📄 উম্মুল মু'মিনীন সফিয়্যা (রা)
খায়বার যুদ্ধ বিজয়ের পর সফিয়্যা (রা) বন্দী হয়ে আসলে এক সময় তাকে রাসূল জিজ্ঞেস করলেন, আমার ব্যাপারে তোমার কোন আগ্রহ আছে কি? তিনি উত্তরে বললেন, শিরকের মধ্যে নিমজ্জিত থাকার সময় আমি এই আশা পোষণ করতাম। সুতরাং ইসলাম গ্রহণের দ্বারা আল্লাহ আমাকে আপনার সাহচর্য লাভের যে সুযোগ দিয়েছেন, সে সুযোগ আমি কীভাবে হারাতে পারি?
নাম ও পরিচয়: তাঁর প্রকৃত নাম যয়নব। প্রসিদ্ধ নাম সফিয়্যা। আরবের প্রথা অনুযায়ী যুদ্ধলব্ধ মাল বণ্টনের সময় যে উৎকৃষ্ট বা উত্তম মাল দলপতির জন্য রাখা হতো তাকে সফিয়্যা বলা হতো। খায়বার যুদ্ধে প্রাপ্ত সকল কিছুর মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলেন যয়নব। শেষ পর্যন্ত এ যয়নবকে রাসূল এর ভাগে দেয়া হয়। এজন্য তাঁর নামকরণ করা হয় সফিয়া এবং এ নামেই তিনি প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল হুওয়াই ইবনে আখতাব। তিনি ছিলেন হারুন ইবনে ইমরান (আ.)-এর অধস্তন পুরুষ।
বংশ: তাঁর বংশ তালিকা হল- যয়নব বিনতে হুওয়াই ইবনে আখতাব ইবনে সাঈদ ইবনে আমের ইবনে ওবাইদ ইবনে কা'আব ইবনুল খাযরাজ ইবনে আবূ হাবীব ইবনে নুছাইর ইবনে নাহহাম ইবনে মাইখুম। তাঁর মায়ের নাম ছিল বাররা বিনতে সামওয়ান। এ সামওয়ান ইয়াহুদীদের সর্বশ্রেষ্ঠ গোত্র বনু কুরাইযার নেতা ছিলেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে সফিয়্যা (রা)-এর পিতৃকুল নযীর ও মাতৃকুল বনু কুরাইযার ইয়াহুদীদের এক বংশে গিয়ে মিলিত হয়েছে।
পারিবারিক অবস্থান: সফিয়্যা (রা)-এর আব্বা ও দাদা উভয়েই ছিলেন তৎকালীন ইয়াহুদী জাতির সম্মানিত ও মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ। যে কারণে বনী ইসরাঈলের সমস্ত আরবীয় গোত্রের মধ্যে তাদেরকে আলাদা রকম সম্মান করা হতো। বিশেষ করে তাঁর বাবা হুওয়াই ইবনে আখতাবকে মর্যাদার শীর্ষে স্থান দেওয়া হয়েছিল। ইয়াহুদীরা বিনা বাক্যে তাঁর নেতৃত্ব মেনে চলত। তাঁর নানা সামওয়ান মানমর্যাদা শৌর্য-বীর্য এবং বীরত্বের দিক দিয়ে সারা জাযিরাতুল আরবে ছিলেন সম্মানিত। অর্থাৎ সফিয়া (রা) ছিলেন সবদিক দিয়েই বিশিষ্টতার অধিকারিণী।
প্রথম বিবাহ: সফিয়্যা (রা)-এর প্রথম বিয়ে হয় আরবের প্রখ্যাত কবি ও সর্দার সালাম ইবনে মিশকাম আল কারাবীর সাথে। প্রথম দিকে তাদের দাম্পত্য জীবন সুখের হলেও পরবর্তীতে মনোমালিন্য ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। ফলে সফিয়্যা (রা) পিতৃগৃহে ফিরে আসেন।
দ্বিতীয় বিবাহ: এরপর কেনানা ইবনে আবুল আফীক-এর সাথে তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে হয়। আবুল আফীক ছিলেন খায়বারের নামকরা দুর্গ আল-কামুদ-এর সর্দার। এ সময় তাঁর বয়স ছিল সতের বছর।
পিতা ও চাচার মৃত্যু: তাঁর পিতা ও চাচা আবু ইয়াসির রাসূল এর চরম শত্রু ছিল। তারা মদীনা থেকে বিতাড়িত হয়ে চতুর্থ হিজরীতে খায়বারে গিয়ে কিনানা ইবনে আল রাবীর সাথে বসবাস করতে থাকেন। এখানে বসেই হুওয়াই ইবনে আখতাব মুসলমানদের ক্ষতি করার সর্বপ্রকার চেষ্টা করতে থাকে।
পরবর্তীতে রাসূল এর নেতৃত্বে খায়বার অভিযানকালে মুসলমানদের হাতে আলকামূস দুর্গের পতন ঘটে। যুদ্ধে ইয়াহুদীদের চূড়ান্ত পরাজয় ঘটে। বহু নেতৃস্থানীয় ইয়াহুদী মৃত্যুবরণ করে। কেনানা ইবনে আবুল আফীক দুর্গের অভ্যন্তরে নিহত হন। এমন কি তাঁর পিতা হুওয়াই ইবনে আখতাবও নিহত হন। সফিয়্যা অন্যান্য পরিবার-পরিজনদের সাথে বন্দী হন।
বন্দীনী সফিয়্যা: সফিয়্যা বন্দীনী হিসেবে মুসলিম শিবিরে আসার পর আরবের নিয়ম অনুযায়ী সাহাবী দাহইয়া কলবীর আবেদন মোতাবেক তাঁকে তাঁর ভাগে দিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু সফিয়্যা (রা) তাঁর মর্যাদার দিক বিবেচনা করে সাহাবী দাহইয়া কালবীর ঘরে যেতে অস্বীকার করেন। এ সময়ে কতিপয় সাহাবী আরজ করেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! সফিয়্যা বনু কুরাইযা এবং বনু নজীরের মহিলা। এ নেতৃস্থানীয়া মহিলাকে দাহইয়ার হস্তে বাঁদী হিসেবে সমর্পণ করলেন? তাঁর মর্যাদা তো অনেক উঁচুতে আসীন। তিনি আমাদের নেতার জন্যই যথোপযুক্ত।'
রাসূল সাহাবীদের আবেদন কবুল করলেন এবং দাহইয়া কালবীকে অন্য একজন পরিচারিকা দান করলেন। সফিয়্যাকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করে দিলেন।
রাসূলের নিকট আশ্রয় চাওয়া : সফিয়্যা কোথাও যেতে রাজি হলেন না। তিনি রাসূল এর কাছে বিনীত আরজ করলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! খায়বার যুদ্ধে আমার পিতা এবং স্বামী নিহত হয়েছেন। আমার নিকটতম আত্মীয়-স্বজনরাও যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে। আর আমি ইয়াহুদী ধর্ম ত্যাগ করে পবিত্র ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছি। বর্তমানে আমার ইয়াহূদী আত্মীয়-স্বজন যারা বেঁচে আছে তাদের কেউই আমাকে আশ্রয় দেবে না এবং গ্রহণও করবে না। এ আশ্রয়হীন অবস্থায় আমি কোথায় যাব? কে আমার এ অসহায় অবস্থার সহায়ক হবে? কে আমাকে স্থান দিবে? ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আর কোথাও যাবো না, আমি আপনার অন্তঃপুরে একজন দাসী হয়ে থাকতে চাই। আপনি আমাকে আশ্রয় প্রদান করুন।'
রাসূলের সাথে বিবাহের আকাঙ্ক্ষা : খায়বার যুদ্ধ বিজয়ের পর সফিয়্যা (রা) বন্দী হয়ে আসলে এক সময় তাকে রাসূল জিজ্ঞেস করলেন, আমার ব্যাপারে তোমার কোন আগ্রহ আছে কি? তিনি উত্তরে বললেন, শিরকের মধ্যে নিমজ্জিত থাকার সময় আমি এ আশা পোষণ করতাম। সুতরাং ইসলাম গ্রহণের দ্বারা আল্লাহ আমাকে আপনার সাহচর্য লাভের যে সুযোগ দিয়েছেন, সে সুযোগ আমি কীভাবে হারাতে পারি? অন্য বর্ণনায় এসেছে, সফিয়্যা (রা) যখন রাসূলের নিকট আসলেন, তখন তিনি বললেন, তোমার পিতা ইহুদী ছিলেন, যে আমার প্রতি শত্রুতা পোষণ করত। অবশেষে আল্লাহ তাকে নিহত করলেন। তখন সফিয়্যা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তাঁর কিতাবে বলেছেন-
وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى
অর্থ: 'একজনের (পাপের) বোঝা অন্যের ওপর চাপানো হবে না'। (আন'আম ১৬৪; ইসরা ১৫; ফাতির ১৮; যুমার ৭; নাজমা ৩৮)।
তখন রাসূল বললেন, তুমি যা পছন্দ কর, বেছে নেও। যদি তুমি ইসলামকে পছন্দ কর, তাহলে আমি তোমাকে আমার জন্য রেখে দিব। আর যদি তুমি ইহুদী ধর্ম মতকে পছন্দ কর, তাহলে আমি তোমাকে মুক্ত করে দেব, যাতে তুমি তোমার কওমের সাথে মিলিত হতে পার। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল!
আমি ইসলামকে ভালবেসেছি, আপনি আমাকে দাওয়াত দেয়ার পূর্বেই আমি আপনাকে সত্য বলে স্বীকার করেছি, এমনকি আমি আপনার সওয়ারীতে চড়েছি। ইহুদী ধর্মের প্রতি আমার কোন আকর্ষণ বা অনুরাগ নেই। আর সেখানে আমার পিতা, ভাই, কেউ নেই। আপনি কুফরী বা ইসলাম যে কোনটি গ্রহণের এখতিয়ার দিয়েছেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই আমার নিকট অধিক প্রিয় স্বাধীন হওয়ার চেয়ে এবং আমার কওমের নিকট ফিরে যাওয়ার চেয়ে। তখন তাকে রাসূলুল্লাহ নিজের জন্য রেখে দিলেন।
সফিয়্যাকে বিবাহের কারণ : বিভিন্ন কারণে রাসূলুল্লাহ সফিয়্যাকে বিবাহ করেন। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নিম্নরূপ-
১. আত্মীয়-স্বজন, জ্ঞাতি-গোষ্ঠী নিহত এবং নিজেও স্বীয় ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ হওয়ায় সফিয়্যা শোক বিহ্বল ছিলেন। তার শোকাহত হৃদয়কে শান্ত করা ও তাকে দ্বীন ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য রাসূলুল্লাহ বিবাহ করেন।
২. এ বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে ইসলাম ও মুসলমানদের সাথে বনু নাযীর ও বনু কুরায়জার বিরোধিতা ও শত্রুতা হ্রাসকরণ এবং প্রশমনের অভিপ্রায়ে রাসূলুল্লাহ সফিয়্যাকে বিবাহ করেন। যা পরবর্তীতে বাস্তবায়িত হয়েছিল।
৩. সফিয়্যার যথাযথ সম্মান বজায় রাখা এবং এ নজীরবিহীন ইহসানের প্রতি লক্ষ্য করে ইহুদী সম্প্রদায় যাতে আল্লাহদ্রোহিতা থেকে ফিরে এসে ইসলাম কবুল করতে অনুপ্রাণিত হয়, এজন্য রাসূলুল্লাহ সফিয়্যাকে বিবাহ করেন।
রাসূলের সাথে বিয়ে : সবদিক বিবেচনা করে রাসূল সফিয়্যা (রা)-এর আবেদন মঞ্জুর করলেন এবং খায়বার থেকে মদীনায় ফেরার পথে 'যাবাহা' নামক স্থানে তাকে বিবাহ করেন। এটা ছিল হিজরী সপ্তম সালের মহররম মাসের শেষ সপ্তাহ। এ বিয়েতে অলিমা অনুষ্ঠান অর্থাৎ খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এ ব্যাপারে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক স্যার সৈয়দ আমীর আলী লিখেছেন, 'ইয়াহুদী রমণী সফিয়্যাকে খায়বারের বিরুদ্ধে অভিযানের সময় মুসলমানরা বন্দী হিসেবে এনেছিলেন। তাকেও মুহাম্মদ উদারতার সঙ্গে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং তাঁর সনির্বন্ধ অনুরোধের জন্য তাঁকে স্ত্রীত্বে বরণ করেছিলেন।
এ বিয়ের ফলে আশ্রয়হীনা সফিয়্যা (রা) সুন্দর ও সর্বোত্তম আশ্রয় লাভ করেন। সাথে সাথে এ বিয়ের ফলে ইয়াহুদী সম্প্রদায়ের ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষোভের কিছুটা প্রশমন হয়। এমনকি ধীরে ধীরে ইয়াহুদীদের অনেকেই ইসলাম কবুল করেন।
সফিয়্যা (রা) সুন্দরী ও লাবণ্যময়ী ছিলেন। যে কারণে মদীনায় আসলে তাঁকে দেখার জন্য মহিলাদের ভীড় পড়ে যায়। এমনকি যয়নব বিনতে জাহাশ, হাফসা, আয়েশা এবং জুয়াইরিয়া (রা) তাঁকে দেখতে আসেন। দেখা শোনার পর সকলে যখন চলে যান তখন রাসূল আয়েশা (রা)-কে একা পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'আয়েশা, তাকে কেমন দেখলে? তিনি বললেন, সেতো ইয়াহুদী নারী। বললেন, এমন কথা বলবে না। সে তো মুসলমান হয়েছে। এখন ইসলামে সে উত্তম।'
স্বভাব-প্রকৃতি : সফিয়্যা (রা) ছিলেন ধীরস্থির মেজাজের চমৎকার একজন মহিলা। জনৈক দাসী অভিযোগ করলেন, তাঁর মধ্যে এখনও ইয়াহুদীদের গন্ধ পাওয়া যায়। কারণ সে এখনো শনিবারকে ভালবাসে। এছাড়া ইয়াহুদীদের সাথে এখনও তাঁর সম্পর্ক আছে। ওমর (রা) যখন অন্য লোকের মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করতে চান, তখন তিনি বলেন, 'শনিবারের পরিবর্তে আল্লাহ যখন শুক্রবার দিয়েছেন তখন আর শনিবারকে ভালোবাসার কোন প্রয়োজন নেই।' ইয়াহুদীদের সাথে সম্পর্কের ব্যাপারে বলেন, 'ইয়াহুদীদের সঙ্গে তো আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক। আত্মীয়তার প্রতি আমাকে লক্ষ্য রাখতে হয়।' অতঃপর দাসীকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন- কে তোমাকে এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেছে? সে বলল, শয়তান। এটা শুনে সফিয়্যা (রা) চুপ থাকেন এবং দাসীকে মুক্ত করে দেন।
আল্লামা ইবনে আবদুল বার সফিয়্যা (রা)-এর স্বভাব প্রকৃতি সম্বন্ধে লিখেছেন, 'সফিয়্যা ছিলেন বুদ্ধিমতী, মর্যাদাশীলা এবং ধৈর্যের অধিকারিণী।'
আল্লামা ইবনে কাসীর লিখেছেন, 'রাসূল -এর স্ত্রীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমতি।' রাসূল সফিয়্যাকে খুব ভালোবাসতেন এবং তাঁর সন্তুষ্টি অসন্তুষ্টির খোঁজ-খবর রাখতেন।
সফিয়্যা-যয়নব-আয়েশার সাময়িক দ্বন্দ্ব : একবার সফরকালীন সময়ে সফিয়্যার উটটি অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ সময়ে যয়নব (রা)-এর সাথে একটি অতিরিক্ত উট ছিল। রাসূল তাই যয়নবকে বললেন, যয়নব! তোমার
অতিরিক্ত উটটি সফিয়্যার সাহায্যের জন্য দাও। যয়নব বললেন, 'এ ইয়াহুদীর মেয়েকে আমি উট দিব না।' এ কথায় রাসূল খুবই রাগ করলেন এবং একাধারে দুই মাস যয়নবের (রা)-এর সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখেন। পরবর্তীতে আয়েশা (রা)-এর মধ্যস্থতায়-এর পরিসমাপ্তি ঘটে।
অন্য একদিন রাসূল গৃহে ফিরে দেখলেন সফিয়্যা কাঁদছেন। কারণ জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেন, 'আয়েশা এবং যয়নব বলেছেন, আমরা রাসূলুল্লাহর স্ত্রী এবং বংশ গৌরবের দিক থেকে এক রক্তধারার অধিকারিণী। সুতরাং আমরাই শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার। রাসূল বললেন, 'তুমি কেন বললে না, আমি আল্লাহ্ নবী হারুনের বংশধর ও মূসার ভ্রাতুষ্পুত্রী এবং রাসূল আমার স্বামী। অতএব তোমরা কোন দিক থেকে আমার অপেক্ষা শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী হতে পারো?'
উদারতা : দয়া দক্ষিণার ক্ষেত্রেও তাঁর উদার হাত ছিল। তিনি যখন প্রথম মদীনায় আসেন ও রাসূল এর অন্তপুরে প্রবেশ করেন তখন তাঁর সর্বাঙ্গে বহু মূল্যবান স্বর্ণালঙ্কার ছিল। তিনি সেসব অলঙ্কার নবী নন্দিনী ফাতিমা ও অন্যান্য উম্মাহাতুল মু'মিনীনদের মধ্যে ভাগ-বণ্টন করে দেন।
ওসমান (রা) ৩৫ হিজরীতে বিদ্রোহীদের দ্বারা অবরুদ্ধ হন। বিদ্রোহীরা প্রয়োজনীয় রসদপত্র এমন কি পানি সরবরাহ পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়। এমতাবস্থায় সফিয়্যা (রা) ঘর থেকে বের হয়ে পড়েন এবং কিছু রসদপত্রসহ ওসমান (রা)-এর গৃহের উদ্দেশ্যে খচ্চরে চেপে বসেন। কিন্তু পথিমধ্যে বিদ্রোহীরা তাঁর খচ্চরটিকে আক্রমণ করে বসলে তিনি বলেন তোমরা আমাকে এভাবে অপমান করো না। আমি যাচ্ছি।' এরপর তিনি গৃহে ফিরে আসেন এবং হাসান (রা)-কে দিয়ে দ্রব্য সামগ্রী পৌঁছে দেন। পরে যে ক'দিন ওসমান (রা) অবরুদ্ধ ছিলেন হাসান (রা)-কে দিয়েই প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র পাঠিয়ে দিতেন।
এখান থেকে পরিষ্কার হয় সফিয়্যা (রা) কত বড় দায়িত্ববোধ সম্পন্ন মহিলা ছিলেন। তিনি অসম্ভব সুন্দর রান্না করতে জানতেন। এমন কি এ ক্ষেত্রে আয়েশাও (রা) তাঁর সমকক্ষ ছিলেন না।
সফিয়্যা (রা) লেখাপড়া জানা মহিলা ছিলেন। তিনি প্রায়ই তাঁর ইয়াহুদী আত্মীয়-স্বজনের কাছে ইসলামের সুমহান আদর্শ তুলে ধরে চিঠি লিখতেন। আর এ দাওয়াতী কাজের ফলে অনেকেই ইসলাম কবুল করেন।
তিনি ইসলামী জ্ঞানের ক্ষেত্রে একজন অসাধারণ মানুষ ছিলেন। এ জন্য অনেকে তাঁর কাছ থেকে মাসয়ালা-মাসায়েল জানতে চাইতেন ও জেনে নিতেন। ছহীরা বিনতে হায়দার হজ্জব্রত পালন করার পর সফিয়্যা (রা)-এর সাথে দেখা করতে এসে দেখেন যে, কুফার একদল মহিলা মাসআলা জিজ্ঞেস করার জন্য তাঁর কাছে উপস্থিত হয়েছেন আর তিনি সুন্দরভাবে সকলের জিজ্ঞাসার জবাব দিচ্ছেন।
তিনি মাত্র কয়েকটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। যয়নুল আবেদীন ইসহাক ইবনে আবদুল্লাহ, মুসলিম ইবনে সাফওয়ান, কিনানা এবং ইয়াযিদ ইবনে মাআতাব প্রমুখগণ তাঁর নিকট থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।
ওফাত: ৬০ বছর বয়সে হিজরী ৫০ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁকে জান্নাতুল বাকীতে সমাহিত করা হয়। তাঁর অসিয়ত অনুযায়ী মৃত্যুকালে রেখে যাওয়া সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ তার ভাগিনাকে দেয়া হয়। বাকি সম্পত্তি গরীব মিসকীনদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। জানা যায় মৃত্যুকালে তিনি নগদ এক লক্ষ দিরহাম রেখে যান।
📄 উম্মুল মু'মিনীন মায়মূনা (রা)
রাসূল ও মায়মুনার এই বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আব্বাস ও খালিদ বিন ওয়ালিদ ইসলাম কবুল করেননি। মূলত এই বিয়ের ফলেই এ দু'জন বিশাল ব্যক্তিত্ব ইসলাম কবুল করেন এবং ইসলামের শক্তি বৃদ্ধি করেন। আসলে এই বিয়ের প্রভাব ছিল সুদূর প্রসারী।
নাম ও পরিচয়: পূর্বে তাঁর নাম ছিল বাররা। উম্মাহাতুল মু'মিনীনদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর নাম রাখা হয় মায়মূনা। তাঁর পিতার নাম হারেস এবং মাতার নাম হিন্দ বিনতে আউফ।
বংশনামা: তাঁর বংশ তালিকা হল, বাররা বিনতে হারেস ইবনে হাজন ইবনে বুযাইর ইবনে হাযাম ইবনে রোতবা ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে হেলাল ইবনে আমের ইবনে সা'আসা'আ ইবনে মু'আবিয়া ইবনে বকর ইবনে হাওয়াযেন ইবনে মনসুর ইবনে ইকরামা ইবনে খলিফা ইবনে কায়েস ইবনে আয়লান ইবনে মুদার। আর তাঁর মায়ের দিক দিয়ে বংশ তালিকা হল, বাররা বিনতে হিন্দ বিনতে আউফ ইবনে যাহাইর ইবনে হারেস ইবনে হামাতা ইবনে জারাশ।
মায়মূনা ছিলেন কুরাইশ বংশের হাওয়াযিন গোত্রের হারেসের কন্যা; যিনি সা'আসা'আ নামক এলাকায় বসবাস করতেন। অপরদিকে তিনি ছিলেন রাসূল -এর চাচা আব্বাস (রা)-এর শালিকা এবং বিশ্বখ্যাত সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদের খালা। অন্যদিকে তিনি উম্মুল ফযল লুবাবাতুস সুগরার বোন ছিলেন।
প্রথম বিবাহ: মাসউদ বিন আমর বিন উমায়ের সাকাফীর সঙ্গে তাঁর প্রথম বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু দাম্পত্য জীবনে বনিবনা না হওয়াতে মাসউদ মায়মূনাকে তালাক দেন।
দ্বিতীয় বিবাহ: পরে আবূ রহম ইবনে আবদুল্লাহর সাথে তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে হয়। এ আবূ রহম সপ্তম হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। ফলে মায়মুনা সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করতে থাকেন। এমতাবস্থায় তাঁর দুলাভাই আব্বাস (রা) উদ্যোগী হয়ে রাসূল এর নিকট বিয়ের প্রস্তাব পেশ করেন। ইসলামের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে রাসূল ৫১ বছর বয়স্কা বৃদ্ধা মায়মুনাকে বিয়ে করতে রাজি হন।
রাসূল এর সাথে বিবাহ: সপ্তম হিজরী সালের জিলক্বদ মাসে হুদায়বিয়ার সন্ধি অনুসারে রাসূল ওমরাতুল কাজা পালন করার উদ্দেশ্যে মক্কা রওয়ানা হন। এ সময় জাফর ইবনে আবূ তালিবকে মায়মুনার কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে পাঠানো হয়। তিনি আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবকে উকিল নিযুক্ত করেন। রাসূল ওমরার উদ্দেশ্যে যে ইহরাম বাধেন, সেই অবস্থায় এ বিয়ে সম্পন্ন হয়। আব্বাস (রা) এ বিয়ে পড়ান। ওমরা পালন শেষে মদীনা ফেরার পথে 'সরফ' নামক স্থানে এ বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। এ বিয়ের মোহরানা ধার্য করা হয় ৫০০ দিরহাম। কেউ কেউ বলেন মায়মুনা ছিলেন রাসূল এর সর্বশেষ স্ত্রী। তাদের মতে রায়হানা ও মারিয়া কিবতিয়া দাসী ছিলেন স্ত্রী নয়। তবে ঘটনাচক্রে মনে হয় তারাও স্ত্রী ছিলেন। তারা রাসূলস্ত্রী ছিলেন এটাই অধিক যুক্তিযুক্ত। এখানে তাদেরকে স্ত্রী হিসেবেই গ্রহণ করা হল।
বিয়ের ফলাফল: রাসূল ও মায়মুনার এ বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আব্বাস ও খালিদ বিন ওয়ালিদ ইসলাম কবুল করেননি। মূলত এ বিয়ের ফলেই এ দু'জন বিশাল ব্যক্তিত্ব ইসলাম কবুল করেন এবং ইসলামের শক্তি বৃদ্ধি করেন। আসলে এ বিয়ের প্রভাব ছিল সুদূর প্রসারী। এ প্রসঙ্গে স্যার সৈয়দ আমীর আলী বলেন, 'মায়মুনাকে মুহাম্মদ মক্কায় বিয়ে করেছিলেন। তিনি ছিলেন তাঁর আত্মীয় ও পঞ্চাশের ঊর্ধ্বে ছিল তাঁর বয়স। এ বিয়ে আত্মীয়তার অবলম্বন হিসেবেই শুধু কাজ করেনি; অধিকন্তু এ ইসলামের জন্য লাভ করেছিল দু'জন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব ইবনে আব্বাস এবং ওহুদের দুর্ভাগ্যজনক যুদ্ধে কুরাইশের অশ্বারোহী দলের সেনাপতি ও পরবর্তীকালে গ্রীক বিজেতা খালিদ বিন ওয়ালিদ।'
অনেকের ধারণা রাসূল মায়মুনাকে বিয়ে না করলে খালিদ বিন ওয়ালিদ কোনোদিন হয়তো ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করতেন না। সুতরাং একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, এ বিয়ে ইসলামের ও মুসলমানদের জন্য কল্যাণ বয়ে এনেছিল।
চরিত্র মাহাত্ম্য: মায়মূনা অত্যন্ত পরহেযগার একজন মহিলা ছিলেন। তিনি আল্লাহ্র ভয়ে সর্বদা কম্পিত থাকতেন এবং কান্নাকাটি করতেন। তিনি ছোটখাট আদেশ নিষেধকে সমান গুরুত্ব দিতেন। একবার এক মহিলা অসুস্থ অবস্থায় মানত করল যে, 'সুস্থ হলে বায়তুল মুকাদ্দাস গিয়ে সালাত পড়বে। আল্লাহ তা'আলা তাকে রোগ মুক্ত করলে মানত পুরা করার উদ্দেশ্যে বায়তুল মুকাদ্দাস গমনের জন্য মায়মুনার নিকট বিদায় নিতে আসে। মায়মুনা (রা) তাকে বুঝিয়ে বলেন যে, 'অন্যান্য মসজিদে সালাত আদায়ের চেয়ে মসজিদে নববীতে সালাত আদায়ের সওয়াব হাজার গুণ বেশি। তুমি এখানে থেকেই মসজিদে নববীতে সালাত আদায় কর।'
তাঁর সম্পর্কে আয়েশা (রা) বলেন, 'মায়মূনা ছিলেন আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহকে ভয়কারিণী এবং আত্মীয়তার সম্পর্কের প্রতি সবচেয়ে বেশি যত্নবান মহিলা।'
একবার তাঁর এক আত্মীয় বেড়াতে আসেন। কিন্তু তার মুখ দিয়ে মদের গন্ধ আসছিল। তাই মায়মুনা (রা) ক্ষেপে গিয়ে বললেন, 'ভবিষ্যতে আর কখনো আমার কাছে আসবে না।'
হাদীস শিক্ষা ও সম্প্রসারণে তাঁর অবদান মায়মূনা (রা) রাসূল -এর ইন্তেকালের পরও দীর্ঘদিন জীবিত ছিলেন। মহানবী -এর অনেক হাদীসই উন্মুল মু'মিনীনদের মাধ্যমে পরবর্তীদের কাছে সম্প্রসারিত হয়েছে। মায়মুনা (রা)-এর অবদান এ ক্ষেত্রে মোটেই নগণ্য নয়। রাসূলুল্লাহ হতে তিনি হাদীস শিক্ষা লাভ করেছেন এবং তা বর্ণনাও করেছেন। ইবনুজ জাওযী (র) বলেন: মায়মুনা (রা) থেকে ৭৬টি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্যে সহীহাইন তথা সহীহ বুখারী ও মুসলিমে ১৩টি হাদীস সংকলিত হয়েছে। ইমাম বুখারী ও মুসলিম যৌথভাবে ৭টি, ইমাম বুখারী এককভাবে ১টি এবং ইমাম মুসলিম (র) এককভাবে ৫টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। আমাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী তাঁর থেকে বর্ণিত হাদীস পুনরুক্তিসহ বুখারীতে ২১টি, মুসলিমে ১৮টি, তিরমিযীতে ৪টি, আবু দাউদে ১৫টি, নাসাঈতে ২৬টি এবং ইবনে মাজায় ১১টি সংকলিত হয়েছে। তাঁর থেকে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আবদুল্লাহ ইবনে শাদ্দাদ, আবদুর রহমান ইবনে সায়েব, ইয়াযিদ ইবনে আছম প্রমুখ সাহাবীগণ হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাঁর থেকে বর্ণিত হাদীসগুলো দ্বীন ও দুনিয়ার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্বলিত।
নি্নে তাঁর থেকে বর্ণিত কিছু হাদীস উল্লেখ করা হলো -
١. عَنْ مَيْمُونَةَ (رض) أَنَّ النَّبِيِّ ﷺ أَكَلَ عِنْدَنَا كَتِفًا ثُمَّ صَلَّى وَ لَمْ يَتَوَضَّا .
১. মায়মূনা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী তাঁর নিকট (একদা) বকরীর কাঁধের মাংশ খেলেন, অত:পর সালাত পড়লেন, কিন্তু অযু করলেন না।
٢. عَنْ مَيْمُونَةَ (رض) أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ سُئِلَ عَنْ فَارَةٍ سَقَطَتْ فِي سَمَنٍ ؟ فَقَالَ الْقُوهَا وَمَا حَوْلَهَا وَكُلُوا سَمَنَكُمْ .
২. মায়মূনা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল ঘি বা মাখনে ইঁদুর পতিত হওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হয়ে বললেন, ইঁদুর ও তার পার্শ্ববর্তী ঘিটুকু ফেলে দিয়ে তোমরা তোমাদের ঘি খেতে পার।
٣. عَنْ مَيْمُونَةَ (رض) قَالَتْ : كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَنْضَجِعُ مَعِي وَأَنَا حَائِضِ وَبَيْنِي وَبَيِّنَهُ ثَوْبٌ .
৩. মায়ামূনা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ আমার ঋতুস্রাব অবস্থায় আমার সাথে শয়ন করতেন। তাঁর ও আমার মাঝে কাপড়ের ব্যবধান থাকতো।
٤. عَنْ مَيْمُونَةَ (رض) قَالَتْ : أَدْنَيْتُ لِرَسُولِ اللَّهِ ﷺ غُسْلَهُ مِنَ الْجَنَابَةِ، فَغَسَلَ كَفَّيْهِ مَرَّتَيْنِ أَوْ ثَلَاثًا ، ثُمَّ أَدْخَلَ فِي الْإِنَاءِ ثُمَّ أَفْرَغَ بِهِ عَلَى فَرْجِهِ وَغَسَلَهُ بِشِمَالِهِ، ثُمَّ ضَرَبَ بِشِمَالِهِ الْأَرْضِ فَدَلَكَهَا دَلَكًا ، ثُمَّ تَوَضَّا وُضُوءَهُ لِلصَّلوة، ثُمَّ افرَغَ عَلَى رَأْسِهِ ثَلَاثَ حَفَنَاتِ مِلًا كَفَّيْهِ، ثُمَّ غَسَلَ سَائِرَ جَسَدِهِ، ثُمَّ تَنَحَى عَنْ مَقَامِهِ ذَلَكَ فَغَسَلَ رِجْلَيْهِ، ثُمَّ أَتَيْتُهُ بِالْمِنْدِيلِ فَرَدَّه .
৪. মায়মুনা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ এর জানাবতের গোসল নিকট থেকে লক্ষ্য করেছি। তিনি প্রথমে দু'হাতের কব্জি দু'তিনবার ধৌত করেন। অত:পর হাত পাত্রে দিয়ে লজ্জাস্থানে পানি দেন এবং বাম হাত দিয়ে তা ভালভাবে পরিষ্কার করেন। অত:পর সালাতের ন্যায় অযূ করেন। এরপর তিন কোষ পানি মাথায় দিলেন, অতঃপর সমস্ত শরীর ধৌত করলেন। এরপর ঐ স্থান থেকে সরে এসে পা ধৌত করেন। অতঃপর আমি রুমাল নিয়ে আসি তবে তিনি তা গ্রহণ করেননি।
٥. عَنْ مَيْمُونَةَ (رض) قَالَتْ : كَانَ النَّبِيُّ ﷺ إِذَا سَجَدَ لَوْ شَاءَتْ بَهِيمَةٌ أَنْ تَمُرَّ بَيْنَ يَدَيْهِ لَمَرَّتْ .
৫. মায়মুনা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী যখন সিজদা দিতেন, কোন বকরীর বাচ্চা তাঁর দু'হাতের পাশ দিয়ে অতিক্রম করতে চাইলে করতে পারতো।
٦. عَنْ مَيْمُونَةَ بِنْتِ الْحَارِثِ (رض) أَنَّهَا أَعْتَقَتْ وَلِيْدَةً فِي زَمَانِ رَسُولِ اللهِ ﷺ ، فَذَكَرَ ذَلِكَ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ : لَوْ أَعْطَيْتِهَا إِخْوَالَكِ كَانَ أَعْظَمُ لِأَجْرِكِ .
৬. মায়মূনা বিনত আল-হারিস (রা) রাসূলের যামানায় একজন ক্রীতদাসীকে আযাদ করে মুক্ত করে দেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ এর নিকট এ কথা বর্ণনা করলে তিনি বললেন, তুমি যদি ঐ অর্থ তোমার ভাই ইবনুল হারিসকে দিতে তবে অধিক সাওয়াব পেতে।
٧. عَنْ مَيْمُونَةَ (رض) قَالَتْ : أَهْدِي لِمَوْلَاةٍ لَنَا شَاةٌ مِّنَ الصَّدَقَةِ، فَمَاتَ، فَمَرَّ بِهَا النَّبِيُّ ﷺ قَالَ : أَلَا بَعْتُمْ إِهَابَهَا أَيْ جُلُودَهَا ، فَاسْتَمْتَعْتُمْ بِهِ ؟ فَقَالُوا : يَا رَسُولَ اللَّهِ ﷺ إِنَّهَا مَيْتَةٌ قَالَ : إِنَّمَا حَرَامٌ أَكْلَهَا .
৭. মায়মূনা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমাদের জনৈক দাসীকে একটি বকরী উপহার দেয়া হলো। বকরীটি মরে গেল। রাসূল মরা বকরীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, বললেন: তোমরা কি এর চামড়া পরিশোধন (দাবাগত) করে তা ব্যবহার করবে না? তাঁরা বললেন, হে রাসূল এটা তো মৃত। নবী বললেন, এর গোশত খাওয়া হারাম, চামড়া ব্যবহার করা নয়।
তাঁর বর্ণিত অনেক হাদীস থেকে তাঁর ফিকহী সূক্ষ্মতার পরিচয় মেলে। উদাহরণস্বরূপ একটি হাদীস উল্লেখ করা হলো: একবার ইবনে আব্বাস (রা) মলিন মুখে বসে আছেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "বৎস! তোমার কি হয়েছে? বললেন, উম্মু আম্মার (তাঁর স্ত্রী) আমার চুলে চিরুনী করে দিত, অথচ সে আজ-কাল মাসিক স্রাবে ভুগছে। তিনি বললেন, কী চমৎকার! আমার ঐ রকম দিনে নবী আমার কোলে মাথা মুবারক রেখে শুইতেন, কুরআন শরীফ পড়তেন, আমি ঐ অবস্থায় মসজিদে বিছানা (চাটাই) রেখে আসতাম। বৎস! হাতেও কি এসব হয় কখনও?
ওফাত: রাসূল এর পদাঙ্ক অনুসরণে সতত তৎপর, পরোপকারী, দানশীলা, গোলাম আযাদকারিণী মায়মুনা (রা) হিজরী ৬১ সালে 'সরফ' নামক স্থানে ইন্তেকাল করেন। উল্লেখ্য যে, এ 'সরফে' তাঁর বিয়ে হয়েছিল। এটা তাঁর জীবন ইতিহাসের এক স্মরণীয় ঘটনা। ওফাতের সময় তিনি আয়েশা ও উম্মু সালামা (রা)-কে ডেকে এনে বলেন, সাধারণত সতীনদের মধ্যে যা হয়ে থাকে মাঝে মধ্যে আমাদের মধ্যেও সে রকম হয়ত হয়ে যেত, আমি এ ব্যাপারে লজ্জিত। আপনারা আমাকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আয়েশা (রা) বলেন, আমি তাকে ক্ষমা করে তার জন্য মাগফিরাতের দোয়া করি। এতে তিনি সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, তুমি আমাকে খুশী করেছ আল্লাহ তোমায় খুশী করুন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস তাঁর জানাযার সালাত পড়েছিলেন এবং তিনি লাশ কবরে নামিয়েছিলেন। লাশ বহনের সময় আবদুল্লাহ বলেছিলেন, 'সাবধান! এ উম্মুল মু'মিনীনের লাশ। বেয়াদবী করো না, এমন কি তোমরা নড়াচড়াও করো না। খুব যত্ন সহকারে বহন করবে।'
📄 উম্মুল মু'মিনীন রায়হানা (রা)
তুমি আল্লাহ এবং রাসূলকে গ্রহণ করলে আমি তোমাকে আমার জন্য উপযুক্ত মনে করি। 'রায়হানা বিনতে শামউন রাসূল-এর এই প্রস্তাব আনন্দে গ্রহণ করেন।
নাম ও পরিচয়: তাঁর নাম রায়হানা। পিতার নাম শামউন। তিনি ছিলেন সুপ্রসিদ্ধ ইয়াহুদী বনু নাযীর গোত্রের মেয়ে। বংশ তালিকা হল- রায়হানা বিনতে শামউন ইবনে যায়েদ, অন্য মতে রায়হানা বিনতে যায়েদ ইবনে আমর ইবনে খানাফা ইবনে শামউন ইবনে যায়েদ।
প্রথম বিবাহ: তাঁর প্রথম বিয়ে হয় বনু কুরাইজা গোত্রের হাকামের সাথে। কিছুদিন পর হাকামের মৃত্যু হয়। ৬ষ্ঠ হিজরী সালে যখন মুসলমানরা বনু নাযীর ও বনু কুরায়জা গোত্রের সব কিছু দখল করে নেয় তখন রায়হানাকে যুদ্ধ বন্দী হিসেবে নিয়ে আসা হয়। এরপর কিছুদিন তাকে কায়েসের কন্যা উম্মু মুনফিরের কাছে রাখা হয়।
বিয়ে করতে রাসূল-এর ইচ্ছা প্রকাশ রাসূল বিদ্রোহী ইয়াহুদী গোত্রগুলোর সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনের জন্য সমগ্র আরবে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য রায়হানাকে আশ্রয় দিতে ও বিয়ে করতে মনস্থ করেন এবং তাঁকে বলেন, 'তুমি আল্লাহ এবং রাসূলকে গ্রহণ করলে আমি তোমাকে আমার জন্য উপযুক্ত মনে করি। 'রায়হানা বিনতে শামউন রাসূল এর এ প্রস্তাব আনন্দে গ্রহণ করেন। রায়হানা (রা) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে ছিলেন কুরায়জা গোত্রের আল-হাকাম এর স্ত্রী, মুসলমানদের সাথে কুরায়জা গোত্রের সন্ধি চুক্তি ছিল। কিন্তু আহযাব যুদ্ধে কুরায়জা গোত্রে বিশ্বাসঘাতকতা করে মুশরিক কুরাইশদের পক্ষ গ্রহণ করে। ফলে আল্লাহর নির্দেশে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়। দীর্ঘ দিন তাদেরকে অবরোধ করে রাখলে অনন্যোপায় হয়ে তারা আত্মসমর্পণ করে।
অত:পর তাদের পুরুষদেরকে হত্যা করা হয় এবং মহিলা ও শিশুদেরকে বন্দী করা হয়। এ সূত্রে রায়হানা-এর স্বামী আল হাকাম নিহত হয় এবং তিনি বন্দিনী হন। প্রথমত তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দিলে তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন এবং স্বীয় ইয়াহুদী ধর্মে বহাল থাকতে পছন্দ করেন। অতঃপর তাঁকে পৃথক করে উম্মুল মুনযির বিন্ত কায়েস-এর গৃহে রাখা হয়। কিছু দিন পর স্বত:প্রণোদিত হয়ে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।
রায়হানা (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ রাসূলুল্লাহ -এর সাথে তাঁর বিবাহ হওয়ার বর্ণনা নিজেই প্রদান করেয়াছেন, যা ইবন সা'দ স্বীয় গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন। রায়হানা (রা) বলেন, বন্দীদেরকে হত্যার পর রাসূলুল্লাহ আমার নিকট আগমন করেন, অতঃপর আমাকে কাছে বসিয়ে বললেন, তুমি যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে গ্রহণ কর তা হলে রাসূলুল্লাহ নিজের জন্য তোমাকে গ্রহণ করবেন। আমি বললাম, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে গ্রহণ করলাম। আমি ইসলাম গ্রহণ করার পর রাসূলুল্লাহ আমাকে আলাদা করে দেন এবং আমার তাঁর অন্যান্য পত্নীদিগের ন্যায় একটি গৃহেই আমাদের বাসর হয়। তিনি অন্যান্য স্ত্রীর ন্যায় সমভাবে পালা বণ্টন অনুযায়ী আমার গৃহে আগমন করতেন এবং আমার ওপর পর্দার হুকুম আরোপ করেন।
অপর এক বর্ণনা মতে, প্রথমত তাকে ইসলামের দাওয়াত দিলে তিনি অস্বীকার করেন। এতে রাসূলুল্লাহ মনোক্ষুণ্ণ হন। অতঃপর তিনি একদিন সাহাবীদের নিয়ে তিনি বসলেন। তখন পিছন হতে জুতার আওয়াজ শুনে তিনি বললেন, ছালাবা ইবনে শুভা রায়হানা ইসলাম গ্রহণের সুসংবাদ নিয়ে এসেছিল। অতঃপর ঠিকই তিনি এসে রাসূলুল্লাহ-কে রায়হানার ইসলাম গ্রহণের সুসংবাদ দিল।
অপর বর্ণনা মতে, অতঃপর রাসূল-তাকে স্বাধীন করে দেন। অতঃপর তাকে বিবাহ প্রস্তাব দেন এবং হিজাব (পর্দা) মান্য করার কথা বলে। রায়হান তাঁর উত্তরে বলেন, হে রাসূল! বরং আমাকে দাসী হিসেবে আপনার মালিকানা রাখুন। উহাই আপনার জন্য এবং আমার জন্য সহজতর হবে। তখন রাসূল তাকে দাসী হিসেবে রাখার ইচ্ছা পোষণ করেন। তবে যুক্তির কষ্টিপাথরে এ মতটি জোরালো বলে মনে হয় না। কারণ সম্ভ্রান্ত ও স্বাধীন এ মহিলাকে যিনি দৈবক্রমে বন্দী ও দাসী হয়ে গিয়েছেন, আযাদ হওয়ার স্বাধীনতা প্রদান করলে তিনি যে উক্ত কাঙ্খিত প্রস্তাব প্রত্যাখান করে বন্দীদশাকেই স্বেচ্ছায় গ্রহণ করবেন, ইহা এক রকম অসম্ভব।
রায়হানা ছিলেন অপরূপ সুন্দরী এবং অত্যন্ত অমায়িক ব্যবহার ও পূত-পবিত্র চরিত্রের অধিকারিণী। রাসূল তার প্রতি খুবই সন্তুষ্ট ছিলেন। তিনি যা চাইতেন রাসূল তাঁকে তা প্রদান করতেন। ফলে রাসূল তাঁকে মুক্ত করে ৪০০ দিরহাম মোহরানা প্রদান করে বিয়ে করেন।
ওফাত: ইবনে সা'আদের বর্ণনা মতে হিজরী ৬ষ্ঠ সালের মুহররম মাসে এ বিয়ে সম্পন্ন হয়। এ বিয়ের ফলে ইয়াহুদী গোত্রগুলোর সাথে মুসলমানদের সম্পর্কের চমৎকার উন্নতি হয়। উভয়ের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুসম্পর্কও প্রতিষ্ঠিত হয়।
ঐতিহাসিক ইবনে ইসহাকের মতে, রাসূল এর ইন্তেকালের দশ মাস পূর্বে রায়হানা (রা) ইন্তেকাল করেন।
📄 উম্মুল মু'মিনীন মারিয়া কিবতিয়া (রা)
চক্ষু অশ্রুভারাক্রান্ত, অন্তর ব্যথিত, কিন্তু মুখে এমন কথা বলতে পারি না যা আল্লাহ তায়ালা অপছন্দ করেন। হে ইবরাহীম! আমরা তোমার বিচ্ছেদে শোকাভিভূত। আল্লাহর নির্দেশমত আমরা إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ পড়ছি।
হুদায়বিয়ার সন্ধি সংঘটিত হওয়ার পর রাসূল পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোতে রাষ্ট্রপ্রধানদের নিকট দূত মারফত ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত সম্বলিত চিঠি প্রেরণ করেন। এ চিঠির প্রেক্ষিতে মিসরের খ্রিস্টান শাসক মুকাওকিস সৌহার্দ্র ও শুভেচ্ছার নির্দশনস্বরূপ আপন চাচাত বোন মরিয়ম বা মারিয়া কিবতিয়াকে রাষ্ট্রীয় পর্যাপ্ত উপঢৌকনসহ তৎকালীন প্রথানুসারে মুসলিম রাষ্ট্র প্রধান রাসূল-এর দরবারে উপহারস্বরূপ প্রেরণ করেন।
অপর এক বর্ণনামতে উপঢৌকনস্বরূপ প্রেরিত মহিলার সংখ্যা ছিল চারজন। ইবনে কাছীরের বর্ণনামতে সম্ভবত অপর দুই মহিলা এ ভগ্নীদ্বয়ের খাদিমা (দাসী)-স্বরূপ ছিলেন। এ উপঢৌকনের সাথে মাবুর নামক একজন খোজা দাস (তিনি ছিলেন মারিয়ার ভ্রাতা) এবং দুলদুল নামক সাদা রংয়ের একটি খচ্চরও প্রেরিত হয়েছিল। আরও ছিল এক হাজার মিছকালে স্বর্ণ ও (বিশটি) রেশমী কাপড়, এগুলো প্রেরণ করা হয় রাসূল-এর দূত হাতিব ইবনে আবী বালতা'আর মাধ্যমে। হাতিব (রা) তাঁদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করলে মারিয়া ভগ্নীদ্বয় ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মাবুর পরে মদীনায় রাসূল এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন।
রাসূল আন্তর্জাতিক রাজনীতির দিকে লক্ষ্য রেখে এ উপহার ও উপঢৌকন গ্রহণ করেন। এ সকল উপঢৌকন পাওয়ার পর সর্বপ্রথম রাসূল মারিয়ার নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন। মারিয়া আনন্দের সাথে এ দাওয়াত কবুল করেন ও ইসলাম গ্রহণ করেন। এরপর মারিয়ার সম্মতিতে সম্পূর্ণ ইসলামী বিধান মোতাবেক রাসূল তাঁকে বিয়ে করেন। এভাবে মিসরের রাষ্ট্র প্রধান মুকাওকিসের উপহারের সঠিক মূল্যায়ন করেন।
অন্য বর্ণনা মতে, রাসূল মারিয়াকে নিজের দাসী হিসেবে রাখেন এবং সীরীনকে হাসসান ইবনে ছাবিত (রা)-কে প্রদান করেন। তাঁর গর্ভে 'আবদু'র রাহমান ইবন হাসসান জন্মগ্রহণ করেন।
সপ্তম হিজরী সালের শেষের দিকে এ বিয়ে সংঘটিত হয়। এরপর রাসূল আর কোন বিয়ে করেননি। আর আল্লাহ্র পক্ষ থেকেও রাসূল-এর জন্য নতুন কোনো বিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে আয়াত নাযিল হয়। আল্লাহ বলেন- لَا يَحِلُّ لَكَ النِّسَاءُ مِنْ بَعْدُ وَلَا أَنْ تَبَدَّلَ بِهِنَّ مِنْ أَزْوَاجِ وَلَوْ أَعْجَبَكَ حُسْنُهُنَّ
অর্থ : 'এরপর আর কোনো নারী আপনার জন্য হালাল নয় এবং তাদের পরিবর্তে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করাও হালাল নয়। যদিও তাদের সৌন্দর্য আপনাকে আকর্ষিত করে।' (সূরা-৩৩ আহযাব : আয়াত-৫২)
অন্য বর্ণনা মতে, মারিয়া হলেন রাসূল এর বান্দী ও তাঁর পিতা হলেন শামউন। সমস্ত বান্দীদের মধ্যে রাসূল তাঁকেই পর্দা করার নির্দেশ প্রদান করেন।
মারিয়া কিবতিয়ার গর্ভে জন্মগ্রহণ করে রাসূল এর অন্যতম পুত্র সন্তান ইব্রাহীম। আওয়ালী নামক স্থানে হিজরী ৮ম সালে তাঁর জন্ম হয়। এখানেই মারিয়া (রা) বাস করতেন। এখানে ইব্রাহীমের জন্ম হওয়ার কারণে স্থানটি 'মাশরাবাই ইব্রাহীম' নামে পরিচিতি লাভ করে। ইব্রাহীমের জন্মকালে ধাত্রী নিযুক্ত ছিলেন প্রখ্যাত সাহাবী আবু রাফের পত্নী বিবি সালমা। তিনি যখন রাসূল এর দরবারে হাজির হয়ে পুত্র সন্তান হওয়ার শুভ সংবাদটি দেন তখন রাসূল খুশি হয়ে তাকে একজন গোলাম দান করেন।
ইব্রাহীমের জন্মের সংবাদে রাসূল খুব খুশি হন। সাতদিনের দিন তাঁর আকীকা দেয়া হয় এবং মাথা মুড়িয়ে চুলের ওজন পরিমাণ রূপা গরীবদের মাঝে দান করে দেন। এ দিনেই মুসলিম জাতির পিতা ইব্রাহীম (আঃ)-এর নামে তাঁর নামকরণ করা হয় ইব্রাহীম।
সদ্য প্রসূত শিশু ইব্রাহীমকে দুধ পান করানোর জন্য অনেক আনসার মহিলা প্রার্থী হন। শেষে খাওলা বিনতু যায়দুল আনসারীকে দাই নিযুক্ত করেন। এ জন্য রাসূল তাঁকে কয়েকটি ফলবান খেজুর গাছ দান করেন।
খাওলা বিনতে যায়দুল উম্মু রাফে নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি তাঁর স্বামী বারা বিন আউদু'র সাথে মদীনার উপকন্ঠে বাস করতেন। বারা পেশায় ছিলেন কর্মকার। এ জন্য তার বাড়ি প্রায়ই ধোয়ায় আচ্ছন্ন থাকত। তবুও রাসূল সন্তানের টানে প্রায়শ সেখানে যেতেন এবং ইব্রাহীমের খোঁজ খবর নিতেন।
সতের বা আঠার মাস বয়সের সময়ে ইব্রাহীম ধাত্রী মাতা খাওলার গৃহেই ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যু সংবাদ পেয়ে রাসূল সাহাবী আবদুর রহমানসহ সেখানে ছুটে যান। হাত বাড়িয়ে মৃত ইব্রাহীমকে কোলে তুলে নেন। আর তখনি রাসূল এর দু'চোখ দিয়ে বাধ ভাঙা জোয়ারের মতো পানি নেমে আসে।
আবদুর রহমান আরজ করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ আপনার অবস্থা এমন কেন? রাসূল বলেন, 'আজ আমার অপত্য স্নেহ অশ্রু বিন্দু হয়ে ঝরে পড়ছে।'
রাসূল তাঁর প্রিয়তম পুত্রের মৃত্যুতে ভীষণ মর্মাহত হন। তাঁর চক্ষু হতে অশ্রু প্রবাহিত হয়। এ অবস্থায় তিনি বললেন : চক্ষু অশ্রুভারাক্রান্ত, অন্তর ব্যথিত, কিন্তু মুখে এমন কথা বলতে পারি না যা আল্লাহ তা'আলা অপছন্দ করেন। হে ইবরাহীম! আমরা তোমার বিচ্ছেদে শোকাভিভূত। আল্লাহর নির্দেশমত আমরা إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ পড়ছি। ফাদল ইবনে 'আব্বাস (রা) বা উন্মু বুরদা (রা) তাঁকে গোসল দেন। ছোট খাটিয়ায় করে জানাযা বহন করা হয়।
ইব্রাহীমের মৃত্যুর দিন ঘটনাক্রমে সূর্যগ্রহণ হয়েছিল। সকলে বলাবলি করতে লাগল যে, রাসূল -এর পুত্র মারা গেছে বলেই আজ সূর্যগ্রহণ হয়েছে। তারা বলতে লাগল, 'আকাশ শোকাভিভূত হয়ে পড়েছে, সে জন্যই দুনিয়ায় বিদঘুটে অন্ধকার নেমে এসেছে।' কিন্তু বিশ্ব সংস্কারক রাসূল যখন এ সংবাদ শুনলেন তখনই তিনি এ কুসংস্কারের মূলোৎপাটন করার জন্য সকলকে ডেকে বললেন, 'সূর্যগ্রহণ এবং চন্দ্রগ্রহণ হচ্ছে আল্লাহ্র নিদর্শন। কারো জীবন ও মরণের সঙ্গে এগুলোর কোনোই যোগাযোগ নেই। সুতরাং গ্রহণ লাগা বা না লাগার পেছনে কারো মৃত্যুর কোনো সম্বন্ধ নেই।'
ইব্রাহীমের লাশ ছোট একটা খাটে করে আনা হয়। রাসূল নিজে পুত্রের জানাযা পড়ান। তারপর তাঁকে বিশিষ্ট সাহাবী উসমান বিন মাযউনের কবরের পাশে দাফন করা হয়। তাঁর লাশ কবরে নামান উসামা ও ফযল বিন আব্বাস। রাসূল দাফন শেষ হওয়া পর্যন্ত সেখানে দাঁড়িয়েছিলেন। পরে কবরের ওপর সামান্য পানি ছিটিয়ে দেয়া হয় এবং নির্দিষ্ট চিহ্ন দিয়ে কবরটিকে চিহ্নিত করা হয়।
খোলাফায়ে রাশেদার প্রথম ও দ্বিতীয় খলিফা আবু বকর ও ওমর (রা) মারিয়া (রা)-কে অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখতেন। রাসূল-এর ইন্তেকালের পর উভয় খলিফাই তাঁর প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এমন কি মারিয়া কিবতিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর আত্মীয়-স্বজনকেও উক্ত দু'জন খলিফা সম্ভাব্য সকল সাহায্য সহযোগিতা করেছেন।
ওফাত : ইব্রাহীম (রা)-এর মৃত্যুর পাঁচ বছর পর মারিয়া কিবতিয়া ইন্তেকাল করেন। তাঁকে জান্নাতুল বাকীতে দাফন করা হয়।