📄 হিজরতের দ্বিতীয় বছর
এ বছর রমযান মাসের রোযা ফরয করা হয় এবং যাকাত ও সাদকায়ে ফিতরের বিধান দেওয়া হয়। এ বছরই রাসূলুল্লাহ (সা) ঈদের সালাত আদায় করেন এবং কুরবানী করেন। এ বছর রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর চাচা হামযা ইব্ন আবদুল মুত্তালিবের জন্য একটি পতাকা তৈরি করেন। এটি ছিল ইসলামের ইতিহাসে প্রথম পতাকা। এ পতাকাবাহী সেনাদলকে তিনি সিরিয়া থেকে প্রত্যাবর্তনকারী কুরায়শদের একটি বাণিজ্য কাফেলার মুকাবিলা করার জন্য প্রেরণ করেন। তারা সমূদ্র উপকূলের ঈস নামক জায়গায় পরস্পর মুকাবিলামুখী হয়। কিন্তু মাজদী ইব্ন আমর জুহানী উভয় দলের মধ্যে মধ্যস্থতা করেন। ফলে কোন যুদ্ধ হয়নি। এরপর রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর চাচাত ভাই উবায়দা ইব্ন হারিস ইব্ন আবদুল মুত্তালিবের নেতৃত্বে আরেকটি সেনাদল প্রেরণ করেন। তারাও কুরায়শদের একটি দলের মুকাবিলা করে। উভয় পক্ষে কিছু তীর বিনিময় হয়। এটিই ছিল ইসলামের ইতিহাসে প্রথম তীর বিনিময়। এ বছরই সা'দ ইব্ন আবূ ওয়াক্কাস (রা)-কে একটি সেনাদলের নেতা নিযুক্ত করে প্রেরণ করা হয়।
📄 গাযওয়ায়ে বদর
এ বছরই সংঘটিত হয় বদর যুদ্ধ। এ যুদ্ধের কারণ ছিল, আবূ সুফিয়ান ইব্ন হারবের নেতৃত্বে কুরায়শদের একটি বাণিজ্য কাফেলা সিরিয়া থেকে প্রত্যাবর্তন করছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের গতিরোধ করার জন্য অগ্রসর হন। কুরায়শরা এ খবর জানতে পেরে তাদের কাফেলা রক্ষা করার জন্য মক্কা থেকে বের হয়। আল্লাহ তা'আলা উভয় দলকে বদর নামক জায়গায় কোন পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই একত্র করে দেন। এ যুদ্ধ সংঘটিত হয় রমযান মাসের সতের তারিখ শুক্রবার দিনে। আল্লাহ তা'আলা এ দিনটিকে ‘ইয়াওমুল ফুরকান' বা 'সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী দিন' নামে অভিহিত করেছেন।
এ যুদ্ধে মুসলমান সৈন্য সংখ্যা ছিল তিন শ' তের জন। এর মধ্যে মুহাজির ছিলেন ৮৩ জন এবং আনসার ছিলেন ২৩০ জন। আনসারদের মধ্যে আউস গোত্রের ৬১ জন এবং খাযরাজ গোত্রের ১৭০ জন ছিলেন। আর কুরায়শদের সৈন্য সংখ্যা ছিল এক হাজারের মত। এ যুদ্ধে আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদের বিজয় দান করেন। কুরায়শদের সত্তর জন নিহত হয় এবং সত্তর জন বন্দী হয়। আর মুসলমানদের মধ্যে চৌদ্দ জন শহীদ হন। এর মধ্যে মুহাজির ছয়জন এবং আনসার আটজন।
এরপর রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনার দিকে অগ্রসর হন। বন্দীদের ব্যাপারে তিনি সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করেন। আবূ বকর (রা) ফিদইয়া বা মুক্তিপণ নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়ার পক্ষে মত দেন। উমর (রা) তাদের হত্যা করার পক্ষে মত দেন। রাসূলুল্লাহ (সা) আবূ বকর (রা)-এর মত গ্রহণ করেন এবং ফিদইয়া নিয়ে তাদের ছেড়ে দেন।
এ বছর রমযান মাসেই রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কন্যা রুকাইয়া (রা) ইন্তিকাল করেন। তিনি ছিলেন উসমান ইব্ন আফফান (রা)-এর স্ত্রী। তাঁর অসুস্থতার কারণেই উসমান (রা) বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। তবে রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মতই গণীমত ও পুরস্কারের অংশ দেন।
বদর যুদ্ধের পর রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর কন্যা ফাতিমা (রা)-কে আলী (রা)-এর সাথে বিবাহ দেন। তখন ফাতিমা (রা)-এর বয়স ছিল পনের বছর সাড়ে পাঁচ মাস এবং আলী (রা)-এর বয়স ছিল একুশ বছর পাঁচ মাস। রাসূলুল্লাহ (সা) ফাতিমা (রা)-কে দু'টি ইয়ামানী চাদর, দু'টি রূপার বাজু, একটি চামড়ার বালিশ, যা খেজুরের ছোবড়া দিয়ে ভর্তি ছিল- এসব জিনিসপত্রসহ বিদায় দেন।
📄 ইয়াহূদী সম্প্রদায়কে বয়কট
এ বছরই বনূ কায়নুকা গোত্রের ইয়াহূদীদের অবরোধ করা হয়। তারা ছিল প্রথম ইয়াহূদী গোত্র যারা চুক্তি ভঙ্গ করেছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের অবরোধ করেন এবং শেষ পর্যন্ত তারা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সিদ্ধান্তের উপর আত্মসমর্পণ করে। তখন আবদুল্লাহ ইব্ন উবাই ইব্ন সুলূল তাদের ব্যাপারে সুপারিশ করে। সে ছিল তাদের মিত্র। রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের ব্যাপারে আবদুল্লাহ ইব্ন উবাই-এর সুপারিশ গ্রহণ করেন। এরপর তিনি তাদেরকে মদীনা থেকে বের করে দেন এবং তারা সিরিয়ার আযরিআত নামক জায়গায় চলে যায়। এরপর অল্প দিনের মধ্যেই তারা সেখানে ধ্বংস হয়ে যায়।
📄 হিজরতের তৃতীয় বছর
এ বছর উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ বছরই মদ হারাম করা হয়। এ বছর রাসূলুল্লাহ (সা) হাফসা বিন্ত উমর (রা)-কে বিবাহ করেন। এর আগে তিনি খুনায়স ইব্ন হুযাফা সাহমীর স্ত্রী ছিলেন। তিনি উহুদ যুদ্ধে আহত হয়ে ইন্তিকাল করেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সা) যায়নাব বিন্ত খুযায়মা হিলালিয়া (রা)-কে বিবাহ করেন। তাঁকে ‘উম্মুল মাসাকীন’ বা গরীবের মা বলা হত। কারণ তিনি গরীবদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু ছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে মাত্র দুই বা তিন মাস ছিলেন। এরপর তিনি ইন্তিকাল করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর জানাযার সালাত পড়ান এবং তাঁকে জান্নাতুল বাকীতে দাফন করা হয়।