📄 হিজরতের দশম বছর
এ বছর রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর জীবনের একমাত্র ও শেষ হজ্জ পালন করেন, যা ‘হাজ্জাতুল বিদা’ বা ‘বিদায় হজ্ব’ নামে পরিচিত। যিলকদ মাসে তিনি লক্ষাধিক সাহাবীসহ হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কা যাত্রা করেন।
যিলহজ্জ মাসের নয় তারিখে আরাফাতের ময়দানে ‘জাবালে রহমত’ পাহাড়ে দাঁড়িয়ে তিনি মানব ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় ভাষণ দেন, যা ‘বিদায় হজ্জের ভাষণ’ নামে খ্যাত। এ ভাষণে তিনি ইসলামের মৌলিক নীতিসমূহ, যেমন—মানবতার ঐক্য, নারীর অধিকার, সুদ হারাম হওয়া, পরস্পরের জান-মালের নিরাপত্তা, বংশীয় অহংকার পরিহার এবং কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
এ ভাষণের এক পর্যায়ে তিনি সমবেত জনতাকে জিজ্ঞেস করেন, “আমি কি তোমাদের কাছে আমার রবের পয়গাম পৌঁছে দিয়েছি?” সকলে সমস্বরে উত্তর দেন, “হ্যাঁ, আপনি পৌঁছে দিয়েছেন।” তখন তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেন, “হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন।”
এ হজ্জের সময়ই আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত নাযিল করেন: “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের উপর আমার নিয়ামত পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।” (সূরা আল-মায়িদা: ৩)।
📄 ঐ বছরের অন্যান্য ঘটনাবলী
বিদায় হজ্ব ছাড়াও এ বছর আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। ইয়েমেনের নাজরান থেকে খ্রিষ্টানদের একটি প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে আসে এবং ধর্ম বিষয়ে তাঁর সাথে আলোচনা করে। তারা সত্য উপলব্ধি করা সত্ত্বেও তা মেনে নিতে অস্বীকার করলে রাসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে ‘মুবাহালা’ বা পারস্পরিক অভিশাপের জন্য আহ্বান জানান। কিন্তু তারা মুবাহালা করতে ভীত হয়ে জিযিয়া বা কর দেওয়ার শর্তে সন্ধি করে।
এ সময়েই ভণ্ড নবীদের উদ্ভব ঘটে। ইয়ামামার মুসায়লামা কাযযাব এবং ইয়েমেনের আসওয়াদ আনসী নবুওয়ত দাবী করে। রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের দমনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
রাসূলুল্লাহ (সা) বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলাম প্রচার ও যাকাত আদায়ের জন্য দূত ও কর্মচারী প্রেরণ অব্যাহত রাখেন। তিনি আলী (রা)-কে ইয়েমেনে এবং খালিদ ইব্ন ওয়ালিদ (রা)-কে বনূ হারিছ গোত্রের কাছে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার জন্য প্রেরণ করেন।
📄 হিজরতের একাদশ বছর
হিজরী একাদশ সনের সফর মাসের শেষের দিকে রাসূলুল্লাহ (সা) অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থতার পূর্বেই তিনি মুতার যুদ্ধে শহীদ যায়দ ইব্ন হারিসা (রা)-এর পুত্র উসামা ইব্ন যায়দ (রা)-কে সেনাপতি নিযুক্ত করে রোমানদের বিরুদ্ধে একটি বাহিনী প্রেরণ করার নির্দেশ দেন। কিন্তু তাঁর অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ায় বাহিনীটি যাত্রা স্থগিত করে।
অসুস্থতা তীব্র হলে তিনি আবূ বকর (রা)-কে নামাযের ইমামতি করার নির্দেশ দেন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি উম্মুল মু'মিনীন আয়িশা (রা)-এর ঘরে অবস্থান করেন।
রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ, সোমবার দ্বিপ্রহরে তিনি ‘আর-রাফীক আল-আ'লা’ বা ‘মহান বন্ধুর সান্নিধ্যে’ বলে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
তাঁর ইন্তিকালের সংবাদে সাহাবীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। উমর (রা)-এর মতো সাহাবীও এ সংবাদ বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তখন আবূ বকর (রা) অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে পরিস্থিতি সামাল দেন। তিনি সমবেত জনতাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “যারা মুহাম্মাদের ইবাদত করতে, তারা জেনে রাখো, মুহাম্মদ মৃত্যুবরণ করেছেন। আর যারা আল্লাহর ইবাদত করতে, তারা জেনে রাখো, আল্লাহ চিরঞ্জীব, তাঁর মৃত্যু নেই।” এরপর তিনি কুরআনের এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন: “আর মুহাম্মদ একজন রাসূল ছাড়া আর কিছু নন; তাঁর পূর্বে বহু রাসূল গত হয়েছেন।” (সূরা আলে ইমরান: ১৪৪)।
এরপর আনসার ও মুহাজিরদের আলোচনার ভিত্তিতে ‘সাকীফায়ে বনূ সায়েদা’ নামক স্থানে আবূ বকর (রা)-কে সর্বসম্মতিক্রমে প্রথম খলীফা নির্বাচিত করা হয়। বুধবার রাতে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে আয়িশা (রা)-এর ঘরেই দাফন করা হয়।
📄 রাসূল ﷺ-এর ইন্তিকাল
হিজরী একাদশ সনের সফর মাসের শেষ দিকে রাসূলুল্লাহ (সা) অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর অসুস্থতা ছিল মাথাব্যথা ও প্রচণ্ড জ্বর। অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি কিছুদিন পর্যন্ত নিজেই নামাযের ইমামতি করেন। যখন অসুস্থতা তীব্র আকার ধারণ করে এবং তিনি নামাযের জন্য মসজিদে যেতে অক্ষম হয়ে পড়েন, তখন তিনি আবূ বকর সিদ্দীক (রা)-কে নামাযের ইমামতি করার নির্দেশ দেন।
জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি উম্মুল মু'মিনীন আয়িশা (রা)-এর ঘরে কাটান। ইন্তিকালের দিন, সোমবার সকালে, তিনি কিছুটা সুস্থ বোধ করেন। তিনি ঘরের পর্দা সরিয়ে মসজিদে সাহাবীদেরকে আবূ বকর (রা)-এর পেছনে ফজরের নামায আদায় করতে দেখে মৃদু হাসেন। এই দৃশ্য দেখে সাহাবীরা অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং ভেবেছিলেন তিনি সুস্থ হয়ে উঠেছেন।
কিন্তু বেলা বাড়ার সাথে সাথে তাঁর অবস্থা পুনরায় খারাপ হতে থাকে। দ্বিপ্রহরের দিকে তিনি আয়িশা (রা)-এর কোলে মাথা রেখে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পূর্বে তাঁর শেষ কথা ছিল: “বালির রাফীকিল আ'লা” (মহান বন্ধুর সান্নিধ্যে)।
দিনটি ছিল হিজরী ১১ সনের রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ, সোমবার। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর।
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ইন্তিকালের সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে মদীনা জুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। সাহাবীগণ শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন। উমর (রা)-এর মতো মহান সাহাবীও এ সংবাদ বিশ্বাস করতে পারছিলেন না এবং তরবারি হাতে নিয়ে ঘোষণা করেন যে, “যে বলবে রাসূলুল্লাহ (সা) মারা গেছেন, আমি তার শিরশ্ছেদ করব।”
এ কঠিন মুহূর্তে আবূ বকর (রা) অত্যন্ত প্রজ্ঞা ও দৃঢ়তার সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর হুজরায় প্রবেশ করে তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল থেকে চাদর সরিয়ে কপালে চুম্বন করেন এবং বলেন, “আমার পিতা-মাতা আপনার উপর কুরবান হোক! আল্লাহ আপনার উপর দুটি মৃত্যু একত্রিত করবেন না। আপনার জন্য যে মৃত্যু নির্ধারিত ছিল, তা আপনি আস্বাদন করেছেন।”
এরপর তিনি বেরিয়ে এসে সমবেত জনতাকে উদ্দেশ্য করে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। তিনি বলেন, “হে লোকসকল! তোমাদের মধ্যে যারা মুহাম্মাদের উপাসনা করতে, তারা জেনে রাখো যে, মুহাম্মদ (সা) মৃত্যুবরণ করেছেন। আর যারা আল্লাহর উপাসনা করতে, তারা জেনে রাখো যে, আল্লাহ চিরঞ্জীব, তাঁর মৃত্যু নেই।” এরপর তিনি পবিত্র কুরআনের সূরা আলে ইমরানের ১৪৪ নং আয়াতটি তিলাওয়াত করেন।
আবূ বকর (রা)-এর ভাষণ শোনার পর সাহাবীগণ শান্ত হন এবং নিজেদেরকে সামলে নেন। এরপর ‘সাকীফায়ে বনূ সায়েদা’ নামক স্থানে মুহাজির ও আনসারদের সর্বসম্মতিক্রমে আবূ বকর (রা)-কে খলীফা নির্বাচিত করা হয়। মঙ্গলবার দিনভর মানুষ তাঁর হাতে বাই'আত গ্রহণ করেন।
রাসূলুল্লাহ (সা)-কে গোসল ও কাফন পরানোর পর বুধবার রাতে আয়িশা (রা)-এর হুজরাতেই, যেখানে তিনি ইন্তিকাল করেছিলেন, সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়।