📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 হাজীদের ভুল বোঝাতে কুরাইশদের বৈঠক

📄 হাজীদের ভুল বোঝাতে কুরাইশদের বৈঠক


মুসলিমদের সংখ্যাবৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়তে থাকে কুরাইশদের দুশ্চিন্তা। এদিকে হাজ্জ মৌসুমও এগিয়ে আসছে। ক'দিন পরই সারা আরব উপদ্বীপ থেকে দলে দলে লোক হাজির হবে মক্কায়। যদি মুসলিমরা তাদের পেয়ে বসে? যদি তাদের ইসলামের দাওয়াত দেয়? ধর্মীয় তীর্থস্থানে একটি প্রতিদ্বন্দ্বী ধর্মের উত্থানের খবর যদি আরববাসীদের কানে যায়, কুরাইশদের মান-সম্মান কিছু থাকবে? তাই একটি প্রতিনিধিদল পরামর্শ চাইতে গেল ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরার নিকট। সে ছিল তাদের সবচেয়ে প্রবীণ ও সম্মানিত ব্যক্তি।
সে বলল, “কুরাইশের লোকেরা, শুনুন! হাজ্জের দিনক্ষণ এগিয়ে আসছে। বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষজন তোমাদের এখানে আসবে। অনেকেই ইতিমধ্যে মুহাম্মাদের ব্যাপারে শুনেছে। তাই ওর ব্যাপারে আমরা অতিথিদের কাছে কী বলব, তা আগেই ঠিক করে নিন। নাহলে পরে একেকজনে একেক কথা বললে লজ্জায় মাথা কাটা যাবে।”
সবাই বলল, “তাহলে আপনিই কিছু একটা ঠিক করে দিন।”
“না, সেটা ঠিক আছে। কিন্তু আপনারা পরামর্শ দিন, আগে সেগুলো শুনি।”
তারা বলল, "আচ্ছা! আমরা বলব, সে একজন গণক।”
ওয়ালীদ বলল, “না। সে তো গণক নয়। আমরা গণকদের দেখেছি। সে না ওদের মতো কথা বলে, না ওদের মতো ছন্দ বলে।”
তারা বলল, "উন্মাদ বললে কেমন হয়?"
ওয়ালীদ বলল, “না, তাও হবে না। পাগল-ছাগলের কাজকারবার তো আমরা জানিই। মুহাম্মাদের আচরণ, চাল-চলন কিংবা কথাবার্তা কিছুতেই পাগলামি নেই।”
তারা বলল, “তাহলে কবি বলে চালিয়ে দিই?”
ওয়ালীদ বলল, “কিন্তু সে তো কবিও না! কবিতার যত শত প্রকার রয়েছে তার সবই আপনারা খুব ভালো করেই জানেন। আর ওর কথাবার্তাও কোনও ধরনের কবিতার সাথে মেলে না। সুতরাং তাকে কবিও বলা যাবে না।”
কুরাইশরা বলল, “আচ্ছা, জাদুকর? জাদুকর তো বলা যায়, নাকি?”
ওয়ালীদ বলল, “সে জাদুকরও না। জাদু আর জাদুকরদের আমরা অনেক দেখেছি, তাদের খুঁটিনাটি সবই জানা। সে ওইসব তুকতাক-তন্ত্রমন্ত্র কিছুই করে না।”
“তাহলে বলবটা কী?” কুরাইশদের কণ্ঠে হতাশার সুর।
ওয়ালীদ কিছুক্ষণ ভাবল। ভেবে বলল, "আল্লাহর কসম! ওর কথাগুলো কিন্তু দারুণ সুন্দর, পরিষ্কার আর আকর্ষণীয়। যেন দৃঢ় শেকড় আর ফলবান শাখাওয়ালা গাছ! তাই যে অভিযোগই করুন না কেন, কিছুই ধোপে টিকবে না। তবে আমার মতে, যেটা বললে সবচেয়ে ভালো হয়, তা হলো জাদুকর। বলবে যে, ওর কথা শুনে পিতার সাথে পুত্রের, ভাইয়ের সাথে ভাইয়ের, স্বামীর সাথে স্ত্রীর বিভেদ তৈরি হয়। একে অপরের শত্রুতে পরিণত হয়। ওর ষড়যন্ত্রে আজ পরিবারগুলোতে ভাঙন ধরেছে।”
প্রোপাগান্ডার এই রূপরেখার ব্যাপারে একমত হয়ে কুরাইশরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে গেল। হাজীদের আসার পথগুলোতে দাঁড়িয়ে থেকে প্রতিটা পথচারীকে নবিজি ﷺ-এর ব্যাপারে সতর্ক করতে লাগল। তাদের প্রোপাগান্ডা অব্যাহত রাখল। ফলে হিতে বিপরীত হলো। অবস্থা এমন দাঁড়াল যে, রাসূলুল্লাহ-কে না দেখেই সবাই তাঁর ব্যাপারে কৌতূহল বোধ করতে শুরু করে।[৫২]
অবশেষে চলে এল সেই কাঙ্ক্ষিত সময়। নবিজি-ও প্রস্তুত হলেন হাজীদের কাছে দাওয়াত পৌঁছাতে। তাদের তাঁবুতে গিয়ে গিয়ে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া আরম্ভ করলেন তিনি। সবাইকে বলতেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ قُوْلُوْا لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ تُفْلِحُوا
“হে লোকসকল, বলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, সফল হয়ে যাবে।”[৫৩]
আবু লাহাব এ-সময় আরেকটা কাজ করত। মুহাম্মাদ ﷺ-এর পেছন পেছন হাঁটতে থাকত এবং তাঁর ব্যাপারে নানারকম কুকথা বলত। তাঁকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করত এবং নানা উপায়ে কষ্ট দিত, অত্যাচার করত।[৫৪]
ওই বছর হাজীরা ফিরে যাওয়ার পর দেখা গেল পুরো আরব ভূখণ্ডেই মুহাম্মাদ ﷺ-এর ব্যাপারে আলোচনা হচ্ছে। তাঁর ব্যাপারে সবাই জেনে যাচ্ছে। তাঁর নিজের কর্মতৎপরতার ভূমিকা যেমন আছে, তেমনি তাঁর বিরোধীদের ভূমিকাও এতে কম নয়।

টিকাঃ
[৫২] বাইহাকি, দালাইলুন নুবুওয়াহ, ২/১৯৮; ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/২৭১।
[৫৩] ইবনু হিব্বান, ৬৫৬২, সহীহ।
[৫৪] আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৩/৪৯২; ইবনু কাসীর, আল-বিদায়া, ৫/১৯৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00