📄 জিহাদের পূর্ব মুহূর্তে দা'ওয়াত প্রসঙ্গ
১) রাসূলুল্লাহ (সা) ইসলামের দাওয়াত না দিয়ে কোন সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুদ্ধ করেননি। (বাইহাকী, আহমাদ, তাবারাণী-কাবীর, সিলসিলা সহীহা, হাদীসের সনদ বুখারী ও মুসলিমের শর্ত মোতাবেক সহীহ)
২) ইবনে আওন হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নাফে (রা) কে এই মর্মে পত্র লিখলাম যে, যুদ্ধের পূর্বে কাফিরদের দীনের দাওয়াত দিতে হবে কি না? তিনি বলেন, অতঃপর তিনি আমার প্রতি লিখলেন যে, এই নিয়ম ইসলামের প্রথম যুগে প্রযোজ্য ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) বনূ মুসতালিকের উপর আক্রমন করেছিলেন এমতাবস্থায় যে, তারা জানতেই পারেনি (অর্থাৎ তারা গাফেল ছিল)। তারা তাদের পশুদের পানি পান করাচ্ছিল তখন তিনি তাদের যোদ্ধাদের হত্যা করেছেন এবং অবশিষ্টদের বন্দী করেছেন।... বর্ণনাকারী বলেন, এই হাদীস আমার নিকট আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রা) বর্ণনা করেছেন। আর তিনি তখন সেই সেনাদলেই ছিলেন। (সহীহ মুসলিম)
৩) একদা হাসান বসরী (রা) কে জিজ্ঞেস করা হলো, কাফিরদের কি যুদ্ধের পূর্বে দাওয়াত দিতে হবে? তিনি উত্তরে বললেন- قَدْ بَلَغَهُمُ الْإِسْلَامَ مِّنْذُ بَعَثَ اللَّهُ مُحَمَّدٌ (ص) "আল্লাহ তাআলা যখন থেকে মুহাম্মদ (সা) কে প্রেরণ করেছেন তখন থেকেই তাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌছে গেছে (অর্থাৎ নতুন করে দা'ওয়াত দেওয়ার প্রয়োজন নেই)।” (এটি বর্ণিত হয়েছে-ইবনু আবী শায়বা (১২/৩৬৫), সাঈদ বিন মানসুর (৩/২/২০৬ ২৪৮৬), সিলসিলা সহীহা ২৬৪১)
আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ) এর মতে- প্রথমোক্ত হাদীসটি দ্বিতীয় হাদীসের বিপরীত নয়। কেননা তাতে এ বলা হয়নি যে তাদের নিকট ইসলামের দাওয়াতই পৌছেনি। আর তা হতেই পারে কিভাবে যেখানে আরব পাড়ি দিয়ে রোম পারস্যে ইসলামে প্রচার লাভ করেছে! সমকালীন কতিপয় লেখক এ হাদীসের কারনে বোকামী বশতঃ এ বিষয়টিকেই অস্বীকার করে থাকেন।
📄 দা'ওয়াতের পূর্বে দাঈর লক্ষণীয় বিষয়
(১) দাওয়াতের পূর্বে সর্বপ্রথম দাঈকে তার নিয়াত বিশুদ্ধ করে নিতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ "প্রত্যেক কাজের প্রতিদান তার নিয়তের উপর নির্ভরশীল।” (সহীহ বুখারী)
(২) যে বিষয়ে দা'ওয়াত দেয়া হবে সে বিষয়ে মৌলিক ও পূর্ণাঙ্গ ধারণা অবশ্যই অর্জন করে নেয়া। অর্থাৎ দৃঢ় বিশ্বাস ও পূর্ণ আস্থা নিয়েই অন্যকে দা'ওয়াত দিতে হবে, অস্পষ্ট ধারণার বশবর্তী হয়ে নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন- قُلْ هَذِهِ سَبِيلِي أَدْعُوا إِلَى اللَّهِ عَلَى بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي . “(হে নবী)! বল, ইহাই আমার পথ। আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহ্বান করি সজ্ঞানে, আমি এবং আমার অনুসারীগণও”। (সূরাঃ ইউসুফ-১০৮)
(৩) মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ।
(৪) যে বিষয়ে দা'ওয়াত দেয়া হবে সে বিষয়ে নিজের আমল থাকা।
(৫) যে স্থানে দা'ওয়াত দেয়া হবে তা ঝুকিপূর্ণ না নিরাপদ তা পর্যবেক্ষণ করে নেয়া।
(৬) দা'ওয়াতী কাজের জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ না করা। কেননা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে দা'ওয়াতী কাজ করলে লোকে ভাববে চাকুরীর খাতিরে বা মজুরীর লোভে এ কাজ করা হচ্ছে। তাই তাবলীগের কাজ আল্লাহর ওয়াস্তেই করতে হয়। আল্লাহ বলেন-
قُلْ لَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرَى لِلْعَالَمِينَ ﴾ “(হে মুহাম্মদ!) আপনি বলে দিন, আমি এ কাজের জন্য তোমাদের নিকট কোন পারিশ্রমিক চাই না, এটা তো সারা বিশ্বের জন্য একটি উপদেশ মাত্র।” (সূরাঃ আনআম-৯০)
يَقُوْمِ لَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِنْ أَجْرِى إِلَّا عَلَى الَّذِي فَطَرَنِي ﴾ (হুদ বললো) হে আমার জাতি! আমি এজন্য তোমাদের কাছে কোন মজুরী চাইনা, আমার মজুরী তো তাঁরই কাছে যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা হুদ-৫১)
اتَّبِعُوْا مَنْ لَا يَسْأَلُكُمْ أَجْرًا وَهُمْ مُهْتَدُونَ ﴾ "অনুসরণ করো তাদের, যারা তোমাদের কাছে কোন বিনিময় চায় না, অথচ তারা সুপথ প্রাপ্ত।” (সূরা ইয়াসীন-২১)
অতএব এতে বোঝা যায় যে, দীনী দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে কোন পারিশ্রমিক গ্রহণ করা হলে তা ফলপ্রসূ হয় না। বাস্তব অভিজ্ঞতাও সাক্ষ্য দেয় যে, যারা ওয়াজ নসিহত করে পারিশ্রমিক গ্রহণ করে তাদের কথায় শ্রোতাদের অন্তরে কোন তাসীর করতে পারে না। (তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন)
(৭) যার কাছে দাওয়াত পৌছানো হবে সে কি তার আহ্বান শুনতে মানসিক ভাবে প্রস্তুত কিনা তা জেনে নেয়া। কারণ অসময়ে, কর্ম ব্যস্ততায় বা দাওয়াত দেয়ার পরিবেশ নয় এমন পরিস্থিতিতে দাওয়াত পৌছালে তা কার্যকর হয় না! ইকরীমা থেকে বর্ণিত, ইবনে আব্বাস (রা) আমাকে বললেন, আমি তোমাকে এমন অবস্থায় যেন না দেখি যে, তুমি কোন দলের কাছ দিয়ে যাচ্ছ তখন তারা নিজেদের কোন কাজে ব্যস্ত রয়েছে, আর এই অবস্থায় তুমি তাদেরকে নিজের ওয়াজ শুনানো আরম্ভ করে দিলে। বরং তোমার তখন চুপ থাকা উচিৎ। যখন তারা তোমাকে বলার সুযোগ দেবে তখন তুমি তাদের কাছে নিজের বক্তব্য পেশ করবে। তাহলে তারা আগ্রহ সহকারে তোমার কথা শুনবে। (সহীহ বুখারী)
📄 দা'ওয়াতের সময় দাঈর লক্ষণীয় বিষয়
১. অত্যন্ত নম্র ও বিনয়ের সাথে কথা বলা। রাসূল (সাঃ) বলেছেন, "নিশ্চয় আল্লাহ দয়াশীল, প্রতিটি বিষয়ে নম্র ব্যবহার তিনি পছন্দ করেন, নম্রতা অবলম্বনের ফলে তিনি যা দান করেন কঠোরতার কারণে তা দেন না।” (সহীহ মুসলিম)
২. যে জাতি বা সমাজের প্রতি আহ্বান করা হবে তাদের ভাষাতেই তা করতে হবে। এমনটি যেন না হয় যে, শ্রোতা বাংলাভাষী অথচ দাওয়াত দেয়া হচ্ছে আরবী বা ইংরেজী ভাষায়। আল্লাহ বলেন- وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ "আমি যখনই কোন রাসূল প্রেরণ করেছি- সে নিজ জাতির জনগণের ভাষায়ই পয়গাম পৌঁছিয়েছে যেন সে তাদের পরিষ্কার ভাবে বুঝাতে পারে।" (সূরাঃ ইব্রাহিম-৪)
৩. কোন গোঁজামিল না রেখে স্পষ্ট ভাষায় কথা বলা এবং প্রয়োজন বোধে উদাহরনের মাধ্যমে তথা বিভিন্ন কায়দায় বুঝানোর চেষ্টা করা।
৪. বক্তব্য সংক্ষেপ করা এবং শ্রোতা বিরক্ত হচ্ছে কিনা সেদিকে লক্ষ্য রাখা। রাসূল (সাঃ) বলেন "নামায দীর্ঘ কর এবং বক্তৃতা সংক্ষেপ কর” (সহীহ মুসলিম)।
৫. তাবেঈ শাকীক বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) প্রতি বৃহস্পতিবার লোকদের ওয়াজ নসীহত করতেন। এক ব্যক্তি তাঁকে বলল, হে আবু আব্দুর রহমান! আমার আকাঙ্খা ছিল, আপনি যদি প্রতি দিন আমাদের জন্য ওয়াজ নসীহত করতেন। তিনি উত্তরে বললেন, এরূপ করা থেকে আমাকে এ কথাই বাধা দেয় যে, আমি তোমাদের মাঝে বিরক্তি সৃষ্টি করা পছন্দ করিনা, তাই আমি বিরতি দিয়েই তোমাদের সামনে ওয়াজ করে থাকি। যেমন রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের বিরক্তির ভয়ে মাঝে মধ্যে আমাদের ওয়াজ-নসীহত করতেন। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
৬. ইকরীমা বর্ণনা করেন যে, ইবনে আব্বাস (রা) আমাকে বললেন, সপ্তাহে মাত্র একদিন লোকদের জন্য ওয়াজ নসীহত কর। এতে যদি রাজী না হও তাহলে (সপ্তাহে) দুই দিন, এতেও যদি সন্তুষ্ট না হও তাহলে (সপ্তাহে) তিনদিন। মোট কথা কুরআনকে মানুষের কাছে বিরক্তিকর করে তুল না। (সহীহ বুখারী)
৭. সহজ সরল ভাষায় কথা বলা। মূর্খ বা অল্প শিক্ষিত লোকের কাছে যেমন উচ্চাংগের কথা বলা বা কঠিন শব্দ ব্যবহার করা বোকামী তেমনি উচ্চ শিক্ষিতের সামনে সাদামাটা বা যেন দাওয়াতদাতার ভেতর ইলমই নেই এমনভাবে কথা বলাটাও বোকামী।
৮. আবেগ ও উদ্দীপনার সাথে হাসি মুখে আহ্বান করা। শ্রোতা অপমান বোধ বা খারাপ ধারণা পোষন করবে এমন কথা না বলা।
📄 দা'ওয়াতের পরে দাঈর লক্ষণীয় বিষয়
যাকে দা'ওয়াত দেয়া হয়েছে তার পরবর্তী অবস্থার প্রতি নজর না রেখে বা খোঁজ না নিয়ে শুধু দাওয়াত দিয়ে চলে আসা একজন সচেতন দাঈর কাজ নয়। তাই একজন দাঈর কাজ হবে, সে যে অমুসলিমকে দা’ওয়াত দিয়েছে সে ইসলামের প্রতি দূর্বল হয়ে পড়েছে কিনা তার খোঁজ নেয়া। যদি দূর্বল হয়ে থাকে তাহলে তাকে আবারও ভাল করে দাওয়াত দিতে হবে এবং পুরোপুরিভাবে যেন ইসলামের প্রতি ঝুঁকে পড়ে সে পন্থা অবলম্বন করতে হবে। আর যদি ইসলাম কবুল করে তাহলে তার আমল গঠনের জন্য প্রশিক্ষণ দিতে হবে। পাশাপাশি কোন মুসলমান ভাইকে আমল সংশোধনের জন্য দীনী বিধান অবহিত করা হলে পরবর্তীতে সে সংশোধন হয়েছে কিনা তার খোঁজ নিতে হবে। তবেই দা'ওয়াত ও তাবলীগ সফলতার দিকে এগিয়ে যাবে।