📄 পিতামহের স্নেহ-ছায়ায়
বৃদ্ধ আবদুল মুত্তালিব মা-বাবা হারা নাতিকে নিয়ে মক্কায় ফিরে আসেন। নতুন এই বিপদের কারণে তাঁর হৃদয়ে এমন এক মমতার উদ্রেক হয়, যা তিনি আপন সন্তানদের প্রতিও কখনও কোনোদিন অনুভব করেননি। তিনি নবি-কে অনেক আদর করতেন এবং মর্যাদা দিতেন। শুধু তাঁর জন্য নির্মিত বিছানাতেও নবিজিকে বসাতেন, যেখানে অন্য কারও বসার অনুমতি ছিল না। অন্যান্য লোকজনের সাথে বসলেও তিনি পাশে একটি মাদুরে মুহাম্মাদ ﷺ-কে বসাতেন। তাঁর পিঠ চাপড়ে দিতেন, প্রতিমুহূর্তে খেয়াল রাখতেন। মুহাম্মাদ ﷺ-এর উঠা-বসা, চাল-চলন-আচরণ প্রতিটি বিষয়ই তাকে অত্যন্ত মুগ্ধ করত এবং আনন্দ দিত।
তিনি একরকম নিশ্চিত ছিলেন যে, ভবিষ্যতে তাঁর নাতি অনেক বড় হবে। সবার মাঝে অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তিনি তা দেখে যেতে পারলেন না। নবিজির বয়স যখন মাত্র আট বছর দুই মাস দশ দিন, তখন আবদুল মুত্তালিব মৃত্যুবরণ করলেন। [১৭]
টিকাঃ
[১৭] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/১৬৮-১৬৯; ইবনুল জাওযি, তালকীহু ফুহূমি আহলিল আসার, ৭।
📄 চাচার মমতাময় প্রতিপালন
আবদুল মুত্তালিবের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে আবূ তালিব দায়িত্ব নেন মুহাম্মাদ ﷺ এর প্রতিপালনের। তিনি নবিজির আপন চাচা। তিনিও নবিজিকে অনেক আদর ও স্নেহ করতেন। আবূ তালিব ধনী ও সচ্ছল ছিলেন না। কিন্তু রাসূল ﷺ-এর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তার অল্প সম্পদেও এমন বরকত হতে আরম্ভ করে যে, একজনের খাবারই পুরা পরিবারের জন্য যথেষ্ট হয়ে যেত। আর নবিজি নিজেও ধৈর্য ও অল্পেতুষ্টির ক্ষেত্রে আদর্শ ছিলেন, যা জুটত তাতেই সন্তুষ্ট থাকতেন。
📄 সিরিয়া সফর ও পাদরির সঙ্গে সাক্ষাৎ
মুহাম্মাদ ﷺ-এর বয়স যখন বারো বছর (কিছু তথ্যসূত্র অনুযায়ী, বারো বছর দুই মাস দশ দিন), [১৮] তখন আবূ তালিব সিরিয়ায় একটি বাণিজ্যিক কাফেলার সাথে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু না তিনি চাইছিলেন ভাতিজাকে রেখে যেতে, আর না মুহাম্মাদ ﷺ চাইছিলেন চাচার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে। শেষমেশ তাঁকে সাথে নিয়ে চলেন আবূ তালিব।
সিরিয়ার সীমান্তে বুসরার নিকটে পৌঁছে কাফেলা যাত্রাবিরতি করে। কাফেলাকে স্বাগত জানাতে এগিয়ে আসেন সে শহরে থাকা বড় এক খ্রিষ্টান পাদরি। অথচ এর আগে বহু কাফেলা এসেছে গিয়েছে কিন্তু তিনি তাদের নিকট আসেননি এবং তাদের প্রতি ভ্রুক্ষেপই করেননি। তার নাম ছিল বুহাইরা।[১৯] সবাইকে অতিক্রম করে বালক মুহাম্মাদের কাছে এসে তাঁর হাত ধরে বুহাইরা বললেন, “এই বালক হবে পুরা বিশ্বের নেতা এবং মহাপ্রভুর বার্তাবাহক। আল্লাহ তাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছেন।”
সবাই বলল, "আপনি কীভাবে তা জানতে পারলেন?” বুহাইরা জবাবে বললেন, “সে এদিকটায় আসামাত্রই দেখলাম সব পাথর আর গাছ তাকে সাজদা করার জন্য ঝুঁকে পড়েছে। গাছ ও পাথর নবিদের ছাড়া আর কাউকেই সাজদা করে না। শুধু তা-ই না। নুবুওয়াতের সিলমোহর দেখেও আমি তাকে চিনেছি। তার কাঁধের নিচের নরম হাড়ের ওপর আছে ওটা, অনেকটা আপেলের মতো দেখতে। আমরা আমাদের কিতাবেও এমনটি পেয়েছি।”
বুহাইরা এরপর সেই কাফেলার সম্মানার্থে একটি ভোজের আয়োজন করেন। পরে একসময় আবূ তালিবকে ডেকে নিয়ে অনুনয় করেন যেন বালক মুহাম্মাদ ﷺ-কে আর সামনে না নেওয়া হয়; বরং বাড়িতেই ফিরিয়ে দিতে বলেন তাঁকে। পাছে ইয়াহুদি বা রোমানরা তাঁকে প্রতিশ্রুত সেই নবি হিসেবে চিনতে পেরে হত্যা করতে আসে—এই ভয়েই তিনি এমন পরামর্শ দেন। পাদরির আশঙ্কা আবূ তালিব উপেক্ষা করতে পারলেন না। ভাতিজার নিরাপত্তার কথা ভেবে তাঁকে মক্কায় ফেরত পাঠিয়ে দেন তিনি। [২০]
বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পর মুহাম্মাদ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেন। এর মাঝে দুটি ঘটনা আলাদা মনোযোগের দাবিদার।
টিকাঃ
[১৮] ইবনুল জাওযি, তালকীহ, ৭।
[১৯] তবে কেউ কেউ বলেছেন, বাহীরা।
[২০] তিরমিযি, আস-সুনান, ৩৬২০; ইবনু আবী শাইবা, আল-মুসান্নাফ, ১১৭৮২; বাইহাকি, দালাইলুন নুবুওয়াহ, ২/২৪-২৫; তাবারি, আত-তারীখ, ২/২৭৮-২৭৯।
📄 ফিজার যুদ্ধ
মুহাম্মাদ-এর বয়স তখন বিশ বছর। যুল-কা'দা মাসে যথারীতি চলছে উকায মেলা। কিন্তু সেখানের কোনও এক ঘটনার জের ধরে রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধ বেধে যায়। এক পক্ষে রয়েছে কুরাইশ ও কিনানা গোত্রদ্বয়, আরেক পক্ষে কায়স ও গায়লান।
অনেক রক্তপাতের পর অবশেষে তারা একটি সমঝোতায় আসতে সমর্থ হয়। যে পক্ষে বেশি হতাহত হয়েছে, সে পক্ষ রক্তপণ (অবৈধ হত্যার বিনিময়ে প্রদেয় আর্থিক জরিমানা) পাবে। উল্লেখ্য, এর আগের তিন বছরেও কিন্তু পরপর তিনটি দাঙ্গা হয়েছিল। কিন্তু সেখানে মারামারি, কাটাকাটি ও রক্তাক্ত হওয়ার কোনও ঘটনা ঘটেনি। সাধারণ ঝগড়া-বিবাদ ছিল। মোট এই চারবারের লড়াই-ই ফিজার যুদ্ধ নামে পরিচিতি পায়। আরবিতে ফিজার অর্থ অনৈতিকতা। যুল-কা'দা মাসের পবিত্রতার কারণে এ-সময় যেকোনও ধরনের রক্তপাত কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল। সেই পবিত্রতা লঙ্ঘন করে যুদ্ধটি বেধেছিল বলেই এই নাম।
কুরাইশের সদস্য হিসেবে মুহাম্মাদ নিজেও সে যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন। তাঁর কাজ ছিল শত্রুপক্ষের ছোড়া তির সংগ্রহ করে স্বগোত্রীয় যোদ্ধাদের হাতে তুলে দেওয়া।[২১]
টিকাঃ
[২১] ইবনুল আসীর, আল-কামিল ফিত তারীখ, ১/৪৬৮-৪৭২; ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/১৮৪-১৮৭; মুহাম্মাদ ইবনু হাবীব বাগদাদি, আল-মুনাস্মাক ফী আখবারি কুরাইশ, ১৬৪, ১৮৫।