📄 দ্বিতীয় আকাবার শপথ
প্রশ্ন-৪৬১. আকাবার দ্বিতীয় শপথ কখন অনুষ্ঠিত হয়?
উত্তর: ৬২২ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে নবুওয়াতের ত্রয়োদশ বছরের হজ্জের মৌসুমে আকাবার দ্বিতীয় শপথ অনুষ্ঠিত হয়।
প্রশ্ন-৪৬২. আকাবার দ্বিতীয় শপথ অনুষ্ঠানে কত জন লোক এসেছিল?
উত্তর: ৭৩ জন পুরুষ ও ২ জন মহিলা এসে আকাবায় রাসূল এর সঙ্গে সাক্ষাত করেন।
প্রশ্ন-৪৬৩. আকাবায় রাসূল এর সঙ্গে তখন কে ছিলেন?
উত্তর: রাসূল এর চাচা আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব (রা)।
প্রশ্ন-৪৬৪. ইয়াসরিবের লোকদের উদ্দেশ্য করে আব্বাস কী বললেন?
উত্তর: তিনি বললেন, "হে খাযরাজ গোত্রের লোকেরা! তোমরা ভালোভাবেই জান যে, মুহাম্মদ আমাদের মাঝে কোন অবস্থায় আছে। আমরা আমাদের সাধ্যানুযায়ী আমাদের লোকদের থেকে তাকে আশ্রয় দিয়েছি। সে তোমাদেরকে ছাড়া অন্য কোথাও যেতে রাজি নয়। সুতরাং তোমরা যদি মনে করো যে, তোমরা তোমাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে পারবে এবং তাকে শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে, তাহলে তোমরা তোমাদের দায়িত্বভার গ্রহণ করতে পার। কেননা তোমরা যেহেতু তাকে তোমাদের শহরে আমন্ত্রণ করেছ। কিন্তু তাকে নেয়ার পর যদি তোমরা তার নিরাপত্তায় অপারগতা প্রকাশ কর এবং বিশ্বাসঘাতকতা কর, তাহলে তাকে নেয়ার কোন প্রয়োজন নেই। কারণ সে তার মাতৃভূমিতেই সু-রক্ষিত ও সম্মানিত।"
প্রশ্ন-৪৬৫. কা'ব বিন মালিক (রা) উত্তরে কী বললেন?
উত্তর: তিনি বললেন, "আমরা আপনার কথাগুলো শুনলাম, এখন ইয়া রাসূলাল্লাহ! এবার আপনি বলুন এবং আমাদের কাছে থেকে যে কোন ধরনের শপথ নিতে পারেন, যা আল্লাহ আপনাকে আদেশ করেছেন।
প্রশ্ন-৪৬৬. এরপর রাসূল কী করলেন?
উত্তর: তিনি কুরআনের কিছু আয়াত তিলাওয়াত করলেন এবং ইসলাম গ্রহণের জন্য তাদের সকলকে উদ্বুদ্ধ করলেন। তিনি বললেন, "তোমরা আমাকে প্রতিশ্রুতি দাও যে, তোমরা তোমাদের স্ত্রী-সন্তানদেরকে যেভাবে আগলে রাখ ও রক্ষা কর আমাকেও সেভাবে রক্ষা করবে।"
প্রশ্ন-৪৬৭. বারা বিন মারুর (রা) কী বললেন?
উত্তর: তিনি রাসূল এর হাত ধরে বললেন, "অবশ্যই, যিনি আপনাকে নবী হিসেবে পাঠিয়েছেন সে আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি-আমরা যেভাবে আমাদের স্ত্রীদের হেফাজত করে থাকি ঠিক সেভাবে আপনারও হেফাজত করব। ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের ওপর বিশ্বাস রাখুন। আল্লাহর কসম, আমরাই প্রকৃত যোদ্ধা এবং যুদ্ধের জন্য আমরাই যোগ্য, এটি আমাদের একটি বিশেষত্ব যা আমরা আমাদের পূর্বপুরুষ থেকে পেয়েছি।"
প্রশ্ন-৪৬৮. আবুল হাইশাম বিন তাইহান (রা) কী বললেন?
উত্তর: তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ইয়াহুদীদের সাথে আমাদের কিছু চুক্তি আছে যা এখন আমাদেরকে বাতিল করতে হবে। আল্লাহ যদি আপনাকে ক্ষমতা ও বিজয় দান করেন, তাহলে আপনি কিন্তু আমাদের ছেড়ে আপনাদের স্ব-জাতির কাছে ফিরে যাবেন না।"
প্রশ্ন-৪৬৯. রাসূল কী বললেন?
উত্তর: রাসূল মুচকি হেসে বললেন, "এমনটি কখনো হবে না; তোমাদের রক্ত হবে আমার রক্ত, জীবনে-মরণে আমি তোমাদের সাথে থাকব, তোমরা আমার সাথে থাকবে। তোমরা যাদের সাথে যুদ্ধ করবে আমিও তাদের সাথে যুদ্ধ করব এবং তোমরা যাদের সাথে সন্ধি করবে, আমিও তাদের সাথে সন্ধি করব।"
প্রশ্ন-৪৭০. মক্কার মুসলমানদের জন্য 'আকাবার দ্বিতীয় শপথ' কোন কল্যাণ বয়ে এনেছিল?
উত্তর: হ্যাঁ, আকাবার দ্বিতীয় শপথের পর রাসূল মক্কার মুসলমানদেরকে মক্কা ছেড়ে দ্রুত ইয়াসরিবে গিয়ে তাদের দ্বীনি ভাইদের সঙ্গে যোগদান করতে নির্দেশ দিলেন।
প্রশ্ন-৪৭১. শপথের পর রাসূল ইয়াসরিবে ইসলাম প্রচারের জন্য যে বার জন প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছিলেন তাদের নাম কী ছিল?
উত্তর: তারা ছিলেন. ১. আসাদ বিন যুরারাহ, ২. আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা, ৩. সা'দ বিন রাবি, ৪. রাফি বিন মালিক, ৫. বারা বিন মারুর, ৬. আব্দুল্লাহ বিন আমর, ৭. উবাদা বিন সামিত, ৮. সা'দ বিন উবাদা, ৯. মুনযির বিন আমর, ১০. উসাইদ বিন হুযাইর, ১১. সা'দ বিন খায়সামাহ, ১২. রাফাহ বিন আব্দুল মুনযির (রা)।
প্রশ্ন-৪৭২. মহিলাদের কাছ থেকে কীভাবে বাই'আত নেয়া হয়েছিল?
উত্তর: মহিলাদের কাছ থেকে মৌখিকভাবেই শপথ নেয়া হয়েছিল। রাসূল অপরিচিত মহিলাদের সঙ্গে কখনো হাত মিলাননি।
প্রশ্ন-৪৭৩. এ ঘটনা শুনে কোরাইশরা কী অনুভব করল?
উত্তর: তারা খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করল যে, এ ধরনের চুক্তি অদূর ভবিষ্যতে তাদের জীবন ও সম্পদের ওপর বিভিন্ন শাখা বিস্তার করবে।
প্রশ্ন-৪৭৪. আসন্ন বিপদ রোধ করার জন্য কোরাইশরা কী করল?
উত্তর: তারা শপথের বিরুদ্ধে কঠিন প্রতিবাদ করার উদ্দেশ্যে ইয়াসরিবের হজ্জযাত্রীদের জন্য ক্যাম্প স্থাপন করলেন এবং তাদের উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলেন:
“হে খাযরাজের লোকেরা! আমরা জেনে গেছি যে, তোমরা এখানে এসেছ মুহাম্মদের সাথে একটি চুক্তি করতে এবং তাকে মক্কা থেকে নিয়ে যেতে। আল্লাহর কসম, আমরা চাই না যে, তোমাদের মাঝে এবং আমাদের মাঝে কোন যুদ্ধ সংঘটিত হোক।"
প্রশ্ন-৪৭৫. ইয়াসরিব থেকে আগত পৌত্তলিক হজ্জযাত্রীগণ কী বলল?
উত্তর: পৌত্তলিকগণ কোরাইশদের সকল অভিযোগ অস্বীকার করল এবং তাদেরকে নিশ্চিত করল যে তাদের আপত্তিগুলো যথার্থ সত্য নয়। তার কারণ মুসলমানগণ রাসূল এর সঙ্গে গোপনে সাক্ষাত করতেন যা তাদের পৌত্তলিকরা জানত না এবং বাই'আত সম্পর্কেও তাদের কোন কিছু জানা ছিল না।
প্রশ্ন-৪৭৬. কোরাইশরা যখন নিশ্চিত হল যে, শপথ অনুষ্ঠান সংঘটিত হয়েছিল তখন তারা কী করল?
উত্তর: তারা হজ্জযাত্রীদের পিছনে ছুটল যারা ইতিমধ্যেই মক্কা ছেড়ে চলে গেছে। যে কোনভাবে তারা সা'দ বিন উবাদাহকে ধরে ফেলল এবং তাকে অনেক অত্যাচার করল। পরবর্তীতে মুত'ইম বিন আদি এবং হারিস বিন হারব এর সঙ্গে তার ব্যবসায়িক সম্পর্কের খাতিরে তাকে উদ্ধার করা হয়।
প্রশ্ন-৪৭৭. আকাবার দ্বিতীয় শপথ যেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শপথ নামেও পরিচিত সেটির কী প্রভাব ছিল?
উত্তর: মক্কার ও ইয়াসরিবের মুসলমানদের মাঝে ভালোবাসার চেতনা, সাহায্য ও পারস্পরিক সহযোগিতা এ শপথের মাধ্যমে জেগে উঠল।
প্রশ্ন-৪৭৮. সর্বপ্রথম কে ইয়াসরিবে হিজরত করেন?
উত্তর: তিনি হলেন আবু সালামাহ (রা)।
প্রশ্ন-৪৭৯. হিজরতের জন্য আবু বকর (রা)-ও অনুমতি চেয়েছিলেন?
উত্তর: হ্যাঁ, তবে তাকে অপেক্ষা করার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল।
📄 রাসূল ﷺ-এর মদীনায় হিজরত
প্রশ্ন-৪৮০. কোরাইশরা আকাবার শপথের অদূর-ভবিষ্যতের প্রভাব সম্পর্কে কী ভাবল?
উত্তর: তারা সন্ধিগ্ধ ছিল যে, রাসূল যে কোন সময়ে মক্কা ত্যাগ করতে তৈরি আছেন। তারা শংকিত ছিল যে, মদিনার মুসলমানগণ রাসূলের নেতৃত্বাধীন তাদের একটি বিশাল ঘাঁটি তৈরি করে মক্কায় হামলা চালাবে এবং মক্কা আক্রমণ করতে পারেন।
প্রশ্ন-৪৮১. এরপর তারা কী করল?
উত্তর: তারা আসন্ন বিপদ মোকাবেলা করার উদ্দেশ্যে ‘দারুন নাদওয়া’ (সভাকক্ষে) একটি বৈঠক করেন-
প্রশ্ন-৪৮২. ঐ সভায় কতজন কোরাইশ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন?
উত্তর: ঐ বৈঠকে ১৪ জন কোরাইশ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন, তারা হলেন ১. শাইবা বিন রাবিয়া, ২. উতবা বিন রাবিয়া, ৩. আবু সুফিয়ান, ৩. বিন হারব, ৪. সুআইমাহ বিন আদি, ৫. জুবাইর বিন মুর্ত'ইম, ৬. হারিস বিন আমির, ৭. নযর বিন হারিস বিন কুলাব, ৮. আবুল বুখতারি বিন জিহশাম, ৯. যামাহ বিন আসওয়াদ, ১০. হাকীম বিন হিযাম, ১১. আবু জাহেল বিন হিশাম, ১২. নাবিহ বিন হাজ্জাজ, ১৩. মুনাব্বিহ বিন হাজ্জাজ, ১৪. উমাইয়া বিন খালফ।
প্রশ্ন-৪৮৩. তারা কী পরিকল্পনা করল?
উত্তর: তারা রাসূলকে গোপনে হত্যা করার পরিকল্পনা করল। পরিকল্পনানুযায়ী যুগপৎভাবে রাসূল কে হত্যা করার জন্য প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন করে যুবক নিয়ে একটি দল গঠন করল, যাতে হত্যা করার অপরাধ সকলের ঘাড়ে চাপে।
প্রশ্ন-৪৮৪. রাসূল কীভাবে চক্রান্তটি সম্পর্কে জানলেন?
উত্তর: কোরাইশরা তাদের চক্রান্তটি খুব গোপন রেখেছিল। কিন্তু সর্বশক্তিমান আল্লাহ রাসূলকে তা জানিয়ে দিলেন এবং মদিনায় হিজরতের অনুমতি প্রদান করলেন। আল্লাহ বলেন-
إِلَّا تَنْصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللهُ إِذْ أَخْرَجَهُ الَّذِينَ كَفَرُوا ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لا تَحْزَنْ إِنَّ اللهَ مَعَنَا .
অর্থ- যদি তোমরা তাকে সাহায্য না কর, তবে আল্লাহ তো তাকে সাহায্য করেছিলেন যখন কাফিরগণ তাকে বহিষ্কার করেছিল এবং সে ছিল দুইজনের দ্বিতীয়জন, যখন তারা উভয়ে গুহার মধ্যে ছিল; সে তখন তার সঙ্গীকে বলেছিল, 'বিষণ্ণ হইও না, আল্লাহ তো আমাদের সাথে আছেন। (সূরা-৯ তাওবা, আয়াত নং-৪০)
প্রশ্ন-৪৮৫. এরপর রাসূল কী করলেন?
উত্তর: তিনি তার প্রিয় সাহাবী আবু বকরকে প্রস্তাবিত মদিনায় হিজরত সম্পর্কে জানালেন এবং বললেন যে, আপনি হবেন আমার সফর সঙ্গী।
প্রশ্ন-৪৮৬. হিজরতের জন্য আবু বকর (রা) কী প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন?
উত্তর: তিনি দুটি উটনীর বন্দোবস্ত করলেন, আব্দুল্লাহ বিন উরাইকিত নামে একজন পথ প্রদর্শক ও আমির বিন ফুহাইরা নামে একজন দাসেরও ব্যবস্থা করলেন।
প্রশ্ন-৪৮৭. মক্কার নেতারা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কী করল?
উত্তর: তারা ১১ জন লোক বাছাই করল এবং রাতের অন্ধকারে রাসূল এর বাড়ি ঘেরাও করার পরামর্শ দিল। সে এগারো জন ব্যক্তি ছিল- ১. আবু জাহেল বিন হিশাম, ২. হাকাম বিন আস, ৩. উকবা বিন আবি মুয়িত, ৪. নযর বিন হারিস, ৫. উমাইয়া বিন খালফ, ৫. যামা বিন আসওয়াদ, ৭. সুআইমা বিন আদি, ৮. আবু লাহাব বিন আব্দুল মুত্তালিব, ৯. উবাই বিন খালাফ, ১০. নাবিহ বিন হাজ্জাজ, ১১. মুনাব্বিহ বিন হাজ্জাজ।
প্রশ্ন-৪৮৮. এরপর গুপ্তঘাতকেরা কী করল?
উত্তর: যখন অন্ধকার নেমে আসল তখন ঘাতকেরা রাসূল এর দরজায় এসে ভীড় করতে লাগল, ভোর বেলায় যখনই তিনি ঘর থেকে বের হয়ে আসবেন তখনই তাকে হত্যা করে ফেলবে এ উদ্দেশ্যে তারা অপেক্ষা করতে থাকল।
প্রশ্ন-৪৮৯. রাসূল এর বাড়ি অবরোধকারী লোকদের উদ্দেশ্য করে আবু জাহেল কী বলল?
উত্তর: সে তাদেরকে ধমকের স্বরে বলল, "মুহাম্মদ দাবি করবে যে, যদি তোমরা তার অনুসরণ কর তাহলে সে তোমাদেরকে আরব অথবা অনারবের শাসক নিযুক্ত করবে এবং পরকালে তোমাদের পুরস্কার হবে জান্নাত; নতুবা সে তোমাদেরকে হত্যা করে ফেলবে এবং মৃত্যুর পর তোমাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।"
প্রশ্ন-৪৯০. রাসূল আলী বিন আবু তালিব (রা)-কে কী করতে পরামর্শ দিলেন?
উত্তর: তিনি তাকে পরামর্শ দিলেন, তিনি যেন রাসূলের বিছানায় সবুজ চাদর মুড়িয়ে শুয়ে থাকেন। রাসূল তাকে নিশ্চিত করে বললেন কোন ধরনের বিপদ তোমার আসবে না।
প্রশ্ন-৪৯১. তিনি আলী বিন আবু তালিব (রা)-কে কেন তার পরিবর্তে রেখে গেলেন?
উত্তর: কারণ, রাসূল এর তত্ত্বাবধানে থাকা গচ্ছিত কিছু অর্থ-সম্পদ তাদের সঠিক মালিকদের কাছে হস্তান্তর করার দায়িত্বভার তিনি আলী (রা)-কে দিয়ে যান। আর এ ঘটনার মাধ্যমে বুঝা যায় যে, আমাদের রাসূল কতটা সৎ ও বিশ্বাসভাজন ছিলেন যদিও তারাই তাকে মক্কা থেকে বের করে দিচ্ছে।
প্রশ্ন-৪৯২. রাসূল যখন ঘর থেকে বের হলেন তখন তিনি কি করলেন?
উত্তর: যেহেতু ঘাতকেরা বাহিরে অপেক্ষা করছিল, রাসূল বের হয়ে এক মুঠো বালি নিয়ে তাদের দিকে নিক্ষেপ করলেন এবং কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটি তেলাওয়াত করলেন-
وَجَعَلْنَا مِنْ بَيْنِ أَيْدِيهِمْ سَدًّا وَمِنْ خَلْفِهِمْ سَدًّا فَاغْشَيْنَهُمْ فَهُمْ لَا يُبْصِرُونَ .
অর্থ- আমি তাদের সম্মুখে প্রাচীর ও পশ্চাতে প্রাচীর স্থাপন করেছি এবং তাদেরকে আবৃত করেছি; ফলে তারা দেখতে পায় না। (সূরা-৩৬ ইয়াসীন, আয়াত-৯)
প্রশ্ন-৪৯৩. এরপর যারা রাসূল এর বাড়ি ঘেরাও করে রেখেছিল তাদের কী হল?
উত্তর: তারা রাসূলকে দেখতে পায়নি কারণ আল্লাহ তাদের দৃষ্টি সরিয়ে দিলেন।
প্রশ্ন-৪৯৪. ইতোমধ্যে রাসূল কোথায় চলে গেলেন?
উত্তর: তিনি সোজা আবু বকর (রা)-এর বাড়িতে চলে গেলেন যিনি পূর্ব পরিকল্পনানুযায়ী তৎক্ষণাৎ তার সঙ্গী হন। তারা দুজনই দক্ষিণ দিকে অবস্থিত সাওর পর্বতে গিয়ে উঠেন এবং একটি গুহায় আশ্রয় নেন। যাকে 'সাওর গুহা' বলা হয়।
প্রশ্ন-৪৯৫. কখন এ ঐতিহাসিক ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল?
উত্তর: ৬২২ খ্রিস্টাব্দে ১২/১৩ সেপ্টেম্বরে নবুওয়াতের চতুর্দশ বছরের ২৭ সফর মাসে হিজরত' নামে পরিচিত এ ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়।
প্রশ্ন-৪৯৬. কেন রাসূল আবু বকর (রা)-কে নিয়ে 'সাওর গুহায়' আশ্রয় নিলেন?
উত্তর: রাসূল কোরাইশদের সঙ্গে একটি কৌশল অবলম্বন করলেন, তাহলো তিনি জানতেন কোরাইশরা তাকে খোঁজার জন্য বের হবেন সে জন্য তিনি, মক্কার উত্তরে অবস্থিত মদিনার পথে না গিয়ে বরং দক্ষিণ দিকে অবস্থিত সাওর গুহায় আশ্রয় নেন। যেন কাফিররা ভাবেন যে তিনি ইয়েমেনের পরিচিত রাস্তা অনুসরণ করেছেন।
প্রশ্ন-৪৯৭. আলী (রা)-এর সাথে কোরাইশরা কী করল?
উত্তর: তারা তাকে মক্কার চত্বরে নিয়ে নিষ্ঠুরভাবে মারতে লাগল এবং রাসূল ও তাঁর সাহাবী ও আবু বকরের সন্ধান দেয়ার জন্য তাকে প্রায় এক ঘণ্টা যাবত আটকে রাখে। কিন্তু কোন লাভ হলো না।
প্রশ্ন-৪৯৮. এরপর তারা কোথায় গেল?
উত্তর: তারা আবু বকরের বাড়ি গেল এবং আবু বকরের মেয়ে আসমাকে জিজ্ঞেস করল, রাসূল ও আবু বকর (রা) কোথায়?
প্রশ্ন-৪১১. আসমা বিনতে আবু বকরের সঙ্গে আবু জাহেল কেমন আচরণ করল?
উত্তর: আবু জাহেল তাকে এমনভাবে চড় মারল যে, তার কানের দুল নিচে পড়ে গেল।
প্রশ্ন-৫০০. এরপর কোরাইশরা কী করল?
উত্তর: পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য তারা জরুরি একটি বৈঠক ডাকল। তারা নিকটস্থ সকল জায়গায় গেল এবং মক্কার বাহিরের সকল পরিচিত রাস্তা বন্ধ করে দিল।
প্রশ্ন-৫০১. রাসূল ও আবু বকর (রা)-কে ফিরিয়ে আনার জন্য কোরাইশরা কী পুরস্কার ঘোষণা করল?
উত্তর: তারা পুরস্কার হিসেবে ১০০টি উট ঘোষণা করে।
প্রশ্ন-৫০২. কে সর্বপ্রথম গুহায় প্রবেশ করল এবং কেন?
উত্তর: গুহায় ক্ষতিকারক কোন কিছু আছে কিনা, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার জন্য প্রথমে আবু বকরই গুহায় প্রবেশ করেন। তিনি গুহাটি পরিষ্কার করলেন এবং কাপড় ছিড়ে ছিড়ে সকল গর্ত বন্ধ করে দেন এরপর তিনি রাসূলকে প্রবেশ করতে বললেন।
প্রশ্ন-৫০৩. গুহার ভিতর আবু বকর (রা)-এর কী হল?
উত্তর: রাসূল আবু বকরের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন। হঠাৎ একটি বিষাক্ত পোকা আবু বকরের পায়ে কামড় দিল। এ আঘাত তাকে এতটাই কষ্ট দিচ্ছিল যে, তার চোখের পানি এসে রাসূল এর মুখমণ্ডলে পড়ল।
প্রশ্ন-৫০৪. রাসূল তা দেখে কী করলেন?
উত্তর: তিনি তার মুখের থুথু আবু বকরের পায়ে লাগিয়ে দিলেন এবং মুহূর্তের মধ্যেই তিনি যন্ত্রণা থেকে মুক্ত হয়ে গেলেন।
প্রশ্ন-৫০৫. কতদিন যাবৎ তারা গুহায় অবস্থান করেছিলেন?
উত্তর: শুক্রবার, শনিবার ও রবিবার পর্যন্ত মোট তিনদিন তারা সেখানে অবস্থান করেছিলেন।
প্রশ্ন-৫০৬. কে তাদেরকে মক্কার নতুন খবরাখবর জানাতেন?
উত্তর: আবু বকর (রা)-এর ছেলে আবদুল্লাহ সন্ধ্যার পর তাদেরকে দেখতে যেতেন। তিনি সেখানে রাত্রিযাপন করতেন এবং তাদেরকে মক্কার নতুন পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করতেন।
প্রশ্ন-৫০৭. কে তাদের জন্য দুধ নিয়ে আসতেন?
উত্তর: আমির বিন ফাহাইরা ভেড়া চরাতেন এবং গুহার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দুধ সরবরাহ করে যেতেন।
প্রশ্ন-৫০৮. কোরাইশরা কি তাদের উদ্ধার অভিযানের সময় গুহার নিকটে এসেছিল?
উত্তর: হ্যাঁ, একবার তারা গুহার নিকট এসে পড়ল। তখন রাসূল ও আবু বকর (রা) একটু ভয় পেয়ে গেলেন।
প্রশ্ন-৫০৯. 'সাওর গুহায়' প্রবেশ হতে কাফিরদের কিসে বাঁধা দিল?
উত্তর: আল্লাহ তাদের কাছে গুহার প্রবেশ পথ অস্পষ্ট রাখলেন, মাকড়সা গুহার মুখে বাসা বাঁধল এবং কবুতর সেখানে ডিম পাড়ল। তাই তারা ভিতরে প্রবেশের চিন্তা করেনি।
প্রশ্ন-৫১০. গুহার কাছে দাঁড়িয়ে আবু জাহেল কী বলল?
উত্তর: সে বলল, "আমার মনে হয় সে আমাদের খুব কাছেই আছে। সে আমাদের কথাবার্তা শুনতে পাচ্ছে এবং আমাদেরকে দেখতে পাচ্ছে।"
প্রশ্ন-৫১১. আবু বকর যখন দেখলেন শত্রু খুব কাছেই চলে এসেছে তখন তিনি কী বললেন?
উত্তর: তিনি বললেন, "তারা যদি আমাদেরকে পাথরের ছিদ্র দিয়ে দেখে ফেলে এবং আমাদের যদি ধরে ফেলে!"
প্রশ্ন-৫১২. রাসূল আবু বকর (রা)-কে কী বললেন?
উত্তর: তিনি বললেন, "হে আবু বকর! শান্ত হও। আচ্ছা তুমি ঐ দুই জন সম্পর্কে কী মনে কর যাদের সঙ্গে তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে আল্লাহ আছেন"?
প্রশ্ন-৫১৩. আব্দুল্লাহ বিন উরাইকিত কখন গুহার কাছে এলেন?
উত্তর: পরিকল্পনানুযায়ী তিনি তিন রাত পর আবু বকর (রা)-এর দুটি উটনী সঙ্গে করে গুহায় এসে হাজির হন।
প্রশ্ন-৫১৪. আব্দুল্লাহ বিন উয়াইকিত কে ছিলেন?
উত্তর: তিনি ছিলেন আবু বকর (রা)-এর ভাড়া করা একজন বিশ্বাসী পথপ্রদর্শক। যদিও তিনি একজন কাফির ছিলেন তবুও তার প্রতি আবু বকর আস্থাশীল ছিলেন।
প্রশ্ন-৫১৫. আবু বকর (রা)-এর উটনী কি রাসূল গ্রহণ করেছিলেন?
উত্তর: হ্যাঁ, তিনি এ শর্তে গ্রহণ করলেন যে, তিনি এর জন্য মূল্য প্রদান করবেন।
প্রশ্ন-৫১৬. কে আসমা (রা)-কে উপাধি দিল যে, "আসমা হল দুই কোমর বাঁধুনী"?
উত্তর: আসমা বিনতে আবু বকর (রা) দুই মুহাজিরের জন্য খাদ্য সরবরাহ করতেন। তাদেরকে উটনীর পিঠের সাথে বেঁধে দেয়ার জন্য তিনি তার কোমর বন্ধনী ছিড়ে দুই টুকরা করেন, আর এ কারণে রাসূল তাকে বললেন "আসমা হল দুই কোমর বাঁধুনী।" যা রাসূল এর পক্ষ থেকে তাকে দেয়া উপাধি।
প্রশ্ন-৫১৭. আব্দুল্লাহ বিন উরাইকিতের সঙ্গে তারা কোন পথে চললেন?
উত্তর: তারা উপকূলীয় অঞ্চলের পথ দিয়ে চললেন।
প্রশ্ন-৫১৮. তাদের সাথে চতুর্থ ব্যক্তি হিসেবে কে হিজরত করেন?
উত্তর: আমির বিন ফুহাইরাহ।
প্রশ্ন-৫১৯. সুরাকা বিন মালিক বিন জুশাম কেন রাসূল এর পেছনে পেছনে ছুটলেন?
উত্তর: কারণ, তিনি আশা করেছিলেন যে, মুহাজিরদেরকে তিনি খুঁজে বের করবেন এবং একশটি উট পুরস্কার হিসেবে লাভ করবেন।
প্রশ্ন-৫২০. রাসূলের পিছনে ছুটার সময় সুরাকার কী পরিণতি হল?
উত্তর: তার ঘোড়াটি দুই দুই বার হোঁচট খেল এবং তাকে নিচে ফেলে দিল। কিন্তু সে যতক্ষণ পর্যন্ত রাসূল ও তার সাথীদের দেখছিল ঠিক ততক্ষণ পর্যন্ত সে তাদের পিছন পিছন ছুটতে লাগল। যখন সে তাদের খুব কাছে এসে পড়ল ঠিক তখন আবারও তার ঘোড়াটি তাকে নিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ল। ঐ সময় ঘোড়ার পাগুলো নিচে গেড়ে গেল।
প্রশ্ন-৫২১. তখন সে কী উপলব্ধি করল?
উত্তর: সে তখন ভালোভাবেই বুঝতে পারল যে রাসূল তার কাছ থেকে নিরাপদ।
প্রশ্ন-৫২২. সে রাসূলকে কী বলল?
উত্তর: সে বলল, 'আমি আপনার কোন ক্ষতি করব না।
প্রশ্ন-৫২৩. সে কীভাবে ঐ বিপদ থেকে মুক্তি পেল?
উত্তর: সে রাসূলকে অনুরোধ করল তার জন্য প্রার্থনা করতে রাসূল তার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন এবং তার ঘোড়ার পাগুলো ঠিক হয়ে গেল।
প্রশ্ন-৫২৪. সে রাসূল এর কাছে কী চাইল?
উত্তর: তিনি রাসূলকে একটি নিরাপত্তার নোট লিখে দিতে অনুরোধ করলেন যা তার জন্য প্রবেশের একটি টোকেন হবে।
প্রশ্ন-৫২৫. নোটটি কে লিখেছিলেন?
উত্তর: আমির বিন ফুহাইরা নোটটি লিখে সুরাকাকে দিলেন।
প্রশ্ন-৫২৬. সুরাকার উদ্দেশ্যে রাসূল কী ভবিষ্যৎ বাণী করলেন?
উত্তর: তিনি ভবিষ্যৎবাণী করলেন, "হে সুরাকা! তোমার কেমন লাগবে যখন তোমার হাতে নেতৃত্ব আসবে।" (সম্রাটের কংকন পরবে")
প্রশ্ন-৫২৭. তা কি আসলেই ঘটেছিল?
উত্তর: হ্যাঁ, উমর বিন খাত্তাবের খেলাফত আমলে তা সত্যিই ঘটেছিল।
প্রশ্ন-৫২৮. সুরাকা কি রাসূল এর ঠিকানা কোরাইশদের বলেছিল?
উত্তর: না, রাসূল এর ঠিকানা সম্পর্কে সে তাদের কিছুই বলেনি।
প্রশ্ন-৫২৯. যখন রাসূল ও তার সাথীরা তৃষ্ণার্ত ছিলেন তখন তারা এক বৃদ্ধা মহিলার কাছে যান, কে সেই মহিলা?
উত্তর: ঐ মহিলার নাম ছিল আতিকা বিনতে খালিদ যিনি উম্মে মা'বাদ নামে বেশি পরিচিত ছিলেন।
প্রশ্ন-৫৩০. রাসূল তার কাছে কী চাইলেন?
উত্তর: তিনি তার কাছে বকরীর দুধ চাইলেন।
প্রশ্ন-৫৩১. মহিলা কী বললেন?
উত্তর: মহিলা বললেন, সকল পশুই এখন বাহিরে। তবে অত্যন্ত দুর্বল একটি ছাগল চারণভূমির পাশে দাঁড়িয়ে আছে ওটা থেকে কোন দুধ পাওয়া সম্ভব নয়।
প্রশ্ন-৫৩২. রাসূল কী করলেন?
উত্তর: রাসূল বিসমিল্লাহ বলে ছাগলের ওলান স্পর্শ করলেন। হঠাৎ পর্যাপ্ত পরিমাণ দুধ আসতে লাগল।
প্রশ্ন-৫৩৩. রাসূল প্রথমে ঐ দুধ কাকে দিলেন?
উত্তর: তিনি প্রথমে উম্মে মা'বাদকে দিলেন। এরপর অন্যান্যদেরকে এবং সবার শেষে তিনি পান করলেন।
প্রশ্ন-৫৩৪. এরপর তিনি কী করলেন?
উত্তর: তিনি আবারো দুধ দোহন করলেন এবং পাত্র ভর্তি দুধ উম্মে মা'বাদকে দিয়ে আসলেন।
প্রশ্ন-৫৩৫. সফরকালে তাদের সাথে অন্য কোন ব্যক্তির সাথে দেখা হয়েছিল?
উত্তর: হ্যাঁ, তাদের সাথে যুবাইরের দেখা হয়।
প্রশ্ন-৫৩৬. যুবাইর রাসূল ও তার সাহাবী আবু বকর (রা)-কে কী উপহার প্রদান করেন?
উত্তর: তিনি তাদেরকে দুটি সাদা কাপড় উপহার দেন যা তারা ধন্যবাদের সাথে গ্রহণ করেন।
প্রশ্ন-৫৩৭. সুরাকা ছাড়া আর কেউ কি রাসূল এর পিছু নিয়েছিল?
উত্তর: হ্যাঁ, আবু বুরাইদা নামে আরেক জন পুরস্কার পাওয়ার লালসায় রাসুলকে ধরার চেষ্টা করেছিল।
প্রশ্ন-৫৩৮. তারপর কি ঘটনা সংঘটিত হল?
উত্তর: রাসূল এর সামনাসামনি হয়ে তার সাথে কথা বলতে না বলতেই তিনি সত্তরজন লোকের সঙ্গে ইসলাম গ্রহণ করে ফেললেন।
প্রশ্ন-৫৩৯. এরপর তিনি কী করলেন?
উত্তর: তিনি তার পাগড়ি নিয়ে তার বল্লমের চারপাশে বাঁধলেন এবং রাসূল এর আগমনের চিহ্ন হিসেবে এটিকে পতাকা হিসেবে ব্যবহার করলেন।
প্রশ্ন-৫৪০. মদিনার সফর কেমন ছিল?
উত্তর: এটা ছিল ক্লান্তিকর সফর যদিও প্রত্যেকে আশাবাদী ছিল। রাসূল ও তার সফরসঙ্গীদের মরুভূমি, পাহাড় ও পর্বতের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করতে হয়েছিল।
প্রশ্ন-৫৪১. মক্কা থেকে মদিনার দূরত্ব কত কিলোমিটার?
উত্তর: মক্কা থেকে মদিনার দূরত্ব প্রায় ৪০০ কিলোমিটার।
প্রশ্ন-৫৪২. এ দূরত্ব অতিক্রম করতে কতদিন লেগেছে?
উত্তর: এ দূরত্ব অতিক্রম করতে প্রায় নয় দিন লেগেছে।