📄 হালীমা সা’দিয়ার কোলে নবিজি
আরবদের একটি প্রথা ছিল শহরের খারাবি থেকে বাঁচানোর জন্য শিশুসন্তানকে দুধ পান করাতে বেদুইন নারীদের তত্ত্বাবধানে রাখা। তারা সন্তানকে শক্তিশালী ও সুঠাম করে গড়ে তোলার জন্য মরুভূমির প্রাকৃতিক ও রুক্ষ পরিবেশে পাঠিয়ে দিত। তা ছাড়া সারা আরবে বেদুইনদের ভাষাটাই ছিল আরবির বিশুদ্ধতম রূপ। ফলে তাদের সাথে বেড়ে উঠলে শিশুরা সহজেই প্রমিত আরবি ভাষা শিখতে পারত। আর শহরে বিভিন্ন মানুষের বসবাসের কারণে ভাষাও মিশ্র হয়ে যায়, তাই বিশুদ্ধ রূপ আর থাকে না।
আবদুল মুত্তালিব তাই নাতির জন্য এ রকম কোনও বেদুইন ধাত্রীর সন্ধানে ছিলেন। বানু সা'দ ইবনু বকর ইবনি হাওয়াযিন গোত্রের নারীদের একটি দল সে-সময় মক্কায় আসে শিশুর খোঁজে। আবদুল মুত্তালিব তাদের প্রত্যেককেই শিশু মুহাম্মাদকে নিতে বলেন। কিন্তু তাঁর পিতা নেই শুনে কেউ নিতে চায় না। বাপমরা শিশুর পরিবারের কাছ থেকে সাধারণত ভালো পারিশ্রমিক পাওয়া যায় না-এই ভাবনায় সবাই প্রত্যাখ্যান করতে থাকে।
ওদিকে পিছিয়ে পড়া হালীমা বিনতু আবী যুওয়াইব যখন শহরে এসে পৌঁছলেন, ততক্ষণে অন্য নারীরা কোনো-না-কোনো শিশুর দায়িত্ব পেয়ে গেছে। তার ভাগে ভালো কোনও শিশু মিলেনি। একরকম বাধ্য হয়েই তিনি আবদুল মুত্তালিবের কোলে থাকা শিশুটিকে নিয়ে নেন। কিন্তু তাঁকে কোলে তুলে নেওয়ার পরক্ষণেই তার এমন সৌভাগ্যের দরজা খুলে যায়, যা দেখে পৃথিবীবাসী অবাক বিস্ময়ে নির্বাক তাকিয়ে রয়। যার এক ঝলক আপনারা সামনের পৃষ্ঠাগুলোতে প্রত্যক্ষ করবেন, ইন শা আল্লাহ।
হালীমা সা'দিয়ার পিতা আবূ যুওয়াইবের নাম ছিল আবদুল্লাহ ইবনুল হারিস। তিনি নবি ﷺ-এর দুধনানা। হালীমার স্বামীর নাম হারিস ইবনু আবদিল উযযা। তারা উভয়েই সা'দ ইবনু বকর ইবনি হাওইয়াযিন গোত্রের সাথে সম্পৃক্ত। তাঁদের সন্তানেরা নবিজি ﷺ-এর দুধভাইবোন। তাঁদের তিন জন সন্তান-আবদুল্লাহ, আনিসা এবং জুযামা। জুযামার আরেক নাম শায়মা। এ নামেই তিনি প্রসিদ্ধ। বয়সে বড় ছিলেন। তিনিও শিশু মুহাম্মাদের দেখাশোনা করতেন, খাওয়াতেন এবং আদর করতেন।
📄 হালীমার ঘরে বরকতের বারিধারা
মুহাম্মাদ ﷺ-কে কোলে তোলার পর থেকেই হারিস-হালীমা দম্পতির ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়। অনাবিল ঐশ্বর্যে অবগাহন করে পুরো পরিবার। মুহাম্মাদ যতদিন হালীমার পরিবারে ছিলেন, ততদিন তাঁদের ঘর প্রাচুর্যে ভাসতে থাকে। হালীমা নিজেই বলেছেন যে, যখন তিনি মক্কায় আসেন তখন ছিল দুর্ভিক্ষের সময়। তাদের একটি গাধি ছিল-এ-রকম দুর্বল ও জীর্ণ-শীর্ণ যে, পুরো কাফেলার মধ্যে সবচেয়ে কমজোর ও ধীর গতির ছিল। সবাই তার সামনে, কেউ পেছনে ছিল না। একটি উটনীও ছিল কিন্তু একফোঁটাও দুধ দিত না। হালীমা নিজেও অভুক্ত, বুকের দুধ শুকিয়ে গেছে। সন্তানেরা ক্ষুধার যন্ত্রণায় সারারাত ছটফট করত এবং কাঁদতে থাকত। তারা নিজেরাও ঘুমাত না, বাবা-মাকেও ঘুমাতে দিত না।
কিন্তু তারা যখন মুহাম্মাদ ﷺ-কে ঘরে নিয়ে আসল এবং হালীমা তাঁকে কোলে তুলে নিল তখন তার সীনা দুধে ভরপুর হয়ে গেল। ফলে মুহাম্মাদ ও তার বাচ্চারা তৃপ্তি সহকারে দুধ পান করে আরামে ঘুমিয়ে পড়ল। ওদিকে তার স্বামী হারিস উঠে গিয়ে দেখেন যে, উটনীর ওলানও দুধে টইটম্বুর। তারা সে রাতে সব পাত্র ভর্তি করে দুধ দোহন করল এবং পুরো পরিবার পেট পুরে খেয়ে খুব প্রশান্তির সাথে রাত কাটাল।
মক্কা থেকে ফেরার সময় হালীমা তার ওই গাধির ওপরই সওয়ার হয়েছিল কিন্তু এবার সাথে ছিল মুহাম্মাদ ﷺ। ফলে সেই গাধিই এত দ্রুত চলা আরম্ভ করল যে, পুরা কাফেলাকে পেছনে রেখে সবার সামনে চলে গেল। তার সাথে পাল্লা দিয়ে চলার মতো কেউ ছিল না।
কোনও এক অদৃশ্য ইশারায় হালীমার ঘরকে দুর্ভিক্ষ ও খরা আর স্পর্শ করে না। অথচ তাঁদের বাসস্থান বানু সা'দ ছিল ওই এলাকার সবচেয়ে দুর্ভিক্ষময় ও খরাপ্রবণ জায়গা। তাঁদের ছাগলগুলো চারণভূমি থেকে পেট ভরে খেয়ে ফেরত আসে, ওলান থাকত দুধে ভরা। একসময় যেখানে একফোঁটা দুধও পাওয়া যেত না, সেখানে আজ দুধ দোহন করেই কূল পাওয়া যায় না। খরার মাঝেও তাই শিশু মুহাম্মাদ বেড়ে ওঠেন স্বাস্থ্যবান ও শক্তিশালী হয়ে। এভাবে সুখের এই সময়গুলো অতিবাহিত হতে থাকে। দু-বছর পরে দুধ পানের সময়সীমা পূর্ণ হলে হালীমা নবি ﷺ-কে দুধ খাওয়ানো ছাড়িয়ে দেন।
📄 শিশু মুহাম্মাদকে বুকে রাখতে হালীমার ব্যাকুলতা
ছয় মাস পরপর মুহাম্মাদ ﷺ-কে মক্কায় তাঁর মা ও পরিবারের সাথে দেখা করাতে নিতেন হালীমা। দু-বছর পর যখন দুধ ছাড়ানো হয়, তখন সারা জীবনের তরে মুহাম্মাদ ﷺ-কে পরিবারের কাছে দিয়ে আসার সময় আসে। হালীমা এবার শিশুকে মায়ের কাছে নেওয়ার পর ব্যাকুল হয়ে খুব করে অনুরোধ করলেন, যেন আরও কিছুকাল তাকে রাখতে দেয়। কারণ, যে কল্যাণ ও নিয়ামাতের ছোঁয়া তারা পেয়েছিল তা অবর্ণনীয়। তিনি নবি ﷺ-এর মাকে বলেন যে, মরুভূমিতে সে শক্ত-সামর্থবান-সুঠাম হয়ে বেড়ে উঠবে। এমনিতেও মক্কায় অহরহ মহামারি লেগেই থাকে। তা থেকেও দূরে থাকতে পারবে। আমিনার সম্মতিতে খুশিমনে শিশুকে নিয়ে ফিরে আসেন হালীমা। [১৩]
আরও বছর দুই পর এক অদ্ভুত ও অলৌকিক ঘটনা ঘটে। যা দেখে হারিস-হালীমা দম্পতি খুব ভয় পেয়ে যান। ফলে অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে তাদের অতি প্রিয় মুহাম্মাদকে মক্কায় মায়ের কাছে রেখে আসেন। [১৪]
টিকাঃ
[১৩] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/১৬২-১৬৪; ইবনু হিব্বান, আস-সীরাহ, ৮/৮২-৮৪।
[১৪] ইবনু সা'দ, তবাকাতুল কুবরা, ১/১১২; মাসউদি, মুরূজুয যাহাব, ১/১৮১; আবু নুআইম, দালাইলুন নুবুওয়াহ, ১/১৬১-১৬২। অনেকে ইবনু আব্বাসের কথা অনুসারে এই ঘটনা ৫ম বছরে ঘটেছে বলে মত পেশ করেছেন।
📄 বক্ষবিদারণ: অলৌকিক ঘটনা
ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন আনাস ইবনু মালিক (রদিয়াল্লাহু আনহু)। হালীমার ঘরের কাছেই একদিন মুহাম্মাদ অন্যান্য বাচ্চাদের সাথে খেলছিলেন। এমন সময় ফেরেশতা জিবরীল (আলাইহিস সালাম) এসে তাঁকে শোয়ান। তারপর বালক মুহাম্মাদের বুক চিরে তাঁর হৃদপিণ্ড বের করে আনেন। সেখান থেকে একটি টুকরো ফেলে দিয়ে বলেন, “আপনার মাঝে ওটা ছিল শয়তানের অংশ।” এরপর তিনি হৃৎপিণ্ডটি যামযামের পানিতে পূর্ণ একটি স্বর্ণপাত্রে রেখে ধৌত করেন। তারপর পরিচ্ছন্ন সেই অন্তর পুনঃস্থাপিত করেন মুহাম্মাদ ﷺ-এর বক্ষে।
তখন অন্য বাচ্চারা আতঙ্কে কান্না করতে করতে দৌড়ে যায় হালীমার কাছে। গিয়ে বলে, মুহাম্মাদকে হত্যা করে ফেলেছে। হারিস-হালীমা দম্পতি ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে এসে বালক মুহাম্মাদকে জীবিত দেখতে পান। কিন্তু তাঁর চেহারা ভয়ে একেবারে রক্তশূন্য ফ্যাকাসে।
আনাস (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন যে, মুহাম্মাদ ﷺ-এর বুক ফাড়া সেলাইয়ের দাগটা তিনি দেখেছেন। [১৫]
টিকাঃ
[১৫] মুসলিম, ১৬২।