📄 হিজরতের নবম বছর
এ বছরটিকে ‘আমুল ওফূদ’ বা ‘প্রতিনিধি দলের বছর’ বলা হয়। মক্কা বিজয়ের পর আরবের বিভিন্ন গোত্র দলে দলে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে এসে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে।
এ বছরই তাবুক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) খবর পান যে, রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস মদীনা আক্রমণের জন্য এক বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করছে। এ খবর পেয়ে রাসূলুল্লাহ (সা) গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহ ও ফসলের মৌসুম হওয়া সত্ত্বেও সাহাবীদেরকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দেন। প্রায় ত্রিশ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে তিনি রোমানদের মুকাবিলা করার জন্য তাবুক পর্যন্ত অগ্রসর হন। কিন্তু সেখানে পৌঁছে দেখা যায় যে, রোমান বাহিনীর আগমনের খবরটি ছিল গুজব। রাসূলুল্লাহ (সা) সেখানে প্রায় বিশ দিন অবস্থান করেন এবং পার্শ্ববর্তী গোত্রগুলোর সাথে চুক্তি সম্পাদন করে মদীনায় ফিরে আসেন।
এ যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর মুনাফিকদের নির্মিত ‘মসজিদে দিরার’ ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এ বছরই রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কন্যা উম্মু কুলসুম (রা) এবং হাবশার বাদশাহ নাজাশী ইন্তিকাল করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় নাজাশীর গায়েবানা জানাযা পড়ান।
📄 ইসলামের প্রথম হজ্ব
হিজরী নবম সনে প্রথমবারের মতো মুসলিম নেতৃত্বে হজ্জের আয়োজন করা হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) এ বছর নিজে হজ্জে না গিয়ে আবূ বকর সিদ্দীক (রা)-কে ‘আমীরুল হজ্ব’ বা হজ্জের নেতা নিযুক্ত করে প্রায় তিনশ' মুসলমানসহ মক্কায় প্রেরণ করেন।
আবূ বকর (রা)-এর নেতৃত্বে মুসলিম কাফেলা রওয়ানা হওয়ার পর সূরা আত-তাওবার প্রাথমিক আয়াতগুলো নাযিল হয়, যেখানে মুশরিকদের সাথে সম্পাদিত সকল চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) এ আয়াতগুলো হজ্জের সময় সর্বসাধারণের নিকট ঘোষণা করার জন্য আলী ইব্ন আবী তালিব (রা)-কে প্রেরণ করেন।
আলী (রা) আরাফাতের দিন এবং কুরবানীর দিন মিনায় দাঁড়িয়ে সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে ঘোষণা করেন যে, (১) এ বছরের পর থেকে কোন মুশরিক কা'বা ঘরে প্রবেশ করতে পারবে না, (২) কেউ উলঙ্গ অবস্থায় কা'বা তাওয়াফ করতে পারবে না, (৩) জান্নাতে কেবল মুসলিমরাই প্রবেশ করবে এবং (৪) যাদের সাথে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চুক্তি রয়েছে, তা নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত বলবৎ থাকবে, আর যাদের সাথে কোন চুক্তি নেই, তাদের জন্য চার মাসের নিরাপত্তা দেওয়া হলো।
📄 ঐ বছরের অন্যান্য ঘটনাবলী
নবম হিজরীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল আরবের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিনিধি দলের আগমন। এ বছর সাকীফ গোত্রের প্রতিনিধি দল ইসলাম গ্রহণ করে। এছাড়াও বনূ তামীম, বনূ আমের, বনূ হানীফাসহ বহু গোত্রের প্রতিনিধিরা মদীনায় এসে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর হাতে বাই'আত গ্রহণ করে।
এ বছরই মুনাফিকদের নেতা আবদুল্লাহ ইব্ন উবাই ইব্ন সুলূলের মৃত্যু হয়। তার পুত্র একজন নিষ্ঠাবান মুসলমান ছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে তার পিতার জানাযার সালাত পড়ানোর জন্য অনুরোধ করেন। দয়ার নবী (সা) তার অনুরোধে জানাযা পড়াতে সম্মত হন, কিন্তু উমর (রা) এর বিরোধিতা করেন। তখন আল্লাহ তা'আলা আয়াত নাযিল করে মুনাফিকদের জানাযা পড়াতে নিষেধ করে দেন। (সূরা আত-তাওবা: ৮৪)।
এ বছরই যাকাত ফরয হওয়ার পর তা আদায়ের জন্য বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মচারী নিয়োগ করা হয়।
📄 হিজরতের দশম বছর
এ বছর রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর জীবনের একমাত্র ও শেষ হজ্জ পালন করেন, যা ‘হাজ্জাতুল বিদা’ বা ‘বিদায় হজ্ব’ নামে পরিচিত। যিলকদ মাসে তিনি লক্ষাধিক সাহাবীসহ হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কা যাত্রা করেন।
যিলহজ্জ মাসের নয় তারিখে আরাফাতের ময়দানে ‘জাবালে রহমত’ পাহাড়ে দাঁড়িয়ে তিনি মানব ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় ভাষণ দেন, যা ‘বিদায় হজ্জের ভাষণ’ নামে খ্যাত। এ ভাষণে তিনি ইসলামের মৌলিক নীতিসমূহ, যেমন—মানবতার ঐক্য, নারীর অধিকার, সুদ হারাম হওয়া, পরস্পরের জান-মালের নিরাপত্তা, বংশীয় অহংকার পরিহার এবং কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
এ ভাষণের এক পর্যায়ে তিনি সমবেত জনতাকে জিজ্ঞেস করেন, “আমি কি তোমাদের কাছে আমার রবের পয়গাম পৌঁছে দিয়েছি?” সকলে সমস্বরে উত্তর দেন, “হ্যাঁ, আপনি পৌঁছে দিয়েছেন।” তখন তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেন, “হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন।”
এ হজ্জের সময়ই আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত নাযিল করেন: “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের উপর আমার নিয়ামত পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।” (সূরা আল-মায়িদা: ৩)।