📄 তাবলীগের প্রচলিত পন্থায় কতিপয় ত্রুটি
সমাজের নিম্ন শ্রেণীর মাঝেই দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা:
খ্রিস্টান মিশনারীর দেখাদেখি মুসলমানরাও দ্বীনের দাওয়াতের ক্ষেত্রে সমাজের নিম্ন শ্রেণীর লোকদের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করছেন। অথচ আল্লাহর পথে সর্ব প্রথম সেই সব লোকদের সম্বোধন করা উচিত যারা সমাজকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। নবী রাসূলগণ প্রথমে সাধারণ লোকদের পরিবর্তে সমাজের নেতৃস্থানীয় লোকদের মন মানসিকতায় পরিবর্তন আনয়নের চেষ্টা করেছেন এবং তাদের সংশোধনকে জনসাধারণের সংশোধনের মাধ্যম বানিয়েছেন। সমাজের কর্ণধাররা যদি সুপথে ফিরে আসে তাহলে জন সাধারণকে সহজেই সুপথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
যোগ্যতার গুরুত্ব না দেয়া:
দ্বীনের তাবলীগের জন্য যে যোগ্যতার প্রয়োজন রয়েছে তা গুরুত্ব না দিয়ে যেনতেনভাবে তাবলীগ করা। ফলে অমুসলিমদের নিকট ইসলামকে ঠিক সেইভাবে তুলে ধরা যাচ্ছে না যেভাবে কুরআন তা মানব জাতির সামনে তুলে ধরেছে।
নিকটবর্তীদের সংশোধন না করে দূর সমাজে পাড়ি দেয়া:
দাওয়াত প্রাপ্তির অধিক হকদার তারাই যারা নিকটে অবস্থান করছেন। অনেকে দলবদ্ধভাবে দূর দূরান্তে তাবলীগের কাজের জন্য বেরিয়ে যান, অথচ তার নিজ এলাকায় অসংখ্য লোক রয়েছে যারা সঠিক দ্বীনের দাওয়াত পায়নি।
ফজিলতের প্রতিই অত্যধিক গুরুত্ব প্রদান:
তাবলীগের কাজে আকর্ষণ সৃষ্টি করার মানসে শুধু ফজিলতের হাদীস বয়ান এমনকি রাসূলের নামে মিথ্যা তথা জাল হাদীস বর্ণনা করতেও শংকিত না হওয়া তাবলীগের কাজে এক অশনি লক্ষণ হয়ে দেখা দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন: ﴿وَلَوْ تَقَوَّلَ عَلَيْنَا بَعْضَ الْأَقَاوِيْلِ لَا خَذْنَا مِنْهُ بِالْيَمِينِ ثُمَّ لَقَطَعْنَا مِنْهُ الْوَتِينَ ﴾ তিনি (মুহাম্মদও) যদি আমার ব্যাপারে বানোয়াটি কথা রটায় তাহলে আমি তার ডান হাত পাকড়াও করব। তারপর তার দেহের মূল রগ কেটে দেব।” (সূরা হাক্কাহ-৪৪-৪৬)
দা'ওয়াত ও তাবলীগকে সৎ কাজের আদেশ আখ্যা দেয়া:
দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ করতে গিয়ে এ কাজকে অনেকেই সৎ কাজের আদেশ বলে প্রচার করেন অথচ এটা ভুল ধারণা। দাওয়াত হলো দ্বীনের পথে আহ্বান। এই আহ্বানে কেউ সাড়া দিতেও পারে আবার নাও, এতে কোন শক্তি প্রয়োগ নেই। কিন্তু আদেশ, এটা হলো কমান্ড যার সাথে ক্ষমতা প্রয়োগের সম্পর্ক।
সত্য প্রচারকে ফিতনা মনে করা:
সমাজে যদি এমন কোন আমল লক্ষ্য করা যায় যা কুরআন সুন্নাহর গবেষণার মাধ্যমে শিরক বা বিদআত প্রমানিত হয়েছে, তখন অনেকে বলেন "সঠিক কথাটি প্রচার করে ফিতনা সৃষ্টি করো না"। কিন্তু আসলেই কি সত্য কখনো ফিতনা হতে পারে? মূলত কুরআন হাদীসের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের অভাবেই কোন কোন ভাইয়ের দ্বারা এ ধরনের কাজ হয়ে থাকে। অতীতের গতানুগতিক ভুল পথকে আঁঁকড়ে থাকা ঠিক আরবের তৎকালীন কাফির মুশরিকদের আচরণেরই সাদৃশ্য! যারা রাসূলুল্লাহ (সা) এর দাওয়াতকে এক মহা ফিতনা ভেবেছিল।
📄 দা'ওয়াত ও তাবলীগের বিধান
দা'ওয়াত ও তাবলীগের বিধান শুধু পৌছে দেয়া। তা গ্রহণ করার ব্যপারে কারোর প্রতি কোন জবরদস্তি নেই। কুরআনুল কারীমে এ ব্যপারে বহু আয়াত রয়েছে। নিম্নে তার কতক তুলে ধরা হলো-
فَإِنَّمَا عَلَيْكَ الْبَلْغُ "তোমার দায়িত্ব হলো শুধু তাবলীগ করা।" (সুরাঃ আল ইমরান-২০)
وَمَا عَلَى الرَّسُولِ إِلَّا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ "রাসূলের দায়িত্ব তো কেবল সুস্পষ্টরূপে পৌঁছে দেয়া'। (সূরাঃ আন-নূর-৫৪, আনকাবুত-১৮)
أَطِيعُوا اللهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَاحْذَرُو فَإِنْ تَوَلَّيْتُمْ فَاعْلَمُوا إِنَّمَا عَلَى رَسُوْلِنَا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ "তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং আনুগত্য কর রাসূলের এবং নিজেদের আত্মরক্ষা কর। কিন্তু যদি তোমরা বিমুখ হও, তবে জেনে রাখ, আমার রাসূলের দায়িত্ব প্রকাশ্য প্রচার বৈ কিছু নয়।" (সূরাঃ আল মায়েদা-১২)
مَا عَلَى الرَّسُولِ إِلَّا الْبَلَاغُ "রাসূলের দায়িত্ব শুধু পৌঁছিয়ে দেয়া।” (সূরাঃ আল মায়েদা-৯৯)
فَإِنَّمَا عَلَيْكَ الْبَلَاغُ وَعَلَيْنَا الْحِسَابُ "আপনার দায়িত্ব তো পৌছে দেয়া আর আমার দায়িত্ব হিসাব নেয়া'। (সূরাঃ রা'দ-৪০)
إِنَّمَا أَنَا مِنَ الْمُنْذِرِينَ "আমিতো একজন ভীতি প্রদর্শনকারী।” (সূরা: নামল-৯২)
فَذَكِّرْ إِنَّمَا أَنْتَ مُذَكِّرَ لَسْتَ عَلَيْهِمْ بِمُصَيْطِرُ "আপনি উপদেশ দিন, আপনি তো কেবল একজন উপদেশদাতা, আপনি তাদের শাসক বা দারোগা নন।" (সূরা আল গাশিয়াহ ২১-২২)
لَا إِكْرَاهَ فِي ডিন "দীনের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি নেই।” (সূরাঃ আল বাকারা-২৫৬)
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهُ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ "তুমি যাকে ভালবাস তাকে (ইচ্ছে করলেই) হিদায়াত করতে পারবে না বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করেন।” (সূরাঃ আল কাসাস-৫৬)
সমাপ্ত
টিকাঃ
* দাওয়াত ও তাবলীগের বিধান যে শুধু পৌঁছে দেয়া সে সম্পর্কে আরো আয়াত রয়েছে- সূরা আন-নাহল-৩৫ ও ৮২, সূরা ইয়াসিন-১৭, সূরা আশশুরা-৪৮, সূরা আততাবাগুন-১২।