📄 হিজরতের সপ্তম বছর
এ বছর রাসূলুল্লাহ (সা) হুদায়বিয়ার সন্ধি অনুযায়ী কাযা উমরা আদায় করার জন্য মক্কার দিকে যাত্রা করেন। মুসলমানরা তিন দিন মক্কায় অবস্থান করেন এবং নির্বিঘ্নে উমরা পালন করেন। এ সফরেই রাসূলুল্লাহ (সা) মায়মুনা বিন্ত আল-হারিস (রা)-কে বিবাহ করেন।
এ বছরই হাবশা (আবিসিনিয়া) থেকে মুহাজিরদের শেষ দলটি জাফর ইব্ন আবী তালিব (রা)-এর নেতৃত্বে মদীনায় ফিরে আসে। রাসূলুল্লাহ (সা) খায়বার বিজয় শেষে তাদের আগমনে অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং বলেন, “আমি খায়বার বিজয়ের জন্য বেশি আনন্দিত, নাকি জাফরের আগমনের জন্য, তা বলতে পারছি না।”
এ বছর বিভিন্ন গোত্রের বিরুদ্ধে কয়েকটি সারিয়্যা বা ছোট আকারের সেনাদল প্রেরণ করা হয়।
📄 গাযওয়ায়ে কায়বা
হুদায়বিয়ার সন্ধির পর রাসূলুল্লাহ (সা) ইয়াহূদীদের ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রস্থল খায়বারের দিকে নজর দেন। বনূ নযীর গোত্রের নির্বাসিত নেতারা খায়বারে আশ্রয় নিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আরব গোত্রকে উস্কানি দিচ্ছিল। হিজরী সপ্তম সনের মুহাররম মাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রায় ১৬০০ সাহাবী নিয়ে খায়বার অভিমুখে যাত্রা করেন।
খায়বার ছিল অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি এলাকা, যেখানে অনেকগুলো দুর্গ ছিল। মুসলমানরা এক এক করে দুর্গগুলো জয় করতে শুরু করেন। সবচেয়ে সুরক্ষিত দুর্গ ছিল ‘কামুস’। এই দুর্গটি জয় করতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল। একদিন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, “আগামীকাল আমি এমন একজনের হাতে পতাকা দেব, যার হাতে আল্লাহ বিজয় দান করবেন। সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলও তাকে ভালবাসেন।” পরদিন সকালে সাহাবীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) আলী (রা)-কে ডাকেন, যদিও তাঁর চোখে অসুখ ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর মুখের লালা আলী (রা)-এর চোখে লাগিয়ে দিলে তা সাথে সাথে ভালো হয়ে যায়। এরপর তিনি তাঁর হাতে পতাকা তুলে দেন।
আলী (রা) বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে কামুস দুর্গ জয় করেন। ইয়াহূদীদের বিখ্যাত বীর মারহাব তাঁর হাতেই নিহত হয়।
খায়বার বিজয়ের পর সেখানকার ইয়াহূদীদেরকে উৎপাদিত ফসলের অর্ধেকের বিনিময়ে তাদের জমিতে চাষাবাদ করার অনুমতি দেওয়া হয়। এ যুদ্ধে প্রাপ্ত গণীমতের মালের মধ্যে বনূ নযীরের নেতা হুয়াই ইব্ন আখতাবের কন্যা সাফিয়্যা (রা)-ও ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে মুক্ত করে বিবাহ করেন এবং তিনি উম্মুল মু'মিনীনদের অন্তর্ভুক্ত হন।
📄 হিজরতের ৮ম বছর
এ বছরই মুতার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) হারিস ইব্ন উমায়র আযদী (রা)-কে একটি চিঠি দিয়ে বসরার শাসকের কাছে প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু মুতা নামক জায়গায় পৌঁছালে শুরাহবীল ইব্ন আমর গাসসানী নামক একজন শাসক তাঁকে হত্যা করে। দূত হত্যা আন্তর্জাতিক নীতিমালার চরম লঙ্ঘন ছিল। এর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা) যায়দ ইব্ন হারিসা (রা)-এর নেতৃত্বে তিন হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। তিনি নির্দেশ দেন যে, যায়দ শহীদ হলে জাফর ইব্ন আবী তালিব (রা) সেনাপতি হবেন এবং তিনিও শহীদ হলে আবদুল্লাহ ইব্ন রাওয়াহা (রা) সেনাপতি হবেন।
মুতা নামক জায়গায় রোমান ও তাদের মিত্র আরবদের প্রায় দুই লক্ষ সৈন্যের বিশাল বাহিনীর সাথে মুসলমানদের যুদ্ধ হয়। এ অসম যুদ্ধে তিনজন সেনাপতিই শাহাদাতবরণ করেন। এরপর খালিদ ইব্ন ওয়ালিদ (রা) যুদ্ধের সেনাপতিত্ব গ্রহণ করেন এবং অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে মুসলিম বাহিনীকে নিরাপদে মদীনায় ফিরিয়ে আনেন।
এ বছরই মক্কা বিজয়, হুনাইনের যুদ্ধ এবং তায়েফ অবরোধের মত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো সংঘটিত হয়।
📄 মক্কা বিজয়
হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তি ভঙ্গ করে কুরায়শদের মিত্র বনূ বকর গোত্র মুসলমানদের মিত্র খুযাআ গোত্রের উপর আক্রমণ করে এবং কুরায়শরা তাদেরকে অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করে। এর ফলে সন্ধিচুক্তি বাতিল হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সা) এ ঘটনার প্রতিকার করার জন্য দশ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কার দিকে যাত্রা করেন।
হিজরী ৮ম সনের রমযান মাসে মুসলিম বাহিনী মক্কার উপকণ্ঠে পৌঁছায়। কুরায়শ নেতা আবূ সুফিয়ান মুসলিম বাহিনীর বিশাল সমাবেশ দেখে ভীত হয়ে পড়ে এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চাচা আব্বাস (রা)-এর সহায়তায় রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট আত্মসমর্পণ করে ইসলাম গ্রহণ করে।
রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কায় রক্তপাতহীন প্রবেশের সর্বাত্মক চেষ্টা করেন এবং সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে বলেন, “যারা আবূ সুফিয়ানের ঘরে আশ্রয় নেবে, তারা নিরাপদ। যারা নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে থাকবে, তারা নিরাপদ এবং যারা মসজিদুল হারামে প্রবেশ করবে, তারাও নিরাপদ।”
খালিদ ইব্ন ওয়ালিদ (রা)-এর সেনাদলের সাথে সামান্য সংঘর্ষ ছাড়া প্রায় শান্তিপূর্ণভাবেই মক্কা বিজিত হয়। মক্কায় প্রবেশ করে রাসূলুল্লাহ (সা) সর্বপ্রথম কা'বা ঘরে প্রবেশ করেন এবং সেখানে থাকা ৩৬০টি মূর্তি অপসারণ করেন। এরপর তিনি কা'বার দরজায় দাঁড়িয়ে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন এবং মক্কাবাসীদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। তাঁর এ মহানুভবতায় মুগ্ধ হয়ে মক্কার অধিবাসীরা দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে।