📘 রাসূল সাঃ সম্পর্কে ১০০০ প্রশ্ন 📄 হিজরতের তৃতীয় বছর

📄 হিজরতের তৃতীয় বছর


এ বছর উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ বছরই মদ হারাম করা হয়। এ বছর রাসূলুল্লাহ (সা) হাফসা বিন্ত উমর (রা)-কে বিবাহ করেন। এর আগে তিনি খুনায়স ইব্‌ন হুযাফা সাহমীর স্ত্রী ছিলেন। তিনি উহুদ যুদ্ধে আহত হয়ে ইন্তিকাল করেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সা) যায়নাব বিন্ত খুযায়মা হিলালিয়া (রা)-কে বিবাহ করেন। তাঁকে ‘উম্মুল মাসাকীন’ বা গরীবের মা বলা হত। কারণ তিনি গরীবদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু ছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে মাত্র দুই বা তিন মাস ছিলেন। এরপর তিনি ইন্তিকাল করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর জানাযার সালাত পড়ান এবং তাঁকে জান্নাতুল বাকীতে দাফন করা হয়।

📘 রাসূল সাঃ সম্পর্কে ১০০০ প্রশ্ন 📄 কা‘ব বিন আশরাফকে গোপনে হত্যা

📄 কা‘ব বিন আশরাফকে গোপনে হত্যা


এ বছরই কা'ব ইব্‌ন আশরাফকে হত্যা করা হয়। সে ছিল একজন ইয়াহূদী। সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা)-কে কষ্ট দিত এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ কবিতা রচনা করত। এরপর সে কুরায়শ কাফিরদেরকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে উস্কানী দেওয়ার জন্য মক্কায় যায়। রাসূলুল্লাহ (সা) যখন তার ব্যাপারে জানতে পারেন, তখন বলেন, ‘কা'ব ইব্‌ন আশরাফের ব্যাপারে আমাকে কে সাহায্য করবে?’ তখন মুহাম্মদ ইব্‌ন মাসলামা (রা) বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি চান আমি তাকে হত্যা করি?’ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘হ্যাঁ।’ মুহাম্মদ ইব্‌ন মাসলামা (রা) বলেন, ‘তাহলে আমাকে কিছু কথা বলার অনুমতি দিন।’ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘তুমি বলতে পার।’
এরপর মুহাম্মদ ইব্‌ন মাসলামা (রা) তার কাছে যান এবং বলেন, ‘এই ব্যক্তি (মুহাম্মদ সা.) আমাদের কাছে সাদকা চেয়েছে এবং আমাদেরকে কষ্টে ফেলেছে। তাই আমি আপনার কাছে কিছু ঋণের জন্য এসেছি।’ কা'ব ইব্‌ন আশরাফ বলল, ‘আল্লাহর কসম! তোমরা তার উপর আরো বিরক্ত হবে।’ মুহাম্মদ ইব্‌ন মাসলামা (রা) বলেন, ‘আমরা তো এখন তাঁর অনুসরণ করেছি, তাই তাঁর শেষ পরিণতি না দেখে ছেড়ে দেওয়াটা অপছন্দ করি। আমি চাই আপনি আমাদেরকে এক বা দুই ওয়াসাক খেজুর ঋণ দিন।’ কা'ব বলল, ‘হ্যাঁ, তবে আমার কাছে তোমাদের মহিলাদেরকে বন্ধক রাখ।’ তারা বলল, ‘আমরা কিভাবে আমাদের মহিলাদেরকে আপনার কাছে বন্ধক রাখব, অথচ আপনি আরবের সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষ?’ কা'ব বলল, ‘তাহলে তোমাদের সন্তানদেরকে বন্ধক রাখ।’ তারা বলল, ‘আমরা কিভাবে আমাদের সন্তানদেরকে বন্ধক রাখব? পরে তাদেরকে এই বলে গালি দেওয়া হবে যে, এক বা দুই ওয়াসাক খেজুরের বিনিময়ে বন্ধক রাখা হয়েছিল। এটা আমাদের জন্য লজ্জার বিষয়। বরং আমরা আপনার কাছে আমাদের অস্ত্রশস্ত্র বন্ধক রাখব।’ কা'ব বলল, ‘ঠিক আছে।’
এরপর মুহাম্মদ ইব্‌ন মাসলামা (রা) রাতে তার কাছে আসার ওয়াদা করেন। তিনি আবূ নায়িলাসহ তার কাছে আসেন। আবূ নায়িলা ছিল কা'বের দুধ ভাই। কা'ব তাদেরকে দুর্গের মধ্যে ডেকে নেয় এবং তাদের কাছে নেমে আসে। তার স্ত্রী তাকে বলল, ‘এই সময়ে তুমি কোথায় যাচ্ছ?’ কা'ব বলল, ‘মুহাম্মদ ইব্‌ন মাসলামা ও আমার ভাই আবূ নায়িলা এসেছে।’ তার স্ত্রী বলল, ‘আমি তো এমন একটি শব্দ শুনতে পাচ্ছি, যা থেকে রক্তের ফোঁটা ঝরছে বলে মনে হচ্ছে।’ কা'ব বলল, ‘এরা তো আমার ভাই মুহাম্মদ ইব্‌ন মাসলামা ও আমার দুধ ভাই আবূ নায়িলা। সম্মানিত ব্যক্তিকে রাতে نیزাঘাত করার জন্য ডাকলেও সে বের হয়ে আসে।’
মুহাম্মদ ইব্‌ন মাসলামা (রা) তাঁর সাথে আরো দুই বা তিনজনকে নিয়ে গিয়েছিলেন। তারা হলেন, আব্বাদ ইব্‌ন বিশর, হারিস ইব্‌ন আউস ও আবূ আবস ইব্‌ন জাবর। মুহাম্মদ ইব্‌ন মাসলামা (রা) তাদেরকে বলেন, ‘যখন সে আসবে, তখন আমি তার চুল ধরে তোমাদেরকে ইশারা করব। তখন তোমরা তাকে তরবারি দিয়ে আঘাত করবে।’
কা'ব ইব্‌ন আশরাফ চাদর গায়ে দিয়ে তাদের কাছে নেমে আসে। তার শরীর থেকে সুগন্ধি ছড়াচ্ছিল। মুহাম্মদ ইব্‌ন মাসলামা (রা) বলেন, ‘আজকের মত এত সুন্দর সুগন্ধি আমি আর কখনো দেখিনি।’ কা'ব বলল, ‘আমার কাছে আরবের সবচেয়ে সুগন্ধি ব্যবহারকারী ও সম্ভ্রান্ত মহিলা আছে।’ মুহাম্মদ ইব্‌ন মাসলামা (রা) বলেন, ‘আমি কি আপনার মাথায় একটু ঘ্রাণ নিতে পারি?’ কা'ব বলল, ‘হ্যাঁ, পার।’ এরপর তিনি তার মাথায় হাত দিয়ে ঘ্রাণ নিলেন এবং তাঁর সঙ্গীদেরকেও ঘ্রাণ নিতে দিলেন। এরপর তিনি আবার বলেন, ‘আমি কি আরেকবার ঘ্রাণ নিতে পারি?’ সে বলল, ‘হ্যাঁ, পার।’ এরপর তিনি তার মাথায় হাত দিয়ে যখন তাকে কাবু করে ফেলেন, তখন সঙ্গীদেরকে বলেন, ‘ধর একে।’ তখন তারা তাকে হত্যা করে এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে এসে খবর দেয়।

টিকাঃ
১. এক ওয়াসাক প্রায় ৬০ সা' বা ১৩৫ কেজি।

📘 রাসূল সাঃ সম্পর্কে ১০০০ প্রশ্ন 📄 গাযওয়ায়ে উহুদ

📄 গাযওয়ায়ে উহুদ


কুরায়শরা বদর যুদ্ধে তাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গকে হারানোর পর এর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে। হিজরী তৃতীয় সনের শাওয়াল মাসে তারা তিন হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী নিয়ে মদীনার দিকে অগ্রসর হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের মুকাবিলা করার জন্য এক হাজার সৈন্য নিয়ে মদীনা থেকে বের হন। কিন্তু পথিমধ্যে মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ ইব্‌ন উবাই তার তিনশ সঙ্গীসহ দলত্যাগ করে মদীনায় ফিরে যায়। ফলে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে মাত্র সাতশ সৈন্য অবশিষ্ট থাকে।
উহুদ পাহাড়ের পাদদেশে উভয় দলের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। প্রথম দিকে মুসলমানরা বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু তীরন্দাজদের একটি দল রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নির্দেশ অমান্য করে তাদের স্থান ত্যাগ করার ফলে যুদ্ধের গতি পরিবর্তিত হয়ে যায় এবং মুসলমানদের বিজয় পরাজয়ে রূপান্তরিত হয়।
এ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা) আহত হন। তাঁর দাঁত শহীদ হয়, মুখমণ্ডল জখম হয় এবং মাথায় শিরস্ত্রাণের দুটি বেড়ি ঢুকে যায়। এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর পতাকাবাহী মুসআব ইব্‌ন উমায়র (রা) এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চাচা হামযা ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিব (রা)-সহ প্রায় সত্তরজন সাহাবী শাহাদাতবরণ করেন। অন্যদিকে, কাফিরদের মধ্যে প্রায় বাইশজন নিহত হয়।
যুদ্ধ শেষে কুরায়শরা বিজয়ের আনন্দে মক্কায় ফিরে যায়। রাসূলুল্লাহ (সা) শহীদদের দাফন করার ব্যবস্থা করেন এবং আহতদের সেবা-শুশ্রূষার জন্য মদীনায় নিয়ে আসেন।

📘 রাসূল সাঃ সম্পর্কে ১০০০ প্রশ্ন 📄 হিজরতের চতুর্থ বছর

📄 হিজরতের চতুর্থ বছর


এ বছর আবূ সালামা ইব্‌ন আবদুল আসাদ (রা)-এর নেতৃত্বে একটি সেনাদলকে কুতন নামক জায়গায় প্রেরণ করা হয়। এ বছরই আবদুল্লাহ ইব্‌ন উনায়সের নেতৃত্বে খালিদ ইব্‌ন সুফইয়ান হুযালীকে হত্যা করার জন্য একটি অভিযান প্রেরণ করা হয়। কারণ সে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য লোক জমা করছিল। আবদুল্লাহ ইব্‌ন উনায়স তাকে হত্যা করে তার মাথা নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে ফিরে আসেন।
এ বছরই রাজী'র ঘটনা ঘটে। রাসূলুল্লাহ (সা) দশজন সাহাবীকে আযাল ও কারাহ গোত্রের কিছু লোকের অনুরোধে দ্বীন শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রেরণ করেন। কিন্তু তারা বিশ্বাসঘাতকতা করে তাদেরকে হত্যা করে।
এ বছরই বি'রে মাউনার মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। রাসূলুল্লাহ (সা) সত্তরজন ক্বারী সাহাবীকে নজদবাসীর অনুরোধে দ্বীন শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রেরণ করেন। কিন্তু বনূ সুলাইম গোত্রের লোকেরা বিশ্বাসঘাতকতা করে তাঁদের সকলকে হত্যা করে। শুধুমাত্র আমর ইব্‌ন উমাইয়া দামরী (রা) বেঁচে যান। এ ঘটনায় রাসূলুল্লাহ (সা) অত্যন্ত মর্মাহত হন এবং এক মাস পর্যন্ত নামাযে হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে কুনূত পাঠ করেন।
এ বছরই বনূ নযীর গোত্রকে তাদের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে অবরোধ করা হয়। তারা রাসূলুল্লাহ (সা)-কে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছিল। শেষ পর্যন্ত তারা মদীনা ত্যাগ করে খায়বার ও সিরিয়ায় চলে যেতে বাধ্য হয়।
এ বছরই রাসূলুল্লাহ (সা) উম্মু সালামা (রা)-কে বিবাহ করেন। তাঁর স্বামী আবূ সালামা (রা) উহুদ যুদ্ধে আহত হয়ে ইন্তিকাল করেছিলেন।
এ বছরই রাসূলুল্লাহ (সা)-এর দৌহিত্র হাসান ইব্‌ন আলী (রা) জন্মগ্রহণ করেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px