📄 উম্মুল মু'মিনীন যয়নব বিনতে খুযাইমা (রা)
আসলে ওহুদ যুদ্ধে ৭০ জন সাহাবী শহীদ হওয়ার ফলে ইসলামের সেই প্রথম যুগেই বিধবাদের একটি লম্বা কাফেলা দাঁড়িয়ে যায়। যাঁরা ছিলেন একান্তই অসহায়। কারণ মুসলমান হওয়ার কারণে তাঁদের আত্মীয়-স্বজনরা তাঁদেরকে একটু আশ্রয় পর্যন্ত ও দিতে রাজি ছিল না। এমতাবস্থায় রাসূল (স) এ অসহায় মুসলমান বিধবা মহিলাদেরকে বিয়ে করার জন্য সাহাবীদেরকে উৎসাহ দিতে থাকেন। নিজেও এ ব্যাপারে এগিয়ে আসেন।
নাম ও বংশ : নাম তাঁর যয়নব। ডাকনাম أُمَّ الْمَسَاكِينِ বা গরীব দুঃখীর মা। পিতার নাম খুজাইমা ইবনুল হারেস এবং মাতার নাম মানদাব বিনতে আউফ। তাঁর নসবনামা এ রকম- যয়নব বিনতে খুযাইমা ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর ইবনে আবদে মান্নাফ ইবনে হেলাল ইবনে আমের ইবনে সা'আসা'আ।
জন্ম: তিনি নবুওয়্যাতের ছাব্বিশ বছর আগে বনু বকর ইবনে হাওয়াযেনে হেলালীয়া গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন।
প্রথম ও দ্বিতীয় বিবাহ: তুফায়েল ইবনুল হারিছের সাথে তাঁর প্রথম বিয়ে হয়। প্রথম স্বামীর সাথে তাঁর বনিবনা হয়নি। এ জন্য প্রথম স্বামী তাকে তালাক দিলে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশের সাথে বিয়ে হয়। এ আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশের সাথে তিনি একই সময়ে ইসলাম কবুল করেন। জাহাশ ছিলেন প্রখ্যাত সাহাবীদের একজন। তিনি বলেছেন, আমি ওহুদ যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হয়ে যাব এবং প্রতিপক্ষ আমার ঠোঁট, নাক ও কান কেটে ফেলবে এবং আমি এ অবস্থায় আল্লাহর সাথে মিলিত হবো। তখন আমাকে আল্লাহ জিজ্ঞেস করবে, হে আবদুল্লাহ! তোমার ঠোঁট, নাক ও কান কাটা কেন, আমি আরজ করব, হে আল্লাহ! তোমার এবং তোমার রাসূল এর জন্য।'
তাঁর দোয়া আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কবুল করেন। তিনি অত্যন্ত বীরত্বের সাথে লড়ে যাচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে শত্রুর তরবারীর আঘাতে তাঁর তরবারি দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। তখন রাসূল তাঁর হাতে একটি ডাল তুলে দেন। তিনি ডালটিকেই তরবারী হিসেবে ব্যবহার করতে থাকেন এবং এক সময় শাহাদাত বরণ করেন। যুদ্ধ শেষে দেখা গেল মুশরিকরা তাঁর ঠোঁট, নাক এবং কান কেটে ফেলেছে। যেমন তিনি আল্লাহ্র দরবারে দোয়া করেছিলেন।
যয়নবসহ আরো বহু বিধবা : আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ (রা) শাহাদাত বরণ করলে বিধবা যয়নব (রা) খুবই অসহায় হয়ে পড়েন। আসলে ওহুদ যুদ্ধে ৭০ জন সাহাবী শহীদ হওয়ার ফলে ইসলামের সেই প্রথম যুগেই বিধবাদের একটি লম্বা কাফেলা দাঁড়িয়ে যায়। যাঁরা ছিলেন একান্তই অসহায়। কারণ মুসলমান হওয়ার কারণে তাঁদের আত্মীয়-স্বজনরা তাঁদেরকে একটু আশ্রয় পর্যন্তও দিতে রাজি ছিল না। এমতাবস্থায় রাসূল এ অসহায় মুসলমান বিধবা মহিলাদেরকে বিয়ে করার জন্য সাহাবীদেরকে উৎসাহ দিতে থাকেন। নিজেও এ ব্যাপারে এগিয়ে আসেন।
রাসূলের সাথে বিবাহ : যয়নব (রা) ছিলেন ওহুদ যুদ্ধের ফলে যাঁরা বিধবা হয়েছিলেন তাদের অন্যতম। তিনি বিধবা হওয়ার পর আত্মীয়-স্বজনের দ্বারে দ্বারে মাথা ঠুকেছেন একটু আশ্রয়ের জন্য কিন্তু তারা তাঁকে পাত্তা দেয়নি। শেষ পর্যন্ত রাসূল তাঁকে সমাজে পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও মর্যাদা ফিরিয়ে দেয়ার জন্য বিয়ে করেন। এক বর্ণনায় জানা যায়, 'অসহায়া যয়নব নিজেকে বিনা মোহরে রাসূল -এর কাছে পেশ করেন। তবে অন্য বর্ণনা মতে রাসূল ও তাঁর বিয়ের মোহরানা ধার্য হয়েছিল চার শত দিরহাম। হিজরী তৃতীয় সনে রাসূল ও যয়নব (রা)-এর মধ্যে এ বিয়ে সম্পন্ন হয়। এ সময়ে যয়নব (রা)-এর বয়স ছিল ৪১ বছর এবং রাসূল এর বয়স ছিল ৫৫ বছর।
চরিত্র: যয়নব (রা) ছিলেন জন্মগতভাবেই প্রশস্ত হৃদয় ও উদার প্রকৃতির মানুষ। তিনি ছোটবেলা থেকেই ভূখা, নাঙা ও গরীব-দুঃখীদের বন্ধু ছিলেন। তিনি ধনাঢ্য পিতার সন্তান হওয়া সত্ত্বেও গরীবদের দুঃখ সইতে পারতেন না। এমন বহু ঘটনা আছে যে, তিনি খেতে বসেছেন- এমন সময় ক্ষুধার্ত ভিক্ষুক এসে খাবার চেয়েছে, ব্যাস! তিনি নিজের খাবারটাই দিয়ে দিয়েছেন। এ জন্য ইসলাম গ্রহণের আগে সে বাল্যকালেই তিনি (أُمُّ الْمَسَاكِينِ) উম্মুল মাসাকীন বা মিসকীনদের মা নামে আরবে পরিচিতা হয়ে ওঠেন।
সাধারণ জনগণের পক্ষ থেকে এ ধরনের খেতাব নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বড় ব্যাপার। জানা যায় উম্মাহাতুল মু'মিনীনগণ কোন এক সময় রাসূল -এর নিকট জানতে চান, 'হে আল্লাহ্র রাসূল। আমাদের মধ্যে সকলের আগে কে পরলোক গমন করবেন।'
রাসূল আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী উত্তর দিলেন, أَسْرَعُكُنَّ لُحُوْقًا بِي . أَطْوَلَكُنَّ بَدًا 'তোমাদের মধ্যে যার হাত সর্বাপেক্ষা বড় সে সকলের আগে মৃত্যুবরণ করবে।' সকলেই ভাবলেন মাপের দিক দিয়ে সওদা (রা)-এর হাত তুলনামূলকভাবে যেহেতু বড় সেহেতু সম্ভবত তিনি সবার আগে ইন্তেকাল করবেন। কিন্তু সবার আগে যখন যয়নব (রা) ইন্তেকাল করলেন তখন সবাই বুঝলেন রাসূল কী বুঝাতে চেয়েছিলেন। আসলে রাসূল যয়নব (রা)-এর দান-খয়রাতের হাতকে বড় বলেছিলেন।
ওফাত: যয়নব (রা) রাসূল -এর সাথে বিয়ের মাত্র তিন মাস পরেই ইন্তেকাল করেন। তিনি রাসূল-এর উপস্থিতিতেই ইন্তেকাল করেন। তাঁর জানায় ইমামতি করেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ। উম্মাহাতুল মু'মীনীনদের মধ্যে এ ভাগ্য আর কারো হয়নি। যদিও খাদীজা (রা) ও রাসূল এর জীবদ্দশায় ইন্তেকাল করেন। পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, খাদীজা (রা) যখন ইন্তেকাল করেন তখন জানাযার সালাতের হুকুম হয়নি।'
মৃত্যুকালে এ সৌভাগ্যবতী যয়নব (রা)-এর বয়স হয়েছিল মাত্র ৪১ বছর। এত কম বয়সেও রাসূল-এর কোন স্ত্রী ইন্তেকাল করেননি। তাঁকে মদীনার বিখ্যাত কবরস্থান জান্নাতুল বাকীতে দাফন করা হয়।
📄 উম্মুল মু'মিনীন উম্মু সালামা (রা)
ক. আমি আভিজাত্যের অহংকারে অহংকারী মেয়ে।
খ. আমি একজন বিধবা মহিলা, আমার সন্তানাদি আছে।
গ. আমি একা, বিয়ের কাজ সম্পাদন করার আমার কেউ নেই।
নাম ও পরিচয়: রাসূল -এর ষষ্ঠ স্ত্রী ছিলেন উম্মু সালামা (রা)। তাঁর মূল নাম ছিল হিন্দ। ডাক নাম উম্মু সালামা। এ নামেই তিনি পরিচিত হয়ে আছেন। পিতার আসল নাম সুহাইল, ডাক নাম আবূ উমাইয়া। ইনি কুরাইশ বংশের মাখজুম গোত্রের লোক। মায়ের নাম আতিকা। পিতার দিক থেকে তাঁর বংশ তালিকা ছিল- হিন্দ বিনতে আবূ উমাইয়া সুহাইল ইবনে মুগীরা ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর ইবনে মাখজুম। আর মায়ের দিক থেকে হিন্দ বিনতে আতিকা বিনতে আমের ইবনে রাবীয়াহ ইবনে মালেক কেনানা।
সামাজিক মর্যাদা: উম্মু সালামা (রা)-এর পিতা-মাতা উভয় দিক থেকেই তৎকালীন আরবের খুবই মর্যাদাসম্পন্ন বংশের লোক ছিলেন। তাঁর পিতা আবূ উমাইয়া ছিলেন আরবের একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি। তিনি এতটাই উদার, দানশীল এবং হৃদয় খোলা মানুষ ছিলেন যে, 'যাদুর রাকিব' উপাধিতে ভূষিত হন। মাঝে মধ্যে যখন সফরে যাওয়ার প্রয়োজন হত তখন আবূ উমাইয়া পুরো কাফেলার ব্যয়ভার নিজেই বহন করতেন। এজন্যই তাঁর উপাধি দেয়া হয় زاد الركب 'যাদুর রাকিব' বা মুসাফিরের পাথেয়।
প্রথম বিবাহ: উম্মু সালামা (রা)-এর প্রথম বিয়ে হয় তাঁরই চাচাত ভাই আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল আসাদের সাথে। তিনি রাসূল -এর দুধ ভাই ছিলেন। মূল নাম আবদুল্লাহ হলেও পরবর্তীতে তিনি আবূ সালামা নামেই পরিচিতি লাভ করেন।
ইসলাম গ্রহণ ও হিজরত : ইসলামের একান্ত প্রাথমিক অবস্থায়, যখন ইসলাম কবুল করা মানে বিপদের পাহাড়কে নিজের মাথায় তুলে নেয়ার মতো অবস্থা ঠিক এ বিপদ সঙ্কুল অবস্থায় উম্মু সালামা এবং তাঁর স্বামী পরিবার পরিজনের তীব্র বিরোধিতার মুখে ইসলাম কবুল করেন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের ওপর নেমে আসে নানা অত্যাচার-নির্যাতন। শেষ পর্যন্ত মক্কায় টিকতে না পেরে তাঁরা অন্যান্য মুসলমানদের সাথে স্বামী-স্ত্রী উভয়ে আবিসিনিয়া হিজরত করেন। এখানেই তাঁদের প্রথম সন্তান সালামা জন্মগ্রহণ করেন। এ পুত্র সালামার নামেই স্বামী আবূ সালামা এবং স্ত্রী উম্মু সালামা নামে খ্যাতি লাভ করেন।
জানা যায়, আবিসিনিয়ার আবহাওয়া সালামা পরিবারের স্বাস্থ্যের অনুকূলে ছিল না। যে কারণে তাঁরা বাধ্য হয়ে মক্কায় ফিরে আসেন। পরবর্তীতে রাসূল -এর নির্দেশে মদীনায় হিজরত করেন।
হিজরতের করুণ চিত্র : এখানে উল্লেখ্য যে, উম্মু সালামা (রা) মদীনায় হিজরতকারী প্রথম মহিলা। কিন্তু মদীনায় হিজরতের অভিজ্ঞতা ছিল খুবই তিক্ত ও দুঃখজনক। ঐতিহাসিক ইবনে আসীর সে ঘটনাটি উম্মু সালামার জবানীতেই পেশ করেছেন। তিনি বলেন, 'আবূ সালামা যখন মদীনা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাঁর কাছে একটি মাত্র উট ছিল। তিনি আমাকে এবং আমার পুত্র সালামাকে তার পিঠে সওয়ার করান। তিনি নিজে উটের লাগাম ধরে রওয়ানা করেন। বনু মুগীরা ছিল আমার সমগোত্রীয়।
এ গোত্রের লোকেরা আমাদেরকে দেখে ফেলে এবং আবূ সালামাকে বাধা দিয়ে বলে যে, আমরা আমাদের কন্যাকে এত খারাপ অবস্থায় যেতে দেবো না। তারা আবূ সালামার হাত থেকে লাগام ছিনিয়ে নেয় এবং আমাকে সঙ্গে নিয়ে চলে যায়। ইতোমধ্যে আবূ সালামার বংশের লোক বনু আবদুল আসাদ এসে পৌছে। তারা পুত্র সালামাকে ছিনিয়ে নেয় এবং বনু মুগীরাকে জানিয়ে দেয় যে, তোমরা তোমাদের কন্যাকে স্বামীর সাথে যেতে না দিলে আমরাও আমাদের শিশুকে তোমাদের কন্যার সাথে কিছুতেই যেতে দেব না।
এখন আমি, আমার স্বামী এবং পুত্র সন্তান তিনজনই একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম। শোকে-দুঃখে আমার অবস্থা বেগতিক। যেহেতু হিজরতের হুকুম হয়েছিল, তাই আবূ সালামা মদীনায় চলে যান। আমি একা রয়ে যাই। প্রতিদিন ভোরে ঘর থেকে বের হতাম এবং একটা পাহাড়ে বসে বসে সন্ধ্যা পর্যন্ত ক্রন্দন করতাম। প্রায় এক বছর আমাকে এ অবস্থায় কাটাতে হয়।
একদিন বনু মুগীরার এক ব্যক্তি, যিনি ছিলেন আমার বন্ধু, আমার এ অস্থিরতা দেখে দয়া পরবশ হয়ে তার বংশের লোকদেরকে একত্রিত করে বললেন, আপনারা এ অসহায়কে কেন ছেড়ে দিচ্ছেন না? একে তো আপনারা স্বামী এবং সন্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছেন। তার এ কথাগুলো বেশ কাজ করেছে। শেষ পর্যন্ত তাদের মনে দয়ার উদ্রেক হয়। তারা আমাকে অনুমতি দিয়ে বলে যে, তোমার ইচ্ছে হলে স্বামীর কাছে যেতে পার।
এটা শুনে বনু আবদুল আসাদের লোকেরাও আমার কাছে সন্তান ফেরত দেয়। এবার উটের পিঠে হাওদা বেঁধে পুত্র সালামাকে বুকে নিয়ে সওয়ার হই। আমি ছিলাম সম্পূর্ণ একা। এ অবস্থায় কোবায় পৌঁছি। সেখানে ওসমান ইবনে তালহা ইবনে আবূ তালহার সাথে সাক্ষাৎ হয়। তিনি আমার অবস্থা জানতে পেরে জিজ্ঞেস করেন, তোমার সাথে কেউ আছে? আমি বললাম, না, আমি একা।
আর আমার এ শিশু সন্তান। তিনি আমার উটের লাগাম ধরে টেনে নিয়ে যান। আল্লাহ্ সাক্ষী, তালহার চেয়ে ভালো লোক আরবে আমি পাইনি। মনযিল এলে আমার অবতরণ দরকার হলে তিনি গাছের আড়ালে চলে যেতেন। রওয়ানা করার সময় হলে তিনি উট নিয়ে আসতেন। আমি ভালোভাবে বসলে তিনি উটের লাগام ধরে আগে আগে গমন করতেন। গোটা পথ এভাবে কাটে। মদীনা পৌঁছে বনু আমের ইবনে আওফ-এর জনপদ কোবা অতিক্রমকালে ওসমান ইবনে আবূ তালহা আমাকে জানান যে, তোমার স্বামী এ গ্রামে আছেন। আবূ সালামা এখানে অবস্থান করছেন।
তাঁর উপর নির্যাতন: আমরা যদি ইসলাম প্রচারের প্রথম দিকে নজর দেই তাহলে দেখবো হিজরতকালীন সময়ে আবূ সালামার গোত্রের ওপর যে অত্যাচার-নির্যাতন হয়েছে, যে কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে অন্যদের বেলায় তেমন হয়নি। উম্মু সালামা নিজেই বলেন, 'ইসলামের জন্য আবূ সালামার গোত্রকে যে কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে, তা আহলে বাইতের আর কাউকে সইতে হয়েছে বলে আমার জানা নেই।'
উম্মু সালামা এমনই মর্যাদাবান পিতার সন্তান ছিলেন যে, যখন হিজরতকালে তিনি মদীনার কোবা পল্লীতে পৌঁছান তখন তাঁর পরিচয় জানতে পেরে কেউই তা বিশ্বাস করতে চায়নি। কারণ ঐ জাহেলী যুগেও কুরাইশ বংশের আবূ উমাইয়ার মতো সম্ভ্রান্ত পরিবারের মহিলারা এমনি একা বেড়াতেন না। কিন্তু উম্মু সালামার
ব্যাপারটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি ইসলামের হুকুম আহকাম সর্বোপরি আল্লাহ্র নির্দেশকে নিজের জীবনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। এর কিছুদিন পর হজ্জ করার জন্য কিছু লোক যখন মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয় তখন উম্মু সালামা তাঁর পরিবারের কাছে একটা চিঠি পাঠান। এবার সবাই বিশ্বাস করে যে, সত্যিই তিনি কুরাইশ বংশের আবূ উমাইয়ার সন্তান।
স্বামীর সাথে স্বাক্ষাত ও উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ: আল্লাহ্র মেহেরবাণীতে স্বামীর সাথে সাক্ষাৎ হয়। আবূ সালামার সন্ধান দিয়ে ওসমান ইবনে আবু তালহা মক্কা ফিরে যান। এ ঘটনাটি উম্মু সালামার ওপর খুব প্রভাব ফেলে। তিনি তার সারা জীবনেও ঘটনাটি ভুলেননি এবং ওসমান ইবনে তালহার মহানুভবতার কথা স্মরণ করতেন। তিনি প্রায়ই বলতেন-
مَا رَأَيْتُ صَاحِبًا قَطُّ أَكْرَمُ مِنْ عُثْمَانَ بْنِ طَلْحَةَ .
'আমি কখনো ওসমান ইবনে তালহার চেয়ে ভালো সাথী কাউকে দেখিনি।'
মদীনায় স্বামীর সাথে একত্রিত হওয়ার পর তাঁরা আবার সাংসারিক জীবন শুরু করেন। কিন্তু বেশিদিন একত্র থাকা সম্ভব হয়নি। এরই মধ্যে ডাক আসে ওহুদ যুদ্ধের। বীর যোদ্ধা আবু সালামা ওহود যুদ্ধে বীরবিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এ যুদ্ধে তিনি বহু শত্রু সৈন্যকেও নিধন করেন। তবে শত্রুর নিক্ষিপ্ত একটি তীর তাঁর বাহুতে এসে বিদ্ধ হয়। জখমটা ছিল মারাত্মক। দীর্ঘ একমাস চিকিৎসার পর তিনি কোনো রকম সুস্থ হয়ে ওঠেন।
জানা যায় এ ঘটনারও দু'বছর এগার মাস পর রাসূল এর নির্দেশে তিনি 'কতন' এলাকায় একটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। স্বামীর শাহাদাত বরণ এ যুদ্ধে প্রায় এক মাস সময় লেগে যায়। এখানেও তিনি আঘাতপ্রাপ্ত হন। যতদূর জানা যায়, এ আঘাতটা তাঁর পূর্বের জখমকে কাঁচা করে দেয় এবং তিনি মদীনায় ফিরে আসেন। জখমের তীব্রতা বাড়তে থাকে। এ অবস্থায় তিনি তাঁর স্ত্রী উম্মু সালামা (রা)-কে এ বলে সান্ত্বনা দিতেন।
'আমি রাসূলে করীম এর নিকট শুনেছি, কেউ যদি কোনো বিপদের সম্মুখীন হয় তাহলে দুঃশ্চিন্তা না করে সে যেন বলে, 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।'
কারণ, আল্লাহর সান্নিধ্য পাওয়ার অনুভূতিই মু'মিনের জীবনে বিপদের মুহূর্তে প্রশান্তি দিতে পারে। তিনি এ বলেও প্রার্থনা করতে বলেছেন-
اللَّهُمَّ عِنْدَكَ احْتَسَبْتُ مُصِيبَتِي هُذِهِ اللَّهُمَّ اخْلُفْنِي خَيْرًا مِّنْهَا إِلَّا عَطَاهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ .
“হে আল্লাহ! আমি আমার এ বিপদে তোমার কাছেই প্রতিদান চাচ্ছি। তুমি আমাকে এর চাইতেও উত্তম পুরস্কারে ভূষিত করো, আল্লাহ অবশ্যই তাকে তা দান করবেন।'
আবূ সালামার অবস্থা ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছিল। একদিন সকালে রাসূলে করীম তাঁকে দেখার জন্যে উপস্থিত হলেন। চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যের খোঁজ-খবর নিয়ে যখন তিনি প্রত্যাবর্তন করছিলেন, ঠিক সে মুহূর্তেই আবূ সালামা (রা) ইন্তেকাল করলেন। রাসূলে করীম নিজ হাতে তাঁর চোখ দুটি বুঁজিয়ে দিলেন এবং আল্লাহর কাছে এ বলে প্রার্থনা করলেন-
اللهُمَّ اغْفِرْ لِأَبِي سَلَمَةَ، وَارْفَعْ دَرَجَتَهُ فِي الْمُقَرَّبِينَ وَاخْلُقَهُ فِي عَقِيهِ فِي الْغَابِرِينَ وَاغْفِرْ لَنَا وَلَهُ يَا رَبُّ الْعَالَمِينَ وَافْسِحْ لَهُ فِي قَبْرِهِ، وَنَوِّرُ لَهُ فِيْهِ .
'হে আল্লাহ! তুমি আবূ সালামার সমস্ত গুনাহ মাফ করে দাও, তাঁর মর্যাদাকে বৃদ্ধি করে তোমার প্রিয় ও নিকটতম বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করো, তাঁর পরিবার-পরিজনের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করো এবং তাঁকে ও আমাদের সকলকে ক্ষমা করো। তাঁর কবরকে আলোকিত ও প্রশস্ত করে দাও।'
রাসূল থেকে তার স্বামী কর্তৃক বর্ণিত সেই দু'আ উম্মু সালামা (রা) স্মরণ হলো। তিনি- 'হে আল্লাহ! বিপদে তোমার কাছেই এর প্রতিদান চাচ্ছি'- পর্যন্ত বলে থমকে গেলেন এবং মনে মনে বললেন: 'আবূ সালামার চেয়ে উত্তম জীবন সঙ্গী আর কে হতে পারে?'
হিজরী ৪ সালের জমাদিউল উখরার ৯ তারিখে তিনি ইন্তেকাল করেন। উন্মু সালামার গর্ভে আবু সালামার ঔরসজাত দুইজন পুত্র সন্তান ছিল- সালামা ও উমার ও ২ জন কন্যা ছিল যয়নব (রা) ও রুকাইয়া (রা)।
সব কথা শুনে রাসূল উম্মু সালামাকে বললেন, 'হে উম্মু সালামা! তোমার যে ইয়াতিম সন্তানদের কথা উল্লেখ করেছ তাদের লালন-পালনের ব্যবস্থা আল্লাহই করবেন, আর তোমার কেউ নেই সে সমস্যারও সমাধান হবে।' তার উত্তরে উম্মু সালামা ছেলে ওমরকে বললেন, যাও মহানবী-এর সাথে আমার বিয়ের ব্যবস্থা কর। এর কিছুদিন পর রাসূল-এর সাথে তাঁর বিয়ে হয়। সময়টা ছিল হিজরী চতুর্থ সালের শাওয়াল মাস।
বিয়ের সময় রাসূল উম্মু সালামাকে দু'টি যাঁতা, একটি কলসী এবং খুরমার বাকলে ভর্তি একটি চামড়ার বালিশ দান করেছিলেন।
উম্মু সালামা ছিলেন খুবই সুন্দরী ও লজ্জাবতী মহিলা। তাই দাম্পত্য জীবনে স্বাভাবিক হতে একটু বিলম্ব হয়। নবী করীম তাঁর গৃহে আসতেই তিনি লজ্জায় কন্যা যয়নবকে কোলে নিয়ে বসে থাকতেন। বিয়ের পর ৪ জন সন্তান-সন্ততিসহ উম্মু সালামা নবীজীর গৃহে আসেন এবং সংসার জীবন শুরু করেন। নবী স্ত্রীগণ দু'টি দলে বিভক্ত ছিলেন। এর একটির নেতৃত্বে ছিলেন আয়েশা (রা) এবং অপরটির নেতৃত্বে ছিলেন উম্মু সালামা (রা)।
উম্মু সালামার বিচক্ষণতা: উপস্থিত বুদ্ধির জোরে উম্মু সালামা (রা) হুদায়বিয়ার সন্ধির সময়ে যে সংকটের সৃষ্টি হয়েছিল তা থেকে উত্তরণে রাসূল-কে সহযোগিতা করেছিলেন। ঘটনাটি ছিল- হুদায়বিয়ার সন্ধি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর রাসূল সেখানে সকলকে কুরবানী করার নির্দেশ প্রদান করেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে কেউই রাসূল-এর হুকুম মতো কাজ করেননি। বরং চুপচাপ বসেছিলেন। আসলে বাহ্যত হুদায়বিয়ার সন্ধিটা ছিল বাহ্যিকভাবে মুসলমানদের স্বার্থের বিরুদ্ধে। যে কারণে মুসলমানেরা খুবই মনঃকষ্টে ভুগছিলেন।
রাসূল কুরবানী করার জন্য পর পর তিনবার নির্দেশ দেন কিন্তু তবুও মুসলমানেরা যখন কুরবানী না করে চুপ রইলেন তখন অত্যন্ত বিষণ্ণ মনে তিনি নিজ তাঁবুতে ফিরে গেলেন এবং উম্মু সালামার কাছে পূর্বাপর সকল কিছু খুলে বললেন। উম্মু সালামা তখন রাসূল-কে বললেন, 'আপনি কাউকে কিছুই বলবেন না বরং বাইরে গিয়ে নিজের কুরবানী নিজে করে ফেলুন এবং ইহরাম ত্যাগ করার জন্য মাথার চুল কেটে ফেলুন।' তাঁর কথামত রাসূল বাইরে বেরিয়ে এসে নিজের কুরবানী নিজে করলেন এবং মাথা মুড়িয়ে (ন্যাড়া করে) ফেললেন। এরপর দেখা গেল একে একে সবাই রাসূল -এর অনুসরণে কুরবানী করলেন এবং ইহরাম ত্যাগ করলেন। এমন কি মাথা মুড়ানোর জন্য মোটামুটি ভিড় লেগে গিয়েছিল যে, কার আগে কে মাথা মুড়াবে।
বুঝা যায় উম্মু সালামা (রা) কেমন বুদ্ধিমতি মহিলা ছিলেন। তাঁর বুদ্ধিভিত্তিক ও মনস্তাত্বিক সিদ্ধান্তের কারণেই সেদিন বড় ধরনের সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছিল। এ ব্যাপারে ইমামুল হারামাইন বলেছেন, 'মহিলা জগতের ইতিহাসে সঠিক সিদ্ধান্ত দানের এত বড় দৃষ্টান্ত আর নেই।' (যুরকানী ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৭২)
তাঁর মেধা: উম্মু সালামা সম্পর্কে মাহমুদ বিন লবিদ বলেন, 'যদিও মহানবী -এর সকল পত্নী আল্লাহর রাসূলের প্রচুর হাদীস স্মৃতিতে ধারণ করেছিলেন, তবু তাদের মধ্যে আয়েশা (রা) এবং উম্মু সালামা (রা)-এর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না।' তিনি রাসূল -এর মতোই সুন্দর সুরে কুরআন তিলাওয়াত করতে পারতেন এবং ছাত্রদের শেখাতেন। তিনি রাসূল -এর প্রত্যেকটি কথা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে শুনতেন, মনে রাখতেন এবং আমল করার চেষ্টা করতেন।
মুসনাদে আহমদ গ্রন্থে ইবনে কিয়াম লিখেছেন, 'উম্মু সালামার ফতোয়াসমূহ যদি একত্রিত করা যায় তাহলে তা দিয়ে একটি ক্ষুদ্র পুস্তিকা তৈরি হতে পারে।'
হাদীস শিক্ষা ও সম্প্রসারণে উম্মু সালামা (রা)-এর অবদান হাদীস শিক্ষা ও বর্ণনায় উম্মু সালামা (রা)-এর অবদান অনস্বীকার্য। হাদীস বর্ণনা ও প্রচারে আয়েশা (রা)-এর পরেই তাঁর স্থান। এ সম্পর্কে মাহমূদ ইবনে লবীদ বলেন-
كَانَ أَزْوَاجُ النَّبِيِّ الله يَحْفَظْنَ مِنْ حَدِيثِ النَّبِيِّ ﷺ كَثِيرًا وَلَا مَثَلاً لِعَائِشَةَ وَ أُمِّ سَلَمَةَ .
"রাসূলুল্লাহ এর স্ত্রীগণের বহু হাদীস মুখস্থ ছিল। তবে আয়েশা ও উম্মু সালামা (রা)-এর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না"। (আনসাবুল আশরাফ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪১৫; হায়াতুস সাহাবা)
হাদীস শুনার প্রতি উম্মু সালামা (রা)-এর প্রবল আগ্রহ ছিল। একদিন তিনি চুলের বেনী বাঁধাচ্ছিলেন। এমন সময় রাসূল ভাষণ দেয়ার জন্য মসজিদের মিম্বারে দাঁড়ালেন। তিনি কেবল, “ওহে লোক সকল! বলেছেন, আর অমনি উম্মু সালামা
. عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ (رضى) قَالَتْ : كُنْتُ عِنْدَ النَّبِيِّ ﷺ وَعِنْدَهُ مَيْمُونَةٌ فَأَقْبَلَ ابْنُ أُمِّ مَكْتُومٍ وَ ذَلَكَ بَعْدُ أَنْ أَمِرْنَا بِالْحِجَابِ . فَقَالَ : احْتَجِبًا مِنْهُ فَقُلْنَا : يَا رَسُولَ اللهِ ﷺ أَلَيْسَ أَعْمَى؟ لا يُبْصِرُنَا وَلَا يَعْرِفُنَا فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : أَفَعُمْيَا وَ انْتُمَا السْتُمَا تُبْصِرَانِهِ .
৪. উম্মু সালামা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমি নবী এর কাছে ছিলাম। সেখানে মায়মূনাও (রা) ছিলেন। ইবনে উম্মু মাকতুম আসলেন। এটা পর্দার বিধান নাযিল হবার পরের ঘটনা। নবী বললেন, তোমরা তাঁর থেকে পর্দা কর। আমরা বললাম: হে রাসূল সে তো অন্ধ, আমাদেরকে দেখতেও পারছে না, চিনতেও পারছে না। নবী বললেন: তোমরাও কি অন্ধ, তোমরা কি তাঁকে দেখতে পাচ্ছো না? (সুনানে আবু দাউদ, ২য় খণ্ড, পৃ. ৫৬৮)
ইবাদত বিষয়ক
ه. عَنْ أَمِّ سَلَمَةَ (رضى) أَنَّ النَّبِيِّ ﷺ اِسْتَيْقَظَ لَيْلَةٌ فَقَالَ : مَاذَا أُنْزِلَ اللَّيَةُ مِنَ الْفِتْنَةِ، مَا ذَا أُنْزِلَ مِنَ الْخَزَائِنِ؟ مَنْ يُوقِظُ صَوَاحِبَ الْحُجُرَاتِ : الأَرْبَ كَاسِيَةٍ فِي الدُّنْيَا عَارِيَةٍ فِي الآخِرَةِ .
৫. উম্মু সালামা (রা) হতে বর্ণিত। নবী কোন এক রাতে ঘুম থেকে জেগে বললেন: সুবহানাল্লাহ্! কতই না ফিতনা এবং ধনভাণ্ডার এ রাতে নাযিল হয়েছে। এমন কে আছে যে, হুজরার অধিবাসীদেরকে জাগাবে? এমন অনেক লোক আছে যারা দুনিয়ায় কাপড় পরিধান করছে, অথচ আখিরাতে তারা হবে উলঙ্গ। (সহীহ আল-বুখারী, ১ম খন্ড, পৃ. ১৫১)
. عَنْ أَمِّ سَلَمَةَ (رضى) قَالَتْ : شَكَوْتُ إِلَى النَّبِيِّ ﷺ أَنَّ اشْتَكِي، فَقَالَ : طُوفِى مِنْ وَرَاءِ النَّاسِ وَأَنْتِ رَاكِبَةٌ، فَطُفْتُ وَ رَسُولُ اللَّهِ يُصَلِّى إِلَى جَانِبِ الْبَيْتِ، وَهُوَ يَقْرَأُ بِالطُّورِ و كتاب مسطورٍ .
৬. উম্মু সালামা (রা) বলেন, হজ্জে আমি রাসূলুল্লাহ-এর নিকট অসুস্থতার অভিযোগ করলে তিনি বললেন: সাওয়ারে আরোহিনী হয়ে লোকদের পিছনে পিছনে তুমি তাওয়াফ কর। আমি তাওয়াফ করলাম, আর রাসূলুল্লাহ কা'বা গৃহের পার্শ্বে সূরা তুর পাঠ করে সালাত পড়ছিলেন। (মুসলিম ১ম খণ্ড, পৃ.-৪১৩)
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ (رض) قَالَتْ : عَلْمَنِي رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَنْ أَقُولَ عِنْدَ أَذَانِ الْمَغْرِبِ : اَللَّهُمَّ إِنَّ هَذَا إِقْبَالُ لَيْلِكَ وَ إِدْبَارُ نَهَارِكَ و أَصْوَاتُ دُعَائِكَ فَاغْفِرْ لِي .
৭. উম্মু সালামা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ আমায় মাগরিবের আযানের পরে এ দোয়া পড়তে শিখিয়েছিলেন : اللَّهُمَّ إِنَّ هَذَا إِقْبَالُ لَيْلِكَ وَادْبَارُ : نَهَارِكَ وَأَصْوَاتُ دُعَائِكَ فَاغْفِرْ لِي হে আল্লাহ! নিশ্চয় এটি আপনার রাতের আগমন, দিবসের পশ্চাত গমন এবং আপনার আহ্বানের আওয়াজ। সুতরাং আমাকে ক্ষমা করে দিন। (সুনান আবু দাউদ, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৭)
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ (رضی) قَالَتْ : مَا رَأَيْتُ النَّبِيِّ ﷺ يَصُومُ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ إِلَّا شَعْبَانَ وَ رَمَضَانَ .
৮. উম্মু সালামা (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমি নবীকে শা'বান ও রমযান মাস ছাড়া অন্য কোন, মাসে ক্রমাগত দু'মাস রোযা রাখতে দেখিনি। (তিরমিযী, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৫৫)
عَنْ زَيْنَبَ بِنْتِ أَبِي سَلَمَةَ عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ (رضى) زَوْجِ النَّبِيِّ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ سَمِعَ جَلْبَةَ خَصْمٍ بِبَابِ حُجْرَتِهِ فَخَرَجَ إِلَيْهِمْ فَقَالَ : إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ وَإِنَّهُ يَأْتِينِي الْخَصَمُ فَلَعَلَّ
তুমি যদি চাও তবে সাত দিন তোমার কাছে কাটাব। যদি সাত দিন তোমার কাছে কাটাই, তবে আমার অন্যান্য স্ত্রীদের কাছেও সাতদিন করে কাটাব। (বুখারী ১ম খণ্ড, পৃ. ২৮৯)
١٤. عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ (رضى) قَالَتْ : لَمْ يَكُنْ تَوْبَ أَحَبُّ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ مِنْ قَمِيصِ .
১৪. উম্মু সালামা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: কামীস-এর চেয়ে কোন পোশাকই রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট অধিক প্রিয় ছিল না। (মুসনাদে আহমদ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ.-২৫০)
পবিত্রতা বিষয়ক
١٥. عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ (رضى) قَالَتْ : إِنَّ امْرَأَةً مِّنَ الْمُسْلِمِينَ وَقَالَ زُهَيْرٌ : إِنَّهَا قَالَتْ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي إِمْرَأَةٌ أَشُدُّ ضَفْرِ رَأْسِي أَفَانْقُضُهُ لِلْجَنَابَةِ ؟ قَالَ : إِنَّمَا يَكْفِيكَ أَنْ تَحْتِيَ عَلَيْهِ ثَلَثًا .
১৫. উম্মু সালামা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: জনৈকা মুসলিম মহিলা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বললেন: আমার চুল খুব ঘন ও ঝুটি বাঁধা। আমি কি জানাবাত হতে পবিত্র হওয়ার জন্য চুল কমিয়ে ফেলব? নবী ﷺ বললেন: তিনবার চুলে পানি ঢালাই তোমার জন্য যথেষ্ট হবে। (আবু দাউদ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৩)
١٦. عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ (رضى) أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ كَانَ يُقَبِّلُهَا وَهُوَ صَائِمٌ . وَكَانَا يَغْتَسِلَانِ فِي إِنَاءٍ وَاحِدٍ .
১৬. উম্মু সালামা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: নবী ﷺ রোযা অবস্থায় তাঁকে চুম্বন দিতেন এবং তাঁরা দু'জন একই পাত্র থেকে গোসল করতেন। (মুসনাদে আহমদ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ৩৪৩)
রَسُولُ اللهِ يُصَلّى إِلَى جَانِبِ الْبَيْتِ، وَهُوَ يَقْرَأُ بِالطُّورِ وَ كتاب مسطور -
৬. উম্মু সালামা (রা) বলেন, হজ্জে আমি রাসূলুল্লাহ এর নিকট অসুস্থতার অভিযোগ করলে তিনি বললেন: সাওয়ারে আরোহিনী হয়ে লোকদের পিছনে পিছনে তুমি তাওয়াফ কর। আমি তাওয়াফ করলাম, আর রাসূলুল্লাহ কা'বা গৃহের পার্শ্বে সূরা তুর পাঠ করে সালাত পড়ছিলেন। (মুসলিম ১ম খণ্ড, পৃ.-৪১৩)
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ (رض) قَالَتْ : عَلَّمَنِي رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَنْ أَقُولَ عِنْدَ أَذَانِ الْمَغْرِبِ : اَللَّهُمَّ إِنَّ هَذَا إِقْبَالُ لَيْلِكَ وَ إِدْبَارُ نَهَارِكَ وَ أَصْوَاتُ دُعَائِكَ فَاغْفِرْ لِي .
৭. উম্মু সালামা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ আমায় মাগরিবের আযানের পরে এ দোয়া পড়তে শিখিয়েছিলেন: اَللَّهُمَّ إِنَّ هَذَا إِقْبَالُ لَيْلِكَ وَإِدْبَارُ نَهَارِكَ وَأَصْوَاتُ دُعَائِكَ فَاغْفِرْ لِي . হে আল্লাহ! নিশ্চয় এটি আপনার রাতের আগমন, দিবসের পশ্চাত গমন এবং আপনার আহ্বানের আওয়াজ। সুতরাং আমাকে ক্ষমা করে দিন। (সুনান আবু দাউদ, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৭)
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ (رضی) قَالَتْ : مَا رَأَيْتُ النَّبِيِّ ﷺ يَصُومُ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ إِلَّا شَعْبَانَ وَ رَمَضَانَ .
৮. উম্মু সালামা (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমি নবীকে শা'বান ও রমযান মাস ছাড়া অন্য কোন মাসে ক্রমাগত দু'মাস রোযা রাখতে দেখিনি। (তিরমিযী, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৫৫)
عَنْ زَيْنَبَ بِنْتِ أَبِي سَلَمَةَ عَنْ أَمِّ سَلَمَةَ (رضى) زَوْجِ النَّبِيِّ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ سَمِعَ جَلْبَةَ خَصْمِ بِبَابِ حُجْرَتِهِ فَخَرَجَ إِلَيْهِمْ فَقَالَ : إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ وَإِنَّهُ يَأْتِينِي الْخَصَمُ فَلَعَلَّ
তুমি যদি চাও তবে সাত দিন তোমার কাছে কাটাব। যদি সাত দিন তোমার কাছে কাটাই, তবে আমার অন্যান্য স্ত্রীদের কাছেও সাতদিন করে কাটাব। (বুখারী ১ম খণ্ড, পৃ. ২৮৯)
١٤. عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ (رضى) قَالَتْ : لَمْ يَكُنْ تَوْبَ أَحَبُّ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ مِنْ قَمِيصِ .
১৪. উম্মু সালামা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: কামীস-এর চেয়ে কোন পোশাকই রাসূলুল্লাহ-এর নিকট অধিক প্রিয় ছিল না। (মুসনাদে আহমদ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ.-২৫০)
পবিত্রতা বিষয়ক ١٥. عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ (رضى) قَالَتْ : إِنَّ امْرَأَةً مِّنَ الْمُسْلِمِينَ وَقَالَ زُهَيْرٌ : إِنَّهَا قَالَتْ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي امْرَأَةٌ أَشُدُّ ضَفْرِ رَاسِي أَفَانْقُصُهُ لِلْجَنَابَةِ ؟ قَالَ : إِنَّمَا يَكْفِيكَ أَنْ تَحْثِيَ عَلَيْهِ ثَلَثًا .
১৫. উম্মু সালামা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: জনৈকা মুসলিম মহিলা রাসূলুল্লাহ-কে বললেন: আমার চুল খুব ঘন ও ঝুটি বাঁধা। আমি কি জানাবাত হতে পবিত্র হওয়ার জন্য চুল কমিয়ে ফেলব? নবী বললেন: তিনবার চুলে পানি ঢালাই তোমার জন্য যথেষ্ট হবে। (আবু দাউদ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৩)
١٦. عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ (رضى) أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ كَانَ يُقَبِّلُهَا وَهُوَ صَائِمٌ وَكَانَا يَغْتَسِلَانِ فِي إِنَاءٍ وَاحِدٍ .
১৬. উম্মু সালামা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: নবী রোযা অবস্থায় তাঁকে চুম্বন দিতেন এবং তাঁরা দু'জন একই পাত্র থেকে গোসল করতেন। (মুসনাদে আহমদ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ৩৪৩)
শিক্ষা বিষয়ক
۱۷. عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي مُلَيْكَةَ عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ (رضى) أَنَّهَا ذكَرَتْ أَوْ كَلِمَةٌ غَيْرَهَا قِرَاءَةَ رَسُولِ اللهِ ﷺ بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ - الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ - مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ - يَقْطَعُ قِرَانَتَهُ آيَةً أَيَةً .
১৭. আব্দুল্লাহ ইবন আবু মুলায়কা উম্মু সালামা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। উন্মু সালামা (রা) রাসূলুল্লাহ- এর কুরআন পাঠ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে বিসমিল্লাহ্-এর পর সূরা ফাতিহার প্রথম তিনটি আয়াত উল্লেখ করে বললেন: রাসূলুল্লাহ প্রতি আয়াতে থেমে থেমে তিলাওয়াত করতেন।
(আবু দাউদ, ২য় খণ্ড, পৃ. ৫৫৬।)
চিকিৎসা বিষয়ক
۱۸. عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ (رضى) أَنَّ النَّبِيُّ ﷺ رَأَى فِي بَيْتِهَا جَارِيَةٌ فِي وَجْهِهَا سَفَعَةً - فَقَالَ : اسْتَرْقُوا لَهَا فَإِنَّ بِهَا النَّظْرَةُ .
১৮. উম্মু সালামা (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: নবী তাঁর ঘরে এক মেয়েকে দেখলেন, যার চেহারায় কালো কুচকে দাগ পড়ে গিয়েছে। নবী বললেন: দোয়া পড়ে তাতে ফুঁক দাও। কেননা এতে নজর লেগেছে।
এরূপ অনেক গুরুত্বপূর্ণ হাদীস আমরা তাঁর থেকে লাভ করে থাকি।
উম্মু সালামা (রা) অতিশয় লাজুক প্রকৃতির মহিলা ছিলেন। বিয়ের পর রাসূল যখন উম্মু সালামা (রা)-এর ঘরে আসতেন তখন তিনি লজ্জার কারণে মেয়ে যয়নবকে কোলে করে বসে থাকতেন। এ অবস্থা বেশ কিছু দিন বহাল ছিল। তারপর ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হয়।
উম্মু সালামা (রা) ছিলেন অত্যন্ত আমলদার একজন মহিলা। বিদায় হজ্জের সময় তিনি অসুস্থ ছিলেন। কিন্তু যথার্থ ওজর থাকা সত্ত্বেও যখন তিনি রাসূল সাথে গমন করেন, তখন রাসূল তাওয়াফ সম্পর্কে বললেন, 'উম্মু সালামা, ফজরের সালাত চলাকালে উটের পিঠে সওয়ার হয়ে তুমি তাওয়াফ করবে।'
📄 উম্মুল মু'মিনীন যয়নব বিনতে জাহাশ (রা)
দাস প্রথা ও যায়েদ তৎকালীন আরব সমাজে অন্যান্য পণ্য সামগ্রীর সাথে বাজারে মানুষও বেচাকেনা হতো। যাদেরকে বাজারে পণ্য সামগ্রীর মতো বেচাকেনা করা হতো তারা ক্রীতদাসরূপে পরিচিত ছিল। নবুওয়্যাতের পূর্বে ও সূচনালগ্নেও এ প্রথা চালু ছিল। পরবর্তীকালে রাসূল খোলাফায়ে রাশেদা, সাহাবাগণ ও পরবর্তীকালের মুসলিম শাসকগণ ধীরে ধীরে এ কু-প্রথার বিলুপ্তি সাধন করেন।
সেই জাহেলী যুগের প্রথা অনুযায়ী খাদীজা (রা)-এর ভাতিজা হাকীম ইবনে খুযাইমা বাজার থেকে যায়েদ ইবনে হারিসা নামের এক দাস বালককে কিনে এনে ফুফুকে উপহার হিসেবে দিলেন। পরবর্তীতে খাদীজা প্রিয় দাস যায়েদকে স্বামী মুহাম্মদ -এর খেদমতের জন্য দিয়ে দিলেন। কিন্তু দয়ার সাগর, সর্বমানবতার মুক্তিদূত, রাহমাতুল্লিল আলামীন তাকে আযাদ (মুক্ত) করে দিলেন। এমনকি আপন পালক পুত্র হিসেবে তাকে গ্রহণ করলেন। রাসূল -এর ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে যায়েদ ইসলাম কবুল করলেন এবং অচিরেই নিজেকে কুরআন হাদীসের জ্ঞানে সমৃদ্ধ করে তুললেন।
যায়েদের সাথে যয়নবের বিয়ে: এ ক্রীতদাস যায়েদ (রা)-এর সাথে রাসূল -এর আপন ফুফাতো বোন অনিন্দ্য সুন্দরী যয়নব বিনতে জাহাশ (রা)-এর বিয়ে দেন। রাসূল -এর উদ্দেশ্য ছিল মানুষের মধ্যে সমতা ফিরিয়ে আনা। সব মুসলমান সমান, সকলে ভাই ভাই, আশরাফ-আতরাফের কোনো বালাই ইসলামে নেই। ইসলামের সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েই তিনি একজন সদ্য আযাদপ্রাপ্ত ক্রীতদাসের সাথে আরবের সর্বশ্রেষ্ঠ বংশ, কুরাইশ বংশের মেয়ে তাও আবার নিজেরই ফুফাতো বোনকে বিয়ে দেন।
কিন্তু নারীসূলভ মানসিকতার কারণে যয়নব (রা) এ বিয়েকে ভালো মনে মেনে নিতে পারেননি। যে কারণে বিয়ের প্রায় এক বছর একত্রে বসবাস করার পরও তাদের মধ্যে সার্বিক অর্থে কোনো ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেনি। ফলে যায়েদ (রা) প্রচণ্ড অশান্তির মধ্যে দিনাতিপাত করছিলেন। আসলে যয়নব (রা) বিয়ের আগেই রাসূল -এর খেদমতে যায়েদ (রা) সম্বন্ধে আরজ করেছিলেন, 'আমি তাঁকে আমার জন্য পছন্দ করি না।' তিনি শুধু রাসূল -এর নির্দেশ মেনে নেয়ার জন্যই এ বিয়েতে রাজি হয়েছিলেন।
শিক্ষা বিষয়ক
۱۷. عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي مُلَيْكَةَ عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ (رضى) أَنَّهَا ذكَرَتْ أَوْ كَلِمَةً غَيْرَهَا قِرَاءَةَ رَسُولِ اللهِ ﷺ بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ - الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ - الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ - مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ - يَقْطَعُ فِرَانَتَهُ آيَةٌ آيَةً .
১৭. আব্দুল্লাহ ইবন আবু মুলায়কা উম্মু সালামা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। উন্মু সালামা (রা) রাসূলুল্লাহ-এর কুরআন পাঠ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে বিসমিল্লাহ্-এর পর সূরা ফাতিহার প্রথম তিনটি আয়াত উল্লেখ করে বললেন: রাসূলুল্লাহ প্রতি আয়াতে থেমে থেমে তিলাওয়াত করতেন। (আবু দাউদ, ২য় খণ্ড, পৃ. ৫৫৬।)
চিকিৎসা বিষয়ক
۱۸. عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ (رضى) أَنَّ النَّبِيُّ ﷺ رَأَى فِي بَيْتِهَا جَارِيَةً فِي وَجْهِهَا سَفَعَةً ، فَقَالَ : اسْتَرْقُوا لَهَا فَإِنَّ بِهَا النَّظْرَةُ .
১৮. উম্মু সালামা (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: নবী তাঁর ঘরে এক মেয়েকে দেখলেন, যার চেহারায় কালো কুচকে দাগ পড়ে গিয়েছে। নবী বললেন: দোয়া পড়ে তাতে ফুঁক দাও। কেননা এতে নজর লেগেছে।
এরূপ অনেক গুরুত্বপূর্ণ হাদীস আমরা তাঁর থেকে লাভ করে থাকি।
উন্মু সালামা (রা) অতিশয় লাজুক প্রকৃতির মহিলা ছিলেন। বিয়ের পর রাসূল যখন উন্মু সালামা (রা)-এর ঘরে আসতেন তখন তিনি লজ্জার কারণে মেয়ে যয়নবকে কোলে করে বসে থাকতেন। এ অবস্থা বেশ কিছু দিন বহাল ছিল। তারপর ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হয়।
উম্মু সালামা (রা) ছিলেন অত্যন্ত আমলদার একজন মহিলা। বিদায় হজ্জের সময় তিনি অসুস্থ ছিলেন। কিন্তু যথার্থ ওজর থাকা সত্ত্বেও যখন তিনি রাসূল-এর সাথে গমন করেন, তখন রাসূল তাওয়াফ সম্পর্কে বললেন, 'উম্মু সালামা, ফজরের সালাত চলাকালে উটের পিঠে সওয়ার হয়ে তুমি তাওয়াফ করবে।'
দাস প্রথা ও যায়েদ : তৎকালীন আরব সমাজে অন্যান্য পণ্য সামগ্রীর সাথে বাজারে মানুষও বেচাকেনা হতো। যাদেরকে বাজারে পণ্য সামগ্রীর মতো বেচাকেনা করা হতো তারা ক্রীতদাসরূপে পরিচিত ছিল। নবুওয়্যাতের পূর্বে ও সূচনালগ্নেও এ প্রথা চালু ছিল। পরবর্তীকালে রাসূল খোলাফায়ে রাশেদা, সাহাবাগণ ও পরবর্তীকালের মুসলিম শাসকগণ ধীরে ধীরে এ কু-প্রথার বিলুপ্তি সাধন করেন।
সেই জাহেলী যুগের প্রথা অনুযায়ী খাদীজা (রা)-এর ভাতিজা হাকীম ইবনে খুযাইমা বাজার থেকে যায়েদ ইবনে হারিসা নামের এক দাস বালককে কিনে এনে ফুফুকে উপহার হিসেবে দিলেন। পরবর্তীতে খাদীজা প্রিয় দাস যায়েদকে স্বামী মুহাম্মদ-এর খেদমতের জন্য দিয়ে দিলেন। কিন্তু দয়ার সাগর, সর্বমানবতার মুক্তিদূত, রাহমাতুল্লিল আলামীন তাকে আযাদ (মুক্ত) করে দিলেন। এমনকি আপন পালক পুত্র হিসেবে তাকে গ্রহণ করলেন। রাসূল -এর ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে যায়েদ ইসলাম কবুল করলেন এবং অচিরেই নিজেকে কুরআন হাদীসের জ্ঞানে সমৃদ্ধ করে তুললেন।
যায়েদের সাথে যয়নবের বিয়ে : এ ক্রীতদাস যায়েদ (রা)-এর সাথে রাসূল-এর আপন ফুফাতো বোন অনিন্দ্য সুন্দরী যয়নব বিনতে জাহাশ (রা)-এর বিয়ে দেন। রাসূল-এর উদ্দেশ্য ছিল মানুষের মধ্যে সমতা ফিরিয়ে আনা। সব মুসলমান সমান, সকলে ভাই ভাই, আশরাফ-আতরাফের কোনো বালাই ইসলামে নেই। ইসলামের সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েই তিনি একজন সদ্য আযাদপ্রাপ্ত ক্রীতদাসের সাথে আরবের সর্বশ্রেষ্ঠ বংশ, কুরাইশ বংশের মেয়ে তাও আবার নিজেরই ফুফাতো বোনকে বিয়ে দেন।
কিন্তু নারীসূলভ মানসিকতার কারণে যয়নব (রা) এ বিয়েকে ভালো মনে মেনে নিতে পারেননি। যে কারণে বিয়ের প্রায় এক বছর একত্রে বসবাস করার পরও তাদের মধ্যে সার্বিক অর্থে কোনো ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেনি। ফলে যায়েদ (রা) প্রচন্ড অশান্তির মধ্যে দিনাতিপাত করছিলেন। আসলে যয়নব (রা) বিয়ের আগেই রাসূল-এর খেদমতে যায়েদ (রা) সম্বন্ধে আরজ করেছিলেন, 'আমি তাঁকে আমার জন্য পছন্দ করি না।' তিনি শুধু রাসূল-এর নির্দেশ মেনে নেয়ার জন্যই এ বিয়েতে রাজি হয়েছিলেন।
যায়েদ-যয়নব দ্বন্দ্ব: কিন্তু যখন দু'জনের মধ্যে মোটেই বনিবনা হচ্ছিল না তখন একদিন যায়েد (রা) এসে রাসূল-কে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! যয়নব আমার কথার ওপর কথা বলে তর্ক করে, আমি তাকে তালাক দিতে চাই।' একথা শুনে রাসূল যায়েদ (রা)-কে আল্লাহর ভয় দেখিয়ে তালাক দেয়া থেকে বিরত থাকতে বললেন। কারণ তালাক দেয়া শরীয়তে জায়েয হলেও অপছন্দনীয়। এমন কি বৈধ কাজসমূহের মধ্যে এ কাজটি নিকৃষ্টতম ও সর্বাধিক ঘৃণিত।
যে কারণে রাসূল তাঁকে প্রশ্ন করলেন, 'তুমি কি তার মধ্যে কোন ত্রুটি দেখতে পেয়েছ?' যায়েদ উত্তর করলেন 'না!' কিন্তু আমি তার সংগে বসবাস করতে পারবো না।' রাসূল তাঁকে আদেশের সুরে বললেন, 'বাড়িতে গিয়ে তোমার স্ত্রীর দেখাশোনা কর, তার সংগে ভালো আচরণ কর এবং আল্লাহকে ভয় কর। কারণ আল্লাহ বলেছেন, 'তোমাদের স্ত্রীদের প্রতি সদাচরণ কর আর আল্লাহকে ভয় কর।' কিন্তু তাদের সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে শেষ পর্যন্ত যায়েদ (রা) রাসূল নিষেধ করার পরও যয়নব (রা)-কে তালাক দিয়ে দেন। এ বিষয়টি সূরা আহযাবে এভাবে বর্ণিত হয়েছে- وَإِذْ تَقُولُ لِلَّذِي أَنْعَمَ اللهُ عَلَيْهِ وَانْعَمْتَ عَلَيْهِ أَمْسِكَ عَلَيْكَ زَوْجَكَ وَاتَّقِ اللهَ .
অর্থ : 'হে নবী! সে সময়ের কথা স্মরণ কর, যখন তুমি সে ব্যক্তিকে বলেছিলেন যে, যার প্রতি আল্লাহ এবং তুমি অনুগ্রহ করেছিলে, তোমার স্ত্রীকে পরিত্যাগ করো না এবং আল্লাহকে ভয় কর।' [সূরা-৩৩ আহযাব: আয়াত-৩৭]
নিরীহ যয়নব: যায়েদ (রা) যখন যয়নব (রা)-কে তালাক দিলেন তখন জনগণের মধ্যে জল্পনা-কল্পনা চলতে লাগল, ক্রীতদাসের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে কে-ই বা বিয়ে করবে। সত্যি কথা বলতে কি, তালাকপ্রাপ্তা হওয়ার পর যয়নব (রা) হয়ে গেলেন অবজ্ঞা ও ঘৃণার পাত্রী! এ অবস্থা থেকে যয়নব (রা)-কে রেহাই দিতে আল্লাহ রাসূল এর সাথে তাঁকে বিয়ে দেয়ার মনস্থ করলেন।
তাই যয়নব (রা) তালাকপ্রাপ্তা হওয়ার পর ইদ্দত পুরা হলে রাসূলে করীম তাঁকে বিয়ে করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন। কিন্তু জাহেলী প্রথা সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ যায়েদ (রা) ছিলেন রাসূল -এর পালক পুত্র। তৎকালীন আরবের লোকজন পালক পুত্রকে আপন পুত্রের মতই মনে করত। যায়েদ (রা) ঐ সময়ে যায়েদ ইবনে মুহাম্মদ নামেই পরিচিত ছিলেন। ফলে রাসূল অপবাদের আশংকা করছিলেন। তাছাড়া মুনাফিকদের তর্জন গর্জনও ছিল।
কুপ্রথার মূলৎপাটনে আয়াত নাযিল : যা হোক, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন চাচ্ছিলেন সকল প্রকার কুসংস্কারের মূলোৎপাটন করে নির্ভেজাল একটি ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা করার জন্য রাসূল কে দুনিয়াতে প্রেরণ করেন। তাই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সবকিছু নিরসনকল্পে ঘোষণা করলেন-
مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّنْ رِّجَالِكُمْ وَلَكِن رَّسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّنَ ، وَكَانَ اللهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا .
অর্থ : 'তোমাদের পুরুষদের মধ্যে মুহাম্মদ কারো পিতা নন বরং তিনি আল্লাহ্র রাসূল এবং সর্বশেষ নবী। [সূরা-৩৩ আহযাব : আয়াত-৪০]
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও ঘোষণা করেন-
وَتُخْفِي فِي نَفْسِكَ مَا اللَّهُ مُبْدِيْهِ وَتَخْشَى النَّاسَ ، وَاللَّهُ أَحَقُّ أَنْ تَخْشَهُ .
'তুমি অন্তরে তা গোপন করছিলে, যা আল্লাহ প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন, তুমি মানুষকে ভয় করছ, অথচ আল্লাহই তো বেশি ভয় পাওয়ার যোগ্য।' [৩৩-আহযাব : ৩৭]
বিয়ের প্রস্তাব যায়েদ কর্তৃক : রাসূল নিশ্চিন্ত হলেন। এরপর তিনি যায়েদকেই পাঠালেন বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যয়নব (রা)-এর কাছে। তিনি যয়নব (রা)-এর গৃহে গিয়ে বললেন, 'আল্লাহ্র রাসূল তোমাকে বিয়ে করতে চান।' তিনি বললেন, 'এটা খুব ভালো কথা। তবে ইস্তেখারা করে সিদ্ধান্ত নেব।' তিনি ইস্তেখারায় বসে গেলেন। ইতোমধ্যেই আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল ও যয়নব (রা)-এর বিয়ের ব্যাপারে আয়াত নাযিল হলো-
فَلَمَّا قَضَى زَيْدٌ مِنْهَا وَطَرًا زَوَّجْنُكَهَا لِكَيْ لَا يَكُونَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ حَرَجٌ فِي أَزْوَاجِ أَدْعِيَاتِهِمْ إِذَا قَضَوْا مِنْهُنَّ وَطَرًا ، وَكَانَ أَمْرُ اللَّهِ مَفْعُولاً .
অর্থ: 'অতঃপর যায়েদ যখন তার সাথে স্বীয় প্রয়োজন সমাপ্ত করল তখন আমি তাঁকে তোমার নিকট বিয়ে দিলাম। যাতে প্রয়োজন পুরো করার পর মুখ ডাকা পুত্রের স্ত্রীদের ব্যাপারে মু'মিনদের ওপর কোনো দোষারোপ না চলে। আল্লাহ্র ইচ্ছে তো পূরণ হবেই।' [সূরা-৩৩ আহযাব: আয়াত-৩৭]
সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে, 'তখন আমি তাঁকে তোমার নিকট বিয়ে দিলাম।' এমন কথা নাযিল হওয়ার পর বিয়ের কাজ সম্পন্ন করা হল। সময়টা ছিল ৫ম হিজরীর জিলক্বদ মাস। এ জন্যেই যয়নব (রা) গর্ব করে বলতেন, 'আমার বিয়ে স্বয়ং আল্লাহ দিয়েছেন।'
বিয়ের অনুষ্ঠান: এ বিয়েতে বেশ আনন্দ করা হয়। বৌভাত অনুষ্ঠানে আনসার ও মুহাজিরদের প্রায় তিনশ জনকে দাওয়াত করা হয়। খাওয়ার মেনু ছিল গোশত-রুটি। একেক বারে দশজন করে লোক খেতে বসছিলেন। কিন্তু শেষ দলের লোকজন খাওয়া শেষ হওয়ার পরও বসেছিলেন। তারা নানা গল্পে মেতে উঠলেন। ফলে রাত ক্রমেই গভীর হতে লাগল।
পর্দার আয়াত: রাসূল লজ্জার কারণে মেহমানদেরকে উঠতে বলতে পারছিলেন না, অথচ খুব অস্বস্তি অনুভব করছিলেন। ঠিক এ সময়ে আল্লাহ্র পক্ষ থেকে পর্দার আয়াত নাযিল হয়। ইরশাদ হচ্ছে-
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لا تَدْخُلُوا بُيُوتَ النَّبِيِّ إِلَّا أَنْ يُؤْذَنَ لَكُمْ إِلى طَعَامٍ غَيْرَ نَظِرِينَ إِنَّهُ ، وَلَكِنْ إِذَا دُعِيْتُمْ فَادْخُلُوا فَإِذَا طَعِمْتُمْ فَانْتَشِرُوا وَلاَ مُسْتَأْنِسِينَ لِحَدِيثٍ ، إِنَّ ذَلِكُمْ كَانَ يُؤْذِي النَّبِي فَيَسْتَحْيِ مِنْكُمْ ، وَاللَّهُ لَا يَسْتَحْيِ مِنَ الْحَقِّ ، هُنَّ مَتَاعًا فَسْتَلُوهُنَّ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ . وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ
অর্থ : 'হে ঈমানদার লোকেরা! তোমাদেরকে অনুমতি দেয়া না হলে তোমরা নবী গৃহে প্রবেশ করবে না। অবশ্য দাওয়াত পেলে যাবে, তবে ডাকার আগে গিয়ে অনর্থক বসে থাকবে না। বরং ডাকবার পরে যাবে, খাওয়ার পরে চলে আসবে। বসে গল্প-গুজবে রত হবে না। নিশ্চয় এটা নবীর জন্য কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদেরকে বলতে সংকোচ বোধ করেন, কিন্তু আল্লাহ সত্য কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন না। তোমরা নবীর স্ত্রীদের নিকট কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে।' [সূরা-৩৩ আহযাব: আয়াত-৫৩]
এ আয়াত নাযিল হওয়ার পর রাসূল দরজায় পর্দা ঝুলিয়ে দেন। ফলে লোকদের ভেতরে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়।
রাসূল ও যয়নব (রা)-এর বিয়ের ফলে আরবের দীর্ঘদিনের প্রচলিত একটি ভ্রান্ত ধারণার অবসান ঘটে, তা হল-পালক পুত্র আদৌ আপন পুত্র হতে পারে না। ফলে তার স্ত্রীকে বিয়ে করাও দোষণীয় নয়। ইসলাম পরিষ্কারভাবে ১৪ জন নারীকে বিয়ে করা নিষিদ্ধ করেছে। বাকি সকলকে বিয়ে করা জায়েয। এ ১৪ জনের মধ্যে পালক পুত্রের স্ত্রীর কথা নেই।
বিয়ের বৈশিষ্ট্য: এ বিয়ের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে, তা হল-
১. জাহেলী যুগে পালক পুত্র আসল পুত্রের মর্যাদাসম্পন্ন ছিল। এ প্রথার বিলুপ্তি ঘটানো হয়েছে।
২. লোকদেরকে আদেশ করা হয় যে, কাউকে তার প্রকৃত পিতা ব্যতীত অন্যের সাথে পিতৃ পরিচয়ে সম্পর্ক করা যাবে না।
৩. মানুষের মধ্যে উঁচু-নীচুর কোনো ব্যবধান থাকবে না।
৪. আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে যয়নব (রা)-এর বিয়ে দেন।
৫. যয়নবের সাথে বিয়ের সময় পর্দার আয়াত নাযিল হয় এবং পর্দা প্রথার প্রচলন হয়।
৬. একমাত্র যয়নবের বিয়েতেই জাঁকজমকপূর্ণভাবে অলিমা অনুষ্ঠান করা হয়।
শারীরিক গঠনের দিক দিয়ে জয়নব (রা) ছিলেন ক্ষুদ্রকায় কিন্তু সুন্দরী ছিলেন। সাথে সাথে শোভন শারীরিক গঠন ছিল তাঁর।
চরিত্র মাধুর্য: তিনি অত্যন্ত দ্বীনদার, পরহেযগার, উদার, দয়ার্দ্রচিত্ত, বিনয়ী ও সৎ স্বভাবী ছিলেন। আর তিনি ছিলেন পরিশ্রমী একজন মহিলা। তিনি হস্তশিল্পের
কাজে খুবই পারদর্শী ছিলেন। তিনি নিজ হাতে রোজগার করে সংসার চালাতেন। তাঁর পরহেযগারিতার ব্যাপারে রাসূল -এর সাক্ষ্য পাওয়া যায়। একবার সাহাবীদের মধ্যে রাসূল কিছু মাল বিতরণ করছিলেন। কিন্তু স্ত্রী যয়নবের পরামর্শক্রমে তা কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ রাখেন। এতে ওমর (রা) রাগ করে যয়নবকে ধমক দিলে রাসূল বলেন, 'ওমর! যয়নবকে কিছু বলো না। সে খুবই আল্লাহ ভীরু ও ইবাদতের সময় ক্রন্দনশীলা।'
একবার ওমর (রা) বায়তুল মাল থেকে যয়নবকে এক বছরের খরচ পাঠিয়ে দেন। যয়নব (রা)-এর সামান্য অংশ একটি চাদরে ঢেকে রেখে বাকি সমস্ত কিছু গরীব-মিসকীনদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়ার জন্য পরিচারিকাকে নির্দেশ দেন। এ সময় পরিচারিকা আরজ করলেন, আম্মাজান! গরীবদের মাঝে আমিও একজন। সুতরাং এ মাল থেকে আমিও কিছু পেতে পারি। বিবি যয়নব বললেন, চাদরে ঢাকা যা আছে সবই তোমার, বাকিগুলো তুমি দান করে দাও।'
সব কিছু দান করার পর তিনি মহান রাব্বুল আলামীনের উদ্দেশ্যে আরজ করলেন, 'ইয়া রাব্বাল আলামীন! বায়তুল মাল থেকে দান যেন আর আমাকে গ্রহণ করতে না হয়।' তাঁর এ মুনাজাত কবুল হয় অর্থাৎ ঐ বছরেই তিনি ইন্তেকাল করেন।
স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য: যয়নব বিনতে জাহাশ (রা) ছিলেন আত্মমর্যাদা সম্পন্না মহিলা। মুহাম্মদ ইবনে ওমর বর্ণনা করেন যে, 'একদিন যয়নব (রা) নবীজীকে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনার অন্য স্ত্রীদের মতো নই। তাঁদের মধ্যে একজনও এমন নেই, যার বিয়ে পিতা-ভাই বা বংশের অন্য কারো অভিভাবকত্বে সম্পন্ন হয়নি। একমাত্র আমিই ব্যতিক্রম। আল্লাহ তা'আলা আমাকে আসমান থেকে আপনার স্ত্রী করেছেন।'
আয়েশা (রা) বলেছেন-
مَا رَأَيْتُ امْرَأَةً قَطُّ فِي الدِّينِ مِنْ زَيْنَبَ .
'আমি দ্বীনের ব্যাপারে যয়নব (রা) থেকে উত্তম কোনো মহিলা দেখিনি।' (আল-ইসতীয়াব-২/৭৫৪)
মূসা ইবনে তারেক যয়নব (রা) সম্পর্কে আয়েশা (রা) থেকে উদ্ধৃত করে বলেন, 'দ্বীনদারী, তাকওয়া, সত্যবাদিতা, আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি সহানুভূতি, দানশীলতা এবং আত্মত্যাগে তাঁর চেয়ে উত্তম মহিলা আর কেউ ছিল না।'
আয়েশা (রা) তাঁর সম্বন্ধে আরও বলেছেন, 'আল্লাহ তা'আলা যয়নব বিনতে জাহাশের প্রতি রহম করুন। সত্যি দুনিয়ায় তিনি অনন্য মর্যাদা লাভ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবীর সাথে তাঁকে বিয়ে দিয়েছেন এবং তাঁর প্রসঙ্গে কুরআনের আয়াত নাযিল হয়েছে।
তাঁর সম্বন্ধে উম্মু সালামা (রা) বলেন- كَانَتْ صَالِحَةً صَوَّامَةً قَوَّامَةً .
'তিনি ছিলেন অতি নেককার, অধিক সিয়াম পালনকারী এবং অতি ইবাদতকারী।'
হাদীস শিক্ষা ও সম্প্রসারণে তাঁর অবদান
যয়নব বিনতে জাহাশ (রা) মর্যাদা সম্পন্ন মহিলা সাহাবী ছিলেন। বিভিন্ন কর্মের পাশাপাশি তিনি অল্প পরিমাণে হলেও নবী থেকে হাদীস শিক্ষা ও তা বর্ণনা কার্যেও অবদান রেখেছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ থেকে ১১টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইবনে হাজার (র) আল-ইসাবা গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, যয়নব (রা) নবী থেকে কতিপয় হাদীস বর্ণনা করেছেন। হাদীস পুনরুক্তিসহ বুখারীতে ৫টি, মুসলিমে ৩টি, তিরমিযীতে ২টি, আবু দাউদে ২টি, নাসাঈতে ২টি ও ইবনে মাজায় ২টি সংকলিত হয়েছে।
তাঁর থেকে বর্ণিত হাদীসের কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হলো- . عَنْ زَيْنَبَ بِنْتِ جَحْشٍ (رض) أَنَّهَا قَالَتْ : اسْتَيْقَظَ النَّبِيُّ مِنَ النَّوْمِ مُحْمَرًا وَجْهُهُ يَقُولُ : لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَيْلٌ لِلْعَرَبِ مِنْ شَرِّ قَدْ اقْتَرَبَ فُتِحَ الْيَوْمُ مِنْ رَدْمِ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ مِثْلَ هَذِهِ وَعَقَدَ سُفْيَانُ تِسْعِينَ أَوْ مِائَةٌ - قِيلَ : أَنْهْلِكَ وَفِيْنَا الصَّالِحُونَ : قَالَ : نَعَمْ إِذَا كَثُرَ الْخُبْثُ .
১. যয়নব বিনত জাহাশ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: নবী একদা রক্তিম বর্ণের চেহারা নিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠলেন। তিনি বললেন: আল্লাহ
ছাড়া কোন উপাস্য নেই। আরবদের জন্য বিপদ সমাগত। ইয়া'জুজ-মা'জুজ এর প্রাচীরের ছিদ্র আজ এ পর্যন্ত উন্মুক্ত করে ফেলা হয়েছে (বর্ণনাকারী সুফিয়ান) তাঁর হাতের আঙ্গুল দিয়ে ৯০ বা ১০০-এর আকৃতি করে দেখালেন। রাসূলুল্লাহ -কে জিজ্ঞেস করা হলো- আমরাও কি ধ্বংস হয়ে যাবো অথচ আমাদের মাঝে পুণ্যবানগণ রয়েছে? নবী বললেন: হ্যাঁ, যখন অন্যায় অধিক হবে, তোমরাও ধ্বংস হয়ে যাবে। (মুসলিম, ২য় খণ্ড, পৃ.-৩৮৮)
عَنْ زَيْنَبَ بْنَتِ جَحْشٍ (رض) قَالَتْ : قُلْتُ لِلنَّبِيِّ ﷺ أَنَا مُسْتَحَاضَةٌ فَقَالَ : تَجْلِسُ أَيَّامَ أَقْرَانِهَا ثُمَّ تَغْتَسِلُ وَتُؤَخِّرِ الظَّهْرَ وَ تُعَجِّلِ الْعَصْرَ وَ تَغْتَسِلُ وَتُصَلِّيْهِمَا وَتَوَخِّرِ الْمَغْرِبَ وَتُعَجِّلُ الْعِشَاءَ وَتَغْتَسِلُ وَتُصَلِّيْهِمَا جَمِيعًا، وَتَغْتَسِلُ لِلْفَجْرِ .
২. যয়নব বিনতে জাহাশ (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমি নবী কে বললাম, যে, আমি ইস্তিহাযা (অনিয়ন্ত্রিত স্রাব)-এ আক্রান্ত। নবী বললেন: তুমি তোমার পূর্ব নির্ধারিত হায়েযর দিনগুলোতে অপেক্ষা করবে। অতঃপর গোসল করে যোহরকে বিলম্ব করত আসরকে তাড়াতাড়ি করবে। অতঃপর গোসল করে উভয় ওয়াক্ত সালাত পড়বে। অনুরূপ মাগরিবকে বিলম্ব করে এশা কে এগিয়ে এসে গোসল করে উভয় সালাত একত্রে পড়বে। আর ফজরের জন্যও আলাদা গোসল করবে। (সুনানে নাসাই ১ম খণ্ড পৃ.-৬৫-৬৬)
عَنْ زَيْنَبَ بِنْتِ جَحْشٍ (رضى) أَنَّهُ كَانَ لَهَا مَخْضَبٌ مِّنْ صَفْرٍ - قَالَتْ : كُنْتُ أَرَجِلُ رَأْسَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فِيهِ .
৩. যয়নব বিনত জাহাশ (রা) হতে বর্ণিত। তাঁর হলুদ রঙের একটি চিরুনী ছিল যা দ্বারা তিনি রাসূল এর মাথা চিরুনী করে দিতেন। (সুনান ইবনে মাজাহ)
৪. যয়নব বিনতে আবু সালাম (রা) বলেন: তিনি যয়নব বিনত জাহাশের (রা) নিকট আসলে তিনি বললেন: আমি রাসূলুল্লাহ কে মিম্বারে দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছি তিনি বলেছেন, আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী কোন নারীর জন্য বৈধ নয়
মৃত ব্যক্তির জন্য তিন দিনের অধিক শোক প্রকাশ করা। তবে স্বামীর মৃত্যুতে স্ত্রী চার মাস দশ দিন শোক পালন করতে পারে।
তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনাকারীদের মধ্যে ছিলেন মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবন জাহাশ (তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র), উম্মু হাবীবা বিনতে আবু সুফিয়ান, যয়নব বিনতে আবু সালামা, কুলছুম বিনতুল মুসতালাক (র) প্রমুখ সাহাবী ও তাবেঈদের নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।
ওফাত: হিজরী ২০ সালে ওমর (রা)-এর শাসন আমলে ৫৩ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। ইন্তেকালের সময় শুধু একটি মাত্র গৃহ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। তাঁর স্মৃতি চিহ্ন এ গৃহটি উমাইয়া খলীফা ওয়ালীদ ইবনে আবদুল মালেক ৫০ হাজার দিরহামের বিনিময়ে তাঁর আত্মীয়-স্বজনের নিকট থেকে ক্রয় করে মসজিদে নববীর আন্তর্ভুক্ত করেন।
মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাঁর কাফনের কাপড় তৈরি করে যান। এ ব্যাপারে তিনি ওসিয়ত করেন যে, 'ওমর আমার জন্য কাপড় পাঠাতে পারে। এমন হলে এক প্রস্থ কাপড় ছদকা করে দেবে।'
তাঁর ওসিয়ত অনুযায়ী রাসূলে করীম -এর খাটে করে তাঁকে দাফন করতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ খাটে করে আবু বকর (রা)-এর লাশও বহন করা হয়। তবে আবূ বকর (রা)-এর পর যাদের লাশ বহন করা হয়, তাদের মধ্যে যয়নব (রা) ছিলেন প্রথম মহিলা।
ওমর (রা)-এর নির্দেশে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ, উসামা ইবনে যায়েদ, আবদুল্লাহ ইবনে আবু আহমদ ইবনে জাহাশ এবং মুহাম্মদ ইবনে তালহা তাঁর লাশ কবরে নামান। এঁরা সবাই ছিলেন যয়নব (রা)-এর নিকটাত্মীয়।
আয়েশা (রা) তাঁর মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে বলেছিলেন, 'ভাগ্যবতী অনন্য মহিলা বিদায় নিয়েছেন। এতীমরা হয়ে পড়েছে অস্থির ব্যাকুল। তিনি ছিলেন এতীমদের আশ্রয়স্থল।'
ওমর (রা) তাঁর জানাযার সালাত পড়ান। তাকে জান্নাতুল বাকীতে দাফন করা হয়। আকীল এবং হানাফিয়ার কবরের মধ্যস্থলে তাঁর কবরের অবস্থান। তাঁর দাফন করার দিন প্রচণ্ড গরম পড়েছিল। এজন্য ওমর (ra) সেখানে তাঁবু গাড়েন। জানা যায় কবর খননের জন্য জান্নাতুল বাকীতে এটা ছিল প্রথম তাঁবু।
📄 উম্মুল মু'মিনীন জুয়াইরিয়া (রা)
ইয়া রাসূলাল্লাহ আমি হারেস ইবনে আবূ দিদারের কন্যা। আমার পিতা গোত্রের সরদার, আমি কি বিপদে পড়েছি তা আপনার অজানা নয়।
নাম ও পরিচয়: নাম জুয়াইরিয়া। পূর্ব নাম ছিল বাররা। রাসূল তাঁর নাম পরিবর্তন করে রাখেন জুয়াইরিয়া। আব্বার নাম হারেস। তিনি বনু মুস্তালিক গোত্রের সর্দার ছিলেন। তাঁর বংশ তালিকা হল, জুয়াইরিয়া বিনতে হারেস ইবনে আবু দিদার ইবনে হাবীব ইবনে আয়েয ইবনে মালেক ইবনে জুয়াইমা ইবনে আসাদ ইবনে আমর ইবনে রাবীয়া ইবনে হারিসা ইবনে আমর মুযিকিয়া।
প্রথম বিবাহ: জুয়াইরিয়া (রা)-এর প্রথম বিয়ে হয়েছিল তাঁর নিজের গোত্রের মুসাফা ইবনে সাফওয়ান মুসতালেফীর সাথে। মুসাফা সম্পর্কে জুয়াইরিয়া (রা)-এর চাচাত ভাই ছিলেন। তিনি ইবনে যিয়ার নামেও পরিচিত ছিলেন।
প্রথম দিকে ইসলামের প্রকাশ্য শত্রু: জুয়াইরিয়া (রা)-এর পিতা এবং স্বামী দু'জনই ইসলামের ঘোর শত্রু ছিলেন। কুরাইশদের প্ররোচনায় অথবা নিজেদের ইচ্ছায় তারা মদীনার ওপর আক্রমণ করার পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলেন। সংবাদটি রাসূল এর কানে পৌঁছলে তিনি এর সত্যতা যাচাই-এর জন্য বুরাইদা ইবনে হাবীব আসলামীকে ঘটনাস্থলে প্রেরণ করেন সরেজমিনে তদন্ত করার জন্য। বুরাইদা ফিরে এসে সংবাদটি সত্য বলে জানালে রাসূল তাঁর বাহিনী নিয়ে রওয়ানা হন এবং মুরাইসী নামক স্থানে অবস্থান নেন। এ মুরাইসী নামক স্থানটি মদীনা থেকে নয় মাইল দূরে। আর সময়টি ছিল হিজরী ৫ম সনের শাবান মাস।
বনী মুস্তালিক যুদ্ধ: ওদিকে মুসলমান বাহিনীর আগমন, অবস্থান গ্রহণ ও রণসজ্জার খবর শুনে মুস্তালিক গোত্র প্রধান জুয়াইরিয়া (রা)-এর পিতা হারেস তাঁর সংগঠিত বাহিনী থেকে সটকে পড়েন। কিন্তু তাঁর বাহিনীর মনোবল ছিল অটুট। হারেসের অধীনস্থ বাহিনী কিছুমাত্র পিছু না হটে মুসলিম বাহিনীর সাথে
মরণপণ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। প্রচণ্ড যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হওয়ার পর দেখা গেল মুসলিম বাহিনী জয়লাভ করেছে। এ যুদ্ধে বনী মুস্তালিক গোত্রের এগার জন নিহত হয়। ও ছয়শত সেনা মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হয়। আর দুই হাজার উট ও পাঁচ হাজার ছাগলও মুসলমানদের দখলে আসে। এ যুদ্ধে জুয়াইরিয়ার স্বামী নিহত হন।
উক্ত যুদ্ধবন্দীদের সাথে বন্দী অবস্থায় গোত্র প্রধান হারেসের কন্যা জুয়াইরিয়াও ছিলেন। তৎকালীন আরবের নিয়ম অনুযায়ী যুদ্ধবন্দীদেরকে গোলাম হিসেবে বিলি বণ্টন করা হতো। সে মুতাবেক জুয়াইরিয়া সাবিত ইবনে কায়েসের ভাগে পড়েন। পূর্বেই বলেছি জুয়াইরিয়া ছিলেন গোত্র প্রধানের কন্যা। যে কারণে তিনি দাসীর জীবন মেনে নিতে পারছিলেন না। সে জন্য তিনি সাবিত (রা)-এর কাছে অর্থের বিনিময়ে মুক্তির আবেদন জানান। সাবিত (রা) ১৯ উকিয়াহ স্বর্ণের বিনিময়ে এ আবেদন মঞ্জুর করেন।
রাসূল জুয়াইরিয়ার পক্ষ থেকে মুক্তিপণ আদায় ও তাকে বিবাহ করা : কিন্তু জুয়াইরিয়ার কাছে এত বিপুল স্বর্ণ বা সম্পদ না থাকার কারণে তিনি এ ব্যাপারে সাহায্য করার জন্য স্বয়ং রাসূল-এর নিকট আবেদন করেন। এ ঘটনাটি আয়েশা (রা) এভাবে বর্ণনা করেছেন, 'রাসূলুল্লাহ বনু মুস্তালিকের যুদ্ধ বন্দীদেরকে বণ্টন করলে জুয়াইরিয়া বিনতে হারেস সাবিত ইবনে কায়েসের ভাগে পড়েন। জুয়াইরিয়া তৎক্ষণাৎ মুক্তিপণ দিয়ে মুক্তি লাভের উদ্যোগ নেন। তিনি ছিলেন খুবই লাবণ্যময়ী মিষ্টি মেয়ে। তাঁকে যে-ই দেখতো সে মুগ্ধ হয়ে যেত। জুয়াইরিয়া মুক্তিলাভের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ এর কাছে সাহায্য কামনা করেন। তিনি রাসূলুল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি হারেস ইবনে আবূ দিদারের কন্যা।
আমার পিতা গোত্রের সরদার, আমি কি বিপদে পড়েছি তা আপনার অজানা নয়। আমি সাবিত ইবনে কায়েসের ভাগে পড়েছি। আমার মুক্তিপণ আদায়ে আপনার সাহায্য কামনা করছি। রাসূলুল্লাহ বললেন, আমি যদি তোমার জন্য আরো ভালো কিছুর ব্যবস্থা করি? তিনি বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! সেটা কি? তিনি বললেন, আমি তোমার পক্ষ থেকে মুক্তিপণ আদায় করে দিয়ে তোমাকে বিয়ে করব। জুয়াইরিয়া বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমি এতে রাজি আছি। তখন রাসূল বললেন, আমি তাই করলাম।
মুসলমানগণ যখন জানতে পারলেন যে, রাসূলুল্লাহ জুয়াইরিয়াকে বিয়ে করেছেন তখন তারা তাদের হাতে বন্দী বনু মুস্তালিকের সব লোককে রাসূলুল্লাহ এর আত্মীয় বিবেচনা করে ফেরত পাঠিয়ে দিলেন। এভাবে বনু মুস্তালিকের ছয়'শ বন্দী শুধু রাসূলুল্লাহ এর সাথে জুয়াইরিয়ার বিয়ে হওয়ার কারণে মুক্তি লাভ করল। সত্যি বলতে কি নিজ গোত্রের জন্য জুয়াইরিয়ার চেয়ে কল্যাণকর প্রমাণিত হয়েছে এমন কোন মহিলার কথা আমার জানা নেই।'
জুয়াইরিয়ার পিতার ইসলাম গ্রহণ: অন্য একটি বর্ণনা এরূপ- ইবনে আসীর (রা) বলেন, 'জুয়াইরিয়ার বাবা যখন জানতে পারলেন যে, তার কন্যা বন্দী হয়ে আছে, তখন তিনি অনেক সম্পদ ও আসবাবপত্র কয়েকটি উটের ওপর বোঝাই করে কন্যার মুক্তির জন্য মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। পথিমধ্যে পছন্দনীয় দু'টি উট 'মাফিক' নামক স্থানে লুকিয়ে রেখে অবশিষ্ট উট ও আসবাব নিয়ে রাসূল এর দরবারে উপস্থিত হয়ে আরজ করলেন, 'আপনি আমার কন্যাকে বন্দী করে এনেছেন। এসব মাল ও আসবাবপত্র নিন, বিনিময়ে আমার কন্যাকে ফিরিয়ে দিন।'
রাসূল বললেন, 'যে দু'টি উট তুমি লুকিয়ে রেখে এসেছ তা কোথায়?' রাসূল এর কথা শুনে হারেস আশ্চর্য হয়ে গেলেন এবং তখনই ইসলাম গ্রহণ করলেন। এরপর যখন জানতে পারলেন যে, তাঁর কন্যা রাসূল এর স্ত্রী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন, তখন তিনি সীমাহীন খুশি হন এবং কন্যার সাথে সাক্ষাৎ করে গৃহে ফিরে যান।
রাজনৈতিক কারণে বিয়ে: মূলত রাসূল এ বিয়েটা করেছিলেন সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে। একটু চোখ-কান খুলে বিয়ের বিষয়টা দেখলেই পরিষ্কার হয় যে, বিয়েটা ছিল রাজনৈতিক দূরদর্শীতার এক মাইলফলক। এ বিয়ের ফলে রাসূল ও মুসলমানগণ কূটনৈতিকভাবে বিজয় লাভ করেন। কারণ বনু মুস্তালিক গোত্রের সকল মানুষ ছিল ইসলাম ও মুসলমানদের চরম শত্রু। তারা কোনো প্রকারেই রাসূল ও মুসলমানদের মেনে নিতে রাজি ছিল না। এমতাবস্থায় রাসূল জুয়াইরিয়াকে বিয়ে করার ফলে বনু মুস্তালিকের সকল যুদ্ধ বন্দী বেকসুর মুক্তি লাভ করে। ফলে হঠাৎ করেই প্রাণের দুশমন বন্ধুতে পরিণত হয়। বনু মুস্তালিক গোত্রের কেউ আর কোনোদিন রাসূল ও মুসলমানদের বিরোধিতা করেনি। এমন কি তারা ধীরে ধীরে সকলেই ইসলামের পতাকাতলে আশ্রয় গ্রহণ করে।
জুয়াইরিয়ার ব্যক্তি সত্ত্বা : জুয়াইরিয়া (রা) ছিলেন অত্যন্ত ব্যক্তিত্বসম্পন্না ও স্বাধীনচেতা মহিলা। যে কারণে তিনি বন্দী জীবন সহ্য করতে পারেননি। তিনি দেখতে ছিলেন সুন্দরী এবং সুস্বাস্থ্যের অধিকারিণী। তাঁর সম্বন্ধে বলতে গিয়ে আয়েশা (রা) বলেন, 'জুয়াইরিয়া দেখতেই শুধু সুন্দরী ছিলেন না, বরং তাঁর অনুপম চেহারায়, চিত্তাকর্ষক এবং মধুর আচরণে এমন এক মাধুর্য নিহিত ছিল, যাতে করে যে কোনো লোক তাঁর সান্নিধ্যে আসত, সে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাশীল, বিমুগ্ধ ও আকৃষ্ট হয়ে যেত। তাঁকে দেখলেই দর্শকের মনে একটা স্থায়ী মমতার চিহ্ন ফুটে উঠতো।'
জুয়াইরিয়া (রা) একজন ইবাদত গুজার মহিলা ছিলেন। জানা যায়, তিনি প্রায় সার্বক্ষণিকভাবেই ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। একদিন রাসূল তাঁর ঘরে প্রবেশ করে দেখলেন জুয়াইরিয়া তাসবীহ পাঠ করছেন। রাসূল বললেন, 'তুমি কি সব সময় এ আমল কর?' তিনি উত্তর দিলেন, 'জি হ্যাঁ।'
একদিন ভোরে জুয়াইরিয়া (রা) মসজিদে বসে দোয়া করছিলেন। এ অবস্থায় রাসূল তাঁকে দেখলেন এবং চলে গেলেন। দুপুরে ফিরে এসে রাসূল তাঁকে সেই অবস্থায় দেখতে পেলেন।
ইবনে সা'আদ বর্ণনা করেন যে, জুমু'আর দিন নবীজী জুয়াইরিয়ার কাছে যান। সেদিন তিনি সিয়াম পালনরত ছিলেন। নবীজী যেহেতু একটা রোযা রাখাকে মাকরূহ মনে করতেন, তাই জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি গতকাল সিয়াম রেখেছিলে?' বললেন, 'না। নবীজী পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, আগামীকাল রাখবে? বললেন, না। নবীজী বললেন, তাহলে সিয়াম ভেঙ্গে ফেল।
রাসূল জুয়াইরিয়াকে খুব ভালোবাসতেন। একবার তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'ঘরে খাবার কিছু আছে কি? জুয়াইরিয়া বললেন, আমার এক দাসী ছদকার কিছু গোশত দিয়েছে, তাই আছে। এ ছাড়া আপাতত অন্য কিছু নেই। রাসূল বললেন, তাই নিয়ে এসো। কারণ, যাকে ছদকা দেয়া হয়েছে, তার কাছে তা পৌঁছেছে।'
হাদীস বর্ণনায় তাঁর অবদান
এ পুণ্যবতী মহিলা রাসূল ﷺ থেকে অল্প কয়েকটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইবনে আব্বাস, ইবনে ওমর, জাবের, আবু আইয়ুব মারাসী, তোফায়েল, মুজাহিদ, কুলছুম ইবনে মুসতালিক, কুরাইব এবং আবদুল্লাহ ইবনে শাদ্দাদ তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।
তিনি ছিলেন অত্যন্ত বুযুর্গ মহিলা সাহাবী। রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে তিনি ৭টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তন্মধ্যে ইমাম বুখারী একটি ও মুসলিম ২টি হাদীস নিজ নিজ গ্রন্থে সংকলন করেছেন।
তাঁর থেকে বর্ণিত হাদীসের কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হলো-
১. عَنْ عُبَيْدِ بْنِ السَّبَاكِ قَالَ : إِنَّ جُوَيْرِيَةَ (رضى) زَوْجِ النَّبِيِّ أَخْبَرَتْهُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ دَخَلَ عَلَيْهَا فَقَالَ : هَلْ مِنْ طَعَامٍ ؟ قَالَتْ : لَا وَ اللَّهِ يَا رَسُولَ اللَّهِ ﷺ وَ مَا عِنْدَنَا طَعَامٌ الا عَظْمُ مِنْ شَاةِ أَتَيْتُهُ مَوْلانِى مِنَ الصَّدَقَةِ فَقَالَ : قَرِّبِيهِ فَقَدْ بَلَغَتْ مَحِلُّهَا .
১. উবাইদা ইবনে সাববাক (রা) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল ﷺ-এর স্ত্রী জুয়াইরিয়া (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ একদা তাঁর কাছে এসে বললেন: তোমার কাছে কোন খাবার আছে কি? তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ! আমার দাসীকে দেয়া সাদকার বকরীর কিছু গোশত ছাড়া আমাদের কাছে আর কিছুই নেই। নবী ﷺ বললেন: তাই নিয়ে এসো, কারণ সাদকা তার নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে গিয়েছে। (মুসলিম)
عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ عَنْ جُوَيْرِيَةَ (رضى) أَنَّ النَّبِيِّ ﷺ خَرَجَ مِنْ عِنْدِهَا بَكِرَةٌ حِينَ صَلَّى الصَّبْحَ وَهِيَ فِي مَسْجِدِهَا ثُمَّ رَجَعَ بعْدَ أَنْ أَضْحَى وَهِيَ جَالِسَةٌ ، قَالَ : مَا زَلْتَ عَلَى الْحَالِ حَتَّى فَارَقْتُكِ عَلَيْهَا ؟ قَالَتْ : نَعَمْ - قَالَ النَّبِيُّ : لَقَدْ قُلْتُ بَعْدَكِ اربع كَلِمَاتٍ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ لَوْ وَزَنَتِ بِمَا قُلْتُ مُنْذُ الْيَوْمَ لَوَزِنْتَهُنَّ : سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ عَدَدَ خَلْقِهِ وَ رِضَى نَفْسِهِ وَ زِنَةَ عَرْشِهِ وَ مِدَادَ كَلِمَاتِهِ .
২. ইবনে আব্বাস (রা) জুয়াইরিয়া (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: নবী করীম একদা খুব ভোরে ফজরের সালাত পড়ে তাঁর নিকট থেকে বের হলেন। আর তিনি তখন তাঁর সিজদার স্থানেই ছিলেন। অত:পর নবী করীম দুপুর বেলায় ফিরে এসে দেখেন তিনি সিজদার স্থানেই বসা। নবী করীম বললেন: তোমাকে যে অবস্থায় রেখে গিয়েছি সে অবস্থায় আছ। তিনি বললেন, হ্যাঁ। নবী করীম বলেছেন: নিম্নের এ চার শব্দের দোয়া টি যদি তুমি তিনবার করে বলতে তা হলে এ যাবৎ তুমি যা বলেছ তার সাথে এটা ওযন করা যেত।
سُبْحَانَ اللهِ وَ بِحَمْدِهِ عَدَدَ خَلْقِهِ وَ رِضَى نَفْسِهِ وَ زِنَةَ عَرْشِهِ وَ مداد كلماته . (মুসলিম)
عَنْ جُوَيْرِيَةَ (رضى) قَالَتْ : قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ مَنْ لَبِسَ نَوْبَ حَرِيْرٍ الْبَسَهُ اللَّهُ قَوْبًا مِّنَ النَّارِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ .
৩. জুয়াইরিয়া (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ বলেছেন, যে ব্যক্তি রেশমী কাপড় পরবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে আগুনের পোশাক পরাবেন। (মুসলিম)
ওফাত: আমীর মু'আবিয়ার শাসনামলে ৬৫ বছর বয়সে জুয়াইরিয়া (রা) ইন্তেকাল করেন। সময়টা ছিল হিজরী ৫০ সালের রবিউল আউয়াল মাস। মদীনার তৎকালীন গর্ভনর মারওয়ান ইবনুল হাকام তাঁর জানাযার সালাত পড়ান। তাঁকে জান্নাতুল বাকীতে সমাহিত করা হয়।