📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 সংশয়-সন্দেহ সৃষ্টি করা ও অপপ্রচার চালানো

📄 সংশয়-সন্দেহ সৃষ্টি করা ও অপপ্রচার চালানো


কেবল বিদ্রুপ-বিনোদনে যখন ইসলাম নির্মূল হলো না, পৌত্তলিকরা তখন ধরল মিথ্যা প্রচারণার পথ। এ ক্ষেত্রে তারা ভিন্ন ভিন্ন পন্থায় অগ্রসর হলো।
প্রথম প্রথম তারা দাবি করত যে, মুহাম্মাদ রাতের বেলা হিজিবিজি হাবিজাবি স্বপ্ন দেখে আর দিনের বেলায় ওগুলোকেই কুরআন নামে চালিয়ে দেয়। পরে একসময় বলতে লাগল, এই জিনিস তিনি নিজে নিজে রচনা করেন। আবার কখনও বলত, অন্য কেউ তাঁকে এসব শিখিয়ে-পড়িয়ে দেয়, আর তিনি সেসব মুখস্থ করে আওড়ান। কখনও-বা বলত, কুরআন হলো স্রেফ প্রাচীনকালের রূপকথা আর উপকথার সমষ্টি। যা সে লিখে রেখেছে। কখনও বলত, কোনও শয়তান জিনের আসা-যাওয়া আছে তার কাছে। গণকের মতো। এর জবাবে আল্লাহ তাআলা বলেন,
هَلْ أُنَبِّئُكُمْ عَلَى مَنْ تَنَزَّلُ الشَّيَاطِينُ ﴿١٢٢﴾ تَنَزَّلُ عَلَى كُلِّ أَفَاكٍ أَثِيمٍ (٢٢٢)
"বাস্তবেই কাদের ওপর শয়তান অবতীর্ণ হয়, জানো কি? তারা অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক পাপাচারী মিথ্যুকের ওপর।”[৬৩]
মুহাম্মাদ-কে স্নায়ুবিক বৈকল্যের রোগী বলেও দাবি করত মুশরিকরা। এভাবে অজ্ঞান হওয়া, ঘোরের মধ্যে চলে যাওয়া আর শরীর কাঁপুনি দেওয়ার সময়ই নাকি কুরআনের কথাগুলো তাঁর মাথায় আসে! আবার কখনও কখনও বলত, সে একটা কবি। এ দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে আল্লাহ বলেন,
وَالشُّعَرَاءُ يَتَّبِعُهُمُ الْغَاوُوْنَ ﴿٤٢٢) أَلَمْ تَرَ أَنَّهُمْ فِي كُلِّ وَادٍ يَهِيمُوْنَ ﴿٥٢٢﴾ وَأَنَّهُمْ يَقُوْلُوْنَ مَا لَا يَفْعَلُوْنَ ﴿٦٢٢)
“আর কবিদের অনুসরণ করে তো কেবল বিভ্রান্তরা। তুমি কি দেখো না যে, তারা প্রতি ময়দানেই উদ্‌ভ্রান্ত হয়ে ফেরে? এমন কাজ করার দাবি করে, যা তারা আদৌ করে না।” [৬৪]
এ আয়াতে কবিদের তিনটি বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে: ১. এদের অনুসারীরা বিভ্রান্ত। ২. তাদের নির্দিষ্ট কোনও গন্তব্য নেই। ৩. তারা যা করে না তা-ই বলে বেড়ায়।
রাসূল ও তাঁর অনুসারীদের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করলে ঠিক এগুলোর বিপরীত চিত্র পাওয়া যায়। রাসূল ﷺ-এর অনুসারীরা যেমন নেককার ও সৎ, তেমনি তাঁর লক্ষ্যও সুনির্দিষ্ট। তিনি এক আল্লাহ, এক দ্বীন এবং এক পথের কথাই প্রচার করেন এবং সেদিকেই আহ্বান করেন। আর তিনি যা শিক্ষা দেন, বাস্তবে তা নিখুঁতভাবে পালন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

টিকাঃ
[৬৩] সূরা শুআরা, ২৬: ২২১-২২২।
[৬৪] সূরা শুআরা, ২৬: ২২৪-২২৬।

📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 ইসলাম নিয়ে মুশরিকদের আপত্তি উত্থাপন

📄 ইসলাম নিয়ে মুশরিকদের আপত্তি উত্থাপন


নবিজি ﷺ-এর শিক্ষার তিনটি বিষয় নিয়ে ছিল মুশরিকদের প্রধান আপত্তি। সত্যি বলতে এ তিনটি বিষয়ই তাদের ও মুসলিমদের মাঝে দ্বন্দ্বের মূল জায়গা। মৃত্যুর পর বিচারের জন্য পুনরুত্থান, মরণশীল মাটির এক মানুষের নবি হওয়া এবং আল্লাহর একত্ব। পৌত্তলিক মগজে এগুলো একদমই অবোধ্য ও অবাস্তব।
প্রথমে আসা যাক পুনরুত্থানের কথায়। মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত হওয়ার বিষয়টি তাদের নিকট অতি আশ্চর্যের, যা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তাদের ভাষায়,
أَإِذَا مِتْنَا وَكُنَّا تُرَابًا وَعِظَامًا أَإِنَّا لَمَبْعُوثُونَ ﴿٦١﴾ أَوَآبَاؤُنَا الْأَوَّلُونَ (۷۱)
“আমরা যখন মরে যাব এবং মাটি ও হাড়ে পরিণত হব, তখনো কি আমরা পুনরুত্থিত হব? আমাদের পিতৃপুরুষগণও কি?”[৬৫]
তাদের কথা-মাটির সাথে মিশে যাওয়া হাড়গোড় আবার জীবিত হয় কী করে? আমাদের মৃত পূর্বপুরুষেরা বুঝি আবার উঠে দাঁড়িয়ে চলতে-ফিরতে-বলতে শুরু করবে?
ذَلِكَ رَجْعُ بَعِيدُ (۳)
“এ প্রত্যাবর্তন সুদূরপরাহত।”[৬৬]
নিজেদের মাঝে কথাবার্তা বলার সময় তারা এ বিষয়টা নিয়ে হাসিঠাট্টা করত,
هَلْ نَدُلُّكُمْ عَلَى رَجُلٍ يُنَبِّئُكُمْ إِذَا مُزِّقْتُمْ كُلَّ مُمَزَّقٍ إِنَّكُمْ لَفِي خَلْقٍ جَدِيدٍ ﴿۷﴾ أَفْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أَمْ بِهِ جِنَّةٌ
“আমরা কি তোমাদের এমন ব্যক্তির সন্ধান দেবো, যে তোমাদের খবর দেয় যে, তোমরা সম্পূর্ণ ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও তোমরা নতুন সৃজিত হবে! সে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা বলে, না হয় সে উন্মাদ।”[৬৭]
কুরআনের বেশ কিছু আয়াতে আল্লাহ তাআলা নিজেই পুনরুত্থানের বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। মুশরিকরা দাবি করত পুনরুত্থান অযৌক্তিক। কিন্তু কুরআন মানুষের স্বাভাবিক ন্যায়বোধকে নাড়া দিয়ে দেখায় যে, পুনরুত্থান ও শেষ বিচার হলো জীবনচক্রের এক অপরিহার্য ও স্বাভাবিক উপাদান।
কত পাপাচারী-অপরাধী আছে যারা তাদের কুকর্মের সামান্যতম প্রতিফল না পেয়েই মারা যায়। আবার কত নিরীহ-নিরপরাধ মানুষ তাদের জীবদ্দশায় তাদের ওপর হওয়া অত্যাচারের বিচার দেখে যেতে পারে না। আবার অনেক ভালো মানুষও মরে যায় তার সুকৃতির কোনও প্রতিদান না পেয়েই। মৃত্যুই যদি শেষ কথা হয়, তাহলে কেন মানুষ কষ্ট করে ভালো হওয়ার চেষ্টা করবে? ভালো কাজ করবে? একে-অপরকে লাথি-গুঁতো দিয়ে, অত্যাচার করে নিজে সর্বোচ্চ সুখ পাওয়াটাই তো তাহলে জীবনের সার্থকতা বলে প্রতীয়মান হবে! কিন্তু আমাদের ন্যায়বোধ বলে-না। এমনটা হতে পারে না। আল্লাহ তাআলা অবিবেচকের মতো এমন অসম করে আপন সৃষ্টিকুল সাজাতে পারেন না। আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিকুলের প্রতি পূর্ণ ন্যায়বিচারক। আল্লাহ জাল্লা শানুহু বলেন,
أَفَنَجْعَلُ الْمُسْلِمِينَ كَالْمُجْرِمِينَ ﴿٥٢﴾ مَا لَكُمْ كَيْفَ تَحْكُمُوْنَ ﴿٦٣﴾
“বিশ্বাসী আর পাপাচারীদের সাথে কি আমি একই আচরণ করব? কী হলো তোমাদের? কী করে তোমরা এমন সিদ্ধান্ত দিচ্ছ?”[৬৮]
অন্যত্র বলেছেন,
أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ اجْتَرَحُوا السَّيِّئَاتِ أَنْ تَجْعَلَهُمْ كَالَّذِينَ آمَنُوْا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَوَاءٌ تَحْيَاهُمْ وَمَمَاتُهُمْ سَاءَ مَا يَحْكُمُوْنَ ﴿٢١﴾
“দুষ্কর্ম উপার্জনকারীরা কি ভেবেছে যে, তাদের আমি ইহকাল ও পরকালে সৎকর্মশীল বিশ্বাসীদের সমান বানিয়ে দেবো? কত নিকৃষ্ট তাদের বিচারবোধ!”[৬৯]
এই তো গেল ন্যায়বোধের কথা। এখন মৃত মানুষের জীবিত হওয়ার ধারণাটা কি যৌক্তিক? এটা কি অসম্ভব কিছু? আল্লাহ তাআলা বলেন,
أَأَنتُمْ أَشَدُّ خَلْقًا أَمِ السَّمَاءُ بَنَاهَا ﴿٧٢﴾
“কোনটি সৃষ্টি করা বেশি কঠিন? তোমাদের, না তোমাদের মাথার ওপর স্থাপিত ঊর্ধ্বাকাশ? তিনি তো তা সৃষ্টি করেছেন।”[৭০]
অন্যত্র বলেছেন,
أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّ اللَّهَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَلَمْ يَعْيَ بِخَلْقِهِنَّ بِقَادِرٍ عَلَى أَنْ تُحْيِي الْمَوْتَى بَلَى إِنَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ ﴿۳۳﴾
“তারা কি বোঝে না, যে আল্লাহ আসমান-জমিন সৃষ্টি করেছেন এবং এগুলোর সৃষ্টিতে কোনও ক্লান্তিবোধ করেননি তিনি মৃতকেও পুনর্জীবিত করতে সক্ষম? অবশ্যই, কেন নয়? নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বময় ক্ষমতাধর।”[৭১]
وَلَقَدْ عَلِمْتُمُ النَّشْأَةَ الْأُوْلَى فَلَوْلَا تَذَكَّرُوْنَ ﴿٢٦﴾
“তোমরা প্রথম সৃষ্টি সম্পর্কে অবগত হয়েছ, তবুও তোমরা অনুধাবন করো না কেন?”[৭২]
كَمَا بَدَأْنَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُعِيدُهُ وَعْدًا عَلَيْنَا إِنَّا كُنَّا فَاعِلِينَ ﴿٤٠١﴾
“যেভাবে আমি সৃষ্টির সূচনা করেছি, ঠিক সেভাবে এর পুনরাবৃত্তি করব। এ আমার প্রতিশ্রুতি এবং আমি তা পূর্ণ করেই ছাড়ব।”[৭৩]
আবার কেউ কেউ বলতেন যে, মানলাম যে, আল্লাহ সারা জাহানের স্রষ্টা। কিন্তু একটা জিনিস পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর আবার তা তৈরি করাটা তো অসম্ভব। আল্লাহ তাদের ভুল সংশোধন করে দিলেন, শূন্য থেকে কোনোকিছু প্রথমবার সৃষ্টি করার চেয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত জিনিস পুনর্নির্মাণ করা অতি সহজ।
أَفَعَيِيْنَا بِالْخَلْقِ الْأَوَّلِ بَلْ هُمْ فِي لَبْسٍ مِنْ خَلْقٍ جَدِيدٍ ﴿٥١﴾
“আমি তো একবার সৃষ্টি করেই ক্লান্ত হয়ে পড়িনি! তারাই বরং নতুন করে সৃষ্টি করার বিষয়টি নিয়ে ধাঁধায় পড়ে আছে।”[৭৪]
এবার আসা যাক দ্বিতীয় বিষয়ে। মুহাম্মাদ ﷺ-কে একজন সত্যবাদী মানুষ হিসেবে মানতে কুরাইশদের আপত্তি নেই। কিন্তু রক্ত-গোশতের তৈরি একজন মানুষকে আল্লাহর নবি ও রাসূল হওয়ার মতো ভারী কাজ দেওয়া হতে পারে, এটি তাদের অকল্পনীয়। তারা বিষয়টি মানতে পারেনি। মুহাম্মাদ নুবুওয়াতের দাবি করার পর কুরাইশরা জবাব দেয়,
مَالِ هَذَا الرَّسُوْلِ يَأْكُلُ الطَّعَامَ وَيَمْشِي فِي الْأَسْوَاقِ “এ আবার কেমন ঐশী-দূত, যে খাবারও খায় আবার বাজারেও যায়?”[৭৫] তাদের সংশয়ের উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন,
بَلْ عَجِبُوا أَنْ جَاءَهُم مُنْذِرٌ مِّنْهُمْ فَقَالَ الْكَافِرُوْنَ هَذَا شَيْءٌ عَجِيْبُ ﴿٢﴾ “তারা তাদেরই মধ্য থেকে একজন সতর্ককারী আবির্ভূত হয়েছেন বলে বিস্ময়বোধ করে, অতঃপর কাফিররা বলে, এটা অতি আশ্চর্যের ব্যাপার।”[৭৬] তারা এ-ও বলে,
مَا أَنْزَلَ اللَّهُ عَلَى بَشَرٍ مِّنْ شَيْءٍ “আল্লাহ কোনও মানুষের প্রতি কোনও কিছু অবতীর্ণ করেননি।”[৭৭] আল্লাহর পক্ষ থেকে মরণশীল কোনও মানুষ ঐশীবাণী পেতে পারে, এটা তাদের মনঃপূত নয়। তাদের এই ধ্যানধারণা খণ্ডন করে আল্লাহ বলেন,
قُلْ مَنْ أَنزَلَ الْكِتَابَ الَّذِي جَاءَ بِهِ مُوْسَى نُوْرًا وَهُدًى لِلنَّاسِ “তাদের জিজ্ঞেস করুন, 'তাহলে ওই গ্রন্থ কে নাযিল করেছে, যা মূসা নিয়ে এসেছিল? যা এক আলোকবর্তিকা এবং মানুষের জন্য পথনির্দেশ?”[৭৮] কুরআনে বহু ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে রক্ত-মাংসের মানুষকে তাঁর জাতি নবি বলে মানতে চায়নি। তাদের বক্তব্য ছিল,
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ
إِنْ أَنْتُمْ إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُنَا “তুমি তো কেবল আমাদের মতোই মানুষ।”[৭৯]
নবিগণ জবাবে বলেছেন, إِنْ نَّحْنُ إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَمُنُّ عَلَى مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ “হ্যাঁ, আমরাও তোমাদের মতো মানুষ বটে। কিন্তু আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে চান, তাকে অনুগ্রহ দান করেন।”[৮০]
মূল কথা হলো, প্রত্যেক নবি-রাসূলই মানুষ ছিলেন। মুহাম্মাদ ﷺ-ও এর ব্যতিক্রম নন। আর অতিপ্রাকৃতিক ফেরেশতারা যদি নবি-রাসূল হয়ে আসতেন, তাহলে রক্ত- গোশতে গঠিত এসব মানুষ তাঁদের অনুসরণ করতে পারত না। শুধু বার্তা পৌঁছে দিয়ে ক্ষান্ত হওয়াই তো নবি-রাসূলের কাজ নয়; বরং আসমানি বার্তাকে জমীনে কীভাবে প্রয়োগ করতে হবে, সেটা দেখিয়ে দেওয়াও তাঁদের কর্তব্য। মানুষের চেয়ে ভালোভাবে সেটা আর কে পারবে? ফেরেশতা পাঠানো হলে মুশরিকরা আবার এই আপত্তি করত, “এসব অতিপ্রাকৃতিক সত্তা যা পারে, আমরা কীভাবে তা পারব?” প্রজ্ঞাপূর্ণ এই বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে এই আয়াতে, وَلَوْ جَعَلْنَاهُ مَلَكًا لَّجَعَلْنَاهُ رَجُلًا وَلَلَبَسْنَا عَلَيْهِم مَّا يَلْبِسُوْنَ ﴿۹) “যদি আমি কোনও ফেরেশতাকে রাসূল করে পাঠাতাম, তবে তাকেও তো আমি মানবাকৃতিতেই পাঠাতাম। এতেও তারা ওই সন্দেহই করত, যা এখন করছে।”[৮১]
আরব পৌত্তলিকরা যেহেতু ইবরাহীম, ইসমাঈল, মূসা (আলাইহিমুস সালাম)-কে নবি বলেও স্বীকার করত আবার তাদের মানুষ বলেও মানত, তাই মুহাম্মাদ ﷺ-এর বিরুদ্ধে সেই অভিযোগ আর ধোপে টিকল না। ফলে তারা আরেকটি নতুন আপত্তি পেশ করল, 'আল্লাহ কি নবি বানানোর জন্য একসময়ের ইয়াতীম অসহায় এই গরিব ব্যক্তিটাকেই পেল? এটা কী করে সম্ভব যে, কুরাইশ কিংবা সাকীফ গোত্রের বড় বড় নেতাদের ছেড়ে এক মিসকীনকে আল্লাহ নিজের নবি হিসেবে নির্বাচন করল!'
لَوْلَا نُزِّلَ هَذَا الْقُرْآنُ عَلَى رَجُلٍ مِّنَ الْقَرْيَتَيْنِ عَظِيمٍ (১৩)
“দুই এলাকার (মক্কা ও তায়িফ) কোনও প্রভাবশালী গণ্যমান্য ব্যক্তির কাছে কেন কুরআন অবতীর্ণ হলো না?”[৮২]
একদম অল্প কথায় আল্লাহ এর যথাযথ জবাব দিয়ে দেন,
أَهُمْ يَقْسِمُوْنَ رَحْمَتَ رَبِّكَ
"আপনার রবের রহমত কি ওরা বণ্টন করে দেবে নাকি?”[৮৩]
কুরআন, নুবুওয়াত, ওহি সবকিছুই আল্লাহর রহমতের অন্তর্ভুক্ত। এগুলো কাকে দেওয়া হবে, তা তিনিই নির্ধারণ করবেন। এর অধিকার কেবল তাঁরই। আল্লাহ তাআলা বলেন,
اللَّهُ أَعْلَمُ حَيْثُ يَجْعَلُ رِسَالَتَهُ
“কাকে বার্তাবাহনের দায়িত্ব দিতে হবে, তা আল্লাহ ভালো করেই জানেন।” [৮৪]
আবারও মোক্ষম জবাব পেয়ে মুশরিকরা এবার ভিন্ন আরেকটি রাস্তা ধরল। আপত্তি তুলল যে, রাজা-বাদশারা কত জাঁকজমক আর ধনসম্পদে বেষ্টিত থাকে। নির্দিষ্ট কিছু লোক ছাড়া তাদের ধারেকাছেও কেউ ভিড়তে পারে না। তুখোড় সব উপদেষ্টা, শত-শত দাস, দেহরক্ষী, আর সুন্দরী রমণী থাকে তাদের। তাহলে স্বয়ং আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদকে কেন কাজ করতে হয়, বাজারে গিয়ে নিজের খাবার উপার্জন ও ক্রয় করতে হয়? তারা বলে,
لَوْلَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ مَلَكُ فَيَكُوْنَ مَعَهُ نَذِيرًا (۷) أَوْ يُلْقَى إِلَيْهِ كَنزٌ أَوْ تَكُوْنُ لَهُ جَنَّةٌ يَأْكُلُ مِنْهَا وَقَالَ الظَّالِمُوْنَ إِنْ تَتَّبِعُوْنَ إِلَّا رَجُلًا مَّسْحُوْرًا (۸)
“তাঁর কাছে কেন কোনও ফেরেশতা নাযিল করা হলো না যে তাঁর সাথে সতর্ককারী হয়ে থাকত? অথবা তিনি ধন-ভান্ডার প্রাপ্ত হলেন না কেন, কিংবা তাঁর একটি বাগান হলো না কেন, যা থেকে তিনি আহার করতেন?
“জালিমরা বলে, তোমরা তো একজন জাদুগ্রস্ত ব্যক্তিরই অনুসরণ করছ।”[৮৫]
মুশরিকদের বিবেচনাবোধ বলে যে, দেবদূত তো রাজদূতের মতোই হওয়ার কথা। অথচ এই লোকের প্রাসাদ কোথায়? সম্পদ কই? কোথায় তার রাজকীয় পাইক- পেয়াদা? একটা ফেরেশতাও তো তার পাশে কখনও দেখা যায় না! তার সাথে তো হত-দরিদ্র দুর্বল শ্রেণির লোকজনকেই বেশি দেখা যায়!
এসব কিছুর জবাব ছোট্ট একটি বাক্যেই নিহিত রয়েছে। তা হচ্ছে-মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল।
ধনী-গরিব, সবল-দুর্বল, দাস-স্বাধীন সবার কাছেই তিনি আল্লাহর বার্তা পৌঁছাতে প্রেরিত হয়েছেন। তিনি যদি রাজা-বাদশার মতো শান-শওকত নিয়ে চলাফেরা করতেন, তাহলে বেশির ভাগ মানুষই দূরে সরে যেত। তাই সাদাসিধে থাকাটাই তাঁর মিশনের দাবি। তাহলেই মানুষ বুঝবে যে ইসলাম কোনও সম্রাট, ধর্মতত্ত্ববিদ বা দার্শনিকের অবসরের বিনোদন নয়; বরং প্রাত্যহিক মানবজীবনের সাথে সংগতিপূর্ণ ও অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
কিন্তু স্বগোত্রীয় একজন মানুষের বিরুদ্ধে কুরাইশদের এমন উঠেপড়ে লাগাটা আপাতদৃষ্টিতে অদ্ভুত। মুহাম্মাদ ﷺ-এর দাওয়াতে কী এমন ছিল, যা মূর্তিপূজারিদের কাছে এত আপত্তিকর ঠেকল? সত্যিকারার্থে নবিজি ও মুশরিকের মাঝে দ্বন্দ্বের আসল জায়গাটা ছিল তাওহীদ-একত্ববাদ ও বহুত্ববাদের দ্বৈরথ।
পৌত্তলিকরা তাওহীদের কিছু বিষয় মানত বটে। যেমন: আল্লাহ তাঁর সত্তা, গুণাবলি ও কর্মে একক ও অদ্বিতীয়, এটা মানতে তাদের আপত্তি নেই। তা ছাড়া আল্লাহই যে বিশ্বজাহানের একমাত্র স্রষ্টা, সকল জীবের প্রতিপালক ও আহারদাতা, জীবন-মৃত্যু দেওয়ার মালিক, কারও কাছে জবাবদিহি ছাড়া একক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম-এগুলোও স্বীকার করত তারা।
তবে সাথে সাথে এটাও বিশ্বাস করত যে, কিছু কিছু সত্তা আল্লাহর দেওয়া বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী। তারা আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত এবং বিশেষ বান্দা। যেমন: আম্বিয়ায়ে কেরাম, আল্লাহর আউলিয়াগণ, নেককার বুযুর্গ এবং তাদের বানানো আরও দেব-দেবীরা। মুশরিকদের মতে, এরা আল্লাহর দেওয়া ক্ষমতায় অলৌকিক কর্মকাণ্ড করতেও সক্ষম, যেমন: অসুস্থকে সুস্থ করা, বন্ধ্যা নারীকে গর্ভধারণ করানো, প্রয়োজন পূরণ করে দেওয়া ইত্যাদি। এদের তারা মনে করত আল্লাহ ও মানুষের মাঝে মাধ্যম, তাদের কাছে প্রার্থনা করা হলে তারা সেটা আল্লাহর কাছে পৌঁছে দেবে।
ফলে পৌত্তলিকরা এ-সকল উচ্চপদস্থ সত্তাকে খুশি করার সর্বাত্মক চেষ্টা করত। তাদের ধারণা, এ-সকল পুণ্যাত্মাদের সন্তুষ্ট করলে আল্লাহও সন্তুষ্ট হবেন। সন্তুষ্ট করার পদ্ধতিগুলোও বেশ বাহারি। তাদের কবরের ওপর নির্মাণ করা হতো সৌধ। তীর্থযাত্রীরা এসে এ-সকল সৌধকে ঘিরে নানারকম আচার-অনুষ্ঠান করে ওই ব্যক্তিবর্গদের খুশি করতে চাইত। এমনকি এদের উদ্দেশ্য করে শস্য, পণ্য, সোনাদানা ও পশুবলিও করা হতো দেদারসে। এ-সকল অর্ঘ্য প্রথমে পেশ করা হতো সেখানকার সেবক-পুরোহিতদের হাতে। তারা সেগুলো নিয়ে রাখত সৌধ বা দেব-দেবীর মূর্তির সামনে। সাধারণত এদের মাধ্যম ছাড়া সরাসরি আল্লাহর ইবাদাত তারা করত না। [৮৬]
তবে পশুবলির ধরন ছিল নানারকম। কখনও সেসব বুযুর্গদের নামে একটি পশুকে এমনি ছেড়ে দেওয়া হতো। অবাধে ঘুরে বেড়ানো এসব পশু সামনে পড়লে প্রচণ্ড ভক্তি দেখাত ভক্তরা। কখনও তাদের কবরের সামনে নিয়ে গিয়ে ওই ব্যক্তির নামে যবাই করা হতো প্রাণীটি। [৮৭]
আবার বছরে একবার-দুবার এসব তীর্থস্থান ঘিরে মেলাও বসত। উপরোল্লেখিত আচার-অনুষ্ঠানগুলোই করা হতো এখানে। সাধারণত ওখানকার কারও মৃত্যুবার্ষিকীকে ঘিরে আয়োজিত হতো এসব মেলা। দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা আসত ভক্তি নিবেদন করতে। এসব আচার-প্রথার উদ্দেশ্য ছিল মৃত নেককারদের সন্তুষ্টি লাভ, যাতে তারা আল্লাহর কাছে ভক্তদের নামে সুপারিশ করেন।
কিছু সাধুকে উদ্দেশ্য করে পৌত্তলিকরা বলত, “বাবা, আমার প্রার্থনা গ্রহণ করুন, এই এই বিপদাপদ সরিয়ে দিন।” তাদের মতে, আল্লাহ এ-সকল মৃত ব্যক্তিকে তাদের প্রার্থনা শোনার ক্ষমতা তো দিয়েছেনই, এমনকি সেগুলোর জবাব দেওয়া বা আল্লাহর কাছে সুপারিশ করার ক্ষমতাও দিয়েছেন। [৮৮]
এই ছিল মুশরিকদের শির্ক এবং গাইরুল্লাহর জন্য তাদের ইবাদাত। আল্লাহ ব্যতীত তাদের অন্যান্য উপাস্য। এদেরই তারা আল্লাহর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করত। তাদেরই মূর্তি বানিয়ে পূজা করত তাদের সন্তুষ্টির আশায়।
নবিজি যখন তাওহীদ ও একত্ববাদ এর আহ্বান নিয়ে তাদের নিকট আসলেন এবং আল্লাহ ব্যতীত সমস্ত উপাস্যকে ছেড়ে দেওয়ার দাবি জানালেন তখন তাদের কাছে তা অতি কষ্টকর ও বেশ ভারী মনে হলো। তারা একে পথভ্রষ্টতা এবং ষড়যন্ত্র বলে বিবেচনা করল। তারা বলল,
أَجَعَلَ الْآلِهَةَ إِلَيْهَا وَاحِدًا إِنَّ هَذَا لَشَيْءٍ عُجَابٌ ﴿٥﴾ وَانْطَلَقَ الْمَلَأُ مِنْهُمْ أَنِ امْشُوا وَاصْبِرُوا عَلَى آلِهَتِكُمْ إِنَّ هَذَا لَشَيْءٍ يُرَادُ ﴿٦﴾ مَا سَمِعْنَا بِهَذَا فِي الْمِلَّةِ الْآخِرَةِ إِنَّ هَذَا إِلَّا اخْتِلَاقُ ﴿٧﴾
“সে কি সব উপাস্যকে এক উপাস্যে পরিণত করেছে? নিশ্চয় এ বড় বিস্ময়কর বিষয়! তাদের কতিপয় বিশিষ্ট ব্যক্তি এ কথা বলে প্রস্থান করে যে, তোমরা চলে যাও এবং উপাস্যদের পূজায় দৃঢ় থাকো। নিশ্চয়ই এ বক্তব্য কোনও বিশেষ উদ্দেশ্যে প্রণোদিত। এক উপাস্যওয়ালা কোনও ধর্মের কথা তো আমরা শুনিনি! নিশ্চয়ই এটা কোনও নতুন উদ্ভাবন।”[৮৯]
কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে এসব মুশরিকের সাথে বিতর্ক করেছেন স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা। তাদের জিজ্ঞেস করেছেন যে, কাউকে আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত ভাবার জন্য তাদের মানদণ্ডটা কী। কীভাবে তারা নিশ্চিত হতো যে, অমুক ব্যক্তি আল্লাহর বিশেষ বান্দা। এটা নির্ধারণ করার উপায় স্রেফ দুটি- নিজেরাই অদৃশ্যের জ্ঞান লাভ করা, অথবা আসমানি কিতাব থেকে জেনে নেওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন,
أَمْ عِنْدَهُمُ الْغَيْبُ فَهُمْ يَكْتُبُونَ ﴿٧٤) “তাদের কাছে কি অদৃশ্যের খবর আছে? ফলে তারা তা টুকে রাখে?”[৯০]
ائْتُونِي بِكِتَابٍ مِّنْ قَبْلِ هَذَا أَوْ أَثَارَةٍ مِّنْ عِلْمٍ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِيْنَ ﴿٤) "তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকলে এটির আগে অবতীর্ণ হওয়া কোনও কিতাব নিয়ে আসো, অথবা তোমাদের দাবির স্বপক্ষে পরম্পরাগত কোনও জ্ঞান থাকলে তা পেশ করো।" [৯১]
قُلْ هَلْ عِنْدَكُمْ مِّنْ عِلْمٍ فَتُخْرِجُوْهُ لَنَا إِنْ تَتَّبِعُوْنَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنْ أَنتُمْ إِلَّا تَخْرُصُوْنَ ﴿১৪৮)
“আপনি বলুন, তোমাদের কাছে কি কোনও প্রমাণ আছে যা আমাদের দেখাতে পারো। তোমরা শুধু আন্দাজের অনুসরণ করো এবং তোমরা শুধু অনুমান করে কথা বলো।”[৯২]
মুশরিকরা স্বীকার করত যে, তাদের কাছে অদৃশ্যের জ্ঞান নেই। আসমানি কোনও কিতাবও নেই তাদের কাছে। বাপ-দাদার সময় থেকে চলে আসা ঐতিহ্য-সংস্কৃতিই তাদের আসল সম্বল। ফলে তারা বলতে লাগল,
بَلْ نَتَّبِعُ مَا وَجَدْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا “বরং আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের যে বিষয়ের ওপর পেয়েছি, তারই অনুসরণ করি।”[৯৩]
إِنَّا وَجَدْنَا آبَاءَنَا عَلَى أُمَّةٍ وَإِنَّا عَلَى آثَارِهِم مُّهْتَدُونَ ﴿২৩﴾ "আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের পেয়েছি এক পথের পথিক এবং আমরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছি।”[৯৪]
মূর্তিপূজারিদের অজ্ঞতা ও অসহায়ত্ব এখান থেকেই প্রকাশ পায়। কুরআনে আল্লাহ তা একদম স্পষ্ট করে দিয়েছেন,
إِنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُوْنَ ﴿٤٧﴾ “নিশ্চয়ই আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।”[৯৫]
তাদের নেককার ও নৈকট্যপ্রাপ্ত পূর্বপুরুষদের ব্যাপারে আল্লাহ স্পষ্টত বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ تَدْعُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللَّهِ عِبَادُ أَمْثَالُكُمْ
"আল্লাহকে বাদ দিয়ে তোমরা যাদের ডাকো, তারা সবাই তোমাদের মতোই বান্দা।”[৯৬]
অর্থাৎ যে বিষয়গুলো আল্লাহ তাআলার সাথে বিশেষায়িত সেগুলোর ওপর তোমাদের যেমন কোনও ক্ষমতা নেই ঠিক তেমনি তোমাদের উপাস্যদেরও কোনও ক্ষমতা নেই। সুতরাং তোমরা এবং তারা অসহায়ত্ব ও ক্ষমতাহীনতার দিক দিয়ে সমান সমান। এ জন্যই আল্লাহ চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেছেন,
فَادْعُوْهُمْ فَلْيَسْتَجِيبُوْا لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ ﴿٤٩١﴾ “তোমরা তাদের ডাকো, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকো, তাহলে তারা যেন তোমাদের ডাকে সাড়া দেয়।" [৯৭]
وَالَّذِينَ تَدْعُوْنَ مِنْ دُوْنِهِ مَا يَمْلِكُوْنَ مِنْ قِطْمِيرٍ (۳۱) “আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ডাকো, তারা তুচ্ছ একটি খেজুর আঁটিরও মালিক নয়।”[৯৮]
إِنْ تَدْعُوْهُمْ لَا يَسْمَعُوا دُعَاءَكُمْ وَلَوْ سَمِعُوْا مَا اسْتَجَابُوا لَكُمْ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكْفُرُونَ بِشِرْكِكُمْ وَلَا يُنَبِّئُكَ مِثْلُ خَبِيرٍ ﴿٤١) "তোমরা তাদের ডাকলে তারা তোমাদের সে ডাক শুনে না। শুনলেও তোমাদের ডাকে সাড়া দেয় না। কিয়ামাতের দিন তারা তোমাদের শিরক অস্বীকার করবে। পূর্ণ অবগত সত্তার (আল্লাহ) ন্যায় তোমাকে কেউ অবহিত করতে পারবে না।" [৯৯]
অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার জ্ঞান পরিপূর্ণ এবং সবকিছুর খবর তিনি রাখেন। সুতরাং তিনি যা বলবেন তা-ই সঠিক হবে আর অন্যরা যা বলবে তা হবে মিথ্যা ও বানোয়াট। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَالَّذِينَ يَدْعُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللَّهِ لَا يَخْلُقُوْنَ شَيْئًا وَهُمْ يُخْلَقُوْنَ ﴿٢﴾ أَمْوَاتٌ غَيْرُ أَحْيَاءٍ وَمَا يَشْعُرُوْنَ أَيَّانَ يُبْعَثُونَ (١٢)
“আল্লাহকে ছাড়া আরও যাদের কাছে তারা প্রার্থনা করে, তারা একটা জিনিসও সৃষ্টি করতে পারে না; বরং তারা নিজেরাই সৃজিত। তারা মৃত, নির্জীব। কখন তাদের পুনরুত্থিত করা হবে, সেটাই তো তারা জানে না।”[১০০]
أَيُشْرِكُوْنَ مَا لَا يَخْلُقُ شَيْئًا وَهُمْ يُخْلَقُوْنَ ﴿۱۹۱) وَلَا يَسْتَطِيعُوْنَ لَهُمْ نَصْرًا وَلَا أَنفُسَهُمْ يَنْصُرُوْنَ ﴿٢٩١)
“তারা কি আল্লাহর সাথে এমন অংশীদার নির্ধারণ করে, যারা কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না; বরং উল্টো তারা নিজেরাই সৃষ্ট? এসব প্রার্থিতরা না তাদের প্রার্থীদের সাহায্য করতে পারে, না নিজেদের।”[১০১]
وَاتَّخَذُوا مِنْ دُونِهِ آلِهَةٌ لَّا يَخْلُقُوْنَ شَيْئًا وَهُمْ يُخْلَقُوْنَ وَلَا يَمْلِكُونَ لِأَنفُسِهِمْ ضَرًّا وَلَا نَفْعًا وَلَا يَمْلِكُونَ مَوْتًا وَّلَا حَيَاةً وَلَا نُشُورًا (۳)
“তারা তাঁর পরিবর্তে কত উপাস্য গ্রহণ করেছে, যারা কিছুই সৃষ্টি করে না এবং তারা নিজেরাই সৃষ্ট এবং নিজের ভালোও করতে পারে না, মন্দও করতে পারে না এবং জীবন, মরণ ও পুনরুজ্জীবনেরও তারা মালিক না।”[১০২]
আল্লাহ তাআলা তাদের উপাস্যদের অবস্থা একটি উপমার মাধ্যমে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন,
وَالَّذِينَ يَدْعُوْنَ مِنْ دُوْنِهِ لَا يَسْتَجِيبُوْنَ لَهُمْ بِشَيْءٍ إِلَّا كَبَاسِطِ كَفَّيْهِ إِلَى الْمَاءِ لِيَبْلُغَ فَاهُ وَمَا هُوَ بِبَالِغِهِ وَمَا دُعَاءُ الْكَافِرِينَ إِلَّا فِي ضَلَالٍ (٤١)
"আর তাঁকে ছাড়া তারা যাদের ডাকে, তারা তাদের কোনও কাজে আসে না, ওদের দৃষ্টান্ত সেরূপ, যেমন কেউ দু-হাত পানির দিকে প্রসারিত করে, যাতে পানি তার মুখে পৌঁছে যায়। অথচ পানি কোনও সময়ই তার মুখে পৌঁছাবে না। কাফিরদের যত আহ্বান তা সবই ভ্রষ্টতায় নিপতিত।”[১০৩]
মুশরিকদের বলা হলো, তোমরা কীভাবে আল্লাহ তাআলার সাথে-যিনি সর্বশক্তিমান এবং সবকিছুর সৃষ্টা-অন্যান্য উপাস্যদের শরীক করো। যাদের কোনও ক্ষমতা নেই, যাদের নিজেদেরই সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ আর তারা কি সমান হতে পারে?
أَفَمَنْ يَخْلُقُ كَمَنْ لَّا يَخْلُقُ أَفَلَا تَذَكَّرُوْنَ (۷۱) “যিনি সৃষ্টি করে, তিনি কি সে লোকের সমতুল্য যে সৃষ্টি করতে পারে না? তোমরা কি এতটুকুও বুঝবে না।”[১০৪]
যখন তাদের সামনে এই প্রশ্ন রাখা হলো তারা হতভম্ব হয়ে গেল। নির্বাক হয়ে হতাশ চেয়ে থাকা ছাড়া তাদের আর কোনও উপায় ছিল না। তাদের হুজ্জতবাজি খতম হতে দেখে তারা নতুন কৌশল আবিষ্কার করে বলতে শুরু করল, 'দেখো, আমাদের বাপ-দাদারা সমস্ত মানুষ থেকে বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী ছিলেন। তাদের অনন্য বুদ্ধিমত্তার বিষয়টি সবার মাঝে ব্যাপকভাবে প্রসিদ্ধ ছিল। দূর-দূরান্তের মানুষও বিষয়টি অকুণ্ঠচিত্তে মান্য করত। ওই সমস্ত সম্মানিত ব্যক্তিদের দ্বীন-ধর্ম-ইবাদাতই ছিল এ-রকম। সুতরাং তা বাতিল ও গোমরাহ হওয়া অসম্ভব। স্বয়ং মুহাম্মাদের বাপ-দাদারাও এই একই ধর্মের ওপর অতিবাহিত হয়েছেন।
এর প্রত্যুত্তরে আল্লাহ তাআলা বলেন, قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا أَلْفَيْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا أَوَلَوْ كَانَ آبَاؤُهُمْ لَا يَعْقِلُوْنَ شَيْئًا وَّلَا يَهْتَدُوْنَ "তারা বলে, বরং আমরা আমাদের বাপ-দাদাদের যাতে পেয়েছি সে বিষয়েরই অনুসরণ করব। যদিও তাদের বাপ-দাদারা কিছুই জানত না, জানত না সরল পথটাও।" [১০৫]
إِنَّهُمْ أَلْقَوْا آبَاءَهُمْ ضَالِّيْنَ ﴿١٦﴾ فَهُمْ عَلَى آثَارِهِمْ يُهْرَعُوْنَ (۷) "তারা তাদের পূর্বপুরুষদের পেয়েছিল বিপথগামী। অতঃপর তারা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণে ছিল তৎপর।”[১০৬]
আবার বাপ-দাদা ও দেব-দেবীদের অপমান ও বিরোধিতা করার ফলে মুহাম্মাদ ও মুসলিমরা অভিশপ্ত হয়েছে বলেও অভিযোগ তোলে মুশরিকরা।
إِنْ تَقُوْلُ إِلَّا اعْتَرَاكَ بَعْضُ آلِهَتِنَا بِسُوْءٍ
“আমরা এ কথাই বলি যে, তোমার ওপর আমাদের কোনও উপাস্যের অশুভ ছায়া পড়েছে।”[১০৭]
এসব দুর্বল হুমকির জবাবে আল্লাহ তাদের মনে করিয়ে দেন সেসব দেব-দেবীর চূড়ান্ত অক্ষমতার কথা। নিশ্চল, নির্বাক, প্রতিরোধহীন এসব প্রতিমা কী করে মুসলিমদের ক্ষতি করবে?
أَلَهُمْ أَرْجُلٌ يَمْشُوْنَ بِهَا أَمْ لَهُمْ أَيْدٍ يَبْطِشُوْنَ بِهَا أَمْ لَهُمْ أَعْيُنٌ يُبْصِرُوْنَ بِهَا أَمْ لَهُمْ آذَانٌ يَسْمَعُوْنَ بِهَا قُلِ ادْعُوا شُرَكَاءَكُمْ ثُمَّ كِيْدُوْنِ فَلَا تُنْظِرُوْنِ ﴿۵۹۱﴾
"তাদের কি পা আছে যে, হাঁটবে? হাত আছে যে, ধরবে? চোখ আছে যে, দেখবে? না কি কান আছে যে, শুনবে? বলে দাও, যাদের তোমরা আল্লাহর শরিক বলে দাবি করো, তাদের ডাকো অতঃপর আমার অমঙ্গল করো এবং আমাকে কোনও অবকাশই দিয়ো না।” [১০৮]
يَا أَيُّهَا النَّاسُ ضُرِبَ مَثَلُ فَاسْتَمِعُوْا لَهُ إِنَّ الَّذِينَ تَدْعُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللَّهِ لَنْ يَخْلُقُوْا ذُبَابًا وَلَوِ اجْتَمَعُوْا لَهُ وَإِنْ يَسْلُبْهُمُ الذُّبَابُ شَيْئًا لَّا يَسْتَنقِذُوْهُ مِنْهُ ضَعُفَ الطَّالِبُ وَالْمَطْلُوْبُ (۳৭)
“হে লোকসকল, একটি উপমা বর্ণনা করা হলো, অতএব তোমরা তা মনোযোগ দিয়ে শোনো। তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের পূজা করো, তারা কখনও একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না, যদিও তারা সকলে একত্র হয়। আর মাছি যদি তাদের কাছ থেকে কোনও কিছু ছিনিয়ে নেয়, তবে তারা তার কাছ থেকে তা উদ্ধারও করতে পারবে না। প্রার্থনাকারী এবং যার কাছে প্রার্থনা করা হয়, উভয়েই শক্তিহীন দুর্বল।”[১০৯]
নিজেদের বিশ্বাসের প্রতি মুশরিকদের করা অপমান শুনতে শুনতে কোনও কোনও মুসলিম ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে যেতেন। রাগের মাথায় মুশরিকদের বলে বসতেন, "তোদের দেবতাদের মাথায় শিয়ালে প্রস্রাব করে গেলেও তো তারা কিছু বলতে পারে না। যার মাথায় শিয়াল প্রস্রাব করে সে কতই-না অপদস্থ ও লাঞ্ছিত।”
মুশরিকরা এতে রাগে অন্ধ হয়ে মুসলিমদের ও আল্লাহর নামে গালিগালাজের ঝড় বইয়ে দিত। গভীর এক আধ্যাত্মিক দ্বৈরথ যেন নিছক গলাবাজিতে পর্যবসিত না হয়, তাই আল্লাহ সাথে সাথে নির্দেশ দেন,
وَلَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللَّهِ فَيَسُبُّوا اللهَ عَدْوًا بِغَيْرِ عِلْمٍ “আল্লাহকে ছাড়া তারা যেসবকে ডাকে, সেগুলোকে গালমন্দ কোরো না। তাহলে তারাও ধৃষ্টতা করে অজ্ঞতাবশত আল্লাহকে গালি দিয়ে বসবে।”[১১০]

টিকাঃ
[৬৫] সূরা সাফফাত, ৩৭: ১৬-১৭।
[৬৬] সূরা কাফ, ৫০: ৩।
[৬৭] সূরা সাবা, ৩৪: ৭-৮।
[৬৮] সূরা কলাম, ৬৮: ৩৫-৩৬।
[৬৯] সূরা জাসিয়া, ৪৫: ২১।
[৭০] সূরা নাযিআত, ৭৯ : ২৭।
[৭১] সূরা আহকাফ, ৪৬: ৩৩।
[৭২] সূরা ওয়াকিয়া, ৫৬: ৬২।
[৭৩] সূরা আম্বিয়া, ২১: ১০৪।
[৭৪] সূরা কাফ, ৫০: ১৫।
[৭৫] সূরা ফুরকান, ২৫: ৭।
[৭৬] সূরা কাফ, ৫০:২।
[৭৭] সূরা আনআম, ৬: ৯১।
[৭৮] সূরা আনআম, ৬: ৯১।
[৭৯] সূরা ইবরাহীম, ১৪: ১০।
[৮০] সূরা ইবরাহীম, ১৪: ১১।
[৮১] সূরা আনআম, ৬: ৯।
[৮২] সূরা যুখরুফ, ৪৩: ৩১।
[৮৩] সূরা যুখরুফ, ৪৩: ৩২।
[৮৪] সূরা আনআম, ৬: ১২৪।
[৮৫] সূরা ফুরকান, ২৫: ৭-৮।
[৮৬] সূরা আনআমের ১৩৬ নং এবং এর তাফসীর দ্রষ্টব্য।
[৮৭] দ্রষ্টব্য-সূরা মাইদা, ৫: ৩, ১৩০; সূরা আনআম, ৬: ১২১, ১৩৮; বুখারি, ৪৬২৩; ইবনু হিশাম, ১/৮৯-৯০।
[৮৮] সূরা ইউনুসের ১৮ নং আয়াতের তাফসীর দ্রষ্টব্য।
[৮৯] সূরা সাদ, ৩৮:৫-৭।
[৯০] সূরা কলাম, ৬৮: ৪৭।
[৯১] সূরা আহকাফ, ৪৬:৪।
[৯২] সূরা আনআম, ৬ : ১৪৮।
[৯৩] সূরা লুকমান, ৩১ : ২১।
[৯৪] সূরা যুখরুফ, ৪৩: ২৩।
[৯৫] সূরা নাহল, ১৬: ৭৪।
[৯৬] সূরা আ'রাফ, ৭: ১৯৪।
[৯৭] সূরা আ'রাফ, ৭: ১৯৪।
[৯৮] সূরা ফাতির, ৩৫: ১৩।
[৯৯] সূরা ফাতির, ৩৫: ১৪।
[১০০] সূরা নাহল, ১৬: ২০-২১।
[১০১] সূরা আ'রাফ, ৭: ১৯১-১৯২।
[১০২] সূরা ফুরকান, ২৫: ৩।
[১০৩] সূরা রা'দ, ১৩: ১৪।
[১০৪] সূরা নাহল, ১৬: ১৭।
[১০৫] সূরা বাকারা, ২: ১৭০।
[১০৬] সূরা সফফাত, ৩৭ : ৬৯-৭০।
[১০৭] সূরা হুদ, ১১ : ৫৪।
[১০৮] সূরা আ'রাফ, ৭ : ১৯৫।
[১০৯] সূরা হাজ্জ, ২২: ৭৩।
[১১০] সূরা আনআম, ৬: ১০৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00