📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 নির্যাতন-নিপীড়নের কিছু নমুনা

📄 নির্যাতন-নিপীড়নের কিছু নমুনা


* বিলাল ইবনু রবাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ছিলেন উমাইয়া ইবনু খালাফের দাস। দাসের এমন আধ্যাত্মিক স্বাধীনতা উমাইয়ার সহ্য হয়নি। সে তাঁর গলায় রশি বেঁধে রাস্তার কিছু বখাটে ও ছোট ছোট বালকদের হাতে তুলে দিত। তারা তাঁকে ছেঁচড়ে টেনে নিয়ে যেত আর বিলালের মুখে অনবরত ধ্বনিত হতো, “আহাদ! আহাদ!” এ ছাড়াও তাঁকে দুপুরের তপ্ত মরুভূমির উত্তপ্ত বালুতে চিত করে ফেলে বুকে পাথর চাপিয়ে দিত উমাইয়া। তারপর বলত, “হয় এখানে পড়ে থেকেই মরবি, আর নয়তো মুহাম্মাদকে অস্বীকার করে লাত ও উযযার আরাধনা করবি।” সবকিছু সয়ে নিয়ে বিলাল ঘোষণা করে চলতেন, "আহাদ! আহাদ!”
যাতনার সমাপ্তি হয় আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাত ধরে। এক দিন আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) হাঁটছিলেন। বিলাল (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে তখনো শাস্তি দেওয়া হচ্ছিল। তিনি এই নির্মম নির্যাতন দেখে আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় তাঁকে কিনে নিয়ে মুক্ত করে দেন।[১১১]

* আমির ইবনু ফুহাইরা (রদিয়াল্লাহু আনহু) এমনই আরেক নিপীড়িত অগ্র-মুসলিম। তাঁকে মারতে মারতে অজ্ঞান করে ফেলা হতো। এত অধিক অত্যাচার করা হতো যে, তিনি কী বলছেন বা না বলছেন, বুঝতে পারতেন না।[১১২]

* আফলাহ্ (রদিয়াল্লাহু আনহু)। যার আরেক নাম ছিল আবূ ফুকাইহা। তিনি বানু আবদিদ দারের দাস ছিলেন। তাঁকে শেকলে বেঁধে টানতে টানতে নিয়ে যাওয়া হতো এবং উত্তপ্ত বালুতে কিংবা আগুন গরম পাথরে নগ্ন করে ফেলে রাখা হতো। বুকে চাপা দেওয়া থাকত বেশ ভারী পাথর। ফলে তিনি একটু নড়াচড়াও করতে পারতেন না। তাপ সহ্য করতে না পেরে তিনি প্রায়ই জ্ঞান হারাতেন। এভাবে তাঁকে বহু দিন পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে কষ্ট দেওয়া হতো। দ্বিতীয়বার হাবশায় হিজরতের সময় তিনিও হিজরত করেন। মুশরিকরা একবার তাঁর গলা ও পায়ে রশি বেঁধে ছেঁচড়ে নিয়ে যেতে থাকে। এমনভাবে তীব্র মরুতে ফেলে রাখে যে, তিনি যেন মৃত, প্রাণহীন। এবারও মুমূর্ষু এই মুমিনের সাহায্যে এগিয়ে আসেন আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)। বিলালের মতো তাঁকেও কিনে মুক্ত করে দেন।[১১৩]

* খাব্বাব ইবনুল আরাত্ত (রদিয়াল্লাহু আনহু) একজন সুবিখ্যাত সাহাবি। বানু খুযাআ গোত্রের উম্মু আনমার বিনতু সাবা'র দাস। খাব্বাব পেশায় ছিলেন কামার। ইসলাম গ্রহণ করার কারণে তাঁর মালিক উম্মু আনমার উত্তপ্ত লোহার টুকরা তাঁর পিঠে রেখে দিত আর বলত, 'মুহাম্মাদের দ্বীন ছেড়ে দে। তাকে অস্বীকার কর।' এই কথা শুনে তাঁর ঈমান আরও বেড়ে যেত। ইসলামের ওপর অনড় থাকত। অন্যান্য মুশরিকরাও তাঁকে নির্যাতন করত। কখনও কখনও খাব্বাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু)- এর ঘাড়ে খুব জোরে জোরে আঘাত করত, আবার কখনও চুল ছিঁড়তে থাকত, কয়েকবার তো জ্বলন্ত কয়লার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল, তাঁর দগ্ধ পিঠের চর্বিই যা নির্বাপিত করেছিল। [১১৪]

* যিন্নীরা (রদিয়াল্লাহু আনহা) ইসলাম গ্রহণকারিণী এক রোমান দাসী। তাঁর ইসলাম গ্রহণের খবর পাওয়ার পর পৌত্তলিকেরা নির্যাতন করতে করতে তাঁকে অন্ধ করে ফেলে। এরপর দাবি করে বসে লাত-উযযা দেবীর অভিশাপে নাকি সে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে! উত্তরে যিন্নীরা (রদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন যে, আল্লাহই তাঁকে অন্ধ করেছেন, তিনি চাইলে তাঁর দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়েও দিতে পারেন। পরদিন ঘুম থেকে উঠে দেখেন যে, সত্যিই তাঁর দৃষ্টি ফিরে এসেছে! কিন্তু নির্যাতনকারীরা এই অলৌকিক ঘটনা দেখে বলতে লাগল, “এটা মুহাম্মাদের জাদু ছাড়া আর কিছু নয়!” [১১৫]

* উম্মু উবাইস (রদিয়াল্লাহু আনহা) ছিলেন বানূ যাহরার এক দাসী। তাঁর মনিবের নাম আসওয়াদ ইবনু আবদি ইয়াগ্‌স। সে উম্মু উবাইসের ইসলাম গ্রহণের খবর পেয়ে তাঁকে বিরামহীন অত্যাচার করতে শুরু করে। এই আসওয়াদ লোকটা নবি ﷺ-এর এক দাগী শত্রু। নবিজিকে অক্লান্তভাবে অপমান ও ঠাট্টা করত সে।[১১৬]

* বানূ আদি গোত্রের আমর ইবনু মুআম্মালের এক দাসী ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁকে নির্যাতন করতেন স্বয়ং উমর ইবনুল খাত্তাব। তখনো তিনি মুসলিম হননি। শারীরিক শক্তির জন্য বিখ্যাত উমর ক্লান্ত হয়ে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত দাসীটিকে মারধর করতেন। বিরতির সময় বলতেন, “আমি কিন্তু দয়ামায়ার কারণে থামিনি, বুঝেছিস? একটু ক্লান্ত হয়ে গেছি।” সেই দাসী (রদিয়াল্লাহু আনহা) জবাব দিতেন, “আপনার মালিকও আপনার সাথে এ-রকমই আচরণ করবেন!”[১১৭]
এমন আরও দু'জন মুসলিমা দাসী ছিলেন নাহদিয়্যা ও তাঁর মেয়ে। রদিয়াল্লাহু আনহুমা। বানু আবদিদ দারের এক নারী এঁদের মনিব ছিল। মা-মেয়ের ওপরও যথারীতি নিপীড়ন চলতে থাকে। [১১৮]
এবারও এগিয়ে আসেন সেই আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)। টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে মুক্ত করে দেন এই দু'জনকেও। এসব জায়গায় আবূ বকরকে টাকা খরচ করতে দেখে তাঁর বাবা আবূ কুহাফা ভর্ৎসনার সুরে বলেছিল, “তুমি দেখি দুর্বল মানুষদের পেছনে সব টাকা খরচ করে ফেলছ! এরচেয়ে কয়েকটা শক্তসমর্থ মানুষকে মুক্ত করলে তো বিপদের সময় ওরা তোমার কাজে আসত।” আবূ বকর জবাব দেন, “আমি তো এগুলো আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় করছি।”
এই ঘটনার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর প্রশংসা করে এবং তাঁর শত্রুদের নিন্দা জানিয়ে আয়াত অবতীর্ণ করেন:
فَأَنْذَرْتُكُمْ نَارًا تَلَظَّى (٤١) لَا يَصْلَاهَا إِلَّا الْأَشْقَى ﴿٥١﴾ الَّذِي كَذَّبَ وَتَوَلَّى 11) وَسَيُجَنَّبُهَا الْأَتْقَى (۷۱) الَّذِي يُؤْتِي مَالَهُ يَتَزَكَّى (۸۱) وَمَا لِأَحَدٍ عِنْدَهُ مِنْ نِعْمَةٍ تُجْزَى (۹۱) إِلَّا ابْتِغَاءَ وَجْهِ رَبِّهِ الْأَعْلَى ﴿٢﴾ وَلَسَوْفَ يَرْضَى (١٢)
"তোমাদের সতর্ক করছি এক ভয়ংকরভাবে প্রজ্বলিত আগুনের ব্যাপারে। এতে প্রবেশ করবে কেবল সেসব মহাদুর্ভাগা, যারা অস্বীকার করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়। কিন্তু আল্লাহভীরুকে এ আগুন থেকে রক্ষা করা হবে, যে আত্মশুদ্ধির জন্য সম্পদ খরচ করে এবং তার ওপর কারও অনুগ্রহের প্রতিদান হিসেবে নয়; বরং সে চায় শুধুই তার মহান প্রতিপালকের সন্তুষ্টি। আর শীঘ্রই সে সন্তুষ্টি লাভ করবে।”[১১৯]

কিন্তু সকল মুসলিম দাসই মুক্তিপণের সৌভাগ্য পাননি। কেউ শহীদ হন, আবার কেউ প্রকাশ্যে কুফরের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন। তবে মনে মনে ঠিকই মুমিন থাকেন। অন্তর থাকে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসে ভরপুর ও পরিতৃপ্ত।

* আম্মার ইবনু ইয়াসির ও তাঁর বাবা-মা (রদিয়াল্লাহু আনহুম) ছিলেন বানু মাখযূম গোত্রের। আবূ জাহল ছিল যার গোত্রপতি। তার নেতৃত্বে একেকবার গোত্রের একেকজন এসে ইয়াসির পরিবারকে আবতাহ নামক স্থানে ধরে নিয়ে যেত। তারপর তাদের উত্তপ্ত সূর্যালোকের নিচে রেখে নির্যাতন করত। নবি তাঁদের এই অবর্ণনীয় দুর্ভোগ দেখে সান্ত্বনা দিতেন, “ইয়াসির পরিবার, ধৈর্য ধরো। তোমাদের গন্তব্য জান্নাত। হে আল্লাহ, ইয়াসির পরিবারকে মাফ করে দিন।”[১২০]
সত্যিই তাঁরা একদম শেষ পর্যন্ত দৃঢ় থেকেছেন ঈমানের ওপর। আম্মারের বাবা ইয়াসির অত্যাচার সইতে সইতে শহীদ হয়ে যান।

* আম্মারের মায়ের নাম সুমাইয়া বিনতু খাইয়াত (রদিয়াল্লাহু আনহা)। তিনি ছিলেন আবূ হুযাইফা মাখযূমির দাসী। তিনি বেশ দুর্বল এবং বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। অমানুষ আবু জাহল তাঁর যোনিতে একটি বর্শা প্রবেশ করিয়ে দেয়। যার অসহ্য যন্ত্রণায় তিনি শাহাদাতবরণ করেন। তিনিই ইসলামের প্রথম নারী শহীদ।

* আর আম্মার (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর জন্য অত্যাচার ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠতে থাকে। মুশরিকরা কখনও তাঁকে শেকলে পরিয়ে তপ্ত পাথর বুকে চাপিয়ে মরুভূমিতে ফেলে রাখত। কখনও পানিতে ডুবিয়ে রাখত। একপর্যায়ে যন্ত্রণা সইতে না পেরে বাধ্য হয়ে তিনি মুশরিকদের আদেশমতো কুফরি কথা উচ্চারণ করেছিলেন। কিন্তু অন্তর ছিল ঈমানে পূর্ণ। দেহ-মনের এই টানাপড়েনে খুবই বিমর্ষ ও ভীত হয়ে পড়েন আম্মার (রদিয়াল্লাহু আনহু)। কিন্তু আল্লাহ তাঁদের মনে শান্তির সুবাতাস বইয়ে এই আয়াত নাযিল করেন,
مَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ مِنْ بَعْدِ إِيْمَانِهِ إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنُّ بِالْإِيْمَانِ وَلَكِنْ مَنْ شَرَحَ بِالْكُفْرِ صَدْرًا فَعَلَيْهِمْ غَضَبٌ مِّنَ اللَّهِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمُ ﴿٦٠١)
“যার ওপর জবরদস্তি করা হয় এবং তার অন্তর বিশ্বাসে অটল থাকে সে ব্যতীত, যে কেউ বিশ্বাসী হওয়ার পর আল্লাহতে অবিশ্বাসী হয় এবং কুফরির জন্য মন উন্মুক্ত করে দেয়, তাদের ওপর আপতিত হবে আল্লাহর গযব এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।”[১২১]

সমাজের পক্ষ থেকে এমন বিরোধিতা আসাটাই স্বাভাবিক ছিল। তবে নব্য-মুসলিমদের নিকটতম আত্মীয়-স্বজনেরাও যেভাবে তাতে হাত লাগিয়েছে, তা একটু অবাক করার মতোই বটে। মূর্তির প্রতি আনুগত্যের সামনে অর্থহীন হয়ে যায় পারিবারিক বন্ধন।

* ধনী ও বিলাসী পরিবারের শৌখিন যুবক মুসআব ইবনু উমাইর (রদিয়াল্লাহু আনহু)। ইসলাম গ্রহণের পর খাবার-পানীয়ও বন্ধ করে দেন তাঁর মা। এমনকি ঘর থেকেও বের করে দেন। জন্মদাত্রী মায়ের কাছ থেকে এমন অসহনীয় আচরণের পাশাপাশি সইতে হয়েছে শারীরিক অত্যাচারও। ফলে সাপের চামড়ার ন্যায় তাঁর চামড়াও উঠে গিয়েছিল। [১২২]

* সুহাইব ইবনু সিনান রুমি (রদিয়াল্লাহু আনহু) এমন আরেকজন মুসলিম। নির্যাতনের ফলে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতেন তিনি। তাঁর কোনও খবরই থাকত না যে, তিনি কী বলছেন!![১২৩]

কুরাইশদের চোখে মুসলিম দাসেরা ছিল অবাধ্য বিদ্রোহীর মতো, যাদের একমাত্র পাওনা মৃত্যু। নিচু সামাজিক অবস্থানের কারণে তাঁরা একেবারেই নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েন। অবশ্য সম্পদ আর সামাজিক মর্যাদাও কাজে আসেনি মুসলিমদের জন্য। উসমান ইবনু আফফান (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মতো ধনী ও সম্মানিত মানুষকেও নানাভাবে অত্যাচার সইতে হয়েছে। তাঁর এক চাচা তাঁকে একবার একটি খেজুরের চাটাইয়ে পেঁচিয়ে নিচ থেকে অঙ্গারের তাপ দিতে থাকে।[১২৪]
আবূ বকর এবং তালহা ইবনু উবাইদিল্লাহ (রদিয়াল্লাহু আনহুমা)-কেও অপমান সইতে হয়েছে। নাওফাল ইবনু খুয়াইলিদ, কেউ কেউ বলেন উসমান ইবনু উবাইদিল্লাহ, তাঁদের একসাথে একই রশি দিয়ে বেঁধে রাখে, যেন সালাত আদায় করতে এবং ধর্মীয় আচারগুলো পালন করতে না পারেন। কিন্তু তাঁরা তা মানতেন না। মুশরিকরা দেখে পেরেশান হয়ে যেত যে, তাঁদের রশি খোলা এবং তাঁরা দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করছে। অথচ তাদের দু'জনকে একত্রে বেঁধে রাখা হয়েছিল। একই রশিতে দু'জনকে বাঁধা হতো বলে তাঁদের 'করীনান' (قَرِيْنَانِ) বলা হতো। এর অর্থ 'একসাথে মিলিত দু'জন'।[১২৫]
ইসলামের প্রতি আবূ জাহলের মারাত্মক বিদ্বেষ ও চরম অহংকারের কথা কুরআনে বেশ কয়েকবার এসেছে। মক্কার যেসব গোত্রপতি ইসলাম ও মুসলিমদের বিরোধিতা করাকে জীবনের লক্ষ্যে পরিণত করেছিল, আবূ জাহল তাদেরই একজন। একেকজন মুসলিম হওয়ার খবর আসে, আর তার বিদ্বেষের মাত্রা বেড়ে চলে। সেই নব্য-মুসলিম সামাজিকভাবে মর্যাদাবান হলে শুধু তিরস্কার করত আর সম্পদ-সম্মান ছিনিয়ে নেওয়ার হুমকি দিত। আর সমাজের নিচুতলার বাসিন্দা হলে তো নিজেও মারধর করত, অন্যদেরও এই কাজ করতে ডাকত এবং আদেশ করত। এই দুর্বল ও গরিব মুসলিমদের অত্যাচার, এমনকি পিটিয়ে মারাটাই ছিল সাধারণভাবে মুশরিকদের নিয়ম। তবে গণ্যমান্য কোনও লোকের ধর্মান্তরিত হবার খবর পেলে একটু রয়েসয়ে প্রতিক্রিয়া দেখাত। সমশ্রেণির মুশরিক ছাড়া অন্য কেউ সেই মুসলিমের ধর্মান্তরকে চ্যালেঞ্জ করতে পারত না। [১২৬]

টিকাঃ
[১১১] ইবনু কাসীর, সূরা নাহলের ১০৬ নং আয়াতের তাফসীর; ইবনু হিশাম, ১/৩১৭-৩১৮; ইবনুল জাওযি, তালকীহ, ৬১।
[১১২] ইবনু সা'দ, তবাকাতুল কুবরা, ৩/৪৮।
[১১৩] ইবনুল আসীর, উসদুল গাবাহ, ৫/২৪৮; ইবনু হাজার, আল-ইসাবাহ, ৭/১২৫।
[১১৪] ইবনুল আসীর, উসদুল গাবাহ, ১/৫৯১-৫৯২; ইবনুল জাওযি, তালকীহ, ৬০।
[১১৫] ইবনুল আসীর, উসদুল গাবাহ, ৫/৪৬২; ইবনু সা'দ, তবাকাত, ৮/২৫৬।
[১১৬] ইবনু হাজার, আল-ইসাবাহ, ৮/৪৩৪।
[১১৭] ইবনু হিশাম, ১/৩১৯; ইবনু সা'দ, তবাকাত, ৮/২৫৬।
[১১৮] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/৩১৮-৩১৯।
[১১৯] সূরা লাইল, ৯২: ১৪-২১।
[১২০] হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ৯/২৯৬; ইবনু হাজার, আল-ইসাবাহ, ৩/৬৪৮।
[১২১] সূরা নাহল, ১৬: ১০৬; ইবনু হিশাম, ১/৩১৯-৩২০।
[১২২] ইবনুল আসীর, উসদুল গাবাহ, ৪/৪০৬।
[১২৩] ইবনু সা'দ, তবাকাত, ৩/২৪৮।
[১২৪] সালমান মানসূরপুরি, রহমাতুললিল আলামীন, ১/৮৭।
[১২৫] ইবনুল আসীর, উসদুল গাবাহ, ২/৪৬৮।
[১২৬] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/৩২০।

📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাথে মুশরিকদের আচরণ

📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাথে মুশরিকদের আচরণ


আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ-কে বেশ প্রভাব, গাম্ভীর্য আর মর্যাদা দান করেছিলেন। ফলে তাঁর সাথে বাড়াবাড়ি করার সাহস কেউ পেত না। সে যত বড় ব্যক্তিই হোক না কেন। তার ওপর নবি ছিলেন সম্মানিত গোত্রের সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে, তাই তাঁর সাথে অতটা দুর্ব্যবহার করা হতো না, যতটা করা হতো দাস-শ্রেণির মুসলিমদের সাথে। আবার আরেক সম্মানিত গোত্রপতি আবু তালিব তাঁর ভাতিজাকে নিরাপত্তা দিয়ে রেখেছিলেন। বানূ আবদি মানাফের এই ব্যক্তি শুধু কুরাইশদের কাছে না, গোটা আরবেই ছিল সমীহের পাত্র। এমন লোকের ভাতিজাকে কষ্ট দিতে এবং তাঁর সাথে দুর্ব্যবহার করতে সবাই একটু হলেও ইতস্তত করত। ভয় পেত।
এর বদলে তারা আবূ তালিবের সাথে সলা-পরামর্শ করে। মুহাম্মাদ তাঁর মিশন বন্ধ না করলে কী পরিণতি হবে, তা নিয়ে একটু-আধটু ইঙ্গিত দিত কথায় কথায়।

📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 আবূ তালিবের সাথে কুরাইশদের কথোপকথন

📄 আবূ তালিবের সাথে কুরাইশদের কথোপকথন


বেশ কিছুদিন চিন্তাভাবনার পর কুরাইশের একদল রুই-কাতলা সিদ্ধান্ত নিল আবূ তালিবের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করার। দেখা করে বলল, “দেখুন, আপনার ভাতিজার কাজকারবার তো সবই জানেন। সে আমাদের উপাস্যদের নামে খারাপ কথা বলে, আমাদের ধর্মকে দোষারোপ করে। বলে যে, আমরা নাকি অজ্ঞ, কিছু বুঝি না। আবার আমাদের বাপ-দাদাদের নিয়েও এটা-সেটা বলতে ছাড়ে না। তাই বলছিলাম, হয় আপনি তাকে থামান, আর নয়তো তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলুন। তখন আমরাই ওর সাথে বোঝাপড়া করব।” আবূ তালিব নরম স্বরে কিছু একটা উত্তর দিয়ে সেদিনের মতো তাদের বিদেয় করেন। কিন্তু মুহাম্মাদ তাঁর নুবুওয়াতের দাবি ও ইসলামের প্রচারণার ওপর অটল রইলেন। [১২৭]

টিকাঃ
[১২৭] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/২৬৫।

📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 আবূ তালিবকে কুরাইশদের হুমকি ও চ্যালেঞ্জ

📄 আবূ তালিবকে কুরাইশদের হুমকি ও চ্যালেঞ্জ


আরও কিছুকাল অপেক্ষা করে কুরাইশরা যখন দেখল যে, আবূ তালিব কিছুই করছেন না। এদিকে মুহাম্মাদ-ও তাঁর কাজ এবং প্রচার-প্রসার করেই যাচ্ছেন। তখন তারা অবশেষে একটা এসপার-ওসপার করার সিদ্ধান্ত নেয়। আবারও আবূ তালিবের সাথে মিটিংয়ে বসে। এবার আর আগের মতো নরম স্বরে না বলে কড়া ভাষায় জানাল, "আবূ তালিব, আপনার বয়সও হয়েছে, মুরুব্বি হিসেবে সম্মানও করি। আপনার ভাতিজার ব্যাপারে একটা অনুরোধ করে গিয়েছিলাম, সেটাকে তো কোনও পাত্তাই দিলেন না। আল্লাহর কসম! আমরা কিন্তু এসব আর বেশিদিন সহ্য করব না। আমাদের পূর্বপুরুষদের অপমান করে, আমাদের অজ্ঞ বলে, দেবতাদের খারাপ কথা বলে, কী শুরু হয়েছে এসব? শুনুন, হয় আপনি তাকে থামাবেন, আর নয়তো আমরা যুদ্ধের ঘোষণা করছি। কোনও এক পক্ষ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আমরা যুদ্ধ করে যাব।”
আবূ তালিব এবারে হুমকি আমলে নিলেন। তিনি কিছুটা ভয় পেয়ে গেলেন। নবিজি ﷺ-কে ডেকে কুরাইশদের বলা কথাগুলো বুঝিয়ে বললেন। অনুরোধ করলেন, "আমাকেও দয়া করো, নিজেকেও দয়া করো। এমন বোঝা আমার ওপর চাপিয়ো না, যেটা নিতে পারব না।”
আবূ তালিবের পুরো কথা শুনে মুহাম্মাদ বললেন,
يَا عَمَّا وَاللَّهِ لَوْ وَضَعُوا الشَّمْسَ فِي يَمِينِي، وَالْقَمَرَ فِي يَسَارِي، عَلَى أَنْ أَتْرُكَ هُذَا الْأَمْرَ حَتَّى يُظْهِرَهُ اللَّهُ أَوْ أَهْلِكَ فِيْهِ مَا تَرَكْتُهُ
“চাচা! আল্লাহর শপথ! এরা যদি আমাদের ডান হাতে সূর্য আর বাম হাতে চাঁদও এনে দেয়, আমি আমার কাজ ছাড়ব না। হয় আল্লাহ আমাকে বিজয়ী করবেন, নয়তো এ কাজ করতে করতেই আমার মৃত্যু এসে যাবে।”[১২৮]
এ কথা বলার পর নবি ﷺ-এর চোখে অশ্রু চলে আসে, তিনি নীরবে অশ্রুপাত করতে থাকেন। এ অবস্থা দেখে আবূ তালিবের মুহাব্বত বেড়ে যায় এবং নিজের সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসেন এবং বলেন, “ভাতিজা, যেখানে চাও যাও। যা ইচ্ছা বলো। আল্লাহর কসম! আমি কিছুতেই তোমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেব না।”[১২৯]

টিকাঃ
[১২৮] ইবনু ইসহাক, কিতাবুল মাগাযি, ১/২৮৪-২৮৫, দুর্বল।
[১২৯] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/২৬৫-২৬৬; বাইহাকি, দালাইলুন নুবুওয়াহ, ২/১৮৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00