📄 বংশধারা
রাসূল ﷺ-এর দাদা আবদুল মুত্তালিবের পিতা হাশিমের নামানুসারে এ বংশকে বলা হয় হাশিমি। কুসাইয়ের দায়িত্বসমূহ থেকে হাজীগণের আতিথেয়তার দায়িত্ব পান হাশিম। এরপর তাঁর কাছ থেকে হস্তান্তরিত হয় তাঁর ভাই মুত্তালিবের কাছে। মুত্তালিবের মৃত্যুর পর হাশিমের বংশধররা পুনরায় এই মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব হাতে পান। ইসলামের অভ্যুদয় পর্যন্ত তাঁরা এ পদে আসীন থাকেন।
হাশিমকে ওইসময়ের সবচেয়ে মর্যাদাবান ব্যক্তি বলে গণ্য করা হতো। তিনি 'ওয়াদিয়ে বাতহা'র সর্দার ছিলেন। হাশিম শব্দের অর্থ চূর্ণকারী, টুকরোকারী। তিনি রুটি টুকরো টুকরো করে গোশত আর ঝোলের সাথে মিশিয়ে একধরনের খাবার তৈরি করে মানুষের মাঝে বিতরণ করতেন। এ কারণেই তাঁর নাম হাশিম বলে পরিচিতি পায়। তাঁর মূল নাম ছিল আমর। কুরাইশ গোত্র পেশায় ব্যবসায়ী। কুরাইশদের ব্যবসায়ী কাফেলার জন্য শীতকালে ইয়েমেনে আর গ্রীষ্মকালে সিরিয়ায় যাওয়ার ব্যবস্থা করেন হাশিম। তিনি এই দুই অঞ্চলের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কুরাইশ কাফেলার নিরাপদ যাতায়াতের অনুমতিপত্র নিয়ে দেন।[১] সূরা কুরাইশে আল্লাহ তাআলা কুরাইশ গোত্রকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, এই নিরাপদ ভ্রমণের জন্য তারা আল্লাহর কাছে ঋণী। এটি আল্লাহর অনেক বড় রহমত ও নিয়ামাত।
হাশিম একবার সিরিয়া অভিমুখে ভ্রমণকালে ইয়াসরিবে যাত্রা-বিরতি করেন। সে সময় তিনি সেখানকার বানু আদি ইবনি নাজ্জার গোত্রের মেয়ে সালামা বিনতু আমরকে বিয়ে করেন। কিছুদিন সেখানে অবস্থান করার পর তিনি আবার সিরিয়া অভিমুখে রওনা হন। অতঃপর ফিলিস্তিনের বিখ্যাত নগরী গাযায় আকস্মিকভাবে তাঁর মৃত্যু হয়। সেসময় তাঁর স্ত্রী সালমা গর্ভবতী ছিলেন। তিনি এক ছেলের জন্ম দেন, যার চুলে সাদাটে ভাব ছিল। ফলে তার নাম রাখা হয় শাইবা, যার অর্থ শুভ্রকেশী। সে মদীনায় লালিত-পালিত হতে থাকে। মক্কায় হাশিমের আত্মীয়দের কেউ তখনো শাইবার জন্মের কথা জানত না। আট বছর পর মুত্তালিব জানতে পারেন তাঁর প্রয়াত ভাইয়ের ছেলের ব্যাপারে। সিদ্ধান্ত নেন তাকে মক্কায় ফিরিয়ে আনার। পরে যখন তিনি তাকে নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করেন তখন লোকজন ভাবে তাঁর সাথে থাকা ছেলেটা বুঝি তাঁর দাস। ফলে ছেলেটিকে তারা 'আবদুল মুত্তালিব' (মুত্তালিবের দাস) বলে সম্বোধন করতে শুরু করে। আর এভাবেই শাইবা পরিচিত হয়ে যান আবদুল মুত্তালিব নামে।[৩]
সুদর্শন যুবক হয়ে বেড়ে ওঠা আবদুল মুত্তালিব একসময় কুরাইশ গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিতে পরিণত হন। ওইসময়ে তাঁর সমমর্যাদার কেউ ছিল না। তিনি কুরাইশদের গোত্রপতি ছিলেন এবং তাদের বাণিজ্যিক কাফেলাগুলোর তদারকি করতেন। দানশীলতার কারণে তাঁর খ্যাতি ছিল সবচেয়ে বেশি। অধিক পরিমাণে দান করার কারণে তাকে فَيَّاضٌ ‘ফায়্যাদ’ (অত্যধিক উদার) বলে অভিহিত করা হতো। অভাবী মানুষ, এমনকি পশুপাখিকেও তিনি খাবার-দাবার দিতেন। তাঁকে বলা হতো 'পাহাড়চূড়ার পশু-পাখিদের এবং ভূপৃষ্ঠের মানুষদের আপ্যায়নকারী'।
পবিত্র যামযাম কূপ পুনরাবিষ্কারের কৃতিত্বও আবদুল মুত্তালিবের। অনেক অনেক বছর আগে এখানে নির্জন মরুতে একাকী হন্যে হয়ে পানি খুঁজছিলেন মা হাজার (আলাইহাস সাল্লাম)। আল্লাহর কুদরতে তাঁর শিশুপুত্র ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)-এর পায়ের আঘাতে সে-সময় প্রবাহিত হয় এই কূপ। জুরহুম গোত্র মক্কা থেকে নির্বাসিত হওয়ার সময় এই কূপের স্থানটি ঢেকে দিয়ে যায়। তখন থেকেই তা সবার দৃষ্টির আড়ালে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গিয়েছিল। একরাতে আবদুল মুত্তালিবকে স্বপ্নে সে স্থানটি দেখানো হয় এবং তা খনন করতে আদেশ দেওয়া হয়। পরদিন তিনি নির্ধারিত স্থানে গিয়ে খনন করতেই পুরোনো সেই যামযামের ধারা আবারও বেরিয়ে আসে।[৪]
আবদুল মুত্তালিবের জীবদ্দশাতেই আবিসিনিয়ান শাসক আবরাহার হস্তিবাহিনী কা'বা আক্রমণ করে। এই বাহিনীকে কুরআনে বলা হয়েছে—“আসহাবিল ফীল” (হাতিওয়ালা)। আবরাহা ষাট হাজার যোদ্ধার এক বিশাল সৈন্যদল নিয়ে রওনা হয়েছিল কা'বা ধ্বংস করার নোংরা মানসিকতা নিয়ে। উদ্দেশ্য ছিল হাজ্জযাত্রীদের ইয়েমেনের নবনির্মিত গির্জা অভিমুখে তীর্থযাত্রায় বাধ্য করা। মুযদালিফা ও মিনার মাঝে রয়েছে মুহাসসির উপত্যকা। সেখানে এসে জড়ো হয় আবরাহার সেনাদল। যে হাতির পিঠে আবরাহা সওয়ার হয়েছিল, তা সকল মক্কাবাসীকে ভয়ে প্রকম্পিত করে ফেলেছিল। অথচ সেই ভয়ানক জন্তুই কিনা এবার আর অগ্রসর হতে সম্মতি দেয় না। পবিত্র এই গৃহের প্রতিরক্ষায় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা প্রেরণ করেন ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি। ষাট হাজার হানাদার সেনাকে পাখিগুলো ছোট ছোট পাথর দিয়ে আক্রমণ করে। এরই আঘাতে বিশাল এই বাহিনী চর্বিত ঘাসের মতো (كَعَصْفٍ مَّأْكُوْلٍ) নেতিয়ে পড়ে।[৫]
এই ঘটনা ঘটেছিল মুহাম্মাদ ﷺ-এর পৃথিবীতে আগমনের ৫০ বা ৫৫ দিন পূর্বে।
নবি ﷺ-এর পিতা আবদুল্লাহ। আবদুল মুত্তালিবের সবচেয়ে সুদর্শন, পুণ্যবান ও আদরের সন্তান। তাকে 'যাবীহ'ও বলা হয়। অর্থ-যাকে যবাই বা কুরবানি করা হয়েছে। যামযাম কূপ খননের সময় যখন কূপের নিশান দেখা গেল তখন কুরাইশও আবদুল মুত্তালিবের সাথে এই মর্যাদায় ভাগ বসাতে উদ্যত হলো। এ নিয়ে তাদের মাঝে তুমুল ঝগড়া ও বিরাট বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। পরে অতি কষ্টে এই বিবাদ-বিশৃঙ্খলার একটা মীমাংসা হয়। তবে তাদের বাহাদুরি দেখে আবদুল মুত্তালিব মান্নত করেন যে, আল্লাহ তাআলা যদি তাকে দশটি ছেলে দান করেন এবং প্রত্যেকেই প্রতিপক্ষের সাথে লড়াই করার উপযুক্ত হয়, তাহলে তিনি তাদের মধ্য থেকে একজনকে আল্লাহর রাস্তায় যবাই করবেন। পরবর্তী সময়ে আল্লাহ তাআলা তাঁর এই ইচ্ছাকে পূর্ণ করেন। তাঁর দশটি পুত্রসন্তানের সবাই এখন শক্তিশালী লড়াকু সৈনিক। ফলে আবদুল মুত্তালিব মান্নত পুরা করার উদ্দেশ্যে তার সব ছেলের নাম দিয়ে লটারির আয়োজন করেন। লটারিতে আবদুল্লাহর নাম আসে। তাই আবদুল্লাহকে যবাই করার জন্য কা'বা চত্বরে নিয়ে যান। কিন্তু কুরাইশ গোত্রের লোকেরা, বিশেষত আবদুল্লাহর ভাই ও মামারা প্রচণ্ডভাবে এ কাজের বিরোধিতা করেন। অবশেষে ঠিক হয় যে, আবদুল্লাহর বদলে এক শ উট যবাই করা হবে। এই সিদ্ধান্তানুসারে তিনি তাঁর ছেলে আবদুল্লাহর পরিবর্তে এক শ উট যবাই করেন।
আর এ ঘটনার ফলে আবদুল্লাহর এক নাম হয় 'যাবীহ'।[৬]
এ জন্যই নবিজি মুহাম্মাদ ﷺ-কে 'দুই যাবীহের সন্তান' বলে আখ্যায়িত করা হয়। এক যাবীহ হলেন ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) আর একজন নবিজির সম্মানিত পিতা আবদুল্লাহ। এমনিভাবে নবি ﷺ-কে আরও বলা হয় 'মুক্তিপ্রাপ্ত দুই নেকব্যক্তির সন্তান'। কারণ, ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) ও আবদুল্লাহ দু'জনের কুরবানিই কিছু মুক্তিপণের মাধ্যমে রহিত করা হয়। ইসমাঈলের পরিবর্তে কুরবানি হয় একটি দুম্বা এবং আবদুল্লাহর পরিবর্তে এক শ উট।
পিতার মতো আবদুল্লাহও ছিলেন সুন্দর ও সুপুরুষ। বানু যাহরা গোত্রের নেতা ওয়াহাবের মেয়ে আমিনার সাথে তাঁর বিয়ে হয়। আমিনা সেই সময়ের সবচেয়ে পবিত্র ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী ছিল। তাদের বংশও ছিল উঁচু। বিয়ের কিছুকাল পরে আমিনা অন্তঃসত্ত্বা হন। কিন্তু সন্তান জন্মের আগেই আবদুল মুত্তালিব আবদুল্লাহকে ব্যবসায়িক কাজে মদীনা বা সিরিয়ায় পাঠান। ফিরতি পথে মদীনায় তাঁর মৃত্যুর বেদনাবিধুর ঘটনা ঘটে। 'নাবিগা যুবইয়ানি' নামক স্থানে তাকে দাফন করা হয়। তখনো নবি ﷺ-এর জন্ম হয়নি।[৭]
টিকাঃ
[১] ভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াতের এই অনুমোদন অনেকটা বর্তমান যুগের ভিসার মতো। তাই এটি আদায় করতে পারা যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে। (অনুবাদক)
[২] পরে এ অঞ্চলের নাম হয় মদীনা মুনাওওয়ারা।
[৩] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/১৩৭-১৩৮; তাবারী, আত-তারীখ, ২/২৪৭।
[৪] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/১৪২-১৭৪।
[৫] ইবনু কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮/৪৫৮-৪৬৬; ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/৪৩-৬৫।
[৬] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/১৫১-১৫৫; তাবারি, তারীখ, ২/২৩৯-২৪৩।
[৭] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/১৫৬-১৫৭; তাবারি, আত-তারীখ, ২/২৪৬; আবুল কাসিম সুহাইলি, আর-রওদুল উনুফ, ১/১৮৪।
📄 জন্ম হলো মুহাম্মাদ ﷺ-এর
আবরাহার ব্যর্থ অভিযানের পঞ্চাশ কি পঞ্চান্ন দিন পরের ঘটনা। সময়টা ছিল বসন্তকাল। ৯ রবীউল আউয়াল[৮] সোমবার ভোরবেলায় মক্কা নগরীতে বানু হাশিম পরিবারে জন্ম হয় মুহাম্মাদ ﷺ-এর। সে বছরই আবরাহা মক্কায় আক্রমণ করেছিল। আরবিতে হাতিকে বলে ফীল। হস্তিবাহিনীর আক্রমণের ঘটনার কারণে বছরটি পরিচিত হয় আমুল ফীল (عَامُ الْفِيلِ) বা হস্তিবছর নামে। গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নবিজি ﷺ-এর জন্ম-তারিখ পড়ে ২২ এপ্রিল, ৫৭১ সন।
নবি ﷺ-এর জন্মের সময় ধাত্রীর কাজ আঞ্জাম দেন আবদুর রহমান ইবনু আউফ (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মা শিফা বিনতু আমর। সন্তান জন্মদানের পর রাসূল-এর মা আমিনা স্বপ্নে দেখেন যে, তাঁর শরীর থেকে একটি আলো বেরিয়ে সিরিয়ার প্রাসাদগুলো আলোকিত করে ফেলছে।[৯]
নাতি জন্মের খবর পেয়ে আনন্দে উদ্বেলিত হন আবদুল মুত্তালিব। নবজাতককে কা'বায় নিয়ে আল্লাহ তাআলার শোকরিয়া ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন এবং তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা করেন। আবদুল মুত্তালিবের ধারণা—তাঁর নাতি একদিন অনেক বড় হবে, খুবই প্রশংসিত হবে। তাই তিনি তার নাম রাখেন মুহাম্মাদ, অর্থ “প্রশংসিত”। আরবের সংস্কৃতি অনুযায়ী সপ্তম দিনে তিনি শিশু মুহাম্মাদের আকীকা করেন, চুল মুণ্ডন করেন এবং খতনা করেন। এরপর মক্কাবাসীদের নিমন্ত্রণ করে বেশ জমজমাট এক ভোজের আয়োজন করেন। [১০]
মুহাম্মাদ ﷺ-কে তাঁর বাবার দাসী উম্মু আইমান দেখা-শোনা করতেন। তিনি আবিসিনিয়ার অধিবাসী ছিলেন। তার আসল নাম ছিল বারাকাহ। আল্লাহ তাআলা তাঁকে অনেক নিয়ামাত ও অনুগ্রহ দান করেছেন। উম্মু আইমান (রদিয়াল্লাহু আনহা) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নুবুওয়াতের যুগ পেয়েছিলেন এবং মদীনায় হিজরতও করেছিলেন। নবিজি ﷺ-এর মৃত্যুর পাঁচ মাস পর তিনিও মদীনাতে ইন্তিকাল করেন।[১১]
টিকাঃ
[৮] ৯ রবিউল আউয়ালই যে নবি ﷺ-এর জন্মতারিখ তা নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ তাহকীক করেছেন মাহমুদ পাশা ফালাকি। দেখুন, নাতাইজুল আফহাম ফী তাকবীমিল আরব কবলাল ইসলাম, ২৮-৩৫। তবে ১২ রবিউল আউয়াল-এর কথাও কেউ কেউ বলেন।
[৯] আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৪/১২৭, ১২৮; ইবনু সা'দ, তবাকাতুল কুবরা, ১/১০২।
[১০] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ১/১৫৯-১৬০; তাবারি, আত-তারীখ, ২/১৫৬-১৫৭। বলা হয়, নবি খতনা করা অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেছেন। -ইবনুল জাওযি, তালকীহু ফুতুমি আহলিল আসার, ৪। কিন্তু ইবনুল কাইয়িম (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'এ ব্যাপারে কোনো হাদীস প্রমাণিত নেই।'-যাদুল মাআদ, ১/১৮।
[১১] মুসলিম, ১৭৭১।
📄 মুহাম্মাদ ﷺ-এর দুধপান
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মা আমিনার দুধ পান করানোর সাথে সাথে চাচা আবু লাহাবের দাসী সুওয়াইবাও তাঁকে দুধ পান করান। সে সময় রাসূল ﷺ-এর সাথে তার সন্তান মাসরূহও দুধ পান করছিল। এর আগে হামযা ইবনু আবদিল মুত্তালিব এবং আবূ সালামাকেও সুওয়াইবা দুধ পান করিয়েছিলেন। ফলে তারা তিন জন মুহাম্মাদ ﷺ-এর দুধভাই হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন।[১২]
টিকাঃ
[১২] বুখারি, ৫১০০, ৫১০১; আবূ নুআইম, দালাইলুন নুবুওয়াহ, ১/১৫৭; তাবারি, আত-তারীখ, ২/১৫৮।
📄 হালীমা সা’দিয়ার কোলে নবিজি
আরবদের একটি প্রথা ছিল শহরের খারাবি থেকে বাঁচানোর জন্য শিশুসন্তানকে দুধ পান করাতে বেদুইন নারীদের তত্ত্বাবধানে রাখা। তারা সন্তানকে শক্তিশালী ও সুঠাম করে গড়ে তোলার জন্য মরুভূমির প্রাকৃতিক ও রুক্ষ পরিবেশে পাঠিয়ে দিত। তা ছাড়া সারা আরবে বেদুইনদের ভাষাটাই ছিল আরবির বিশুদ্ধতম রূপ। ফলে তাদের সাথে বেড়ে উঠলে শিশুরা সহজেই প্রমিত আরবি ভাষা শিখতে পারত। আর শহরে বিভিন্ন মানুষের বসবাসের কারণে ভাষাও মিশ্র হয়ে যায়, তাই বিশুদ্ধ রূপ আর থাকে না।
আবদুল মুত্তালিব তাই নাতির জন্য এ রকম কোনও বেদুইন ধাত্রীর সন্ধানে ছিলেন। বানু সা'দ ইবনু বকর ইবনি হাওয়াযিন গোত্রের নারীদের একটি দল সে-সময় মক্কায় আসে শিশুর খোঁজে। আবদুল মুত্তালিব তাদের প্রত্যেককেই শিশু মুহাম্মাদকে নিতে বলেন। কিন্তু তাঁর পিতা নেই শুনে কেউ নিতে চায় না। বাপমরা শিশুর পরিবারের কাছ থেকে সাধারণত ভালো পারিশ্রমিক পাওয়া যায় না-এই ভাবনায় সবাই প্রত্যাখ্যান করতে থাকে।
ওদিকে পিছিয়ে পড়া হালীমা বিনতু আবী যুওয়াইব যখন শহরে এসে পৌঁছলেন, ততক্ষণে অন্য নারীরা কোনো-না-কোনো শিশুর দায়িত্ব পেয়ে গেছে। তার ভাগে ভালো কোনও শিশু মিলেনি। একরকম বাধ্য হয়েই তিনি আবদুল মুত্তালিবের কোলে থাকা শিশুটিকে নিয়ে নেন। কিন্তু তাঁকে কোলে তুলে নেওয়ার পরক্ষণেই তার এমন সৌভাগ্যের দরজা খুলে যায়, যা দেখে পৃথিবীবাসী অবাক বিস্ময়ে নির্বাক তাকিয়ে রয়। যার এক ঝলক আপনারা সামনের পৃষ্ঠাগুলোতে প্রত্যক্ষ করবেন, ইন শা আল্লাহ।
হালীমা সা'দিয়ার পিতা আবূ যুওয়াইবের নাম ছিল আবদুল্লাহ ইবনুল হারিস। তিনি নবি ﷺ-এর দুধনানা। হালীমার স্বামীর নাম হারিস ইবনু আবদিল উযযা। তারা উভয়েই সা'দ ইবনু বকর ইবনি হাওইয়াযিন গোত্রের সাথে সম্পৃক্ত। তাঁদের সন্তানেরা নবিজি ﷺ-এর দুধভাইবোন। তাঁদের তিন জন সন্তান-আবদুল্লাহ, আনিসা এবং জুযামা। জুযামার আরেক নাম শায়মা। এ নামেই তিনি প্রসিদ্ধ। বয়সে বড় ছিলেন। তিনিও শিশু মুহাম্মাদের দেখাশোনা করতেন, খাওয়াতেন এবং আদর করতেন।