? এক কাজ করুন। আপনি আমার সাথে চলুন। নিজের শহরেই নিজের রবের উপাসনা করবেন, আসুন।"
মালিকের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি মেনে নেন আবু বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)। দু'জনে একসাথে ফিরে যান মক্কায়। মালিক ঘোষণা করে দেন যে, তিনি আবূ বকরকে নিরাপত্তা দিয়েছেন। তবে শর্ত হলো যে, তিনি শুধু ঘরের ভেতর লোকচক্ষুর আড়ালে সালাত আদায় করবেন। পৌত্তলিকরা কিছুটা হলেও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। ইসলামের প্রকাশ্য প্রচারণা দেখে তাদের নারী, শিশু এবং সরল মানুষেরা কখন বিগড়ে যায়, এ নিয়ে তারা বেশ ভয়েই থাকত।
আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) কিছুদিন সে শর্ত মেনে চলেন। পরে একদিন বারান্দায় সালাত আদায় ও কুরআন তিলাওয়াত করতে শুরু করেন। ফলে আবারও মানুষজন তাঁকে ইবাদাতরত অবস্থায় দেখতে পায়। ইবনুদ দাগিনা সে খবর পেয়ে তাঁকে নিরাপত্তার শর্তের কথা মনে করিয়ে দেন। আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) ভেবেচিন্তে অবশেষে ইবনুদ দাগিনার প্রতিশ্রুতি বাতিল করে ফেলেন। তিনি বলেন, “আমার রবের দেওয়া নিরাপত্তা পেয়েই আমি খুশি।”
আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর এই ভক্তি কোনও লোকদেখানো বিষয় নয়। তাঁর অন্তর ছিল সত্যিই কোমল। তিনি অত্যধিক কান্নাকাটি করতেন। আল্লাহর পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি, শাস্তির হুমকি, সৃষ্টিজগতের বর্ণনা, আগেকার নবিদের ঘটনা কুরআনে পড়তে পড়তে অশ্রুসজল হয়ে উঠত তাঁর চোখ। কুরআনের প্রতি এই আবেগ দেখে মুশরিকদের নারী ও শিশুরা তাঁর আশপাশে ভিড় জমাত, তাঁকে কাঁদতে দেখে তারাও কাঁদত এবং তন্ময় হয়ে শুনত। গোঁয়ার মুশরিকদের কাছে এই জিনিস আবার অসহনীয় হয়ে উঠতে থাকে। এর কারণেও তারা আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে কষ্ট দিত।[১৫১]
কিন্তু ইসলামের প্রতি এই কঠোর অবস্থান সকল মক্কাবাসীর বৈশিষ্ট্য ছিল না। কিছু মানুষ ছিলেন পৌত্তলিক সমাজে স্তম্ভের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নবিজির বার্তা নিয়ে একান্তে ভাবতে গেলে এদের অন্তরের পাথর ঠিকই গলতে শুরু করত। গোটা কুরাইশদের বিরোধিতার মুখেও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অটল সাহস ও অবিচল ধৈর্য দেখে অভিভূত হয়ে পড়েন তাঁরা। এ-রকম কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ইসলাম গ্রহণ করেন হামযা ইবনু আবদিল মুত্তালিব এবং উমর ইবনুল খাত্তাব (রদিয়াল্লাহু আনহুমা)। ইসলামের ইতিহাসে এ দু'জনের মুসলিম হওয়ার ঘটনা এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এদের ইসলাম গ্রহণের ফলে মুসলমানদের শক্তি কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছিল।
আবূ জাহল ছাড়াও এমন আরও পাঁচ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি হলো ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরা মাখযূমি, আসওয়াদ ইবনু আবদি ইয়াগূস যুহরি, আবূ যামআ আসওয়াদ ইবনু আবদিল মুত্তালিব আসাদি, হারিস ইবনু কাইস খুযাঈ এবং আস ইবনু ওয়াইল সাহমি। নুবুওয়াতি মিশন শুরু হওয়ার পর মক্কায় এত বছর কেটে গেলেও নবি ﷺ একটিবারের জন্যও প্রতিশোধ নেননি। কারণ, আল্লাহই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, যথাসময়ে তিনি এদের দেখে নেবেন। শেষ পর্যন্ত মুহাম্মাদ ﷺ-এর কঠিনতম শত্রুরা করুণতম মৃত্যুর শিকার হয়েছিল।
* ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরার গায়ে সামান্য তিরের আঁচড় লেগেছিল। সে এটিকে পাত্তাই দেয়নি। কিন্তু জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আঁচড়টির দিকে ইশারা করেন ফলে তাতে জ্বালাপোড়া শুরু হয়। বেশ কয়েক বছর ধরে সেই ক্ষতের প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ধুঁকে ধুঁকে অবশেষে মৃত্যু হয় ওয়ালীদের।
* একইভাবে জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আসওয়াদ ইবনু আবদি ইয়াগুসের দিকে ইশারা করেন। তার শরীরে ফোস্কা পড়ে যায় এবং এটাই তার মৃত্যুর কারণ হয়। আরেক উৎস থেকে জানা যায় যে, সূর্যের প্রখর তাপে এই ফোস্কা পড়ে। তবে এতেও জিবরীলেরই ভূমিকা ছিল। অন্য আরেক বর্ণনামতে, জিবরীল তার পেটের দিকে ইশারা করেন। ফলে তার পেট এমনভাবে ফুলে ওঠে যে, এতেই তার মৃত্যু হয়।
* আসওয়াদ ইবনু আবদিল মুত্তালিবের বাড়াবাড়ি চরমে পৌঁছালে নবি দুআ করেন, যেন আল্লাহ তার দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেন এবং তাকে পিতৃত্ব থেকে বঞ্চিত করেন। জিবরীল (আলাইহিস সালাম)-কে পাঠানো হয় একটি কাঁটাদার গাছের ডাল দিয়ে আঘাত করে তাকে অন্ধ করে দিতে এবং তার ছেলেকেও মেরে ফেলতে। তিনি যথাযথভাবে আদেশ পালন করেন। ফলে সে অন্ধ হয়ে যায় এবং তার ছেলেরাও মৃত্যুবরণ করে।
* হারিস ইবনু কাইসের মৃত্যু আরও করুণ। মৃত্যুশয্যায় তার তার পেট হলুদ তরলে ভরে ওঠে। আর পেটের সব বর্জ্য বেরিয়ে আসতে থাকে নাক দিয়ে। এভাবে যন্ত্রণাকর অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
* আস ইবনু ওয়াইল একবার একটি কাঁটাযুক্ত গাছে বসেছিল। যার একটি কাঁটা তার পায়ে বিদ্ধ হয়। সে কাঁটার বিষে তার পা ফুলে যায় এবং সে বিষ মাথা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ওই বিষের প্রভাবেই তার জীবনাবসান ঘটে। [১৩৯]
এই হলো তাদের পাঁচ জনের সংক্ষিপ্ত পরিণাম-কাহিনি। এসব ইসলামবিদ্বেষী দুর্ভাগারা এ-রকম ঐশী শাস্তির শিকার হয়।
তবে বেশির ভাগ সময়ই নবি ধৈর্য ধরে সকল বিরোধিতা সহ্য করে যান, ঠিক যেমনটি করেছিলেন পূর্বেকার নবি-রাসূলগণ। এমন অটল ধৈর্য ও ঈমান দেখে সাহাবিদের অন্তরও প্রশান্ত হয়, আল্লাহর আনুগত্যে অবিচল থাকে তাদের হৃদয়। এদিকে যথারীতি চলতে থাকে মুশরিকদের মৌখিক গালাগাল ও শারীরিক নির্যাতন।
টিকাঃ
[১৩৯] তাবারি, তাফসীর, ৮/৯০; সুয়ূতি, আদ-দুররুল মানসূর, ৪/২০০।
[১৪৫] সূরা নাজম, ৫৩: ৭-৮।
[১৪৬] ইবনু হাজার, আল-ইসাবাহ, ৮/১৩৮; বাইহাকি, দালাইলুন নুবুওয়াহ, ২/৩৩৯।
[১৪৭] শাইখ আবদুল্লাহ, মুখতাসারুস-সীরাহ, ১১৩।
[১৪৮] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/২৯৮-২৯৯।
[১৪৯] ইবনু হিব্বান, ৬৫৬৭; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ১১/২০০১।
[১৫০] বুখারি, ৩৮৫৬; ইবনু হিশাম, ১/২৮৯-২৯০; সুযুতি, আদ-দুররুল মানসূর, ৫/৬৫৫।
[১৫১] বুখারি, ৩৯০৫。
আবিসিনিয়ার দরবারে পরাজয়ের রাগ কুরাইশরা স্বভাবতই হাতের কাছে থাকা মুসলমানদের ওপর প্রকাশ করতে লাগল।
নবিজি ﷺ-এর মেয়ে উম্মু কুলসূম (রদিয়াল্লাহু আনহা)-কে তালাক দেওয়া সেই উতাইবা ইবনু আবী লাহাব এবার নবিজি ﷺ-এর কাছে এল। সূরা নাজমের এই আয়াতটি:
ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّى ﴿৮﴾ فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى ﴿৯﴾
“অতঃপর নিকটবর্তী হলো ও ঝুলে গেল। তখন দুই ধনুকের ব্যবধান ছিল অথবা আরও কম।” [১৪৫]
উদ্ধৃত করে বলল, “এই কথা যে বানিয়েছে, আমি তাকে অবিশ্বাস করি।” কুরাইশদের ওই সাজদার ঘটনার জ্বালা প্রশমন করতেই মূলত জোর করে এই কথা বলা।
ধীরে ধীরে এই উতাইবা লোকটা নবিজি ﷺ-এর জন্য বিরতিহীন বিরক্তির উৎসে পরিণত হতে শুরু করে। একবার সে এমনকি নবিজির জামা টেনে ছিঁড়ে ফেলে এবং মুখে থুতু মেরে বসে। আল্লাহর রাসূল জবাবে বদদুআ করেন, “হে আল্লাহ, আপনার একটি কুকুরকে এর ওপর লেলিয়ে দিন।”
এর অল্প কিছুকাল পরের ঘটনা। এক কাফেলার সাথে সিরিয়ায় যায় উতাইবা। ‘যারকা’ নামক স্থানে যাত্রাবিরতির সময়ে একটি সিংহ এসে কাফেলার চারপাশে ঘুরতে থাকে। আতঙ্কিত উতাইবা চিৎকার করে ওঠে, “ইয়া আল্লাহ, এটা নিশ্চিত আমাকে খাওয়ার জন্য এসেছে! মুহাম্মাদের প্রার্থনা দেখি সত্যি হয়ে গেল! মক্কায় বসে সে আমাকে সিরিয়ায় খুন করে ফেলছে!”
রাতে ঘুমানোর সময় কাফেলার লোকেরা উতাইবাকে একদম মাঝখানে শুতে দিল। তা সত্ত্বেও সিংহটি সব উট আর মানুষকে পাশ কাটিয়ে উতাইবার গায়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে। থাবা দিয়ে মাথা ছিঁড়ে ফেলে ওই দুরাত্মাটির ভবলীলা সাঙ্গ করে দেয়।[১৪৬]
মক্কার ঘরে ঘরে নবি ﷺ-এর শত্রু। আগে একবার সাজদারত নবিজির ঘাড়ে উটের নাড়িভুঁড়ি তুলে দেওয়া উকবা ইবনু আবী মু'আইত আবারও হাজির হলো সালাতের সময়ে। এবার রাসূলুল্লাহ সাজদায় গেলে তাঁর ঘাড়ে পা রেখে সে এত জোরে চাপ দেয় যে, নবিজির চোখ ফেটে যাবার উপক্রম হয়।[১৪৭]
অবশেষে যখন কিছুতেই নবি ﷺ-কে ঠেকানো গেল না, তখন মুশরিকরা তাঁকে হত্যা করার পরিকল্পনার দিকে বিশেষ মনোযোগ দিল। গোত্রকেন্দ্রিক সমাজে এ ধরনের হত্যা অল্পতে শেষ হয়ে যায় না। একটি হত্যাকাণ্ডের জের ধরে বিশাল রক্তপাত হয়। বহুদিন ধরে চলতে থাকে এর গরম হাওয়া। তবু তাদের আর তর সইছিল না। আবূ জাহল কুরাইশদের মাঝে ঘোষণা করল,
“দেখতেই তো পাচ্ছেন, মুহাম্মাদ কতটা বেপরোয়া হয়ে তার মতো সে কাজ করেই যাচ্ছে। পূর্বপুরুষদের অস্বীকার করছে, তাদের পথভ্রষ্ট বলে অপমানিত করছে, আমাদের মূর্খ বলে ডাকছে, আর দেব-দেবীদের বিরুদ্ধকথা প্রচার করেই চলেছে সে। আমি আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি। একদিন আমি ভারী একটি পাথর নিয়ে অপেক্ষায় থাকব। সে সাজদায় যাওয়ামাত্রই ওটা দিয়ে ওর মাথা গুঁড়িয়ে দেবো। এরপর তোমরা বানু আবদি মানাফের আক্রোশ থেকে চাইলে আমাকে বাঁচাতেও পারো, অথবা চাইলে ওদের হাতে তুলেও দিতে পারো।”
লোকজন আশ্বস্ত করল, “চিন্তা করবেন না। আল্লাহর কসম! আমরা কখনও আপনাকে ছেড়ে যাব না। যা চান, তা-ই করুন।”
সমর্থকদের উৎসাহ পেয়ে আবু জাহলও দেরি করল না। পরদিন ঠিকই ভারী একটি পাথর নিয়ে অপেক্ষায় রইল। নবি যথারীতি কা'বায় এসে সালাতে দাঁড়ালেন। কা'বার চারপাশে জায়গায় জায়গায় জটলা পাকিয়ে বসে ছিল কুরাইশরা। আবূ জাহল কী করে, তা দেখতে সবাই অপেক্ষমাণ। আবূ জাহল কার্যসমাধা করতে এগিয়ে গেল ঠিকই। কিন্তু পরক্ষণেই পেছনে ঘুরে দিল দৌড়। চেহারা ফ্যাকাসে, দৃষ্টি উদ্ভ্রান্ত, হাতে তখনো শক্ত করে ধরা সেই পাথর। কুরাইশরা ব্যস্তসমস্ত হয়ে তাকে ধরে শান্ত করল। জিজ্ঞেস করল, “আবুল হাকাম, হঠাৎ কী হলো?”
সে বলল “আমি তো কথামতো কাজ করতেই যাচ্ছিলাম, কিন্তু হঠাৎ কোত্থেকে একটা উট এসে হাজির। আল্লাহর কসম! এত বড় মাথা, গলা আর দাঁতওয়ালা উট আমি জীবনেও দেখিনি। আমাকে খেয়ে ফেলতে আসছিল ওটা।”
নবি পরে বলেছিলেন, "সেটা আসলে জিবরীল ছিল। যদি সে আমার নিকটবর্তী হতো তাহলে সে তাকে ধরে ফেলত।” [১৪৮]
তবে এতকিছুর পরও অন্যান্য কুরাইশ নেতারা আবূ জাহলের অভিজ্ঞতা থেকে কোনও শিক্ষা নেয়নি। একদিন নবিজি কা'বা তওয়াফ করছিলেন। আশপাশে থাকা কুরাইশরা তাঁকে উদ্দেশ্য করে টিটকারি মারতে থাকে। রাসূলুল্লাহ যত বিরক্ত হন, তাদের টিটকারি-মশকরা তত বাড়ে। অবশেষে আল্লাহর রাসূল থেমে তাদের মুখের ওপর বললেন, “হে কুরাইশের লোকসকল, তোমরা কি শুনছ? যেই সত্তার হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম! আমি তোমাদের হত্যা ও যবাই করার আদেশ নিয়ে এসেছি!” [১৪৯]
নবিজির মুখে এমন কথা শুনে মশকরাকারীদের বুক ধক করে ওঠে। কিছুক্ষণ নীরব থেকে তারা নরম-সরম কথা বলে মুহাম্মাদ ﷺ-কে নিরস্ত করতে চেষ্টা করে।
পরদিন আবার ওই একই লোকেরা নতুন করে সাহস সঞ্চয় করে কা'বায় আসে। বলাবলি করতে থাকে মুহাম্মাদ সম্পর্কে। একটু পর নবিজি হাজির হতেই তেড়েফুঁড়ে এল তারা। নবিজির জামা টানতে টানতে বলল, “তুই-ই তো সেই লোক না, যে আমাদের বাপ-দাদাদের দেবতাদের ভুলে যেতে বলে?”
নবি একটুও ভয় না পেয়ে বলেন, “হ্যাঁ। আমিই সেই লোক।”
উন্মাদ হয়ে থাকা জটলাটার কেউ তাঁকে ধাক্কাধাক্কি করতে থাকে, কেউ ছোটায় গালির তুবড়ি। নবিজির গলার কাপড় টেনে ধরে উকবা ইবনু আবী মু'আইত তাঁর শ্বাসরোধ করে ফেলার জোগাড় করে। কোলাহল শুনে দৌড়ে আসেন আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)। উকবার কাঁধে সজোরে টান দিয়ে তার কাছ থেকে মুহাম্মাদ-কে ছাড়িয়ে নেন। তারপর প্রতিটা ব্যক্তিকে টেনেটুনে নবিজির কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে থাকেন। বলেন, “ওরে হতাভাগার দল! তোমাদের জন্য আফসোস! একজন মানুষ আল্লাহকে নিজের রব বলছে দেখেই বুঝি তোমরা তাকে মেরে ফেলতে চাও?”
উত্তেজিত মুশরিকরা এবার নবিজি ﷺ-কে ছেড়ে দিয়ে আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)- কে ধরল। নবিজিকে নিরাপদ রাখতে তিনি জীবন দিতেও প্রস্তুত। সেদিন আবূ বকরকে এত মারা হয় যে, তাঁর চেহারা থেকে নাক আলাদা করে বোঝা যাচ্ছিল না। তাঁর গোত্র বানু তাইমের লোকেরা তাঁকে পরে জড়াজড়ি করে ঘরে পৌঁছে দেয়। সবাই ধরেই নিয়েছিল যে, তিনি পরেরদিন পর্যন্ত আর বাঁচবেন না।
কিন্তু আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) সেদিন সন্ধ্যায়ই কথা বলতে আরম্ভ করেন। সন্ধ্যায় জ্ঞান ফেরার পর প্রথমেই জানতে চান মুহাম্মাদ কেমন আছেন। এত প্রাণপণ ভক্তি দেখে প্রচণ্ড তিরস্কার করে গোত্রের লোকেরা। নিজের স্বাস্থ্য ঠিক রাখা তো দূরের কথা, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুস্থতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার আগে তিনি সেদিন খাবার- পানিও ছুঁয়ে দেখেননি। ওই আঁধারের মাঝেই তাঁকে দারুল আরকামে নিয়ে যাওয়া হয়। নবিজিকে জীবিত ও সুস্থ দেখে তারপরেই তিনি খাবার-পানীয় গ্রহণ করেন।[১৫০]
হিজরতের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগ পর্যন্ত আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) মুহুর্মুহু নির্যাতনের শিকার হন। অবশেষে একদিন আবিসিনিয়ার উদ্দেশে মক্কা ছেড়ে রওনা দেন তিনি। পথে 'বার্ক গিমাদ' নামক একটি জায়গা পড়ে। সেখানে দেখা হয় মালিক ইবনুদ দাগিনার সাথে। তিনি বিখ্যাত 'কারা' ও 'আহাবীশ' গোত্রের নেতা। আবু বকরের মক্কাত্যাগের কারণ জানতে চান মালিক। সব শুনে নাখোশ হয়ে বলেন, “আপনি অভাবীদের কত সাহায্য করেন, পরিবারের সাথে ভালো আচরণ করেন, অভাগাদের বোঝা বয়ে নেন, মেহমানের কদর করেন, সত্যের জন্য কষ্ট সহ্য করা মানুষদেরও আশ্রয় দেন। আপনার মতো মানুষকে আবার বহিষ্কার করে কীভাবে? এক কাজ করুন। আপনি আমার সাথে চলুন। নিজের শহরেই নিজের রবের উপাসনা করবেন, আসুন।"
মালিকের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি মেনে নেন আবু বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)। দু'জনে একসাথে ফিরে যান মক্কায়। মালিক ঘোষণা করে দেন যে, তিনি আবূ বকরকে নিরাপত্তা দিয়েছেন। তবে শর্ত হলো যে, তিনি শুধু ঘরের ভেতর লোকচক্ষুর আড়ালে সালাত আদায় করবেন। পৌত্তলিকরা কিছুটা হলেও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। ইসলামের প্রকাশ্য প্রচারণা দেখে তাদের নারী, শিশু এবং সরল মানুষেরা কখন বিগড়ে যায়, এ নিয়ে তারা বেশ ভয়েই থাকত।
আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) কিছুদিন সে শর্ত মেনে চলেন। পরে একদিন বারান্দায় সালাত আদায় ও কুরআন তিলাওয়াত করতে শুরু করেন। ফলে আবারও মানুষজন তাঁকে ইবাদাতরত অবস্থায় দেখতে পায়। ইবনুদ দাগিনা সে খবর পেয়ে তাঁকে নিরাপত্তার শর্তের কথা মনে করিয়ে দেন। আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) ভেবেচিন্তে অবশেষে ইবনুদ দাগিনার প্রতিশ্রুতি বাতিল করে ফেলেন। তিনি বলেন, “আমার রবের দেওয়া নিরাপত্তা পেয়েই আমি খুশি।”
আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর এই ভক্তি কোনও লোকদেখানো বিষয় নয়। তাঁর অন্তর ছিল সত্যিই কোমল। তিনি অত্যধিক কান্নাকাটি করতেন। আল্লাহর পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি, শাস্তির হুমকি, সৃষ্টিজগতের বর্ণনা, আগেকার নবিদের ঘটনা কুরআনে পড়তে পড়তে অশ্রুসজল হয়ে উঠত তাঁর চোখ। কুরআনের প্রতি এই আবেগ দেখে মুশরিকদের নারী ও শিশুরা তাঁর আশপাশে ভিড় জমাত, তাঁকে কাঁদতে দেখে তারাও কাঁদত এবং তন্ময় হয়ে শুনত। গোঁয়ার মুশরিকদের কাছে এই জিনিস আবার অসহনীয় হয়ে উঠতে থাকে। এর কারণেও তারা আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে কষ্ট দিত।[১৫১]
কিন্তু ইসলামের প্রতি এই কঠোর অবস্থান সকল মক্কাবাসীর বৈশিষ্ট্য ছিল না। কিছু মানুষ ছিলেন পৌত্তলিক সমাজে স্তম্ভের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নবিজির বার্তা নিয়ে একান্তে ভাবতে গেলে এদের অন্তরের পাথর ঠিকই গলতে শুরু করত। গোটা কুরাইশদের বিরোধিতার মুখেও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অটল সাহস ও অবিচল ধৈর্য দেখে অভিভূত হয়ে পড়েন তাঁরা। এ-রকম কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ইসলাম গ্রহণ করেন হামযা ইবনু আবদিল মুত্তালিব এবং উমর ইবনুল খাত্তাব (রদিয়াল্লাহু আনহুমা)। ইসলামের ইতিহাসে এ দু'জনের মুসলিম হওয়ার ঘটনা এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এদের ইসলাম গ্রহণের ফলে মুসলমানদের শক্তি কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছিল।
আবূ জাহল ছাড়াও এমন আরও পাঁচ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি হলো ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরা মাখযূমি, আসওয়াদ ইবনু আবদি ইয়াগূস যুহরি, আবূ যামআ আসওয়াদ ইবনু আবদিল মুত্তালিব আসাদি, হারিস ইবনু কাইস খুযাঈ এবং আস ইবনু ওয়াইল সাহমি। নুবুওয়াতি মিশন শুরু হওয়ার পর মক্কায় এত বছর কেটে গেলেও নবি ﷺ একটিবারের জন্যও প্রতিশোধ নেননি। কারণ, আল্লাহই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, যথাসময়ে তিনি এদের দেখে নেবেন। শেষ পর্যন্ত মুহাম্মাদ ﷺ-এর কঠিনতম শত্রুরা করুণতম মৃত্যুর শিকার হয়েছিল।
* ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরার গায়ে সামান্য তিরের আঁচড় লেগেছিল। সে এটিকে পাত্তাই দেয়নি। কিন্তু জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আঁচড়টির দিকে ইশারা করেন ফলে তাতে জ্বালাপোড়া শুরু হয়। বেশ কয়েক বছর ধরে সেই ক্ষতের প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ধুঁকে ধুঁকে অবশেষে মৃত্যু হয় ওয়ালীদের।
* একইভাবে জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আসওয়াদ ইবনু আবদি ইয়াগুসের দিকে ইশারা করেন। তার শরীরে ফোস্কা পড়ে যায় এবং এটাই তার মৃত্যুর কারণ হয়। আরেক উৎস থেকে জানা যায় যে, সূর্যের প্রখর তাপে এই ফোস্কা পড়ে। তবে এতেও জিবরীলেরই ভূমিকা ছিল। অন্য আরেক বর্ণনামতে, জিবরীল তার পেটের দিকে ইশারা করেন। ফলে তার পেট এমনভাবে ফুলে ওঠে যে, এতেই তার মৃত্যু হয়।
* আসওয়াদ ইবনু আবদিল মুত্তালিবের বাড়াবাড়ি চরমে পৌঁছালে নবি দুআ করেন, যেন আল্লাহ তার দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেন এবং তাকে পিতৃত্ব থেকে বঞ্চিত করেন। জিবরীল (আলাইহিস সালাম)-কে পাঠানো হয় একটি কাঁটাদার গাছের ডাল দিয়ে আঘাত করে তাকে অন্ধ করে দিতে এবং তার ছেলেকেও মেরে ফেলতে। তিনি যথাযথভাবে আদেশ পালন করেন। ফলে সে অন্ধ হয়ে যায় এবং তার ছেলেরাও মৃত্যুবরণ করে।
* হারিস ইবনু কাইসের মৃত্যু আরও করুণ। মৃত্যুশয্যায় তার তার পেট হলুদ তরলে ভরে ওঠে। আর পেটের সব বর্জ্য বেরিয়ে আসতে থাকে নাক দিয়ে। এভাবে যন্ত্রণাকর অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
* আস ইবনু ওয়াইল একবার একটি কাঁটাযুক্ত গাছে বসেছিল। যার একটি কাঁটা তার পায়ে বিদ্ধ হয়। সে কাঁটার বিষে তার পা ফুলে যায় এবং সে বিষ মাথা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ওই বিষের প্রভাবেই তার জীবনাবসান ঘটে। [১৩৯]
এই হলো তাদের পাঁচ জনের সংক্ষিপ্ত পরিণাম-কাহিনি। এসব ইসলামবিদ্বেষী দুর্ভাগারা এ-রকম ঐশী শাস্তির শিকার হয়।
তবে বেশির ভাগ সময়ই নবি ধৈর্য ধরে সকল বিরোধিতা সহ্য করে যান, ঠিক যেমনটি করেছিলেন পূর্বেকার নবি-রাসূলগণ। এমন অটল ধৈর্য ও ঈমান দেখে সাহাবিদের অন্তরও প্রশান্ত হয়, আল্লাহর আনুগত্যে অবিচল থাকে তাদের হৃদয়। এদিকে যথারীতি চলতে থাকে মুশরিকদের মৌখিক গালাগাল ও শারীরিক নির্যাতন।
টিকাঃ
[১৩৯] তাবারি, তাফসীর, ৮/৯০; সুয়ূতি, আদ-দুররুল মানসূর, ৪/২০০।
[১৪৫] সূরা নাজম, ৫৩: ৭-৮।
[১৪৬] ইবনু হাজার, আল-ইসাবাহ, ৮/১৩৮; বাইহাকি, দালাইলুন নুবুওয়াহ, ২/৩৩৯।
[১৪৭] শাইখ আবদুল্লাহ, মুখতাসারুস-সীরাহ, ১১৩।
[১৪৮] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/২৯৮-২৯৯।
[১৪৯] ইবনু হিব্বান, ৬৫৬৭; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ১১/২০০১।
[১৫০] বুখারি, ৩৮৫৬; ইবনু হিশাম, ১/২৮৯-২৯০; সুযুতি, আদ-দুররুল মানসূর, ৫/৬৫৫।
[১৫১] বুখারি, ৩৯০৫。
📄 হামযা ইবনু আবদুল মুত্তালিবের ইসলাম গ্রহণ
একবার সাফা পর্বতের কাছেই নবিজি ﷺ-এর পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল আবূ জাহল। তাঁকে দেখতে পেয়ে বিশ্রীভাবে অপমান করে বসল সে। কিছু সূত্রে আরও জানা যায় যে, একটি পাথর ছুড়ে সে নবিজির মাথা রক্তাক্তও করে দিয়েছিল। চিরধৈর্যশীল রাসূলুল্লাহ ﷺ এবারও কোনও প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। আবূ জাহল খুশিমনে কা'বা প্রাঙ্গণে গিয়ে কুরাইশদের এক বৈঠকের সাথে বসল। ওদিকে আবদুল্লাহ ইবনু জুদআনের এক দাসী দেখে ফেলেছে এই অপ্রীতিকর ও অমানবিক আচরণ।
এর কিছুক্ষণ পরের ঘটনা। শিকার শেষে ধনুক হাতে ঘরে ফিরলেন নবিজির চাচা হামযা ইবনু আবদিল মুত্তালিব। কথায় কথায় নবিজির সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি তাঁকে বলে দিল সেই দাসী। হামযা রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে আবু জাহলকে গিয়ে বললেন, “এই হতভাগা, তোর এত বড় সাহস! আমার ভাতিজাকে গালি দিয়েছিস আবার তাঁকে মেরেছিস! জানিস না, আমিও ওর ধর্মের অনুসারী?” এই বলে ধনুক দিয়ে বাড়ি মেরে আবূ জাহলের মাথা ফাটিয়ে দিলেন তিনি। আবূ জাহলের গোত্র বানু মাখযূম আর হামযার গোত্র বানু হাশিম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেল এ ঘটনায়। আবূ জাহল তার স্বগোত্রীয়দের এই বলে শান্ত করল, “থাক, বাদ দাও। আবূ আম্মারাকে (হামযার উপনাম) যেতে দাও। আসলেই আমি তার ভাতিজাকে খুব খারাপ গালি দিয়েছিলাম।”[১৫২]
হামযা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর এই আচমকা ধর্মান্তর অবশ্য পারিবারিক মর্যাদাবোধের কারণে চলে আসা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। অথচ এই ঘটনাটির আগে নবিজি ﷺ-এর ছয় বছরের দাওয়াতি কার্যক্রম একবারও হামযার মনে কোনও দোলা দেয়নি। কিন্তু ক্রমেই তাঁর মনে ইসলামের প্রতি ভালোবাসার শক্ত শেকড় গাড়তে থাকে। একসময় হামযা অবাক বিস্ময়ে দেখলেন যে, দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা তাঁর বংশীয় জাত্যাভিমানকেও ছাড়িয়ে গেছে। নিছক আত্মীয়তার টান ছাপিয়ে আল্লাহর প্রতি ঈমান তাঁর অন্তরে এত শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে, ইসলামে তাঁর অবদানে তিনি আসাদুল্লাহ (আল্লাহর সিংহ) উপাধি লাভ করেন। তিনি ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেন নুবুওয়াতের ষষ্ঠ বছরের যুল- হিজ্জাহ মাসে।
টিকাঃ
[১৫২] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/২৯১-২৯২।
একবার সাফা পর্বতের কাছেই নবিজি ﷺ-এর পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল আবূ জাহল। তাঁকে দেখতে পেয়ে বিশ্রীভাবে অপমান করে বসল সে। কিছু সূত্রে আরও জানা যায় যে, একটি পাথর ছুড়ে সে নবিজির মাথা রক্তাক্তও করে দিয়েছিল। চিরধৈর্যশীল রাসূলুল্লাহ ﷺ এবারও কোনও প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। আবূ জাহল খুশিমনে কা'বা প্রাঙ্গণে গিয়ে কুরাইশদের এক বৈঠকের সাথে বসল। ওদিকে আবদুল্লাহ ইবনু জুদআনের এক দাসী দেখে ফেলেছে এই অপ্রীতিকর ও অমানবিক আচরণ।
এর কিছুক্ষণ পরের ঘটনা। শিকার শেষে ধনুক হাতে ঘরে ফিরলেন নবিজির চাচা হামযা ইবনু আবদিল মুত্তালিব। কথায় কথায় নবিজির সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি তাঁকে বলে দিল সেই দাসী। হামযা রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে আবু জাহলকে গিয়ে বললেন, “এই হতভাগা, তোর এত বড় সাহস! আমার ভাতিজাকে গালি দিয়েছিস আবার তাঁকে মেরেছিস! জানিস না, আমিও ওর ধর্মের অনুসারী?” এই বলে ধনুক দিয়ে বাড়ি মেরে আবূ জাহলের মাথা ফাটিয়ে দিলেন তিনি। আবূ জাহলের গোত্র বানু মাখযূম আর হামযার গোত্র বানু হাশিম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেল এ ঘটনায়। আবূ জাহল তার স্বগোত্রীয়দের এই বলে শান্ত করল, “থাক, বাদ দাও। আবূ আম্মারাকে (হামযার উপনাম) যেতে দাও। আসলেই আমি তার ভাতিজাকে খুব খারাপ গালি দিয়েছিলাম।”[১৫২]
হামযা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর এই আচমকা ধর্মান্তর অবশ্য পারিবারিক মর্যাদাবোধের কারণে চলে আসা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। অথচ এই ঘটনাটির আগে নবিজি ﷺ-এর ছয় বছরের দাওয়াতি কার্যক্রম একবারও হামযার মনে কোনও দোলা দেয়নি। কিন্তু ক্রমেই তাঁর মনে ইসলামের প্রতি ভালোবাসার শক্ত শেকড় গাড়তে থাকে। একসময় হামযা অবাক বিস্ময়ে দেখলেন যে, দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা তাঁর বংশীয় জাত্যাভিমানকেও ছাড়িয়ে গেছে। নিছক আত্মীয়তার টান ছাপিয়ে আল্লাহর প্রতি ঈমান তাঁর অন্তরে এত শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে, ইসলামে তাঁর অবদানে তিনি আসাদুল্লাহ (আল্লাহর সিংহ) উপাধি লাভ করেন। তিনি ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেন নুবুওয়াতের ষষ্ঠ বছরের যুল- হিজ্জাহ মাসে।
টিকাঃ
[১৫২] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/২৯১-২৯২।
📄 উমর ইবনুল খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণ
উমর ইবনুল খাত্তাব (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মুসলিম হওয়ার ঘটনা ইসলমি ইতিহাসের সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক অধ্যায়গুলোর একটি। দীর্ঘদেহী ও বলবান এই মানুষটি পরিচিত ছিলেন কড়া মেজাজি ও কবিতাপ্রেমী হিসেবে। সেই সাথে ইসলামের সাথে ছিল তার মারাত্মক শত্রুতা। হামযা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মাত্র তিন দিন পরেই উমর ইসলাম গ্রহণ করেন।
কা'বায় নবিজি ﷺ-এর তিলাওয়াত করা কিছু আয়াত মাঝেমাঝে উমরের কানেও এসেছিল। মনেও একটু নাড়া পড়েছিল সে আয়াতগুলো শুনে। কিন্তু সার্বিক বিবেচনায় তাঁর হৃদয় তখনো ইসলাম ও নবি-এর শত্রুতায় বদ্ধপরিকর। এমনকি একদিন এমন অবস্থা দাঁড়াল যে, তিনি তরবারি নিয়ে পুরোপুরি প্রস্তুত রাসূলুল্লাহ-কে হত্যা করার জন্য। সৌভাগ্যবশত, ওই তৎপরতাকে কাজে রূপ দিতে পারেননি তিনি।
মুষ্টিতে তলোয়ার আর অন্তরে বিদ্বেষ নিয়ে চলছেন উদ্দেশ্য পূরণ করতে। মাঝপথে নুআইম ইবনু আবদিল্লাহর সাথে দেখা। নুআইম বললেন, “কোথায় যাচ্ছেন?”
“মুহাম্মাদকে যবাই করে ফেলব”, উমরের জবাব।
“বানু হাশিম আর বানু যুহরা যদি প্রতিশোধ নিতে আসে?”
কথাটা যেন উমরের কাছে চ্যালেঞ্জের মতো লাগল। রাগত স্বরে বললেন, “আপনিও বিধর্মী হয়ে গেছেন নাকি?"
নুআইম পাল্টা বললেন “আমার কথা ছাড়ুন। আপনার বোন আর বোন-জামাই-ই তো নিজ ধর্ম ছেড়ে দিয়েছে।”
রাগের চোটে উমর ভুলেই যান নবিজি ﷺ-এর কথা। ছুটে যান বোন ফাতিমা বিনতুল খাত্তাব (রদিয়াল্লাহু আনহা)-এর ঘরে। ঠিক সেই সময় খাব্বাব ইবনুল আরাত্ত (রদিয়াল্লাহু আনহু) ছিলেন ফাতিমার ঘরে, সূরা ত্ব-হা শেখাচ্ছিলেন তাদের। উমরের আসার শব্দ পেয়েই খাব্বাব লুকিয়ে পড়েন। সূরা লেখা পাতাগুলোও দ্রুত লুকিয়ে ফেলেন ফাতিমা।
“কী বিড়বিড় করছিলি তোরা?” সশস্ত্র উমরের জিজ্ঞাসা।
“কই? কিছু না তো! এমনি কথা বলছিলাম।”
“তোরা দু'জনই বিধর্মী হয়ে গেছিস, না?”
উমরের বোন-জামাই এবার বললেন, “আচ্ছা উমর, আপনিই বলুন। আপনার ধর্ম যদি সত্য থেকে বহু দূরে থাকে, তাহলে আর কীই-বা করার আছে?” কথা শেষ না হতেই উমর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁকে প্রহার করতে থাকেন। ফাতিমা বাধা দিতে এলে তাঁর মুখেও আঘাত করে রক্তাক্ত করে ফেলেন। কিন্তু উমরের বোন তখন সত্য উচ্চারণে আর ভীত নন। স্বামীর সাথে গলা মিলিয়ে তিনিও উমরের ধর্মবিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তুললেন, “উমর, সত্য যদি তোমার ধর্ম থেকে বহু দূরে থাকে, তাহলে কী করবে?”
তারপর ভাইকে শুনিয়ে দিলেন কালিমা শাহাদাত, জানিয়ে দিলেন নিজের ঈমান গ্রহণের কথা, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনও উপাস্য নেই, আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।”
বোনের এই দৃপ্ত ঘোষণা উমরকে লজ্জায় ফেলে দেয়। এবার একটু নরম হয়ে বললেন, “আচ্ছা, কী যেন পড়ছিলে, ওইটা একটু দেখি?”
বোন এবার কড়া স্বরে বললেন, “তুমি তো নাপাক। পাক-পবিত্র না হয়ে কেউ এটা ছুঁতে পারে না। যাও, পবিত্র হয়ে এসো।”
অনুশোচনায় দগ্ধ উমর গোসল করে এলেন। সূরা ত্ব-হা লেখা পাতাগুলো নিয়ে পড়তে আরম্ভ করলেন। অতঃপর যখন এই আয়াতে পৌঁছলেন- إِنَّنِي أَنَا اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدْنِيْ وَأَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِي ﴿٤١)
“নিশ্চয়ই আমি আল্লাহ, আমি ছাড়া কোনও উপাস্য নেই। অতএব, আমারই উপাসনা করো এবং আমার স্মরণে সালাত প্রতিষ্ঠা করো।”[১৫৩]
তখন বলতে লাগলেন, "এ তো অনেক উত্তম ও বড় সম্মানিত কালাম। আমাকে মুহাম্মাদের ঠিকানা বলে দাও।”
এ কথা শুনে খাব্বাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) লুকানো স্থান থেকে বেরিয়ে আসেন। বলেন, “উমর, সুসংবাদ গ্রহণ করুন! আমার ধারণা নবি ﷺ-এর দুআ আপনার ব্যাপারে কবুল হয়েছে। গত জুমুআ রাতে রাসূলুল্লাহ দুআ করেছেন, 'ইয়া আল্লাহ, উমর ইবনুল খাত্তাব এবং আবূ জাহল ইবনু হিশামের মধ্যে যে আপনার নিকট বেশি প্রিয় তার মাধ্যমে ইসলামকে শক্তিশালী করুন।”
এরপর তিনি বলে দিলেন, নবিজি সাফা পর্বতের পাশে আরকামের ঘরে অবস্থান করছেন। জানতে পেরে উমর সেখানে ছুটে যান। দরজায় টোকা শুনে একজন সাহাবি দরজার ফাঁক দিয়ে উমরকে দেখতে পান, উত্তেজিত দেহভঙ্গি, হাতে তরবারি! পড়িমড়ি করে ভেতরে ছুটে গিয়ে তিনি সবাইকে সতর্ক করে দেন।
"ব্যাপার কী?” হামযা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) জিজ্ঞেস করলেন।
“দরজায় উমর দাঁড়িয়ে আছে।” ভীত কণ্ঠে সেই সাহাবির অনুযোগ।
হামযা বললেন, “ওহ! এই ব্যাপার? যদি সে ভালো উদ্দেশ্যে এসে থাকে, তাহলে তো ভালোই। আর তা না হলে ওর তরবারি দিয়েই আজ ওকে শেষ করে দেবো।”
ঠিক সেই সময় মুহাম্মাদ-এর ওপর ওহি অবতীর্ণ হচ্ছিল। ওহি অবতরণ শেষে বসার ঘরে এলেন তিনি। এসেই দেখেন উমর সেখানে বসা। নিজেই এগিয়ে গিয়ে উমরের কাপড় ধরে ঝাঁকি দিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “ওহে উমর, কেন ফিরে আসতে দেরি করছ? ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরাকে আল্লাহ যেভাবে শায়েস্তা করেছেন, সে-রকম কিছুর অপেক্ষায় আছ? হে আল্লাহ, এই হলো উমর ইবনুল খাত্তাব! ওর মাধ্যমে ইসলামকে শক্তিশালী ও গৌরবান্বিত করুন!”
নবিজি ﷺ-এর দুআ শেষ হতেই উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া আর কোনও উপাস্য নেই। আর আপনি আল্লাহর রাসূল।”
উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম উঁচু স্বরে “আল্লাহু আকবার!” বলে উঠলেন। যার ধ্বনি কা'বা প্রাঙ্গণ থেকেও শোনা গিয়েছিল।[১৫৪]
টিকাঃ
[১৫৩] সূরা ত্বহা, ২০: ১৪।
[১৫৪] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/৩৪৩-৩৪৬; ইবনুল জাওযি, তারীখু উমর ইবনিল খাত্তাব, ৭-১১।
উমর ইবনুল খাত্তাব (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মুসলিম হওয়ার ঘটনা ইসলমি ইতিহাসের সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক অধ্যায়গুলোর একটি। দীর্ঘদেহী ও বলবান এই মানুষটি পরিচিত ছিলেন কড়া মেজাজি ও কবিতাপ্রেমী হিসেবে। সেই সাথে ইসলামের সাথে ছিল তার মারাত্মক শত্রুতা। হামযা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মাত্র তিন দিন পরেই উমর ইসলাম গ্রহণ করেন।
কা'বায় নবিজি ﷺ-এর তিলাওয়াত করা কিছু আয়াত মাঝেমাঝে উমরের কানেও এসেছিল। মনেও একটু নাড়া পড়েছিল সে আয়াতগুলো শুনে। কিন্তু সার্বিক বিবেচনায় তাঁর হৃদয় তখনো ইসলাম ও নবি-এর শত্রুতায় বদ্ধপরিকর। এমনকি একদিন এমন অবস্থা দাঁড়াল যে, তিনি তরবারি নিয়ে পুরোপুরি প্রস্তুত রাসূলুল্লাহ-কে হত্যা করার জন্য। সৌভাগ্যবশত, ওই তৎপরতাকে কাজে রূপ দিতে পারেননি তিনি।
মুষ্টিতে তলোয়ার আর অন্তরে বিদ্বেষ নিয়ে চলছেন উদ্দেশ্য পূরণ করতে। মাঝপথে নুআইম ইবনু আবদিল্লাহর সাথে দেখা। নুআইম বললেন, “কোথায় যাচ্ছেন?”
“মুহাম্মাদকে যবাই করে ফেলব”, উমরের জবাব।
“বানু হাশিম আর বানু যুহরা যদি প্রতিশোধ নিতে আসে?”
কথাটা যেন উমরের কাছে চ্যালেঞ্জের মতো লাগল। রাগত স্বরে বললেন, “আপনিও বিধর্মী হয়ে গেছেন নাকি?"
নুআইম পাল্টা বললেন “আমার কথা ছাড়ুন। আপনার বোন আর বোন-জামাই-ই তো নিজ ধর্ম ছেড়ে দিয়েছে।”
রাগের চোটে উমর ভুলেই যান নবিজি ﷺ-এর কথা। ছুটে যান বোন ফাতিমা বিনতুল খাত্তাব (রদিয়াল্লাহু আনহা)-এর ঘরে। ঠিক সেই সময় খাব্বাব ইবনুল আরাত্ত (রদিয়াল্লাহু আনহু) ছিলেন ফাতিমার ঘরে, সূরা ত্ব-হা শেখাচ্ছিলেন তাদের। উমরের আসার শব্দ পেয়েই খাব্বাব লুকিয়ে পড়েন। সূরা লেখা পাতাগুলোও দ্রুত লুকিয়ে ফেলেন ফাতিমা।
“কী বিড়বিড় করছিলি তোরা?” সশস্ত্র উমরের জিজ্ঞাসা।
“কই? কিছু না তো! এমনি কথা বলছিলাম।”
“তোরা দু'জনই বিধর্মী হয়ে গেছিস, না?”
উমরের বোন-জামাই এবার বললেন, “আচ্ছা উমর, আপনিই বলুন। আপনার ধর্ম যদি সত্য থেকে বহু দূরে থাকে, তাহলে আর কীই-বা করার আছে?” কথা শেষ না হতেই উমর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁকে প্রহার করতে থাকেন। ফাতিমা বাধা দিতে এলে তাঁর মুখেও আঘাত করে রক্তাক্ত করে ফেলেন। কিন্তু উমরের বোন তখন সত্য উচ্চারণে আর ভীত নন। স্বামীর সাথে গলা মিলিয়ে তিনিও উমরের ধর্মবিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তুললেন, “উমর, সত্য যদি তোমার ধর্ম থেকে বহু দূরে থাকে, তাহলে কী করবে?”
তারপর ভাইকে শুনিয়ে দিলেন কালিমা শাহাদাত, জানিয়ে দিলেন নিজের ঈমান গ্রহণের কথা, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনও উপাস্য নেই, আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।”
বোনের এই দৃপ্ত ঘোষণা উমরকে লজ্জায় ফেলে দেয়। এবার একটু নরম হয়ে বললেন, “আচ্ছা, কী যেন পড়ছিলে, ওইটা একটু দেখি?”
বোন এবার কড়া স্বরে বললেন, “তুমি তো নাপাক। পাক-পবিত্র না হয়ে কেউ এটা ছুঁতে পারে না। যাও, পবিত্র হয়ে এসো।”
অনুশোচনায় দগ্ধ উমর গোসল করে এলেন। সূরা ত্ব-হা লেখা পাতাগুলো নিয়ে পড়তে আরম্ভ করলেন। অতঃপর যখন এই আয়াতে পৌঁছলেন- إِنَّنِي أَنَا اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدْنِيْ وَأَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِي ﴿٤١)
“নিশ্চয়ই আমি আল্লাহ, আমি ছাড়া কোনও উপাস্য নেই। অতএব, আমারই উপাসনা করো এবং আমার স্মরণে সালাত প্রতিষ্ঠা করো।”[১৫৩]
তখন বলতে লাগলেন, "এ তো অনেক উত্তম ও বড় সম্মানিত কালাম। আমাকে মুহাম্মাদের ঠিকানা বলে দাও।”
এ কথা শুনে খাব্বাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) লুকানো স্থান থেকে বেরিয়ে আসেন। বলেন, “উমর, সুসংবাদ গ্রহণ করুন! আমার ধারণা নবি ﷺ-এর দুআ আপনার ব্যাপারে কবুল হয়েছে। গত জুমুআ রাতে রাসূলুল্লাহ দুআ করেছেন, 'ইয়া আল্লাহ, উমর ইবনুল খাত্তাব এবং আবূ জাহল ইবনু হিশামের মধ্যে যে আপনার নিকট বেশি প্রিয় তার মাধ্যমে ইসলামকে শক্তিশালী করুন।”
এরপর তিনি বলে দিলেন, নবিজি সাফা পর্বতের পাশে আরকামের ঘরে অবস্থান করছেন। জানতে পেরে উমর সেখানে ছুটে যান। দরজায় টোকা শুনে একজন সাহাবি দরজার ফাঁক দিয়ে উমরকে দেখতে পান, উত্তেজিত দেহভঙ্গি, হাতে তরবারি! পড়িমড়ি করে ভেতরে ছুটে গিয়ে তিনি সবাইকে সতর্ক করে দেন।
"ব্যাপার কী?” হামযা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) জিজ্ঞেস করলেন।
“দরজায় উমর দাঁড়িয়ে আছে।” ভীত কণ্ঠে সেই সাহাবির অনুযোগ।
হামযা বললেন, “ওহ! এই ব্যাপার? যদি সে ভালো উদ্দেশ্যে এসে থাকে, তাহলে তো ভালোই। আর তা না হলে ওর তরবারি দিয়েই আজ ওকে শেষ করে দেবো।”
ঠিক সেই সময় মুহাম্মাদ-এর ওপর ওহি অবতীর্ণ হচ্ছিল। ওহি অবতরণ শেষে বসার ঘরে এলেন তিনি। এসেই দেখেন উমর সেখানে বসা। নিজেই এগিয়ে গিয়ে উমরের কাপড় ধরে ঝাঁকি দিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “ওহে উমর, কেন ফিরে আসতে দেরি করছ? ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরাকে আল্লাহ যেভাবে শায়েস্তা করেছেন, সে-রকম কিছুর অপেক্ষায় আছ? হে আল্লাহ, এই হলো উমর ইবনুল খাত্তাব! ওর মাধ্যমে ইসলামকে শক্তিশালী ও গৌরবান্বিত করুন!”
নবিজি ﷺ-এর দুআ শেষ হতেই উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া আর কোনও উপাস্য নেই। আর আপনি আল্লাহর রাসূল।”
উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম উঁচু স্বরে “আল্লাহু আকবার!” বলে উঠলেন। যার ধ্বনি কা'বা প্রাঙ্গণ থেকেও শোনা গিয়েছিল।[১৫৪]
টিকাঃ
[১৫৩] সূরা ত্বহা, ২০: ১৪।
[১৫৪] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/৩৪৩-৩৪৬; ইবনুল জাওযি, তারীখু উমর ইবনিল খাত্তাব, ৭-১১।