📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 মুহাজিরদের প্রত্যাবর্তন

📄 মুহাজিরদের প্রত্যাবর্তন


কুরাইশরা কুরআনের আয়াত শুনে সাজদা দেওয়ার খবর আবিসিনিয়ায়ও পৌঁছে যায়। মুহাজিরদের মাঝে কানকথা ছড়িয়ে পড়ে যে, কুরাইশরা ইসলাম গ্রহণ করেছে। ফলে তাঁরা সানন্দে জাহাজে উঠে পড়েন আরবের উদ্দেশে। কিন্তু মক্কার অদূরে এসেই খবর পান যে, সবই আগের মতো আছে। আপন বাসভূমি তখনো শত্রুতার কাঁটায় ঘেরা। চারদিক নির্যাতনে ছাওয়া। হতাশ হয়ে আবার কেউ আবিসিনিয়ায় ফিরে যান, কেউ গোপনীয়ভাবে কোথাও অবস্থান করেন, আর কেউ কেউ সরাসরি মক্কায় প্রবেশ করেন সহানুভূতিশীল কোনও অমুসলিমের কাছে আশ্রয় নিয়ে। [১৪৩]

টিকাঃ
[১৪৩] ইবনু হিশাম, ১/৩৬৪; ইবনুল কাইয়িম, যাদুল মাআদ, ১/২৪, ২/৪৪।

কুরাইশরা কুরআনের আয়াত শুনে সাজদা দেওয়ার খবর আবিসিনিয়ায়ও পৌঁছে যায়। মুহাজিরদের মাঝে কানকথা ছড়িয়ে পড়ে যে, কুরাইশরা ইসলাম গ্রহণ করেছে। ফলে তাঁরা সানন্দে জাহাজে উঠে পড়েন আরবের উদ্দেশে। কিন্তু মক্কার অদূরে এসেই খবর পান যে, সবই আগের মতো আছে। আপন বাসভূমি তখনো শত্রুতার কাঁটায় ঘেরা। চারদিক নির্যাতনে ছাওয়া। হতাশ হয়ে আবার কেউ আবিসিনিয়ায় ফিরে যান, কেউ গোপনীয়ভাবে কোথাও অবস্থান করেন, আর কেউ কেউ সরাসরি মক্কায় প্রবেশ করেন সহানুভূতিশীল কোনও অমুসলিমের কাছে আশ্রয় নিয়ে। [১৪৩]

টিকাঃ
[১৪৩] ইবনু হিশাম, ১/৩৬৪; ইবনুল কাইয়িম, যাদুল মাআদ, ১/২৪, ২/৪৪।

📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 আবিসিনিয়ায় দ্বিতীয় হিজরত

📄 আবিসিনিয়ায় দ্বিতীয় হিজরত


সাজদার সেই ঘটনার পর কুরাইশদের আর কোথাও মুখ দেখানোর জো রইল না। পাছে লোকে ভেবে বসে তারা মুহাম্মাদ ﷺ-এর বার্তার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছে, তাই তারা পূর্বের তুলনায় শত্রুতা আরও বাড়িয়ে দিয়ে তার ক্ষতিপূরণ দিল। আবার মুসলিমদের প্রতি আবিসিনিয়ার রাজার উদার আচরণের কথা জেনেও রাগে ফুঁসছিল তাদের অন্তর।
নিরাপত্তার খাতিরে মুসলিমদের আরও একটি দলকে আবিসিনিয়া পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন নবিজি । বিরাশি বা তিরাশি জন পুরুষ আর আঠারো জন নারী নিজেদের প্রস্তুত করলেন এ যাত্রায়। যদিও কাফির-মুশরিকদের পাহারার চোখগুলো আগের চেয়ে সচেতন ছিল, তবুও তাঁরা সেগুলোকে ফাঁকি দিয়ে মক্কা ছাড়তে সক্ষম হলেন।

সাজদার সেই ঘটনার পর কুরাইশদের আর কোথাও মুখ দেখানোর জো রইল না। পাছে লোকে ভেবে বসে তারা মুহাম্মাদ ﷺ-এর বার্তার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছে, তাই তারা পূর্বের তুলনায় শত্রুতা আরও বাড়িয়ে দিয়ে তার ক্ষতিপূরণ দিল। আবার মুসলিমদের প্রতি আবিসিনিয়ার রাজার উদার আচরণের কথা জেনেও রাগে ফুঁসছিল তাদের অন্তর।
নিরাপত্তার খাতিরে মুসলিমদের আরও একটি দলকে আবিসিনিয়া পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন নবিজি । বিরাশি বা তিরাশি জন পুরুষ আর আঠারো জন নারী নিজেদের প্রস্তুত করলেন এ যাত্রায়। যদিও কাফির-মুশরিকদের পাহারার চোখগুলো আগের চেয়ে সচেতন ছিল, তবুও তাঁরা সেগুলোকে ফাঁকি দিয়ে মক্কা ছাড়তে সক্ষম হলেন।

📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 মুসলমানদের ফেরাতে কুরাইশদের অপতৎপরতা

📄 মুসলমানদের ফেরাতে কুরাইশদের অপতৎপরতা


এবার আগের চেয়েও বড় দল হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় কুরাইশদের মাথার চুল ছেঁড়ার মতো অবস্থা। কিন্তু এবার তারা এক মারাত্মক চাল দিল মুসলিমদের মক্কায় ফিরিয়ে আনার জন্য। আবিসিনিয়ান রাজার সাথে দর কষাকষি করতে তারা পাঠাল দুই সদস্যের এক প্রতিনিধিদল—একজন আমর ইবনুল আস এবং অপরজন আবদুল্লাহ ইবনু রবীআ। তখন তারা মুশরিক ছিল। বুদ্ধিমত্তা ও চাতুর্যে তারা ছিল সে সময়কার প্রবাদপুরুষ। মুখে মুখে তাদের নাম।
পরিকল্পনামাফিক এই প্রতিনিধিদ্বয় প্রথমে আবিসিনিয়ার যাজকদের সাথে দেখা করে। উৎকোচ দিয়ে আদায় করে নেয় রাজার সাথে দেখা করার অনুমতি। সাক্ষাতের দিনে তারা রাজার সামনে পেশ করে আরবদেশ থেকে আনা বিপুল পরিমাণ উপঢৌকন। গলায় মধু ঢেলে বলে,
“মহারাজ, আমাদের শহর থেকে কিছু আহাম্মক এসে আপনার এই মহান রাজ্যে আস্তানা গেড়েছে। তারা আমাদের ধর্ম ত্যাগ করেছে বটে। কিন্তু আপনার ধর্মও গ্রহণ করেনি; বরং তারা নতুন এক দ্বীন-ধর্ম আবিষ্কার করেছে। যা না জানি আমরা আর না আপনি। তাদের পরিবারগুলো তাদের পাগলামির কারণে দুশ্চিন্তায় অস্থির। তাই তারা মহারাজের কাছে আমাদের পাঠিয়েছে, যেন আমরা ঘরের লোকদের ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে যাই। কারণ, ঘরের লোকই ভালো জানে তাদের অবস্থা সম্পর্কে। ফলে সে অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা সহজ হবে।"
রাজ-যাজকরাও পাশ থেকে সায় জানাতে থাকে। রাজাকে অনুরোধ করে এ আবেদন মেনে নিতে। কিন্তু রাজাকে তারা যতটা বোকা ভেবেছিল তিনি ততটা বোকা নন। তিনি বললেন যে, উভয়পক্ষকেই নিজ নিজ বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া হবে। দরবারে ডেকে আনা হয় মুহাজির মুসলিমদের। পরিবারকে ত্যাগ করে অজানা এক ধর্ম গ্রহণের কারণ জিজ্ঞেস করেন রাজা।
নবিজি ﷺ-এর চাচাত ভাই জা’ফার ইবনু আবী তালিব (রদিয়াল্লাহু আনহু) মুসলিমদের মুখপাত্র হয়ে বলেন,
“সম্রাট, আমরা অজ্ঞতায় ডুবে থাকা এক জাতি ছিলাম। মূর্তিপূজা করতাম, মৃত প্রাণীর মাংস খাওয়া থেকে শুরু করে এমন কোনও জঘন্য কাজ নেই, যা আমরা করতাম না। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করতাম, প্রতিবেশীদের সাথে করতাম অসদাচরণ। সবলেরা দুর্বলদের চুষে খেত। এভাবেই কাটছিল আমাদের দিন। তারপর আল্লাহ তাআলা একদিন আমাদের মধ্য থেকে তুলে আনলেন এমন এক বার্তাবাহক, যার বংশমর্যাদা, সততা, সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা আর বিশুদ্ধতা সম্পর্কে আমরা সবাই ওয়াকিফহাল। তিনি আমাদের আহ্বান করলেন এক ও অদ্বিতীয় উপাস্যকে মেনে নিতে, আল্লাহর ইবাদাত করতে। আমাদের বাপ-দাদারা যেসব ইট-পাথরকে পূজা করতেন, সেগুলোকে ত্যাগ করতে বললেন। আরও আদেশ দিলেন সদা সত্য বলার, কথা দিয়ে কথা রাখার, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের প্রতি দয়া করার। অন্যায় রক্তপাত, নির্লজ্জতা, মিথ্যাচার ও ধোঁকাবাজি করা থেকে নিষেধ করলেন। আরও নিষেধ করলেন অনাথের সম্পদ আত্মসাৎ ও সতী নারীর প্রতি অপবাদ দেওয়া থেকে।
তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যেন আমরা কোনও অংশীদার সাব্যস্ত করা ছাড়াই এক আল্লাহর আরাধনা করি। আদেশ করেছেন সালাত আদায়ের, সিয়াম পালনের এবং অভাবীকে তার প্রাপ্য প্রদানের। আমরা তাঁকে আল্লাহর রাসূল বলে স্বীকার করে নিয়েছি। আল্লাহর কাছ থেকে তিনি যা-ই নিয়ে আসেন, তারই অনুসরণ করি আমরা। তিনি যা নিষেধ করেন, তা পরিত্যাগ করি। যা আদেশ করেন, তা গ্রহণ করে নিই। আমাদের জাতির তা সহ্য হলো না। তারা আমাদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন চালাল, লোভ দেখিয়ে মূর্তিপূজায় ফেরত নিতে চাইল, ছেড়ে আসা জঘন্য কাজগুলো আবারও শুরু করতে বলল। আমাদের ও আমাদের দ্বীনের মাঝে তারা প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ালে আমরা তাদের থাবা থেকে পালাতে উদ্যত হই। অন্য সবার বদলে বেছে নিই আপনার আশ্রয়কে। মহারাজ, আমরা এখানে আপনার নিরাপত্তাপ্রার্থী। আশা করি আমাদের সাথে কোনও অবিচার করা হবে না।"
রাজা ধৈর্য ধরে শুনলেন জা'ফারের কথা। তারপর জানতে চাইলেন মুহাম্মাদ ﷺ-এর কাছে আসা বাণীর কিছু অংশ তিনি শোনাতে পারবেন কি না। সূরা মারইয়ামের শুরুর দিকের কয়েকটি আয়াত তিলাওয়াত করে শোনান জা'ফার (রাদিয়াল্লাহু আনহু)। তিলাওয়াত শুনে কাঁদতে কাঁদতে রাজার দাড়ি ভিজে যায়। যাজকরাও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। রাজা বলেন, “আরে এ যে সেই একই ঐশী রশ্মি, যা ঈসা নিয়ে এসেছিলেন!”
তারপর কুরাইশ প্রতিনিধিদের দিকে ফিরে রাজা বলেন, “আপনারা যেতে পারেন। আল্লাহর কসম! আমি ওদের না আপনাদের হাতে তুলে দেবো আর না তাদের প্রতি কোনও দুর্ব্যবহার করব।”
প্রতিনিধিদ্বয় এতে দমে যাওয়ার পাত্র নয়। তারা কৌশল পরিবর্তন করে। মুসলিমদের প্রতি রাজার মনে বিদ্বেষ তৈরি করার মোক্ষম অস্ত্রটি ছিল তাদের হাতে। পরদিন রাজদরবারে আবার দেখা করে আমর বলেন, “মহারাজ, একটা বিষয় তো বলাই হয়নি। এই লোকগুলো ঈসা (আলাইহিস সালাম)-কে নিয়ে এত জঘন্য কথা বলে, যা আপনার সামনে উচ্চারণ করতেও লজ্জা হয়।”
পুনরায় ডাকা হয় মুসলিমদের। ঈসা (আলাইহিস সালাম) সম্পর্কে তাঁদের কী বিশ্বাস, তা জানতে চাইলেন রাজা। জা'ফার ইবনু আবী তালিব (রদিয়াল্লাহু আনহু) অকপটে উত্তর দেন,
“আমরা তা-ই বলি, যা আমাদের নবিজি আমাদের শিখিয়েছেন। ঈসা (আলাইহিস সালাম) একজন মানুষ এবং আল্লাহর নবি। তিনি পবিত্র কুমারী মারইয়াম (আলাইহাস সালাম)-এর মাঝে আল্লাহর দেওয়া রূহ ও কালাম।”
রাজা মাটিতে পড়ে থাকা একটি খড়কুটো তুলে নেন। তারপর বলেন,
“আল্লাহর কসম! আপনি যা বললেন, মারইয়াম-তনয় ঈসা তার চেয়ে এই খড়কুটো পরিমাণও বেশি কিছু ছিলেন না। যান, আমার রাজ্যে শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে বাস করুন। আপনাদের প্রতি দুর্ব্যবহারকারীরা শাস্তি পাবে। আমি আপনাদের কোনও ক্ষতি হতে দেবো না, পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণের বিনিময়েও না।”
কুরাইশদের আনা সব উপঢৌকন ফেরত দিয়ে দেওয়ার আদেশ করেন তিনি। প্রতিনিধিদলটি ব্যর্থতার গ্লানি আর চরম অপমান নিয়ে ফিরে যায় মক্কায়। গিয়ে বলে, মুসলমানেরা উত্তম একটি রাষ্ট্রে উত্তম তত্ত্বাবধানে বসবাস করছে।[১৪৪]

টিকাঃ
[১৪৪] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/৩৩৪, ৩৩৮।

এবার আগের চেয়েও বড় দল হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় কুরাইশদের মাথার চুল ছেঁড়ার মতো অবস্থা। কিন্তু এবার তারা এক মারাত্মক চাল দিল মুসলিমদের মক্কায় ফিরিয়ে আনার জন্য। আবিসিনিয়ান রাজার সাথে দর কষাকষি করতে তারা পাঠাল দুই সদস্যের এক প্রতিনিধিদল—একজন আমর ইবনুল আস এবং অপরজন আবদুল্লাহ ইবনু রবীআ। তখন তারা মুশরিক ছিল। বুদ্ধিমত্তা ও চাতুর্যে তারা ছিল সে সময়কার প্রবাদপুরুষ। মুখে মুখে তাদের নাম।
পরিকল্পনামাফিক এই প্রতিনিধিদ্বয় প্রথমে আবিসিনিয়ার যাজকদের সাথে দেখা করে। উৎকোচ দিয়ে আদায় করে নেয় রাজার সাথে দেখা করার অনুমতি। সাক্ষাতের দিনে তারা রাজার সামনে পেশ করে আরবদেশ থেকে আনা বিপুল পরিমাণ উপঢৌকন। গলায় মধু ঢেলে বলে,
“মহারাজ, আমাদের শহর থেকে কিছু আহাম্মক এসে আপনার এই মহান রাজ্যে আস্তানা গেড়েছে। তারা আমাদের ধর্ম ত্যাগ করেছে বটে। কিন্তু আপনার ধর্মও গ্রহণ করেনি; বরং তারা নতুন এক দ্বীন-ধর্ম আবিষ্কার করেছে। যা না জানি আমরা আর না আপনি। তাদের পরিবারগুলো তাদের পাগলামির কারণে দুশ্চিন্তায় অস্থির। তাই তারা মহারাজের কাছে আমাদের পাঠিয়েছে, যেন আমরা ঘরের লোকদের ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে যাই। কারণ, ঘরের লোকই ভালো জানে তাদের অবস্থা সম্পর্কে। ফলে সে অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা সহজ হবে।"
রাজ-যাজকরাও পাশ থেকে সায় জানাতে থাকে। রাজাকে অনুরোধ করে এ আবেদন মেনে নিতে। কিন্তু রাজাকে তারা যতটা বোকা ভেবেছিল তিনি ততটা বোকা নন। তিনি বললেন যে, উভয়পক্ষকেই নিজ নিজ বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া হবে। দরবারে ডেকে আনা হয় মুহাজির মুসলিমদের। পরিবারকে ত্যাগ করে অজানা এক ধর্ম গ্রহণের কারণ জিজ্ঞেস করেন রাজা।
নবিজি ﷺ-এর চাচাত ভাই জা’ফার ইবনু আবী তালিব (রদিয়াল্লাহু আনহু) মুসলিমদের মুখপাত্র হয়ে বলেন,
“সম্রাট, আমরা অজ্ঞতায় ডুবে থাকা এক জাতি ছিলাম। মূর্তিপূজা করতাম, মৃত প্রাণীর মাংস খাওয়া থেকে শুরু করে এমন কোনও জঘন্য কাজ নেই, যা আমরা করতাম না। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করতাম, প্রতিবেশীদের সাথে করতাম অসদাচরণ। সবলেরা দুর্বলদের চুষে খেত। এভাবেই কাটছিল আমাদের দিন। তারপর আল্লাহ তাআলা একদিন আমাদের মধ্য থেকে তুলে আনলেন এমন এক বার্তাবাহক, যার বংশমর্যাদা, সততা, সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা আর বিশুদ্ধতা সম্পর্কে আমরা সবাই ওয়াকিফহাল। তিনি আমাদের আহ্বান করলেন এক ও অদ্বিতীয় উপাস্যকে মেনে নিতে, আল্লাহর ইবাদাত করতে। আমাদের বাপ-দাদারা যেসব ইট-পাথরকে পূজা করতেন, সেগুলোকে ত্যাগ করতে বললেন। আরও আদেশ দিলেন সদা সত্য বলার, কথা দিয়ে কথা রাখার, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের প্রতি দয়া করার। অন্যায় রক্তপাত, নির্লজ্জতা, মিথ্যাচার ও ধোঁকাবাজি করা থেকে নিষেধ করলেন। আরও নিষেধ করলেন অনাথের সম্পদ আত্মসাৎ ও সতী নারীর প্রতি অপবাদ দেওয়া থেকে।
তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যেন আমরা কোনও অংশীদার সাব্যস্ত করা ছাড়াই এক আল্লাহর আরাধনা করি। আদেশ করেছেন সালাত আদায়ের, সিয়াম পালনের এবং অভাবীকে তার প্রাপ্য প্রদানের। আমরা তাঁকে আল্লাহর রাসূল বলে স্বীকার করে নিয়েছি। আল্লাহর কাছ থেকে তিনি যা-ই নিয়ে আসেন, তারই অনুসরণ করি আমরা। তিনি যা নিষেধ করেন, তা পরিত্যাগ করি। যা আদেশ করেন, তা গ্রহণ করে নিই। আমাদের জাতির তা সহ্য হলো না। তারা আমাদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন চালাল, লোভ দেখিয়ে মূর্তিপূজায় ফেরত নিতে চাইল, ছেড়ে আসা জঘন্য কাজগুলো আবারও শুরু করতে বলল। আমাদের ও আমাদের দ্বীনের মাঝে তারা প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ালে আমরা তাদের থাবা থেকে পালাতে উদ্যত হই। অন্য সবার বদলে বেছে নিই আপনার আশ্রয়কে। মহারাজ, আমরা এখানে আপনার নিরাপত্তাপ্রার্থী। আশা করি আমাদের সাথে কোনও অবিচার করা হবে না।"
রাজা ধৈর্য ধরে শুনলেন জা'ফারের কথা। তারপর জানতে চাইলেন মুহাম্মাদ ﷺ-এর কাছে আসা বাণীর কিছু অংশ তিনি শোনাতে পারবেন কি না। সূরা মারইয়ামের শুরুর দিকের কয়েকটি আয়াত তিলাওয়াত করে শোনান জা'ফার (রাদিয়াল্লাহু আনহু)। তিলাওয়াত শুনে কাঁদতে কাঁদতে রাজার দাড়ি ভিজে যায়। যাজকরাও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। রাজা বলেন, “আরে এ যে সেই একই ঐশী রশ্মি, যা ঈসা নিয়ে এসেছিলেন!”
তারপর কুরাইশ প্রতিনিধিদের দিকে ফিরে রাজা বলেন, “আপনারা যেতে পারেন। আল্লাহর কসম! আমি ওদের না আপনাদের হাতে তুলে দেবো আর না তাদের প্রতি কোনও দুর্ব্যবহার করব।”
প্রতিনিধিদ্বয় এতে দমে যাওয়ার পাত্র নয়। তারা কৌশল পরিবর্তন করে। মুসলিমদের প্রতি রাজার মনে বিদ্বেষ তৈরি করার মোক্ষম অস্ত্রটি ছিল তাদের হাতে। পরদিন রাজদরবারে আবার দেখা করে আমর বলেন, “মহারাজ, একটা বিষয় তো বলাই হয়নি। এই লোকগুলো ঈসা (আলাইহিস সালাম)-কে নিয়ে এত জঘন্য কথা বলে, যা আপনার সামনে উচ্চারণ করতেও লজ্জা হয়।”
পুনরায় ডাকা হয় মুসলিমদের। ঈসা (আলাইহিস সালাম) সম্পর্কে তাঁদের কী বিশ্বাস, তা জানতে চাইলেন রাজা। জা'ফার ইবনু আবী তালিব (রদিয়াল্লাহু আনহু) অকপটে উত্তর দেন,
“আমরা তা-ই বলি, যা আমাদের নবিজি আমাদের শিখিয়েছেন। ঈসা (আলাইহিস সালাম) একজন মানুষ এবং আল্লাহর নবি। তিনি পবিত্র কুমারী মারইয়াম (আলাইহাস সালাম)-এর মাঝে আল্লাহর দেওয়া রূহ ও কালাম।”
রাজা মাটিতে পড়ে থাকা একটি খড়কুটো তুলে নেন। তারপর বলেন,
“আল্লাহর কসম! আপনি যা বললেন, মারইয়াম-তনয় ঈসা তার চেয়ে এই খড়কুটো পরিমাণও বেশি কিছু ছিলেন না। যান, আমার রাজ্যে শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে বাস করুন। আপনাদের প্রতি দুর্ব্যবহারকারীরা শাস্তি পাবে। আমি আপনাদের কোনও ক্ষতি হতে দেবো না, পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণের বিনিময়েও না।”
কুরাইশদের আনা সব উপঢৌকন ফেরত দিয়ে দেওয়ার আদেশ করেন তিনি। প্রতিনিধিদলটি ব্যর্থতার গ্লানি আর চরম অপমান নিয়ে ফিরে যায় মক্কায়। গিয়ে বলে, মুসলমানেরা উত্তম একটি রাষ্ট্রে উত্তম তত্ত্বাবধানে বসবাস করছে।[১৪৪]

টিকাঃ
[১৪৪] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/৩৩৪, ৩৩৮।

📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 দেশে-বিদেশে পরাজিত মুশরিকপক্ষের পেরেশানি

📄 দেশে-বিদেশে পরাজিত মুশরিকপক্ষের পেরেশানি


ঘরে-বাইরে একের পর এক পরাজয়ে মুশরিকদের মরিয়া ভাব বাড়তে থাকে। বিদেশের মাটিতে রাজদরবারে তাদের গোত্রের নাম ডুবেছে স্রেফ একটি ছোট্ট শরণার্থীদলের কারণে। এ অপমান মেনে নেওয়া যায় না। রক্তের মাধ্যমে হলেও তারা মুসলিমদের কাছ থেকে এর মূল্য বুঝে পেতে বদ্ধপরিকর হয়।
কিন্তু কী করে? আবূ তালিব এখনও ভাতিজার সমর্থনে বটবৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে। কোনও ছল-চাতুরিতেই তাঁকে টলানো যাচ্ছে না। চাচার নিরাপত্তাবলয়ে মুহাম্মাদ অবাধে নিজের মিশন চালিয়ে যাচ্ছেন। এখন পর্যন্ত নির্যাতন, হত্যাচেষ্টা, ঘুষ, তর্ক, এমনকি সমঝোতার মাধ্যমেও কোনও ফলাফল আসেনি।

ঘরে-বাইরে একের পর এক পরাজয়ে মুশরিকদের মরিয়া ভাব বাড়তে থাকে। বিদেশের মাটিতে রাজদরবারে তাদের গোত্রের নাম ডুবেছে স্রেফ একটি ছোট্ট শরণার্থীদলের কারণে। এ অপমান মেনে নেওয়া যায় না। রক্তের মাধ্যমে হলেও তারা মুসলিমদের কাছ থেকে এর মূল্য বুঝে পেতে বদ্ধপরিকর হয়।
কিন্তু কী করে? আবূ তালিব এখনও ভাতিজার সমর্থনে বটবৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে। কোনও ছল-চাতুরিতেই তাঁকে টলানো যাচ্ছে না। চাচার নিরাপত্তাবলয়ে মুহাম্মাদ অবাধে নিজের মিশন চালিয়ে যাচ্ছেন। এখন পর্যন্ত নির্যাতন, হত্যাচেষ্টা, ঘুষ, তর্ক, এমনকি সমঝোতার মাধ্যমেও কোনও ফলাফল আসেনি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00