📄 আবিসিনিয়ায় দ্বিতীয় হিজরত
সাজদার সেই ঘটনার পর কুরাইশদের আর কোথাও মুখ দেখানোর জো রইল না। পাছে লোকে ভেবে বসে তারা মুহাম্মাদ ﷺ-এর বার্তার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছে, তাই তারা পূর্বের তুলনায় শত্রুতা আরও বাড়িয়ে দিয়ে তার ক্ষতিপূরণ দিল। আবার মুসলিমদের প্রতি আবিসিনিয়ার রাজার উদার আচরণের কথা জেনেও রাগে ফুঁসছিল তাদের অন্তর।
নিরাপত্তার খাতিরে মুসলিমদের আরও একটি দলকে আবিসিনিয়া পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন নবিজি । বিরাশি বা তিরাশি জন পুরুষ আর আঠারো জন নারী নিজেদের প্রস্তুত করলেন এ যাত্রায়। যদিও কাফির-মুশরিকদের পাহারার চোখগুলো আগের চেয়ে সচেতন ছিল, তবুও তাঁরা সেগুলোকে ফাঁকি দিয়ে মক্কা ছাড়তে সক্ষম হলেন।
সাজদার সেই ঘটনার পর কুরাইশদের আর কোথাও মুখ দেখানোর জো রইল না। পাছে লোকে ভেবে বসে তারা মুহাম্মাদ ﷺ-এর বার্তার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছে, তাই তারা পূর্বের তুলনায় শত্রুতা আরও বাড়িয়ে দিয়ে তার ক্ষতিপূরণ দিল। আবার মুসলিমদের প্রতি আবিসিনিয়ার রাজার উদার আচরণের কথা জেনেও রাগে ফুঁসছিল তাদের অন্তর।
নিরাপত্তার খাতিরে মুসলিমদের আরও একটি দলকে আবিসিনিয়া পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন নবিজি । বিরাশি বা তিরাশি জন পুরুষ আর আঠারো জন নারী নিজেদের প্রস্তুত করলেন এ যাত্রায়। যদিও কাফির-মুশরিকদের পাহারার চোখগুলো আগের চেয়ে সচেতন ছিল, তবুও তাঁরা সেগুলোকে ফাঁকি দিয়ে মক্কা ছাড়তে সক্ষম হলেন।
📄 মুসলমানদের ফেরাতে কুরাইশদের অপতৎপরতা
এবার আগের চেয়েও বড় দল হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় কুরাইশদের মাথার চুল ছেঁড়ার মতো অবস্থা। কিন্তু এবার তারা এক মারাত্মক চাল দিল মুসলিমদের মক্কায় ফিরিয়ে আনার জন্য। আবিসিনিয়ান রাজার সাথে দর কষাকষি করতে তারা পাঠাল দুই সদস্যের এক প্রতিনিধিদল—একজন আমর ইবনুল আস এবং অপরজন আবদুল্লাহ ইবনু রবীআ। তখন তারা মুশরিক ছিল। বুদ্ধিমত্তা ও চাতুর্যে তারা ছিল সে সময়কার প্রবাদপুরুষ। মুখে মুখে তাদের নাম।
পরিকল্পনামাফিক এই প্রতিনিধিদ্বয় প্রথমে আবিসিনিয়ার যাজকদের সাথে দেখা করে। উৎকোচ দিয়ে আদায় করে নেয় রাজার সাথে দেখা করার অনুমতি। সাক্ষাতের দিনে তারা রাজার সামনে পেশ করে আরবদেশ থেকে আনা বিপুল পরিমাণ উপঢৌকন। গলায় মধু ঢেলে বলে,
“মহারাজ, আমাদের শহর থেকে কিছু আহাম্মক এসে আপনার এই মহান রাজ্যে আস্তানা গেড়েছে। তারা আমাদের ধর্ম ত্যাগ করেছে বটে। কিন্তু আপনার ধর্মও গ্রহণ করেনি; বরং তারা নতুন এক দ্বীন-ধর্ম আবিষ্কার করেছে। যা না জানি আমরা আর না আপনি। তাদের পরিবারগুলো তাদের পাগলামির কারণে দুশ্চিন্তায় অস্থির। তাই তারা মহারাজের কাছে আমাদের পাঠিয়েছে, যেন আমরা ঘরের লোকদের ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে যাই। কারণ, ঘরের লোকই ভালো জানে তাদের অবস্থা সম্পর্কে। ফলে সে অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা সহজ হবে।"
রাজ-যাজকরাও পাশ থেকে সায় জানাতে থাকে। রাজাকে অনুরোধ করে এ আবেদন মেনে নিতে। কিন্তু রাজাকে তারা যতটা বোকা ভেবেছিল তিনি ততটা বোকা নন। তিনি বললেন যে, উভয়পক্ষকেই নিজ নিজ বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া হবে। দরবারে ডেকে আনা হয় মুহাজির মুসলিমদের। পরিবারকে ত্যাগ করে অজানা এক ধর্ম গ্রহণের কারণ জিজ্ঞেস করেন রাজা।
নবিজি ﷺ-এর চাচাত ভাই জা’ফার ইবনু আবী তালিব (রদিয়াল্লাহু আনহু) মুসলিমদের মুখপাত্র হয়ে বলেন,
“সম্রাট, আমরা অজ্ঞতায় ডুবে থাকা এক জাতি ছিলাম। মূর্তিপূজা করতাম, মৃত প্রাণীর মাংস খাওয়া থেকে শুরু করে এমন কোনও জঘন্য কাজ নেই, যা আমরা করতাম না। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করতাম, প্রতিবেশীদের সাথে করতাম অসদাচরণ। সবলেরা দুর্বলদের চুষে খেত। এভাবেই কাটছিল আমাদের দিন। তারপর আল্লাহ তাআলা একদিন আমাদের মধ্য থেকে তুলে আনলেন এমন এক বার্তাবাহক, যার বংশমর্যাদা, সততা, সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা আর বিশুদ্ধতা সম্পর্কে আমরা সবাই ওয়াকিফহাল। তিনি আমাদের আহ্বান করলেন এক ও অদ্বিতীয় উপাস্যকে মেনে নিতে, আল্লাহর ইবাদাত করতে। আমাদের বাপ-দাদারা যেসব ইট-পাথরকে পূজা করতেন, সেগুলোকে ত্যাগ করতে বললেন। আরও আদেশ দিলেন সদা সত্য বলার, কথা দিয়ে কথা রাখার, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের প্রতি দয়া করার। অন্যায় রক্তপাত, নির্লজ্জতা, মিথ্যাচার ও ধোঁকাবাজি করা থেকে নিষেধ করলেন। আরও নিষেধ করলেন অনাথের সম্পদ আত্মসাৎ ও সতী নারীর প্রতি অপবাদ দেওয়া থেকে।
তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যেন আমরা কোনও অংশীদার সাব্যস্ত করা ছাড়াই এক আল্লাহর আরাধনা করি। আদেশ করেছেন সালাত আদায়ের, সিয়াম পালনের এবং অভাবীকে তার প্রাপ্য প্রদানের। আমরা তাঁকে আল্লাহর রাসূল বলে স্বীকার করে নিয়েছি। আল্লাহর কাছ থেকে তিনি যা-ই নিয়ে আসেন, তারই অনুসরণ করি আমরা। তিনি যা নিষেধ করেন, তা পরিত্যাগ করি। যা আদেশ করেন, তা গ্রহণ করে নিই। আমাদের জাতির তা সহ্য হলো না। তারা আমাদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন চালাল, লোভ দেখিয়ে মূর্তিপূজায় ফেরত নিতে চাইল, ছেড়ে আসা জঘন্য কাজগুলো আবারও শুরু করতে বলল। আমাদের ও আমাদের দ্বীনের মাঝে তারা প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ালে আমরা তাদের থাবা থেকে পালাতে উদ্যত হই। অন্য সবার বদলে বেছে নিই আপনার আশ্রয়কে। মহারাজ, আমরা এখানে আপনার নিরাপত্তাপ্রার্থী। আশা করি আমাদের সাথে কোনও অবিচার করা হবে না।"
রাজা ধৈর্য ধরে শুনলেন জা'ফারের কথা। তারপর জানতে চাইলেন মুহাম্মাদ ﷺ-এর কাছে আসা বাণীর কিছু অংশ তিনি শোনাতে পারবেন কি না। সূরা মারইয়ামের শুরুর দিকের কয়েকটি আয়াত তিলাওয়াত করে শোনান জা'ফার (রাদিয়াল্লাহু আনহু)। তিলাওয়াত শুনে কাঁদতে কাঁদতে রাজার দাড়ি ভিজে যায়। যাজকরাও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। রাজা বলেন, “আরে এ যে সেই একই ঐশী রশ্মি, যা ঈসা নিয়ে এসেছিলেন!”
তারপর কুরাইশ প্রতিনিধিদের দিকে ফিরে রাজা বলেন, “আপনারা যেতে পারেন। আল্লাহর কসম! আমি ওদের না আপনাদের হাতে তুলে দেবো আর না তাদের প্রতি কোনও দুর্ব্যবহার করব।”
প্রতিনিধিদ্বয় এতে দমে যাওয়ার পাত্র নয়। তারা কৌশল পরিবর্তন করে। মুসলিমদের প্রতি রাজার মনে বিদ্বেষ তৈরি করার মোক্ষম অস্ত্রটি ছিল তাদের হাতে। পরদিন রাজদরবারে আবার দেখা করে আমর বলেন, “মহারাজ, একটা বিষয় তো বলাই হয়নি। এই লোকগুলো ঈসা (আলাইহিস সালাম)-কে নিয়ে এত জঘন্য কথা বলে, যা আপনার সামনে উচ্চারণ করতেও লজ্জা হয়।”
পুনরায় ডাকা হয় মুসলিমদের। ঈসা (আলাইহিস সালাম) সম্পর্কে তাঁদের কী বিশ্বাস, তা জানতে চাইলেন রাজা। জা'ফার ইবনু আবী তালিব (রদিয়াল্লাহু আনহু) অকপটে উত্তর দেন,
“আমরা তা-ই বলি, যা আমাদের নবিজি আমাদের শিখিয়েছেন। ঈসা (আলাইহিস সালাম) একজন মানুষ এবং আল্লাহর নবি। তিনি পবিত্র কুমারী মারইয়াম (আলাইহাস সালাম)-এর মাঝে আল্লাহর দেওয়া রূহ ও কালাম।”
রাজা মাটিতে পড়ে থাকা একটি খড়কুটো তুলে নেন। তারপর বলেন,
“আল্লাহর কসম! আপনি যা বললেন, মারইয়াম-তনয় ঈসা তার চেয়ে এই খড়কুটো পরিমাণও বেশি কিছু ছিলেন না। যান, আমার রাজ্যে শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে বাস করুন। আপনাদের প্রতি দুর্ব্যবহারকারীরা শাস্তি পাবে। আমি আপনাদের কোনও ক্ষতি হতে দেবো না, পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণের বিনিময়েও না।”
কুরাইশদের আনা সব উপঢৌকন ফেরত দিয়ে দেওয়ার আদেশ করেন তিনি। প্রতিনিধিদলটি ব্যর্থতার গ্লানি আর চরম অপমান নিয়ে ফিরে যায় মক্কায়। গিয়ে বলে, মুসলমানেরা উত্তম একটি রাষ্ট্রে উত্তম তত্ত্বাবধানে বসবাস করছে।[১৪৪]
টিকাঃ
[১৪৪] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/৩৩৪, ৩৩৮।
এবার আগের চেয়েও বড় দল হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় কুরাইশদের মাথার চুল ছেঁড়ার মতো অবস্থা। কিন্তু এবার তারা এক মারাত্মক চাল দিল মুসলিমদের মক্কায় ফিরিয়ে আনার জন্য। আবিসিনিয়ান রাজার সাথে দর কষাকষি করতে তারা পাঠাল দুই সদস্যের এক প্রতিনিধিদল—একজন আমর ইবনুল আস এবং অপরজন আবদুল্লাহ ইবনু রবীআ। তখন তারা মুশরিক ছিল। বুদ্ধিমত্তা ও চাতুর্যে তারা ছিল সে সময়কার প্রবাদপুরুষ। মুখে মুখে তাদের নাম।
পরিকল্পনামাফিক এই প্রতিনিধিদ্বয় প্রথমে আবিসিনিয়ার যাজকদের সাথে দেখা করে। উৎকোচ দিয়ে আদায় করে নেয় রাজার সাথে দেখা করার অনুমতি। সাক্ষাতের দিনে তারা রাজার সামনে পেশ করে আরবদেশ থেকে আনা বিপুল পরিমাণ উপঢৌকন। গলায় মধু ঢেলে বলে,
“মহারাজ, আমাদের শহর থেকে কিছু আহাম্মক এসে আপনার এই মহান রাজ্যে আস্তানা গেড়েছে। তারা আমাদের ধর্ম ত্যাগ করেছে বটে। কিন্তু আপনার ধর্মও গ্রহণ করেনি; বরং তারা নতুন এক দ্বীন-ধর্ম আবিষ্কার করেছে। যা না জানি আমরা আর না আপনি। তাদের পরিবারগুলো তাদের পাগলামির কারণে দুশ্চিন্তায় অস্থির। তাই তারা মহারাজের কাছে আমাদের পাঠিয়েছে, যেন আমরা ঘরের লোকদের ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে যাই। কারণ, ঘরের লোকই ভালো জানে তাদের অবস্থা সম্পর্কে। ফলে সে অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা সহজ হবে।"
রাজ-যাজকরাও পাশ থেকে সায় জানাতে থাকে। রাজাকে অনুরোধ করে এ আবেদন মেনে নিতে। কিন্তু রাজাকে তারা যতটা বোকা ভেবেছিল তিনি ততটা বোকা নন। তিনি বললেন যে, উভয়পক্ষকেই নিজ নিজ বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া হবে। দরবারে ডেকে আনা হয় মুহাজির মুসলিমদের। পরিবারকে ত্যাগ করে অজানা এক ধর্ম গ্রহণের কারণ জিজ্ঞেস করেন রাজা।
নবিজি ﷺ-এর চাচাত ভাই জা’ফার ইবনু আবী তালিব (রদিয়াল্লাহু আনহু) মুসলিমদের মুখপাত্র হয়ে বলেন,
“সম্রাট, আমরা অজ্ঞতায় ডুবে থাকা এক জাতি ছিলাম। মূর্তিপূজা করতাম, মৃত প্রাণীর মাংস খাওয়া থেকে শুরু করে এমন কোনও জঘন্য কাজ নেই, যা আমরা করতাম না। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করতাম, প্রতিবেশীদের সাথে করতাম অসদাচরণ। সবলেরা দুর্বলদের চুষে খেত। এভাবেই কাটছিল আমাদের দিন। তারপর আল্লাহ তাআলা একদিন আমাদের মধ্য থেকে তুলে আনলেন এমন এক বার্তাবাহক, যার বংশমর্যাদা, সততা, সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা আর বিশুদ্ধতা সম্পর্কে আমরা সবাই ওয়াকিফহাল। তিনি আমাদের আহ্বান করলেন এক ও অদ্বিতীয় উপাস্যকে মেনে নিতে, আল্লাহর ইবাদাত করতে। আমাদের বাপ-দাদারা যেসব ইট-পাথরকে পূজা করতেন, সেগুলোকে ত্যাগ করতে বললেন। আরও আদেশ দিলেন সদা সত্য বলার, কথা দিয়ে কথা রাখার, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের প্রতি দয়া করার। অন্যায় রক্তপাত, নির্লজ্জতা, মিথ্যাচার ও ধোঁকাবাজি করা থেকে নিষেধ করলেন। আরও নিষেধ করলেন অনাথের সম্পদ আত্মসাৎ ও সতী নারীর প্রতি অপবাদ দেওয়া থেকে।
তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যেন আমরা কোনও অংশীদার সাব্যস্ত করা ছাড়াই এক আল্লাহর আরাধনা করি। আদেশ করেছেন সালাত আদায়ের, সিয়াম পালনের এবং অভাবীকে তার প্রাপ্য প্রদানের। আমরা তাঁকে আল্লাহর রাসূল বলে স্বীকার করে নিয়েছি। আল্লাহর কাছ থেকে তিনি যা-ই নিয়ে আসেন, তারই অনুসরণ করি আমরা। তিনি যা নিষেধ করেন, তা পরিত্যাগ করি। যা আদেশ করেন, তা গ্রহণ করে নিই। আমাদের জাতির তা সহ্য হলো না। তারা আমাদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন চালাল, লোভ দেখিয়ে মূর্তিপূজায় ফেরত নিতে চাইল, ছেড়ে আসা জঘন্য কাজগুলো আবারও শুরু করতে বলল। আমাদের ও আমাদের দ্বীনের মাঝে তারা প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ালে আমরা তাদের থাবা থেকে পালাতে উদ্যত হই। অন্য সবার বদলে বেছে নিই আপনার আশ্রয়কে। মহারাজ, আমরা এখানে আপনার নিরাপত্তাপ্রার্থী। আশা করি আমাদের সাথে কোনও অবিচার করা হবে না।"
রাজা ধৈর্য ধরে শুনলেন জা'ফারের কথা। তারপর জানতে চাইলেন মুহাম্মাদ ﷺ-এর কাছে আসা বাণীর কিছু অংশ তিনি শোনাতে পারবেন কি না। সূরা মারইয়ামের শুরুর দিকের কয়েকটি আয়াত তিলাওয়াত করে শোনান জা'ফার (রাদিয়াল্লাহু আনহু)। তিলাওয়াত শুনে কাঁদতে কাঁদতে রাজার দাড়ি ভিজে যায়। যাজকরাও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। রাজা বলেন, “আরে এ যে সেই একই ঐশী রশ্মি, যা ঈসা নিয়ে এসেছিলেন!”
তারপর কুরাইশ প্রতিনিধিদের দিকে ফিরে রাজা বলেন, “আপনারা যেতে পারেন। আল্লাহর কসম! আমি ওদের না আপনাদের হাতে তুলে দেবো আর না তাদের প্রতি কোনও দুর্ব্যবহার করব।”
প্রতিনিধিদ্বয় এতে দমে যাওয়ার পাত্র নয়। তারা কৌশল পরিবর্তন করে। মুসলিমদের প্রতি রাজার মনে বিদ্বেষ তৈরি করার মোক্ষম অস্ত্রটি ছিল তাদের হাতে। পরদিন রাজদরবারে আবার দেখা করে আমর বলেন, “মহারাজ, একটা বিষয় তো বলাই হয়নি। এই লোকগুলো ঈসা (আলাইহিস সালাম)-কে নিয়ে এত জঘন্য কথা বলে, যা আপনার সামনে উচ্চারণ করতেও লজ্জা হয়।”
পুনরায় ডাকা হয় মুসলিমদের। ঈসা (আলাইহিস সালাম) সম্পর্কে তাঁদের কী বিশ্বাস, তা জানতে চাইলেন রাজা। জা'ফার ইবনু আবী তালিব (রদিয়াল্লাহু আনহু) অকপটে উত্তর দেন,
“আমরা তা-ই বলি, যা আমাদের নবিজি আমাদের শিখিয়েছেন। ঈসা (আলাইহিস সালাম) একজন মানুষ এবং আল্লাহর নবি। তিনি পবিত্র কুমারী মারইয়াম (আলাইহাস সালাম)-এর মাঝে আল্লাহর দেওয়া রূহ ও কালাম।”
রাজা মাটিতে পড়ে থাকা একটি খড়কুটো তুলে নেন। তারপর বলেন,
“আল্লাহর কসম! আপনি যা বললেন, মারইয়াম-তনয় ঈসা তার চেয়ে এই খড়কুটো পরিমাণও বেশি কিছু ছিলেন না। যান, আমার রাজ্যে শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে বাস করুন। আপনাদের প্রতি দুর্ব্যবহারকারীরা শাস্তি পাবে। আমি আপনাদের কোনও ক্ষতি হতে দেবো না, পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণের বিনিময়েও না।”
কুরাইশদের আনা সব উপঢৌকন ফেরত দিয়ে দেওয়ার আদেশ করেন তিনি। প্রতিনিধিদলটি ব্যর্থতার গ্লানি আর চরম অপমান নিয়ে ফিরে যায় মক্কায়। গিয়ে বলে, মুসলমানেরা উত্তম একটি রাষ্ট্রে উত্তম তত্ত্বাবধানে বসবাস করছে।[১৪৪]
টিকাঃ
[১৪৪] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/৩৩৪, ৩৩৮।
📄 দেশে-বিদেশে পরাজিত মুশরিকপক্ষের পেরেশানি
ঘরে-বাইরে একের পর এক পরাজয়ে মুশরিকদের মরিয়া ভাব বাড়তে থাকে। বিদেশের মাটিতে রাজদরবারে তাদের গোত্রের নাম ডুবেছে স্রেফ একটি ছোট্ট শরণার্থীদলের কারণে। এ অপমান মেনে নেওয়া যায় না। রক্তের মাধ্যমে হলেও তারা মুসলিমদের কাছ থেকে এর মূল্য বুঝে পেতে বদ্ধপরিকর হয়।
কিন্তু কী করে? আবূ তালিব এখনও ভাতিজার সমর্থনে বটবৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে। কোনও ছল-চাতুরিতেই তাঁকে টলানো যাচ্ছে না। চাচার নিরাপত্তাবলয়ে মুহাম্মাদ অবাধে নিজের মিশন চালিয়ে যাচ্ছেন। এখন পর্যন্ত নির্যাতন, হত্যাচেষ্টা, ঘুষ, তর্ক, এমনকি সমঝোতার মাধ্যমেও কোনও ফলাফল আসেনি।
ঘরে-বাইরে একের পর এক পরাজয়ে মুশরিকদের মরিয়া ভাব বাড়তে থাকে। বিদেশের মাটিতে রাজদরবারে তাদের গোত্রের নাম ডুবেছে স্রেফ একটি ছোট্ট শরণার্থীদলের কারণে। এ অপমান মেনে নেওয়া যায় না। রক্তের মাধ্যমে হলেও তারা মুসলিমদের কাছ থেকে এর মূল্য বুঝে পেতে বদ্ধপরিকর হয়।
কিন্তু কী করে? আবূ তালিব এখনও ভাতিজার সমর্থনে বটবৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে। কোনও ছল-চাতুরিতেই তাঁকে টলানো যাচ্ছে না। চাচার নিরাপত্তাবলয়ে মুহাম্মাদ অবাধে নিজের মিশন চালিয়ে যাচ্ছেন। এখন পর্যন্ত নির্যাতন, হত্যাচেষ্টা, ঘুষ, তর্ক, এমনকি সমঝোতার মাধ্যমেও কোনও ফলাফল আসেনি।
📄 নবিজি ﷺ-এর প্রতি নির্যাতন বৃদ্ধি ও হত্যার প্রচেষ্টা
আবিসিনিয়ার দরবারে পরাজয়ের রাগ কুরাইশরা স্বভাবতই হাতের কাছে থাকা মুসলমানদের ওপর প্রকাশ করতে লাগল।
নবিজি ﷺ-এর মেয়ে উম্মু কুলসূম (রদিয়াল্লাহু আনহা)-কে তালাক দেওয়া সেই উতাইবা ইবনু আবী লাহাব এবার নবিজি ﷺ-এর কাছে এল। সূরা নাজমের এই আয়াতটি:
ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّى ﴿৮﴾ فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى ﴿৯﴾
“অতঃপর নিকটবর্তী হলো ও ঝুলে গেল। তখন দুই ধনুকের ব্যবধান ছিল অথবা আরও কম।” [১৪৫]
উদ্ধৃত করে বলল, “এই কথা যে বানিয়েছে, আমি তাকে অবিশ্বাস করি।” কুরাইশদের ওই সাজদার ঘটনার জ্বালা প্রশমন করতেই মূলত জোর করে এই কথা বলা।
ধীরে ধীরে এই উতাইবা লোকটা নবিজি ﷺ-এর জন্য বিরতিহীন বিরক্তির উৎসে পরিণত হতে শুরু করে। একবার সে এমনকি নবিজির জামা টেনে ছিঁড়ে ফেলে এবং মুখে থুতু মেরে বসে। আল্লাহর রাসূল জবাবে বদদুআ করেন, “হে আল্লাহ, আপনার একটি কুকুরকে এর ওপর লেলিয়ে দিন।”
এর অল্প কিছুকাল পরের ঘটনা। এক কাফেলার সাথে সিরিয়ায় যায় উতাইবা। ‘যারকা’ নামক স্থানে যাত্রাবিরতির সময়ে একটি সিংহ এসে কাফেলার চারপাশে ঘুরতে থাকে। আতঙ্কিত উতাইবা চিৎকার করে ওঠে, “ইয়া আল্লাহ, এটা নিশ্চিত আমাকে খাওয়ার জন্য এসেছে! মুহাম্মাদের প্রার্থনা দেখি সত্যি হয়ে গেল! মক্কায় বসে সে আমাকে সিরিয়ায় খুন করে ফেলছে!”
রাতে ঘুমানোর সময় কাফেলার লোকেরা উতাইবাকে একদম মাঝখানে শুতে দিল। তা সত্ত্বেও সিংহটি সব উট আর মানুষকে পাশ কাটিয়ে উতাইবার গায়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে। থাবা দিয়ে মাথা ছিঁড়ে ফেলে ওই দুরাত্মাটির ভবলীলা সাঙ্গ করে দেয়।[১৪৬]
মক্কার ঘরে ঘরে নবি ﷺ-এর শত্রু। আগে একবার সাজদারত নবিজির ঘাড়ে উটের নাড়িভুঁড়ি তুলে দেওয়া উকবা ইবনু আবী মু'আইত আবারও হাজির হলো সালাতের সময়ে। এবার রাসূলুল্লাহ সাজদায় গেলে তাঁর ঘাড়ে পা রেখে সে এত জোরে চাপ দেয় যে, নবিজির চোখ ফেটে যাবার উপক্রম হয়।[১৪৭]
অবশেষে যখন কিছুতেই নবি ﷺ-কে ঠেকানো গেল না, তখন মুশরিকরা তাঁকে হত্যা করার পরিকল্পনার দিকে বিশেষ মনোযোগ দিল। গোত্রকেন্দ্রিক সমাজে এ ধরনের হত্যা অল্পতে শেষ হয়ে যায় না। একটি হত্যাকাণ্ডের জের ধরে বিশাল রক্তপাত হয়। বহুদিন ধরে চলতে থাকে এর গরম হাওয়া। তবু তাদের আর তর সইছিল না। আবূ জাহল কুরাইশদের মাঝে ঘোষণা করল,
“দেখতেই তো পাচ্ছেন, মুহাম্মাদ কতটা বেপরোয়া হয়ে তার মতো সে কাজ করেই যাচ্ছে। পূর্বপুরুষদের অস্বীকার করছে, তাদের পথভ্রষ্ট বলে অপমানিত করছে, আমাদের মূর্খ বলে ডাকছে, আর দেব-দেবীদের বিরুদ্ধকথা প্রচার করেই চলেছে সে। আমি আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি। একদিন আমি ভারী একটি পাথর নিয়ে অপেক্ষায় থাকব। সে সাজদায় যাওয়ামাত্রই ওটা দিয়ে ওর মাথা গুঁড়িয়ে দেবো। এরপর তোমরা বানু আবদি মানাফের আক্রোশ থেকে চাইলে আমাকে বাঁচাতেও পারো, অথবা চাইলে ওদের হাতে তুলেও দিতে পারো।”
লোকজন আশ্বস্ত করল, “চিন্তা করবেন না। আল্লাহর কসম! আমরা কখনও আপনাকে ছেড়ে যাব না। যা চান, তা-ই করুন।”
সমর্থকদের উৎসাহ পেয়ে আবু জাহলও দেরি করল না। পরদিন ঠিকই ভারী একটি পাথর নিয়ে অপেক্ষায় রইল। নবি যথারীতি কা'বায় এসে সালাতে দাঁড়ালেন। কা'বার চারপাশে জায়গায় জায়গায় জটলা পাকিয়ে বসে ছিল কুরাইশরা। আবূ জাহল কী করে, তা দেখতে সবাই অপেক্ষমাণ। আবূ জাহল কার্যসমাধা করতে এগিয়ে গেল ঠিকই। কিন্তু পরক্ষণেই পেছনে ঘুরে দিল দৌড়। চেহারা ফ্যাকাসে, দৃষ্টি উদ্ভ্রান্ত, হাতে তখনো শক্ত করে ধরা সেই পাথর। কুরাইশরা ব্যস্তসমস্ত হয়ে তাকে ধরে শান্ত করল। জিজ্ঞেস করল, “আবুল হাকাম, হঠাৎ কী হলো?”
সে বলল “আমি তো কথামতো কাজ করতেই যাচ্ছিলাম, কিন্তু হঠাৎ কোত্থেকে একটা উট এসে হাজির। আল্লাহর কসম! এত বড় মাথা, গলা আর দাঁতওয়ালা উট আমি জীবনেও দেখিনি। আমাকে খেয়ে ফেলতে আসছিল ওটা।”
নবি পরে বলেছিলেন, "সেটা আসলে জিবরীল ছিল। যদি সে আমার নিকটবর্তী হতো তাহলে সে তাকে ধরে ফেলত।” [১৪৮]
তবে এতকিছুর পরও অন্যান্য কুরাইশ নেতারা আবূ জাহলের অভিজ্ঞতা থেকে কোনও শিক্ষা নেয়নি। একদিন নবিজি কা'বা তওয়াফ করছিলেন। আশপাশে থাকা কুরাইশরা তাঁকে উদ্দেশ্য করে টিটকারি মারতে থাকে। রাসূলুল্লাহ যত বিরক্ত হন, তাদের টিটকারি-মশকরা তত বাড়ে। অবশেষে আল্লাহর রাসূল থেমে তাদের মুখের ওপর বললেন, “হে কুরাইশের লোকসকল, তোমরা কি শুনছ? যেই সত্তার হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম! আমি তোমাদের হত্যা ও যবাই করার আদেশ নিয়ে এসেছি!” [১৪৯]
নবিজির মুখে এমন কথা শুনে মশকরাকারীদের বুক ধক করে ওঠে। কিছুক্ষণ নীরব থেকে তারা নরম-সরম কথা বলে মুহাম্মাদ ﷺ-কে নিরস্ত করতে চেষ্টা করে।
পরদিন আবার ওই একই লোকেরা নতুন করে সাহস সঞ্চয় করে কা'বায় আসে। বলাবলি করতে থাকে মুহাম্মাদ সম্পর্কে। একটু পর নবিজি হাজির হতেই তেড়েফুঁড়ে এল তারা। নবিজির জামা টানতে টানতে বলল, “তুই-ই তো সেই লোক না, যে আমাদের বাপ-দাদাদের দেবতাদের ভুলে যেতে বলে?”
নবি একটুও ভয় না পেয়ে বলেন, “হ্যাঁ। আমিই সেই লোক।”
উন্মাদ হয়ে থাকা জটলাটার কেউ তাঁকে ধাক্কাধাক্কি করতে থাকে, কেউ ছোটায় গালির তুবড়ি। নবিজির গলার কাপড় টেনে ধরে উকবা ইবনু আবী মু'আইত তাঁর শ্বাসরোধ করে ফেলার জোগাড় করে। কোলাহল শুনে দৌড়ে আসেন আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)। উকবার কাঁধে সজোরে টান দিয়ে তার কাছ থেকে মুহাম্মাদ-কে ছাড়িয়ে নেন। তারপর প্রতিটা ব্যক্তিকে টেনেটুনে নবিজির কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে থাকেন। বলেন, “ওরে হতাভাগার দল! তোমাদের জন্য আফসোস! একজন মানুষ আল্লাহকে নিজের রব বলছে দেখেই বুঝি তোমরা তাকে মেরে ফেলতে চাও?”
উত্তেজিত মুশরিকরা এবার নবিজি ﷺ-কে ছেড়ে দিয়ে আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)- কে ধরল। নবিজিকে নিরাপদ রাখতে তিনি জীবন দিতেও প্রস্তুত। সেদিন আবূ বকরকে এত মারা হয় যে, তাঁর চেহারা থেকে নাক আলাদা করে বোঝা যাচ্ছিল না। তাঁর গোত্র বানু তাইমের লোকেরা তাঁকে পরে জড়াজড়ি করে ঘরে পৌঁছে দেয়। সবাই ধরেই নিয়েছিল যে, তিনি পরেরদিন পর্যন্ত আর বাঁচবেন না।
কিন্তু আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) সেদিন সন্ধ্যায়ই কথা বলতে আরম্ভ করেন। সন্ধ্যায় জ্ঞান ফেরার পর প্রথমেই জানতে চান মুহাম্মাদ কেমন আছেন। এত প্রাণপণ ভক্তি দেখে প্রচণ্ড তিরস্কার করে গোত্রের লোকেরা। নিজের স্বাস্থ্য ঠিক রাখা তো দূরের কথা, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুস্থতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার আগে তিনি সেদিন খাবার- পানিও ছুঁয়ে দেখেননি। ওই আঁধারের মাঝেই তাঁকে দারুল আরকামে নিয়ে যাওয়া হয়। নবিজিকে জীবিত ও সুস্থ দেখে তারপরেই তিনি খাবার-পানীয় গ্রহণ করেন।[১৫০]
হিজরতের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগ পর্যন্ত আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) মুহুর্মুহু নির্যাতনের শিকার হন। অবশেষে একদিন আবিসিনিয়ার উদ্দেশে মক্কা ছেড়ে রওনা দেন তিনি। পথে 'বার্ক গিমাদ' নামক একটি জায়গা পড়ে। সেখানে দেখা হয় মালিক ইবনুদ দাগিনার সাথে। তিনি বিখ্যাত 'কারা' ও 'আহাবীশ' গোত্রের নেতা। আবু বকরের মক্কাত্যাগের কারণ জানতে চান মালিক। সব শুনে নাখোশ হয়ে বলেন, “আপনি অভাবীদের কত সাহায্য করেন, পরিবারের সাথে ভালো আচরণ করেন, অভাগাদের বোঝা বয়ে নেন, মেহমানের কদর করেন, সত্যের জন্য কষ্ট সহ্য করা মানুষদেরও আশ্রয় দেন। আপনার মতো মানুষকে আবার বহিষ্কার করে কীভাবে? এক কাজ করুন। আপনি আমার সাথে চলুন। নিজের শহরেই নিজের রবের উপাসনা করবেন, আসুন।"
মালিকের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি মেনে নেন আবু বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)। দু'জনে একসাথে ফিরে যান মক্কায়। মালিক ঘোষণা করে দেন যে, তিনি আবূ বকরকে নিরাপত্তা দিয়েছেন। তবে শর্ত হলো যে, তিনি শুধু ঘরের ভেতর লোকচক্ষুর আড়ালে সালাত আদায় করবেন। পৌত্তলিকরা কিছুটা হলেও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। ইসলামের প্রকাশ্য প্রচারণা দেখে তাদের নারী, শিশু এবং সরল মানুষেরা কখন বিগড়ে যায়, এ নিয়ে তারা বেশ ভয়েই থাকত।
আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) কিছুদিন সে শর্ত মেনে চলেন। পরে একদিন বারান্দায় সালাত আদায় ও কুরআন তিলাওয়াত করতে শুরু করেন। ফলে আবারও মানুষজন তাঁকে ইবাদাতরত অবস্থায় দেখতে পায়। ইবনুদ দাগিনা সে খবর পেয়ে তাঁকে নিরাপত্তার শর্তের কথা মনে করিয়ে দেন। আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) ভেবেচিন্তে অবশেষে ইবনুদ দাগিনার প্রতিশ্রুতি বাতিল করে ফেলেন। তিনি বলেন, “আমার রবের দেওয়া নিরাপত্তা পেয়েই আমি খুশি।”
আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর এই ভক্তি কোনও লোকদেখানো বিষয় নয়। তাঁর অন্তর ছিল সত্যিই কোমল। তিনি অত্যধিক কান্নাকাটি করতেন। আল্লাহর পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি, শাস্তির হুমকি, সৃষ্টিজগতের বর্ণনা, আগেকার নবিদের ঘটনা কুরআনে পড়তে পড়তে অশ্রুসজল হয়ে উঠত তাঁর চোখ। কুরআনের প্রতি এই আবেগ দেখে মুশরিকদের নারী ও শিশুরা তাঁর আশপাশে ভিড় জমাত, তাঁকে কাঁদতে দেখে তারাও কাঁদত এবং তন্ময় হয়ে শুনত। গোঁয়ার মুশরিকদের কাছে এই জিনিস আবার অসহনীয় হয়ে উঠতে থাকে। এর কারণেও তারা আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে কষ্ট দিত।[১৫১]
কিন্তু ইসলামের প্রতি এই কঠোর অবস্থান সকল মক্কাবাসীর বৈশিষ্ট্য ছিল না। কিছু মানুষ ছিলেন পৌত্তলিক সমাজে স্তম্ভের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নবিজির বার্তা নিয়ে একান্তে ভাবতে গেলে এদের অন্তরের পাথর ঠিকই গলতে শুরু করত। গোটা কুরাইশদের বিরোধিতার মুখেও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অটল সাহস ও অবিচল ধৈর্য দেখে অভিভূত হয়ে পড়েন তাঁরা। এ-রকম কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ইসলাম গ্রহণ করেন হামযা ইবনু আবদিল মুত্তালিব এবং উমর ইবনুল খাত্তাব (রদিয়াল্লাহু আনহুমা)। ইসলামের ইতিহাসে এ দু'জনের মুসলিম হওয়ার ঘটনা এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এদের ইসলাম গ্রহণের ফলে মুসলমানদের শক্তি কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছিল।
আবূ জাহল ছাড়াও এমন আরও পাঁচ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি হলো ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরা মাখযূমি, আসওয়াদ ইবনু আবদি ইয়াগূস যুহরি, আবূ যামআ আসওয়াদ ইবনু আবদিল মুত্তালিব আসাদি, হারিস ইবনু কাইস খুযাঈ এবং আস ইবনু ওয়াইল সাহমি। নুবুওয়াতি মিশন শুরু হওয়ার পর মক্কায় এত বছর কেটে গেলেও নবি ﷺ একটিবারের জন্যও প্রতিশোধ নেননি। কারণ, আল্লাহই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, যথাসময়ে তিনি এদের দেখে নেবেন। শেষ পর্যন্ত মুহাম্মাদ ﷺ-এর কঠিনতম শত্রুরা করুণতম মৃত্যুর শিকার হয়েছিল।
* ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরার গায়ে সামান্য তিরের আঁচড় লেগেছিল। সে এটিকে পাত্তাই দেয়নি। কিন্তু জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আঁচড়টির দিকে ইশারা করেন ফলে তাতে জ্বালাপোড়া শুরু হয়। বেশ কয়েক বছর ধরে সেই ক্ষতের প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ধুঁকে ধুঁকে অবশেষে মৃত্যু হয় ওয়ালীদের।
* একইভাবে জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আসওয়াদ ইবনু আবদি ইয়াগুসের দিকে ইশারা করেন। তার শরীরে ফোস্কা পড়ে যায় এবং এটাই তার মৃত্যুর কারণ হয়। আরেক উৎস থেকে জানা যায় যে, সূর্যের প্রখর তাপে এই ফোস্কা পড়ে। তবে এতেও জিবরীলেরই ভূমিকা ছিল। অন্য আরেক বর্ণনামতে, জিবরীল তার পেটের দিকে ইশারা করেন। ফলে তার পেট এমনভাবে ফুলে ওঠে যে, এতেই তার মৃত্যু হয়।
* আসওয়াদ ইবনু আবদিল মুত্তালিবের বাড়াবাড়ি চরমে পৌঁছালে নবি দুআ করেন, যেন আল্লাহ তার দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেন এবং তাকে পিতৃত্ব থেকে বঞ্চিত করেন। জিবরীল (আলাইহিস সালাম)-কে পাঠানো হয় একটি কাঁটাদার গাছের ডাল দিয়ে আঘাত করে তাকে অন্ধ করে দিতে এবং তার ছেলেকেও মেরে ফেলতে। তিনি যথাযথভাবে আদেশ পালন করেন। ফলে সে অন্ধ হয়ে যায় এবং তার ছেলেরাও মৃত্যুবরণ করে।
* হারিস ইবনু কাইসের মৃত্যু আরও করুণ। মৃত্যুশয্যায় তার তার পেট হলুদ তরলে ভরে ওঠে। আর পেটের সব বর্জ্য বেরিয়ে আসতে থাকে নাক দিয়ে। এভাবে যন্ত্রণাকর অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
* আস ইবনু ওয়াইল একবার একটি কাঁটাযুক্ত গাছে বসেছিল। যার একটি কাঁটা তার পায়ে বিদ্ধ হয়। সে কাঁটার বিষে তার পা ফুলে যায় এবং সে বিষ মাথা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ওই বিষের প্রভাবেই তার জীবনাবসান ঘটে। [১৩৯]
এই হলো তাদের পাঁচ জনের সংক্ষিপ্ত পরিণাম-কাহিনি। এসব ইসলামবিদ্বেষী দুর্ভাগারা এ-রকম ঐশী শাস্তির শিকার হয়।
তবে বেশির ভাগ সময়ই নবি ধৈর্য ধরে সকল বিরোধিতা সহ্য করে যান, ঠিক যেমনটি করেছিলেন পূর্বেকার নবি-রাসূলগণ। এমন অটল ধৈর্য ও ঈমান দেখে সাহাবিদের অন্তরও প্রশান্ত হয়, আল্লাহর আনুগত্যে অবিচল থাকে তাদের হৃদয়। এদিকে যথারীতি চলতে থাকে মুশরিকদের মৌখিক গালাগাল ও শারীরিক নির্যাতন।
টিকাঃ
[১৩৯] তাবারি, তাফসীর, ৮/৯০; সুয়ূতি, আদ-দুররুল মানসূর, ৪/২০০।
[১৪৫] সূরা নাজম, ৫৩: ৭-৮।
[১৪৬] ইবনু হাজার, আল-ইসাবাহ, ৮/১৩৮; বাইহাকি, দালাইলুন নুবুওয়াহ, ২/৩৩৯।
[১৪৭] শাইখ আবদুল্লাহ, মুখতাসারুস-সীরাহ, ১১৩।
[১৪৮] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/২৯৮-২৯৯।
[১৪৯] ইবনু হিব্বান, ৬৫৬৭; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ১১/২০০১।
[১৫০] বুখারি, ৩৮৫৬; ইবনু হিশাম, ১/২৮৯-২৯০; সুযুতি, আদ-দুররুল মানসূর, ৫/৬৫৫।
[১৫১] বুখারি, ৩৯০৫。
আবিসিনিয়ার দরবারে পরাজয়ের রাগ কুরাইশরা স্বভাবতই হাতের কাছে থাকা মুসলমানদের ওপর প্রকাশ করতে লাগল।
নবিজি ﷺ-এর মেয়ে উম্মু কুলসূম (রদিয়াল্লাহু আনহা)-কে তালাক দেওয়া সেই উতাইবা ইবনু আবী লাহাব এবার নবিজি ﷺ-এর কাছে এল। সূরা নাজমের এই আয়াতটি:
ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّى ﴿৮﴾ فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى ﴿৯﴾
“অতঃপর নিকটবর্তী হলো ও ঝুলে গেল। তখন দুই ধনুকের ব্যবধান ছিল অথবা আরও কম।” [১৪৫]
উদ্ধৃত করে বলল, “এই কথা যে বানিয়েছে, আমি তাকে অবিশ্বাস করি।” কুরাইশদের ওই সাজদার ঘটনার জ্বালা প্রশমন করতেই মূলত জোর করে এই কথা বলা।
ধীরে ধীরে এই উতাইবা লোকটা নবিজি ﷺ-এর জন্য বিরতিহীন বিরক্তির উৎসে পরিণত হতে শুরু করে। একবার সে এমনকি নবিজির জামা টেনে ছিঁড়ে ফেলে এবং মুখে থুতু মেরে বসে। আল্লাহর রাসূল জবাবে বদদুআ করেন, “হে আল্লাহ, আপনার একটি কুকুরকে এর ওপর লেলিয়ে দিন।”
এর অল্প কিছুকাল পরের ঘটনা। এক কাফেলার সাথে সিরিয়ায় যায় উতাইবা। ‘যারকা’ নামক স্থানে যাত্রাবিরতির সময়ে একটি সিংহ এসে কাফেলার চারপাশে ঘুরতে থাকে। আতঙ্কিত উতাইবা চিৎকার করে ওঠে, “ইয়া আল্লাহ, এটা নিশ্চিত আমাকে খাওয়ার জন্য এসেছে! মুহাম্মাদের প্রার্থনা দেখি সত্যি হয়ে গেল! মক্কায় বসে সে আমাকে সিরিয়ায় খুন করে ফেলছে!”
রাতে ঘুমানোর সময় কাফেলার লোকেরা উতাইবাকে একদম মাঝখানে শুতে দিল। তা সত্ত্বেও সিংহটি সব উট আর মানুষকে পাশ কাটিয়ে উতাইবার গায়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে। থাবা দিয়ে মাথা ছিঁড়ে ফেলে ওই দুরাত্মাটির ভবলীলা সাঙ্গ করে দেয়।[১৪৬]
মক্কার ঘরে ঘরে নবি ﷺ-এর শত্রু। আগে একবার সাজদারত নবিজির ঘাড়ে উটের নাড়িভুঁড়ি তুলে দেওয়া উকবা ইবনু আবী মু'আইত আবারও হাজির হলো সালাতের সময়ে। এবার রাসূলুল্লাহ সাজদায় গেলে তাঁর ঘাড়ে পা রেখে সে এত জোরে চাপ দেয় যে, নবিজির চোখ ফেটে যাবার উপক্রম হয়।[১৪৭]
অবশেষে যখন কিছুতেই নবি ﷺ-কে ঠেকানো গেল না, তখন মুশরিকরা তাঁকে হত্যা করার পরিকল্পনার দিকে বিশেষ মনোযোগ দিল। গোত্রকেন্দ্রিক সমাজে এ ধরনের হত্যা অল্পতে শেষ হয়ে যায় না। একটি হত্যাকাণ্ডের জের ধরে বিশাল রক্তপাত হয়। বহুদিন ধরে চলতে থাকে এর গরম হাওয়া। তবু তাদের আর তর সইছিল না। আবূ জাহল কুরাইশদের মাঝে ঘোষণা করল,
“দেখতেই তো পাচ্ছেন, মুহাম্মাদ কতটা বেপরোয়া হয়ে তার মতো সে কাজ করেই যাচ্ছে। পূর্বপুরুষদের অস্বীকার করছে, তাদের পথভ্রষ্ট বলে অপমানিত করছে, আমাদের মূর্খ বলে ডাকছে, আর দেব-দেবীদের বিরুদ্ধকথা প্রচার করেই চলেছে সে। আমি আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি। একদিন আমি ভারী একটি পাথর নিয়ে অপেক্ষায় থাকব। সে সাজদায় যাওয়ামাত্রই ওটা দিয়ে ওর মাথা গুঁড়িয়ে দেবো। এরপর তোমরা বানু আবদি মানাফের আক্রোশ থেকে চাইলে আমাকে বাঁচাতেও পারো, অথবা চাইলে ওদের হাতে তুলেও দিতে পারো।”
লোকজন আশ্বস্ত করল, “চিন্তা করবেন না। আল্লাহর কসম! আমরা কখনও আপনাকে ছেড়ে যাব না। যা চান, তা-ই করুন।”
সমর্থকদের উৎসাহ পেয়ে আবু জাহলও দেরি করল না। পরদিন ঠিকই ভারী একটি পাথর নিয়ে অপেক্ষায় রইল। নবি যথারীতি কা'বায় এসে সালাতে দাঁড়ালেন। কা'বার চারপাশে জায়গায় জায়গায় জটলা পাকিয়ে বসে ছিল কুরাইশরা। আবূ জাহল কী করে, তা দেখতে সবাই অপেক্ষমাণ। আবূ জাহল কার্যসমাধা করতে এগিয়ে গেল ঠিকই। কিন্তু পরক্ষণেই পেছনে ঘুরে দিল দৌড়। চেহারা ফ্যাকাসে, দৃষ্টি উদ্ভ্রান্ত, হাতে তখনো শক্ত করে ধরা সেই পাথর। কুরাইশরা ব্যস্তসমস্ত হয়ে তাকে ধরে শান্ত করল। জিজ্ঞেস করল, “আবুল হাকাম, হঠাৎ কী হলো?”
সে বলল “আমি তো কথামতো কাজ করতেই যাচ্ছিলাম, কিন্তু হঠাৎ কোত্থেকে একটা উট এসে হাজির। আল্লাহর কসম! এত বড় মাথা, গলা আর দাঁতওয়ালা উট আমি জীবনেও দেখিনি। আমাকে খেয়ে ফেলতে আসছিল ওটা।”
নবি পরে বলেছিলেন, "সেটা আসলে জিবরীল ছিল। যদি সে আমার নিকটবর্তী হতো তাহলে সে তাকে ধরে ফেলত।” [১৪৮]
তবে এতকিছুর পরও অন্যান্য কুরাইশ নেতারা আবূ জাহলের অভিজ্ঞতা থেকে কোনও শিক্ষা নেয়নি। একদিন নবিজি কা'বা তওয়াফ করছিলেন। আশপাশে থাকা কুরাইশরা তাঁকে উদ্দেশ্য করে টিটকারি মারতে থাকে। রাসূলুল্লাহ যত বিরক্ত হন, তাদের টিটকারি-মশকরা তত বাড়ে। অবশেষে আল্লাহর রাসূল থেমে তাদের মুখের ওপর বললেন, “হে কুরাইশের লোকসকল, তোমরা কি শুনছ? যেই সত্তার হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম! আমি তোমাদের হত্যা ও যবাই করার আদেশ নিয়ে এসেছি!” [১৪৯]
নবিজির মুখে এমন কথা শুনে মশকরাকারীদের বুক ধক করে ওঠে। কিছুক্ষণ নীরব থেকে তারা নরম-সরম কথা বলে মুহাম্মাদ ﷺ-কে নিরস্ত করতে চেষ্টা করে।
পরদিন আবার ওই একই লোকেরা নতুন করে সাহস সঞ্চয় করে কা'বায় আসে। বলাবলি করতে থাকে মুহাম্মাদ সম্পর্কে। একটু পর নবিজি হাজির হতেই তেড়েফুঁড়ে এল তারা। নবিজির জামা টানতে টানতে বলল, “তুই-ই তো সেই লোক না, যে আমাদের বাপ-দাদাদের দেবতাদের ভুলে যেতে বলে?”
নবি একটুও ভয় না পেয়ে বলেন, “হ্যাঁ। আমিই সেই লোক।”
উন্মাদ হয়ে থাকা জটলাটার কেউ তাঁকে ধাক্কাধাক্কি করতে থাকে, কেউ ছোটায় গালির তুবড়ি। নবিজির গলার কাপড় টেনে ধরে উকবা ইবনু আবী মু'আইত তাঁর শ্বাসরোধ করে ফেলার জোগাড় করে। কোলাহল শুনে দৌড়ে আসেন আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)। উকবার কাঁধে সজোরে টান দিয়ে তার কাছ থেকে মুহাম্মাদ-কে ছাড়িয়ে নেন। তারপর প্রতিটা ব্যক্তিকে টেনেটুনে নবিজির কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে থাকেন। বলেন, “ওরে হতাভাগার দল! তোমাদের জন্য আফসোস! একজন মানুষ আল্লাহকে নিজের রব বলছে দেখেই বুঝি তোমরা তাকে মেরে ফেলতে চাও?”
উত্তেজিত মুশরিকরা এবার নবিজি ﷺ-কে ছেড়ে দিয়ে আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)- কে ধরল। নবিজিকে নিরাপদ রাখতে তিনি জীবন দিতেও প্রস্তুত। সেদিন আবূ বকরকে এত মারা হয় যে, তাঁর চেহারা থেকে নাক আলাদা করে বোঝা যাচ্ছিল না। তাঁর গোত্র বানু তাইমের লোকেরা তাঁকে পরে জড়াজড়ি করে ঘরে পৌঁছে দেয়। সবাই ধরেই নিয়েছিল যে, তিনি পরেরদিন পর্যন্ত আর বাঁচবেন না।
কিন্তু আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) সেদিন সন্ধ্যায়ই কথা বলতে আরম্ভ করেন। সন্ধ্যায় জ্ঞান ফেরার পর প্রথমেই জানতে চান মুহাম্মাদ কেমন আছেন। এত প্রাণপণ ভক্তি দেখে প্রচণ্ড তিরস্কার করে গোত্রের লোকেরা। নিজের স্বাস্থ্য ঠিক রাখা তো দূরের কথা, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুস্থতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার আগে তিনি সেদিন খাবার- পানিও ছুঁয়ে দেখেননি। ওই আঁধারের মাঝেই তাঁকে দারুল আরকামে নিয়ে যাওয়া হয়। নবিজিকে জীবিত ও সুস্থ দেখে তারপরেই তিনি খাবার-পানীয় গ্রহণ করেন।[১৫০]
হিজরতের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগ পর্যন্ত আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) মুহুর্মুহু নির্যাতনের শিকার হন। অবশেষে একদিন আবিসিনিয়ার উদ্দেশে মক্কা ছেড়ে রওনা দেন তিনি। পথে 'বার্ক গিমাদ' নামক একটি জায়গা পড়ে। সেখানে দেখা হয় মালিক ইবনুদ দাগিনার সাথে। তিনি বিখ্যাত 'কারা' ও 'আহাবীশ' গোত্রের নেতা। আবু বকরের মক্কাত্যাগের কারণ জানতে চান মালিক। সব শুনে নাখোশ হয়ে বলেন, “আপনি অভাবীদের কত সাহায্য করেন, পরিবারের সাথে ভালো আচরণ করেন, অভাগাদের বোঝা বয়ে নেন, মেহমানের কদর করেন, সত্যের জন্য কষ্ট সহ্য করা মানুষদেরও আশ্রয় দেন। আপনার মতো মানুষকে আবার বহিষ্কার করে কীভাবে? এক কাজ করুন। আপনি আমার সাথে চলুন। নিজের শহরেই নিজের রবের উপাসনা করবেন, আসুন।"
মালিকের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি মেনে নেন আবু বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)। দু'জনে একসাথে ফিরে যান মক্কায়। মালিক ঘোষণা করে দেন যে, তিনি আবূ বকরকে নিরাপত্তা দিয়েছেন। তবে শর্ত হলো যে, তিনি শুধু ঘরের ভেতর লোকচক্ষুর আড়ালে সালাত আদায় করবেন। পৌত্তলিকরা কিছুটা হলেও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। ইসলামের প্রকাশ্য প্রচারণা দেখে তাদের নারী, শিশু এবং সরল মানুষেরা কখন বিগড়ে যায়, এ নিয়ে তারা বেশ ভয়েই থাকত।
আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) কিছুদিন সে শর্ত মেনে চলেন। পরে একদিন বারান্দায় সালাত আদায় ও কুরআন তিলাওয়াত করতে শুরু করেন। ফলে আবারও মানুষজন তাঁকে ইবাদাতরত অবস্থায় দেখতে পায়। ইবনুদ দাগিনা সে খবর পেয়ে তাঁকে নিরাপত্তার শর্তের কথা মনে করিয়ে দেন। আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) ভেবেচিন্তে অবশেষে ইবনুদ দাগিনার প্রতিশ্রুতি বাতিল করে ফেলেন। তিনি বলেন, “আমার রবের দেওয়া নিরাপত্তা পেয়েই আমি খুশি।”
আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর এই ভক্তি কোনও লোকদেখানো বিষয় নয়। তাঁর অন্তর ছিল সত্যিই কোমল। তিনি অত্যধিক কান্নাকাটি করতেন। আল্লাহর পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি, শাস্তির হুমকি, সৃষ্টিজগতের বর্ণনা, আগেকার নবিদের ঘটনা কুরআনে পড়তে পড়তে অশ্রুসজল হয়ে উঠত তাঁর চোখ। কুরআনের প্রতি এই আবেগ দেখে মুশরিকদের নারী ও শিশুরা তাঁর আশপাশে ভিড় জমাত, তাঁকে কাঁদতে দেখে তারাও কাঁদত এবং তন্ময় হয়ে শুনত। গোঁয়ার মুশরিকদের কাছে এই জিনিস আবার অসহনীয় হয়ে উঠতে থাকে। এর কারণেও তারা আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে কষ্ট দিত।[১৫১]
কিন্তু ইসলামের প্রতি এই কঠোর অবস্থান সকল মক্কাবাসীর বৈশিষ্ট্য ছিল না। কিছু মানুষ ছিলেন পৌত্তলিক সমাজে স্তম্ভের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নবিজির বার্তা নিয়ে একান্তে ভাবতে গেলে এদের অন্তরের পাথর ঠিকই গলতে শুরু করত। গোটা কুরাইশদের বিরোধিতার মুখেও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অটল সাহস ও অবিচল ধৈর্য দেখে অভিভূত হয়ে পড়েন তাঁরা। এ-রকম কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ইসলাম গ্রহণ করেন হামযা ইবনু আবদিল মুত্তালিব এবং উমর ইবনুল খাত্তাব (রদিয়াল্লাহু আনহুমা)। ইসলামের ইতিহাসে এ দু'জনের মুসলিম হওয়ার ঘটনা এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এদের ইসলাম গ্রহণের ফলে মুসলমানদের শক্তি কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছিল।
আবূ জাহল ছাড়াও এমন আরও পাঁচ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি হলো ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরা মাখযূমি, আসওয়াদ ইবনু আবদি ইয়াগূস যুহরি, আবূ যামআ আসওয়াদ ইবনু আবদিল মুত্তালিব আসাদি, হারিস ইবনু কাইস খুযাঈ এবং আস ইবনু ওয়াইল সাহমি। নুবুওয়াতি মিশন শুরু হওয়ার পর মক্কায় এত বছর কেটে গেলেও নবি ﷺ একটিবারের জন্যও প্রতিশোধ নেননি। কারণ, আল্লাহই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, যথাসময়ে তিনি এদের দেখে নেবেন। শেষ পর্যন্ত মুহাম্মাদ ﷺ-এর কঠিনতম শত্রুরা করুণতম মৃত্যুর শিকার হয়েছিল।
* ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরার গায়ে সামান্য তিরের আঁচড় লেগেছিল। সে এটিকে পাত্তাই দেয়নি। কিন্তু জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আঁচড়টির দিকে ইশারা করেন ফলে তাতে জ্বালাপোড়া শুরু হয়। বেশ কয়েক বছর ধরে সেই ক্ষতের প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ধুঁকে ধুঁকে অবশেষে মৃত্যু হয় ওয়ালীদের।
* একইভাবে জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আসওয়াদ ইবনু আবদি ইয়াগুসের দিকে ইশারা করেন। তার শরীরে ফোস্কা পড়ে যায় এবং এটাই তার মৃত্যুর কারণ হয়। আরেক উৎস থেকে জানা যায় যে, সূর্যের প্রখর তাপে এই ফোস্কা পড়ে। তবে এতেও জিবরীলেরই ভূমিকা ছিল। অন্য আরেক বর্ণনামতে, জিবরীল তার পেটের দিকে ইশারা করেন। ফলে তার পেট এমনভাবে ফুলে ওঠে যে, এতেই তার মৃত্যু হয়।
* আসওয়াদ ইবনু আবদিল মুত্তালিবের বাড়াবাড়ি চরমে পৌঁছালে নবি দুআ করেন, যেন আল্লাহ তার দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেন এবং তাকে পিতৃত্ব থেকে বঞ্চিত করেন। জিবরীল (আলাইহিস সালাম)-কে পাঠানো হয় একটি কাঁটাদার গাছের ডাল দিয়ে আঘাত করে তাকে অন্ধ করে দিতে এবং তার ছেলেকেও মেরে ফেলতে। তিনি যথাযথভাবে আদেশ পালন করেন। ফলে সে অন্ধ হয়ে যায় এবং তার ছেলেরাও মৃত্যুবরণ করে।
* হারিস ইবনু কাইসের মৃত্যু আরও করুণ। মৃত্যুশয্যায় তার তার পেট হলুদ তরলে ভরে ওঠে। আর পেটের সব বর্জ্য বেরিয়ে আসতে থাকে নাক দিয়ে। এভাবে যন্ত্রণাকর অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
* আস ইবনু ওয়াইল একবার একটি কাঁটাযুক্ত গাছে বসেছিল। যার একটি কাঁটা তার পায়ে বিদ্ধ হয়। সে কাঁটার বিষে তার পা ফুলে যায় এবং সে বিষ মাথা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ওই বিষের প্রভাবেই তার জীবনাবসান ঘটে। [১৩৯]
এই হলো তাদের পাঁচ জনের সংক্ষিপ্ত পরিণাম-কাহিনি। এসব ইসলামবিদ্বেষী দুর্ভাগারা এ-রকম ঐশী শাস্তির শিকার হয়।
তবে বেশির ভাগ সময়ই নবি ধৈর্য ধরে সকল বিরোধিতা সহ্য করে যান, ঠিক যেমনটি করেছিলেন পূর্বেকার নবি-রাসূলগণ। এমন অটল ধৈর্য ও ঈমান দেখে সাহাবিদের অন্তরও প্রশান্ত হয়, আল্লাহর আনুগত্যে অবিচল থাকে তাদের হৃদয়। এদিকে যথারীতি চলতে থাকে মুশরিকদের মৌখিক গালাগাল ও শারীরিক নির্যাতন।
টিকাঃ
[১৩৯] তাবারি, তাফসীর, ৮/৯০; সুয়ূতি, আদ-দুররুল মানসূর, ৪/২০০।
[১৪৫] সূরা নাজম, ৫৩: ৭-৮।
[১৪৬] ইবনু হাজার, আল-ইসাবাহ, ৮/১৩৮; বাইহাকি, দালাইলুন নুবুওয়াহ, ২/৩৩৯।
[১৪৭] শাইখ আবদুল্লাহ, মুখতাসারুস-সীরাহ, ১১৩।
[১৪৮] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/২৯৮-২৯৯।
[১৪৯] ইবনু হিব্বান, ৬৫৬৭; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ১১/২০০১।
[১৫০] বুখারি, ৩৮৫৬; ইবনু হিশাম, ১/২৮৯-২৯০; সুযুতি, আদ-দুররুল মানসূর, ৫/৬৫৫।
[১৫১] বুখারি, ৩৯০৫。