📄 নবিজির কর্মজীবন
মুহাম্মাদ ইয়াতীম হয়ে জন্মগ্রহণ করেছেন। প্রথমে আপন দাদা পরে চাচার অধীনে লালিত-পালিত হয়েছেন। পিতার নিকট থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে অল্প কিছু সম্পদ পেয়েছিলেন, যা দিয়ে তেমন কিছুই করার উপযোগী ছিল না। এই কারণে তিনি যখন হালকা-পাতলা কাজ করার উপযুক্ত হন তখন থেকে তাঁর দুধভাইদের সাথে বান্ সা'দের ছাগল চরাতেন।[২৩]
মক্কায় ফিরে আসার পরও মাত্র কয়েক কীরাতের [২৪] বিনিময়ে মক্কাবাসীর ছাগলের রাখালি করতেন।[২৫]
শুরু-জীবনে বকরি চরানো আম্বিয়া (আলাইহিমুস সালাম)-দের সুন্নাত। এই রাখালগিরি কিন্তু যেনতেন কোনও কাজ নয়। নবিজীবনে এই পেশার রয়েছে সুদূরপ্রসারী প্রভাব। নুবুওয়াত প্রাপ্তির পর মুহাম্মাদ বলেছেন, وَهَلْ مِنْ نَبِيَّ إِلَّا رَعَاهَا "প্রত্যেক নবিই বকরি বা ভেড়া চরিয়েছেন।”[২৬]
যখন যৌবনে পদার্পণ করেন তখন তিনি নিজেকে ব্যবসায়িক কাজে নিযুক্ত করেন। কিছু কিছু বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে যে, রাসূল সাইব ইবনু আবী সাইবের সাথে মিলে ব্যবসা করতেন। নবিজি ছিলেন সর্বোত্তম ও বিনম্র পার্টনার। কখনও বাদানুবাদ কিংবা ঝগড়া করতেন না।[২৭] লেনদেনসহ সমস্ত কাজে বিশ্বস্ততা ও সততা ছিল তাঁর আমরণ সঙ্গী। এই কারণেই সবার মুখে মুখে তিনি “আল-আমীন” (অতি বিশ্বস্ত) বলে পরিচিত ও প্রসিদ্ধ হয়ে যান।
টিকাঃ
[২৩] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/১৬৬।
[২৪] কীরাত হলো এক দীনারের বিশ ভাগের এক ভাগ বা চব্বিশ ভাগের এক ভাগ, যার মূল্য বর্তমানে সর্বোচ্চ ৮০-৯০ রুপিয়া (১০০-১১০ টাকা)।
[২৫] বুখারি, ২২৬২।
[২৬] বুখারি, ৫৪৫৩।
[২৭] আবূ দাউদ, ৪৮৩৬; ইবনু মাজাহ, ২২৮৭; আহমাদ, ৩/৪২৫।
📄 সিরিয়ায় ব্যবসা-যাত্রা
বিশ্বস্ত কর্মী সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ব্যবসায়ীদের। যাতে তাদের সম্পদের যথাযথ সংরক্ষণ হয়। এমনই এক ব্যবসায়ী ছিলেন কুরাইশ গোত্রের সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত ও ধনী নারী খাদীজা বিনতু খুয়াইলিদ। লোক ভাড়া করে তিনি তাদের দিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহন ও বিক্রি করাতেন। মুহাম্মাদ ﷺ-এর বিশ্বস্ততার সুনাম শোনার পর খাদীজা কালবিলম্ব না করে তাঁকে কাজে নিয়ে নেন। ফলে যুবক মুহাম্মাদ ব্যবসায়িক মালামাল নিয়ে সিরিয়া গমন করেন। সাথে থাকে খাদীজার একজন দাস মাইসারা।
অসাধারণ সাফল্যমণ্ডিত এক সফর শেষে মক্কায় ফেরেন মুহাম্মাদ। এ-সময় ব্যবসায় প্রচুর লাভ হয় এবং সম্পদে এত বরকত হয় যে ইতিপূর্বে কখনও এমন হয়নি। মক্কায় এসে খাদীজার হাতে তুলে দেন বিপুল পরিমাণ মুনাফা।[২৮]
টিকাঃ
[২৮] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/১৮৭-১৮৮।
📄 খাদীজার সাথে বিবাহ
ইতিমধ্যে খাদীজার দু'জন স্বামী মৃত্যুবরণ করেছে। বর্তমানে তিনি স্বামীহীন, বিধবা। প্রথম স্বামীর নাম আতীক ইবনু আয়িয মাখযূমি। তার মৃত্যুর পর বিবাহ করেন আবূ হালা তাইমিকে। আবূ হালার ঘরে তাঁর এক পুত্রসন্তানেরও জন্ম হয়। দ্বিতীয় স্বামী আবূ হালাও মৃত্যুবরণ করে। এরপর কুরাইশের একাধিক প্রভাবশালী নেতার কাছ থেকে বিয়ের প্রস্তাব পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তিনি সবগুলোই ফিরিয়ে দেন। এবার মাইসারার কাছে মুহাম্মাদ ﷺ-এর সততা-বিশ্বস্ততা, দক্ষতা ও সুউচ্চ চরিত্রের বর্ণনা শুনে মুগ্ধ হয়ে যান খাদীজা। তারপর যখন শুনলেন, সূর্যের তাপ থেকে বাঁচাতে দু'জন ফেরেশতা তাঁকে ছায়া দান করছিল—তখন খাদীজা অনুভব করলেন, জীবনসঙ্গী তিনি পেয়ে গেছেন। পরে বান্ধবী নাফীসার মাধ্যমে মুহাম্মাদ ﷺ-এর কাছে বিয়ের প্রসঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেন।
মুহাম্মাদ এ ব্যাপারে তাঁর চাচাদের সাথে পরামর্শ করেন। তারা খাদীজার চাচা আমর ইবনু আসাদের কাছে মুহাম্মাদ ﷺ-এর পক্ষ থেকে খাদীজার জন্য বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। ভাতিজির পক্ষ থেকে তা গ্রহণ করেন আমর। দেনমোহর হিসেবে মুহাম্মাদ বিশটি উট প্রদান করেন (অন্য বর্ণনায় ছয়টি উটের কথাও আছে)। বানু হাশিম ও কুরাইশ গোত্রপতিদের উপস্থিতিতে শুভ কাজটি সুসম্পন্ন হয়। আল্লাহ তাআলার প্রশংসা ও স্তুতি এবং মুহাম্মাদ ﷺ-এর মর্যাদা ও গুণাবলি সহকারে খুতবা পাঠ করে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন আবূ তালিব। সিরিয়া থেকে ফেরত আসার দুই মাস কয়েক দিনের মাথায়ই পঁচিশ বছর বয়সি মুহাম্মাদের বিবাহ সম্পন্ন হয়। কনের বয়স ছিল চল্লিশ। কোনও কোনও বর্ণনায় আটাশের কথাও উল্লেখ রয়েছে。
📄 খাদীজা থেকে নবিজি ﷺ-এর সন্তানাদি
খাদীজা (রদিয়াল্লাহু আনহা) মুহাম্মাদ ﷺ-এর প্রথম স্ত্রী। তিনি জীবিত থাকাবস্থায় নবি আর কোনও বিবাহ করেননি। ইবরাহীম ছাড়া নবিজির বাকি সব সন্তান খাদীজার গর্ভেই জন্ম নেন। ইবরাহীম মারিয়া কিবতিয়া (রদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে জন্মগ্রহণ করেছেন। নবিজির ছেলে-মেয়েদের নাম:
প্রথম-কাসিম পঞ্চম-ফাতিমা দ্বিতীয়-যায়নাব ষষ্ঠ-আবদুল্লাহ তৃতীয়-রুকাইয়া সপ্তম-ইবরাহীম। চতুর্থ-উন্মু কুলসূম রদিয়াল্লাহু আনহুম আজমাঈন।
অবশ্য তাঁদের সঠিক সংখ্যা ও বয়সের ক্রম নিয়ে গবেষকদের মতপার্থক্য আছে। পুত্রসন্তান সব শিশুকালেই মারা যান। তবে কন্যারা সবাই পিতার নুবুওয়াত-প্রাপ্তি দেখেছেন। প্রত্যেকেই ইসলাম গ্রহণ করেছেন ও মদীনায় হিজরতও করেছেন। ফাতিমা (রদিয়াল্লাহু আনহা) ছাড়া বাকি সবাই নবিজির জীবদ্দশায় মৃত্যুবরণ করেন। আর ফাতিমা (রদিয়াল্লাহু আনহা) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওফাতের ছয় মাস পরে ইন্তিকাল করেন।[২৯]
টিকাঃ
[২৯] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/১৮৯-১৯১; ইবনুল জাওযি, তালকীহ, ৭; ইবনু হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি, ৭/১০৫।