📄 ঈমানদারদের ইবাদাত ও প্রশিক্ষণ
সূরা মুদ্দাসসিরের নির্দেশনাগুলো শুধু নবিজি ﷺ-এর জন্যই ছিল না; বরং সকল মুমিনের জন্য। এ আয়াতগুলোতে জীবনযাপনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু মূলনীতি দেওয়া হয়। এ নিয়মগুলো আজও সকল মুসলিমের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। সূরা মুদ্দাসসির অবতীর্ণ হওয়ার পর ওহি ধারাবাহিকভাবে আসতে শুরু করে। এর পরই নাযিল হয় সূরা ফাতিহা। আল্লাহর স্তুতি বর্ণনা ও প্রার্থনা করার বেশ কিছু নিয়ম ও পদ্ধতি আলোচিত হয়েছে এখানে। আরও জানা যায় দুনিয়া ও আখিরাতে সকল কাজের প্রতিদান পাওয়ার বিষয়টিও।
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাসের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হওয়ার পর তার ওপর গড়ে তুলতে বলা হয় ইবাদাতের দালান। রিসালাত-প্রাপ্তির পর সর্বপ্রথম যে আমলের নির্দেশ আসে, তা হলো সালাত। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) নবিজি ﷺ-কে ওজু করার এবং সালাত আদায়ের নিয়ম শেখান। তারপর সকালে ও সন্ধ্যায় দু-রাকাআত করে সালাত পড়ার আদেশ করেন। [৪৪]
ওজু যেহেতু সালাতের পূর্বশর্ত, তাই পবিত্রতা হয়ে যায় মুমিনের চিহ্ন। সূরা ফাতিহাকে সালাতের আসল এবং হাম্দ ও তাস্বীহকে সালাতের অন্যান্য যিক্ হিসাবে সাব্যস্ত করা হয়। প্রতিটি নড়াচড়ার মাঝে থাকে আল্লাহ তাআলার মহিমা ও বড়ত্বের ঘোষণা। ঈমানের এই প্রধান অবলম্বনকে মুশরিকদের পূতিগন্ধ ও অত্যাচার থেকে মুক্ত রাখতে মুমিনরা তখন সালাত আদায় করতেন গিরি-উপত্যকার মতো নির্জন স্থানে। কখনও গোপন কোনও ঘাঁটি নির্বাচন করতেন সালাত আদায়ের জন্য। [৪৫]
ইসলামের প্রাথমিক সময়টাতে সালাত ছাড়া অন্য কোনও ইবাদাত কিংবা আদেশ- নিষেধ ছিল না। এ সময়ে নাযিল হওয়া ওহির মূল বক্তব্য ছিল ঈমানের বিভিন্ন বিষয় এবং তাওহীদ। সাহাবিদের মাঝে এ-সকল আয়াত আত্মশুদ্ধি ও নৈতিকতাবোধ জাগ্রত করে। জান্নাত-জাহান্নামের স্পষ্ট বর্ণনাও দেওয়া হয়। জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব, আখিরাতের চিরস্থায়িত্ব, চিরশান্তি ও চিরশাস্তির কথা বিধৃত হয় সুসংবাদ ও সতর্কবাণীর আকারে।
নবি তাঁর প্রতি নাযিল হওয়া আয়াতগুলোর অর্থ অনুসারীদের শিখিয়ে দিতেন। আর এ নির্দেশনাগুলোর নিখুঁত বাস্তব রূপ দেখিয়ে দিতেন নিজে পালন করার মাধ্যমে। অবিশ্বাসের অন্ধকার থেকে তাঁদের নিয়ে চলেন ঈমানের আলোতে, দেখিয়ে দেন সরল পথ, আর খুব আন্তরিকভাবে নসীহত করেন আল্লাহর দ্বীনকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরতে। আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছু থেকে দূরে থাকতে। মুখ ফিরিয়ে নিতে।
তখনো নবিজি প্রকাশ্যে দাওয়াত দেওয়া শুরু করেননি। কিন্তু কুরাইশরা তাঁর কর্মতৎপরতা আঁচ করতে পারে। কয়েকজন মুমিন প্রকাশ্যে তাঁদের নতুন দ্বীন পালন করতেন। কুরাইশরা তাদের বিদ্রূপ করতেন এবং বাধাও দিতেন, তবে তা ছিল একেবারে সামান্য। প্রথমদিকে তারা খুব একটা পাত্তা দেয়নি এই অল্প অল্প সামাজিক পরিবর্তনকে। রাসূল ﷺ-ও তখন তাদের বা তাদের উপাস্যদের কোনও বিরোধিতা করেননি এবং তাদের ব্যাপারে কোনও কথা বলেননি।
টিকাঃ
[৪৪] শাইখ আবদুল্লাহ, মুখতাসারুস-সীরাহ, ৮৮।
[৪৫] আবূ দাউদ, আল-মুসনাদ, ১৮৪; ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/২৪৭।
📄 গোত্রে গোত্রে ইসলামের দাওয়াত
প্রতি বছর আরবের তিন জায়গায় তিনটি বিরাট মেলা বসত-উকায, মাজিন্না ও যুল মাজায। সারা আরব থেকে মানুষের ঢল নামত এ জায়গাগুলোতে। নাখলা ও তায়িফের মাঝখানে অবস্থিত উকায গ্রাম। যুল-কা'দা মাসের বিশ দিন জুড়ে সেখানে মেলা চলত। তারপর সেখান থেকে লোকজন চলে যেত মাজিন্নায়। বসাত বাহারি পণ্যের দোকান। যুল-কা'দের বাকি দশদিন সেখানে মেলা থাকত। মাজিন্না হলো মক্কা থেকে একটু নিচে মাররুয যাহরান উপত্যকায়। আরাফার ময়দানে জাবালে রহমতের পেছনেই অবস্থিত যুল মাজায। যুল-হিজ্জাহ মাসের প্রথম আট দিন সেখানকার মেলায় হতো রমরমা বেচাকেনা আর অসংখ্য মানুষের ভিড়। ওখান থেকেই পরে লোকজন এসে হাজ্জের আনুষ্ঠানিকতা আরম্ভ করত।
মক্কার বাইরের বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে ইসলামের দাওয়াহ পৌঁছানোর জন্য এ সময়টি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ। একে একে ইসলামের আহ্বান শুনতে পায় বানু আমির ইবনু সা'সাআ, বানু মুহারিব, বানু ফাযারা, গাসসান ও মুররা, বান্ হানীফা, বানু সুলাইম, বানু আক্স, বান্ নাসর, বানুল বুকা, কিন্দা ও কাল্ব, বানুল হারিস ইবনি কা'ব, উযরা এবং হাদারামা। এই গোত্রগুলোর কোনওটিই নবিজি ﷺ-এর আহ্বানে সাড়া দেয়নি। [২১০] কিন্তু এদের একেকটির জবাব ছিল একেক ধরনের। কেউ বিনীতভাবে নাকচ করে। কেউ ক্ষমতার গন্ধ পেয়ে বায়না ধরে যে, নবিজির মৃত্যুর পর যেন তাদের এ কাজের উত্তরসূরি বানিয়ে দেওয়া হয়। কেউ কেউ অজুহাত দেয় যে, রাসূলুল্লাহর স্বগোত্রীয় ও আত্মীয়দের বেশির ভাগই তো তাঁর ডাকে সাড়া দেয়নি। আবার কেউ কেউ সরাসরি অপমান করে বসে। বিশেষ করে বানূ হানীফার আচরণ ছিল মাত্রাতিরিক্ত কুৎসিত। পরে একসময় নিজেকে নবি বলে দাবি করা মিথ্যুক মুসাইলিমা এ গোত্রেরই সদস্য ছিল। [২১১]
টিকাঃ
[২১০] ইবনু সা'দ, তবাকাত, ১/২১৬।
[২১১] ইবনু হিশাম, ১/৪২৪-৪২৫।