📄 রাসূলূল্লাহ (সাঃ) তাবলীগ থেকে শিক্ষা, প্রকৃত তাবলীগ জামা'আত চেনার উপায়
রাসূলুল্লাহ (সা) এর দা'ওয়াত ও তাবলীগী কার্যক্রম থেকে যে শিক্ষা পাওয়া যায় তার প্রধান কতক নিম্নরূপ:
১. দীনের দা'ওয়াত সর্বত্র পৌঁছে দেয়ার জন্য নির্ভয়ে কাজ করে যেতে হবে এবং এজন্য যে কোন ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকতে হবে।
২. প্রত্যেক যুগের প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার জাহেলী প্রথার সাথে আপোষহীন নীতি অবলম্বন করতে হবে।
৩. সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার যাবতীয় শিরকী কর্মকাণ্ড সমূহ চিহ্নিত করে জন সম্মুখে স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরতে হবে। শিরকের ক্ষতিকারক দিক সমূহ উপস্থাপন করে তা পরিহার করার জন্য সমাজের লোকদের আহ্বান জানাতে হবে।
৪. কোন ব্যক্তির নিজস্ব চিন্তাধারা বা কারোর স্বপ্নে প্রাপ্ত নীতি (হোক সে ব্যক্তি কোন ইসলামী চিন্তাবিদ হিসেবে খ্যাত বা বুযুর্গানে দীন) বা কারোর মনগড়া পদ্ধতির ভিত্তিতে তাবলীগ করা চলবে না। বরং দাওয়াত ও তাবলীগী কার্যক্রম পরিচালিত হতে হবে অহী ব্যবস্থাপনার আলোকে। অর্থাৎ কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর ভিত্তিতে।
৫. দা'ওয়াত ও তাবলীগী সংগঠন পরিচালনাকারী তথা প্রতিটি দাঈ-মুবাল্লিগ ও দায়িত্বশীলকে অবশ্যই তাগুত মুক্ত হতে হবে। অর্থাৎ তাদেরকে তাগুত রাষ্ট্র প্রধানের আনুগত্য পরিহার করতে হবে, তারা বিজাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের জড়াবে না। আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠার লক্ষে প্রশাসনিক তাগুতী নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে।
রাসূলুল্লাহর তাবলীগী কার্যক্রম থেকে উপরোল্লেখিত যে শিক্ষাগুলো পাওয়া গেল তা মূলত একটি প্রকৃত তাবলীগ জামা'আতের বৈশিষ্ট্য। বর্তমানে তাবলীগী জামা'আতের নামে বহু দল গঠিত হয়েছে। কিন্তু সে সবের মাঝে কোনটি প্রকৃত ও সঠিক জামা'আত তা চিনতে হলে আমাদের দেখতে হবে তাদের মাঝে কাদের সাথে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর তাবলীগী কার্যক্রমের মিল রয়েছে।
﴿ لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ ﴾
"রাসুলের জীবনেই তোমাদের উত্তম আদর্শ বিদ্যমান।” (সূরা আহযাব-২১)
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ أَطِيعُوا۟ ٱللَّهَ وَأَطِيعُوا۟ ٱلرَّسُولَ وَلَا تُبْطِلُوٓا۟ أَعْمَٰلَكُمْ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর আর আনুগত্য কর রাসূলের। আর (আল্লাহর ও রাসূলের দেখানো পদ্ধতি অনুসরণ না করে) তোমাদের আমলগুলোকে বরবাদ করে দিও না।” (সূরা মুহাম্মদ-৩৩)
📄 দাঈ ও মুবাল্লিগের প্রয়োজনীয় গুণাবলী
যারা দা'ওয়াত ও তাবলীগের মহৎ কাজ আঞ্জাম দিবেন তাদের বিশেষ কতগুলো গুণের অধিকারী হতে হবে। নিম্নে সংক্ষেপে এরূপ কিছু গুণাবলী উল্লেখ করা হলো।
১. আল্লাহভীরু হওয়া: الَّذِينَ يُبَلِّغُونَ رِسَٰلَٰتِ ٱللَّهِ وَيَخْشَوْنَهُۥ وَلَا يَخْشَوْنَ أَحَدًا إِلَّا ٱللَّهَ যারা আল্লাহর পয়গাম সমূহ পৌছে দেয় তারা তাকেই ভয় করে আর আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করেনা। (আহযাব-৩৯)
২. আলেমে দ্বীন তথা কুরআন সুন্নাহর যথার্থ জ্ঞানের অধিকারী হওয়া: وَمَا كَانَ ٱلْمُؤْمِنُونَ لِيَنفِرُوا۟ كَآفَّةً ۚ فَلَوْلَا نَفَرَ مِن كُلِّ فِرْقَةٍ مِّنْهُمْ طَآئِفَةٌ لِّيَتَفَقَّهُوا۟ فِى ٱلدِّينِ وَلِيُنذِرُوا۟ قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوٓا۟ إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ "তাদের প্রত্যেক দলের একটি অংশ কেন বের হল না যাতে দ্বীনের জ্ঞান লাভ করে এবং পরে তারা নিজ নিজ সম্প্রদায়ের নিকট প্রত্যাবর্তন করে তাদেরকে দ্বীন সম্পর্কে সতর্ক করে, যাতে করে তারা (সম্প্রদায়ের লোকেরা) ভয় করে, সতর্ক হয়।” (সূরাঃ আত-তওবা-১২২)
৩. ধৈর্যশীল হওয়া। আল্লাহ তা'আলা সূরা আসরে বলেছেন- إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّلِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ "তারা ক্ষতিগ্রস্ত নয়-যারা ঈমান আনে, সৎকর্ম করে, পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয় ও ধৈর্যধারণে পরস্পরকে উদ্বুদ্ধ করে থাকে।"।
৪. নিজের জন্যে যা পছন্দ করে অপরের জন্যও তাই পছন্দ করা। সুবিচারক হওয়া তথা প্রতিটি ব্যাপারে ইনসাফ কায়েম করা। কারো প্রতি জুলুম বা অবিচার না করা। সদাচরণ করা। নরম ও মিষ্টি ভাষী হওয়া। আল্লাহ তাঁর নবীকে উদ্দেশ্য করে বলছেন- وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ - "হে নবী! তুমি যদি রুঢ় ও কঠোর স্বভাবের হতে তবে লোকেরা তোমার ধারের কাছেও আসতো না।” (সূরাঃ আল ইমরান-১৫৯)
৫. স্পষ্ট ভাষী হওয়া এবং স্পষ্টভাষী হওয়ার জন্য আল্লাহর নিকট দুআ করা। যেমন মূসা (আঃ) করেছিলেন - قَالَ رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِّنْ لِسَانِي يَفْقَهُوا قَوْلِي - "হে রব। তুমি আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দাও, আমার কাজ সহজ করে দাও এবং আমার জিহবার জড়তা দূর করে দাও। (সূরাঃ তোহা ২৫-২৮)
৬. আমীরের আনুগত্য করা। দলবদ্ধভাবে তাবলীগ করার ক্ষেত্রে নির্বাচিত আমিরের কথা মেনে চলা। এছাড়াও আমলদার হওয়া, কৌশলী হওয়া, নম্র ভদ্র ও সহানুভূতিশীল হওয়া, বিশ্বস্ত, নির্ভরযোগ্য ও আমানতদার হওয়া, আত্মত্যাগী হওয়া, ক্ষমা করার নীতি অবলম্বন করা ইত্যাদি।
📄 দাঈ ও মুবাল্লিগদের পারস্পরিক সম্পর্ক মজবুত করার উপায়
১. মান ইজ্জতের নিরাপত্তা : একজন মুসলমানের যদি একতা নিশ্চিত রূপে বিশ্বাস হয় যে, তার ভাইয়ের বা সাথীর কাছে তার মান ইজ্জত নিরাপদ তবেই তার ভাইয়ের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে উঠবে।
২. দুঃখ কষ্টে অংশ গ্রহণ : একজনের দুঃখ ব্যথা অপরের দুঃখ ব্যথায় পরিণত হওয়া। রাসূল (সাঃ) বলেছেন : তোমরা মুমিনদেরকে পারস্পরিক সহৃদয়তা, বন্ধুত্ব, ভালবাসা এবং পারস্পরিক দুঃখ কষ্টের অনুভূতিতে এমনি দেখতে পাবে, যেমন একটি দেহ, যদি তার একটি অঙ্গ রোগাক্রান্ত হয় তবে তার সাথে গোটা দেহ, জ্বর ও রাত্রি জাগরণের মাধ্যমে তাতে অংশ গ্রহণ করে। (বুখারী ও মুসলিম)
৩. গঠন মূলক সমালোচনা : "তোমরা প্রত্যেকেই নিজ ভাইয়ের আয়না স্বরূপ। সুতরাং কেউ যদি তার ভাইয়ের মধ্যে কোন খারাপ দেখে তাহলে তা দূর করে দিবে।" (জামে আত-তিরমিযী)
৪. আবেগের বহিঃপ্রকাশ : মুচকি হাসি, কুশল বিনিময়, ইত্যাদির মাধ্যমে আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো।
৫. দেখা সাক্ষাত : বারবার মুলাকাত, সহচার্য গ্রহণ এবং কাছে এসে কথাবার্তা বলে সম্পর্ক সুদৃঢ় করা যায়।
৬. সালামের আদান প্রদান করা : রাসূল (সাঃ) বলেন, আমি তোমাদেরকে এমন একটি কাজের কথা বলে দেব কি যখন তোমরা তা করবে, পরস্পরের ভালবাসা স্থাপিত হবে? (তা হল) তোমরা পরস্পরের মধ্যে সালামের প্রসার কর। (মুসলিম, তিরমিযী, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ)
৭. মুসাফাহা করা : এর দ্বারা শত্রুতা দূরীভূত হয় এবং আন্তরিকতা বৃদ্ধি পায়। রুগ্ন ভাইকে দেখতে যাওয়া এবং পরিচর্যা করা : "যখন সে রোগাক্রান্ত হয় তার পরিচর্যা কর। (সহীহ মুসলিম)
৮. একত্রে বসে আহার করা : একে অপরকে নিজগৃহে খাবারের দাওয়াত দেয়া এটা আন্তরিকতা ও ভালবাসা বহিঃ প্রকাশের চমৎকার দৃষ্টান্ত। এছাড়াও - সামর্থ অনুযায়ী উপহার উপঢৌকন প্রদানের চেষ্টা করা, শোকর গোজারী হওয়া, ভাইয়ের সাথে মিলিত হলে তার ব্যক্তিগত অবস্থা জিজ্ঞেস করা, সুন্দর ভাবে কথার বা প্রশ্নের জবাব দেয়া, পরস্পরের জন্য দু'আ করা ইত্যাদি।
📄 তাবলীগের প্রচলিত পন্থায় কতিপয় ত্রুটি
সমাজের নিম্ন শ্রেণীর মাঝেই দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা:
খ্রিস্টান মিশনারীর দেখাদেখি মুসলমানরাও দ্বীনের দাওয়াতের ক্ষেত্রে সমাজের নিম্ন শ্রেণীর লোকদের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করছেন। অথচ আল্লাহর পথে সর্ব প্রথম সেই সব লোকদের সম্বোধন করা উচিত যারা সমাজকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। নবী রাসূলগণ প্রথমে সাধারণ লোকদের পরিবর্তে সমাজের নেতৃস্থানীয় লোকদের মন মানসিকতায় পরিবর্তন আনয়নের চেষ্টা করেছেন এবং তাদের সংশোধনকে জনসাধারণের সংশোধনের মাধ্যম বানিয়েছেন। সমাজের কর্ণধাররা যদি সুপথে ফিরে আসে তাহলে জন সাধারণকে সহজেই সুপথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
যোগ্যতার গুরুত্ব না দেয়া:
দ্বীনের তাবলীগের জন্য যে যোগ্যতার প্রয়োজন রয়েছে তা গুরুত্ব না দিয়ে যেনতেনভাবে তাবলীগ করা। ফলে অমুসলিমদের নিকট ইসলামকে ঠিক সেইভাবে তুলে ধরা যাচ্ছে না যেভাবে কুরআন তা মানব জাতির সামনে তুলে ধরেছে।
নিকটবর্তীদের সংশোধন না করে দূর সমাজে পাড়ি দেয়া:
দাওয়াত প্রাপ্তির অধিক হকদার তারাই যারা নিকটে অবস্থান করছেন। অনেকে দলবদ্ধভাবে দূর দূরান্তে তাবলীগের কাজের জন্য বেরিয়ে যান, অথচ তার নিজ এলাকায় অসংখ্য লোক রয়েছে যারা সঠিক দ্বীনের দাওয়াত পায়নি।
ফজিলতের প্রতিই অত্যধিক গুরুত্ব প্রদান:
তাবলীগের কাজে আকর্ষণ সৃষ্টি করার মানসে শুধু ফজিলতের হাদীস বয়ান এমনকি রাসূলের নামে মিথ্যা তথা জাল হাদীস বর্ণনা করতেও শংকিত না হওয়া তাবলীগের কাজে এক অশনি লক্ষণ হয়ে দেখা দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন: ﴿وَلَوْ تَقَوَّلَ عَلَيْنَا بَعْضَ الْأَقَاوِيْلِ لَا خَذْنَا مِنْهُ بِالْيَمِينِ ثُمَّ لَقَطَعْنَا مِنْهُ الْوَتِينَ ﴾ তিনি (মুহাম্মদও) যদি আমার ব্যাপারে বানোয়াটি কথা রটায় তাহলে আমি তার ডান হাত পাকড়াও করব। তারপর তার দেহের মূল রগ কেটে দেব।” (সূরা হাক্কাহ-৪৪-৪৬)
দা'ওয়াত ও তাবলীগকে সৎ কাজের আদেশ আখ্যা দেয়া:
দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ করতে গিয়ে এ কাজকে অনেকেই সৎ কাজের আদেশ বলে প্রচার করেন অথচ এটা ভুল ধারণা। দাওয়াত হলো দ্বীনের পথে আহ্বান। এই আহ্বানে কেউ সাড়া দিতেও পারে আবার নাও, এতে কোন শক্তি প্রয়োগ নেই। কিন্তু আদেশ, এটা হলো কমান্ড যার সাথে ক্ষমতা প্রয়োগের সম্পর্ক।
সত্য প্রচারকে ফিতনা মনে করা:
সমাজে যদি এমন কোন আমল লক্ষ্য করা যায় যা কুরআন সুন্নাহর গবেষণার মাধ্যমে শিরক বা বিদআত প্রমানিত হয়েছে, তখন অনেকে বলেন "সঠিক কথাটি প্রচার করে ফিতনা সৃষ্টি করো না"। কিন্তু আসলেই কি সত্য কখনো ফিতনা হতে পারে? মূলত কুরআন হাদীসের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের অভাবেই কোন কোন ভাইয়ের দ্বারা এ ধরনের কাজ হয়ে থাকে। অতীতের গতানুগতিক ভুল পথকে আঁঁকড়ে থাকা ঠিক আরবের তৎকালীন কাফির মুশরিকদের আচরণেরই সাদৃশ্য! যারা রাসূলুল্লাহ (সা) এর দাওয়াতকে এক মহা ফিতনা ভেবেছিল।