📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর স্ত্রীগণ যেমন ছিলেন > 📄 উম্মুল মু'মিনীন উম্মু হাবীবা (রা)

📄 উম্মুল মু'মিনীন উম্মু হাবীবা (রা)


একদা আবু সুফিয়ান যখন মেয়ের গৃহে প্রবেশ করে বিছানায় বসতে যান তখন উম্মে হাবীবা তা উল্টে দেন। ঘটনার আকস্মিকতায় আবু সুফিয়ান খুব অপমানবোধ করেন এবং বলেন, 'তুমি এ বিছানায় নিজের পিতাকেও বসতে দিবে না?' উম্মে হাবীবা বললেন, 'একজন মুশরিক রাসূল এর বিছানায় বসুক অবশ্যই আমি তা পছন্দ করি না।'

ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ যখন উম্মু হাবীবা (রা)-কে বিয়ে করেন তখন নিম্নের এ আয়াতটি নাযিল হয়- عَسَى اللَّهُ أَنْ يَجْعَلَ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَ الَّذِينَ عَادَيْتُمْ مِنْهُمْ مَوَدَّةً . অর্থ: যারা তোমাদের শত্রু আল্লাহ তাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সম্ভবতঃ বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে দেবেন। (সূরা-৬০ মুমতাহিনা : আয়াত-৭)

নাম ও পরিচয়: তাঁর আসল নাম রামলা। কারো কারো মতে 'হিন্দ'। ডাক নাম উম্মু হাবীবা। পিতার নাম আবু সুফিয়ান। মাতার নাম সুফিয়া বিনতে আবুল আস। তিনি ওসমান (রা)-এর ফুফু ছিলেন। অর্থাৎ ওসমান (রা) ছিলেন উন্মু হাবীবা (রা)-এর আপন ফুফাতো ভাই। উম্মু হাবীবাহ নবুওয়্যাতের ১৭ বছর পূর্বে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন।

বংশ: তাঁর বংশ তালিকা হল, রামলা বিনতে আবু সুফিয়ান সখর ইবনে হারব ইবনে উমাইয়া ইবনে আবদে শামস। পিতা-মাতা উভয়েই কুরাইশ বংশের লোক ছিলেন। পিতা আবু সুফিয়ান তো ছিলেন ইসলামের প্রধান শত্রু এবং বিখ্যাত কুরাইশ নেতা।

প্রথম বিবাহ: তিনি মক্কার শ্রেষ্ঠ সুন্দরীদের অন্যতম ছিলেন। যে কারণে পিতা আবু সুফিয়ান গর্ব করে বলতেন, 'আমার নিকট রয়েছে সারা আরবের শ্রেষ্ঠ

সুন্দরী লাবণ্যময়ী নারী (উম্মু হাবীবা)।' আবু সুফিয়ান তাই অনেক দেখাশোনা, খোঁজ খবরের পর বনু আসাদ গোত্রের সুদর্শন পুরুষ ওবায়দুল্লাহ বিন জাহাশের সাথে উম্মু হাবীবার বিয়ে দেন। ওবায়দুল্লাহ বিন জাহাশ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী ছিলেন। তিনি উম্মুল মু'মিনীন যয়নব বিনতে জাহাশ (রা)-এর ভাই ছিলেন।

ইসলাম গ্রহণ: নবুওয়্যাতের প্রথম যুগেই উম্মু হাবীবাহ ও স্বামী ওবায়দুল্লাহ ইসলাম কবুল করেন। মক্কায় কাফেরদের অত্যাচারে টিকতে না পেরে স্বামী-স্ত্রী উভয়ে হাবশায় হিজরত করেন। এই হাবশাতেই তাঁদের কন্যা হাবীবা জন্মগ্রহণ করেন। এ হাবীবার নামেই তাঁকে উম্মু হাবীবা বলা হয় এবং এ নামেই তিনি পরিচিত হয়ে আছেন।

প্রথম স্বামীর মৃত্যুবরণ: হাবশাতে আসার পর স্বামী ওবায়দুল্লাহর ভেতর ধীরে ধীরে পরিবর্তন দেখা দেয়। ইসলাম গ্রহণের আগে ওবায়দুল্লাহ ছিলেন প্রচণ্ড মদ্যপায়ী। মদ নিষিদ্ধ হলে অন্যান্যদের মত তিনি তা ত্যাগ করেন। কিন্তু হাবশা আসার পর ওবায়দুল্লাহ আবার মদ পান শুরু করেন। উম্মু হাবীবা স্ত্রী হিসেবে তাকে এ পথ থেকে ফেরানোর প্রাণপণ চেষ্টা করেন। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। এক রাতে উম্মু হাবীবা তাঁর স্বামীকে বিভৎস অবস্থায় স্বপ্নে দেখেন।

এরপর তিনি স্বামীকে ভয় দেখিয়ে সাবধান করার চেষ্টা করেন কিন্তু উল্টো ওবায়দুল্লাহ তাঁকে বলেন, 'উম্মু হাবীবা, ধর্মের ব্যাপারে চিন্তা করে বুঝলাম, খ্রিস্টবাদের চেয়ে উত্তম কোনো ধর্ম নেই। আমি ইতোপূর্বে মুসলমান হলেও এখন পুনরায় খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছি।' এরপর উম্মু হাবীবা তাকে তিরস্কার করলেন কিন্তু কিছুই হলো না, সে খ্রিস্টান হয়ে গেল এবং একদিন মাত্রাতিরিক্ত মদ পান করার কারণে মৃত্যুবরণ করে।

নি:স্ব উম্মু হাবীবা: ওবায়দুল্লাহর মৃত্যুর পর থেকে উম্মু হাবীবা সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ হয়ে যান এবং মানবেতর জীবন যাপন করতে থাকেন। এ সংবাদ রাসূল -এর নিকট পৌছলে, ইসলামের জন্য উম্মু হাবীবার ত্যাগের কথা চিন্তা করে তিনি খুবই বিচলিত হন।

রাসূল -এর প্রস্তাব: পরে সব দিক বিবেচনা করে বিয়ের প্রস্তাবসহ আমর ইবনে উমাইয়া যাসিরীকে হাবশার বাদশাহ নাজ্জাশীর কাছে পাঠান। বাদশাহ নাজ্জাশী নিজের দাসী আবরাহার মাধ্যমে এ প্রস্তাব উম্মু হাবীবার নিকট পৌছান।

প্রস্তাব পেয়ে উম্মু হাবীবা এতই খুশি হন যে, তিনি আবরাহাকে দু'টি রূপার চুড়ি, পায়ের দু'টি মল এবং দু'টি রূপার আংটি উপহার দেন। উম্মু হাবীবা নিজের পক্ষ থেকে খালিদ ইবনে সাঈদকে উকিল নিয়োগ করেন।

বিবাহ সম্পন্ন : বাদশাহ নাজ্জাশী সন্ধ্যায় স্থানীয় সকল মুসলমান এবং জাফর ইবনে আবূ তালিবকে ডেকে বিবাহ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেন। বাদশাহর পক্ষ থেকে মোহরানা হিসেবে ৪০০ দেরহাম বা দীনার আদায় করা হয়। উল্লেখ্য যে, এরপর বাদশাহ নাজ্জাশী নিজেই বিয়ে পড়ান। এই বিয়েতে কিছু খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

হিজরী ৬ অথবা ৭ সালে এ বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। বিয়ের সময় উম্মু হাবীবা (রা)-এর বয়স হয়েছিল ৩৬/৩৭ বছর। বিয়ের পর উম্মু হাবীবা জাহাজ যোগে মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। জাহাজ যখন মদীনায় পৌঁছে তখন রাসূল খায়বার অভিযানে ব্যস্ত ছিলেন এবং সেখানে অবস্থান করছিলেন।

বিয়ে করার কারণ : রাসূল উন্মু হাবীবাকে মূলত দু'টো কারণে বিয়ে করেছিলেন।

প্রথমত, স্বামীর মৃত্যু হওয়ার পর বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে উম্মু হাবীবা প্রচণ্ড কষ্টের মধ্যে দিন যাপন করছিলেন। তার কষ্ট ছিল ইসলামের প্রতি মহব্বতের কারণে। তিনি স্বামীর মতোই পুনরায় খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করতে পারতেন কিন্তু তিনি তা করেননি। বরং স্বামীর এ ধরনের প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর এ ত্যাগের পুরস্কার হিসেবে রাসূল তাঁকে বিয়ে করেন।

দ্বিতীয়ত, আবু সুফিয়ান ছিলেন সে কুরাইশ নেতা যিনি আবূ জেহেলের মৃত্যুর পর ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। নবুওয়্যাতের সে প্রথম দিন থেকেই আবু সুফিয়ান রাসূল ও মুসলমানদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন ও জুলুমের বন্যা প্রবাহিত করেছে। বলা যায়, মানুষের পক্ষে যত প্রকার পন্থা অবলম্বন করা সম্ভব আবু সুফিয়ান তার কোনটিই ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে ছাড়েনি।

বিয়ের ফলাফল : ইসলাম ও মুসলমানদের এ জাত শত্রুরই কন্যা ছিলেন উন্মু হাবীবা (রা)। এ জন্য রাসূল রাজনৈতিক কারণে সুদূর প্রসারী চিন্তা-ভাবনা করেই উম্মু হাবীবাকে বিয়ে করেন। ঐতিহাসিক ফলও পাওয়া যায়। আবূ সুফিয়ান ক্রমে নরম হতে থাকেন এবং মক্কা বিজয়ের দিন ইসলাম কবুল করেন।

তাঁর ঈমানের বলিষ্ঠতা : উম্মু হাবীবার চরিত্র মাধুর্যে উম্মু হাবীবা (রা) ছিলেন নেককার ও বলিষ্ঠ ঈমানের অধিকারিণী। তিনি ঈমান ও ইসলামের ব্যাপারে কারো সাথে সমঝোতা করতে বা সামান্য দুর্বলতা দেখাতেও রাজি ছিলেন না। এর প্রমাণ তো আমরা তাঁর স্বামী ওবায়দুল্লাহ যখন পুনরায় খ্রিস্টান হন তখনই পেয়েছি।

অন্যদিকে তাঁর পিতা আবু সুফিয়ান একবার মদীনায় আসেন হুদায়বিয়ার সন্ধির সময়সীমা বাড়ানোর জন্য। তিনি ইচ্ছে পোষণ করছিলেন যে, তাঁর কন্যা উন্মু হাবীবাকে দিয়েই রাসূল-এর কাছে আবেদন পেশ করবেন, যাতে সহজেই তা পাস হয়। এ উদ্দেশ্যে তিনি উম্মু হাবীবার গৃহে পদার্পণ করেন।

একদা আবু সুফিয়ান যখন মেয়ের গৃহে প্রবেশ করে বিছানায় বসতে যান তখন উম্মু হাবীবা তা উল্টে দেন। ঘটনার আকস্মিকতায় আবু সুফিয়ান খুব অপমানবোধ করেন এবং বলেন, 'তুমি এ বিছানায় নিজের পিতাকেও বসতে দিবে না?' উম্মু হাবীবা বললেন, 'একজন মুশরিক রাসূল -এর বিছানায় বসুক অবশ্যই আমি তা পছন্দ করি না।' কন্যার কথা শুনে আবু সুফিয়ান ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, 'তুমি আমার বিরুদ্ধে খুব বেশি বিগড়ে গেছ।'

উম্মু হাবীবা নিজের পিতার সাথে যে রূঢ় আচরণ করেছিলেন তা শুধুমাত্র ঈমানের তাকিদে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে।

তিনি ছোট খাট ব্যাপারেও খুব গুরুত্ব দিতেন এবং অন্যদেরকেও সে ব্যাপারে উৎসাহিত করতেন ও তাকিদ দিতেন। একবার তাঁর ভাগিনা আবু সুফিয়ান ইবনে সাঈদ ছাতু খেয়ে কুলি না করলে তিনি বললেন, 'তোমার কুলি করা উচিৎ ছিল। কারণ, নবীজী বলেছেন, আগুনে পাকানো জিনিস খেলে অযু করতে হয়।' একবার তিনি রাসূল-কে বলতে শুনেছেন যে, প্রতিদিন যে ১২ রাকা'আত করে নফল সালাত পড়লে জান্নাতে তার জন্য ঘর তৈরি করা হবে। এরপর থেকে তিনি আর এ সালাত ছাড়েননি। তিনি নিজেই বলেছেন, অত:পর আমি নিয়মিত বার রাকা'আত সালাত পড়তাম।

তাঁর পিতা আবু সুফিয়ান ইন্তেকাল করলে তিনদিন পর তিনি খোশবু চেয়ে নিয়ে হাতে মুখে মাখেন এবং বলেন, ঈমানদার নারীর জন্য তিনদিনের বেশি শোক করা জায়েয নেই, অবশ্য স্বামী ছাড়া। স্বামীর জন্য স্ত্রীর শোক করার মেয়াদ হচ্ছে চার মাস দশ দিন। নবীজীকে একথা বলতে না শুনলে এ ব্যাপারে আমার কোনো খবরই ছিল না।'

প্রথম স্বামী ওবায়দুল্লাহর ঔরসে তাঁর দু'জন সন্তান আবদুল্লাহ ও হাবীবার জন্ম হয়। যতদূর জানা যায় তার আর কোনো সন্তান হয়নি।

হাদীস শিক্ষা ও সম্প্রসারণে তাঁর অবদান

উম্মুল মু'মিনীন উম্মু হাবীবা (রা) রাসূলুল্লাহ ও যয়নব বিনতে জাহাশ (রা) থেকে হাদীস শিক্ষা লাভ করেন এবং পরে তা বর্ণনা করেন। তাঁর থেকে ৬৫টি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এর মধ্যে দু'টি মুত্তাফাকুন আলাইহি এবং দু'টি ইমাম মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন।

ইবনে উতবা, সালেম ইবনে সেওয়ার হাবীবা, মু'আবিয়া, ওৎবা, আবু সুফিয়ান, আবদুল্লাহ বিন ওৎবা, সালিম বিন সাওয়াব, আবূল জিরাহ, যয়নব বিনতে আবু সালামা, সুফিয়া বিনতে সায়বা, ওরওয়া বিন যুবায়ের, শাহার বিন হাওশাব, আবূ সালেহ আস সামান প্রমুখ তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।

আমাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী তাঁর থেকে বর্ণিত হাদীস পূনরুক্তিসহ সহীহ আল-বুখারীতে ৮টি, সহীহ মুসলিমে ৯টি, জামে' আত তিরমিযীতে ৪টি, সুনান আবু দাউদে ৮টি, নাসাঈতে ৩৪টি এবং ইবনে মাজায় ৮টি সংকলিত হয়েছে।

তাঁর থেকে বর্ণিত হাদীসের কয়েকটি প্রামাণ্য হাদীস গ্রন্থ হতে নিম্নে উল্লেখ করা হলো-

عَنْ أَمْ حَبِيبَةَ بِنْتِ أَبِي سُفْيَانَ (رضى) لَمَّا جَاءَهَا نَعْى .۱ أَبِيهَا دَعَتْ بِطِيبٍ فَمَسَحَتْ ذِرَاعَيْهَا ، وَقَالَتْ : وَمَا لِي بالطَّيبِ مِنْ حَاجَةٍ ، لَوْلا أَنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَقُولُ : لَا يَحِلُّ لِإِمْرَاةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ تَحَدُ عَلَى مَيِّتِ فَوْقَ ثَلاَثٍ إِلا عَلَى زَوْجِ أَرْبَعَةِ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا .
১. উম্মু হাবীবা বিনতে আবু সুফিয়ান (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বললেন: যখন তাঁর পিতার মৃত্যু সংবাদ তাঁর কাছে আসলো, তিনি সুগন্ধি আনতে বললেন।

অতঃপর তা স্বীয় বাজুতে মাখলেন এবং বললেন: আমার কোন সুগন্ধির প্রয়োজন হতো না, যদি না আমি রাসূলুল্লাহকে বলতে শুনতাম, তিনি বলেছেন, আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী কোন নারীর জন্য বৈধ নয় কোন মৃতের জন্য তিন দিনের অধিক শোক প্রকাশ করা। তবে স্বামীর মৃত্যুতে চারমাস দশ দিন শোক প্রকাশ করা যায়। (বুখারী ২য় খণ্ড, পৃ.-৮০৪-৮০৫)

عَنْ أَمْ حَبِيبَةَ (رضى) تَقُولُ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَقَولُ : مَنْ صَلَّى اثْنَى عَشَرَةَ رَكْعَةٌ فِي يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ بَنِي لَهُ بِهِنَّ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ - قَالَتْ أَمْ حَبِيبَةً فَمَا تَرَكْتُهُنَّ مُنْذُ سَمْعَتِهِنَّ مِنْ رَسُولِ اللهِ ﷺ .
২. উম্মু হাবীবা (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি দিবা-রাত্রী বারো রাক'আত সালাত (নফল) পড়বে, জান্নাতে তাঁর জন্য একটি ঘর বানানো হবে। উম্মু হাবীবা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ থেকে এ হাদীস শুনার পর আমি কখনও এ সালাত ত্যাগ করিনি। (মুসলিম ১ম খণ্ড, পৃ.-২৫১)

عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ أَبِي سُفْيَانَ أَنَّهُ سَأَلَ أُخْتَهُ أَمْ حَبِيبَةً (رضی) زَوْجِ النَّبِيِّ ﷺ هَلْ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يُصَلِّي فِي الثَّوْبِ الَّذِي يُجَامِعُهَا فِيْهِ؟ فَقَالَتْ : نَعَمْ إِذَا لَمْ يُرَ فِيْهِ أَذًى .
৩. মু'আবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রা) তাঁর বোন উম্মু হাবীবা (রা) কে জিজ্ঞেস করলেন, যে কাপড় পড়ে নবী কারীম স্ত্রী সহবাস করেন, সেই কাপড় পরেই কি তিনি সালাত পড়তেন? উম্মু হাবীবা (রা) বললেন: হ্যাঁ, যখন ঐ কাপড়ে নাপাকীর কোন চিহ্ন দেখা না যেত। (আবু দাউদ, ১ম খণ্ড, পৃ.-৫৩)

عَنْ صَفِيَّةَ بِنْتِ شَيْبَةَ عَنْ أَمْ حَبِيبَةَ (رضى) زَوْجِ النَّبِيِّ قَالَ : كُلُّ كَلامِ ابْنِ آدَمَ عَلَيْهِ لَا لَهُ إِلَّا أَمْرَ بِهَا بِمَعْرُوفٍ أَوْ نَهى عَنِ الْمُنْكَرِ أَوْ ذِكْرُ اللَّهِ .

৪. সাফিয়্যা বিনতে শায়বা (রা) উম্মু হাবীবা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, নবী বলেছেন: বনু আদমের প্রতিটি কথাই তার বিপক্ষে যাবে তবে সৎকাজে আদেশ, অসৎ কাজে নিষেধ এবং যিকরুল্লাহ বা আল্লাহর স্মরণ ব্যতীত। (মুসলিম)

ه. عَنْ أَمْ حَبِيبَةَ (رضى) أَنَّهَا حَدَّثَتْهُ قَالَتْ : سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَقُولُ : لَوْلا أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّنِي لَأَمَرْتُهُمْ بِالسَّوَاكِ عِنْدَ كُلِّ صَلَاةٍ .
৫. উম্মু হাবীবা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, যদি আমার উম্মাতের জন্য কষ্টকর না হতো তবে আমি তাদেরকে আদেশ দিতাম প্রতি সালাতে মিসওয়াক করার জন্য। (মুসলিম: হাদীস নং-৫৮৯)

ওফাত: আপন ভাই আমীর মু'আবিয়ার শাসন আমলে হিজরী ৪৪ সালে ৭৩ বছর বয়সে উম্মু হাবীবা (রা) ইন্তেকাল করেন। মদীনায় তাঁকে দাফন করা হয়। অন্য এক বর্ণনা থেকে জানা যায়, তাঁকে আলী (রা)-এর গৃহে দাফন করা হয়। এর প্রমাণ হলো জয়নুল আবেদীন (রা) তার গৃহ খননকালে একটি শিলা লিপি পান, তাতে লেখা ছিল, এটা রামলা বিনতে সাখর-এর কবর।

মৃত্যুর আগে তিনি আয়েশাকে (রা) ডেকে বলেন, 'আমার এবং আপনার মধ্যে সতীনের মতো সম্পর্ক ছিল। কোনো ভুলত্রুটি হয়ে থাকলে মাফ করে দেবেন এবং আমার মাগফেরাতের জন্য দোয়া করবেন। আয়েশা দোয়া করলে তিনি পুনরায় বললেন, আপনি আমাকে খুশি করেছেন, আল্লাহ আপনাকে খুশি করুন।'

📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর স্ত্রীগণ যেমন ছিলেন > 📄 উম্মুল মু'মিনীন সফিয়্যা (রা)

📄 উম্মুল মু'মিনীন সফিয়্যা (রা)


খায়বার যুদ্ধ বিজয়ের পর সফিয়্যা (রা) বন্দী হয়ে আসলে এক সময় তাকে রাসূল জিজ্ঞেস করলেন, আমার ব্যাপারে তোমার কোন আগ্রহ আছে কি? তিনি উত্তরে বললেন, শিরকের মধ্যে নিমজ্জিত থাকার সময় আমি এই আশা পোষণ করতাম। সুতরাং ইসলাম গ্রহণের দ্বারা আল্লাহ আমাকে আপনার সাহচর্য লাভের যে সুযোগ দিয়েছেন, সে সুযোগ আমি কীভাবে হারাতে পারি?

নাম ও পরিচয়: তাঁর প্রকৃত নাম যয়নব। প্রসিদ্ধ নাম সফিয়্যা। আরবের প্রথা অনুযায়ী যুদ্ধলব্ধ মাল বণ্টনের সময় যে উৎকৃষ্ট বা উত্তম মাল দলপতির জন্য রাখা হতো তাকে সফিয়্যা বলা হতো। খায়বার যুদ্ধে প্রাপ্ত সকল কিছুর মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলেন যয়নব। শেষ পর্যন্ত এ যয়নবকে রাসূল এর ভাগে দেয়া হয়। এজন্য তাঁর নামকরণ করা হয় সফিয়া এবং এ নামেই তিনি প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল হুওয়াই ইবনে আখতাব। তিনি ছিলেন হারুন ইবনে ইমরান (আ.)-এর অধস্তন পুরুষ।

বংশ: তাঁর বংশ তালিকা হল- যয়নব বিনতে হুওয়াই ইবনে আখতাব ইবনে সাঈদ ইবনে আমের ইবনে ওবাইদ ইবনে কা'আব ইবনুল খাযরাজ ইবনে আবূ হাবীব ইবনে নুছাইর ইবনে নাহহাম ইবনে মাইখুম। তাঁর মায়ের নাম ছিল বাররা বিনতে সামওয়ান। এ সামওয়ান ইয়াহুদীদের সর্বশ্রেষ্ঠ গোত্র বনু কুরাইযার নেতা ছিলেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে সফিয়‍্যা (রা)-এর পিতৃকুল নযীর ও মাতৃকুল বনু কুরাইযার ইয়াহুদীদের এক বংশে গিয়ে মিলিত হয়েছে।

পারিবারিক অবস্থান: সফিয়্যা (রা)-এর আব্বা ও দাদা উভয়েই ছিলেন তৎকালীন ইয়াহুদী জাতির সম্মানিত ও মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ। যে কারণে বনী ইসরাঈলের সমস্ত আরবীয় গোত্রের মধ্যে তাদেরকে আলাদা রকম সম্মান করা হতো। বিশেষ করে তাঁর বাবা হুওয়াই ইবনে আখতাবকে মর্যাদার শীর্ষে স্থান দেওয়া হয়েছিল। ইয়াহুদীরা বিনা বাক্যে তাঁর নেতৃত্ব মেনে চলত। তাঁর নানা সামওয়ান মানমর্যাদা শৌর্য-বীর্য এবং বীরত্বের দিক দিয়ে সারা জাযিরাতুল আরবে ছিলেন সম্মানিত। অর্থাৎ সফিয়া (রা) ছিলেন সবদিক দিয়েই বিশিষ্টতার অধিকারিণী।

প্রথম বিবাহ: সফিয়্যা (রা)-এর প্রথম বিয়ে হয় আরবের প্রখ্যাত কবি ও সর্দার সালাম ইবনে মিশকাম আল কারাবীর সাথে। প্রথম দিকে তাদের দাম্পত্য জীবন সুখের হলেও পরবর্তীতে মনোমালিন্য ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। ফলে সফিয়্যা (রা) পিতৃগৃহে ফিরে আসেন।

দ্বিতীয় বিবাহ: এরপর কেনানা ইবনে আবুল আফীক-এর সাথে তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে হয়। আবুল আফীক ছিলেন খায়বারের নামকরা দুর্গ আল-কামুদ-এর সর্দার। এ সময় তাঁর বয়স ছিল সতের বছর।

পিতা ও চাচার মৃত্যু: তাঁর পিতা ও চাচা আবু ইয়াসির রাসূল এর চরম শত্রু ছিল। তারা মদীনা থেকে বিতাড়িত হয়ে চতুর্থ হিজরীতে খায়বারে গিয়ে কিনানা ইবনে আল রাবীর সাথে বসবাস করতে থাকেন। এখানে বসেই হুওয়াই ইবনে আখতাব মুসলমানদের ক্ষতি করার সর্বপ্রকার চেষ্টা করতে থাকে।

পরবর্তীতে রাসূল এর নেতৃত্বে খায়বার অভিযানকালে মুসলমানদের হাতে আলকামূস দুর্গের পতন ঘটে। যুদ্ধে ইয়াহুদীদের চূড়ান্ত পরাজয় ঘটে। বহু নেতৃস্থানীয় ইয়াহুদী মৃত্যুবরণ করে। কেনানা ইবনে আবুল আফীক দুর্গের অভ্যন্তরে নিহত হন। এমন কি তাঁর পিতা হুওয়াই ইবনে আখতাবও নিহত হন। সফিয়্যা অন্যান্য পরিবার-পরিজনদের সাথে বন্দী হন।

বন্দীনী সফিয়্যা: সফিয়্যা বন্দীনী হিসেবে মুসলিম শিবিরে আসার পর আরবের নিয়ম অনুযায়ী সাহাবী দাহইয়া কলবীর আবেদন মোতাবেক তাঁকে তাঁর ভাগে দিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু সফিয়্যা (রা) তাঁর মর্যাদার দিক বিবেচনা করে সাহাবী দাহইয়া কালবীর ঘরে যেতে অস্বীকার করেন। এ সময়ে কতিপয় সাহাবী আরজ করেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! সফিয়্যা বনু কুরাইযা এবং বনু নজীরের মহিলা। এ নেতৃস্থানীয়া মহিলাকে দাহইয়ার হস্তে বাঁদী হিসেবে সমর্পণ করলেন? তাঁর মর্যাদা তো অনেক উঁচুতে আসীন। তিনি আমাদের নেতার জন্যই যথোপযুক্ত।'

রাসূল সাহাবীদের আবেদন কবুল করলেন এবং দাহইয়া কালবীকে অন্য একজন পরিচারিকা দান করলেন। সফিয়্যাকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করে দিলেন।

রাসূলের নিকট আশ্রয় চাওয়া : সফিয়্যা কোথাও যেতে রাজি হলেন না। তিনি রাসূল এর কাছে বিনীত আরজ করলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! খায়বার যুদ্ধে আমার পিতা এবং স্বামী নিহত হয়েছেন। আমার নিকটতম আত্মীয়-স্বজনরাও যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে। আর আমি ইয়াহুদী ধর্ম ত্যাগ করে পবিত্র ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছি। বর্তমানে আমার ইয়াহূদী আত্মীয়-স্বজন যারা বেঁচে আছে তাদের কেউই আমাকে আশ্রয় দেবে না এবং গ্রহণও করবে না। এ আশ্রয়হীন অবস্থায় আমি কোথায় যাব? কে আমার এ অসহায় অবস্থার সহায়ক হবে? কে আমাকে স্থান দিবে? ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আর কোথাও যাবো না, আমি আপনার অন্তঃপুরে একজন দাসী হয়ে থাকতে চাই। আপনি আমাকে আশ্রয় প্রদান করুন।'

রাসূলের সাথে বিবাহের আকাঙ্ক্ষা : খায়বার যুদ্ধ বিজয়ের পর সফিয়্যা (রা) বন্দী হয়ে আসলে এক সময় তাকে রাসূল জিজ্ঞেস করলেন, আমার ব্যাপারে তোমার কোন আগ্রহ আছে কি? তিনি উত্তরে বললেন, শিরকের মধ্যে নিমজ্জিত থাকার সময় আমি এ আশা পোষণ করতাম। সুতরাং ইসলাম গ্রহণের দ্বারা আল্লাহ আমাকে আপনার সাহচর্য লাভের যে সুযোগ দিয়েছেন, সে সুযোগ আমি কীভাবে হারাতে পারি? অন্য বর্ণনায় এসেছে, সফিয়্যা (রা) যখন রাসূলের নিকট আসলেন, তখন তিনি বললেন, তোমার পিতা ইহুদী ছিলেন, যে আমার প্রতি শত্রুতা পোষণ করত। অবশেষে আল্লাহ তাকে নিহত করলেন। তখন সফিয়্যা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তাঁর কিতাবে বলেছেন-
وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى
অর্থ: 'একজনের (পাপের) বোঝা অন্যের ওপর চাপানো হবে না'। (আন'আম ১৬৪; ইসরা ১৫; ফাতির ১৮; যুমার ৭; নাজমা ৩৮)।

তখন রাসূল বললেন, তুমি যা পছন্দ কর, বেছে নেও। যদি তুমি ইসলামকে পছন্দ কর, তাহলে আমি তোমাকে আমার জন্য রেখে দিব। আর যদি তুমি ইহুদী ধর্ম মতকে পছন্দ কর, তাহলে আমি তোমাকে মুক্ত করে দেব, যাতে তুমি তোমার কওমের সাথে মিলিত হতে পার। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল!

আমি ইসলামকে ভালবেসেছি, আপনি আমাকে দাওয়াত দেয়ার পূর্বেই আমি আপনাকে সত্য বলে স্বীকার করেছি, এমনকি আমি আপনার সওয়ারীতে চড়েছি। ইহুদী ধর্মের প্রতি আমার কোন আকর্ষণ বা অনুরাগ নেই। আর সেখানে আমার পিতা, ভাই, কেউ নেই। আপনি কুফরী বা ইসলাম যে কোনটি গ্রহণের এখতিয়ার দিয়েছেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই আমার নিকট অধিক প্রিয় স্বাধীন হওয়ার চেয়ে এবং আমার কওমের নিকট ফিরে যাওয়ার চেয়ে। তখন তাকে রাসূলুল্লাহ নিজের জন্য রেখে দিলেন।

সফিয়্যাকে বিবাহের কারণ : বিভিন্ন কারণে রাসূলুল্লাহ সফিয়্যাকে বিবাহ করেন। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নিম্নরূপ-
১. আত্মীয়-স্বজন, জ্ঞাতি-গোষ্ঠী নিহত এবং নিজেও স্বীয় ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ হওয়ায় সফিয়্যা শোক বিহ্বল ছিলেন। তার শোকাহত হৃদয়কে শান্ত করা ও তাকে দ্বীন ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য রাসূলুল্লাহ বিবাহ করেন।
২. এ বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে ইসলাম ও মুসলমানদের সাথে বনু নাযীর ও বনু কুরায়জার বিরোধিতা ও শত্রুতা হ্রাসকরণ এবং প্রশমনের অভিপ্রায়ে রাসূলুল্লাহ সফিয়্যাকে বিবাহ করেন। যা পরবর্তীতে বাস্তবায়িত হয়েছিল।
৩. সফিয়‍্যার যথাযথ সম্মান বজায় রাখা এবং এ নজীরবিহীন ইহসানের প্রতি লক্ষ্য করে ইহুদী সম্প্রদায় যাতে আল্লাহদ্রোহিতা থেকে ফিরে এসে ইসলাম কবুল করতে অনুপ্রাণিত হয়, এজন্য রাসূলুল্লাহ সফিয়্যাকে বিবাহ করেন।

রাসূলের সাথে বিয়ে : সবদিক বিবেচনা করে রাসূল সফিয়্যা (রা)-এর আবেদন মঞ্জুর করলেন এবং খায়বার থেকে মদীনায় ফেরার পথে 'যাবাহা' নামক স্থানে তাকে বিবাহ করেন। এটা ছিল হিজরী সপ্তম সালের মহররম মাসের শেষ সপ্তাহ। এ বিয়েতে অলিমা অনুষ্ঠান অর্থাৎ খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এ ব্যাপারে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক স্যার সৈয়দ আমীর আলী লিখেছেন, 'ইয়াহুদী রমণী সফিয়‍্যাকে খায়বারের বিরুদ্ধে অভিযানের সময় মুসলমানরা বন্দী হিসেবে এনেছিলেন। তাকেও মুহাম্মদ উদারতার সঙ্গে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং তাঁর সনির্বন্ধ অনুরোধের জন্য তাঁকে স্ত্রীত্বে বরণ করেছিলেন।

এ বিয়ের ফলে আশ্রয়হীনা সফিয়্যা (রা) সুন্দর ও সর্বোত্তম আশ্রয় লাভ করেন। সাথে সাথে এ বিয়ের ফলে ইয়াহুদী সম্প্রদায়ের ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষোভের কিছুটা প্রশমন হয়। এমনকি ধীরে ধীরে ইয়াহুদীদের অনেকেই ইসলাম কবুল করেন।

সফিয়্যা (রা) সুন্দরী ও লাবণ্যময়ী ছিলেন। যে কারণে মদীনায় আসলে তাঁকে দেখার জন্য মহিলাদের ভীড় পড়ে যায়। এমনকি যয়নব বিনতে জাহাশ, হাফসা, আয়েশা এবং জুয়াইরিয়া (রা) তাঁকে দেখতে আসেন। দেখা শোনার পর সকলে যখন চলে যান তখন রাসূল আয়েশা (রা)-কে একা পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'আয়েশা, তাকে কেমন দেখলে? তিনি বললেন, সেতো ইয়াহুদী নারী। বললেন, এমন কথা বলবে না। সে তো মুসলমান হয়েছে। এখন ইসলামে সে উত্তম।'

স্বভাব-প্রকৃতি : সফিয়্যা (রা) ছিলেন ধীরস্থির মেজাজের চমৎকার একজন মহিলা। জনৈক দাসী অভিযোগ করলেন, তাঁর মধ্যে এখনও ইয়াহুদীদের গন্ধ পাওয়া যায়। কারণ সে এখনো শনিবারকে ভালবাসে। এছাড়া ইয়াহুদীদের সাথে এখনও তাঁর সম্পর্ক আছে। ওমর (রা) যখন অন্য লোকের মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করতে চান, তখন তিনি বলেন, 'শনিবারের পরিবর্তে আল্লাহ যখন শুক্রবার দিয়েছেন তখন আর শনিবারকে ভালোবাসার কোন প্রয়োজন নেই।' ইয়াহুদীদের সাথে সম্পর্কের ব্যাপারে বলেন, 'ইয়াহুদীদের সঙ্গে তো আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক। আত্মীয়তার প্রতি আমাকে লক্ষ্য রাখতে হয়।' অতঃপর দাসীকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন- কে তোমাকে এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেছে? সে বলল, শয়তান। এটা শুনে সফিয়্যা (রা) চুপ থাকেন এবং দাসীকে মুক্ত করে দেন।

আল্লামা ইবনে আবদুল বার সফিয়্যা (রা)-এর স্বভাব প্রকৃতি সম্বন্ধে লিখেছেন, 'সফিয়্যা ছিলেন বুদ্ধিমতী, মর্যাদাশীলা এবং ধৈর্যের অধিকারিণী।'

আল্লামা ইবনে কাসীর লিখেছেন, 'রাসূল -এর স্ত্রীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমতি।' রাসূল সফিয়্যাকে খুব ভালোবাসতেন এবং তাঁর সন্তুষ্টি অসন্তুষ্টির খোঁজ-খবর রাখতেন।

সফিয়্যা-যয়নব-আয়েশার সাময়িক দ্বন্দ্ব : একবার সফরকালীন সময়ে সফিয়্যার উটটি অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ সময়ে যয়নব (রা)-এর সাথে একটি অতিরিক্ত উট ছিল। রাসূল তাই যয়নবকে বললেন, যয়নব! তোমার

অতিরিক্ত উটটি সফিয়্যার সাহায্যের জন্য দাও। যয়নব বললেন, 'এ ইয়াহুদীর মেয়েকে আমি উট দিব না।' এ কথায় রাসূল খুবই রাগ করলেন এবং একাধারে দুই মাস যয়নবের (রা)-এর সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখেন। পরবর্তীতে আয়েশা (রা)-এর মধ্যস্থতায়-এর পরিসমাপ্তি ঘটে।

অন্য একদিন রাসূল গৃহে ফিরে দেখলেন সফিয়্যা কাঁদছেন। কারণ জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেন, 'আয়েশা এবং যয়নব বলেছেন, আমরা রাসূলুল্লাহর স্ত্রী এবং বংশ গৌরবের দিক থেকে এক রক্তধারার অধিকারিণী। সুতরাং আমরাই শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার। রাসূল বললেন, 'তুমি কেন বললে না, আমি আল্লাহ্ নবী হারুনের বংশধর ও মূসার ভ্রাতুষ্পুত্রী এবং রাসূল আমার স্বামী। অতএব তোমরা কোন দিক থেকে আমার অপেক্ষা শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী হতে পারো?'

উদারতা : দয়া দক্ষিণার ক্ষেত্রেও তাঁর উদার হাত ছিল। তিনি যখন প্রথম মদীনায় আসেন ও রাসূল এর অন্তপুরে প্রবেশ করেন তখন তাঁর সর্বাঙ্গে বহু মূল্যবান স্বর্ণালঙ্কার ছিল। তিনি সেসব অলঙ্কার নবী নন্দিনী ফাতিমা ও অন্যান্য উম্মাহাতুল মু'মিনীনদের মধ্যে ভাগ-বণ্টন করে দেন।

ওসমান (রা) ৩৫ হিজরীতে বিদ্রোহীদের দ্বারা অবরুদ্ধ হন। বিদ্রোহীরা প্রয়োজনীয় রসদপত্র এমন কি পানি সরবরাহ পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়। এমতাবস্থায় সফিয়্যা (রা) ঘর থেকে বের হয়ে পড়েন এবং কিছু রসদপত্রসহ ওসমান (রা)-এর গৃহের উদ্দেশ্যে খচ্চরে চেপে বসেন। কিন্তু পথিমধ্যে বিদ্রোহীরা তাঁর খচ্চরটিকে আক্রমণ করে বসলে তিনি বলেন তোমরা আমাকে এভাবে অপমান করো না। আমি যাচ্ছি।' এরপর তিনি গৃহে ফিরে আসেন এবং হাসান (রা)-কে দিয়ে দ্রব্য সামগ্রী পৌঁছে দেন। পরে যে ক'দিন ওসমান (রা) অবরুদ্ধ ছিলেন হাসান (রা)-কে দিয়েই প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র পাঠিয়ে দিতেন।

এখান থেকে পরিষ্কার হয় সফিয়্যা (রা) কত বড় দায়িত্ববোধ সম্পন্ন মহিলা ছিলেন। তিনি অসম্ভব সুন্দর রান্না করতে জানতেন। এমন কি এ ক্ষেত্রে আয়েশাও (রা) তাঁর সমকক্ষ ছিলেন না।

সফিয়‍্যা (রা) লেখাপড়া জানা মহিলা ছিলেন। তিনি প্রায়ই তাঁর ইয়াহুদী আত্মীয়-স্বজনের কাছে ইসলামের সুমহান আদর্শ তুলে ধরে চিঠি লিখতেন। আর এ দাওয়াতী কাজের ফলে অনেকেই ইসলাম কবুল করেন।

তিনি ইসলামী জ্ঞানের ক্ষেত্রে একজন অসাধারণ মানুষ ছিলেন। এ জন্য অনেকে তাঁর কাছ থেকে মাসয়ালা-মাসায়েল জানতে চাইতেন ও জেনে নিতেন। ছহীরা বিনতে হায়দার হজ্জব্রত পালন করার পর সফিয়্যা (রা)-এর সাথে দেখা করতে এসে দেখেন যে, কুফার একদল মহিলা মাসআলা জিজ্ঞেস করার জন্য তাঁর কাছে উপস্থিত হয়েছেন আর তিনি সুন্দরভাবে সকলের জিজ্ঞাসার জবাব দিচ্ছেন।

তিনি মাত্র কয়েকটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। যয়নুল আবেদীন ইসহাক ইবনে আবদুল্লাহ, মুসলিম ইবনে সাফওয়ান, কিনানা এবং ইয়াযিদ ইবনে মাআতাব প্রমুখগণ তাঁর নিকট থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।

ওফাত: ৬০ বছর বয়সে হিজরী ৫০ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁকে জান্নাতুল বাকীতে সমাহিত করা হয়। তাঁর অসিয়ত অনুযায়ী মৃত্যুকালে রেখে যাওয়া সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ তার ভাগিনাকে দেয়া হয়। বাকি সম্পত্তি গরীব মিসকীনদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। জানা যায় মৃত্যুকালে তিনি নগদ এক লক্ষ দিরহাম রেখে যান।

📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর স্ত্রীগণ যেমন ছিলেন > 📄 উম্মুল মু'মিনীন মায়মূনা (রা)

📄 উম্মুল মু'মিনীন মায়মূনা (রা)


রাসূল ও মায়মুনার এই বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আব্বাস ও খালিদ বিন ওয়ালিদ ইসলাম কবুল করেননি। মূলত এই বিয়ের ফলেই এ দু'জন বিশাল ব্যক্তিত্ব ইসলাম কবুল করেন এবং ইসলামের শক্তি বৃদ্ধি করেন। আসলে এই বিয়ের প্রভাব ছিল সুদূর প্রসারী।

নাম ও পরিচয়: পূর্বে তাঁর নাম ছিল বাররা। উম্মাহাতুল মু'মিনীনদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর নাম রাখা হয় মায়মূনা। তাঁর পিতার নাম হারেস এবং মাতার নাম হিন্দ বিনতে আউফ।

বংশনামা: তাঁর বংশ তালিকা হল, বাররা বিনতে হারেস ইবনে হাজন ইবনে বুযাইর ইবনে হাযাম ইবনে রোতবা ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে হেলাল ইবনে আমের ইবনে সা'আসা'আ ইবনে মু'আবিয়া ইবনে বকর ইবনে হাওয়াযেন ইবনে মনসুর ইবনে ইকরামা ইবনে খলিফা ইবনে কায়েস ইবনে আয়লান ইবনে মুদার। আর তাঁর মায়ের দিক দিয়ে বংশ তালিকা হল, বাররা বিনতে হিন্দ বিনতে আউফ ইবনে যাহাইর ইবনে হারেস ইবনে হামাতা ইবনে জারাশ।

মায়মূনা ছিলেন কুরাইশ বংশের হাওয়াযিন গোত্রের হারেসের কন্যা; যিনি সা'আসা'আ নামক এলাকায় বসবাস করতেন। অপরদিকে তিনি ছিলেন রাসূল -এর চাচা আব্বাস (রা)-এর শালিকা এবং বিশ্বখ্যাত সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদের খালা। অন্যদিকে তিনি উম্মুল ফযল লুবাবাতুস সুগরার বোন ছিলেন।

প্রথম বিবাহ: মাসউদ বিন আমর বিন উমায়ের সাকাফীর সঙ্গে তাঁর প্রথম বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু দাম্পত্য জীবনে বনিবনা না হওয়াতে মাসউদ মায়মূনাকে তালাক দেন।

দ্বিতীয় বিবাহ: পরে আবূ রহম ইবনে আবদুল্লাহর সাথে তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে হয়। এ আবূ রহম সপ্তম হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। ফলে মায়মুনা সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করতে থাকেন। এমতাবস্থায় তাঁর দুলাভাই আব্বাস (রা) উদ্যোগী হয়ে রাসূল এর নিকট বিয়ের প্রস্তাব পেশ করেন। ইসলামের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে রাসূল ৫১ বছর বয়স্কা বৃদ্ধা মায়মুনাকে বিয়ে করতে রাজি হন।

রাসূল এর সাথে বিবাহ: সপ্তম হিজরী সালের জিলক্বদ মাসে হুদায়বিয়ার সন্ধি অনুসারে রাসূল ওমরাতুল কাজা পালন করার উদ্দেশ্যে মক্কা রওয়ানা হন। এ সময় জাফর ইবনে আবূ তালিবকে মায়মুনার কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে পাঠানো হয়। তিনি আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবকে উকিল নিযুক্ত করেন। রাসূল ওমরার উদ্দেশ্যে যে ইহরাম বাধেন, সেই অবস্থায় এ বিয়ে সম্পন্ন হয়। আব্বাস (রা) এ বিয়ে পড়ান। ওমরা পালন শেষে মদীনা ফেরার পথে 'সরফ' নামক স্থানে এ বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। এ বিয়ের মোহরানা ধার্য করা হয় ৫০০ দিরহাম। কেউ কেউ বলেন মায়মুনা ছিলেন রাসূল এর সর্বশেষ স্ত্রী। তাদের মতে রায়হানা ও মারিয়া কিবতিয়া দাসী ছিলেন স্ত্রী নয়। তবে ঘটনাচক্রে মনে হয় তারাও স্ত্রী ছিলেন। তারা রাসূলস্ত্রী ছিলেন এটাই অধিক যুক্তিযুক্ত। এখানে তাদেরকে স্ত্রী হিসেবেই গ্রহণ করা হল।

বিয়ের ফলাফল: রাসূল ও মায়মুনার এ বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আব্বাস ও খালিদ বিন ওয়ালিদ ইসলাম কবুল করেননি। মূলত এ বিয়ের ফলেই এ দু'জন বিশাল ব্যক্তিত্ব ইসলাম কবুল করেন এবং ইসলামের শক্তি বৃদ্ধি করেন। আসলে এ বিয়ের প্রভাব ছিল সুদূর প্রসারী। এ প্রসঙ্গে স্যার সৈয়দ আমীর আলী বলেন, 'মায়মুনাকে মুহাম্মদ মক্কায় বিয়ে করেছিলেন। তিনি ছিলেন তাঁর আত্মীয় ও পঞ্চাশের ঊর্ধ্বে ছিল তাঁর বয়স। এ বিয়ে আত্মীয়তার অবলম্বন হিসেবেই শুধু কাজ করেনি; অধিকন্তু এ ইসলামের জন্য লাভ করেছিল দু'জন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব ইবনে আব্বাস এবং ওহুদের দুর্ভাগ্যজনক যুদ্ধে কুরাইশের অশ্বারোহী দলের সেনাপতি ও পরবর্তীকালে গ্রীক বিজেতা খালিদ বিন ওয়ালিদ।'

অনেকের ধারণা রাসূল মায়মুনাকে বিয়ে না করলে খালিদ বিন ওয়ালিদ কোনোদিন হয়তো ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করতেন না। সুতরাং একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, এ বিয়ে ইসলামের ও মুসলমানদের জন্য কল্যাণ বয়ে এনেছিল।

চরিত্র মাহাত্ম্য: মায়মূনা অত্যন্ত পরহেযগার একজন মহিলা ছিলেন। তিনি আল্লাহ্র ভয়ে সর্বদা কম্পিত থাকতেন এবং কান্নাকাটি করতেন। তিনি ছোটখাট আদেশ নিষেধকে সমান গুরুত্ব দিতেন। একবার এক মহিলা অসুস্থ অবস্থায় মানত করল যে, 'সুস্থ হলে বায়তুল মুকাদ্দাস গিয়ে সালাত পড়বে। আল্লাহ তা'আলা তাকে রোগ মুক্ত করলে মানত পুরা করার উদ্দেশ্যে বায়তুল মুকাদ্দাস গমনের জন্য মায়মুনার নিকট বিদায় নিতে আসে। মায়মুনা (রা) তাকে বুঝিয়ে বলেন যে, 'অন্যান্য মসজিদে সালাত আদায়ের চেয়ে মসজিদে নববীতে সালাত আদায়ের সওয়াব হাজার গুণ বেশি। তুমি এখানে থেকেই মসজিদে নববীতে সালাত আদায় কর।'

তাঁর সম্পর্কে আয়েশা (রা) বলেন, 'মায়মূনা ছিলেন আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহকে ভয়কারিণী এবং আত্মীয়তার সম্পর্কের প্রতি সবচেয়ে বেশি যত্নবান মহিলা।'

একবার তাঁর এক আত্মীয় বেড়াতে আসেন। কিন্তু তার মুখ দিয়ে মদের গন্ধ আসছিল। তাই মায়মুনা (রা) ক্ষেপে গিয়ে বললেন, 'ভবিষ্যতে আর কখনো আমার কাছে আসবে না।'

হাদীস শিক্ষা ও সম্প্রসারণে তাঁর অবদান মায়মূনা (রা) রাসূল -এর ইন্তেকালের পরও দীর্ঘদিন জীবিত ছিলেন। মহানবী -এর অনেক হাদীসই উন্মুল মু'মিনীনদের মাধ্যমে পরবর্তীদের কাছে সম্প্রসারিত হয়েছে। মায়মুনা (রা)-এর অবদান এ ক্ষেত্রে মোটেই নগণ্য নয়। রাসূলুল্লাহ হতে তিনি হাদীস শিক্ষা লাভ করেছেন এবং তা বর্ণনাও করেছেন। ইবনুজ জাওযী (র) বলেন: মায়মুনা (রা) থেকে ৭৬টি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্যে সহীহাইন তথা সহীহ বুখারী ও মুসলিমে ১৩টি হাদীস সংকলিত হয়েছে। ইমাম বুখারী ও মুসলিম যৌথভাবে ৭টি, ইমাম বুখারী এককভাবে ১টি এবং ইমাম মুসলিম (র) এককভাবে ৫টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। আমাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী তাঁর থেকে বর্ণিত হাদীস পুনরুক্তিসহ বুখারীতে ২১টি, মুসলিমে ১৮টি, তিরমিযীতে ৪টি, আবু দাউদে ১৫টি, নাসাঈতে ২৬টি এবং ইবনে মাজায় ১১টি সংকলিত হয়েছে। তাঁর থেকে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আবদুল্লাহ ইবনে শাদ্দাদ, আবদুর রহমান ইবনে সায়েব, ইয়াযিদ ইবনে আছম প্রমুখ সাহাবীগণ হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাঁর থেকে বর্ণিত হাদীসগুলো দ্বীন ও দুনিয়ার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্বলিত।

নি্নে তাঁর থেকে বর্ণিত কিছু হাদীস উল্লেখ করা হলো -

١. عَنْ مَيْمُونَةَ (رض) أَنَّ النَّبِيِّ ﷺ أَكَلَ عِنْدَنَا كَتِفًا ثُمَّ صَلَّى وَ لَمْ يَتَوَضَّا .
১. মায়মূনা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী তাঁর নিকট (একদা) বকরীর কাঁধের মাংশ খেলেন, অত:পর সালাত পড়লেন, কিন্তু অযু করলেন না।

٢. عَنْ مَيْمُونَةَ (رض) أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ سُئِلَ عَنْ فَارَةٍ سَقَطَتْ فِي سَمَنٍ ؟ فَقَالَ الْقُوهَا وَمَا حَوْلَهَا وَكُلُوا سَمَنَكُمْ .
২. মায়মূনা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল ঘি বা মাখনে ইঁদুর পতিত হওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হয়ে বললেন, ইঁদুর ও তার পার্শ্ববর্তী ঘিটুকু ফেলে দিয়ে তোমরা তোমাদের ঘি খেতে পার।

٣. عَنْ مَيْمُونَةَ (رض) قَالَتْ : كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَنْضَجِعُ مَعِي وَأَنَا حَائِضِ وَبَيْنِي وَبَيِّنَهُ ثَوْبٌ .
৩. মায়ামূনা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ আমার ঋতুস্রাব অবস্থায় আমার সাথে শয়ন করতেন। তাঁর ও আমার মাঝে কাপড়ের ব্যবধান থাকতো।

٤. عَنْ مَيْمُونَةَ (رض) قَالَتْ : أَدْنَيْتُ لِرَسُولِ اللَّهِ ﷺ غُسْلَهُ مِنَ الْجَنَابَةِ، فَغَسَلَ كَفَّيْهِ مَرَّتَيْنِ أَوْ ثَلَاثًا ، ثُمَّ أَدْخَلَ فِي الْإِنَاءِ ثُمَّ أَفْرَغَ بِهِ عَلَى فَرْجِهِ وَغَسَلَهُ بِشِمَالِهِ، ثُمَّ ضَرَبَ بِشِمَالِهِ الْأَرْضِ فَدَلَكَهَا دَلَكًا ، ثُمَّ تَوَضَّا وُضُوءَهُ لِلصَّلوة، ثُمَّ افرَغَ عَلَى رَأْسِهِ ثَلَاثَ حَفَنَاتِ مِلًا كَفَّيْهِ، ثُمَّ غَسَلَ سَائِرَ جَسَدِهِ، ثُمَّ تَنَحَى عَنْ مَقَامِهِ ذَلَكَ فَغَسَلَ رِجْلَيْهِ، ثُمَّ أَتَيْتُهُ بِالْمِنْدِيلِ فَرَدَّه .

৪. মায়মুনা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ এর জানাবতের গোসল নিকট থেকে লক্ষ্য করেছি। তিনি প্রথমে দু'হাতের কব্জি দু'তিনবার ধৌত করেন। অত:পর হাত পাত্রে দিয়ে লজ্জাস্থানে পানি দেন এবং বাম হাত দিয়ে তা ভালভাবে পরিষ্কার করেন। অত:পর সালাতের ন্যায় অযূ করেন। এরপর তিন কোষ পানি মাথায় দিলেন, অতঃপর সমস্ত শরীর ধৌত করলেন। এরপর ঐ স্থান থেকে সরে এসে পা ধৌত করেন। অতঃপর আমি রুমাল নিয়ে আসি তবে তিনি তা গ্রহণ করেননি।

٥. عَنْ مَيْمُونَةَ (رض) قَالَتْ : كَانَ النَّبِيُّ ﷺ إِذَا سَجَدَ لَوْ شَاءَتْ بَهِيمَةٌ أَنْ تَمُرَّ بَيْنَ يَدَيْهِ لَمَرَّتْ .
৫. মায়মুনা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী যখন সিজদা দিতেন, কোন বকরীর বাচ্চা তাঁর দু'হাতের পাশ দিয়ে অতিক্রম করতে চাইলে করতে পারতো।

٦. عَنْ مَيْمُونَةَ بِنْتِ الْحَارِثِ (رض) أَنَّهَا أَعْتَقَتْ وَلِيْدَةً فِي زَمَانِ رَسُولِ اللهِ ﷺ ، فَذَكَرَ ذَلِكَ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ : لَوْ أَعْطَيْتِهَا إِخْوَالَكِ كَانَ أَعْظَمُ لِأَجْرِكِ .
৬. মায়মূনা বিনত আল-হারিস (রা) রাসূলের যামানায় একজন ক্রীতদাসীকে আযাদ করে মুক্ত করে দেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ এর নিকট এ কথা বর্ণনা করলে তিনি বললেন, তুমি যদি ঐ অর্থ তোমার ভাই ইবনুল হারিসকে দিতে তবে অধিক সাওয়াব পেতে।

٧. عَنْ مَيْمُونَةَ (رض) قَالَتْ : أَهْدِي لِمَوْلَاةٍ لَنَا شَاةٌ مِّنَ الصَّدَقَةِ، فَمَاتَ، فَمَرَّ بِهَا النَّبِيُّ ﷺ قَالَ : أَلَا بَعْتُمْ إِهَابَهَا أَيْ جُلُودَهَا ، فَاسْتَمْتَعْتُمْ بِهِ ؟ فَقَالُوا : يَا رَسُولَ اللَّهِ ﷺ إِنَّهَا مَيْتَةٌ قَالَ : إِنَّمَا حَرَامٌ أَكْلَهَا .

৭. মায়মূনা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমাদের জনৈক দাসীকে একটি বকরী উপহার দেয়া হলো। বকরীটি মরে গেল। রাসূল মরা বকরীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, বললেন: তোমরা কি এর চামড়া পরিশোধন (দাবাগত) করে তা ব্যবহার করবে না? তাঁরা বললেন, হে রাসূল এটা তো মৃত। নবী বললেন, এর গোশত খাওয়া হারাম, চামড়া ব্যবহার করা নয়।

তাঁর বর্ণিত অনেক হাদীস থেকে তাঁর ফিকহী সূক্ষ্মতার পরিচয় মেলে। উদাহরণস্বরূপ একটি হাদীস উল্লেখ করা হলো: একবার ইবনে আব্বাস (রা) মলিন মুখে বসে আছেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "বৎস! তোমার কি হয়েছে? বললেন, উম্মু আম্মার (তাঁর স্ত্রী) আমার চুলে চিরুনী করে দিত, অথচ সে আজ-কাল মাসিক স্রাবে ভুগছে। তিনি বললেন, কী চমৎকার! আমার ঐ রকম দিনে নবী আমার কোলে মাথা মুবারক রেখে শুইতেন, কুরআন শরীফ পড়তেন, আমি ঐ অবস্থায় মসজিদে বিছানা (চাটাই) রেখে আসতাম। বৎস! হাতেও কি এসব হয় কখনও?

ওফাত: রাসূল এর পদাঙ্ক অনুসরণে সতত তৎপর, পরোপকারী, দানশীলা, গোলাম আযাদকারিণী মায়মুনা (রা) হিজরী ৬১ সালে 'সরফ' নামক স্থানে ইন্তেকাল করেন। উল্লেখ্য যে, এ 'সরফে' তাঁর বিয়ে হয়েছিল। এটা তাঁর জীবন ইতিহাসের এক স্মরণীয় ঘটনা। ওফাতের সময় তিনি আয়েশা ও উম্মু সালামা (রা)-কে ডেকে এনে বলেন, সাধারণত সতীনদের মধ্যে যা হয়ে থাকে মাঝে মধ্যে আমাদের মধ্যেও সে রকম হয়ত হয়ে যেত, আমি এ ব্যাপারে লজ্জিত। আপনারা আমাকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আয়েশা (রা) বলেন, আমি তাকে ক্ষমা করে তার জন্য মাগফিরাতের দোয়া করি। এতে তিনি সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, তুমি আমাকে খুশী করেছ আল্লাহ তোমায় খুশী করুন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস তাঁর জানাযার সালাত পড়েছিলেন এবং তিনি লাশ কবরে নামিয়েছিলেন। লাশ বহনের সময় আবদুল্লাহ বলেছিলেন, 'সাবধান! এ উম্মুল মু'মিনীনের লাশ। বেয়াদবী করো না, এমন কি তোমরা নড়াচড়াও করো না। খুব যত্ন সহকারে বহন করবে।'

📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর স্ত্রীগণ যেমন ছিলেন > 📄 উম্মুল মু'মিনীন রায়হানা (রা)

📄 উম্মুল মু'মিনীন রায়হানা (রা)


তুমি আল্লাহ এবং রাসূলকে গ্রহণ করলে আমি তোমাকে আমার জন্য উপযুক্ত মনে করি। 'রায়হানা বিনতে শামউন রাসূল-এর এই প্রস্তাব আনন্দে গ্রহণ করেন।

নাম ও পরিচয়: তাঁর নাম রায়হানা। পিতার নাম শামউন। তিনি ছিলেন সুপ্রসিদ্ধ ইয়াহুদী বনু নাযীর গোত্রের মেয়ে। বংশ তালিকা হল- রায়হানা বিনতে শামউন ইবনে যায়েদ, অন্য মতে রায়হানা বিনতে যায়েদ ইবনে আমর ইবনে খানাফা ইবনে শামউন ইবনে যায়েদ।

প্রথম বিবাহ: তাঁর প্রথম বিয়ে হয় বনু কুরাইজা গোত্রের হাকামের সাথে। কিছুদিন পর হাকামের মৃত্যু হয়। ৬ষ্ঠ হিজরী সালে যখন মুসলমানরা বনু নাযীর ও বনু কুরায়জা গোত্রের সব কিছু দখল করে নেয় তখন রায়হানাকে যুদ্ধ বন্দী হিসেবে নিয়ে আসা হয়। এরপর কিছুদিন তাকে কায়েসের কন্যা উম্মু মুনফিরের কাছে রাখা হয়।

বিয়ে করতে রাসূল-এর ইচ্ছা প্রকাশ রাসূল বিদ্রোহী ইয়াহুদী গোত্রগুলোর সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনের জন্য সমগ্র আরবে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য রায়হানাকে আশ্রয় দিতে ও বিয়ে করতে মনস্থ করেন এবং তাঁকে বলেন, 'তুমি আল্লাহ এবং রাসূলকে গ্রহণ করলে আমি তোমাকে আমার জন্য উপযুক্ত মনে করি। 'রায়হানা বিনতে শামউন রাসূল এর এ প্রস্তাব আনন্দে গ্রহণ করেন। রায়হানা (রা) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে ছিলেন কুরায়জা গোত্রের আল-হাকাম এর স্ত্রী, মুসলমানদের সাথে কুরায়জা গোত্রের সন্ধি চুক্তি ছিল। কিন্তু আহযাব যুদ্ধে কুরায়জা গোত্রে বিশ্বাসঘাতকতা করে মুশরিক কুরাইশদের পক্ষ গ্রহণ করে। ফলে আল্লাহর নির্দেশে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়। দীর্ঘ দিন তাদেরকে অবরোধ করে রাখলে অনন্যোপায় হয়ে তারা আত্মসমর্পণ করে।

অত:পর তাদের পুরুষদেরকে হত্যা করা হয় এবং মহিলা ও শিশুদেরকে বন্দী করা হয়। এ সূত্রে রায়হানা-এর স্বামী আল হাকাম নিহত হয় এবং তিনি বন্দিনী হন। প্রথমত তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দিলে তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন এবং স্বীয় ইয়াহুদী ধর্মে বহাল থাকতে পছন্দ করেন। অতঃপর তাঁকে পৃথক করে উম্মুল মুনযির বিন্ত কায়েস-এর গৃহে রাখা হয়। কিছু দিন পর স্বত:প্রণোদিত হয়ে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।

রায়হানা (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ রাসূলুল্লাহ -এর সাথে তাঁর বিবাহ হওয়ার বর্ণনা নিজেই প্রদান করেয়াছেন, যা ইবন সা'দ স্বীয় গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন। রায়হানা (রা) বলেন, বন্দীদেরকে হত্যার পর রাসূলুল্লাহ আমার নিকট আগমন করেন, অতঃপর আমাকে কাছে বসিয়ে বললেন, তুমি যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে গ্রহণ কর তা হলে রাসূলুল্লাহ নিজের জন্য তোমাকে গ্রহণ করবেন। আমি বললাম, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে গ্রহণ করলাম। আমি ইসলাম গ্রহণ করার পর রাসূলুল্লাহ আমাকে আলাদা করে দেন এবং আমার তাঁর অন্যান্য পত্নীদিগের ন্যায় একটি গৃহেই আমাদের বাসর হয়। তিনি অন্যান্য স্ত্রীর ন্যায় সমভাবে পালা বণ্টন অনুযায়ী আমার গৃহে আগমন করতেন এবং আমার ওপর পর্দার হুকুম আরোপ করেন।

অপর এক বর্ণনা মতে, প্রথমত তাকে ইসলামের দাওয়াত দিলে তিনি অস্বীকার করেন। এতে রাসূলুল্লাহ মনোক্ষুণ্ণ হন। অতঃপর তিনি একদিন সাহাবীদের নিয়ে তিনি বসলেন। তখন পিছন হতে জুতার আওয়াজ শুনে তিনি বললেন, ছালাবা ইবনে শুভা রায়হানা ইসলাম গ্রহণের সুসংবাদ নিয়ে এসেছিল। অতঃপর ঠিকই তিনি এসে রাসূলুল্লাহ-কে রায়হানার ইসলাম গ্রহণের সুসংবাদ দিল।

অপর বর্ণনা মতে, অতঃপর রাসূল-তাকে স্বাধীন করে দেন। অতঃপর তাকে বিবাহ প্রস্তাব দেন এবং হিজাব (পর্দা) মান্য করার কথা বলে। রায়হান তাঁর উত্তরে বলেন, হে রাসূল! বরং আমাকে দাসী হিসেবে আপনার মালিকানা রাখুন। উহাই আপনার জন্য এবং আমার জন্য সহজতর হবে। তখন রাসূল তাকে দাসী হিসেবে রাখার ইচ্ছা পোষণ করেন। তবে যুক্তির কষ্টিপাথরে এ মতটি জোরালো বলে মনে হয় না। কারণ সম্ভ্রান্ত ও স্বাধীন এ মহিলাকে যিনি দৈবক্রমে বন্দী ও দাসী হয়ে গিয়েছেন, আযাদ হওয়ার স্বাধীনতা প্রদান করলে তিনি যে উক্ত কাঙ্খিত প্রস্তাব প্রত্যাখান করে বন্দীদশাকেই স্বেচ্ছায় গ্রহণ করবেন, ইহা এক রকম অসম্ভব।

রায়হানা ছিলেন অপরূপ সুন্দরী এবং অত্যন্ত অমায়িক ব্যবহার ও পূত-পবিত্র চরিত্রের অধিকারিণী। রাসূল তার প্রতি খুবই সন্তুষ্ট ছিলেন। তিনি যা চাইতেন রাসূল তাঁকে তা প্রদান করতেন। ফলে রাসূল তাঁকে মুক্ত করে ৪০০ দিরহাম মোহরানা প্রদান করে বিয়ে করেন।

ওফাত: ইবনে সা'আদের বর্ণনা মতে হিজরী ৬ষ্ঠ সালের মুহররম মাসে এ বিয়ে সম্পন্ন হয়। এ বিয়ের ফলে ইয়াহুদী গোত্রগুলোর সাথে মুসলমানদের সম্পর্কের চমৎকার উন্নতি হয়। উভয়ের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুসম্পর্কও প্রতিষ্ঠিত হয়।

ঐতিহাসিক ইবনে ইসহাকের মতে, রাসূল এর ইন্তেকালের দশ মাস পূর্বে রায়হানা (রা) ইন্তেকাল করেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00