📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 জন্ম হলো মুহাম্মাদ ﷺ-এর

📄 জন্ম হলো মুহাম্মাদ ﷺ-এর


আবরাহার ব্যর্থ অভিযানের পঞ্চাশ কি পঞ্চান্ন দিন পরের ঘটনা। সময়টা ছিল বসন্তকাল। ৯ রবীউল আউয়াল[৮] সোমবার ভোরবেলায় মক্কা নগরীতে বানু হাশিম পরিবারে জন্ম হয় মুহাম্মাদ ﷺ-এর। সে বছরই আবরাহা মক্কায় আক্রমণ করেছিল। আরবিতে হাতিকে বলে ফীল। হস্তিবাহিনীর আক্রমণের ঘটনার কারণে বছরটি পরিচিত হয় আমুল ফীল (عَامُ الْفِيلِ) বা হস্তিবছর নামে। গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নবিজি ﷺ-এর জন্ম-তারিখ পড়ে ২২ এপ্রিল, ৫৭১ সন।
নবি ﷺ-এর জন্মের সময় ধাত্রীর কাজ আঞ্জাম দেন আবদুর রহমান ইবনু আউফ (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মা শিফা বিনতু আমর। সন্তান জন্মদানের পর রাসূল-এর মা আমিনা স্বপ্নে দেখেন যে, তাঁর শরীর থেকে একটি আলো বেরিয়ে সিরিয়ার প্রাসাদগুলো আলোকিত করে ফেলছে।[৯]
নাতি জন্মের খবর পেয়ে আনন্দে উদ্বেলিত হন আবদুল মুত্তালিব। নবজাতককে কা'বায় নিয়ে আল্লাহ তাআলার শোকরিয়া ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন এবং তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা করেন। আবদুল মুত্তালিবের ধারণা—তাঁর নাতি একদিন অনেক বড় হবে, খুবই প্রশংসিত হবে। তাই তিনি তার নাম রাখেন মুহাম্মাদ, অর্থ “প্রশংসিত”। আরবের সংস্কৃতি অনুযায়ী সপ্তম দিনে তিনি শিশু মুহাম্মাদের আকীকা করেন, চুল মুণ্ডন করেন এবং খতনা করেন। এরপর মক্কাবাসীদের নিমন্ত্রণ করে বেশ জমজমাট এক ভোজের আয়োজন করেন। [১০]
মুহাম্মাদ ﷺ-কে তাঁর বাবার দাসী উম্মু আইমান দেখা-শোনা করতেন। তিনি আবিসিনিয়ার অধিবাসী ছিলেন। তার আসল নাম ছিল বারাকাহ। আল্লাহ তাআলা তাঁকে অনেক নিয়ামাত ও অনুগ্রহ দান করেছেন। উম্মু আইমান (রদিয়াল্লাহু আনহা) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নুবুওয়াতের যুগ পেয়েছিলেন এবং মদীনায় হিজরতও করেছিলেন। নবিজি ﷺ-এর মৃত্যুর পাঁচ মাস পর তিনিও মদীনাতে ইন্তিকাল করেন।[১১]

টিকাঃ
[৮] ৯ রবিউল আউয়ালই যে নবি ﷺ-এর জন্মতারিখ তা নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ তাহকীক করেছেন মাহমুদ পাশা ফালাকি। দেখুন, নাতাইজুল আফহাম ফী তাকবীমিল আরব কবলাল ইসলাম, ২৮-৩৫। তবে ১২ রবিউল আউয়াল-এর কথাও কেউ কেউ বলেন।
[৯] আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৪/১২৭, ১২৮; ইবনু সা'দ, তবাকাতুল কুবরা, ১/১০২।
[১০] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/১৫৯-১৬০; তাবারি, আত-তারীখ, ২/১৫৬-১৫৭। বলা হয়, নবি খতনা করা অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেছেন। -ইবনুল জাওযি, তালকীহু ফুতুমি আহলিল আসার, ৪। কিন্তু ইবনুল কাইয়িম (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'এ ব্যাপারে কোনো হাদীস প্রমাণিত নেই।'-যাদুল মাআদ, ১/১৮।
[১১] মুসলিম, ১৭৭১।

📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 মুহাম্মাদ ﷺ-এর দুধপান

📄 মুহাম্মাদ ﷺ-এর দুধপান


রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মা আমিনার দুধ পান করানোর সাথে সাথে চাচা আবু লাহাবের দাসী সুওয়াইবাও তাঁকে দুধ পান করান। সে সময় রাসূল ﷺ-এর সাথে তার সন্তান মাসরূহও দুধ পান করছিল। এর আগে হামযা ইবনু আবদিল মুত্তালিব এবং আবূ সালামাকেও সুওয়াইবা দুধ পান করিয়েছিলেন। ফলে তারা তিন জন মুহাম্মাদ ﷺ-এর দুধভাই হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন।[১২]

টিকাঃ
[১২] বুখারি, ৫১০০, ৫১০১; আবূ নুআইম, দালাইলুন নুবুওয়াহ, ১/১৫৭; তাবারি, আত-তারীখ, ২/১৫৮।

📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 হালীমা সা’দিয়ার কোলে নবিজি

📄 হালীমা সা’দিয়ার কোলে নবিজি


আরবদের একটি প্রথা ছিল শহরের খারাবি থেকে বাঁচানোর জন্য শিশুসন্তানকে দুধ পান করাতে বেদুইন নারীদের তত্ত্বাবধানে রাখা। তারা সন্তানকে শক্তিশালী ও সুঠাম করে গড়ে তোলার জন্য মরুভূমির প্রাকৃতিক ও রুক্ষ পরিবেশে পাঠিয়ে দিত। তা ছাড়া সারা আরবে বেদুইনদের ভাষাটাই ছিল আরবির বিশুদ্ধতম রূপ। ফলে তাদের সাথে বেড়ে উঠলে শিশুরা সহজেই প্রমিত আরবি ভাষা শিখতে পারত। আর শহরে বিভিন্ন মানুষের বসবাসের কারণে ভাষাও মিশ্র হয়ে যায়, তাই বিশুদ্ধ রূপ আর থাকে না।
আবদুল মুত্তালিব তাই নাতির জন্য এ রকম কোনও বেদুইন ধাত্রীর সন্ধানে ছিলেন। বানু সা'দ ইবনু বকর ইবনি হাওয়াযিন গোত্রের নারীদের একটি দল সে-সময় মক্কায় আসে শিশুর খোঁজে। আবদুল মুত্তালিব তাদের প্রত্যেককেই শিশু মুহাম্মাদকে নিতে বলেন। কিন্তু তাঁর পিতা নেই শুনে কেউ নিতে চায় না। বাপমরা শিশুর পরিবারের কাছ থেকে সাধারণত ভালো পারিশ্রমিক পাওয়া যায় না-এই ভাবনায় সবাই প্রত্যাখ্যান করতে থাকে।
ওদিকে পিছিয়ে পড়া হালীমা বিনতু আবী যুওয়াইব যখন শহরে এসে পৌঁছলেন, ততক্ষণে অন্য নারীরা কোনো-না-কোনো শিশুর দায়িত্ব পেয়ে গেছে। তার ভাগে ভালো কোনও শিশু মিলেনি। একরকম বাধ্য হয়েই তিনি আবদুল মুত্তালিবের কোলে থাকা শিশুটিকে নিয়ে নেন। কিন্তু তাঁকে কোলে তুলে নেওয়ার পরক্ষণেই তার এমন সৌভাগ্যের দরজা খুলে যায়, যা দেখে পৃথিবীবাসী অবাক বিস্ময়ে নির্বাক তাকিয়ে রয়। যার এক ঝলক আপনারা সামনের পৃষ্ঠাগুলোতে প্রত্যক্ষ করবেন, ইন শা আল্লাহ।
হালীমা সা'দিয়ার পিতা আবূ যুওয়াইবের নাম ছিল আবদুল্লাহ ইবনুল হারিস। তিনি নবি ﷺ-এর দুধনানা। হালীমার স্বামীর নাম হারিস ইবনু আবদিল উযযা। তারা উভয়েই সা'দ ইবনু বকর ইবনি হাওইয়াযিন গোত্রের সাথে সম্পৃক্ত। তাঁদের সন্তানেরা নবিজি ﷺ-এর দুধভাইবোন। তাঁদের তিন জন সন্তান-আবদুল্লাহ, আনিসা এবং জুযামা। জুযামার আরেক নাম শায়মা। এ নামেই তিনি প্রসিদ্ধ। বয়সে বড় ছিলেন। তিনিও শিশু মুহাম্মাদের দেখাশোনা করতেন, খাওয়াতেন এবং আদর করতেন।

📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 হালীমার ঘরে বরকতের বারিধারা

📄 হালীমার ঘরে বরকতের বারিধারা


মুহাম্মাদ ﷺ-কে কোলে তোলার পর থেকেই হারিস-হালীমা দম্পতির ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়। অনাবিল ঐশ্বর্যে অবগাহন করে পুরো পরিবার। মুহাম্মাদ যতদিন হালীমার পরিবারে ছিলেন, ততদিন তাঁদের ঘর প্রাচুর্যে ভাসতে থাকে। হালীমা নিজেই বলেছেন যে, যখন তিনি মক্কায় আসেন তখন ছিল দুর্ভিক্ষের সময়। তাদের একটি গাধি ছিল-এ-রকম দুর্বল ও জীর্ণ-শীর্ণ যে, পুরো কাফেলার মধ্যে সবচেয়ে কমজোর ও ধীর গতির ছিল। সবাই তার সামনে, কেউ পেছনে ছিল না। একটি উটনীও ছিল কিন্তু একফোঁটাও দুধ দিত না। হালীমা নিজেও অভুক্ত, বুকের দুধ শুকিয়ে গেছে। সন্তানেরা ক্ষুধার যন্ত্রণায় সারারাত ছটফট করত এবং কাঁদতে থাকত। তারা নিজেরাও ঘুমাত না, বাবা-মাকেও ঘুমাতে দিত না।
কিন্তু তারা যখন মুহাম্মাদ ﷺ-কে ঘরে নিয়ে আসল এবং হালীমা তাঁকে কোলে তুলে নিল তখন তার সীনা দুধে ভরপুর হয়ে গেল। ফলে মুহাম্মাদ ও তার বাচ্চারা তৃপ্তি সহকারে দুধ পান করে আরামে ঘুমিয়ে পড়ল। ওদিকে তার স্বামী হারিস উঠে গিয়ে দেখেন যে, উটনীর ওলানও দুধে টইটম্বুর। তারা সে রাতে সব পাত্র ভর্তি করে দুধ দোহন করল এবং পুরো পরিবার পেট পুরে খেয়ে খুব প্রশান্তির সাথে রাত কাটাল।
মক্কা থেকে ফেরার সময় হালীমা তার ওই গাধির ওপরই সওয়ার হয়েছিল কিন্তু এবার সাথে ছিল মুহাম্মাদ ﷺ। ফলে সেই গাধিই এত দ্রুত চলা আরম্ভ করল যে, পুরা কাফেলাকে পেছনে রেখে সবার সামনে চলে গেল। তার সাথে পাল্লা দিয়ে চলার মতো কেউ ছিল না।
কোনও এক অদৃশ্য ইশারায় হালীমার ঘরকে দুর্ভিক্ষ ও খরা আর স্পর্শ করে না। অথচ তাঁদের বাসস্থান বানু সা'দ ছিল ওই এলাকার সবচেয়ে দুর্ভিক্ষময় ও খরাপ্রবণ জায়গা। তাঁদের ছাগলগুলো চারণভূমি থেকে পেট ভরে খেয়ে ফেরত আসে, ওলান থাকত দুধে ভরা। একসময় যেখানে একফোঁটা দুধও পাওয়া যেত না, সেখানে আজ দুধ দোহন করেই কূল পাওয়া যায় না। খরার মাঝেও তাই শিশু মুহাম্মাদ বেড়ে ওঠেন স্বাস্থ্যবান ও শক্তিশালী হয়ে। এভাবে সুখের এই সময়গুলো অতিবাহিত হতে থাকে। দু-বছর পরে দুধ পানের সময়সীমা পূর্ণ হলে হালীমা নবি ﷺ-কে দুধ খাওয়ানো ছাড়িয়ে দেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00