📄 ঐ বছরের অন্যান্য ঘটনাবলী
নবম হিজরীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল আরবের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিনিধি দলের আগমন। এ বছর সাকীফ গোত্রের প্রতিনিধি দল ইসলাম গ্রহণ করে। এছাড়াও বনূ তামীম, বনূ আমের, বনূ হানীফাসহ বহু গোত্রের প্রতিনিধিরা মদীনায় এসে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর হাতে বাই'আত গ্রহণ করে।
এ বছরই মুনাফিকদের নেতা আবদুল্লাহ ইব্ন উবাই ইব্ন সুলূলের মৃত্যু হয়। তার পুত্র একজন নিষ্ঠাবান মুসলমান ছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে তার পিতার জানাযার সালাত পড়ানোর জন্য অনুরোধ করেন। দয়ার নবী (সা) তার অনুরোধে জানাযা পড়াতে সম্মত হন, কিন্তু উমর (রা) এর বিরোধিতা করেন। তখন আল্লাহ তা'আলা আয়াত নাযিল করে মুনাফিকদের জানাযা পড়াতে নিষেধ করে দেন। (সূরা আত-তাওবা: ৮৪)।
এ বছরই যাকাত ফরয হওয়ার পর তা আদায়ের জন্য বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মচারী নিয়োগ করা হয়।
📄 হিজরতের দশম বছর
এ বছর রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর জীবনের একমাত্র ও শেষ হজ্জ পালন করেন, যা ‘হাজ্জাতুল বিদা’ বা ‘বিদায় হজ্ব’ নামে পরিচিত। যিলকদ মাসে তিনি লক্ষাধিক সাহাবীসহ হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কা যাত্রা করেন।
যিলহজ্জ মাসের নয় তারিখে আরাফাতের ময়দানে ‘জাবালে রহমত’ পাহাড়ে দাঁড়িয়ে তিনি মানব ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় ভাষণ দেন, যা ‘বিদায় হজ্জের ভাষণ’ নামে খ্যাত। এ ভাষণে তিনি ইসলামের মৌলিক নীতিসমূহ, যেমন—মানবতার ঐক্য, নারীর অধিকার, সুদ হারাম হওয়া, পরস্পরের জান-মালের নিরাপত্তা, বংশীয় অহংকার পরিহার এবং কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
এ ভাষণের এক পর্যায়ে তিনি সমবেত জনতাকে জিজ্ঞেস করেন, “আমি কি তোমাদের কাছে আমার রবের পয়গাম পৌঁছে দিয়েছি?” সকলে সমস্বরে উত্তর দেন, “হ্যাঁ, আপনি পৌঁছে দিয়েছেন।” তখন তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেন, “হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন।”
এ হজ্জের সময়ই আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত নাযিল করেন: “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের উপর আমার নিয়ামত পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।” (সূরা আল-মায়িদা: ৩)।
📄 ঐ বছরের অন্যান্য ঘটনাবলী
বিদায় হজ্ব ছাড়াও এ বছর আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। ইয়েমেনের নাজরান থেকে খ্রিষ্টানদের একটি প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে আসে এবং ধর্ম বিষয়ে তাঁর সাথে আলোচনা করে। তারা সত্য উপলব্ধি করা সত্ত্বেও তা মেনে নিতে অস্বীকার করলে রাসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে ‘মুবাহালা’ বা পারস্পরিক অভিশাপের জন্য আহ্বান জানান। কিন্তু তারা মুবাহালা করতে ভীত হয়ে জিযিয়া বা কর দেওয়ার শর্তে সন্ধি করে।
এ সময়েই ভণ্ড নবীদের উদ্ভব ঘটে। ইয়ামামার মুসায়লামা কাযযাব এবং ইয়েমেনের আসওয়াদ আনসী নবুওয়ত দাবী করে। রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের দমনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
রাসূলুল্লাহ (সা) বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলাম প্রচার ও যাকাত আদায়ের জন্য দূত ও কর্মচারী প্রেরণ অব্যাহত রাখেন। তিনি আলী (রা)-কে ইয়েমেনে এবং খালিদ ইব্ন ওয়ালিদ (রা)-কে বনূ হারিছ গোত্রের কাছে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার জন্য প্রেরণ করেন।
📄 হিজরতের একাদশ বছর
হিজরী একাদশ সনের সফর মাসের শেষের দিকে রাসূলুল্লাহ (সা) অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থতার পূর্বেই তিনি মুতার যুদ্ধে শহীদ যায়দ ইব্ন হারিসা (রা)-এর পুত্র উসামা ইব্ন যায়দ (রা)-কে সেনাপতি নিযুক্ত করে রোমানদের বিরুদ্ধে একটি বাহিনী প্রেরণ করার নির্দেশ দেন। কিন্তু তাঁর অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ায় বাহিনীটি যাত্রা স্থগিত করে।
অসুস্থতা তীব্র হলে তিনি আবূ বকর (রা)-কে নামাযের ইমামতি করার নির্দেশ দেন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি উম্মুল মু'মিনীন আয়িশা (রা)-এর ঘরে অবস্থান করেন।
রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ, সোমবার দ্বিপ্রহরে তিনি ‘আর-রাফীক আল-আ'লা’ বা ‘মহান বন্ধুর সান্নিধ্যে’ বলে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
তাঁর ইন্তিকালের সংবাদে সাহাবীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। উমর (রা)-এর মতো সাহাবীও এ সংবাদ বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তখন আবূ বকর (রা) অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে পরিস্থিতি সামাল দেন। তিনি সমবেত জনতাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “যারা মুহাম্মাদের ইবাদত করতে, তারা জেনে রাখো, মুহাম্মদ মৃত্যুবরণ করেছেন। আর যারা আল্লাহর ইবাদত করতে, তারা জেনে রাখো, আল্লাহ চিরঞ্জীব, তাঁর মৃত্যু নেই।” এরপর তিনি কুরআনের এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন: “আর মুহাম্মদ একজন রাসূল ছাড়া আর কিছু নন; তাঁর পূর্বে বহু রাসূল গত হয়েছেন।” (সূরা আলে ইমরান: ১৪৪)।
এরপর আনসার ও মুহাজিরদের আলোচনার ভিত্তিতে ‘সাকীফায়ে বনূ সায়েদা’ নামক স্থানে আবূ বকর (রা)-কে সর্বসম্মতিক্রমে প্রথম খলীফা নির্বাচিত করা হয়। বুধবার রাতে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে আয়িশা (রা)-এর ঘরেই দাফন করা হয়।