📄 আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি ইসলামের দাওয়াত
নবি মিশনের প্রথম তিন বছর ছিল ব্যক্তিপর্যায়-কেন্দ্রিক। কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্রের গুরুত্বপূর্ণ কিছু মানুষও ইসলাম গ্রহণ করেন। তবে সংখ্যায় তাঁরা ছিলেন একেবারেই হাতেগোনা। এবার আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলকে আদেশ দিলেন-জ্ঞাতি-আত্মীয়দের মূর্তিপূজার ব্যাপারে সতর্ক করতে। দাওয়াত কবুলকারীদের সাথে সম্পর্ক রক্ষা এবং প্রত্যাখ্যানকারীদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ ﴿٢١٤﴾ وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِمَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ ﴿٢١٥﴾ فَإِنْ عَصَوْكَ فَقُلْ إِنِّي بَرِيءٌ مِّمَّا تَعْمَلُونَ ﴿٢١٦﴾
“আপনি নিকটতম আত্মীয়দের সতর্ক করুন এবং আপনার অনুসারী মুমিনদের প্রতি সদয় হোন। যদি তারা আপনার অবাধ্যতা করে, তাহলে বলে দিন, তোমরা যা করো তা থেকে আমি সম্পূর্ণ মুক্ত।”[৪৬]
এ আদেশ পাওয়ার পর নবি তাঁর নিকটতম জ্ঞাতিবংশ বানু হাশিমকে এক জায়গায় জড়ো করেন। বানুল মুত্তালিবের কিছু মানুষও তার মধ্যে ছিলেন। তাদের উদ্দেশ্যে তিনি একটি সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। এর শুরুতেই ছিল আল্লাহ তাআলার প্রশংসা, বড়ত্ব ও তাঁর একত্বের ঘোষণা। তারপর তিনি বলেন,
“আল্লাহর শপথ! যিনি ছাড়া কোনও ইলাহ নেই। আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে বার্তাবাহক। বিশেষ করে আপনাদের প্রতি এবং সাধারণভাবে সমগ্র মানবজাতির প্রতি আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে।
আল্লাহর শপথ! রাতে যেভাবে ঘুমান, ঠিক সেভাবেই একদিন আপনারা মারা যাবেন। আর সকালে যেভাবে জেগে ওঠেন, ঠিক সেভাবেই আপনাদের আবার পুনরুত্থিত করা হবে। তারপর আপনাদের সব কাজের হিসেব-নিকেশ হবে। ভালো কাজের ভালো প্রতিদান, মন্দ কাজের মন্দ প্রতিদান। তারপর চিরদিনের জন্য জান্নাত কিংবা জাহান্নাম।"
বক্তব্য শুনে সবার অন্তর প্রশান্ত হলো। তারা পরস্পর আস্তে আস্তে নরম স্বরে কথা বলছিল। কিন্তু হঠাৎ তাঁর চাচা আবু লাহাব বলে উঠল, “আরে এ তো দেখছি সারা আরব জাহানকে ক্ষেপিয়ে তুলবে! কেউ থামাও ওকে! পরে একূল-ওকূল সবই হারাবে। ওদের হাতে একে তুলে দিলে সে তো অপমানিত হবেই। আর তাকে বাঁচাতে গেলে সবাই ওদের হাতে মারা পড়বে।”
কিন্তু নবিজির আরেক চাচা আবূ তালিব বলেছেন, “কী যা-তা বলছ? আল্লাহর কসম! বেঁচে থাকা পর্যন্ত আমরা ওকে রক্ষা করে যাব।” তারপর ভাতিজার দিকে ফিরে বলেন, “তুমি তোমার কাজ করে যাও। আল্লাহর কসম! আমি সব সময় তোমার পাশে আছি। তবে আমার মন চায় না যে, আমি আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম ত্যাগ করি।”[৪৭]
টিকাঃ
[৪৬] সূরা শুআরা, ২৬: ২১৪-২১৬।
[৪৭] ইবনুল আসীর, আল-কামিল, ১/৫৮৪-৫৮৫।
📄 সাফা পাহাড়ের চূড়ায়
ওই দিনগুলোতে আল্লাহ তাআলা নাযিল করলেন,
فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ ﴿٤٩﴾
"আপনাকে যে আদেশ দেওয়া হয়েছে তা প্রকাশ্যে ঘোষণা করুন এবং মুশরিকদের পরোয়া করবেন না।”[৪৮]
এই হুকুম পাওয়ার পর প্রকাশ্য প্রচারকাজের অংশ হিসেবে রাসূলুল্লাহ ﷺ একদিন সাফা পাহাড়ের চূড়ায় উঠে দাঁড়ান। এটি কা'বার কাছেই অবস্থিত একটি ছোট পাথুরে পাহাড়। সবচেয়ে উঁচু পাথরে দাঁড়িয়ে উঁচু আওয়াজে বলেন, "ইয়া সাবাহা!”
সাধারণত কোনও আসন্ন বিপদের খবর জানান দিতে এমনটা করা হতো। যেমন, আশপাশ থেকে কোনও সৈন্যদলকে আক্রমণে আসতে দেখা গেলে কেউ একজন পাহাড়ে উঠে "ইয়া সাবাহা!” বলে এলাকাবাসীদের জানান দিত। নবিজি ﷺ-ও মক্কাবাসীদের কোনও এক মহাবিপদের সংবাদ দিতে চলেছেন। প্রতিটি পরিবারকে তিনি নাম ধরে ডাকতে লাগলেন, “হে বানী ফিহর! হে বানী আদি! হে বানী অমুক! হে বানী আবদি মানাফ! হে বানী আবদিল মুত্তালিব...!”
ডাক শুনে একেকটি বংশ-পরিবারের লোকেরা ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে এল। যারা আসতে পারছিল না, তারা তাদের পক্ষ থেকে অন্য কাউকে পাঠিয়ে দিল।
সবাই জড়ো হলে নবি বললেন, “যদি বলি এই উপত্যকার পেছন থেকে একদল সৈনিক ঘোড়া ছুটিয়ে আপনাদের আক্রমণ করতে আসছে, তাহলে কি আপনারা আমাকে বিশ্বাস করবেন?”
প্রশ্ন শুনে একটু অবাক হলেও তারা জবাব দিল, “হ্যাঁ, অবশ্যই। আমরা তো আপনাকে কখনও মিথ্যা বলতে শুনিনি। সব সময় সত্যবাদী হিসেবেই পেয়েছি।”
“তাহলে শুনুন। এক মহাশাস্তি আসার পূর্বেই আমি আপনাদের সাবধান করতে এসেছি। আমার এবং আপনাদের মাঝে উপমা হলো সেই ব্যক্তির মতো, যে শত্রুপক্ষকে দেখতে পেয়ে তাড়াতাড়ি নিজ সম্প্রদায়কে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে দৌড় দিয়েছে। কিন্তু আশঙ্কা করছে যে, তার আগেই শত্রুরা পৌঁছে যাবে, ফলে সে চিৎকার করে বলতে লাগল, ইয়া সাবাহা! ইয়া সাবাহা!”
এই স্পষ্ট রূপক কথার পর নবি তাদের "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” এর সাক্ষ্য (শাহাদাহ) দিতে বলেন। বুঝিয়ে বলেন যে, ইহকাল ও পরকালে এটিই মুক্তির একমাত্র পথ। এই বার্তা প্রত্যাখ্যান করে মূর্তিপূজা আঁকড়ে ধরে থাকলে যে আল্লাহ শাস্তি দেবেন, স্বয়ং নবিও যে তাদের বাঁচাতে পারবেন না, সবকিছু বিস্তারিতভাবে বলে দেন।
এরপর নাম ধরে ধরে প্রত্যেককে সতর্ক করে আহ্বান করেন,
“হে কুরাইশ, আল্লাহর কাছ থেকে মুক্তিপণ দিয়ে নিজেদের ছাড়িয়ে নিন। নিজেদের জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচান। আমি আপনাদের লাভ কিংবা ক্ষতি কিছুরই মালিক নই। আল্লাহর কাছ থেকে আপনাদের বাঁচাতেও পারব না।
হে কা'ব ইবনু লুয়াই পরিবার, জাহান্নাম থেকে নিজেদের বাঁচান! আমি আপনাদের লাভ কিংবা ক্ষতি কিছুরই করার অধিকার রাখি না।
হে বানী মুররা ইবনি কা'ব, নিজেদের জাহান্নাম থেকে বাঁচান।
হে বানী কুসাই সম্প্রদায়, নিজেদের জাহান্নাম থেকে বাঁচান। আমি আপনাদের লাভ কিংবা ক্ষতি কিছুরই মালিক নই।
হে বানী আবদি শামস্, নিজেদের জাহান্নাম থেকে বাঁচান।
হে বানী আবদি মানাফ, নিজেদের জাহান্নাম থেকে বাঁচান। আমি আপনাদের লাভ কিংবা ক্ষতি কিছুরই মালিক নই।
হে বানী হাশিম, জাহান্নাম থেকে বাঁচুন।
ওহে বানী আবদিল মুত্তালিব, নিজ দায়িত্বে জাহান্নাম থেকে বাঁচুন। আমি না আপনাদের কোনও লাভ-ক্ষতি করার কেউ, আর না আল্লাহর কাছ থেকে বাঁচানোর কেউ। আমার সম্পত্তি থেকে যা চান, নিয়ে যান। কিন্তু আল্লাহর শাস্তি থেকে আপনাদের বাঁচানোর কোনও ক্ষমতা আমার নেই।
হে আব্বাস ইবনু আবদিল মুত্তালিব, রাসূলের চাচা, আল্লাহর কাছ থেকে কিন্তু আপনাকে আমি বাঁচাতে পারব না।
হে সফিয়্যা বিনতু আবদিল মুত্তালিব, রাসূলের ফুপু, আল্লাহর কাছ থেকে আমি আপনাকে বাঁচাতে পারব না।
হে ফাতিমা বিনতু মুহাম্মাদ, আমার সম্পত্তি যা চাও, নিয়ে নাও। তবু জাহান্নাম থেকে বাঁচো। আল্লাহর কাছ থেকে আমি তোমায় বাঁচাতে পারব না।
তবে হ্যাঁ, আপনাদের সবার সাথে আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে, অবশ্যই আমি এর হক যথাযথ আদায় করব।"
নবিজি ﷺ-এর এই সতর্কবাণী শোনা শেষে সবাই আস্তে আস্তে ফিরে চলল। সবাই এদিক-সেদিক বিক্ষিপ্ত হয়ে গেল। কেউ সমর্থন বা বিরোধিতা করেছে বলে জানা যায় না। তবে আবু লাহাব জঘন্য আচরণ করে বলেছিল, “ধ্বংস হয়ে যাও তুমি! এসব বলার জন্যই কি তুমি আমাদের জমা করেছিলে?”
এর প্রত্যুত্তরে আল্লাহ তাআলা একটি সূরা অবতীর্ণ করলেন,
تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ (১) مَا أَغْنَى عَنْهُ مَالُهُ وَمَا كَسَبَ ﴿٢﴾ سَيَصْلَى نَارًا ذَاتَ لهب (٣) وَامْرَأَتُهُ حَمَّالَةَ الْخَطَبِ ﴿٤﴾ فِي جِيْدِهَا حَبْلٌ مِّن مَّسَدٍ ﴿٥﴾
"আবু লাহাবের দু-হাত ধ্বংস হোক এবং ধ্বংস হোক সে নিজে। তার ধন-সম্পদ এবং যা কিছু সে উপার্জন করেছে তা তার কোনও কাজে আসেনি। অচিরেই সে দগ্ধ হবে লেলিহান আগুনে। এবং তার স্ত্রীও-যে ইন্ধন বহন করে, তার গলদেশে খর্জরের রশি নিয়ে।”[৪৯]
আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিয়েছেন যে, মুহাম্মাদ ﷺ ধ্বংস হবে না; বরং ধ্বংস হবে আবূ লাহাব নিজে, তার স্ত্রী, তার ধন-সম্পদ সবই এবং তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম। [৫০]
সাধারণ লোকজন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বক্তব্য শুনে পেরেশান হয়ে গেল। কী করবে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না। কিন্তু ঘরে ফিরে নিজেরা আলাপ-আলোচনা করার পর অহংকার তাদের পেয়ে বসল, তারা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সতর্কবার্তার প্রতি নাক সিটকান আরম্ভ করল। নবিজি বড় কারও পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সে ঠাট্টা করে বলত, “দেখো, একেই রাসূল বানিয়ে দেওয়া হয়েছে!? আবূ কাবশার এই নাতির কাছে আসমান থেকে সম্বোধন করা হয়!”
আবূ কাবশা নবিজি ﷺ-এর মায়ের দিকের একজন পূর্বপুরুষ। কুরাইশদের পৌত্তলিক ধর্ম ছেড়ে তিনি ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর দ্বীন গ্রহণ করেছিলেন। তাদের ধারণা অনুসারে সে পথভ্রষ্ট হয়েছিল। তাই মুহাম্মাদ যখন তাদের থেকে আলাদা এক ধর্মের কথা প্রচার করলেন তখন তারা অবজ্ঞা ও অপমান করার উদ্দেশ্যে নবি ﷺ-কে আবূ কাবশার দিকে সম্পৃক্ত করে সম্বোধন করতেন। রাসূল ﷺ-কেও তার মতো পথভ্রষ্ট মনে করতেন।
স্বগোত্রীয়দের বিদ্রুপ ও শত্রুতা সত্ত্বেও নবি তাঁর মিশনে অবিচল থাকেন। সভা- সমাবেশ, মাহফিল কিংবা মাজলিস সেখানে যাকে পেতেন ইসলামের দাওয়াত দিতেন। কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করে সেই একই বার্তা দিতেন, যুগে যুগে যা দিয়ে গেছেন আগেকার নবি-রাসূলগণ। তিনি বলতেন,
يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِّنْ إِلَهِ غَيْرُهُ “হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত করো। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোনও মা'বুদ নেই।”[৫১]
এর সাথে সাথে নবি সবার চোখের সামনেই প্রকাশ্যে আল্লাহ তাআলার ইবাদাত শুরু করে দেন। কা'বা প্রাঙ্গণে দিন-দুপুরে সালাত আদায়ও শুরু করেন। ধীরে ধীরে সফলতা পেতে থাকে তাঁর দাওয়াত। একের পর এক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। সেই সাথে মুমিন-কাফিরে বাড়তে থাকে ফাটল। তৈরি হয় বৈরিতা। এমনকি একই পরিবারের সদস্যদের মাঝেও শত্রুতা দানা বাঁধে। পরিবার, গোত্র, সংস্কৃতির মতো মহাপবিত্র বন্ধনের চেয়ে ইসলাম ধর্মকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার এই ক্ষমার অযোগ্য পাপ (!) ক্রমেই কুরাইশদের রাগ বাড়িয়ে দিতে থাকে।
টিকাঃ
[৪৮] সূরা হিজর, ১৫:৯৪।
[৪৯] সূরা লাহাব, ১১১:১-৫।
[৫০] বুখারি, ৪৭৭০; মুসলিম, ২০৮; ইবনু হিব্বান, ৬৫৫০; তিরমিযি, ৩১৮৪।
[৫১] সূরা আ'রাফ, ০৭:৮৫।
📄 হাজীদের ভুল বোঝাতে কুরাইশদের বৈঠক
মুসলিমদের সংখ্যাবৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়তে থাকে কুরাইশদের দুশ্চিন্তা। এদিকে হাজ্জ মৌসুমও এগিয়ে আসছে। ক'দিন পরই সারা আরব উপদ্বীপ থেকে দলে দলে লোক হাজির হবে মক্কায়। যদি মুসলিমরা তাদের পেয়ে বসে? যদি তাদের ইসলামের দাওয়াত দেয়? ধর্মীয় তীর্থস্থানে একটি প্রতিদ্বন্দ্বী ধর্মের উত্থানের খবর যদি আরববাসীদের কানে যায়, কুরাইশদের মান-সম্মান কিছু থাকবে? তাই একটি প্রতিনিধিদল পরামর্শ চাইতে গেল ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরার নিকট। সে ছিল তাদের সবচেয়ে প্রবীণ ও সম্মানিত ব্যক্তি।
সে বলল, “কুরাইশের লোকেরা, শুনুন! হাজ্জের দিনক্ষণ এগিয়ে আসছে। বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষজন তোমাদের এখানে আসবে। অনেকেই ইতিমধ্যে মুহাম্মাদের ব্যাপারে শুনেছে। তাই ওর ব্যাপারে আমরা অতিথিদের কাছে কী বলব, তা আগেই ঠিক করে নিন। নাহলে পরে একেকজনে একেক কথা বললে লজ্জায় মাথা কাটা যাবে।”
সবাই বলল, “তাহলে আপনিই কিছু একটা ঠিক করে দিন।”
“না, সেটা ঠিক আছে। কিন্তু আপনারা পরামর্শ দিন, আগে সেগুলো শুনি।”
তারা বলল, "আচ্ছা! আমরা বলব, সে একজন গণক।”
ওয়ালীদ বলল, “না। সে তো গণক নয়। আমরা গণকদের দেখেছি। সে না ওদের মতো কথা বলে, না ওদের মতো ছন্দ বলে।”
তারা বলল, "উন্মাদ বললে কেমন হয়?"
ওয়ালীদ বলল, “না, তাও হবে না। পাগল-ছাগলের কাজকারবার তো আমরা জানিই। মুহাম্মাদের আচরণ, চাল-চলন কিংবা কথাবার্তা কিছুতেই পাগলামি নেই।”
তারা বলল, “তাহলে কবি বলে চালিয়ে দিই?”
ওয়ালীদ বলল, “কিন্তু সে তো কবিও না! কবিতার যত শত প্রকার রয়েছে তার সবই আপনারা খুব ভালো করেই জানেন। আর ওর কথাবার্তাও কোনও ধরনের কবিতার সাথে মেলে না। সুতরাং তাকে কবিও বলা যাবে না।”
কুরাইশরা বলল, “আচ্ছা, জাদুকর? জাদুকর তো বলা যায়, নাকি?”
ওয়ালীদ বলল, “সে জাদুকরও না। জাদু আর জাদুকরদের আমরা অনেক দেখেছি, তাদের খুঁটিনাটি সবই জানা। সে ওইসব তুকতাক-তন্ত্রমন্ত্র কিছুই করে না।”
“তাহলে বলবটা কী?” কুরাইশদের কণ্ঠে হতাশার সুর।
ওয়ালীদ কিছুক্ষণ ভাবল। ভেবে বলল, "আল্লাহর কসম! ওর কথাগুলো কিন্তু দারুণ সুন্দর, পরিষ্কার আর আকর্ষণীয়। যেন দৃঢ় শেকড় আর ফলবান শাখাওয়ালা গাছ! তাই যে অভিযোগই করুন না কেন, কিছুই ধোপে টিকবে না। তবে আমার মতে, যেটা বললে সবচেয়ে ভালো হয়, তা হলো জাদুকর। বলবে যে, ওর কথা শুনে পিতার সাথে পুত্রের, ভাইয়ের সাথে ভাইয়ের, স্বামীর সাথে স্ত্রীর বিভেদ তৈরি হয়। একে অপরের শত্রুতে পরিণত হয়। ওর ষড়যন্ত্রে আজ পরিবারগুলোতে ভাঙন ধরেছে।”
প্রোপাগান্ডার এই রূপরেখার ব্যাপারে একমত হয়ে কুরাইশরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে গেল। হাজীদের আসার পথগুলোতে দাঁড়িয়ে থেকে প্রতিটা পথচারীকে নবিজি ﷺ-এর ব্যাপারে সতর্ক করতে লাগল। তাদের প্রোপাগান্ডা অব্যাহত রাখল। ফলে হিতে বিপরীত হলো। অবস্থা এমন দাঁড়াল যে, রাসূলুল্লাহ-কে না দেখেই সবাই তাঁর ব্যাপারে কৌতূহল বোধ করতে শুরু করে।[৫২]
অবশেষে চলে এল সেই কাঙ্ক্ষিত সময়। নবিজি-ও প্রস্তুত হলেন হাজীদের কাছে দাওয়াত পৌঁছাতে। তাদের তাঁবুতে গিয়ে গিয়ে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া আরম্ভ করলেন তিনি। সবাইকে বলতেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ قُوْلُوْا لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ تُفْلِحُوا
“হে লোকসকল, বলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, সফল হয়ে যাবে।”[৫৩]
আবু লাহাব এ-সময় আরেকটা কাজ করত। মুহাম্মাদ ﷺ-এর পেছন পেছন হাঁটতে থাকত এবং তাঁর ব্যাপারে নানারকম কুকথা বলত। তাঁকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করত এবং নানা উপায়ে কষ্ট দিত, অত্যাচার করত।[৫৪]
ওই বছর হাজীরা ফিরে যাওয়ার পর দেখা গেল পুরো আরব ভূখণ্ডেই মুহাম্মাদ ﷺ-এর ব্যাপারে আলোচনা হচ্ছে। তাঁর ব্যাপারে সবাই জেনে যাচ্ছে। তাঁর নিজের কর্মতৎপরতার ভূমিকা যেমন আছে, তেমনি তাঁর বিরোধীদের ভূমিকাও এতে কম নয়।
টিকাঃ
[৫২] বাইহাকি, দালাইলুন নুবুওয়াহ, ২/১৯৮; ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/২৭১।
[৫৩] ইবনু হিব্বান, ৬৫৬২, সহীহ।
[৫৪] আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৩/৪৯২; ইবনু কাসীর, আল-বিদায়া, ৫/১৯৮।