📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর নামায > 📄 জুম‘আর নামাযের প্রচলিত ৭টি ভুল সংশোধন

📄 জুম‘আর নামাযের প্রচলিত ৭টি ভুল সংশোধন


(১) গোসল না করা : আবু সাঈদ খুদরী থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন:
غُسْلُ يَوْمِ الْجُمُعَةِ وَاجِبٌّ عَلَى كُلِّ مُحْتَلَمٍ
'জুমু'আর দিন প্রত্যেক বালেগের গোসল করা ওয়াজিব।' (মোআত্তাসহ হাদীসের ৬টি বিশুদ্ধ কিতাব)
আবদুল্লাহ বিন-ওমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: "জুমআর দিন আসলে সেদিন তোমরা গোসল করবে।” (হাদীসের একাধিক বিশুদ্ধ কিতাব)
নবী করীম (সঃ) বলেছেন, তোমাদের কেউ জুমআ পড়তে চাইলে সে যেন গোসল করে।' (মুসলিম)
(২) মুসল্লীদের ঘাড় টপকিয়ে সামনের কাতারে শরীক হওয়া: আবদুল্লাহ বিন বোসর থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) খোতবা প্রদানের সময় এক ব্যক্তি লোকদের ঘাড়ের উপর দিয়ে যাচ্ছিল। তিনি তাকে আদেশ দেন, বস, তুমি লোকদেরকে কষ্ট দিয়েছ।'
ইমাম তিরমিজী ঘাড় টপকিয়ে সামনে অগ্রসর হওয়াকে ওলামায়ে কেরামের মতে মাকরূহ বলে উল্লেখ করেছেন। ইমাম শাফেয়ীর মতে, এরূপ করা হারাম। ইমাম নওয়ী বলেছেন, সহীহ হাদীসের আলোকে তা হারাম। ইমাম আহমদের মতে, তা মাকরূহ।
আল্লামা এ'রাকী কা'ব আল-আহবার থেকে বর্ণনা করেছেন, আমি লোকদের ঘাড় টপকানোর চাইতে জুম'আ ত্যাগ করাকে পছন্দ করি। ইবনুল মোসাইয়ের বলেন: মুসল্লীর ঘাড় টপকানো অপেক্ষা আমার কাছে নিজ ঘরে জুম'আর নামায পড়া উত্তম বলে বিবেচিত। ইমাম ইবনে তাইমিয়ার মতে, তা হারাম।
(৩) জুমু'আর সময় দু'পা পেটের সাথে কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখা কিংবা হাত দিয়ে ধরে রাখা: মোআজ বিন আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। 'রসূলুল্লাহ (সঃ) জুম'আর সময় ইমামের খোতবা দানকালে পেটের সাথে দু'পা বেঁধে কিংবা হাত দিয়ে ধরে রাখতে নিষেধ করেছেন। - (আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিজী, হাকেম)
ইবনুল আসীর তাঁর 'আন-নেহায়া' গ্রন্থে লিখেছেন, এভাবে বসলে ঘুম আসে এবং অযূ ছুটে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। এছাড়াও এর ফলে সতর খুলে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
(৪) জুমু'আর দিন ২য় আজানের সময় মসজিদে প্রবেশ করে আজানের জবাব দানের জন্য অপেক্ষা করা এবং খোতবার প্রারম্ভে তাহিয়্যাতুল মসজিদ নামায পড়া: এর ফলে প্রবেশকারী সুন্নতের সওয়াব লাভের জন্য ওয়াজিব লঙ্ঘন করে। আজানের জওয়াব দেয়া সুন্নত, আর খোতবা শুনা ওয়াজিব। আজানের সময় মসজিদে প্রবেশকারীকে খোতবা শোনার স্বার্থে দু'রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ সংক্ষেপে পড়তে হবে। এ মর্মে নবী করীম (সঃ) বলেছেন: 'ইমামের খোতবার সময় কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে সে যেন দু'রাকাত নামায পড়ে এবং তাড়াতাড়ি করে।' (মুসলিম, আহমদ, আবু দাউদ) যারা এ দু'রাকাত নামায পড়েনা, তারা হাদীসের বিরোধীতা করে।
(৫) জুমু'আর ফরজের পর কথা বা কাজ ব্যতীত অবিচ্ছিন্নভাবে সুন্নত পড়া: নিয়ম হল, ফরজের পর কোন দরকারী মথা বলবে বা কোন কাজ করবে। তারপর সুন্নত নামায পড়বে। এ মর্মে নামেরের বোনের ছেলে সায়েব থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি সাহাবী হযরত মোআওইয়ার সাথে মাকসুরায় নামায পড়েছি। ইমামের সালাম ফিরানোর পর একই স্থানে দাঁড়িয়ে আমি (সুন্নত) নামায পড়লাম। তিনি আমার কাছে লোক পাঠান এবং বলেন, তুমি যা করলে আর এরূপ করবে না, তুমি ফরজ পড়ার পর হয় কথা বলবে, আর না হয় বেরিয়ে যাবে। কেননা, রসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন যে, আমরা যেন কথা বলা কিংবা বের হওয়া ছাড়া পূর্ববর্তী নামাযের সাথে পরবর্তী নামায মিলিয়ে না পড়ি।' (মুসলিম)
ইমাম নওয়ী (রঃ) বলেছেন: আমাদের সাথীদের মতে, ফরজ নামাযের স্থান থেকে সরে গিয়ে সুন্নত ও নফল নামায পড়া মোস্তাহাব। উত্তম হল, মসজিদ থেকে ঘরে গিয়ে নফল ও সুন্নত পড়া। তা না হলে, মসজিদের অন্য স্থানে সরে গিয়ে নামায পড়া। এর ফলে সাজদার স্থান বাড়বে এবং ফরজের স্থান থেকে সুন্নত ও নফলের স্থানের মধ্যে পরিবর্তন হবে। কথার মাধ্যমে ও সংযোগহীনতা সৃষ্টি হয় তবে, স্থান পরিবর্তন উত্তম। ১
ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রঃ) বলেছেন, জুম'আসহ অন্যান্য নামাযেও সুন্নত পদ্ধতি হল, ফরজ ও সুন্নতের মধ্যে সংযোগহীনতা সৃষ্টি করা। কেননা, 'নবী করীম (সঃ) দু'ধরনের নামাযকে এক সাথে মিলিয়ে পড়তে নিষেধ করেছেন, যে পর্যন্তনা দু'ধরনের নামাযের মধ্যে কেয়াম কিংবা কথা দ্বারা সংযোগহীনতা সৃষ্টি করা হয়।' অনেক লোক সালাম ফিরানোর পরপরই দু'রাকাত নামায পড়া শুরু করে। এটা ঠিক নয়। কেননা, এতে নবী করীম (সঃ)-এর নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করা হয়। এর লক্ষ্য হল ফরজ ও সুন্নত-নফলের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করা।
(৬) জুমু'আর খোতবার সময় কথা বলা: জুম'আর খোতবার সময় কথা বলা নিষেধ। এ মর্মে নবী করীম (সঃ) বলেছেন:
إِذَا قُلْتُ لِصَاحِبِكَ يَوْمَ الْجُمْعَةِ انْصِتُ وَالْإِمَامُ يَخْطُبُ فَقَدْ لَغَوْتَ
'তুমি যদি জুম'আর সময় ইমামের খোতবা চলাকালে তোমার সঙ্গীকে চুপ করতে বল, তাহলে তুমি লগ্ও করলে।' (বোখারী)
এ শব্দের বিভিন্ন অর্থ আছে।
১. ভুল করা, ২. সওয়াব থেকে বঞ্চিত হওয়া, ৩. জুম'আর ফজীলত বাতিল হওয়া ইত্যাদি।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী বলেছেন, খোতবার সময় কথা বললে তাকে চুপ থাকার নির্দেশ দেয়া সৎ কাজের আদেশের অন্তর্ভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও যদি সওয়াব বাতিল হয়ে যায় তাহলে, অন্য কোন শব্দ উচ্চারণের প্রশ্নই উঠে না। অর্থাৎ খোতবার সময় নিরিবিলি খোতবা শুনতে হবে। তাতে কোন কথা বলে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারবে না। তিনি আরো বলেন, এ হাদীস প্রমাণ করে যে, খোতবার সময় সকল প্রকার কথাবার্তা নিষিদ্ধ। ২
এমনকি কংকর সরানোও নিষিদ্ধ।
এ মর্মে ইবনুল মোনজেরী আরেকটি হাদীস উল্লেখ করেছেন। আবু জার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। আমি জুম'আর সময় মসজিদে প্রবেশ করলাম। তখন নবী করীম (সঃ) খোতবা দিচ্ছিলেন। আমি উবাই বিন কা'বের পাশে বসা ছিলাম। নবী করীম (সঃ) সূরা তাওবা পড়লেন। আমি উবাইকে জিজ্ঞেস করলাম, কবে এ সূরাটি নাজিল হয়েছে? তিনি আমার দিকে চেহারার চামড়া কুঁচকে অসন্তোষের দৃষ্টিতে তাকালেন এবং কোন কথা বললেন না। কিছুক্ষণ পর আমি পুনরায় একই প্রশ্ন করলে তিনিও একই ভাবের পুনাবৃত্তি করলেন এবং কোন উত্তর দিলেন না। নবী করীম (সঃ) নামায শেষ করেন। আমি উবাইকে প্রশ্ন করলাম, আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন না কেন এবং চেহারার চামড়া কুঁচকালেন কেন? উবাই জবাব দেন, তুমি তো তোমার নামায বাতিল করেছ। আমি নবী করীম (সঃ)-এর কাছে এ ঘটনাটি খুলে বললে তিনি উত্তরে বলেন: উবাই সত্য বলেছে।' (ইবনু খোজাইমা)
উবাইর সাথে আবদুল্লাহ বিন মাসউদেরও অনুরূপ এক ঘটনা ঘটেছিল। তিনিও নবী করীম (সঃ)-এর কাছে গিয়ে উবাইর বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে নবী করীম (সঃ) বলেন, উবাই ঠিক বলেছে, উবাইকে অনুসরণ কর।' -(আবু ইয়ালী, ইবনে হিব্বান)
জুম'আর খোতবা যে কত গুরুত্বপূর্ণ এবং তা শুনার প্রয়োজনীয়তা কতবেশি এটা উপরোক্ত হাদীসগুলো দ্বারা বুঝা যায়।
(৭) খোতবার আগে সুন্নত পড়ার সময় দেয়া: অনেক মসজিদে জুম'আর খোতবার আগে বক্তৃতা হয়। বক্তৃতা শুনার জন্য আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, এখন কেউ নামায পড়বেন না খোতবার আগে সুন্নাত পড়ার সময় দেয়া হবে। এর ফলে, মসজিদে ঢুকে প্রথমে তাহিয়্যাতুল মসজিদ দু' রাকাত সুন্নত নামায পড়ার ব্যাপারে নবী করীম (সঃ)-এর আদেশের বিরোধীতা করা হয়। নবী (সঃ) বলেছেন:
إِذَا دَخَلَ أَحَدَكُمُ الْمَسْجِدَ فَلَايَجْلِسُ حَتَّى يُصَلَّى رَكْعَتَيْنِ
'তোমাদের কেউ মসজিদে ঢুকলে সে যেন দু' রাকাত নামায পড়ার আগে না বসে।' (বোখারী)
অথচ, বক্তৃতা শোনার জন্য তাকে সে আদেশ পালন করা থেকে বারণ করা হয়। রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আদেশ লংঘনের মধ্যে কি কোন কল্যাণ আছে?
এ সমস্যার মূল কারণ হল, স্থানীয় ভাষায় খোতবা না দেয়া। আরবি খোতবা লোকেরা বুঝে না বলে আগে বাংলায় বক্তৃতা করে এর ক্ষতিপূরণের চেষ্টা করা হয়। এর ফলে তিনবার খোতবা হতে হয়। নবী (সঃ) মাত্র দু'টো খোতবা দিয়েছেন। স্থানীয় ভাষায় খোতবা দেয়া সম্পূর্ণ জায়েয। এ মর্মে ওলামায়ে কেরামের ফতোয়া রয়েছে। দীনের মধ্যে কোন কিছু যোগ-বিয়োগ করা যায় না। ৩

টিকাঃ
১. শরহে মুসলিম-ইমাম নওয়ী, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ১৭০-১৭১ পৃঃ。
২. ফাতহুল বারী-শরহে বোখারী-ইবনে হাজার আসকালানী-২য় খণ্ড, ৪১৫ পৃঃ。
৩. এ মর্মে লেখকের 'ইসলামে মসজিদের ভূমিকা' বই এর খোতবা অংশ দ্রষ্টব্য。

📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর নামায > 📄 অযু-গোসলের প্রচলিত ১৮টি ভুল সংশোধন

📄 অযু-গোসলের প্রচলিত ১৮টি ভুল সংশোধন


(১) অযু করার সময় প্রকাশ্যে নিয়ত উচ্চারণ করা : এটা সুন্নতের খেলাপ। সুন্নত পদ্ধতি হল, মনে মনে অযূর নিয়ত করা এবং মুখে উচ্চারণ না করা। ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রঃ) বলেছেন, মুখে নিয়তের উচ্চারণ বুদ্ধি ও দ্বীনদারীর ঘাটতি। দ্বীনদারীর ঘাটতি হল এটা বেদআত। আর বুদ্ধির ঘাটতির উদাহরণ হল কেউ খাওয়ার সময় যদি অনুরূপ নিয়ত করে যে, 'আমি খাবারের এ পাত্রটিতে হাত দেয়ার নিয়ত করলাম, আমি তা থেকে এক লোকমা মুখে দিয়ে চিবিয়ে গিলে তৃপ্ত হওয়ার নিয়ত করলাম।' মোটকথা, এগুলো ঠিক নয়।
ইবনুল কাইয়েম (রঃ) বলেছেন, নবী করীম (সঃ) অযুর শুরুতে
نَوَيْتُ أَنْ أَتَوَضَّأَ لِرَفْعِ الْحَدَثِ وَاسْتِبَاحَةِ لِلصَّلَاةِ وَتَقَرُّبًا إِلَى اللَّهِ تَعَالَى
বলতেন না, কিংবা কোন সাহাবায়ে কেরাম থেকে অনুরূপ কিছু বর্ণিত নেই। এমনকি কোন দুর্বল হাদীসেও এরূপ কোন বর্ণনা আসেনি।
লোকেরা অযুর দোআ- এ নামেও একটি দোআ পড়ে। সেটি হল:
بِسْمِ اللهِ الْعَلِيِّ الْعَظِيمِ - وَالْحَمْدُ لِلَّهِ عَلَى دِيْنِ الْإِسْلَامِ - الْإِسْلَامُ حَقٌّ وَالْكُفْرُ بَاطِلُ الْإِسْلَامُ نُورُ وَالْكُفْرُ ظُلُمَاتٌ
এরূপ দোআর সমর্থনেও কোন হাদীস বা সাহাবায়ে কেরামের সমর্থন নেই। তাই এগুলো থেকে বিরত থাকা উচিত।
ইবনুল কাইয়েম (রঃ) বলেছেন, অযূর শুরুতে নবী করীম (সঃ) থেকে বিসমিল্লাহ এবং অযূ শেষে নিম্নোক্ত দোআ ছাড়া আর কিছু বর্ণিত নেই :
১ম
أَشْهَدُ أَنْ لَّا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ - اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ التَّوَّابِينَ (মুসলিম-তাহারাত অধ্যায়) وَاجْعَلْنِي مِنَ الْمُتَطَهِّرِينَ
২য়
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ أَشْهَدُ أَنْ لَّا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ (সুনানে নাসাঈ) اسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوْبُ إِلَيْكَ
(২) অযু-গোসলে পানির অপচয় করা: যারা পুকুর-নদীনালা ও সাগরে অযু করে এবং যারা কলের পানি বা কূপের পানি দিয়ে অযূ করে তাদের উভয়ের বেলায় পানির অপচয়ের বিষয়টি প্রযোজ্য।
হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। 'নবী করীম (সঃ) ৫ মোদ পানি দিয়ে গোসল এবং এক মোদ পানি দিয়ে অযু করতেন।' (বোখারী)
ইমাম বোখারী বলেছেন, ওলামায়ে কেরام পানির অপচয় এবং নবী করীম (সঃ)-এর ব্যবহৃত পানির পরিমাণ অতিক্রম করাকে মাকরূহ বলেছেন। (বোখারী কিতাবুল অযু)
ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রঃ) বলেছেন, নবী করীম (সঃ) সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবেঈগণ, কেউ বেশি পানি ব্যবহার করতেন না।
সা'দ বিন আবি আক্কাস বেশি পানি দিয়ে অযু করছিলেন। নবী (সঃ) তাঁর পাশ দিয়ে অতিক্রম করেন। তিনি বলেন, হে সা'দ, তুমি পানির অপচয় করছ কেন? সা'দ জবাব দেন, অযুর মধ্যেও কি অপচয় আছে? নবী (সঃ) বলেন, 'হাঁ', যদি তুমি প্রবহমান নদীর মধ্যেও অযু কর। (ইবনু মাজাহ)
অপচয় সব ক্ষেত্রেই নিষিদ্ধ।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল বলেছেন, কম পানি ব্যবহার ব্যক্তির বুদ্ধি প্রতিপত্তির প্রমাণ। তাঁর ছাত্র মারওয়াজী বলেন, আমি আবু আবদুল্লাহকে (ইমাম আহমদ) অযূর সময় লোক চক্ষুর আড়াল করে রাখতাম যেন তাঁর কম ব্যবহারের কারণে তারা না বলে যে তিনি ভাল করে অযু করেন না। তিনি অযু করলে মাটি প্রায় ভিজত না।
আবুল ওফা ইবনু আ'কীল বলেন, নবী করীম (সঃ)-এর চরিত্রে ও এবাদতে বেশি পানি ব্যবহারের বৈশিষ্ট্য দেখা যায় না। - (জাইল তাবাকাতিল হানাবেলা, ১ম খণ্ড, ১৫০ পৃঃ)
আবদুল্লাহ বিন মোগাফ্ফাল থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, 'আমার উম্মতের মধ্যে পবিত্রতা অর্জন ও দোআয় সীমালঙ্ঘনকারী একদল লোকের আবির্ভাব ঘটবে।' - (আহমদ, আবু দাউদ, ইবনু মাজাহ, ইবনে হিব্বান, হাকেম)
আ'ওনুল মা'বুদ কিতাবের লেখক বলেছেন, তিন কাজে সীমালঙ্ঘন হতে পারে। (ক) তিনবারের বেশি অঙ্গ ধোঁয়া, (খ) পানি বেশি খরচ করা এবং (গ) ওয়াসওয়াসার কারণে প্রয়োজনের চেয়ে অঙ্গের বেশি অংশ ধোঁয়া। তারপর তিনি বলেন, ওলামায়ে কেরাম পানির অপচয় নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন যদিও সেটা সাগরের তীরের পানিই হোক না কেন।
(৩) ভালভাবে ও পরিপূর্ণ উপায়ে অযু না করা: মোহাম্মদ বিন যিয়াদ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) আমাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমি তাঁকে বলতে শুনেছি : 'তোমরা ভাল করে অযু কর। আবুল কাসেম মোহাম্মদ (সঃ) বলেছেন, পায়ের গোড়ালীর জন্য দোজখের আগুনের ধ্বংস।' (বোখারী) অর্থাৎ পায়ের গোড়ালী সাধারণত ভাল করে ধোঁয়া হয় না বলে তাতে পানি পৌঁছে না। তাই তা দোজখের কারণ হবে।
খালেদ বিন মা'দান নবী করীম (সঃ)-এর এক স্ত্রী থেকে বর্ণনা করেছেন, 'রসূলুল্লাহ (সঃ) এক ব্যক্তিকে নামায পড়তে দেখেন, অথচ তার পায়ের উপরের অংশে এক সিকি পরিমাণ জায়গা শুকনো রয়েছে। তিনি তাকে পুনরায় অযূর নির্দেশ দেন।' (আহমদ)
আবু দাউদ আরো একটু বেশি বর্ণনা করে বলেছে, তিনি তাকে নামায পুনরায় পড়ারও নির্দেশ দেন।' ইমাম আহমদ বলেন, এ হাদীসের সনদ ভাল।
আল্লামা শাওকানী বলেছেন, যে ব্যক্তি এ পরিমাণ স্থান শুকনো রেখেছে, এ হাদীস তার পুনঃ অযূর ওয়াজিব হওয়ার প্রমাণ।
অযূর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করা জরুরী। বহু লোক অযূর অঙ্গগুলোতে ঠিকমত পানি পৌঁছেছে কিনা তার প্রতি গুরুত্ব দেয় না। তাদের জন্য নিম্নের হাদীসগুলো খুবই উপকারী।
হযরত ওসমান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। 'রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন : যে ব্যক্তি নামাযের জন্য ভালভাবে অযু করল, ফরজ নামায পড়ার জন্য রওনা হল এবং লোকদের সাথে জাম'আতে নামায পড়ল, আল্লাহ তার সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেবেন।' - (মুসলিম, আহমদ, নাসাঈ)
আবু আইউব এবং ওকবা বিন আমের থেকে বর্ণিত। 'রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন : কোন ব্যক্তি যেভাবে হুকুম দেয়া হয়েছে সেভাবে অযু ও নামায পড়লে তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।' - (আহমদ, নাসাঈ, ইবনু মাজাহ, ইবনু হিব্বান)
(৪) পেশাবের অপবিত্রতা থেকে না বাঁচা : নবী করীম (সঃ) এটাকে কবীরা গুনাহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কা কিংবা মদীনার একটি বাগানের পাশ দিয়ে অতিক্রমের সময় দু'ব্যক্তির কবর থেকে চিৎকার শুনে বলেন, তারা বড় কোন বিষয়ে আজাব ভোগ করছে না। তারপর বলেন, তাদের একজন পেশাবের অপবিত্রতা থেকে বাঁচার চেষ্টা করত না এবং অন্যজন চোগলখুরী করত। তারপর তিনি খেজুরের একটি ডাল আনার নির্দেশ দেন। তিনি এটাকে ভেঙ্গে দু'টুকরো করেন এবং দু'কবরের উপর দু'অংশ গেঁড়ে দেন। জিজ্ঞেস করা হল, হে আল্লাহর রসূল! আপনি এটা' কেন করলেন? তিনি জবাব দেন, এগুলো শুকানোর আগ পর্যন্ত আল্লাহ তাদের আজাব লাঘব করতে পারেন।' - (বোখারী)
পেশাব করার সময় পেশাব বা পেশাবের ছিঁটা গায়ে বা কাপড়ে পড়লে তা নাপাক হয়ে যায়। নাপাক শরীর ও কাপড় দিয়ে নামায পড়লে নামায হবে না।
(৫) পেশাব-পায়খানা করার সময় সতর ঢেকে না রাখা : উরু ঢাকা জরুরী এবং তা সতরের অন্তর্ভুক্ত। অনেকে উরু খোলা রেখে পেশাব-পায়খানা করে। 'একবার নবী করীম (সঃ) জোরহোদ নামক সাহাবীর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলেন, হে জোরহোদ, তোমার উরু ঢাক, কেননা, উরু হচ্ছে সতর।' - (আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিজী, ইবনে হিব্বান, হাকেম)
'রসূলুল্লাহ (সঃ) আরো বলেছেন : নাভী থেকে হাঁটু পর্যন্ত সতর।' - (হাকেম)
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন : উরু সতর।' - (তিরমিজী)
তাই পেশাব-পায়খানা করার সময় উরু ঢেকে বসতে হবে।
(৬) পেশাব থেকে পবিত্রতার নামে বাড়াবাড়ি করা: কিছু লোক পেশাব থেকে পবিত্রতা অর্জনের নামে শয়তানের ওয়াসওয়াসার শিকার। তারা পবিত্রতার জন্য মাত্রাতিরিক্ত কষ্ট স্বীকার করে। এজন্য কৃত্রিমতা অবলম্বন করতে গিয়ে শরীয়তের সীমালঙ্ঘন করে। তারা পেশাবের সর্বশেষ ফোঁটা বের করার জন্য পুরুষাঙ্গ ধরে ৪০ কদম হাঁটে, এক পা, এক পা করে দু'পা দিয়ে চিপে, যেন সেনাবাহিনীর কসরত! তাঁদের যুক্তি হল, বদনার পানি ফেলে দেয়ার পর উপুড় করে রাখলে অল্প অল্প করে ফোঁটা তৈরি হয়ে নিচে পড়ে। তেমনি পেশাবও আস্তে আস্তে ঝরে পড়ে। এজন্য কাশি দেয় এবং গলা ঘক্ ঘক্ করে।
আল্লামা ইবনুল কাইয়েম (রঃ) বলেছেন, শয়তানের ওয়াসওয়াসাগ্রস্ত লোকেরা পেশাবের পর ১০টি কাজ করে। সেগুলো হল: ১. পুরুষাঙ্গকে গোড়া থেকে মাথা পর্যন্ত হাত দিয়ে টেনে এবং চিপে পেশাবের সর্বশেষ ফোঁটা বের করে। ২. গলা ঘক্ ঘক্ করা যেন অবশিষ্ট পেশাব বের হয়। ৩. নিচ থেকে উপরে ওঠে তাড়াতাড়ি বসে পড়ে। ৪. রশি বেয়ে উপরের দিকে ওঠার পর নিচে নেমে বসে পড়ে। ৫. পুরুষাঙ্গের মাথায় পেশাবের ফোঁটা দেখে পুরুস্নাঙ্গের ছিদ্রকে ফাঁক করে ধরে পবিত্রতার জন্য পানি ঢালে। ৭. পুরুষাঙ্গের মাত্রায় তুলা দিয়ে রাখে। ৮. পুরুষাঙ্গের মাথায় ন্যাকড়া বেঁধে রাখে। ৯. সিঁড়ি বেয়ে উপরে একটু উঠার পর দ্রুত নেমে আসে। ১০. কিছুক্ষণ হাঁটার পর পুনরায় কুলুখ ব্যবহার করে।
ইবনুল কাইয়েম বলেন, আমাদের ওস্তাজ শেখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেন: এগুলো সবই শয়তানের ওয়াসওয়াসা এবং বেদআত। তিনি বলেন, প্রথম দু'টোর বিষয়ে হাদীস তালাশ করে সহীহ কোন হাদীস পাইনি বরং ২য়টির ব্যাপারে একটি দুর্বল হাদীস রয়েছে যার উপর আমল করা যায় না। তিনি বলেন, পেশাবের উদাহরণ হল স্তনের দুধের মত। দোহন করলে দুধ বের হবে, আর ছেড়ে দিলে দুধ স্থিতিশীল থাকবে, অর্থাৎ কিছুই বের হবে না। যারা এ কাজের বদ অভ্যাস করেছে তারা ওয়াসওয়াসার শিকার। আর যারা তা করেনি তারা তা থেকে মুক্ত। যদি এ সকল কাজ সুন্নত হত, তাহলে এগুলো সবার আগে রসূলুল্লাহ (সঃ) এবং সাহাবায়ে কেরামগণ করতেন। ১
শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুস সালাম বলেন: শয়তানের ওয়াসওয়াসাগ্রস্ত লোকেরা উপরোক্ত যে ১০টি কাজ করে, মহানবী (সঃ) তা করেননি। এগুলো সবই শয়তানের ওয়াসওয়াসা এবং গোমরাহী। ২
পুরুষাঙ্গ ধরে হাটাহাটি করাই সতর লংঘন। পুরুষাঙ্গ ধরে হাটা অত্যন্ত লজ্জার বিষয়ও বটে। অনেকে বাড়িতে মেয়েলোকের সামনেও এ কাজ করে। মেয়েলোকেরা লজ্জা পায়। কোন মেয়ে লোক যদি পুরুষের সামনে নিজ লজ্জাস্থান ধরে এভাবে হাঁটত তখন সেটা কি রকম বেহায়াপনা হত। এটাও ঠিক তেমনি এক ভয়াবহ বেহায়াপনা।
পেশাব ধীরে সুস্থে করতে হবে। এরপর ঢিলা বা পানির যে কোন একটা ব্যবহার করলেই পাক হওয়া যায়। তাড়াহুড়া করে পেশাব করলে পেশাব ঝরার আশঙ্কা থাকতে পারে। কিন্তু ধীরে সুস্থে পেশাব করলে সে আশঙ্কা থাকে না। তাই নিজেদেরকে বিনা প্রয়োজনে ঐ সকল বদ অভ্যাসের রোগী বানানো ঠিক হবে না। আর যাদের পেশাব ঝরার রোগ আছে তারা প্রতি ওয়াক্ত নামাযের জন্য নতুন অযু করে নেবেন।
(৭) পেশাব-পায়খানার বেগ নিয়ে নামায পড়া: এটা ঠিক নয়। এর ফলে নিজের কষ্ট তো আছেই। এছাড়াও নবী করীম (সঃ)-এর আদেশের বিরোধীতা করা হয়। হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী করীম (সঃ) বলেছেন, খাওয়া উপস্থিত হলে এবং দু'টো নিকৃষ্ট জিনিসকে (পেশাব-পায়খানা) দমন করা অবস্থায় নামায হতে পারে না। - (মুসলিম)
(৮) ঘুম থেকে জেগে হাত না ধুয়ে পানির পাত্রে হাত ঢুকানো: হাদীসের মধ্যে এসেছে, পানির পাত্রে হাত ঢুকানোর আগে হাত ধুয়ে নিতে হবে। আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'তোমাদের কেউ ঘুম থেকে জাগলে তিনবার হাত ধোয়ার আগে সে যেন পানির পাত্রে নিজ হাত না ঢুকায়। তোমরা জাননা, তোমাদের হাত রাত্রে কোথায় বাস করেছে।' - (মালেক, শাফেঈ, আহমদ, বোখারী, মুসলিম এবং অন্য ৪টি হাদীসের বিশুদ্ধ কিতাব)
শেখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেছেন, হাত ধোয়ার পেছনে তিনটি হেকমত থাকতে পারে। ১. পায়খানা-পেশাবের রাস্তায় হাত লাগলে নির্গত ঘাম বা নাপাকী হাতে লাগতে পারে। ২. হাতের মধ্যে শয়তানের স্পর্শ লাগতে পারে। যেমন, হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে। নবী করীম (সঃ) বলেছেন, 'তোমাদের কেউ ঘুম থেকে জাগলে সে যেন নিজের নাকের দুটো ছিদ্র ভাল করে ঝেড়ে নেয়। শয়তান তার নাকের ছিদ্রের ভেতর বাস করে।' (বোখারী, মুসলিম) এ হাদীস দ্বারা নাক পরিষ্কার করার যে কারণ জানা গেল, সেটা হল, সেখানে শয়তানের রাত্রি যাপন। তাই একই কারণ হাত ধোয়ার পেছনেও প্রযোজ্য হতে পারে। ৩. এটা এবাদতের বিষয় যার অর্থ আমাদের বোধগম্য নয়।
(৯) অযূর শুরুতে বিসমিল্লাহ না বলা: সাঈদ বিন যায়েদ এবং আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'অযূ ছাড়া নামায হয়না এবং বিসমিল্লাহ বলা ছাড়া অযূ হয়না।' (আহমদ, আবু দাউদ, ইবনু মাজাহ, হাকেম)।
সৌদী আরবের সুপ্রিম ওলামা কাউন্সিলের সদস্য শেখ আবদুল্লাহ জিবরীন বলেছেন, কোন কোন আলেমের মতে, পেশাব ও পায়খানায় বিসমিল্লাহ বলা মাকরূহ এবং অযূতে বিসমিল্লাহ বলা ওয়াজিব। (শরহু মানার আস-সাবীল)
(১০) গর্দান মাসেহ করা: গর্দান মাসেহ করার ব্যাপারে মহানবী (সঃ) থেকে কোন সহীহ হাদীস বর্ণিত নেই। তালহা বিন মাসরাফ তার বাপ থেকে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঘাড় মাসেহ সম্পর্কিত বর্ণিত হাদীস দুর্বল। তাই ইমাম নওয়ী, ইবনে তাইমিয়া এবং ইবনে হাজার আসকালানী এটাকে দুর্বল হাদীস বলেছেন।
(১১) হাতের কনুই না ধোয়া: মহানবী (সঃ) হাত ধোয়ার সময় কনুই পর্যন্ত ধুতেন। তাই আমাদেরও তা করা উচিত। অন্যথায় অযু হবে না।
(১২) গোসলের সময় মোটা মানুষের চামড়ার ভাঁজে পানি না পৌঁছানো: মোটা মানুষের শরীরে গোশতের প্রাচুর্যের কারণে চামড়ার নিচে ভাঁজ পড়ে যায়। ফরজ গোসলের সময় তাতে পানি না পৌঁছলে সে গোসল দ্বারা শরীর পাক হবে না এবং কোন এবাদতও কবুল হবে না। তাই ভালভাবে অযু-গোসল করতে হবে।
(১৩) হাতের আংটি ও ঘড়ির নিচে পানি না পৌঁছানো: এতে করে ঐ জায়গাটুকু শুকনো থাকবে এবং ঐ অযু-গোসল দিয়ে নামায জায়েয হবেনা। ইমাম বোখারী বলেছেন, সাহাবী ইবনে সিরীন (রাঃ) অযুর সময় আংটির নিচে পানি পৌঁছাতেন।
(১৪) হাতের মধ্যে রং লাগলে কিংবা নখ পলিশ ব্যবহার করলে তা দূর করার আগে অযু হবে না: রং লাগলে সে জায়গায় পানি পৌঁছে না। অনুরূপ নখ পলিশ ব্যবহারের কারণেও সেখানে পানি পৌঁছেনা। তাই অযু-গোসলের আগে কেরোসিন জাতীয় জিনিস ও রং এবং নখ পালিশ দূরকারী রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে তা দূর করতে হবে।
(১৫) যমযমের পানি দিয়ে অযূ না করা: যেকোন পানি দিয়েই অযু-গোসল সবই করা যায়। সেটা যমযমের পানি হলেও। আবদুল্লাহ বিন আহমদ থেকে বর্ণিত। তিনি তাঁর 'যাওয়ায়েদ আল-মোসনাদ' গ্রন্থে হযরত আলী (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। নবী করীম (সঃ) হজ্জ থেকে ফিরে মসজিদে হারামে পৌঁছে এক বালতি পানি আমার আদেশ দেন। তিনি সে পানি পান করেন এবং তা দিয়ে অযু করেন।
আল্লামা সা'আতী বলেছেন, এর দ্বারা বুঝা যায় যে, যমযমের পানি পান করা ও তা দিয়ে অযু করা মোস্তাহাব।' (আল-ফাতহুর রাব্বানী-১১শ খণ্ড, ৮৬ পৃঃ)
ইমাম নওয়ী শরহে মুসলিমে লিখেছেন, হযরত আব্বাস (রাঃ) থেকে যমযমের পানি দ্বারা গোসল করা নিষিদ্ধ মর্মে বর্ণনা সহীহ নয়।
সৌদী আরবের পরলোকগত জেনারেল মুফতী শেখ আবদুল আযীয বিন বাজ বলেছেন, যমযমের পানি দিয়ে অযু জায়েয। তেমনি প্রয়োজন দেখা দিলে এস্তেঞ্জা এবং ফরজ গোসলও জায়েয। তাঁর মতে, নবী করীম (সঃ)-এর হাতের আঙ্গুলীর ফাঁক দিয়ে উৎসারিত পানি অযু-গোসল ও পান করার জন্য যায়েজ ছিল। যমযম সে ধরনের পানি না হলেও দু'পানিই পবিত্র। তাই দু'টো পানির হুকুম একই হবে। (ফাতাওয়া বি আহকামিল হজ্জ ওয়াল ওমরাহ-শেখ আঃ আযীয বিন বাজ)
(১৬) মাসিক সম্পর্কিত অজ্ঞতার কারণে নামায না পড়া: মহিলারা মাসিক সম্পর্কিত মাসলা না জানার কারণে নামাযের ক্ষেত্রে অনেক ভুল করে। 'কেউ যদি শেষ ওয়াক্তে পবিত্র হয়, তার উপর ঐ ওয়াক্ত আদায় করা ফরজ হয়ে যায়। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'কেউ যদি সূর্যাস্তের পূর্বে ১ রাকাত আসরের নামায পায় সে পুরো আসর পেয়ে গেল।' (বোখারী, মুসলিম)
অর্থাৎ তাকে বাকি রাকাতগুলো পড়া অব্যহত রাখতে হবে। তখন সূর্যাস্ত হলেও অসুবিধে নেই। আর যদি সূর্যোদয়ের আগে ১ রাকাত নামায পরিমাণ সময় আগে পবিত্র হয়, তাকে ফজর পড়তে হবে। নামাযের শেষ সময়ে পাক হওয়া সত্ত্বেও গোসল করতে গড়িমসি করায় নামাযের সময় চলে গেলে কবীরা গুনাহ হবে। মাতা-পিতা ও স্বামীর কর্তব্য হল মেয়েলোকদেরকে এ ব্যাপারে সতর্ক করা ও তাকিদ দেয়া। নচেত তারাও নামায লঙ্ঘনের গুনাহর শরীক হবে।
ইমাম ইবনুন নাহ্হাস বলেছেন, নামাযের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পর যদি মাসিক আসে এবং যদি ঐ সময়ে, নামায আদায় করা সম্ভবপর হয়, তাহলে পাক-পবিত্র হওয়ার পর সে ওয়াক্তের কাজা আদায় করতে হবে। ১
শেখ সালেহ বিন ওসাইমিন বলেছেন, নামাযের ওয়াক্ত শুরুর, যেমন সূর্য হেলার আধ ঘণ্টা পর মাসিক দেখা দিলে পরে ঐ নামায কাজা আদায় করতে হবে। কেননা, ওয়াক্ত শুরুর সময় সে পাক ছিল। - (ফাতাওয়াহ আল-মারআহ-২৫ পৃঃ)
(১৭) অযু করার পর শরীর ও কাপড়ে নাপাকী লাগলে অযু ভাঙ্গে না। অনুরূপভাবে, নখ কিংবা চুল কাটলেও অযু নষ্ট হয় না। যেসব কারণে অযু নষ্ট হয় এগুলো তার মধ্যে নেই।
(১৮) পাক হওয়া সত্ত্বেও ৪০ দিন পর্যন্ত নেফাসের মেয়াদ পূরণ করা: সন্তান প্রসবের পর যেদিন পাক হবে সেদিন থেকে নামায-রোযা শুরু করবে। ৪০ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করার কোন দরকার নেই। আরো আগে পাক হওয়া সত্ত্বেও নামায রোযা না করলে কবীরা গুনাহ হবে।

টিকাঃ
১. এগাছাতুল লাহফান-ইবনুল কাইয়েম, ১ম খণ্ড, ১৪৩, ১৪৪ পৃঃ।
২. আস-সুনান ওয়াল মোবতাদেআ'ত-পৃঃ ২৫।
১. তাম্বীহ আল-গাফেলীন-ইবনুন নাহহাস-পৃষ্ঠা: ৩১১।

📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর নামায > 📄 উপসংহার

📄 উপসংহার


বিশুদ্ধ হাদীসের আলোকে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নামায বইটি পড়ার পর নামাযের ভুলগুলোও আলোচনা হলে নামাযকে পরিপূর্ণ করার পথে আর কোন বাধা থাকে না। উপরন্তু নামাযের জন্য দরকার পবিত্রতা অর্জন। অযু-গোসলের মাধ্যমেই পবিত্রতা অর্জন করতে হয়। তাই নামাযের ত্রুটির পাশাপাশি অযু-গোসলের ভুল-ত্রুটিগুলোও আলোচনার দাবী রাখে। সেজন্য আমি অযু-গোসলের ভুল-ত্রুটিগুলোও আলোচনা করেছি।
মুসলমানের সাপ্তাহিক ঈদ হল জুম'আর দিন। সে কারণে জুম'আর নামাযের ভুল-ত্রুটিগুলোও শোধরানো দরকার। সে কাজটুকুও সম্পন্ন করতে পারায় আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি। হাদীস শরীফে এসেছে, মহানবী (সঃ) বলেছেন, বান্দাহকে সর্বপ্রথম আল্লাহর কাছে নামাযের হিসেব দিতে হবে। নামাযের প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলোর হিসেবও এর অন্তর্ভুক্ত হবার কথা। তাই আসুন, মহান কেয়ামত দিবসের প্রস্তুতি হিসেবে আমরা নামায ও প্রাসঙ্গিক বিষয়সমূহকে ত্রুটিমুক্ত করার চেষ্টা চালাই। আল্লাহ আমাদেরকে তওফিক দিন, আমীন।
সমাপ্ত

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00