📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 সিরিয়া সফর ও পাদরির সঙ্গে সাক্ষাৎ

📄 সিরিয়া সফর ও পাদরির সঙ্গে সাক্ষাৎ


মুহাম্মাদ ﷺ-এর বয়স যখন বারো বছর (কিছু তথ্যসূত্র অনুযায়ী, বারো বছর দুই মাস দশ দিন), [১৮] তখন আবূ তালিব সিরিয়ায় একটি বাণিজ্যিক কাফেলার সাথে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু না তিনি চাইছিলেন ভাতিজাকে রেখে যেতে, আর না মুহাম্মাদ ﷺ চাইছিলেন চাচার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে। শেষমেশ তাঁকে সাথে নিয়ে চলেন আবূ তালিব।
সিরিয়ার সীমান্তে বুসরার নিকটে পৌঁছে কাফেলা যাত্রাবিরতি করে। কাফেলাকে স্বাগত জানাতে এগিয়ে আসেন সে শহরে থাকা বড় এক খ্রিষ্টান পাদরি। অথচ এর আগে বহু কাফেলা এসেছে গিয়েছে কিন্তু তিনি তাদের নিকট আসেননি এবং তাদের প্রতি ভ্রুক্ষেপই করেননি। তার নাম ছিল বুহাইরা।[১৯] সবাইকে অতিক্রম করে বালক মুহাম্মাদের কাছে এসে তাঁর হাত ধরে বুহাইরা বললেন, “এই বালক হবে পুরা বিশ্বের নেতা এবং মহাপ্রভুর বার্তাবাহক। আল্লাহ তাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছেন।”
সবাই বলল, "আপনি কীভাবে তা জানতে পারলেন?” বুহাইরা জবাবে বললেন, “সে এদিকটায় আসামাত্রই দেখলাম সব পাথর আর গাছ তাকে সাজদা করার জন্য ঝুঁকে পড়েছে। গাছ ও পাথর নবিদের ছাড়া আর কাউকেই সাজদা করে না। শুধু তা-ই না। নুবুওয়াতের সিলমোহর দেখেও আমি তাকে চিনেছি। তার কাঁধের নিচের নরম হাড়ের ওপর আছে ওটা, অনেকটা আপেলের মতো দেখতে। আমরা আমাদের কিতাবেও এমনটি পেয়েছি।”
বুহাইরা এরপর সেই কাফেলার সম্মানার্থে একটি ভোজের আয়োজন করেন। পরে একসময় আবূ তালিবকে ডেকে নিয়ে অনুনয় করেন যেন বালক মুহাম্মাদ ﷺ-কে আর সামনে না নেওয়া হয়; বরং বাড়িতেই ফিরিয়ে দিতে বলেন তাঁকে। পাছে ইয়াহুদি বা রোমানরা তাঁকে প্রতিশ্রুত সেই নবি হিসেবে চিনতে পেরে হত্যা করতে আসে—এই ভয়েই তিনি এমন পরামর্শ দেন। পাদরির আশঙ্কা আবূ তালিব উপেক্ষা করতে পারলেন না। ভাতিজার নিরাপত্তার কথা ভেবে তাঁকে মক্কায় ফেরত পাঠিয়ে দেন তিনি। [২০]
বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পর মুহাম্মাদ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেন। এর মাঝে দুটি ঘটনা আলাদা মনোযোগের দাবিদার।

টিকাঃ
[১৮] ইবনুল জাওযি, তালকীহ, ৭।
[১৯] তবে কেউ কেউ বলেছেন, বাহীরা।
[২০] তিরমিযি, আস-সুনান, ৩৬২০; ইবনু আবী শাইবা, আল-মুসান্নাফ, ১১৭৮২; বাইহাকি, দালাইলুন নুবুওয়াহ, ২/২৪-২৫; তাবারি, আত-তারীখ, ২/২৭৮-২৭৯।

📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 ফিজার যুদ্ধ

📄 ফিজার যুদ্ধ


মুহাম্মাদ-এর বয়স তখন বিশ বছর। যুল-কা'দা মাসে যথারীতি চলছে উকায মেলা। কিন্তু সেখানের কোনও এক ঘটনার জের ধরে রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধ বেধে যায়। এক পক্ষে রয়েছে কুরাইশ ও কিনানা গোত্রদ্বয়, আরেক পক্ষে কায়স ও গায়লান।
অনেক রক্তপাতের পর অবশেষে তারা একটি সমঝোতায় আসতে সমর্থ হয়। যে পক্ষে বেশি হতাহত হয়েছে, সে পক্ষ রক্তপণ (অবৈধ হত্যার বিনিময়ে প্রদেয় আর্থিক জরিমানা) পাবে। উল্লেখ্য, এর আগের তিন বছরেও কিন্তু পরপর তিনটি দাঙ্গা হয়েছিল। কিন্তু সেখানে মারামারি, কাটাকাটি ও রক্তাক্ত হওয়ার কোনও ঘটনা ঘটেনি। সাধারণ ঝগড়া-বিবাদ ছিল। মোট এই চারবারের লড়াই-ই ফিজার যুদ্ধ নামে পরিচিতি পায়। আরবিতে ফিজার অর্থ অনৈতিকতা। যুল-কা'দা মাসের পবিত্রতার কারণে এ-সময় যেকোনও ধরনের রক্তপাত কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল। সেই পবিত্রতা লঙ্ঘন করে যুদ্ধটি বেধেছিল বলেই এই নাম।
কুরাইশের সদস্য হিসেবে মুহাম্মাদ নিজেও সে যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন। তাঁর কাজ ছিল শত্রুপক্ষের ছোড়া তির সংগ্রহ করে স্বগোত্রীয় যোদ্ধাদের হাতে তুলে দেওয়া।[২১]

টিকাঃ
[২১] ইবনুল আসীর, আল-কামিল ফিত তারীখ, ১/৪৬৮-৪৭২; ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/১৮৪-১৮৭; মুহাম্মাদ ইবনু হাবীব বাগদাদি, আল-মুনাস্মাক ফী আখবারি কুরাইশ, ১৬৪, ১৮৫।

📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 হিলফুল ফুদূল

📄 হিলফুল ফুদূল


ফিজার যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েকদিন পরে সেই মাসেই কুরাইশের পাঁচটি বংশের মাঝে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর নাম হিলফুল ফুদূল। স্বাক্ষরকারী পক্ষগুলো হলো বানূ হাশিম, বানু আবদিল মুত্তালিব, বানু আসআদ, বানু যাহরা এবং বানূ তাইম।
চুক্তিটির আবির্ভাব হয় এক লজ্জাকর ঘটনার প্রতিবাদে। স্রেফ অপরিচিত আর অচেনা হওয়ার অপরাধে এক ব্যক্তিকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করার ঘটনা। 'যুবাইদ' (ইয়েমেন) অঞ্চল থেকে এক ব্যক্তি ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে মক্কায় আসেন। আস ইবনু ওয়াইল নামক স্থানীয় এক ব্যক্তি তার সকল পণ্য বিনামূল্যে ছিনিয়ে নেয়। অসহায় লোকটি একে একে বানু আবদিদ দার, বানু মাখযূম, বানু জামাহ্, বানু সাহম ও বানূ আদির কাছে সাহায্যের আবেদন জানান। একটা মানুষও তার সেই আকুল আবেদনে সাড়া দেয়নি। মরিয়া হয়ে লোকটি জাবালে আবী কুবাইস-এর চূড়ায় উঠে দাঁড়ান। সবার কাছে ঘোষণা করেন নিজের দুঃখের কাহিনি। শ্রোতাদের কাছে সাহায্যের চেয়ে আকুল আবেদন ব্যক্ত করেন। সে আবেদনে সাড়া দেন যুবাইর ইবনু আবদিল মুত্তালিব। দুর্দশাগ্রস্ত অচেনা লোকটির দিকে বাড়িয়ে দেন সাহায্যের হাত।
যুবাইর সকল গোত্রের প্রতিনিধিদের এক জায়গায় জড়ো হওয়ার আহ্বান করেন। বানু তাইমের সর্দার আবদুল্লাহ ইবনু জুদআনের বাড়িতে সভা বসে। সেখানে গোত্রপতিরা এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্তে ঐকমত্য পোষণ করেন। এখন থেকে বংশ-গোত্র নির্বিশেষে যেকোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে হওয়া অন্যায়-অত্যাচার প্রতিহত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তারপর আস ইবনু ওয়াইলকে বাধ্য করা হয় ওই ব্যক্তির পণ্যদ্রব্য ফিরিয়ে দিতে। চুক্তির সময় মুহাম্মাদ ﷺ-ও সে সভায় নিজ চাচাদের সাথে উপস্থিত ছিলেন।
নুবুওয়াত লাভের পর তিনি ঘোষণা করেন, “আবদুল্লাহ ইবনু জুদআনের ঘরে সেই চুক্তি স্বাক্ষরের ঘটনায় আমিও অংশগ্রহণ করেছিলাম। এমন এক চুক্তি, যার বিনিময়ে লাল উটও আমার অপছন্দ। ইসলামের যুগেও যদি সে চুক্তির জন্য আমাকে ডাকা হতো, তাহলে অবশ্যই আমি তাতে সাড়া দিতাম।”[২২]

টিকাঃ
[২২] ইবনু সা'দ, তবাকাতুল কুবরা, ১/১২৬-১২৮; যুবাইরি, নাসাবু কুরাইশ, ২৯১।

📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 নবিজির কর্মজীবন

📄 নবিজির কর্মজীবন


মুহাম্মাদ ইয়াতীম হয়ে জন্মগ্রহণ করেছেন। প্রথমে আপন দাদা পরে চাচার অধীনে লালিত-পালিত হয়েছেন। পিতার নিকট থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে অল্প কিছু সম্পদ পেয়েছিলেন, যা দিয়ে তেমন কিছুই করার উপযোগী ছিল না। এই কারণে তিনি যখন হালকা-পাতলা কাজ করার উপযুক্ত হন তখন থেকে তাঁর দুধভাইদের সাথে বান্ সা'দের ছাগল চরাতেন।[২৩]
মক্কায় ফিরে আসার পরও মাত্র কয়েক কীরাতের [২৪] বিনিময়ে মক্কাবাসীর ছাগলের রাখালি করতেন।[২৫]
শুরু-জীবনে বকরি চরানো আম্বিয়া (আলাইহিমুস সালাম)-দের সুন্নাত। এই রাখালগিরি কিন্তু যেনতেন কোনও কাজ নয়। নবিজীবনে এই পেশার রয়েছে সুদূরপ্রসারী প্রভাব। নুবুওয়াত প্রাপ্তির পর মুহাম্মাদ বলেছেন, وَهَلْ مِنْ نَبِيَّ إِلَّا رَعَاهَا "প্রত্যেক নবিই বকরি বা ভেড়া চরিয়েছেন।”[২৬]
যখন যৌবনে পদার্পণ করেন তখন তিনি নিজেকে ব্যবসায়িক কাজে নিযুক্ত করেন। কিছু কিছু বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে যে, রাসূল সাইব ইবনু আবী সাইবের সাথে মিলে ব্যবসা করতেন। নবিজি ছিলেন সর্বোত্তম ও বিনম্র পার্টনার। কখনও বাদানুবাদ কিংবা ঝগড়া করতেন না।[২৭] লেনদেনসহ সমস্ত কাজে বিশ্বস্ততা ও সততা ছিল তাঁর আমরণ সঙ্গী। এই কারণেই সবার মুখে মুখে তিনি “আল-আমীন” (অতি বিশ্বস্ত) বলে পরিচিত ও প্রসিদ্ধ হয়ে যান।

টিকাঃ
[২৩] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/১৬৬।
[২৪] কীরাত হলো এক দীনারের বিশ ভাগের এক ভাগ বা চব্বিশ ভাগের এক ভাগ, যার মূল্য বর্তমানে সর্বোচ্চ ৮০-৯০ রুপিয়া (১০০-১১০ টাকা)।
[২৫] বুখারি, ২২৬২।
[২৬] বুখারি, ৫৪৫৩।
[২৭] আবূ দাউদ, ৪৮৩৬; ইবনু মাজাহ, ২২৮৭; আহমাদ, ৩/৪২৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00