📘 রাসূল সাঃ সম্পর্কে ১০০০ প্রশ্ন > 📄 রাসূল ﷺ-এর ইন্তিকাল

📄 রাসূল ﷺ-এর ইন্তিকাল


হিজরী একাদশ সনের সফর মাসের শেষ দিকে রাসূলুল্লাহ (সা) অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর অসুস্থতা ছিল মাথাব্যথা ও প্রচণ্ড জ্বর। অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি কিছুদিন পর্যন্ত নিজেই নামাযের ইমামতি করেন। যখন অসুস্থতা তীব্র আকার ধারণ করে এবং তিনি নামাযের জন্য মসজিদে যেতে অক্ষম হয়ে পড়েন, তখন তিনি আবূ বকর সিদ্দীক (রা)-কে নামাযের ইমামতি করার নির্দেশ দেন।
জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি উম্মুল মু'মিনীন আয়িশা (রা)-এর ঘরে কাটান। ইন্তিকালের দিন, সোমবার সকালে, তিনি কিছুটা সুস্থ বোধ করেন। তিনি ঘরের পর্দা সরিয়ে মসজিদে সাহাবীদেরকে আবূ বকর (রা)-এর পেছনে ফজরের নামায আদায় করতে দেখে মৃদু হাসেন। এই দৃশ্য দেখে সাহাবীরা অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং ভেবেছিলেন তিনি সুস্থ হয়ে উঠেছেন।
কিন্তু বেলা বাড়ার সাথে সাথে তাঁর অবস্থা পুনরায় খারাপ হতে থাকে। দ্বিপ্রহরের দিকে তিনি আয়িশা (রা)-এর কোলে মাথা রেখে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পূর্বে তাঁর শেষ কথা ছিল: “বালির রাফীকিল আ'লা” (মহান বন্ধুর সান্নিধ্যে)।
দিনটি ছিল হিজরী ১১ সনের রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ, সোমবার। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর।
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ইন্তিকালের সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে মদীনা জুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। সাহাবীগণ শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন। উমর (রা)-এর মতো মহান সাহাবীও এ সংবাদ বিশ্বাস করতে পারছিলেন না এবং তরবারি হাতে নিয়ে ঘোষণা করেন যে, “যে বলবে রাসূলুল্লাহ (সা) মারা গেছেন, আমি তার শিরশ্ছেদ করব।”
এ কঠিন মুহূর্তে আবূ বকর (রা) অত্যন্ত প্রজ্ঞা ও দৃঢ়তার সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর হুজরায় প্রবেশ করে তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল থেকে চাদর সরিয়ে কপালে চুম্বন করেন এবং বলেন, “আমার পিতা-মাতা আপনার উপর কুরবান হোক! আল্লাহ আপনার উপর দুটি মৃত্যু একত্রিত করবেন না। আপনার জন্য যে মৃত্যু নির্ধারিত ছিল, তা আপনি আস্বাদন করেছেন।”
এরপর তিনি বেরিয়ে এসে সমবেত জনতাকে উদ্দেশ্য করে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। তিনি বলেন, “হে লোকসকল! তোমাদের মধ্যে যারা মুহাম্মাদের উপাসনা করতে, তারা জেনে রাখো যে, মুহাম্মদ (সা) মৃত্যুবরণ করেছেন। আর যারা আল্লাহর উপাসনা করতে, তারা জেনে রাখো যে, আল্লাহ চিরঞ্জীব, তাঁর মৃত্যু নেই।” এরপর তিনি পবিত্র কুরআনের সূরা আলে ইমরানের ১৪৪ নং আয়াতটি তিলাওয়াত করেন।
আবূ বকর (রা)-এর ভাষণ শোনার পর সাহাবীগণ শান্ত হন এবং নিজেদেরকে সামলে নেন। এরপর ‘সাকীফায়ে বনূ সায়েদা’ নামক স্থানে মুহাজির ও আনসারদের সর্বসম্মতিক্রমে আবূ বকর (রা)-কে খলীফা নির্বাচিত করা হয়। মঙ্গলবার দিনভর মানুষ তাঁর হাতে বাই'আত গ্রহণ করেন।
রাসূলুল্লাহ (সা)-কে গোসল ও কাফন পরানোর পর বুধবার রাতে আয়িশা (রা)-এর হুজরাতেই, যেখানে তিনি ইন্তিকাল করেছিলেন, সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়।

📘 রাসূল সাঃ সম্পর্কে ১০০০ প্রশ্ন > 📄 রাসূল ﷺ-এর স্ত্রীগণ ও সন্তান-সন্ততি

📄 রাসূল ﷺ-এর স্ত্রীগণ ও সন্তান-সন্ততি


রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পবিত্র স্ত্রীগণ ‘উম্মাহাতুল মু'মিনীন’ বা ‘বিশ্বাসীদের মাতা’ হিসেবে সম্মানিত। তাঁর স্ত্রীগণের তালিকা নিম্নরূপ:
১. খাদীজা বিন্ত খুওয়াইলিদ (রা): রাসূলুল্লাহ (সা)-এর প্রথম স্ত্রী। তাঁর জীবদ্দশায় রাসূলুল্লাহ (সা) অন্য কোনো বিবাহ করেননি।
২. সাওদা বিন্ত যাম'আ (রা)
৩. আয়িশা বিন্ত আবূ বকর (রা)
৪. হাফসা বিন্ত উমর (রা)
৫. যায়নাব বিন্ত খুযায়মা (রা): তাঁকে ‘উম্মুল মাসাকীন’ বা ‘দরিদ্রদের মাতা’ বলা হতো।
৬. উম্মু সালামা (হিন্দ বিন্ত আবী উমাইয়া) (রা)
৭. যায়নাব বিন্ত জাহশ (রা)
৮. জুওয়াইরিয়া বিন্ত আল-হারিস (রা)
৯. উম্মু হাবীবা (রামলা বিন্ত আবী সুফিয়ান) (রা)
১০. সাফিয়্যা বিন্ত হুয়াই ইব্‌ন আখতাব (রা)
১১. মায়মুনা বিন্ত আল-হারিস (রা)
এঁরা ছাড়াও রাসূলুল্লাহ (সা)-এর দু’জন দাসী ছিলেন, যাঁদের সাথে তিনি স্ত্রীর মতো আচরণ করতেন:
১. মারিয়া কিবতিয়া (রা): মিসরের শাসক মুকাউকিসের পক্ষ থেকে প্রেরিত। তাঁর গর্ভেই রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পুত্র ইবরাহীম (রা) জন্মগ্রহণ করেন।
২. রায়হানা বিন্ত যায়দ (রা): তিনি ছিলেন বনূ কুরায়যা গোত্রের অন্তর্ভুক্ত।

*সন্তান-সন্ততি:*
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাতজন সন্তান ছিলেন—তিনজন পুত্র এবং চারজন কন্যা। ইবরাহীম (রা) ছাড়া সকল সন্তানই খাদীজা (রা)-এর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন।
*পুত্রগণ:*
১. কাসিম (রা): তাঁর নামানুসারেই রাসূলুল্লাহ (সা)-এর উপনাম ছিল ‘আবুল কাসিম’। তিনি শৈশবেই ইন্তিকাল করেন।
২. আবদুল্লাহ (রা): তাঁকে ‘তayyib’ ও ‘তাহির’ উপাধিতেও ডাকা হতো। তিনিও শৈশবে ইন্তিকাল করেন।
৩. ইবরাহীম (রা): তিনি ছিলেন মারিয়া কিবতিয়া (রা)-এর গর্ভজাত সন্তান। তিনিও শৈশবে ইন্তিকাল করেন।

*কন্যাগণ:*
১. যায়নাব (রা): তাঁকে আবুল আস ইব্‌ন রাবী'র নিকট বিবাহ দেওয়া হয়।
২. রুকাইয়া (রা): তাঁকে উসমান ইব্‌ন আফফান (রা)-এর নিকট বিবাহ দেওয়া হয়।
৩. উম্মু কুলসুম (রা): রুকাইয়া (রা)-এর ইন্তিকালের পর তাঁকে উসমান (রা)-এর নিকট বিবাহ দেওয়া হয়।
৪. ফাতিমা (রা): তাঁকে আলী ইব্‌ন আবী তালিব (রা)-এর নিকট বিবাহ দেওয়া হয়। তিনিই ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সন্তানদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ এবং একমাত্র সন্তান যিনি তাঁর ইন্তিকালের পরেও জীবিত ছিলেন।

📘 রাসূল সাঃ সম্পর্কে ১০০০ প্রশ্ন > 📄 এক নজরে মুহাম্মদ ﷺ-এর পবিত্র জীবন

📄 এক নজরে মুহাম্মদ ﷺ-এর পবিত্র জীবন


*জন্ম:* ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দ, ১২ রবিউল আউয়াল, সোমবার, মক্কা নগরীতে।
*নবুয়ত প্রাপ্তি:* ৬১০ খ্রিষ্টাব্দ, ৪০ বছর বয়সে, হেরা গুহায়।
*মক্কী জীবন (১৩ বছর):*
- প্রথম ৩ বছর: গোপনে ইসলামের দাওয়াত।
- পরবর্তী ১০ বছর: প্রকাশ্যে দাওয়াত, কুরায়শদের চরম নির্যাতন ও বিরোধিতা।
- শি'আবে আবী তালিবে ৩ বছর অবরোধ।
- দুঃখের বছর: চাচা আবূ তালিব ও স্ত্রী খাদীজা (রা)-এর ইন্তিকাল।
- তায়েফে দাওয়াত ও মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা।
- ইসরা ও মি'রাজ।
- আকাবার প্রথম ও দ্বিতীয় বাই'আত।

*মাদানী জীবন (১০ বছর):*
- হিজরত: ৬২২ খ্রিষ্টাব্দ, ৫৩ বছর বয়সে মদীনা গমন।
- মদীনার সনদ: প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।
- বদরের যুদ্ধ (২য় হিজরী): মুসলমানদের প্রথম decisive বিজয়।
- উহুদের যুদ্ধ (৩য় হিজরী): মুসলমানদের সাময়িক বিপর্যয়।
- খন্দকের যুদ্ধ (৫ম হিজরী): সম্মিলিত বাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয়।
- হুদায়বিয়ার সন্ধি (৬ষ্ঠ হিজরী): একটি সুস্পষ্ট বিজয়।
- খায়বার বিজয় (৭ম হিজরী)।
- মক্কা বিজয় (৮ম হিজরী): রক্তপাতহীন বিজয় ও সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা।
- হুনাইনের যুদ্ধ (৮ম হিজরী)।
- তাবুক অভিযান (৯ম হিজরী)।
- প্রতিনিধি দলের বছর (৯ম হিজরী)।
- বিদায় হজ্ব (১০ম হিজরী): আরাফাতের ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণ।

*ইন্তিকাল:* ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দ, ১১ হিজরী, ১২ রবিউল আউয়াল, সোমবার, ৬৩ বছর বয়সে মদীনা মুনাওয়ারায়।

📘 রাসূল সাঃ সম্পর্কে ১০০০ প্রশ্ন > 📄 বিবিধ-১

📄 বিবিধ-১


*রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দৈহিক অবয়ব ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য (শামায়েল)*

*দৈহিক গঠন:*
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ছিলেন মাঝারি গড়নের; খুব লম্বা বা বেঁটেও ছিলেন না। তাঁর গায়ের রঙ ছিল দুধে-আলতায় মিশ্রিত গোলাপী আভা युक्त। তাঁর মুখমণ্ডল ছিল পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল। তাঁর চোখ ছিল টানাটানা ও কালো। চোখের মণি ছিল গভীর কালো এবং পাপড়ি ছিল ঘন ও লম্বা। তাঁর ললাট ছিল প্রশস্ত, ভ্রূ ছিল ঘন এবং সংযুক্ত। তাঁর দাড়ি ছিল ঘন। কাঁধের মধ্যবর্তী স্থানে 'মোহরে নবুয়ত' বা নবুয়তের সীলমোহর ছিল, যা দেখতে কবুতরের ডিমের মতো লালচে মাংসপিণ্ড ছিল।

*চারিত্রিক মাধুর্য:*
তিনি ছিলেন সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। আল্লাহ তা'আলা নিজেই তাঁর চরিত্রের প্রশংসা করে বলেছেন, “নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের উপর রয়েছেন।” (সূরা আল-কালাম: ৪)।
তিনি ছিলেন সবচেয়ে সত্যবাদী, এজন্য নবুয়তের আগেও তিনি ‘আল-আমীন’ (বিশ্বস্ত) ও ‘আস-সাদিক’ (সত্যবাদী) উপাধিতে ভূষিত ছিলেন। তিনি ছিলেন সর্বাধিক দয়ালু ও ক্ষমাশীল। মক্কা বিজয়ের দিন তিনি তাঁর রক্তপিপাসু শত্রুদেরকেও ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন সবচেয়ে বিনয়ী; নিজের কাজ নিজে করতেন, কাপড়ে তালি লাগাতেন এবং জুতা মেরামত করতেন। তিনি শিশুদের ভালোবাসতেন, তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন এবং তাদের সাথে খেলা করতেন। তিনি ছিলেন সাহসিকতার মূর্ত প্রতীক, যুদ্ধের ময়দানে তিনি থাকতেন সবার আগে। তাঁর দানশীলতা ছিল অকল্পনীয়, বিশেষ করে রমযান মাসে তা বহুগুণে বেড়ে যেত। তিনি কখনো কোনো প্রার্থীকে ‘না’ বলতেন না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00