📄 হালীমার ঘরে বরকতের বারিধারা
মুহাম্মাদ ﷺ-কে কোলে তোলার পর থেকেই হারিস-হালীমা দম্পতির ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়। অনাবিল ঐশ্বর্যে অবগাহন করে পুরো পরিবার। মুহাম্মাদ যতদিন হালীমার পরিবারে ছিলেন, ততদিন তাঁদের ঘর প্রাচুর্যে ভাসতে থাকে। হালীমা নিজেই বলেছেন যে, যখন তিনি মক্কায় আসেন তখন ছিল দুর্ভিক্ষের সময়। তাদের একটি গাধি ছিল-এ-রকম দুর্বল ও জীর্ণ-শীর্ণ যে, পুরো কাফেলার মধ্যে সবচেয়ে কমজোর ও ধীর গতির ছিল। সবাই তার সামনে, কেউ পেছনে ছিল না। একটি উটনীও ছিল কিন্তু একফোঁটাও দুধ দিত না। হালীমা নিজেও অভুক্ত, বুকের দুধ শুকিয়ে গেছে। সন্তানেরা ক্ষুধার যন্ত্রণায় সারারাত ছটফট করত এবং কাঁদতে থাকত। তারা নিজেরাও ঘুমাত না, বাবা-মাকেও ঘুমাতে দিত না।
কিন্তু তারা যখন মুহাম্মাদ ﷺ-কে ঘরে নিয়ে আসল এবং হালীমা তাঁকে কোলে তুলে নিল তখন তার সীনা দুধে ভরপুর হয়ে গেল। ফলে মুহাম্মাদ ও তার বাচ্চারা তৃপ্তি সহকারে দুধ পান করে আরামে ঘুমিয়ে পড়ল। ওদিকে তার স্বামী হারিস উঠে গিয়ে দেখেন যে, উটনীর ওলানও দুধে টইটম্বুর। তারা সে রাতে সব পাত্র ভর্তি করে দুধ দোহন করল এবং পুরো পরিবার পেট পুরে খেয়ে খুব প্রশান্তির সাথে রাত কাটাল।
মক্কা থেকে ফেরার সময় হালীমা তার ওই গাধির ওপরই সওয়ার হয়েছিল কিন্তু এবার সাথে ছিল মুহাম্মাদ ﷺ। ফলে সেই গাধিই এত দ্রুত চলা আরম্ভ করল যে, পুরা কাফেলাকে পেছনে রেখে সবার সামনে চলে গেল। তার সাথে পাল্লা দিয়ে চলার মতো কেউ ছিল না।
কোনও এক অদৃশ্য ইশারায় হালীমার ঘরকে দুর্ভিক্ষ ও খরা আর স্পর্শ করে না। অথচ তাঁদের বাসস্থান বানু সা'দ ছিল ওই এলাকার সবচেয়ে দুর্ভিক্ষময় ও খরাপ্রবণ জায়গা। তাঁদের ছাগলগুলো চারণভূমি থেকে পেট ভরে খেয়ে ফেরত আসে, ওলান থাকত দুধে ভরা। একসময় যেখানে একফোঁটা দুধও পাওয়া যেত না, সেখানে আজ দুধ দোহন করেই কূল পাওয়া যায় না। খরার মাঝেও তাই শিশু মুহাম্মাদ বেড়ে ওঠেন স্বাস্থ্যবান ও শক্তিশালী হয়ে। এভাবে সুখের এই সময়গুলো অতিবাহিত হতে থাকে। দু-বছর পরে দুধ পানের সময়সীমা পূর্ণ হলে হালীমা নবি ﷺ-কে দুধ খাওয়ানো ছাড়িয়ে দেন।
📄 শিশু মুহাম্মাদকে বুকে রাখতে হালীমার ব্যাকুলতা
ছয় মাস পরপর মুহাম্মাদ ﷺ-কে মক্কায় তাঁর মা ও পরিবারের সাথে দেখা করাতে নিতেন হালীমা। দু-বছর পর যখন দুধ ছাড়ানো হয়, তখন সারা জীবনের তরে মুহাম্মাদ ﷺ-কে পরিবারের কাছে দিয়ে আসার সময় আসে। হালীমা এবার শিশুকে মায়ের কাছে নেওয়ার পর ব্যাকুল হয়ে খুব করে অনুরোধ করলেন, যেন আরও কিছুকাল তাকে রাখতে দেয়। কারণ, যে কল্যাণ ও নিয়ামাতের ছোঁয়া তারা পেয়েছিল তা অবর্ণনীয়। তিনি নবি ﷺ-এর মাকে বলেন যে, মরুভূমিতে সে শক্ত-সামর্থবান-সুঠাম হয়ে বেড়ে উঠবে। এমনিতেও মক্কায় অহরহ মহামারি লেগেই থাকে। তা থেকেও দূরে থাকতে পারবে। আমিনার সম্মতিতে খুশিমনে শিশুকে নিয়ে ফিরে আসেন হালীমা। [১৩]
আরও বছর দুই পর এক অদ্ভুত ও অলৌকিক ঘটনা ঘটে। যা দেখে হারিস-হালীমা দম্পতি খুব ভয় পেয়ে যান। ফলে অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে তাদের অতি প্রিয় মুহাম্মাদকে মক্কায় মায়ের কাছে রেখে আসেন। [১৪]
টিকাঃ
[১৩] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/১৬২-১৬৪; ইবনু হিব্বান, আস-সীরাহ, ৮/৮২-৮৪।
[১৪] ইবনু সা'দ, তবাকাতুল কুবরা, ১/১১২; মাসউদি, মুরূজুয যাহাব, ১/১৮১; আবু নুআইম, দালাইলুন নুবুওয়াহ, ১/১৬১-১৬২। অনেকে ইবনু আব্বাসের কথা অনুসারে এই ঘটনা ৫ম বছরে ঘটেছে বলে মত পেশ করেছেন।
📄 বক্ষবিদারণ: অলৌকিক ঘটনা
ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন আনাস ইবনু মালিক (রদিয়াল্লাহু আনহু)। হালীমার ঘরের কাছেই একদিন মুহাম্মাদ অন্যান্য বাচ্চাদের সাথে খেলছিলেন। এমন সময় ফেরেশতা জিবরীল (আলাইহিস সালাম) এসে তাঁকে শোয়ান। তারপর বালক মুহাম্মাদের বুক চিরে তাঁর হৃদপিণ্ড বের করে আনেন। সেখান থেকে একটি টুকরো ফেলে দিয়ে বলেন, “আপনার মাঝে ওটা ছিল শয়তানের অংশ।” এরপর তিনি হৃৎপিণ্ডটি যামযামের পানিতে পূর্ণ একটি স্বর্ণপাত্রে রেখে ধৌত করেন। তারপর পরিচ্ছন্ন সেই অন্তর পুনঃস্থাপিত করেন মুহাম্মাদ ﷺ-এর বক্ষে।
তখন অন্য বাচ্চারা আতঙ্কে কান্না করতে করতে দৌড়ে যায় হালীমার কাছে। গিয়ে বলে, মুহাম্মাদকে হত্যা করে ফেলেছে। হারিস-হালীমা দম্পতি ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে এসে বালক মুহাম্মাদকে জীবিত দেখতে পান। কিন্তু তাঁর চেহারা ভয়ে একেবারে রক্তশূন্য ফ্যাকাসে।
আনাস (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন যে, মুহাম্মাদ ﷺ-এর বুক ফাড়া সেলাইয়ের দাগটা তিনি দেখেছেন। [১৫]
টিকাঃ
[১৫] মুসলিম, ১৬২।
📄 মায়ের কোলে প্রত্যাবর্তন
এই অতি-অলৌকিক ঘটনার পর নবি ﷺ-কে তারা মক্কায় ফিরিয়ে দিয়ে যায়। পরের দু- বছর সেখানে তিনি মায়ের আদর, ভালোবাসা আর স্নেহ-মমতায় বেড়ে উঠতে থাকেন। তাঁর বয়স যখন ছয়, তখন তাঁকে সাথে করে নানাবাড়ি মদীনার উদ্দেশে রওনা দেন আবদুল মুত্তালিব, আমিনা ও উম্মু আইমান। নবিজি ﷺ-এর বাবার কবরও সেখানেই। মদীনায় এক মাস কাটানোর পর মক্কা-অভিমুখে ফিরতিপথের দীর্ঘ যাত্রা শুরু হয়। কিন্তু পথে আমিনা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। একসময় অসুস্থতা বেড়ে গিয়ে তীব্র আকার ধারণ করে। ফলে আবওয়া নামক স্থানে পৌঁছে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি ধূলির এই ধরা থেকে বিদায় নেন। শিশু মুহাম্মাদ মা'কে হারিয়ে এখন ইয়াতীম। অসহায়। বাবা-মা দু'জনেরই ছায়াশূন্য। আমিনাকে সেখানেই সমাধিস্থ করা হয়।[১৬]
টিকাঃ
[১৬] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/১৬৮; ইবনুল জাওযি, তালকীহু ফুহূমি আহলিল আসার, ৭।