📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর স্ত্রীগণ যেমন ছিলেন > 📄 উম্মুল মু'মিনীন যয়নব বিনতে জাহাশ (রা)

📄 উম্মুল মু'মিনীন যয়নব বিনতে জাহাশ (রা)


দাস প্রথা ও যায়েদ তৎকালীন আরব সমাজে অন্যান্য পণ্য সামগ্রীর সাথে বাজারে মানুষও বেচাকেনা হতো। যাদেরকে বাজারে পণ্য সামগ্রীর মতো বেচাকেনা করা হতো তারা ক্রীতদাসরূপে পরিচিত ছিল। নবুওয়‍্যাতের পূর্বে ও সূচনালগ্নেও এ প্রথা চালু ছিল। পরবর্তীকালে রাসূল খোলাফায়ে রাশেদা, সাহাবাগণ ও পরবর্তীকালের মুসলিম শাসকগণ ধীরে ধীরে এ কু-প্রথার বিলুপ্তি সাধন করেন।

সেই জাহেলী যুগের প্রথা অনুযায়ী খাদীজা (রা)-এর ভাতিজা হাকীম ইবনে খুযাইমা বাজার থেকে যায়েদ ইবনে হারিসা নামের এক দাস বালককে কিনে এনে ফুফুকে উপহার হিসেবে দিলেন। পরবর্তীতে খাদীজা প্রিয় দাস যায়েদকে স্বামী মুহাম্মদ -এর খেদমতের জন্য দিয়ে দিলেন। কিন্তু দয়ার সাগর, সর্বমানবতার মুক্তিদূত, রাহমাতুল্লিল আলামীন তাকে আযাদ (মুক্ত) করে দিলেন। এমনকি আপন পালক পুত্র হিসেবে তাকে গ্রহণ করলেন। রাসূল -এর ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে যায়েদ ইসলাম কবুল করলেন এবং অচিরেই নিজেকে কুরআন হাদীসের জ্ঞানে সমৃদ্ধ করে তুললেন।

যায়েদের সাথে যয়নবের বিয়ে: এ ক্রীতদাস যায়েদ (রা)-এর সাথে রাসূল -এর আপন ফুফাতো বোন অনিন্দ্য সুন্দরী যয়নব বিনতে জাহাশ (রা)-এর বিয়ে দেন। রাসূল -এর উদ্দেশ্য ছিল মানুষের মধ্যে সমতা ফিরিয়ে আনা। সব মুসলমান সমান, সকলে ভাই ভাই, আশরাফ-আতরাফের কোনো বালাই ইসলামে নেই। ইসলামের সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েই তিনি একজন সদ্য আযাদপ্রাপ্ত ক্রীতদাসের সাথে আরবের সর্বশ্রেষ্ঠ বংশ, কুরাইশ বংশের মেয়ে তাও আবার নিজেরই ফুফাতো বোনকে বিয়ে দেন।

কিন্তু নারীসূলভ মানসিকতার কারণে যয়নব (রা) এ বিয়েকে ভালো মনে মেনে নিতে পারেননি। যে কারণে বিয়ের প্রায় এক বছর একত্রে বসবাস করার পরও তাদের মধ্যে সার্বিক অর্থে কোনো ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেনি। ফলে যায়েদ (রা) প্রচণ্ড অশান্তির মধ্যে দিনাতিপাত করছিলেন। আসলে যয়নব (রা) বিয়ের আগেই রাসূল -এর খেদমতে যায়েদ (রা) সম্বন্ধে আরজ করেছিলেন, 'আমি তাঁকে আমার জন্য পছন্দ করি না।' তিনি শুধু রাসূল -এর নির্দেশ মেনে নেয়ার জন্যই এ বিয়েতে রাজি হয়েছিলেন।

শিক্ষা বিষয়ক

۱۷. عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي مُلَيْكَةَ عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ (رضى) أَنَّهَا ذكَرَتْ أَوْ كَلِمَةً غَيْرَهَا قِرَاءَةَ رَسُولِ اللهِ ﷺ بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ - الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ - الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ - مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ - يَقْطَعُ فِرَانَتَهُ آيَةٌ آيَةً .
১৭. আব্দুল্লাহ ইবন আবু মুলায়কা উম্মু সালামা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। উন্মু সালামা (রা) রাসূলুল্লাহ-এর কুরআন পাঠ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে বিসমিল্লাহ্-এর পর সূরা ফাতিহার প্রথম তিনটি আয়াত উল্লেখ করে বললেন: রাসূলুল্লাহ প্রতি আয়াতে থেমে থেমে তিলাওয়াত করতেন। (আবু দাউদ, ২য় খণ্ড, পৃ. ৫৫৬।)

চিকিৎসা বিষয়ক
۱۸. عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ (رضى) أَنَّ النَّبِيُّ ﷺ رَأَى فِي بَيْتِهَا جَارِيَةً فِي وَجْهِهَا سَفَعَةً ، فَقَالَ : اسْتَرْقُوا لَهَا فَإِنَّ بِهَا النَّظْرَةُ .
১৮. উম্মু সালামা (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: নবী তাঁর ঘরে এক মেয়েকে দেখলেন, যার চেহারায় কালো কুচকে দাগ পড়ে গিয়েছে। নবী বললেন: দোয়া পড়ে তাতে ফুঁক দাও। কেননা এতে নজর লেগেছে।

এরূপ অনেক গুরুত্বপূর্ণ হাদীস আমরা তাঁর থেকে লাভ করে থাকি।

উন্মু সালামা (রা) অতিশয় লাজুক প্রকৃতির মহিলা ছিলেন। বিয়ের পর রাসূল যখন উন্মু সালামা (রা)-এর ঘরে আসতেন তখন তিনি লজ্জার কারণে মেয়ে যয়নবকে কোলে করে বসে থাকতেন। এ অবস্থা বেশ কিছু দিন বহাল ছিল। তারপর ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হয়।

উম্মু সালামা (রা) ছিলেন অত্যন্ত আমলদার একজন মহিলা। বিদায় হজ্জের সময় তিনি অসুস্থ ছিলেন। কিন্তু যথার্থ ওজর থাকা সত্ত্বেও যখন তিনি রাসূল-এর সাথে গমন করেন, তখন রাসূল তাওয়াফ সম্পর্কে বললেন, 'উম্মু সালামা, ফজরের সালাত চলাকালে উটের পিঠে সওয়ার হয়ে তুমি তাওয়াফ করবে।'

দাস প্রথা ও যায়েদ : তৎকালীন আরব সমাজে অন্যান্য পণ্য সামগ্রীর সাথে বাজারে মানুষও বেচাকেনা হতো। যাদেরকে বাজারে পণ্য সামগ্রীর মতো বেচাকেনা করা হতো তারা ক্রীতদাসরূপে পরিচিত ছিল। নবুওয়্যাতের পূর্বে ও সূচনালগ্নেও এ প্রথা চালু ছিল। পরবর্তীকালে রাসূল খোলাফায়ে রাশেদা, সাহাবাগণ ও পরবর্তীকালের মুসলিম শাসকগণ ধীরে ধীরে এ কু-প্রথার বিলুপ্তি সাধন করেন।

সেই জাহেলী যুগের প্রথা অনুযায়ী খাদীজা (রা)-এর ভাতিজা হাকীম ইবনে খুযাইমা বাজার থেকে যায়েদ ইবনে হারিসা নামের এক দাস বালককে কিনে এনে ফুফুকে উপহার হিসেবে দিলেন। পরবর্তীতে খাদীজা প্রিয় দাস যায়েদকে স্বামী মুহাম্মদ-এর খেদমতের জন্য দিয়ে দিলেন। কিন্তু দয়ার সাগর, সর্বমানবতার মুক্তিদূত, রাহমাতুল্লিল আলামীন তাকে আযাদ (মুক্ত) করে দিলেন। এমনকি আপন পালক পুত্র হিসেবে তাকে গ্রহণ করলেন। রাসূল -এর ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে যায়েদ ইসলাম কবুল করলেন এবং অচিরেই নিজেকে কুরআন হাদীসের জ্ঞানে সমৃদ্ধ করে তুললেন।

যায়েদের সাথে যয়নবের বিয়ে : এ ক্রীতদাস যায়েদ (রা)-এর সাথে রাসূল-এর আপন ফুফাতো বোন অনিন্দ্য সুন্দরী যয়নব বিনতে জাহাশ (রা)-এর বিয়ে দেন। রাসূল-এর উদ্দেশ্য ছিল মানুষের মধ্যে সমতা ফিরিয়ে আনা। সব মুসলমান সমান, সকলে ভাই ভাই, আশরাফ-আতরাফের কোনো বালাই ইসলামে নেই। ইসলামের সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েই তিনি একজন সদ্য আযাদপ্রাপ্ত ক্রীতদাসের সাথে আরবের সর্বশ্রেষ্ঠ বংশ, কুরাইশ বংশের মেয়ে তাও আবার নিজেরই ফুফাতো বোনকে বিয়ে দেন।

কিন্তু নারীসূলভ মানসিকতার কারণে যয়নব (রা) এ বিয়েকে ভালো মনে মেনে নিতে পারেননি। যে কারণে বিয়ের প্রায় এক বছর একত্রে বসবাস করার পরও তাদের মধ্যে সার্বিক অর্থে কোনো ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেনি। ফলে যায়েদ (রা) প্রচন্ড অশান্তির মধ্যে দিনাতিপাত করছিলেন। আসলে যয়নব (রা) বিয়ের আগেই রাসূল-এর খেদমতে যায়েদ (রা) সম্বন্ধে আরজ করেছিলেন, 'আমি তাঁকে আমার জন্য পছন্দ করি না।' তিনি শুধু রাসূল-এর নির্দেশ মেনে নেয়ার জন্যই এ বিয়েতে রাজি হয়েছিলেন।

যায়েদ-যয়নব দ্বন্দ্ব: কিন্তু যখন দু'জনের মধ্যে মোটেই বনিবনা হচ্ছিল না তখন একদিন যায়েد (রা) এসে রাসূল-কে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! যয়নব আমার কথার ওপর কথা বলে তর্ক করে, আমি তাকে তালাক দিতে চাই।' একথা শুনে রাসূল যায়েদ (রা)-কে আল্লাহর ভয় দেখিয়ে তালাক দেয়া থেকে বিরত থাকতে বললেন। কারণ তালাক দেয়া শরীয়তে জায়েয হলেও অপছন্দনীয়। এমন কি বৈধ কাজসমূহের মধ্যে এ কাজটি নিকৃষ্টতম ও সর্বাধিক ঘৃণিত।

যে কারণে রাসূল তাঁকে প্রশ্ন করলেন, 'তুমি কি তার মধ্যে কোন ত্রুটি দেখতে পেয়েছ?' যায়েদ উত্তর করলেন 'না!' কিন্তু আমি তার সংগে বসবাস করতে পারবো না।' রাসূল তাঁকে আদেশের সুরে বললেন, 'বাড়িতে গিয়ে তোমার স্ত্রীর দেখাশোনা কর, তার সংগে ভালো আচরণ কর এবং আল্লাহকে ভয় কর। কারণ আল্লাহ বলেছেন, 'তোমাদের স্ত্রীদের প্রতি সদাচরণ কর আর আল্লাহকে ভয় কর।' কিন্তু তাদের সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে শেষ পর্যন্ত যায়েদ (রা) রাসূল নিষেধ করার পরও যয়নব (রা)-কে তালাক দিয়ে দেন। এ বিষয়টি সূরা আহযাবে এভাবে বর্ণিত হয়েছে- وَإِذْ تَقُولُ لِلَّذِي أَنْعَمَ اللهُ عَلَيْهِ وَانْعَمْتَ عَلَيْهِ أَمْسِكَ عَلَيْكَ زَوْجَكَ وَاتَّقِ اللهَ .
অর্থ : 'হে নবী! সে সময়ের কথা স্মরণ কর, যখন তুমি সে ব্যক্তিকে বলেছিলেন যে, যার প্রতি আল্লাহ এবং তুমি অনুগ্রহ করেছিলে, তোমার স্ত্রীকে পরিত্যাগ করো না এবং আল্লাহকে ভয় কর।' [সূরা-৩৩ আহযাব: আয়াত-৩৭]

নিরীহ যয়নব: যায়েদ (রা) যখন যয়নব (রা)-কে তালাক দিলেন তখন জনগণের মধ্যে জল্পনা-কল্পনা চলতে লাগল, ক্রীতদাসের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে কে-ই বা বিয়ে করবে। সত্যি কথা বলতে কি, তালাকপ্রাপ্তা হওয়ার পর যয়নব (রা) হয়ে গেলেন অবজ্ঞা ও ঘৃণার পাত্রী! এ অবস্থা থেকে যয়নব (রা)-কে রেহাই দিতে আল্লাহ রাসূল এর সাথে তাঁকে বিয়ে দেয়ার মনস্থ করলেন।

তাই যয়নব (রা) তালাকপ্রাপ্তা হওয়ার পর ইদ্দত পুরা হলে রাসূলে করীম তাঁকে বিয়ে করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন। কিন্তু জাহেলী প্রথা সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ যায়েদ (রা) ছিলেন রাসূল -এর পালক পুত্র। তৎকালীন আরবের লোকজন পালক পুত্রকে আপন পুত্রের মতই মনে করত। যায়েদ (রা) ঐ সময়ে যায়েদ ইবনে মুহাম্মদ নামেই পরিচিত ছিলেন। ফলে রাসূল অপবাদের আশংকা করছিলেন। তাছাড়া মুনাফিকদের তর্জন গর্জনও ছিল।

কুপ্রথার মূলৎপাটনে আয়াত নাযিল : যা হোক, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন চাচ্ছিলেন সকল প্রকার কুসংস্কারের মূলোৎপাটন করে নির্ভেজাল একটি ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা করার জন্য রাসূল কে দুনিয়াতে প্রেরণ করেন। তাই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সবকিছু নিরসনকল্পে ঘোষণা করলেন-
مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّنْ رِّجَالِكُمْ وَلَكِن رَّسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّنَ ، وَكَانَ اللهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا .
অর্থ : 'তোমাদের পুরুষদের মধ্যে মুহাম্মদ কারো পিতা নন বরং তিনি আল্লাহ্র রাসূল এবং সর্বশেষ নবী। [সূরা-৩৩ আহযাব : আয়াত-৪০]

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও ঘোষণা করেন-
وَتُخْفِي فِي نَفْسِكَ مَا اللَّهُ مُبْدِيْهِ وَتَخْشَى النَّاسَ ، وَاللَّهُ أَحَقُّ أَنْ تَخْشَهُ .
'তুমি অন্তরে তা গোপন করছিলে, যা আল্লাহ প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন, তুমি মানুষকে ভয় করছ, অথচ আল্লাহই তো বেশি ভয় পাওয়ার যোগ্য।' [৩৩-আহযাব : ৩৭]

বিয়ের প্রস্তাব যায়েদ কর্তৃক : রাসূল নিশ্চিন্ত হলেন। এরপর তিনি যায়েদকেই পাঠালেন বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যয়নব (রা)-এর কাছে। তিনি যয়নব (রা)-এর গৃহে গিয়ে বললেন, 'আল্লাহ্র রাসূল তোমাকে বিয়ে করতে চান।' তিনি বললেন, 'এটা খুব ভালো কথা। তবে ইস্তেখারা করে সিদ্ধান্ত নেব।' তিনি ইস্তেখারায় বসে গেলেন। ইতোমধ্যেই আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল ও যয়নব (রা)-এর বিয়ের ব্যাপারে আয়াত নাযিল হলো-
فَلَمَّا قَضَى زَيْدٌ مِنْهَا وَطَرًا زَوَّجْنُكَهَا لِكَيْ لَا يَكُونَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ حَرَجٌ فِي أَزْوَاجِ أَدْعِيَاتِهِمْ إِذَا قَضَوْا مِنْهُنَّ وَطَرًا ، وَكَانَ أَمْرُ اللَّهِ مَفْعُولاً .
অর্থ: 'অতঃপর যায়েদ যখন তার সাথে স্বীয় প্রয়োজন সমাপ্ত করল তখন আমি তাঁকে তোমার নিকট বিয়ে দিলাম। যাতে প্রয়োজন পুরো করার পর মুখ ডাকা পুত্রের স্ত্রীদের ব্যাপারে মু'মিনদের ওপর কোনো দোষারোপ না চলে। আল্লাহ্র ইচ্ছে তো পূরণ হবেই।' [সূরা-৩৩ আহযাব: আয়াত-৩৭]

সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে, 'তখন আমি তাঁকে তোমার নিকট বিয়ে দিলাম।' এমন কথা নাযিল হওয়ার পর বিয়ের কাজ সম্পন্ন করা হল। সময়টা ছিল ৫ম হিজরীর জিলক্বদ মাস। এ জন্যেই যয়নব (রা) গর্ব করে বলতেন, 'আমার বিয়ে স্বয়ং আল্লাহ দিয়েছেন।'

বিয়ের অনুষ্ঠান: এ বিয়েতে বেশ আনন্দ করা হয়। বৌভাত অনুষ্ঠানে আনসার ও মুহাজিরদের প্রায় তিনশ জনকে দাওয়াত করা হয়। খাওয়ার মেনু ছিল গোশত-রুটি। একেক বারে দশজন করে লোক খেতে বসছিলেন। কিন্তু শেষ দলের লোকজন খাওয়া শেষ হওয়ার পরও বসেছিলেন। তারা নানা গল্পে মেতে উঠলেন। ফলে রাত ক্রমেই গভীর হতে লাগল।

পর্দার আয়াত: রাসূল লজ্জার কারণে মেহমানদেরকে উঠতে বলতে পারছিলেন না, অথচ খুব অস্বস্তি অনুভব করছিলেন। ঠিক এ সময়ে আল্লাহ্র পক্ষ থেকে পর্দার আয়াত নাযিল হয়। ইরশাদ হচ্ছে-
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لا تَدْخُلُوا بُيُوتَ النَّبِيِّ إِلَّا أَنْ يُؤْذَنَ لَكُمْ إِلى طَعَامٍ غَيْرَ نَظِرِينَ إِنَّهُ ، وَلَكِنْ إِذَا دُعِيْتُمْ فَادْخُلُوا فَإِذَا طَعِمْتُمْ فَانْتَشِرُوا وَلاَ مُسْتَأْنِسِينَ لِحَدِيثٍ ، إِنَّ ذَلِكُمْ كَانَ يُؤْذِي النَّبِي فَيَسْتَحْيِ مِنْكُمْ ، وَاللَّهُ لَا يَسْتَحْيِ مِنَ الْحَقِّ ، هُنَّ مَتَاعًا فَسْتَلُوهُنَّ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ . وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ
অর্থ : 'হে ঈমানদার লোকেরা! তোমাদেরকে অনুমতি দেয়া না হলে তোমরা নবী গৃহে প্রবেশ করবে না। অবশ্য দাওয়াত পেলে যাবে, তবে ডাকার আগে গিয়ে অনর্থক বসে থাকবে না। বরং ডাকবার পরে যাবে, খাওয়ার পরে চলে আসবে। বসে গল্প-গুজবে রত হবে না। নিশ্চয় এটা নবীর জন্য কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদেরকে বলতে সংকোচ বোধ করেন, কিন্তু আল্লাহ সত্য কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন না। তোমরা নবীর স্ত্রীদের নিকট কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে।' [সূরা-৩৩ আহযাব: আয়াত-৫৩]

এ আয়াত নাযিল হওয়ার পর রাসূল দরজায় পর্দা ঝুলিয়ে দেন। ফলে লোকদের ভেতরে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়।

রাসূল ও যয়নব (রা)-এর বিয়ের ফলে আরবের দীর্ঘদিনের প্রচলিত একটি ভ্রান্ত ধারণার অবসান ঘটে, তা হল-পালক পুত্র আদৌ আপন পুত্র হতে পারে না। ফলে তার স্ত্রীকে বিয়ে করাও দোষণীয় নয়। ইসলাম পরিষ্কারভাবে ১৪ জন নারীকে বিয়ে করা নিষিদ্ধ করেছে। বাকি সকলকে বিয়ে করা জায়েয। এ ১৪ জনের মধ্যে পালক পুত্রের স্ত্রীর কথা নেই।

বিয়ের বৈশিষ্ট্য: এ বিয়ের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে, তা হল-
১. জাহেলী যুগে পালক পুত্র আসল পুত্রের মর্যাদাসম্পন্ন ছিল। এ প্রথার বিলুপ্তি ঘটানো হয়েছে।
২. লোকদেরকে আদেশ করা হয় যে, কাউকে তার প্রকৃত পিতা ব্যতীত অন্যের সাথে পিতৃ পরিচয়ে সম্পর্ক করা যাবে না।
৩. মানুষের মধ্যে উঁচু-নীচুর কোনো ব্যবধান থাকবে না।
৪. আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে যয়নব (রা)-এর বিয়ে দেন।
৫. যয়নবের সাথে বিয়ের সময় পর্দার আয়াত নাযিল হয় এবং পর্দা প্রথার প্রচলন হয়।
৬. একমাত্র যয়নবের বিয়েতেই জাঁকজমকপূর্ণভাবে অলিমা অনুষ্ঠান করা হয়।

শারীরিক গঠনের দিক দিয়ে জয়নব (রা) ছিলেন ক্ষুদ্রকায় কিন্তু সুন্দরী ছিলেন। সাথে সাথে শোভন শারীরিক গঠন ছিল তাঁর।

চরিত্র মাধুর্য: তিনি অত্যন্ত দ্বীনদার, পরহেযগার, উদার, দয়ার্দ্রচিত্ত, বিনয়ী ও সৎ স্বভাবী ছিলেন। আর তিনি ছিলেন পরিশ্রমী একজন মহিলা। তিনি হস্তশিল্পের

কাজে খুবই পারদর্শী ছিলেন। তিনি নিজ হাতে রোজগার করে সংসার চালাতেন। তাঁর পরহেযগারিতার ব্যাপারে রাসূল -এর সাক্ষ্য পাওয়া যায়। একবার সাহাবীদের মধ্যে রাসূল কিছু মাল বিতরণ করছিলেন। কিন্তু স্ত্রী যয়নবের পরামর্শক্রমে তা কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ রাখেন। এতে ওমর (রা) রাগ করে যয়নবকে ধমক দিলে রাসূল বলেন, 'ওমর! যয়নবকে কিছু বলো না। সে খুবই আল্লাহ ভীরু ও ইবাদতের সময় ক্রন্দনশীলা।'

একবার ওমর (রা) বায়তুল মাল থেকে যয়নবকে এক বছরের খরচ পাঠিয়ে দেন। যয়নব (রা)-এর সামান্য অংশ একটি চাদরে ঢেকে রেখে বাকি সমস্ত কিছু গরীব-মিসকীনদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়ার জন্য পরিচারিকাকে নির্দেশ দেন। এ সময় পরিচারিকা আরজ করলেন, আম্মাজান! গরীবদের মাঝে আমিও একজন। সুতরাং এ মাল থেকে আমিও কিছু পেতে পারি। বিবি যয়নব বললেন, চাদরে ঢাকা যা আছে সবই তোমার, বাকিগুলো তুমি দান করে দাও।'

সব কিছু দান করার পর তিনি মহান রাব্বুল আলামীনের উদ্দেশ্যে আরজ করলেন, 'ইয়া রাব্বাল আলামীন! বায়তুল মাল থেকে দান যেন আর আমাকে গ্রহণ করতে না হয়।' তাঁর এ মুনাজাত কবুল হয় অর্থাৎ ঐ বছরেই তিনি ইন্তেকাল করেন।

স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য: যয়নব বিনতে জাহাশ (রা) ছিলেন আত্মমর্যাদা সম্পন্না মহিলা। মুহাম্মদ ইবনে ওমর বর্ণনা করেন যে, 'একদিন যয়নব (রা) নবীজীকে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনার অন্য স্ত্রীদের মতো নই। তাঁদের মধ্যে একজনও এমন নেই, যার বিয়ে পিতা-ভাই বা বংশের অন্য কারো অভিভাবকত্বে সম্পন্ন হয়নি। একমাত্র আমিই ব্যতিক্রম। আল্লাহ তা'আলা আমাকে আসমান থেকে আপনার স্ত্রী করেছেন।'

আয়েশা (রা) বলেছেন-
مَا رَأَيْتُ امْرَأَةً قَطُّ فِي الدِّينِ مِنْ زَيْنَبَ .
'আমি দ্বীনের ব্যাপারে যয়নব (রা) থেকে উত্তম কোনো মহিলা দেখিনি।' (আল-ইসতীয়াব-২/৭৫৪)

মূসা ইবনে তারেক যয়নব (রা) সম্পর্কে আয়েশা (রা) থেকে উদ্ধৃত করে বলেন, 'দ্বীনদারী, তাকওয়া, সত্যবাদিতা, আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি সহানুভূতি, দানশীলতা এবং আত্মত্যাগে তাঁর চেয়ে উত্তম মহিলা আর কেউ ছিল না।'

আয়েশা (রা) তাঁর সম্বন্ধে আরও বলেছেন, 'আল্লাহ তা'আলা যয়নব বিনতে জাহাশের প্রতি রহম করুন। সত্যি দুনিয়ায় তিনি অনন্য মর্যাদা লাভ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবীর সাথে তাঁকে বিয়ে দিয়েছেন এবং তাঁর প্রসঙ্গে কুরআনের আয়াত নাযিল হয়েছে।

তাঁর সম্বন্ধে উম্মু সালামা (রা) বলেন- كَانَتْ صَالِحَةً صَوَّامَةً قَوَّامَةً .
'তিনি ছিলেন অতি নেককার, অধিক সিয়াম পালনকারী এবং অতি ইবাদতকারী।'

হাদীস শিক্ষা ও সম্প্রসারণে তাঁর অবদান

যয়নব বিনতে জাহাশ (রা) মর্যাদা সম্পন্ন মহিলা সাহাবী ছিলেন। বিভিন্ন কর্মের পাশাপাশি তিনি অল্প পরিমাণে হলেও নবী থেকে হাদীস শিক্ষা ও তা বর্ণনা কার্যেও অবদান রেখেছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ থেকে ১১টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইবনে হাজার (র) আল-ইসাবা গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, যয়নব (রা) নবী থেকে কতিপয় হাদীস বর্ণনা করেছেন। হাদীস পুনরুক্তিসহ বুখারীতে ৫টি, মুসলিমে ৩টি, তিরমিযীতে ২টি, আবু দাউদে ২টি, নাসাঈতে ২টি ও ইবনে মাজায় ২টি সংকলিত হয়েছে।

তাঁর থেকে বর্ণিত হাদীসের কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হলো- . عَنْ زَيْنَبَ بِنْتِ جَحْشٍ (رض) أَنَّهَا قَالَتْ : اسْتَيْقَظَ النَّبِيُّ مِنَ النَّوْمِ مُحْمَرًا وَجْهُهُ يَقُولُ : لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَيْلٌ لِلْعَرَبِ مِنْ شَرِّ قَدْ اقْتَرَبَ فُتِحَ الْيَوْمُ مِنْ رَدْمِ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ مِثْلَ هَذِهِ وَعَقَدَ سُفْيَانُ تِسْعِينَ أَوْ مِائَةٌ - قِيلَ : أَنْهْلِكَ وَفِيْنَا الصَّالِحُونَ : قَالَ : نَعَمْ إِذَا كَثُرَ الْخُبْثُ .
১. যয়নব বিনত জাহাশ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: নবী একদা রক্তিম বর্ণের চেহারা নিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠলেন। তিনি বললেন: আল্লাহ

ছাড়া কোন উপাস্য নেই। আরবদের জন্য বিপদ সমাগত। ইয়া'জুজ-মা'জুজ এর প্রাচীরের ছিদ্র আজ এ পর্যন্ত উন্মুক্ত করে ফেলা হয়েছে (বর্ণনাকারী সুফিয়ান) তাঁর হাতের আঙ্গুল দিয়ে ৯০ বা ১০০-এর আকৃতি করে দেখালেন। রাসূলুল্লাহ -কে জিজ্ঞেস করা হলো- আমরাও কি ধ্বংস হয়ে যাবো অথচ আমাদের মাঝে পুণ্যবানগণ রয়েছে? নবী বললেন: হ্যাঁ, যখন অন্যায় অধিক হবে, তোমরাও ধ্বংস হয়ে যাবে। (মুসলিম, ২য় খণ্ড, পৃ.-৩৮৮)

عَنْ زَيْنَبَ بْنَتِ جَحْشٍ (رض) قَالَتْ : قُلْتُ لِلنَّبِيِّ ﷺ أَنَا مُسْتَحَاضَةٌ فَقَالَ : تَجْلِسُ أَيَّامَ أَقْرَانِهَا ثُمَّ تَغْتَسِلُ وَتُؤَخِّرِ الظَّهْرَ وَ تُعَجِّلِ الْعَصْرَ وَ تَغْتَسِلُ وَتُصَلِّيْهِمَا وَتَوَخِّرِ الْمَغْرِبَ وَتُعَجِّلُ الْعِشَاءَ وَتَغْتَسِلُ وَتُصَلِّيْهِمَا جَمِيعًا، وَتَغْتَسِلُ لِلْفَجْرِ .
২. যয়নব বিনতে জাহাশ (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমি নবী কে বললাম, যে, আমি ইস্তিহাযা (অনিয়ন্ত্রিত স্রাব)-এ আক্রান্ত। নবী বললেন: তুমি তোমার পূর্ব নির্ধারিত হায়েযর দিনগুলোতে অপেক্ষা করবে। অতঃপর গোসল করে যোহরকে বিলম্ব করত আসরকে তাড়াতাড়ি করবে। অতঃপর গোসল করে উভয় ওয়াক্ত সালাত পড়বে। অনুরূপ মাগরিবকে বিলম্ব করে এশা কে এগিয়ে এসে গোসল করে উভয় সালাত একত্রে পড়বে। আর ফজরের জন্যও আলাদা গোসল করবে। (সুনানে নাসাই ১ম খণ্ড পৃ.-৬৫-৬৬)

عَنْ زَيْنَبَ بِنْتِ جَحْشٍ (رضى) أَنَّهُ كَانَ لَهَا مَخْضَبٌ مِّنْ صَفْرٍ - قَالَتْ : كُنْتُ أَرَجِلُ رَأْسَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فِيهِ .
৩. যয়নব বিনত জাহাশ (রা) হতে বর্ণিত। তাঁর হলুদ রঙের একটি চিরুনী ছিল যা দ্বারা তিনি রাসূল এর মাথা চিরুনী করে দিতেন। (সুনান ইবনে মাজাহ)

৪. যয়নব বিনতে আবু সালাম (রা) বলেন: তিনি যয়নব বিনত জাহাশের (রা) নিকট আসলে তিনি বললেন: আমি রাসূলুল্লাহ কে মিম্বারে দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছি তিনি বলেছেন, আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী কোন নারীর জন্য বৈধ নয়

মৃত ব্যক্তির জন্য তিন দিনের অধিক শোক প্রকাশ করা। তবে স্বামীর মৃত্যুতে স্ত্রী চার মাস দশ দিন শোক পালন করতে পারে।

তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনাকারীদের মধ্যে ছিলেন মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবন জাহাশ (তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র), উম্মু হাবীবা বিনতে আবু সুফিয়ান, যয়নব বিনতে আবু সালামা, কুলছুম বিনতুল মুসতালাক (র) প্রমুখ সাহাবী ও তাবেঈদের নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।

ওফাত: হিজরী ২০ সালে ওমর (রা)-এর শাসন আমলে ৫৩ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। ইন্তেকালের সময় শুধু একটি মাত্র গৃহ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। তাঁর স্মৃতি চিহ্ন এ গৃহটি উমাইয়া খলীফা ওয়ালীদ ইবনে আবদুল মালেক ৫০ হাজার দিরহামের বিনিময়ে তাঁর আত্মীয়-স্বজনের নিকট থেকে ক্রয় করে মসজিদে নববীর আন্তর্ভুক্ত করেন।

মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাঁর কাফনের কাপড় তৈরি করে যান। এ ব্যাপারে তিনি ওসিয়ত করেন যে, 'ওমর আমার জন্য কাপড় পাঠাতে পারে। এমন হলে এক প্রস্থ কাপড় ছদকা করে দেবে।'

তাঁর ওসিয়ত অনুযায়ী রাসূলে করীম -এর খাটে করে তাঁকে দাফন করতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ খাটে করে আবু বকর (রা)-এর লাশও বহন করা হয়। তবে আবূ বকর (রা)-এর পর যাদের লাশ বহন করা হয়, তাদের মধ্যে যয়নব (রা) ছিলেন প্রথম মহিলা।

ওমর (রা)-এর নির্দেশে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ, উসামা ইবনে যায়েদ, আবদুল্লাহ ইবনে আবু আহমদ ইবনে জাহাশ এবং মুহাম্মদ ইবনে তালহা তাঁর লাশ কবরে নামান। এঁরা সবাই ছিলেন যয়নব (রা)-এর নিকটাত্মীয়।

আয়েশা (রা) তাঁর মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে বলেছিলেন, 'ভাগ্যবতী অনন্য মহিলা বিদায় নিয়েছেন। এতীমরা হয়ে পড়েছে অস্থির ব্যাকুল। তিনি ছিলেন এতীমদের আশ্রয়স্থল।'

ওমর (রা) তাঁর জানাযার সালাত পড়ান। তাকে জান্নাতুল বাকীতে দাফন করা হয়। আকীল এবং হানাফিয়ার কবরের মধ্যস্থলে তাঁর কবরের অবস্থান। তাঁর দাফন করার দিন প্রচণ্ড গরম পড়েছিল। এজন্য ওমর (ra) সেখানে তাঁবু গাড়েন। জানা যায় কবর খননের জন্য জান্নাতুল বাকীতে এটা ছিল প্রথম তাঁবু।

📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর স্ত্রীগণ যেমন ছিলেন > 📄 উম্মুল মু'মিনীন জুয়াইরিয়া (রা)

📄 উম্মুল মু'মিনীন জুয়াইরিয়া (রা)


ইয়া রাসূলাল্লাহ আমি হারেস ইবনে আবূ দিদারের কন্যা। আমার পিতা গোত্রের সরদার, আমি কি বিপদে পড়েছি তা আপনার অজানা নয়।

নাম ও পরিচয়: নাম জুয়াইরিয়া। পূর্ব নাম ছিল বাররা। রাসূল তাঁর নাম পরিবর্তন করে রাখেন জুয়াইরিয়া। আব্বার নাম হারেস। তিনি বনু মুস্তালিক গোত্রের সর্দার ছিলেন। তাঁর বংশ তালিকা হল, জুয়াইরিয়া বিনতে হারেস ইবনে আবু দিদার ইবনে হাবীব ইবনে আয়েয ইবনে মালেক ইবনে জুয়াইমা ইবনে আসাদ ইবনে আমর ইবনে রাবীয়া ইবনে হারিসা ইবনে আমর মুযিকিয়া।

প্রথম বিবাহ: জুয়াইরিয়া (রা)-এর প্রথম বিয়ে হয়েছিল তাঁর নিজের গোত্রের মুসাফা ইবনে সাফওয়ান মুসতালেফীর সাথে। মুসাফা সম্পর্কে জুয়াইরিয়া (রা)-এর চাচাত ভাই ছিলেন। তিনি ইবনে যিয়ার নামেও পরিচিত ছিলেন।

প্রথম দিকে ইসলামের প্রকাশ্য শত্রু: জুয়াইরিয়া (রা)-এর পিতা এবং স্বামী দু'জনই ইসলামের ঘোর শত্রু ছিলেন। কুরাইশদের প্ররোচনায় অথবা নিজেদের ইচ্ছায় তারা মদীনার ওপর আক্রমণ করার পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলেন। সংবাদটি রাসূল এর কানে পৌঁছলে তিনি এর সত্যতা যাচাই-এর জন্য বুরাইদা ইবনে হাবীব আসলামীকে ঘটনাস্থলে প্রেরণ করেন সরেজমিনে তদন্ত করার জন্য। বুরাইদা ফিরে এসে সংবাদটি সত্য বলে জানালে রাসূল তাঁর বাহিনী নিয়ে রওয়ানা হন এবং মুরাইসী নামক স্থানে অবস্থান নেন। এ মুরাইসী নামক স্থানটি মদীনা থেকে নয় মাইল দূরে। আর সময়টি ছিল হিজরী ৫ম সনের শাবান মাস।

বনী মুস্তালিক যুদ্ধ: ওদিকে মুসলমান বাহিনীর আগমন, অবস্থান গ্রহণ ও রণসজ্জার খবর শুনে মুস্তালিক গোত্র প্রধান জুয়াইরিয়া (রা)-এর পিতা হারেস তাঁর সংগঠিত বাহিনী থেকে সটকে পড়েন। কিন্তু তাঁর বাহিনীর মনোবল ছিল অটুট। হারেসের অধীনস্থ বাহিনী কিছুমাত্র পিছু না হটে মুসলিম বাহিনীর সাথে

মরণপণ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। প্রচণ্ড যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হওয়ার পর দেখা গেল মুসলিম বাহিনী জয়লাভ করেছে। এ যুদ্ধে বনী মুস্তালিক গোত্রের এগার জন নিহত হয়। ও ছয়শত সেনা মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হয়। আর দুই হাজার উট ও পাঁচ হাজার ছাগলও মুসলমানদের দখলে আসে। এ যুদ্ধে জুয়াইরিয়ার স্বামী নিহত হন।

উক্ত যুদ্ধবন্দীদের সাথে বন্দী অবস্থায় গোত্র প্রধান হারেসের কন্যা জুয়াইরিয়াও ছিলেন। তৎকালীন আরবের নিয়ম অনুযায়ী যুদ্ধবন্দীদেরকে গোলাম হিসেবে বিলি বণ্টন করা হতো। সে মুতাবেক জুয়াইরিয়া সাবিত ইবনে কায়েসের ভাগে পড়েন। পূর্বেই বলেছি জুয়াইরিয়া ছিলেন গোত্র প্রধানের কন্যা। যে কারণে তিনি দাসীর জীবন মেনে নিতে পারছিলেন না। সে জন্য তিনি সাবিত (রা)-এর কাছে অর্থের বিনিময়ে মুক্তির আবেদন জানান। সাবিত (রা) ১৯ উকিয়াহ স্বর্ণের বিনিময়ে এ আবেদন মঞ্জুর করেন।

রাসূল জুয়াইরিয়ার পক্ষ থেকে মুক্তিপণ আদায় ও তাকে বিবাহ করা : কিন্তু জুয়াইরিয়ার কাছে এত বিপুল স্বর্ণ বা সম্পদ না থাকার কারণে তিনি এ ব্যাপারে সাহায্য করার জন্য স্বয়ং রাসূল-এর নিকট আবেদন করেন। এ ঘটনাটি আয়েশা (রা) এভাবে বর্ণনা করেছেন, 'রাসূলুল্লাহ বনু মুস্তালিকের যুদ্ধ বন্দীদেরকে বণ্টন করলে জুয়াইরিয়া বিনতে হারেস সাবিত ইবনে কায়েসের ভাগে পড়েন। জুয়াইরিয়া তৎক্ষণাৎ মুক্তিপণ দিয়ে মুক্তি লাভের উদ্যোগ নেন। তিনি ছিলেন খুবই লাবণ্যময়ী মিষ্টি মেয়ে। তাঁকে যে-ই দেখতো সে মুগ্ধ হয়ে যেত। জুয়াইরিয়া মুক্তিলাভের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ এর কাছে সাহায্য কামনা করেন। তিনি রাসূলুল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি হারেস ইবনে আবূ দিদারের কন্যা।

আমার পিতা গোত্রের সরদার, আমি কি বিপদে পড়েছি তা আপনার অজানা নয়। আমি সাবিত ইবনে কায়েসের ভাগে পড়েছি। আমার মুক্তিপণ আদায়ে আপনার সাহায্য কামনা করছি। রাসূলুল্লাহ বললেন, আমি যদি তোমার জন্য আরো ভালো কিছুর ব্যবস্থা করি? তিনি বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! সেটা কি? তিনি বললেন, আমি তোমার পক্ষ থেকে মুক্তিপণ আদায় করে দিয়ে তোমাকে বিয়ে করব। জুয়াইরিয়া বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমি এতে রাজি আছি। তখন রাসূল বললেন, আমি তাই করলাম।

মুসলমানগণ যখন জানতে পারলেন যে, রাসূলুল্লাহ জুয়াইরিয়াকে বিয়ে করেছেন তখন তারা তাদের হাতে বন্দী বনু মুস্তালিকের সব লোককে রাসূলুল্লাহ এর আত্মীয় বিবেচনা করে ফেরত পাঠিয়ে দিলেন। এভাবে বনু মুস্তালিকের ছয়'শ বন্দী শুধু রাসূলুল্লাহ এর সাথে জুয়াইরিয়ার বিয়ে হওয়ার কারণে মুক্তি লাভ করল। সত্যি বলতে কি নিজ গোত্রের জন্য জুয়াইরিয়ার চেয়ে কল্যাণকর প্রমাণিত হয়েছে এমন কোন মহিলার কথা আমার জানা নেই।'

জুয়াইরিয়ার পিতার ইসলাম গ্রহণ: অন্য একটি বর্ণনা এরূপ- ইবনে আসীর (রা) বলেন, 'জুয়াইরিয়ার বাবা যখন জানতে পারলেন যে, তার কন্যা বন্দী হয়ে আছে, তখন তিনি অনেক সম্পদ ও আসবাবপত্র কয়েকটি উটের ওপর বোঝাই করে কন্যার মুক্তির জন্য মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। পথিমধ্যে পছন্দনীয় দু'টি উট 'মাফিক' নামক স্থানে লুকিয়ে রেখে অবশিষ্ট উট ও আসবাব নিয়ে রাসূল এর দরবারে উপস্থিত হয়ে আরজ করলেন, 'আপনি আমার কন্যাকে বন্দী করে এনেছেন। এসব মাল ও আসবাবপত্র নিন, বিনিময়ে আমার কন্যাকে ফিরিয়ে দিন।'

রাসূল বললেন, 'যে দু'টি উট তুমি লুকিয়ে রেখে এসেছ তা কোথায়?' রাসূল এর কথা শুনে হারেস আশ্চর্য হয়ে গেলেন এবং তখনই ইসলাম গ্রহণ করলেন। এরপর যখন জানতে পারলেন যে, তাঁর কন্যা রাসূল এর স্ত্রী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন, তখন তিনি সীমাহীন খুশি হন এবং কন্যার সাথে সাক্ষাৎ করে গৃহে ফিরে যান।

রাজনৈতিক কারণে বিয়ে: মূলত রাসূল এ বিয়েটা করেছিলেন সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে। একটু চোখ-কান খুলে বিয়ের বিষয়টা দেখলেই পরিষ্কার হয় যে, বিয়েটা ছিল রাজনৈতিক দূরদর্শীতার এক মাইলফলক। এ বিয়ের ফলে রাসূল ও মুসলমানগণ কূটনৈতিকভাবে বিজয় লাভ করেন। কারণ বনু মুস্তালিক গোত্রের সকল মানুষ ছিল ইসলাম ও মুসলমানদের চরম শত্রু। তারা কোনো প্রকারেই রাসূল ও মুসলমানদের মেনে নিতে রাজি ছিল না। এমতাবস্থায় রাসূল জুয়াইরিয়াকে বিয়ে করার ফলে বনু মুস্তালিকের সকল যুদ্ধ বন্দী বেকসুর মুক্তি লাভ করে। ফলে হঠাৎ করেই প্রাণের দুশমন বন্ধুতে পরিণত হয়। বনু মুস্তালিক গোত্রের কেউ আর কোনোদিন রাসূল ও মুসলমানদের বিরোধিতা করেনি। এমন কি তারা ধীরে ধীরে সকলেই ইসলামের পতাকাতলে আশ্রয় গ্রহণ করে।

জুয়াইরিয়ার ব্যক্তি সত্ত্বা : জুয়াইরিয়া (রা) ছিলেন অত্যন্ত ব্যক্তিত্বসম্পন্না ও স্বাধীনচেতা মহিলা। যে কারণে তিনি বন্দী জীবন সহ্য করতে পারেননি। তিনি দেখতে ছিলেন সুন্দরী এবং সুস্বাস্থ্যের অধিকারিণী। তাঁর সম্বন্ধে বলতে গিয়ে আয়েশা (রা) বলেন, 'জুয়াইরিয়া দেখতেই শুধু সুন্দরী ছিলেন না, বরং তাঁর অনুপম চেহারায়, চিত্তাকর্ষক এবং মধুর আচরণে এমন এক মাধুর্য নিহিত ছিল, যাতে করে যে কোনো লোক তাঁর সান্নিধ্যে আসত, সে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাশীল, বিমুগ্ধ ও আকৃষ্ট হয়ে যেত। তাঁকে দেখলেই দর্শকের মনে একটা স্থায়ী মমতার চিহ্ন ফুটে উঠতো।'

জুয়াইরিয়া (রা) একজন ইবাদত গুজার মহিলা ছিলেন। জানা যায়, তিনি প্রায় সার্বক্ষণিকভাবেই ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। একদিন রাসূল তাঁর ঘরে প্রবেশ করে দেখলেন জুয়াইরিয়া তাসবীহ পাঠ করছেন। রাসূল বললেন, 'তুমি কি সব সময় এ আমল কর?' তিনি উত্তর দিলেন, 'জি হ্যাঁ।'

একদিন ভোরে জুয়াইরিয়া (রা) মসজিদে বসে দোয়া করছিলেন। এ অবস্থায় রাসূল তাঁকে দেখলেন এবং চলে গেলেন। দুপুরে ফিরে এসে রাসূল তাঁকে সেই অবস্থায় দেখতে পেলেন।

ইবনে সা'আদ বর্ণনা করেন যে, জুমু'আর দিন নবীজী জুয়াইরিয়ার কাছে যান। সেদিন তিনি সিয়াম পালনরত ছিলেন। নবীজী যেহেতু একটা রোযা রাখাকে মাকরূহ মনে করতেন, তাই জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি গতকাল সিয়াম রেখেছিলে?' বললেন, 'না। নবীজী পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, আগামীকাল রাখবে? বললেন, না। নবীজী বললেন, তাহলে সিয়াম ভেঙ্গে ফেল।

রাসূল জুয়াইরিয়াকে খুব ভালোবাসতেন। একবার তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'ঘরে খাবার কিছু আছে কি? জুয়াইরিয়া বললেন, আমার এক দাসী ছদকার কিছু গোশত দিয়েছে, তাই আছে। এ ছাড়া আপাতত অন্য কিছু নেই। রাসূল বললেন, তাই নিয়ে এসো। কারণ, যাকে ছদকা দেয়া হয়েছে, তার কাছে তা পৌঁছেছে।'

হাদীস বর্ণনায় তাঁর অবদান

এ পুণ্যবতী মহিলা রাসূল ﷺ থেকে অল্প কয়েকটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইবনে আব্বাস, ইবনে ওমর, জাবের, আবু আইয়ুব মারাসী, তোফায়েল, মুজাহিদ, কুলছুম ইবনে মুসতালিক, কুরাইব এবং আবদুল্লাহ ইবনে শাদ্দাদ তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।

তিনি ছিলেন অত্যন্ত বুযুর্গ মহিলা সাহাবী। রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে তিনি ৭টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তন্মধ্যে ইমাম বুখারী একটি ও মুসলিম ২টি হাদীস নিজ নিজ গ্রন্থে সংকলন করেছেন।

তাঁর থেকে বর্ণিত হাদীসের কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হলো-

১. عَنْ عُبَيْدِ بْنِ السَّبَاكِ قَالَ : إِنَّ جُوَيْرِيَةَ (رضى) زَوْجِ النَّبِيِّ أَخْبَرَتْهُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ دَخَلَ عَلَيْهَا فَقَالَ : هَلْ مِنْ طَعَامٍ ؟ قَالَتْ : لَا وَ اللَّهِ يَا رَسُولَ اللَّهِ ﷺ وَ مَا عِنْدَنَا طَعَامٌ الا عَظْمُ مِنْ شَاةِ أَتَيْتُهُ مَوْلانِى مِنَ الصَّدَقَةِ فَقَالَ : قَرِّبِيهِ فَقَدْ بَلَغَتْ مَحِلُّهَا .
১. উবাইদা ইবনে সাববাক (রা) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল ﷺ-এর স্ত্রী জুয়াইরিয়া (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ একদা তাঁর কাছে এসে বললেন: তোমার কাছে কোন খাবার আছে কি? তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ! আমার দাসীকে দেয়া সাদকার বকরীর কিছু গোশত ছাড়া আমাদের কাছে আর কিছুই নেই। নবী ﷺ বললেন: তাই নিয়ে এসো, কারণ সাদকা তার নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে গিয়েছে। (মুসলিম)

عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ عَنْ جُوَيْرِيَةَ (رضى) أَنَّ النَّبِيِّ ﷺ خَرَجَ مِنْ عِنْدِهَا بَكِرَةٌ حِينَ صَلَّى الصَّبْحَ وَهِيَ فِي مَسْجِدِهَا ثُمَّ رَجَعَ بعْدَ أَنْ أَضْحَى وَهِيَ جَالِسَةٌ ، قَالَ : مَا زَلْتَ عَلَى الْحَالِ حَتَّى فَارَقْتُكِ عَلَيْهَا ؟ قَالَتْ : نَعَمْ - قَالَ النَّبِيُّ : لَقَدْ قُلْتُ بَعْدَكِ اربع كَلِمَاتٍ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ لَوْ وَزَنَتِ بِمَا قُلْتُ مُنْذُ الْيَوْمَ لَوَزِنْتَهُنَّ : سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ عَدَدَ خَلْقِهِ وَ رِضَى نَفْسِهِ وَ زِنَةَ عَرْشِهِ وَ مِدَادَ كَلِمَاتِهِ .
২. ইবনে আব্বাস (রা) জুয়াইরিয়া (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: নবী করীম একদা খুব ভোরে ফজরের সালাত পড়ে তাঁর নিকট থেকে বের হলেন। আর তিনি তখন তাঁর সিজদার স্থানেই ছিলেন। অত:পর নবী করীম দুপুর বেলায় ফিরে এসে দেখেন তিনি সিজদার স্থানেই বসা। নবী করীম বললেন: তোমাকে যে অবস্থায় রেখে গিয়েছি সে অবস্থায় আছ। তিনি বললেন, হ্যাঁ। নবী করীম বলেছেন: নিম্নের এ চার শব্দের দোয়া টি যদি তুমি তিনবার করে বলতে তা হলে এ যাবৎ তুমি যা বলেছ তার সাথে এটা ওযন করা যেত।
سُبْحَانَ اللهِ وَ بِحَمْدِهِ عَدَدَ خَلْقِهِ وَ رِضَى نَفْسِهِ وَ زِنَةَ عَرْشِهِ وَ مداد كلماته . (মুসলিম)

عَنْ جُوَيْرِيَةَ (رضى) قَالَتْ : قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ مَنْ لَبِسَ نَوْبَ حَرِيْرٍ الْبَسَهُ اللَّهُ قَوْبًا مِّنَ النَّارِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ .
৩. জুয়াইরিয়া (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ বলেছেন, যে ব্যক্তি রেশমী কাপড় পরবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে আগুনের পোশাক পরাবেন। (মুসলিম)

ওফাত: আমীর মু'আবিয়ার শাসনামলে ৬৫ বছর বয়সে জুয়াইরিয়া (রা) ইন্তেকাল করেন। সময়টা ছিল হিজরী ৫০ সালের রবিউল আউয়াল মাস। মদীনার তৎকালীন গর্ভনর মারওয়ান ইবনুল হাকام তাঁর জানাযার সালাত পড়ান। তাঁকে জান্নাতুল বাকীতে সমাহিত করা হয়।

📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর স্ত্রীগণ যেমন ছিলেন > 📄 উম্মুল মু'মিনীন উম্মু হাবীবা (রা)

📄 উম্মুল মু'মিনীন উম্মু হাবীবা (রা)


একদা আবু সুফিয়ান যখন মেয়ের গৃহে প্রবেশ করে বিছানায় বসতে যান তখন উম্মে হাবীবা তা উল্টে দেন। ঘটনার আকস্মিকতায় আবু সুফিয়ান খুব অপমানবোধ করেন এবং বলেন, 'তুমি এ বিছানায় নিজের পিতাকেও বসতে দিবে না?' উম্মে হাবীবা বললেন, 'একজন মুশরিক রাসূল এর বিছানায় বসুক অবশ্যই আমি তা পছন্দ করি না।'

ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ যখন উম্মু হাবীবা (রা)-কে বিয়ে করেন তখন নিম্নের এ আয়াতটি নাযিল হয়- عَسَى اللَّهُ أَنْ يَجْعَلَ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَ الَّذِينَ عَادَيْتُمْ مِنْهُمْ مَوَدَّةً . অর্থ: যারা তোমাদের শত্রু আল্লাহ তাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সম্ভবতঃ বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে দেবেন। (সূরা-৬০ মুমতাহিনা : আয়াত-৭)

নাম ও পরিচয়: তাঁর আসল নাম রামলা। কারো কারো মতে 'হিন্দ'। ডাক নাম উম্মু হাবীবা। পিতার নাম আবু সুফিয়ান। মাতার নাম সুফিয়া বিনতে আবুল আস। তিনি ওসমান (রা)-এর ফুফু ছিলেন। অর্থাৎ ওসমান (রা) ছিলেন উন্মু হাবীবা (রা)-এর আপন ফুফাতো ভাই। উম্মু হাবীবাহ নবুওয়্যাতের ১৭ বছর পূর্বে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন।

বংশ: তাঁর বংশ তালিকা হল, রামলা বিনতে আবু সুফিয়ান সখর ইবনে হারব ইবনে উমাইয়া ইবনে আবদে শামস। পিতা-মাতা উভয়েই কুরাইশ বংশের লোক ছিলেন। পিতা আবু সুফিয়ান তো ছিলেন ইসলামের প্রধান শত্রু এবং বিখ্যাত কুরাইশ নেতা।

প্রথম বিবাহ: তিনি মক্কার শ্রেষ্ঠ সুন্দরীদের অন্যতম ছিলেন। যে কারণে পিতা আবু সুফিয়ান গর্ব করে বলতেন, 'আমার নিকট রয়েছে সারা আরবের শ্রেষ্ঠ

সুন্দরী লাবণ্যময়ী নারী (উম্মু হাবীবা)।' আবু সুফিয়ান তাই অনেক দেখাশোনা, খোঁজ খবরের পর বনু আসাদ গোত্রের সুদর্শন পুরুষ ওবায়দুল্লাহ বিন জাহাশের সাথে উম্মু হাবীবার বিয়ে দেন। ওবায়দুল্লাহ বিন জাহাশ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী ছিলেন। তিনি উম্মুল মু'মিনীন যয়নব বিনতে জাহাশ (রা)-এর ভাই ছিলেন।

ইসলাম গ্রহণ: নবুওয়্যাতের প্রথম যুগেই উম্মু হাবীবাহ ও স্বামী ওবায়দুল্লাহ ইসলাম কবুল করেন। মক্কায় কাফেরদের অত্যাচারে টিকতে না পেরে স্বামী-স্ত্রী উভয়ে হাবশায় হিজরত করেন। এই হাবশাতেই তাঁদের কন্যা হাবীবা জন্মগ্রহণ করেন। এ হাবীবার নামেই তাঁকে উম্মু হাবীবা বলা হয় এবং এ নামেই তিনি পরিচিত হয়ে আছেন।

প্রথম স্বামীর মৃত্যুবরণ: হাবশাতে আসার পর স্বামী ওবায়দুল্লাহর ভেতর ধীরে ধীরে পরিবর্তন দেখা দেয়। ইসলাম গ্রহণের আগে ওবায়দুল্লাহ ছিলেন প্রচণ্ড মদ্যপায়ী। মদ নিষিদ্ধ হলে অন্যান্যদের মত তিনি তা ত্যাগ করেন। কিন্তু হাবশা আসার পর ওবায়দুল্লাহ আবার মদ পান শুরু করেন। উম্মু হাবীবা স্ত্রী হিসেবে তাকে এ পথ থেকে ফেরানোর প্রাণপণ চেষ্টা করেন। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। এক রাতে উম্মু হাবীবা তাঁর স্বামীকে বিভৎস অবস্থায় স্বপ্নে দেখেন।

এরপর তিনি স্বামীকে ভয় দেখিয়ে সাবধান করার চেষ্টা করেন কিন্তু উল্টো ওবায়দুল্লাহ তাঁকে বলেন, 'উম্মু হাবীবা, ধর্মের ব্যাপারে চিন্তা করে বুঝলাম, খ্রিস্টবাদের চেয়ে উত্তম কোনো ধর্ম নেই। আমি ইতোপূর্বে মুসলমান হলেও এখন পুনরায় খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছি।' এরপর উম্মু হাবীবা তাকে তিরস্কার করলেন কিন্তু কিছুই হলো না, সে খ্রিস্টান হয়ে গেল এবং একদিন মাত্রাতিরিক্ত মদ পান করার কারণে মৃত্যুবরণ করে।

নি:স্ব উম্মু হাবীবা: ওবায়দুল্লাহর মৃত্যুর পর থেকে উম্মু হাবীবা সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ হয়ে যান এবং মানবেতর জীবন যাপন করতে থাকেন। এ সংবাদ রাসূল -এর নিকট পৌছলে, ইসলামের জন্য উম্মু হাবীবার ত্যাগের কথা চিন্তা করে তিনি খুবই বিচলিত হন।

রাসূল -এর প্রস্তাব: পরে সব দিক বিবেচনা করে বিয়ের প্রস্তাবসহ আমর ইবনে উমাইয়া যাসিরীকে হাবশার বাদশাহ নাজ্জাশীর কাছে পাঠান। বাদশাহ নাজ্জাশী নিজের দাসী আবরাহার মাধ্যমে এ প্রস্তাব উম্মু হাবীবার নিকট পৌছান।

প্রস্তাব পেয়ে উম্মু হাবীবা এতই খুশি হন যে, তিনি আবরাহাকে দু'টি রূপার চুড়ি, পায়ের দু'টি মল এবং দু'টি রূপার আংটি উপহার দেন। উম্মু হাবীবা নিজের পক্ষ থেকে খালিদ ইবনে সাঈদকে উকিল নিয়োগ করেন।

বিবাহ সম্পন্ন : বাদশাহ নাজ্জাশী সন্ধ্যায় স্থানীয় সকল মুসলমান এবং জাফর ইবনে আবূ তালিবকে ডেকে বিবাহ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেন। বাদশাহর পক্ষ থেকে মোহরানা হিসেবে ৪০০ দেরহাম বা দীনার আদায় করা হয়। উল্লেখ্য যে, এরপর বাদশাহ নাজ্জাশী নিজেই বিয়ে পড়ান। এই বিয়েতে কিছু খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

হিজরী ৬ অথবা ৭ সালে এ বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। বিয়ের সময় উম্মু হাবীবা (রা)-এর বয়স হয়েছিল ৩৬/৩৭ বছর। বিয়ের পর উম্মু হাবীবা জাহাজ যোগে মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। জাহাজ যখন মদীনায় পৌঁছে তখন রাসূল খায়বার অভিযানে ব্যস্ত ছিলেন এবং সেখানে অবস্থান করছিলেন।

বিয়ে করার কারণ : রাসূল উন্মু হাবীবাকে মূলত দু'টো কারণে বিয়ে করেছিলেন।

প্রথমত, স্বামীর মৃত্যু হওয়ার পর বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে উম্মু হাবীবা প্রচণ্ড কষ্টের মধ্যে দিন যাপন করছিলেন। তার কষ্ট ছিল ইসলামের প্রতি মহব্বতের কারণে। তিনি স্বামীর মতোই পুনরায় খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করতে পারতেন কিন্তু তিনি তা করেননি। বরং স্বামীর এ ধরনের প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর এ ত্যাগের পুরস্কার হিসেবে রাসূল তাঁকে বিয়ে করেন।

দ্বিতীয়ত, আবু সুফিয়ান ছিলেন সে কুরাইশ নেতা যিনি আবূ জেহেলের মৃত্যুর পর ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। নবুওয়্যাতের সে প্রথম দিন থেকেই আবু সুফিয়ান রাসূল ও মুসলমানদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন ও জুলুমের বন্যা প্রবাহিত করেছে। বলা যায়, মানুষের পক্ষে যত প্রকার পন্থা অবলম্বন করা সম্ভব আবু সুফিয়ান তার কোনটিই ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে ছাড়েনি।

বিয়ের ফলাফল : ইসলাম ও মুসলমানদের এ জাত শত্রুরই কন্যা ছিলেন উন্মু হাবীবা (রা)। এ জন্য রাসূল রাজনৈতিক কারণে সুদূর প্রসারী চিন্তা-ভাবনা করেই উম্মু হাবীবাকে বিয়ে করেন। ঐতিহাসিক ফলও পাওয়া যায়। আবূ সুফিয়ান ক্রমে নরম হতে থাকেন এবং মক্কা বিজয়ের দিন ইসলাম কবুল করেন।

তাঁর ঈমানের বলিষ্ঠতা : উম্মু হাবীবার চরিত্র মাধুর্যে উম্মু হাবীবা (রা) ছিলেন নেককার ও বলিষ্ঠ ঈমানের অধিকারিণী। তিনি ঈমান ও ইসলামের ব্যাপারে কারো সাথে সমঝোতা করতে বা সামান্য দুর্বলতা দেখাতেও রাজি ছিলেন না। এর প্রমাণ তো আমরা তাঁর স্বামী ওবায়দুল্লাহ যখন পুনরায় খ্রিস্টান হন তখনই পেয়েছি।

অন্যদিকে তাঁর পিতা আবু সুফিয়ান একবার মদীনায় আসেন হুদায়বিয়ার সন্ধির সময়সীমা বাড়ানোর জন্য। তিনি ইচ্ছে পোষণ করছিলেন যে, তাঁর কন্যা উন্মু হাবীবাকে দিয়েই রাসূল-এর কাছে আবেদন পেশ করবেন, যাতে সহজেই তা পাস হয়। এ উদ্দেশ্যে তিনি উম্মু হাবীবার গৃহে পদার্পণ করেন।

একদা আবু সুফিয়ান যখন মেয়ের গৃহে প্রবেশ করে বিছানায় বসতে যান তখন উম্মু হাবীবা তা উল্টে দেন। ঘটনার আকস্মিকতায় আবু সুফিয়ান খুব অপমানবোধ করেন এবং বলেন, 'তুমি এ বিছানায় নিজের পিতাকেও বসতে দিবে না?' উম্মু হাবীবা বললেন, 'একজন মুশরিক রাসূল -এর বিছানায় বসুক অবশ্যই আমি তা পছন্দ করি না।' কন্যার কথা শুনে আবু সুফিয়ান ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, 'তুমি আমার বিরুদ্ধে খুব বেশি বিগড়ে গেছ।'

উম্মু হাবীবা নিজের পিতার সাথে যে রূঢ় আচরণ করেছিলেন তা শুধুমাত্র ঈমানের তাকিদে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে।

তিনি ছোট খাট ব্যাপারেও খুব গুরুত্ব দিতেন এবং অন্যদেরকেও সে ব্যাপারে উৎসাহিত করতেন ও তাকিদ দিতেন। একবার তাঁর ভাগিনা আবু সুফিয়ান ইবনে সাঈদ ছাতু খেয়ে কুলি না করলে তিনি বললেন, 'তোমার কুলি করা উচিৎ ছিল। কারণ, নবীজী বলেছেন, আগুনে পাকানো জিনিস খেলে অযু করতে হয়।' একবার তিনি রাসূল-কে বলতে শুনেছেন যে, প্রতিদিন যে ১২ রাকা'আত করে নফল সালাত পড়লে জান্নাতে তার জন্য ঘর তৈরি করা হবে। এরপর থেকে তিনি আর এ সালাত ছাড়েননি। তিনি নিজেই বলেছেন, অত:পর আমি নিয়মিত বার রাকা'আত সালাত পড়তাম।

তাঁর পিতা আবু সুফিয়ান ইন্তেকাল করলে তিনদিন পর তিনি খোশবু চেয়ে নিয়ে হাতে মুখে মাখেন এবং বলেন, ঈমানদার নারীর জন্য তিনদিনের বেশি শোক করা জায়েয নেই, অবশ্য স্বামী ছাড়া। স্বামীর জন্য স্ত্রীর শোক করার মেয়াদ হচ্ছে চার মাস দশ দিন। নবীজীকে একথা বলতে না শুনলে এ ব্যাপারে আমার কোনো খবরই ছিল না।'

প্রথম স্বামী ওবায়দুল্লাহর ঔরসে তাঁর দু'জন সন্তান আবদুল্লাহ ও হাবীবার জন্ম হয়। যতদূর জানা যায় তার আর কোনো সন্তান হয়নি।

হাদীস শিক্ষা ও সম্প্রসারণে তাঁর অবদান

উম্মুল মু'মিনীন উম্মু হাবীবা (রা) রাসূলুল্লাহ ও যয়নব বিনতে জাহাশ (রা) থেকে হাদীস শিক্ষা লাভ করেন এবং পরে তা বর্ণনা করেন। তাঁর থেকে ৬৫টি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এর মধ্যে দু'টি মুত্তাফাকুন আলাইহি এবং দু'টি ইমাম মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন।

ইবনে উতবা, সালেম ইবনে সেওয়ার হাবীবা, মু'আবিয়া, ওৎবা, আবু সুফিয়ান, আবদুল্লাহ বিন ওৎবা, সালিম বিন সাওয়াব, আবূল জিরাহ, যয়নব বিনতে আবু সালামা, সুফিয়া বিনতে সায়বা, ওরওয়া বিন যুবায়ের, শাহার বিন হাওশাব, আবূ সালেহ আস সামান প্রমুখ তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।

আমাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী তাঁর থেকে বর্ণিত হাদীস পূনরুক্তিসহ সহীহ আল-বুখারীতে ৮টি, সহীহ মুসলিমে ৯টি, জামে' আত তিরমিযীতে ৪টি, সুনান আবু দাউদে ৮টি, নাসাঈতে ৩৪টি এবং ইবনে মাজায় ৮টি সংকলিত হয়েছে।

তাঁর থেকে বর্ণিত হাদীসের কয়েকটি প্রামাণ্য হাদীস গ্রন্থ হতে নিম্নে উল্লেখ করা হলো-

عَنْ أَمْ حَبِيبَةَ بِنْتِ أَبِي سُفْيَانَ (رضى) لَمَّا جَاءَهَا نَعْى .۱ أَبِيهَا دَعَتْ بِطِيبٍ فَمَسَحَتْ ذِرَاعَيْهَا ، وَقَالَتْ : وَمَا لِي بالطَّيبِ مِنْ حَاجَةٍ ، لَوْلا أَنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَقُولُ : لَا يَحِلُّ لِإِمْرَاةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ تَحَدُ عَلَى مَيِّتِ فَوْقَ ثَلاَثٍ إِلا عَلَى زَوْجِ أَرْبَعَةِ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا .
১. উম্মু হাবীবা বিনতে আবু সুফিয়ান (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বললেন: যখন তাঁর পিতার মৃত্যু সংবাদ তাঁর কাছে আসলো, তিনি সুগন্ধি আনতে বললেন।

অতঃপর তা স্বীয় বাজুতে মাখলেন এবং বললেন: আমার কোন সুগন্ধির প্রয়োজন হতো না, যদি না আমি রাসূলুল্লাহকে বলতে শুনতাম, তিনি বলেছেন, আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী কোন নারীর জন্য বৈধ নয় কোন মৃতের জন্য তিন দিনের অধিক শোক প্রকাশ করা। তবে স্বামীর মৃত্যুতে চারমাস দশ দিন শোক প্রকাশ করা যায়। (বুখারী ২য় খণ্ড, পৃ.-৮০৪-৮০৫)

عَنْ أَمْ حَبِيبَةَ (رضى) تَقُولُ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَقَولُ : مَنْ صَلَّى اثْنَى عَشَرَةَ رَكْعَةٌ فِي يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ بَنِي لَهُ بِهِنَّ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ - قَالَتْ أَمْ حَبِيبَةً فَمَا تَرَكْتُهُنَّ مُنْذُ سَمْعَتِهِنَّ مِنْ رَسُولِ اللهِ ﷺ .
২. উম্মু হাবীবা (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি দিবা-রাত্রী বারো রাক'আত সালাত (নফল) পড়বে, জান্নাতে তাঁর জন্য একটি ঘর বানানো হবে। উম্মু হাবীবা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ থেকে এ হাদীস শুনার পর আমি কখনও এ সালাত ত্যাগ করিনি। (মুসলিম ১ম খণ্ড, পৃ.-২৫১)

عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ أَبِي سُفْيَانَ أَنَّهُ سَأَلَ أُخْتَهُ أَمْ حَبِيبَةً (رضی) زَوْجِ النَّبِيِّ ﷺ هَلْ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يُصَلِّي فِي الثَّوْبِ الَّذِي يُجَامِعُهَا فِيْهِ؟ فَقَالَتْ : نَعَمْ إِذَا لَمْ يُرَ فِيْهِ أَذًى .
৩. মু'আবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রা) তাঁর বোন উম্মু হাবীবা (রা) কে জিজ্ঞেস করলেন, যে কাপড় পড়ে নবী কারীম স্ত্রী সহবাস করেন, সেই কাপড় পরেই কি তিনি সালাত পড়তেন? উম্মু হাবীবা (রা) বললেন: হ্যাঁ, যখন ঐ কাপড়ে নাপাকীর কোন চিহ্ন দেখা না যেত। (আবু দাউদ, ১ম খণ্ড, পৃ.-৫৩)

عَنْ صَفِيَّةَ بِنْتِ شَيْبَةَ عَنْ أَمْ حَبِيبَةَ (رضى) زَوْجِ النَّبِيِّ قَالَ : كُلُّ كَلامِ ابْنِ آدَمَ عَلَيْهِ لَا لَهُ إِلَّا أَمْرَ بِهَا بِمَعْرُوفٍ أَوْ نَهى عَنِ الْمُنْكَرِ أَوْ ذِكْرُ اللَّهِ .

৪. সাফিয়্যা বিনতে শায়বা (রা) উম্মু হাবীবা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, নবী বলেছেন: বনু আদমের প্রতিটি কথাই তার বিপক্ষে যাবে তবে সৎকাজে আদেশ, অসৎ কাজে নিষেধ এবং যিকরুল্লাহ বা আল্লাহর স্মরণ ব্যতীত। (মুসলিম)

ه. عَنْ أَمْ حَبِيبَةَ (رضى) أَنَّهَا حَدَّثَتْهُ قَالَتْ : سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَقُولُ : لَوْلا أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّنِي لَأَمَرْتُهُمْ بِالسَّوَاكِ عِنْدَ كُلِّ صَلَاةٍ .
৫. উম্মু হাবীবা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, যদি আমার উম্মাতের জন্য কষ্টকর না হতো তবে আমি তাদেরকে আদেশ দিতাম প্রতি সালাতে মিসওয়াক করার জন্য। (মুসলিম: হাদীস নং-৫৮৯)

ওফাত: আপন ভাই আমীর মু'আবিয়ার শাসন আমলে হিজরী ৪৪ সালে ৭৩ বছর বয়সে উম্মু হাবীবা (রা) ইন্তেকাল করেন। মদীনায় তাঁকে দাফন করা হয়। অন্য এক বর্ণনা থেকে জানা যায়, তাঁকে আলী (রা)-এর গৃহে দাফন করা হয়। এর প্রমাণ হলো জয়নুল আবেদীন (রা) তার গৃহ খননকালে একটি শিলা লিপি পান, তাতে লেখা ছিল, এটা রামলা বিনতে সাখর-এর কবর।

মৃত্যুর আগে তিনি আয়েশাকে (রা) ডেকে বলেন, 'আমার এবং আপনার মধ্যে সতীনের মতো সম্পর্ক ছিল। কোনো ভুলত্রুটি হয়ে থাকলে মাফ করে দেবেন এবং আমার মাগফেরাতের জন্য দোয়া করবেন। আয়েশা দোয়া করলে তিনি পুনরায় বললেন, আপনি আমাকে খুশি করেছেন, আল্লাহ আপনাকে খুশি করুন।'

📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর স্ত্রীগণ যেমন ছিলেন > 📄 উম্মুল মু'মিনীন সফিয়্যা (রা)

📄 উম্মুল মু'মিনীন সফিয়্যা (রা)


খায়বার যুদ্ধ বিজয়ের পর সফিয়্যা (রা) বন্দী হয়ে আসলে এক সময় তাকে রাসূল জিজ্ঞেস করলেন, আমার ব্যাপারে তোমার কোন আগ্রহ আছে কি? তিনি উত্তরে বললেন, শিরকের মধ্যে নিমজ্জিত থাকার সময় আমি এই আশা পোষণ করতাম। সুতরাং ইসলাম গ্রহণের দ্বারা আল্লাহ আমাকে আপনার সাহচর্য লাভের যে সুযোগ দিয়েছেন, সে সুযোগ আমি কীভাবে হারাতে পারি?

নাম ও পরিচয়: তাঁর প্রকৃত নাম যয়নব। প্রসিদ্ধ নাম সফিয়্যা। আরবের প্রথা অনুযায়ী যুদ্ধলব্ধ মাল বণ্টনের সময় যে উৎকৃষ্ট বা উত্তম মাল দলপতির জন্য রাখা হতো তাকে সফিয়্যা বলা হতো। খায়বার যুদ্ধে প্রাপ্ত সকল কিছুর মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলেন যয়নব। শেষ পর্যন্ত এ যয়নবকে রাসূল এর ভাগে দেয়া হয়। এজন্য তাঁর নামকরণ করা হয় সফিয়া এবং এ নামেই তিনি প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল হুওয়াই ইবনে আখতাব। তিনি ছিলেন হারুন ইবনে ইমরান (আ.)-এর অধস্তন পুরুষ।

বংশ: তাঁর বংশ তালিকা হল- যয়নব বিনতে হুওয়াই ইবনে আখতাব ইবনে সাঈদ ইবনে আমের ইবনে ওবাইদ ইবনে কা'আব ইবনুল খাযরাজ ইবনে আবূ হাবীব ইবনে নুছাইর ইবনে নাহহাম ইবনে মাইখুম। তাঁর মায়ের নাম ছিল বাররা বিনতে সামওয়ান। এ সামওয়ান ইয়াহুদীদের সর্বশ্রেষ্ঠ গোত্র বনু কুরাইযার নেতা ছিলেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে সফিয়‍্যা (রা)-এর পিতৃকুল নযীর ও মাতৃকুল বনু কুরাইযার ইয়াহুদীদের এক বংশে গিয়ে মিলিত হয়েছে।

পারিবারিক অবস্থান: সফিয়্যা (রা)-এর আব্বা ও দাদা উভয়েই ছিলেন তৎকালীন ইয়াহুদী জাতির সম্মানিত ও মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ। যে কারণে বনী ইসরাঈলের সমস্ত আরবীয় গোত্রের মধ্যে তাদেরকে আলাদা রকম সম্মান করা হতো। বিশেষ করে তাঁর বাবা হুওয়াই ইবনে আখতাবকে মর্যাদার শীর্ষে স্থান দেওয়া হয়েছিল। ইয়াহুদীরা বিনা বাক্যে তাঁর নেতৃত্ব মেনে চলত। তাঁর নানা সামওয়ান মানমর্যাদা শৌর্য-বীর্য এবং বীরত্বের দিক দিয়ে সারা জাযিরাতুল আরবে ছিলেন সম্মানিত। অর্থাৎ সফিয়া (রা) ছিলেন সবদিক দিয়েই বিশিষ্টতার অধিকারিণী।

প্রথম বিবাহ: সফিয়্যা (রা)-এর প্রথম বিয়ে হয় আরবের প্রখ্যাত কবি ও সর্দার সালাম ইবনে মিশকাম আল কারাবীর সাথে। প্রথম দিকে তাদের দাম্পত্য জীবন সুখের হলেও পরবর্তীতে মনোমালিন্য ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। ফলে সফিয়্যা (রা) পিতৃগৃহে ফিরে আসেন।

দ্বিতীয় বিবাহ: এরপর কেনানা ইবনে আবুল আফীক-এর সাথে তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে হয়। আবুল আফীক ছিলেন খায়বারের নামকরা দুর্গ আল-কামুদ-এর সর্দার। এ সময় তাঁর বয়স ছিল সতের বছর।

পিতা ও চাচার মৃত্যু: তাঁর পিতা ও চাচা আবু ইয়াসির রাসূল এর চরম শত্রু ছিল। তারা মদীনা থেকে বিতাড়িত হয়ে চতুর্থ হিজরীতে খায়বারে গিয়ে কিনানা ইবনে আল রাবীর সাথে বসবাস করতে থাকেন। এখানে বসেই হুওয়াই ইবনে আখতাব মুসলমানদের ক্ষতি করার সর্বপ্রকার চেষ্টা করতে থাকে।

পরবর্তীতে রাসূল এর নেতৃত্বে খায়বার অভিযানকালে মুসলমানদের হাতে আলকামূস দুর্গের পতন ঘটে। যুদ্ধে ইয়াহুদীদের চূড়ান্ত পরাজয় ঘটে। বহু নেতৃস্থানীয় ইয়াহুদী মৃত্যুবরণ করে। কেনানা ইবনে আবুল আফীক দুর্গের অভ্যন্তরে নিহত হন। এমন কি তাঁর পিতা হুওয়াই ইবনে আখতাবও নিহত হন। সফিয়্যা অন্যান্য পরিবার-পরিজনদের সাথে বন্দী হন।

বন্দীনী সফিয়্যা: সফিয়্যা বন্দীনী হিসেবে মুসলিম শিবিরে আসার পর আরবের নিয়ম অনুযায়ী সাহাবী দাহইয়া কলবীর আবেদন মোতাবেক তাঁকে তাঁর ভাগে দিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু সফিয়্যা (রা) তাঁর মর্যাদার দিক বিবেচনা করে সাহাবী দাহইয়া কালবীর ঘরে যেতে অস্বীকার করেন। এ সময়ে কতিপয় সাহাবী আরজ করেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! সফিয়্যা বনু কুরাইযা এবং বনু নজীরের মহিলা। এ নেতৃস্থানীয়া মহিলাকে দাহইয়ার হস্তে বাঁদী হিসেবে সমর্পণ করলেন? তাঁর মর্যাদা তো অনেক উঁচুতে আসীন। তিনি আমাদের নেতার জন্যই যথোপযুক্ত।'

রাসূল সাহাবীদের আবেদন কবুল করলেন এবং দাহইয়া কালবীকে অন্য একজন পরিচারিকা দান করলেন। সফিয়্যাকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করে দিলেন।

রাসূলের নিকট আশ্রয় চাওয়া : সফিয়্যা কোথাও যেতে রাজি হলেন না। তিনি রাসূল এর কাছে বিনীত আরজ করলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! খায়বার যুদ্ধে আমার পিতা এবং স্বামী নিহত হয়েছেন। আমার নিকটতম আত্মীয়-স্বজনরাও যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে। আর আমি ইয়াহুদী ধর্ম ত্যাগ করে পবিত্র ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছি। বর্তমানে আমার ইয়াহূদী আত্মীয়-স্বজন যারা বেঁচে আছে তাদের কেউই আমাকে আশ্রয় দেবে না এবং গ্রহণও করবে না। এ আশ্রয়হীন অবস্থায় আমি কোথায় যাব? কে আমার এ অসহায় অবস্থার সহায়ক হবে? কে আমাকে স্থান দিবে? ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আর কোথাও যাবো না, আমি আপনার অন্তঃপুরে একজন দাসী হয়ে থাকতে চাই। আপনি আমাকে আশ্রয় প্রদান করুন।'

রাসূলের সাথে বিবাহের আকাঙ্ক্ষা : খায়বার যুদ্ধ বিজয়ের পর সফিয়্যা (রা) বন্দী হয়ে আসলে এক সময় তাকে রাসূল জিজ্ঞেস করলেন, আমার ব্যাপারে তোমার কোন আগ্রহ আছে কি? তিনি উত্তরে বললেন, শিরকের মধ্যে নিমজ্জিত থাকার সময় আমি এ আশা পোষণ করতাম। সুতরাং ইসলাম গ্রহণের দ্বারা আল্লাহ আমাকে আপনার সাহচর্য লাভের যে সুযোগ দিয়েছেন, সে সুযোগ আমি কীভাবে হারাতে পারি? অন্য বর্ণনায় এসেছে, সফিয়্যা (রা) যখন রাসূলের নিকট আসলেন, তখন তিনি বললেন, তোমার পিতা ইহুদী ছিলেন, যে আমার প্রতি শত্রুতা পোষণ করত। অবশেষে আল্লাহ তাকে নিহত করলেন। তখন সফিয়্যা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তাঁর কিতাবে বলেছেন-
وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى
অর্থ: 'একজনের (পাপের) বোঝা অন্যের ওপর চাপানো হবে না'। (আন'আম ১৬৪; ইসরা ১৫; ফাতির ১৮; যুমার ৭; নাজমা ৩৮)।

তখন রাসূল বললেন, তুমি যা পছন্দ কর, বেছে নেও। যদি তুমি ইসলামকে পছন্দ কর, তাহলে আমি তোমাকে আমার জন্য রেখে দিব। আর যদি তুমি ইহুদী ধর্ম মতকে পছন্দ কর, তাহলে আমি তোমাকে মুক্ত করে দেব, যাতে তুমি তোমার কওমের সাথে মিলিত হতে পার। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল!

আমি ইসলামকে ভালবেসেছি, আপনি আমাকে দাওয়াত দেয়ার পূর্বেই আমি আপনাকে সত্য বলে স্বীকার করেছি, এমনকি আমি আপনার সওয়ারীতে চড়েছি। ইহুদী ধর্মের প্রতি আমার কোন আকর্ষণ বা অনুরাগ নেই। আর সেখানে আমার পিতা, ভাই, কেউ নেই। আপনি কুফরী বা ইসলাম যে কোনটি গ্রহণের এখতিয়ার দিয়েছেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই আমার নিকট অধিক প্রিয় স্বাধীন হওয়ার চেয়ে এবং আমার কওমের নিকট ফিরে যাওয়ার চেয়ে। তখন তাকে রাসূলুল্লাহ নিজের জন্য রেখে দিলেন।

সফিয়্যাকে বিবাহের কারণ : বিভিন্ন কারণে রাসূলুল্লাহ সফিয়্যাকে বিবাহ করেন। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নিম্নরূপ-
১. আত্মীয়-স্বজন, জ্ঞাতি-গোষ্ঠী নিহত এবং নিজেও স্বীয় ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ হওয়ায় সফিয়্যা শোক বিহ্বল ছিলেন। তার শোকাহত হৃদয়কে শান্ত করা ও তাকে দ্বীন ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য রাসূলুল্লাহ বিবাহ করেন।
২. এ বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে ইসলাম ও মুসলমানদের সাথে বনু নাযীর ও বনু কুরায়জার বিরোধিতা ও শত্রুতা হ্রাসকরণ এবং প্রশমনের অভিপ্রায়ে রাসূলুল্লাহ সফিয়্যাকে বিবাহ করেন। যা পরবর্তীতে বাস্তবায়িত হয়েছিল।
৩. সফিয়‍্যার যথাযথ সম্মান বজায় রাখা এবং এ নজীরবিহীন ইহসানের প্রতি লক্ষ্য করে ইহুদী সম্প্রদায় যাতে আল্লাহদ্রোহিতা থেকে ফিরে এসে ইসলাম কবুল করতে অনুপ্রাণিত হয়, এজন্য রাসূলুল্লাহ সফিয়্যাকে বিবাহ করেন।

রাসূলের সাথে বিয়ে : সবদিক বিবেচনা করে রাসূল সফিয়্যা (রা)-এর আবেদন মঞ্জুর করলেন এবং খায়বার থেকে মদীনায় ফেরার পথে 'যাবাহা' নামক স্থানে তাকে বিবাহ করেন। এটা ছিল হিজরী সপ্তম সালের মহররম মাসের শেষ সপ্তাহ। এ বিয়েতে অলিমা অনুষ্ঠান অর্থাৎ খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এ ব্যাপারে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক স্যার সৈয়দ আমীর আলী লিখেছেন, 'ইয়াহুদী রমণী সফিয়‍্যাকে খায়বারের বিরুদ্ধে অভিযানের সময় মুসলমানরা বন্দী হিসেবে এনেছিলেন। তাকেও মুহাম্মদ উদারতার সঙ্গে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং তাঁর সনির্বন্ধ অনুরোধের জন্য তাঁকে স্ত্রীত্বে বরণ করেছিলেন।

এ বিয়ের ফলে আশ্রয়হীনা সফিয়্যা (রা) সুন্দর ও সর্বোত্তম আশ্রয় লাভ করেন। সাথে সাথে এ বিয়ের ফলে ইয়াহুদী সম্প্রদায়ের ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষোভের কিছুটা প্রশমন হয়। এমনকি ধীরে ধীরে ইয়াহুদীদের অনেকেই ইসলাম কবুল করেন।

সফিয়্যা (রা) সুন্দরী ও লাবণ্যময়ী ছিলেন। যে কারণে মদীনায় আসলে তাঁকে দেখার জন্য মহিলাদের ভীড় পড়ে যায়। এমনকি যয়নব বিনতে জাহাশ, হাফসা, আয়েশা এবং জুয়াইরিয়া (রা) তাঁকে দেখতে আসেন। দেখা শোনার পর সকলে যখন চলে যান তখন রাসূল আয়েশা (রা)-কে একা পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'আয়েশা, তাকে কেমন দেখলে? তিনি বললেন, সেতো ইয়াহুদী নারী। বললেন, এমন কথা বলবে না। সে তো মুসলমান হয়েছে। এখন ইসলামে সে উত্তম।'

স্বভাব-প্রকৃতি : সফিয়্যা (রা) ছিলেন ধীরস্থির মেজাজের চমৎকার একজন মহিলা। জনৈক দাসী অভিযোগ করলেন, তাঁর মধ্যে এখনও ইয়াহুদীদের গন্ধ পাওয়া যায়। কারণ সে এখনো শনিবারকে ভালবাসে। এছাড়া ইয়াহুদীদের সাথে এখনও তাঁর সম্পর্ক আছে। ওমর (রা) যখন অন্য লোকের মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করতে চান, তখন তিনি বলেন, 'শনিবারের পরিবর্তে আল্লাহ যখন শুক্রবার দিয়েছেন তখন আর শনিবারকে ভালোবাসার কোন প্রয়োজন নেই।' ইয়াহুদীদের সাথে সম্পর্কের ব্যাপারে বলেন, 'ইয়াহুদীদের সঙ্গে তো আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক। আত্মীয়তার প্রতি আমাকে লক্ষ্য রাখতে হয়।' অতঃপর দাসীকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন- কে তোমাকে এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেছে? সে বলল, শয়তান। এটা শুনে সফিয়্যা (রা) চুপ থাকেন এবং দাসীকে মুক্ত করে দেন।

আল্লামা ইবনে আবদুল বার সফিয়্যা (রা)-এর স্বভাব প্রকৃতি সম্বন্ধে লিখেছেন, 'সফিয়্যা ছিলেন বুদ্ধিমতী, মর্যাদাশীলা এবং ধৈর্যের অধিকারিণী।'

আল্লামা ইবনে কাসীর লিখেছেন, 'রাসূল -এর স্ত্রীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমতি।' রাসূল সফিয়্যাকে খুব ভালোবাসতেন এবং তাঁর সন্তুষ্টি অসন্তুষ্টির খোঁজ-খবর রাখতেন।

সফিয়্যা-যয়নব-আয়েশার সাময়িক দ্বন্দ্ব : একবার সফরকালীন সময়ে সফিয়্যার উটটি অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ সময়ে যয়নব (রা)-এর সাথে একটি অতিরিক্ত উট ছিল। রাসূল তাই যয়নবকে বললেন, যয়নব! তোমার

অতিরিক্ত উটটি সফিয়্যার সাহায্যের জন্য দাও। যয়নব বললেন, 'এ ইয়াহুদীর মেয়েকে আমি উট দিব না।' এ কথায় রাসূল খুবই রাগ করলেন এবং একাধারে দুই মাস যয়নবের (রা)-এর সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখেন। পরবর্তীতে আয়েশা (রা)-এর মধ্যস্থতায়-এর পরিসমাপ্তি ঘটে।

অন্য একদিন রাসূল গৃহে ফিরে দেখলেন সফিয়্যা কাঁদছেন। কারণ জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেন, 'আয়েশা এবং যয়নব বলেছেন, আমরা রাসূলুল্লাহর স্ত্রী এবং বংশ গৌরবের দিক থেকে এক রক্তধারার অধিকারিণী। সুতরাং আমরাই শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার। রাসূল বললেন, 'তুমি কেন বললে না, আমি আল্লাহ্ নবী হারুনের বংশধর ও মূসার ভ্রাতুষ্পুত্রী এবং রাসূল আমার স্বামী। অতএব তোমরা কোন দিক থেকে আমার অপেক্ষা শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী হতে পারো?'

উদারতা : দয়া দক্ষিণার ক্ষেত্রেও তাঁর উদার হাত ছিল। তিনি যখন প্রথম মদীনায় আসেন ও রাসূল এর অন্তপুরে প্রবেশ করেন তখন তাঁর সর্বাঙ্গে বহু মূল্যবান স্বর্ণালঙ্কার ছিল। তিনি সেসব অলঙ্কার নবী নন্দিনী ফাতিমা ও অন্যান্য উম্মাহাতুল মু'মিনীনদের মধ্যে ভাগ-বণ্টন করে দেন।

ওসমান (রা) ৩৫ হিজরীতে বিদ্রোহীদের দ্বারা অবরুদ্ধ হন। বিদ্রোহীরা প্রয়োজনীয় রসদপত্র এমন কি পানি সরবরাহ পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়। এমতাবস্থায় সফিয়্যা (রা) ঘর থেকে বের হয়ে পড়েন এবং কিছু রসদপত্রসহ ওসমান (রা)-এর গৃহের উদ্দেশ্যে খচ্চরে চেপে বসেন। কিন্তু পথিমধ্যে বিদ্রোহীরা তাঁর খচ্চরটিকে আক্রমণ করে বসলে তিনি বলেন তোমরা আমাকে এভাবে অপমান করো না। আমি যাচ্ছি।' এরপর তিনি গৃহে ফিরে আসেন এবং হাসান (রা)-কে দিয়ে দ্রব্য সামগ্রী পৌঁছে দেন। পরে যে ক'দিন ওসমান (রা) অবরুদ্ধ ছিলেন হাসান (রা)-কে দিয়েই প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র পাঠিয়ে দিতেন।

এখান থেকে পরিষ্কার হয় সফিয়্যা (রা) কত বড় দায়িত্ববোধ সম্পন্ন মহিলা ছিলেন। তিনি অসম্ভব সুন্দর রান্না করতে জানতেন। এমন কি এ ক্ষেত্রে আয়েশাও (রা) তাঁর সমকক্ষ ছিলেন না।

সফিয়‍্যা (রা) লেখাপড়া জানা মহিলা ছিলেন। তিনি প্রায়ই তাঁর ইয়াহুদী আত্মীয়-স্বজনের কাছে ইসলামের সুমহান আদর্শ তুলে ধরে চিঠি লিখতেন। আর এ দাওয়াতী কাজের ফলে অনেকেই ইসলাম কবুল করেন।

তিনি ইসলামী জ্ঞানের ক্ষেত্রে একজন অসাধারণ মানুষ ছিলেন। এ জন্য অনেকে তাঁর কাছ থেকে মাসয়ালা-মাসায়েল জানতে চাইতেন ও জেনে নিতেন। ছহীরা বিনতে হায়দার হজ্জব্রত পালন করার পর সফিয়্যা (রা)-এর সাথে দেখা করতে এসে দেখেন যে, কুফার একদল মহিলা মাসআলা জিজ্ঞেস করার জন্য তাঁর কাছে উপস্থিত হয়েছেন আর তিনি সুন্দরভাবে সকলের জিজ্ঞাসার জবাব দিচ্ছেন।

তিনি মাত্র কয়েকটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। যয়নুল আবেদীন ইসহাক ইবনে আবদুল্লাহ, মুসলিম ইবনে সাফওয়ান, কিনানা এবং ইয়াযিদ ইবনে মাআতাব প্রমুখগণ তাঁর নিকট থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।

ওফাত: ৬০ বছর বয়সে হিজরী ৫০ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁকে জান্নাতুল বাকীতে সমাহিত করা হয়। তাঁর অসিয়ত অনুযায়ী মৃত্যুকালে রেখে যাওয়া সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ তার ভাগিনাকে দেয়া হয়। বাকি সম্পত্তি গরীব মিসকীনদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। জানা যায় মৃত্যুকালে তিনি নগদ এক লক্ষ দিরহাম রেখে যান।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00