📄 দা'ওয়াত ও তাবলীগের মূল ভিত্তি
দাওয়াত ও তাবলীগ শুধুমাত্র দুটি জিনিসের উপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে। (১) মহাগ্রন্থ আল কুরআন। (২) সুন্নাতে রাসূল (সাঃ)। নবী করীম (সাঃ) বিদায় হজ্জের ভাষণে বলেছেন-
تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا كِتَابُ اللَّهِ وَسُنَّة رَسُولِهِ
"আমি তোমাদের মাঝে দুটি বস্তু রেখে যাচ্ছি যা আকঁড়ে ধরতে পারলে তোমরা কখনোই পথভ্রষ্ট হবে না। তা হল- আল্লাহর কিতাব (আল-কুরআন) এবং তাঁর রাসূলের সুন্নাত। (মুয়াত্তা ইমাম মালেক)
📄 কাদের নিকট তাবলীগ করতে হবে
১। পরিবার পরিজন
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قَوْا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِكُمْ نَارًا.
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেকে এবং তোমাদের পরিবার পরিজনকে জাহান্নামের আগুন হতে রক্ষা কর।" (সূরাঃ আত তাহরীম- ৬)
২। নিকট আত্মীয় স্বজনদেরকে
وَأَنْذِرُ عَشِيرَتَكَ اَلْاَ قُرَبِينَ
“(হে রাসূল)! আপনি নিকটতম আত্মীয়দেরকে সতর্ক করুন।" (সূরাঃ আশ শুআরা-২১৪)
৩। সমাজের লোকদের নিকট
وَ لِتُنْذِرَ أَمَ الْقُرَى وَمَنْ حَوْلَهَا
“(এ কুরআন আমি অবতীর্ণ করেছি) যাতে আপনি মক্কাবাসী ও পার্শ্ববর্তীদেরকে ভয় প্রদর্শন করেন।" (সূরাঃ আল আনআম ৯২)।
৪। বিশ্বের সকল মানুষের নিকট
﴿ وَلْتَكُمْ مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ ﴾
তোমাদের মাঝে এমন একটি দল থাকতে হবে যারা মানব জাতিকে কল্যাণের পথে আহবান জানাবে। (সূরা আল-ইমরান-১০৪)
﴿ كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ ﴾
"তোমরাই হলে সর্বোত্তম জাতি, মানব জাতির কল্যাণের জন্যই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। (সূরাঃ আল ইমরান-১১০)
📄 তাবলীগ একাকী হবে, না জামা'আতবদ্ধভাবে
দাওয়াত ও তাবলীগে দ্বীন কয়েক ভাবে হতে পারে-
ক) ব্যক্তিগত উদ্যোগ অর্থাৎ ব্যক্তিগতভাবে মানুষের নিকট দাওয়াত পৌছে দেয়া ও দ্বীনের বিধি বিধান সমূহ অবহিত করা।
খ) জামা'আতবদ্ধভাবে জামা'আত তথা দলবদ্ধভাবে দ্বীন প্রচার। যেমন, তাবলীগী টীম গঠন করে প্রতিটি মহল্লায়, পাড়ায়, দোকানে, বিভিন্ন স্থানে দ্বীনের তাবলীগ করা।
গ) রাষ্ট্রীয়ভাবে রাষ্ট্রীয়ভাবে বা সরকারী উদ্যোগে তাবলীগী দল গঠন করে দেশের অভ্যন্তর সহ বিভিন্ন দেশে প্রেরণ ইত্যাদি।
এখানে লক্ষণীয় যে, তাবলীগের জন্য ঘর সংসার ত্যাগ করা অপরিহার্য নয়। সুতরাং প্রতিটি মুসলিম চাই সে চাকরীজীবী, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, দিনমজুর যে পর্যায়ের হোন না কেন তিনি স্বস্থানে থেকে সর্বাবস্থায় এ পবিত্র দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। আর এভাবে তাবলীগ করাটা সকলের জন্য সম্ভব এবং সহজতর।
📄 দা'ওয়াতের মূলনীতি ও পদ্ধতি
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلُهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنْ ضَلَّ عَنْ سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ
“(হে রাসূল)! আপনি প্রতিপালকের পথে (মানুষকে) আহ্বান করুন হিকমাত (যা দ্বারা আপনার দাবী সপ্রমাণ করাই উদ্দেশ্য হয়) ও সদুপদেশ দ্বারা এবং (এ কাজ করতে গিয়ে যদি কখনো তর্কে জড়াতে হয় তাহলে) তাদের সাথে বিতর্ক করুন উৎকৃষ্ট পন্থায়, নিশ্চয় আপনার প্রতিপালক ভাল করেই জানেন কে তাঁর পথ ছেড়ে বিপদগামী হয়েছে এবং এও জানেন যে, কে হেদায়েতের পথে রয়েছে।” (সূরাঃ নাহল-১২৫)
আলোচ্য আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা দা'ওয়াত ও তাবলীগের নীতি ও পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন। এই দাওয়াতের উপায় উপকরণ কি হবে, কোন নীতি ও পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এবং পরবর্তীতে তাঁর উম্মতের মুবাল্লিগগণ দাওয়াতী কাজ পরিচালনা করবেন তার রূপ রেখাও আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। মুবাল্লিগদের উচিত, দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ করার পূর্বে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত এই মূলনীতি গুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করা।
• প্রথম মূলনীতি-হিকমাত
দাওয়াতের ক্ষেত্রে একজন মুবাল্লিগের প্রথম অবলম্বনের বিষয় হলো হিকমাত। অর্থাৎ মুবাল্লেগকে হিকমাতের সাথে মানুষকে আহবান করতে হবে। হিকমাত কি বা হিকমাত দ্বারা কি উদ্দেশ্য? এ বিষয়ে মোটামুটি বিস্তারিত আলোচনা করা দরকার বলে মনে করছি।
'হিকমাত' আরবী শব্দ। এর বাংলা অর্থ-গভীর জ্ঞান, দীপ্ত বুদ্ধি। বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত আরবী বাংলা অভিধানে "হিকমাত' অর্থ করা হয়েছে তত্ত্বজ্ঞান, বিজ্ঞতা, পরিণাম দর্শিতা, বিচক্ষণতা। এছাড়া বিভিন্ন গ্রন্থে হিকমাতের নিম্ন বর্ণিত অর্থ করা হয়েছে- (১) পরিস্থিতি অনুপাতে কথা বলা হিকমাতের অন্তর্ভুক্ত।' (২) হিকমাত হলো জ্ঞান ও বুদ্ধির সাহায্যে প্রকৃত সত্য লাভ, সত্য লাভের যোগ্যতা ও প্রতিভা। (৩) 'সর্বোত্তম জিনিস সমূহ সম্পর্কে সুক্ষ্ণ গভীর জ্ঞান লাভ করাই হিকমাত।
পবিত্র কুরআনে দৃষ্টিপাত করলে তাতে হিকমাত শব্দের ব্যাপক ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। মহান আল্লাহ তা'আলা কুরআনুল কারীমে নিজেকে বহুবার হিকমাতের গুণে বিশেষিত করেছেন। একইভাবে কুরআনকেও হিকমাত নামে অভিহিত করা হয়েছে। অপর দিকে রাসূলগণকে আল্লাহ পাক বিশেষ যে দুটি বস্তু দান করেছেন সে সম্পর্কে বলা হয়েছে,
وَإِذَا أَخَذَ اللَّهُ مِيْثَاقَ النَّبِيِّنَ لَمَا أَتَيْتُكُمْ مِنْ কিতাব وَحِكْمَةٍ
'আর (স্মরণ কর) আল্লাহ যখন নবীগণের কাছ থেকে অঙ্গিকার গ্রহণ করলেন যে, আমি যা কিছু তোমাদের দান করেছি (তা হলো) কিতাব ও হিকমাত।” (সূরাঃ আল ইমরান-৮১)
'আয়্যাটে উল্লেখিত কিতাবের সঙ্গে 'হিকমতে'র উল্লেখ হয়েছে সেসব স্থানেই কিতাব অর্থ আল্লাহর নিজস্ব কালাম আসমানী গ্রন্থ, যা রাসূলদের প্রতি নাযিল হয়েছে এবং যাতে আল্লাহর আদেশ নিষেধ ও উপদেশ বর্ণিত হয়েছে। আর 'আল-হিকমাত' অর্থ সে সবের নিগূঢ় তত্ত্ব সম্পর্কে বিশুদ্ধ ও সঠিক জ্ঞান এবং সে জ্ঞান অনুযায়ী সঠিক কাজ। বস্তুত এই নির্ভুল জ্ঞান ও তদানুযায়ী সঠিক আমল করার বুদ্ধি প্রত্যেক রাসূলকেই দেয়া হয়েছে। নবী রাসূল গণের ক্ষেত্রে এটা আল্লাহর স্থায়ী ও নির্বিশেষ নিয়ম।'
নবী ইব্রাহিম (আঃ) ও ইসমাঈল (আঃ) যখন কাবা ঘর নির্মাণ করছিলেন তখন তাঁরাও আল্লাহর সমীপে এই আবেদন করেছিলেন যে- رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولاً مِّنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ أَيْتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ “হে পরওয়ারদেগার! তাদের বংশের মধ্য থেকেই একজন রাসূল প্রেরণ করুন, যিনি তাদের কাছে আপনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবেন, তাদেরকে কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দিবেন এবং তাদেরকে পবিত্র করবেন (সূরাঃ আলবাকারা-১২৯)
আল্লাহ পাক তাঁদের দুআ কবুল করেছিলেন এবং তাদের বংশে সাইয়্যেদুল মুরসালীন মুহাম্মদ (সাঃ) কে প্রেরণ করে বলেছেন:
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمُ ايْتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ -
"তিনিই উম্মীদের মধ্যে তাদের একজনকে পাঠিয়েছেন রাসূলরূপে। সে (রাসূল) তাদের নিকট তিলাওয়াত করে আল্লাহর আয়াত, তাদেরকে পবিত্র ও সংস্কৃিত করে এবং শিক্ষা দেয় কিতাব ও হিকমাত।' (সূরাঃ জুমআ ২)
আয়াতে নবী করীম (সাঃ)-এর তিনটি সুস্পষ্ট দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা ঘোষনা করা হয়েছে। এবং শেষাংশে বলা হয়েছে 'কিতাব' ও হিকমাত' শিক্ষাদানও তাঁর দায়িত্ব। এখানেও আল কিতাব অর্থ কুরআনুল কারীম কিন্তু হিকমাত অর্থ কি? যা তিনি উম্মতদের শিক্ষা দেবেন? ঈমাম শাফেয়ী (রহ) লিখেছেন, কুরআন সম্পর্কিত জ্ঞানে সর্বাধিক পারদর্শী আস্থাভাজন বিশিষ্ট লোকদের নিকট আমি শুনেছি: তারা বলেছে হিকমাত হচ্ছে রাসূলের সুন্নাত। অতঃপর তিনি লিখেছেন- রাসূলের সুন্নত হলো সেই হিকমাত যা হযরতের দিল মুবারকে আল্লাহর নিকট থেকে উদ্রেগ করা হয়েছে (কিতাবুর রিসালা)
আল্লাহ পাক অন্যত্র মুহাম্মদ (সাঃ) কে উদ্দেশ্য করে বলেছেন-
وَأَنْزَلَ اللهُ عَلَيْكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَكَ مَا لَمْ تَكُنْ تَعْلَمُ.
“(হে নবী!) আল্লাহ তোমার প্রতি কিতাব ও হিকমাত নাযিল করেছেন এবং তুমি যা জানতে না তা তোমাকে শিক্ষা দিয়েছেন। " (সূরাঃ আন নিসা-১১৩)
এরূপ বহু আয়াতেই কিতাবের সাথে হিকমাত দানের কথা সুস্পষ্টভাবে উল্ল্যেখ করা হয়েছে। এই আয়াতের তাফসীরে আল্লামা ইবনে কাসীর লিখেছেন, আয়াতে উল্লেখিত 'কিতাব' অর্থ কুরআন মজিদ এবং হিকমাত অর্থ সুন্নাত বা হাদীসে রাসূল। (এই উভয় জিনিসই আল্লাহর পক্ষ থেকে আল্লাহ কর্তৃক অবতীর্ণ)। (ইবনু কাসীর)
ইমাম শাফেয়ী (রহ) লিখেছেন, বাক্যে 'কিতাবের সাথে হিকমাত উল্লেখ্য করে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সুন্নাহ ও শিক্ষার নাম যে হিকমাত তাও আল্লাহ তাআলারই অবতারিত। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, কুরআন-ওহী মাতলু' যা তিলাওয়াত করা হয় এবং যার অর্থ ও শব্দাবলী উভয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত। আর হাদীস তথা সুন্নাত 'গাইরে মাতলু' যা তিলাওয়াত করা হয় না। এর শব্দ রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর এবং মর্ম আল্লাহর পক্ষ থেকে। (মা'আরেফুল কুরআন)
আয়াতে হিকমাতকে সুন্নাত বলার তাৎপর্য সম্পর্কে সহীহ বুখারীর ব্যখ্যাকার আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী (রহ) লিখেছেন, সুন্নাত বা হাদীসকে হিকমাত বলার তাৎপর্য এই যে, এর দ্বারাই হক ও বাতিলের মাঝে পার্থক্য করা হয়েছে এবং কুরআনের ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
মোটকথা তাফসীরকার সাহাবীগণ নবী করীম (সাঃ)-এর কাছ থেকে শিখে কুরআনের ব্যাখ্যা করতেন। এখানে হিকমাত শব্দের অর্থ তাদের ভাষা ভিন্ন ভিন্ন হলেও সবগুলোর মর্মই এক। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সুন্নাত। হিকমতের অর্থ কেউ কুরআনের তাফসীর, কেউ ধর্মের গভীর জ্ঞান, কেউ শরীয়তের বিধি-বিধানের জ্ঞান, কেউ এমন বিধি-বিধানের জ্ঞান অর্জন বলেছেন, যা শুধু রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর বর্ণনা থেকেই জানা যায়। নিঃসন্দেহে এসব উক্তির সারমর্ম হল রাসূল (সাঃ)-এর সুন্নাহ। (মা'আরেফুল কুরআন)
এ যাবত হিকমাতের মোটামুটি ব্যাখ্যা তুলে ধরা হলো মাত্র। এক্ষনে আমরা সূরা আন-নাহলে বর্ণিত দাওয়াতের ক্ষেত্রে অবলীম্বনীয় প্রথম মূলনীতি- 'হিকমাত' এর অর্থ মুফাসসিরগণ কি করেছেন তার কতক তুলে ধরবো।
ক) ইমাম ইবনু জারীরের উক্তি অনুযায়ী 'হিকমাত' দ্বারা কালামুল্লাহ ও হাদীসে রাসূল (সাঃ) উদ্দেশ্য। (তফসীর ইবনে কাসীর)
খ) সাহাবী ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, কুরআনে কারীমই হলো হিকমাত। (তফসীর ইবনে আব্বাস)
গ) আলোচ্য আয়াতে হিকমাত দ্বারা উদ্দেশ্য আল-কুরআন। (তফসীরে জালালাইন)
ঘ) হিকমত হলো আল্লাহর সেই অহী যা তিনি নবী (সা)-এর প্রতি করেছেন এবং তাঁর সেই কিতাব যা তিনি নবী (সা) এর উপর নাযিল করেছেন। (তফসীর তাবারী)
ঙ) হিকমত হলো সে অন্তদৃষ্টি যার দ্বারা মানুষ অবস্থার তাগিদ জেনে নিয়ে তদানুযায়ী কথা বলে এবং নম্রতার সময় নম্রতা এবং কঠোরতার সময় কঠোরতা অবলম্বন করে। (রুহুল বায়ান)
চ) এমন বিশুদ্ধ বাক্যকে হিকমাত বলা হয় যা মানুষের মনে আসন করে নেয়। (তাফসীরে রুহুল মাআনী)
ছ) বুদ্ধি খাটিয়ে যাকে দা'ওয়াত দেয়া হচ্ছে তার মন, মানস, যোগ্যতা ও অবস্থার প্রতি দৃষ্টি রাখা তৎসঙ্গে পরিস্থিতি বুঝে কথা বলা হচ্ছে হিকমাত। (তাফহীমূল কুরআন)
জ) অকাট্য দলিলই হিকমাতের মূল বস্তু, যাকে বুরহান বলা হয়। আর কুরআন কারীমে স্বাভাবিক ও যৌক্তিক বহু প্রমাণই শ্রোতৃবর্গের সম্মুখে তুলে ধরা হয়েছে। অতএব এমন কোন দাবীর পক্ষে কাল্পনিক প্রমাণের অবতারণা করা হয়নি যার পক্ষে যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ দেয়া না যায় বরং কুরআনের সমস্ত দাবীই যৌক্তিক। অর্থাৎ সমগ্র কুরআনে কারীমই হলো হিকমাত। (তফসীরে আশরাফী)
ঝ) যুক্তি সম্মত সঠিক কথা যা দ্বারা মানুষকে সত্যের দিকে আহবান করা হয়। আল্লামা সানাউল্লাহ পানিপত্তী (রহ) বলেছেন, এ স্থলে হিকমত অর্থ মহাগ্রন্থ আল কুরআন (তফসীরে নুরুল কুরআন)
(ঞ) মজবুত দলিল প্রমাণের আলোকে হিকমত ও প্রজ্ঞাজনোচিত ভঙ্গিতে অত্যন্ত পরিপক্ক ও অকাট্য বিষয় বস্তু পেশ করা যা শুনে সামাজদার ও জ্ঞানবান লোক মাথা ঝুকিয়ে দিতে বাধ্য হয়। দুনিয়ার কাল্পনিক দর্শনাদি তার সামনে ম্লান হয়ে যায়। (তফসীরে ওসমানী)
(ট) With the divine inspiration and Quran. (THE NOBLE QUR'AN)
অতএব হিকমাতের আলোচনার প্রেক্ষিতে এটা স্পষ্ট প্রতিয়মান হয় যে, শরীয়তের নিয়ম পদ্ধতি পরিত্যাগ করে কারো মনগড়া পদ্ধতির অনুসরন বা ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থপরায়ণতার কারণে, ভয়ে বা গাঁ বাঁচানোর নীতি অবলম্বনের মানসে সত্যপ্রচারে কুণ্ঠাবোধ বা কৌশল অবলম্বনের ধূয়া তুলে বানোয়াট কথাবার্তা ও সহীহ তরীকাকে পরিবর্তন করে ফেলা দা'ওয়াতের ক্ষেত্রে (বিশেষ করে মুসলমানদের মাঝে তাবলীগ করার ব্যাপারে) কোনক্রমেই হিকমাত বলে গণ্য ও বিবেচিত হতে পারে না। ঐরূপ করার দ্বারা একদিকে যেমন নিজেকে গুনাহগার সাব্যস্ত করা হয় অপর দিকে তার মাধ্যমে দীন-ইসলামের আসল রূপই পরিবর্তন ও বিকৃত হয়ে যায়। তাই এ ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখা একান্তই প্রয়োজন।
* হাদীসে হিকমত শব্দের ব্যবহার
হিকমত সম্পর্কে সহীহ হাদীস
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ ضَمْنِي النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى صَدْرِهِ وَقَالَ: اللَّهُمَّ عَلِّمُهُ الحِكْمَةَ.
ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: একদা নবী কারীম (সাঃ) আমাকে তার বুকে চেঁপে ধরে বললেন, হে আল্লাহ! একে হিকমাত দান করুন।
ইমাম বুখারী (রহ) বলেন (এখানে) হিকমাত অর্থ অহীর মাধ্যম ব্যতিত নির্ভুল জ্ঞান লাভ। (সহীহ বুখারী, অধ্যায়ঃ কিতাবুল মানাকিব, অনুচ্ছেদঃ মানাকিবে ইবনে আব্বাস (রাঃ))
عَنْ عَبْدِ اللهِ قَالَ : قَالَ رَسُولَ اللهِ (ص): لَا حَسَدَ إِلَّا فِي اثْنَتَيْنِ : رَجُلٍ آتَاهُ اللهُ مَالاً فَسُلِّطَ عَلَى هَلَكَتِهِ فِي الْحَقِّ، وَآخَرَآتَاهُ اللَّهُ حِكْمَةَ فَهُوَ يَقْضِي بِهَا وَ يُعَلِّمُهَا.
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, দুই ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারোর সাথে হিংসা বিদ্বেষ পোষণ করা বৈধ নয়। তাদের একজন হল এমন ব্যক্তি যাকে আল্লাহ তায়ালা অনেক ধনসম্পদ দান করেছেন এবং সৎ পথে সেগুলো ব্যয় করার মন মানুসিকতা দিয়েছেন। অপর ব্যক্তি হলো আল্লাহ তাআলা যাকে দীনী জ্ঞান তথা হিকমাত দান করেছেন। সে তার জ্ঞান অনুযায়ী মানুষের মাঝে ফায়সালা করে এবং মানুষকে তা শিক্ষাও দেয়। (সহীহ বুখারী)
হিকমাত সম্পর্কিত যইফ ও মুনকার হাদীস
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ (ص) الْكَلِمَةُ الحِكْمَةَ ضَالَةُ الْمُؤْمِنِ فَحَيْثُ وَجَدَهَا فَهُوَ أَحَقُّ بِهَا -
আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা মুমিনের ধন। সুতরাং সে যেখানেই তা পাবে, সেই হবে তার অধিকারী। (তিরমিযী-কিতাবুল ইলম, ইমাম তিরমিযী বলেন হাদীসটি গরী, হাদীসে সনদে ইবরাহীম ইবনুল ফাদল মাখযুমী দুরবল রাবী, আল্লামা আলবানী এটিকে খুবই যয়ীফ বলেছেন।)
(قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّমَ أَنَا دَارُ الْحِكْمَةِ وَعَلَى بَابُهَا )
রাসলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ আমি হলাম জ্ঞানের ঘর আর আলী সেই ঘরের দরজা। (তিরমিযী, আবওয়াবুল মানাকিব, ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে গরিব ও মুনকার বলেছেন, আলবানী এটিকে যঈফ বলেছেন)
• দ্বিতীয় মূলনীতি-সদুপদেশ
তাবলীগের কাজ আঞ্জাম দেয়ার ক্ষেত্রে হিকমাতের পাশাপাশি সদুপদেশও থাকবে। অর্থাৎ নরম ও সুন্দর ভাষায় কথা বলতে হবে যেন তা মানুষের মনের গভীরে রেখাপাত করে এবং তাদের অনুভূতিকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সদুপদেশের আরো চমৎকার ব্যাখ্যা বিভিন্ন তাফসীরকারগণ স্বীয় গ্রন্থ সমূহে তুলে ধরেছেন। যেমন-
ক) আল্লামা ইবনু কাসীর (রহঃ) বলেন, সদুপদেশ দ্বারা ঐ উপদেশকে বুঝানো হয়েছে যার মধ্যে ভয় ও ধমক থাকে, যাতে মানুষ উপদেশ গ্রহণ করে এবং আল্লাহর শাস্তি হতে বাঁচার উপায় অবলম্বন করে।
খ) উত্তম উপদেশ উহাই, যা দ্বারা উৎসাহ প্রদান, ভীতি প্রদর্শন এবং কঠিন অন্তরকে নরম করার উদ্দেশ্যে হয়।
গ) কামুসুল মুফরাদাতে রাগিবে বলা হয়েছে- সদুপদেশ হচ্ছে, শুভেচ্ছা মূলক কথা কার্যকর ভঙ্গিতে এমনভাবে উপস্থাপন করা যাতে প্রতিপক্ষের মন তা কবুল করার জন্য নরম হয়ে যায়, সন্দেহ দূর হয়ে যায় এবং অনুভব করে যে, এতে দা'ওয়াত দাতার কোন স্বার্থ নেই, শুধু শুভেচ্ছার খাতিরে বলেছেন।
ঘ) আল্লামা মওদূদী (রহঃ) বলেন, সদুপদেশের দুটি অর্থঃ (১) যাকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে তাকে শুধুমাত্র যুক্তি প্রমাণের সাহায্যে তৃপ্ত করে দিয়ে ক্ষ্যন্ত হলে চলবে না। বরং তার আবেগ অনুভূতির প্রতিও আবেদন রাখতে হবে এবং সে গুলোর প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি করতে হবে। (২) উপদেশ এমন ভাবে দিতে হবে যাতে আন্তরিকতা ও মঙ্গলাকাংখা সুস্পষ্ট হয়ে উঠে। এমনটি হবে না যে, উপদেশ দাতা তাকে তাচ্ছিল্য করছে এবং নিজের শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতির স্বাদ নিচ্ছে। বরং সে অনুভব করবে উপদেশ দাতার মনে তার সংশোধনের প্রবল আকাংখা রয়েছে এবং আসলে সে তার ভাল চায়।
• তৃতীয় মূলনীতি-উত্তম পন্থায় বিতর্ক
দা'ওয়াত ও তাবলীগের কাজে কোথাও হয়ত তর্ক বিতর্কের প্রয়োজন হবে। কেননা মানুষের মনে কম বেশি অহমিকা ও আত্মম্ভরিতা থাকাটাই স্বাভাবিক। যার ফলে সে অন্যের মতামতকে বিনা বাক্যে মেনে নিতে পারে না। তাছাড়া সকলের চিন্তা চেতনাও এক রকম নয়। সুতরাং যদি কারো সাথে তর্ক বিতর্ক করার প্রয়োজন হয়, তবে তা নরম ও উত্তম ভাষায় করা দরকার। রুহুল মা-আনীতে বলা হয়েছে, উত্তম পন্থায় বিতর্কের মানে এই যে, কথা বার্তায় নম্রতা ও কমনীয়তা অবলম্বন করতে হবে এবং এমন যুক্তি প্রমাণ পেশ করতে হবে, যা প্রতিপক্ষ বুঝতে সক্ষম হয়। তবে উত্তম হল তর্ক বির্তক এড়িয়ে চলা। উধাহরণ হিসেবে এখানে সূরা হাজ্জের আয়াত উল্লেখ করা যেতে পারে সেখানে আল্লাহ বলেছেন যে,
فَلَا يُنَازَعَنَّكَ فِي الْاَمْرِ وَا دُعَ إِلَى رَبِّكَ إِنَّكَ لَعَلَى هُدًى مُسْتَقِيمٍ .. وَإِنْ جَادَلَوكَ فَقُلِ اللَّهَ أَعْلَمَ بِمَا تَعْمَلُونَ.
'অতএব তারা যেন এ (শরীয়তের) ব্যাপারে তোমার সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত না হয়। তুমি তোমার পালন কর্তার দিকে দাওয়াত দাও। নিঃসন্দেহে তুমিই সঠিক পথে রয়েছ। তারা যদি তোমার সাথে ঝগড়া করে তবে বলে দাও, তোমরা যা কিছু করছ তা আল্লাহ খুব ভাল করেই জানেন।' (সূরা-হাজ্জ ৬৭-৬৮)
তবে এদিকে খেয়াল রাখা দরকার যে, তর্ক বিতর্ক করতে গিয়ে কখনো প্রতিপক্ষের লোকদেরকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে তাদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করা যাবে না। তারা যেন উপলব্ধি করতে পারে যে, এই তর্ক বিতর্কের উদ্দেশ্য কেবল প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করাই নয় বরং তাকে সন্তুষ্ট চিত্তে সত্য ও বাস্তবতাকে গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করা। মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনে আমাদেরকে এ বিষয়ে দিক নির্দেশনা দিয়ে বলেছেন:
وَلَا تُجَادِلُوا أَهْلَ الْكِتَابِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِلَّا الَّذِينَ ظَلَمُوْا مِنْهُمْ
"তোমরা আহলে কিতাবের সাথে তর্ক বিতর্ক করার সময় উত্তম পন্থা অবলম্বন করো, তবে তাদের সাথে নয় যারা জুলুম করে।" (সূরা: আনকাবুত-৪৬) অনুরূপভাবে মূসা (আঃ) ও হারুন (আঃ) কেও ফিরাউনের নিকট পাঠাবার সময় বলে দেওয়া হয়েছিল-
إِذْهَبَا إِلَى فِرْعَوْنَ إِنَّهُ طَغَى فَقُوْلَا لَهُ قَوْلًا لَّيْنَا لَعَلَّهَ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَى
"তোমরা তাকে নরম কথা বলবে তাহলে হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে।” (সূরা ত্বাহা-৪৩-৪৪)। আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, কে পথভ্রষ্ট আর কে সত্য পথের অনুসারী তিনি তা ভাল করেই জানেন। সুতরাং তুমি দাওয়াত পৌছাতে থাকো। কিন্তু যারা মানে না অযাথা তাদের পিছনে পড়ে থেকো না।
টিকাঃ
১. সূরা আনফাল-৭১, তওবা-১৫, ২৮, ৬০, ৯৭।
২. সূরা আনআম-১৮, ৭৩।
৩. সূরা বাকারা-১২৯, ২০৯, ২২০, ইমরান-৬, ১৮।
৪. সূরা ফুসসিলাত-৪২।
৫. সূরা আনআম-৮৩, ১২৮, ১৩৯।