📄 হিলফুল ফুদূল
ফিজার যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েকদিন পরে সেই মাসেই কুরাইশের পাঁচটি বংশের মাঝে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর নাম হিলফুল ফুদূল। স্বাক্ষরকারী পক্ষগুলো হলো বানূ হাশিম, বানু আবদিল মুত্তালিব, বানু আসআদ, বানু যাহরা এবং বানূ তাইম।
চুক্তিটির আবির্ভাব হয় এক লজ্জাকর ঘটনার প্রতিবাদে। স্রেফ অপরিচিত আর অচেনা হওয়ার অপরাধে এক ব্যক্তিকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করার ঘটনা। 'যুবাইদ' (ইয়েমেন) অঞ্চল থেকে এক ব্যক্তি ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে মক্কায় আসেন। আস ইবনু ওয়াইল নামক স্থানীয় এক ব্যক্তি তার সকল পণ্য বিনামূল্যে ছিনিয়ে নেয়। অসহায় লোকটি একে একে বানু আবদিদ দার, বানু মাখযূম, বানু জামাহ্, বানু সাহম ও বানূ আদির কাছে সাহায্যের আবেদন জানান। একটা মানুষও তার সেই আকুল আবেদনে সাড়া দেয়নি। মরিয়া হয়ে লোকটি জাবালে আবী কুবাইস-এর চূড়ায় উঠে দাঁড়ান। সবার কাছে ঘোষণা করেন নিজের দুঃখের কাহিনি। শ্রোতাদের কাছে সাহায্যের চেয়ে আকুল আবেদন ব্যক্ত করেন। সে আবেদনে সাড়া দেন যুবাইর ইবনু আবদিল মুত্তালিব। দুর্দশাগ্রস্ত অচেনা লোকটির দিকে বাড়িয়ে দেন সাহায্যের হাত।
যুবাইর সকল গোত্রের প্রতিনিধিদের এক জায়গায় জড়ো হওয়ার আহ্বান করেন। বানু তাইমের সর্দার আবদুল্লাহ ইবনু জুদআনের বাড়িতে সভা বসে। সেখানে গোত্রপতিরা এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্তে ঐকমত্য পোষণ করেন। এখন থেকে বংশ-গোত্র নির্বিশেষে যেকোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে হওয়া অন্যায়-অত্যাচার প্রতিহত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তারপর আস ইবনু ওয়াইলকে বাধ্য করা হয় ওই ব্যক্তির পণ্যদ্রব্য ফিরিয়ে দিতে। চুক্তির সময় মুহাম্মাদ ﷺ-ও সে সভায় নিজ চাচাদের সাথে উপস্থিত ছিলেন।
নুবুওয়াত লাভের পর তিনি ঘোষণা করেন, “আবদুল্লাহ ইবনু জুদআনের ঘরে সেই চুক্তি স্বাক্ষরের ঘটনায় আমিও অংশগ্রহণ করেছিলাম। এমন এক চুক্তি, যার বিনিময়ে লাল উটও আমার অপছন্দ। ইসলামের যুগেও যদি সে চুক্তির জন্য আমাকে ডাকা হতো, তাহলে অবশ্যই আমি তাতে সাড়া দিতাম।”[২২]
টিকাঃ
[২২] ইবনু সা'দ, তবাকাতুল কুবরা, ১/১২৬-১২৮; যুবাইরি, নাসাবু কুরাইশ, ২৯১।
📄 নবিজির কর্মজীবন
মুহাম্মাদ ইয়াতীম হয়ে জন্মগ্রহণ করেছেন। প্রথমে আপন দাদা পরে চাচার অধীনে লালিত-পালিত হয়েছেন। পিতার নিকট থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে অল্প কিছু সম্পদ পেয়েছিলেন, যা দিয়ে তেমন কিছুই করার উপযোগী ছিল না। এই কারণে তিনি যখন হালকা-পাতলা কাজ করার উপযুক্ত হন তখন থেকে তাঁর দুধভাইদের সাথে বান্ সা'দের ছাগল চরাতেন।[২৩]
মক্কায় ফিরে আসার পরও মাত্র কয়েক কীরাতের [২৪] বিনিময়ে মক্কাবাসীর ছাগলের রাখালি করতেন।[২৫]
শুরু-জীবনে বকরি চরানো আম্বিয়া (আলাইহিমুস সালাম)-দের সুন্নাত। এই রাখালগিরি কিন্তু যেনতেন কোনও কাজ নয়। নবিজীবনে এই পেশার রয়েছে সুদূরপ্রসারী প্রভাব। নুবুওয়াত প্রাপ্তির পর মুহাম্মাদ বলেছেন, وَهَلْ مِنْ نَبِيَّ إِلَّا رَعَاهَا "প্রত্যেক নবিই বকরি বা ভেড়া চরিয়েছেন।”[২৬]
যখন যৌবনে পদার্পণ করেন তখন তিনি নিজেকে ব্যবসায়িক কাজে নিযুক্ত করেন। কিছু কিছু বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে যে, রাসূল সাইব ইবনু আবী সাইবের সাথে মিলে ব্যবসা করতেন। নবিজি ছিলেন সর্বোত্তম ও বিনম্র পার্টনার। কখনও বাদানুবাদ কিংবা ঝগড়া করতেন না।[২৭] লেনদেনসহ সমস্ত কাজে বিশ্বস্ততা ও সততা ছিল তাঁর আমরণ সঙ্গী। এই কারণেই সবার মুখে মুখে তিনি “আল-আমীন” (অতি বিশ্বস্ত) বলে পরিচিত ও প্রসিদ্ধ হয়ে যান।
টিকাঃ
[২৩] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/১৬৬।
[২৪] কীরাত হলো এক দীনারের বিশ ভাগের এক ভাগ বা চব্বিশ ভাগের এক ভাগ, যার মূল্য বর্তমানে সর্বোচ্চ ৮০-৯০ রুপিয়া (১০০-১১০ টাকা)।
[২৫] বুখারি, ২২৬২।
[২৬] বুখারি, ৫৪৫৩।
[২৭] আবূ দাউদ, ৪৮৩৬; ইবনু মাজাহ, ২২৮৭; আহমাদ, ৩/৪২৫।
📄 সিরিয়ায় ব্যবসা-যাত্রা
বিশ্বস্ত কর্মী সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ব্যবসায়ীদের। যাতে তাদের সম্পদের যথাযথ সংরক্ষণ হয়। এমনই এক ব্যবসায়ী ছিলেন কুরাইশ গোত্রের সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত ও ধনী নারী খাদীজা বিনতু খুয়াইলিদ। লোক ভাড়া করে তিনি তাদের দিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহন ও বিক্রি করাতেন। মুহাম্মাদ ﷺ-এর বিশ্বস্ততার সুনাম শোনার পর খাদীজা কালবিলম্ব না করে তাঁকে কাজে নিয়ে নেন। ফলে যুবক মুহাম্মাদ ব্যবসায়িক মালামাল নিয়ে সিরিয়া গমন করেন। সাথে থাকে খাদীজার একজন দাস মাইসারা।
অসাধারণ সাফল্যমণ্ডিত এক সফর শেষে মক্কায় ফেরেন মুহাম্মাদ। এ-সময় ব্যবসায় প্রচুর লাভ হয় এবং সম্পদে এত বরকত হয় যে ইতিপূর্বে কখনও এমন হয়নি। মক্কায় এসে খাদীজার হাতে তুলে দেন বিপুল পরিমাণ মুনাফা।[২৮]
টিকাঃ
[২৮] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/১৮৭-১৮৮।
📄 খাদীজার সাথে বিবাহ
ইতিমধ্যে খাদীজার দু'জন স্বামী মৃত্যুবরণ করেছে। বর্তমানে তিনি স্বামীহীন, বিধবা। প্রথম স্বামীর নাম আতীক ইবনু আয়িয মাখযূমি। তার মৃত্যুর পর বিবাহ করেন আবূ হালা তাইমিকে। আবূ হালার ঘরে তাঁর এক পুত্রসন্তানেরও জন্ম হয়। দ্বিতীয় স্বামী আবূ হালাও মৃত্যুবরণ করে। এরপর কুরাইশের একাধিক প্রভাবশালী নেতার কাছ থেকে বিয়ের প্রস্তাব পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তিনি সবগুলোই ফিরিয়ে দেন। এবার মাইসারার কাছে মুহাম্মাদ ﷺ-এর সততা-বিশ্বস্ততা, দক্ষতা ও সুউচ্চ চরিত্রের বর্ণনা শুনে মুগ্ধ হয়ে যান খাদীজা। তারপর যখন শুনলেন, সূর্যের তাপ থেকে বাঁচাতে দু'জন ফেরেশতা তাঁকে ছায়া দান করছিল—তখন খাদীজা অনুভব করলেন, জীবনসঙ্গী তিনি পেয়ে গেছেন। পরে বান্ধবী নাফীসার মাধ্যমে মুহাম্মাদ ﷺ-এর কাছে বিয়ের প্রসঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেন।
মুহাম্মাদ এ ব্যাপারে তাঁর চাচাদের সাথে পরামর্শ করেন। তারা খাদীজার চাচা আমর ইবনু আসাদের কাছে মুহাম্মাদ ﷺ-এর পক্ষ থেকে খাদীজার জন্য বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। ভাতিজির পক্ষ থেকে তা গ্রহণ করেন আমর। দেনমোহর হিসেবে মুহাম্মাদ বিশটি উট প্রদান করেন (অন্য বর্ণনায় ছয়টি উটের কথাও আছে)। বানু হাশিম ও কুরাইশ গোত্রপতিদের উপস্থিতিতে শুভ কাজটি সুসম্পন্ন হয়। আল্লাহ তাআলার প্রশংসা ও স্তুতি এবং মুহাম্মাদ ﷺ-এর মর্যাদা ও গুণাবলি সহকারে খুতবা পাঠ করে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন আবূ তালিব। সিরিয়া থেকে ফেরত আসার দুই মাস কয়েক দিনের মাথায়ই পঁচিশ বছর বয়সি মুহাম্মাদের বিবাহ সম্পন্ন হয়। কনের বয়স ছিল চল্লিশ। কোনও কোনও বর্ণনায় আটাশের কথাও উল্লেখ রয়েছে。